সীতা চুপ করল। কিরীটী আগাগোড়া সীতার বর্ণিত কাহিনী গভীর মনোযোগ সহকারে শুনছিল। এতক্ষণে কথা বলল, আচ্ছা সীতা দেবী, ইতিপূর্বে আর কখনো ঐ বাড়িতে থাকাকালীন সময়ের মধ্যে আপনার টাইগারের উপর কোন প্রকার attempt হয়েছিল কি?
এখন মনে হচ্ছে, দিন দশেক আগে একবার বোধ হয় টাইগারের উপর কোন attempt হয়েছিল।
কী রকম?
সে-রাত্রেও ঠিক অমনি কালকের রাতের মতই টাইগারের চাপা গর্জন শুনে ঘর থেকে আমি বের হয়ে আসি কিন্তু কিছুই দেখতে পাই না।
কোন firing-এর শব্দ শুনেছিলেন সে-রাত্রে?
না।
হুঁ। কিরীটী মুহূর্ত কাল কি যেন ভাবে, পরে প্রশ্ন করে, শতদলবাবু কোথায়? এখন বাড়িতে আছেন নাকি?
তিনি ঘণ্টাখানেক আগেই বের হয়ে এসেছেন; জানি না ঠিক কোথায় গিয়েছেন।
আচ্ছা সীতা দেবী, জুতোর সেই ছাপগুলো বারান্দায় এখনো আছে কি? কিরীটী আবার প্রশ্ন করে।
বোধ হয় আছে। কারণ সকালেই তো থানা-অফিসার মিঃ ঘোষালকে সংবাদ দেওয়া হয়েছিল।
মিঃ ঘোষাল গিয়েছিলেন ওখানে?
হ্যাঁ। তিনি দুপুরেই এসেছিলেন। বললেন, আপনার সঙ্গে তিনি দেখা করবেন। বুঝতে পারছি তিনি দেখা করেন নি।
সন্ধ্যার ঘূসর অস্পষ্টতা ক্রমে যেন চারিদিকে চাপ বেধে উঠছে। একটু একটু করে চারিদিককার পটচ্ছায়া লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যাকাশে দেখা দিতে শুরু করেছে একটি-দুটি করে তারা। অল্পদূরে ডানদিকে সমুদ্র সন্ধ্যার তরল অন্ধকারে একটানা গর্জনে জানাচ্ছে তার অস্তিত্ব।
ক্ষণকালের জন্য কিরীটী বোধ হয় কী চিন্তা করে সহসা ঘুরে দাঁড়িয়ে সীতা দেবীর দিকে তাকিয়ে বলে, সীতা দেবী, আপনার বাবা মিস্টার ঘোষ এখন বাড়িতেই তো আছেন, না?
হ্যাঁ। বাড়ি থেকে বড় একটা তিনি তো কোথাও বের হন না। মৃদুকণ্ঠে জবাব দেয় সীতা।
চলুন। একবার না হয় আপনাদের ওখান থেকেই ঘুরে আসা যাক। শতদলবাবু এর মধ্যে ফিরে এলে তাঁর সঙ্গেও হয়তো দেখা হয়ে যেতে পারে, কী বলেন?
চলুন। হতেও পারে। কতকটা সোৎসাহেই সীতা যেন কিরীটীর প্রস্তাবটা অনুমোদন করে।
কিরীটী ও সীতা পাশাপাশি এগিয়ে চলে, আমি ওদের অনুসরণ করতে লাগলাম।
মাথার উপরে শীতের কুয়াশাহীন প্রথম রাতের কালো আকাশে তারাগুলো বেশ উজ্জল মনে হয় এখন। সমুদ্রের ভাঙা ঢেউয়ের শীর্ষে শীর্ষে ফসফরাসের সোনালী ঝিলিক চিকচিক করে ওঠে। কালো জলে আলোর চুমকি ওগুলো যেন।
সহসা কিরীটীই আবার পাশাপাশি চলতে চলতে সীতাকে প্রশ্ন করে, আপনি আমার ওখানে যাচ্ছিলেন কেন মিস ঘোষ?
ভাবছিলাম আপনার সঙ্গে একটা পরামর্শ করব—
পরামর্শ! কিসের বলুন তো?
এখানে, মানে ঐ বাড়িতে থাকাটা আর ভালো হবে কি না তাই ভাবছি
কেন?
ভাবছিলাম মার বর্তমান অবস্থা ভেবেই। এমনিতে মার নার্ভ খুব স্ট্রং, কিন্তু গতরাত্রের ব্যাপার দেখেশুনে মা যেন বেশ একটু নার্ভাসই হয়ে পড়েছেন বলে মনে হয়। জানেন তো, একে প্যারালেটিক রোগী—ডাক্তারের অ্যাডভাইস আছে যেন ওঁর পক্ষে কোন সময়েই কোনপ্রকার মানসিক উত্তেজনার কারণ না ঘটে। মাকে সর্বদাই তাই আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করি যাতে ওঁর মানসিক শান্তি অটুট থাকে। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে ঐ বাড়িতে যা সব ঘটেছে সুস্থমস্তিষ্ক ব্যক্তির পক্ষেই উত্তেজনার কারণ হচ্ছে, তা মা তো রোগী
কথাটা অবশ্য ভাববার, মিস ঘোষ! কিন্তু আপনার বাবা কী বলেন? কিরীটী প্রশ্ন করে।
বাবা! এসব ব্যাপারে অত্যন্ত indifferent। জ্ঞান হওয়া অবধি দেখে আসছি তো, কোন ব্যাপারেই তিনি বড় একটা থাকতে চান না। নির্লিপ্ত। অসুস্থ হলেও মা-ই সব কিছু দেখাশোনা করেন। তাঁর পরামর্শমতই সব চলে। কিন্তু এক্ষেত্রে যে মাকে নিয়েই কথাটা।
সীতার কথার এবারে আর কিরীটী কোন জবাব দেয় না। নিঃশব্দে কেবল পথ অতিক্রম করতে থাকে।
সীতাই আবার কথা শুরু করে, মার আপনার উপরে একটা অসাধারণ শ্রদ্ধা আছে মিঃ রায়। আমার তো মনে হয়, এ অবস্থায় আমাদের আর ও বাড়িতে বেশী দিন থাকা উচিত হবে না। যে যাই বলুক, definitely some foul play is going over there! তা ছাড়া স্বাস্থ্যের জন্যই মার ঐ বাড়িতে থাকা স্বাস্থ্যের দিক দিয়েও মার বর্তমানে বিশেষ যে কোন progress হচ্ছে বলেও আমার মনে হয় না।
কিন্তু কোন প্রকার foul play-ই যে বর্তমানে ঐ বাড়িতে চলেছে তাই বা আপনার ধারণা হল কেন মিস ঘোষ?
নইলে গত কয়েক দিন ধরে যে সব ব্যাপার ঘটছে, এ-সবের আর কি explanation হতে পারে, আপনিই বলুন! একটা হানাবাড়ি
ভূত-প্রেতে আপনার বিশ্বাস আছে নাকি সীতা দেবী?
না, না—ঠিক সেভাবে কথাটা আমি অবশ্যই বলিনি, মিঃ রায়। বলছিলাম, যা ও বাড়িতে ঘটছে, যুক্তি-তর্ক দিয়েও যে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছি না!
আমার কি মনে হয় জানেন সীতা দেবী?
কী?
এখনি ও-বাড়ি ছেড়ে হয়তো আপনার মা অন্যত্র কোথাও যেতে রাজী হবেন না।
বিস্ময়-ভরা দৃষ্টিতে কিরীটীর মুখের দিকে চোখ তুলে তাকাল সীতা, এ কথা বলছেন কেন?
সীতার প্রশ্নের জবাবটা কিরীটী বোধ হয় একটু ঘুরিয়েই দিল, আপনার মামা স্বর্গীয় রণধীর চৌধুরীর সম্পত্তিতে আপনাদের কি কোন অংশই নেই, মিস ঘোষ?
তা তো জানি না!
রণধীর চৌধুরী গত হয়েছেন কতদিন?
মাস দুই হল।
তাঁর কোন উইল বা ঐজাতীয় কোন নির্দেশনামা নেই?
বলতে পারি না।
আপনার মার মুখেও কিছু শোনেননি?
