নিঃশব্দেই আমরা সকলে দীর্ঘ পথটা অতিক্রম করে হোটেলের সামনে এসে দাঁড়ালাম। ঘোষাল কিরীটীর দিকে তাকিয়ে বললেন, তাহলে এবারে আমাকে বিদায় দিন মিঃ রায়!
তা কি হয়, এক কাপ চা অন্তত না খেয়ে—আসুন? রাণু দেবী, আপনি? কিরীটী রাণুর মুখের দিকে তাকাল।
আমাকে ক্ষমা করতে হবে মিঃ রায় কয়েকটা জরুরী চিঠি সকালেই আমাকে শেষ করতে হব। তা ছাড়া অনেকক্ষণ বের হয়েছি, মা হয়তো ব্যস্ত হয়ে আছেন।
রাণু বিদায় নিয়ে উপরে চলে গেল।
আমরা তিনজনে হোটেলের বারান্দায় এসে বসলাম তিনটে চেয়ার টেনে নিয়ে। আমার মাথার মধ্যে তখনও পূর্বের চিন্তাগুলোই নিঃশব্দে পাক খেয়ে খেয়ে ফিরছে। সম্মুখের রৌদ্রালোকিত সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে বসে রইলাম আমি।
কিরীটী ও ঘোষাল নিম্নস্বরে কী সব আলাপ করতে লাগল।
মধ্যে মধ্যে কেবল তাদের দু-একটা কথার অস্পষ্ট টুকরো শ্রুতিপথে আমার ভেসে আসছিল। বুঝলাম সম্পূর্ণ অন্য সাধারণ কথাবার্তা। নিরালা সম্পর্কে বা শতদল-ঘটিত কোন আলোচনাই নয়।
দিন দুই এর পর যেন কতকটা নির্বিবাদেই কেটে গেল। দুটো দিন কিরীটীও বিশেষ হোটেল থেকে কোথাও একটা বের হয়নি। বেশীর ভাগ সময়ই বারান্দায় ডেকচেয়ারে শুয়ে নিঃশব্দে একটার পর একটা সিগার ধংস করেছে। মনে হয়েছে, সে যেন চারিদিক হতে হঠাৎ নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে বিশেষ কোন একটা চিতায় সমাধিস্থ হয়ে পড়েছে। তৃতীয় দিন হঠাৎ বিকালের দিকে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললে, চল সুব্রত, সমুদ্রের ধার দিয়ে একটু ঘুরে আসা যাক।
দুজনে নিঃশব্দে সমুদ্রের বালুবেলার উপর দিয়ে পাহাড়টার দিকে হেঁটে চলেছি, হঠাৎ দূরে মনে হল যেন কে একটি তরুণী আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। অস্তমুখী ম্লান সূর্যালোকে দূর হতে সীতাকে দেখে আমার চিনতে কষ্ট হলেও কিরীটীর কিন্তু চিনতে কষ্ট হয়নি।
সে বলে ওঠে, আশ্চর্য! সীতা দেবী একাকী আসছেন? সঙ্গে তাঁর সেই চিরানুগত সাথী দুরন্ত ব্যাঘ্র-সদৃশ ভয়ঙ্কর আলসেসিয়ান কুকুর টাইগারকে কই দেখছি না যে!
সত্যি সীতাই আসছে।
কাছাকাছি আসতে কিরীটীই প্রথমে হাত তুলে সম্ভাষণ নমস্কার জানাল, শুভ সন্ধ্যা। এই যে সীতা দেবী, একা যে, আপনার অনুগত সাথীটি কই? তাকে দেখছি না যে?
নমস্কার। সীতাও হাত তুলে প্রতিনমস্কার জানিয়ে বললে, আমার অনুগত সাথী?
হ্যাঁ, আপনার সেই টাইগার?
সহসা লক্ষ্য করলাম কিরীটীর প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গেই সীতার চোখের তারা দুটি যেন কেমন বিষণ্ণ হয়ে উঠল, কাল রাত্রে হঠাৎ গুলি লেগে বেচারার একটা পা জখম হয়েছে, মিঃ রায়। কাতর কন্ঠেই সীতা বললে।
বলেন কী, টাইগার গুলিতে জখম হয়েছে! হাসতে হাসতে কিরীটী শেষের কথা কয়টি উচ্চারণ করে, তারপর সহসা সীতার মুখের দিকে তাকিয়েই বলে, কিন্তু ব্যাপার কি বলুন তো? এ যে বাঘের ঘরে ঘোঘের ব্যাপার!
সত্যিই আশ্চর্য ব্যাপার, মিঃ রায়! আমি আপনার সঙ্গেই হোটেলে দেখা করতে যাচ্ছিলাম।
আমার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন?
হ্যাঁ। আপনি তো জানেন, সেদিনই আমাদের অন্দরমহলে থাকবার জন্য শতদল-ভাগ্নে অনুরোধ জানান। আপনারা চলে আসবার পর কতকটা যেন নিজে উৎসাহ দেখিয়েই একপ্রকার আমাদের অন্দরমহলের দক্ষিণ দিককার যে দুটো ঘর খালি পড়ে ছিল, তাতে নিয়ে গিয়ে আমাদের থাকবার ব্যবস্থা করে দেন। একটা দিন ও একটা রাত ভালোই লাগছিল। কিন্তু, কথাগুলো বলে সীতা যেন একটু দম নেয়।
কিরীটী ও আমি দুজনই উদগ্রীব হয়ে সীতার কথা শুনছি।
সীতা আবার বলতে শুরু করে কাল রাত তখন বোধ হয় গোটা দুই হবে। অন্যান্য দিনের মতই টাইগার আমার ঘরের বাইরে শুয়ে ছিল। হঠাৎ তার ক্রুদ্ধ একটা চাপা গোঁ-গোঁ শব্দে আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। মনে হল কোন কারণে টাইগার যেন হঠাৎ ভীষণ খাপ্পা হয়ে উঠেছে। তারপরই পর পর দুটো গুলির শব্দ!
গুলির শব্দ?
হ্যাঁ। প্রথমটায় তো সত্যি কথা বলতে কি মিঃ রায়, ভয়ে আতঙ্কে আমি একেবারে কাঠ হয়েই গিয়েছিলাম ঘটনার আকস্মিকতায়। কিন্তু চিরদিনই ভয় বস্তুটা আমার একটু কম। নিজেকে সামলে নিতে তাই আমার খুব বেশী সময় লাগেনি। তাড়াতাড়ি বিছানা হতে উঠে দরজাটা খুলে একেবারে বাইরে চলে এলাম। মাঝরাতে কাল বোধ হয় চাঁদ উঠেছিল। ম্লান চাঁদের আলো বারান্দার উপরে এসে পড়েছে। দেখলাম টাইগার তখনও আমার ঘরের দরজার অল্প দূরে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে গোঁ গোঁ করে গজরাচ্ছে যন্ত্রণায়। ইতিমধ্যে পাশের ঘরে মা-বাবার এবং উপরের তলায় শতদল-ভাগ্নেরও ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, তারাও যে যার ঘর থেকে টাইগারের গর্জন শুনে বের হয়ে এসেছে। শতদলভাগ্নের ডাকাডাকিতে অবিনাশও ঘুম ভেঙে উঠে এল। আমি টাইগারকে ডাকতেই সে খোঁড়াতে খোঁড়াতে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। ভালো করে তাকিয়ে দেখি, তার ডান পা-টা বেশ গুরতর ভাবেই জখম হয়েছে। রক্ত ঝরছে তখনও। বারান্দাতেও রক্ত। আর—আর বারান্দায় দেখলাম, অনেকগুলো কেডস জুতোর সোলের ছাপ। ছাপগুলো জুতোর সোলে বোধ হয় ভিজে কাদা লেগেছিল তারই। এবং জুতোর ছাপ লক্ষ্য করে দেখলাম, বরাবর বারান্দার দক্ষিণ প্রান্তের শেষ পর্যন্ত যেখানে প্রাচীর শুরু হয়েছে এবং প্রাচীরের গায়ে যে দরজাটা সেই পর্যন্ত চলে গেছে। দরজাটা কিন্তু বন্ধ। দরজাটা বাইরের থেকে শিকল তুলে বন্ধ করে দিয়েছে। এদিককার খিল খোলা। দরজাটা ভিতর থেকেই খিল এঁটে বন্ধ করা ছিল।
