কিরীটীর শেষ প্রশ্নে সীতা কেমন যেন একটু ইতস্তত করতে থাকে। কিরীটীর তীক্ষ্ণ অনুসন্ধিৎসাতে সেটুকু এড়ায় না। কিরীটী সঙ্গে সঙ্গেই আবার প্রশ্ন করে, সাধারণ ভাবে বিচার করে দেখতে গেলে আপনার মারও তাঁর ভাইয়ের সম্পত্তিতে কিছু দাবী থাকাটা তো বিচিত্র নয়। তবে অবশ্য যদি তিনি তাঁর যাবতীয় সম্পত্তি উইল করে তাঁর একমাত্র মেয়ের ছেলে-নাতিকেই দিয়ে গিয়ে থাকেন তো আলাদা কথা। আপনার মার সঙ্গে শতদলবাবুকেও ও-সম্পর্কে কোন দিন বলতে শোনেননি?
শতদল-ভাগ্নে এখানে আসবার কয়েক দিন পরে মার সঙ্গে তাঁর ঐ ধরনের কি সব কথাবার্তা হচ্ছিল, আমি বিশেষ কান দিইনি। মৃদুকণ্ঠে সীতা জবাব দেয়।
ইতিমধ্যে আমরা প্রায় নিরালার গেটের কাছাকাছি এসে পড়েছিলাম। অন্ধকারে কালো আকাশপটের নীচে নিরালা যেন কেমন একটা ভয়াবহ ছায়ার মতই মনে হয়। যেন কোন প্রাগৈতিহাসিক যুগের বিরাটকায় রক্তলোলুপ জানোয়ার ঘাপটি মেরে বসে আছে। নিজের অজ্ঞাতেই গা-টা অকারণেই কেমন যেন ছমছম করে ওঠে।
গেটটা খোলাই ছিল। সর্বাগ্রে সীতা, পশ্চাতে কিরীটী, তারও পশ্চাতে আমি ভিতরে প্রবেশ করলাম।
অস্পষ্ট তারকার আলোয় চারিদিককার গাছপালা কেমন ধোঁয়াটে, অস্পষ্ট। হঠাৎ তিনজনেই আমরা থমকে দাঁড়ালাম।
দোতলার একটা জানালা খুলে গেল আর সেই জানালাপথে একটা শক্তিশালী টর্চের অনুসন্ধানী আলো নীচের অন্ধকারে এসে উর্ধ্বদিকে উৎক্ষিপ্ত হল। শূন্য আকাশপথে অন্ধকারে আলোর রেখাটা কয়েক মুহূর্তে ঘরে-ফিরে দপ করে একসময় নিবে গেল। আলোটা দেখা যাবার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় কিরীটী দ্রুত বলিষ্ঠ হাতে আকর্ষণ করে আমাকে ও সীতাকে নিয়ে একটা মোটা ঝাউগাছের আড়ালেই আত্মগোপন করেছিল। আলোটা নিভে যাওয়া সত্ত্বেও আমরা তিনজনেই গাছের আড়ালেই দাঁড়িয়েছিলাম আত্মগোপন করে রুদ্ধ নিঃশ্বাসে। কিরীটীর দুহাত দিয়ে তখনও আমাদের দুজনের হাত ধরা। তিনজনেই নির্নিমেষে আমরা উপরের খোলা জানালাটার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে। খোলা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে অস্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি একটা মানুষের ছায়া।
ছায়াটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চিত্রার্পিতের মত।
সহসা চাপা গলায় কিরীটী প্রশ্ন করে, কোন ঘরের জানালা ওটা বলতে পারেন মিস ঘোষ?
মনে হচ্ছে শতদল-ভাগ্নের ঘরের জানালা! চাপা উত্তেজিত কণ্ঠেই জবাব দেয় সীতা।
আমারও তাই ধারণা। কতকটা যেন স্বগতোক্তিই করে কিরীটী।
একটু পরেই জানালাটা বন্ধ হয়ে গেল।
আরো কিছুক্ষণ পরে আমরা গাছের আড়াল হতে বের হয়ে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। দরজাটা ভিতর হতে বন্ধই ছিল। কিরীটী দরজা খোলার সংকেত-ঘণ্টার দড়ির প্রান্তটা ধরে টেনে দরজাটা খোলবার জন্য দড়ির সঙ্গে সংযুক্ত ভিতরের ঘণ্টাটা বাজাতে যাবে, হঠাৎ দরজাটা খুলে গেল। খোলা দরজার সামনে হ্যারিকেন হাতে দাঁড়িয়ে অবিনাশ।
অবিনাশই কথা বললে, বুড়োবাবু তো ঠিকই বলেছেন, আপনারা এসেছেন, দরজাটা খুলে দিতে!
বুড়োবাবু তিনি জানলেন কী করে যে আমরা এসেছি? প্রশ্ন করল কিরীটীই।
তা তো জানি না। তিনি দরজাটা এসে খুলে দিতে বললেন, তাই তো খুলতে এলাম। মৃদু হাসির সঙ্গে কথাটা বললে অবিনাশ।
০৭. দ্বিতীয় প্রশ্ন করল কিরীটী
শতদলবাবু বাড়িতে ফিরে এসেছেন, অবিনাশ? দ্বিতীয় প্রশ্ন করল কিরীটী অবিনাশের দিকে তাকিয়ে।
আজ্ঞে, কই না! দাদাবাবু তো এখনও ফেরেননি বাবু। মৃদুকণ্ঠে অবিনাশ জবাব দিল।
কখন ফিরবেন কিছু বলে গিয়েছেন? কিরীটী অবিনাশকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করে।
আজ্ঞে না। তা তো কিছুই বলে যাননি।
কোথায় গিয়েছেন তুমি জান?
না।
অতঃপর কিরীটী আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে বললে, চল সু ভিতরে গিয়ে বসা যাক। এখনি হয়তো শতদলবাবু এসে পড়বেন—চলুন সীতা দেবী।
সকলে আমরা অন্দরের দিকে অগ্রসর হলাম। অন্ধকার বারান্দাটা। আগে আগে হ্যারিকেন বাতিটা হাতে ঝুলিয়ে চলেছে অবিনাশ, পশ্চাতে অমিরা তিনজন। বেশী দূর অগ্রসর হইনি, একটা খসখস শব্দ শুনে সামনে দিকে তাকাতেই অস্বচ্ছ আলোকিত বারান্দাপথে নজর পড়ল ইনভ্যালিড চেয়ারটার উপরে উপবিষ্ট পক্ষাঘাতে চলচ্ছক্তিহীন হিরণ্ময়ী দেবী দুই হাতে মন্থর গতিতে উপবিষ্ট চেয়ারটার দুই পাশের চাকা দুটো দুপাশের হ্যান্ডেলের সাহায্যে ঘোরাতে ঘোরাতে ঐদিকেই এগিয়ে আসছেন।
সকলের আগে ছিল হ্যারিকেন হাতে অবিনাশ, তাকেই প্রশ্ন করলেন উদ্বেগাকুল কণ্ঠে হিরণ্ময়ী দেবী, অবিনাশ, সীতা এল?
অবিনাশ জবাব দেবার আগেই সীতা জবাব দেয়, এই যে মা, এসেছি আমি–বলতে বলতে সামনের দিকে সে এগিয়ে যায়।
অন্ধকারে পশ্চাতে বোধ হয় আমাকে ও কিরীটীকে দেখতে পাননি প্রথমটায় হিরণ্ময়ী দেবী। তাঁর রুক্ষ বিরক্তিপূর্ণ কণ্ঠস্বর শোনা গেল, এত রাত করে কোথায় ছিলে শুনি? কিন্তু পরক্ষণেই কিরীটীকে সীতার পশ্চাতে দণ্ডায়মান দেখে হিরণ্ময়ী দেবীর কণ্ঠের ক্ষণপূর্বের সমস্ত বিরক্তি যেন নিমেষে অন্তর্হিত হয়ে গেল এবং এবারে আর কন্যাকে নয়, কিরীটীকেই সম্বোধন করে প্রশান্ত স্নিগ্ধ কণ্ঠে বললেন, এ কি। কিরীটীবাবু নাকি? আসুন, আসুন। কোথায় দেখা হল আপনার সঙ্গে ওর?
তুমি ওঁদের ভিতরে নিয়ে এস মা। আমি চায়ের জল চাপাচ্ছি। কথাগুলো বলে সীতা সহসা অন্ধকারে বেশ যেন দ্রুত পদবিক্ষেপেই অদৃশ্য হয়ে গেল।
