তা দিনচারেক আগে হবে। শতদলবাবু জবাব দেন।
ব্যাপারটা তুমি জান অবিনাশ? কিরীটী ঘরে দাঁড়িয়ে এবারে অবিনাশকে প্রশ্ন করে, শতদলবাবুর ঘরের ছবি ছিড়ে পড়ে গিয়েছিল!
হ্যাঁ বাবু, দেখেছি। তাজ্জব ব্যাপার! অমন মোটা তারটা যে কী করে ছিড়ল—
ছেড়েনি তো–কেউ কেটে রেখেছিল তারটাকে! কিরীটী জবাব দেয়।
বলেন কি বাবু! বিস্মিত অবিনাশ কিরীটীর মুখের দিকে তাকায়।
হ্যাঁ। তুমি আর রঘু ছাড়া তো বাড়ির মধ্যে কেউ ঢোকে না? কিরীটী আবার প্রশ্ন করে।
আজ্ঞে না। তবে দিনকতক হল আমার ভাইপো এসেছে, বাবু তাকে চাকরিতে বহাল করেছেন দয়া করে।
ও! বাবুর রান্নাবান্না করে কে?
হিন্দুস্থানী ঠাকুর আছে একটা, বাবুর সঙ্গেই তো এসেছে। অবিনাশ জবাব দেয়।
কই, আপনি তো সেকথা বলেননি শতদলবাবু? কিরীটী প্রশ্ন করে শতদলের মুখের দিকে তাকায়।
মনে ছিল না। হ্যাঁ, ভুখনা আছে, আমার সঙ্গেই এসেছে, লোকটা বোবা আর কালা।
বোবা আর কালা! এমন রত্নটি কোথায় পেলে শতদল? প্রশ্নকারী রাণু দেবী।
লোকটা অনেকদিন থেকেই আমার কাছে আছে। জাতে ছত্রী। রান্না করে চমৎকার। শতদল জবাব দেয়।
কই ডাকুন তো, দেখি লোকটাকে! আমিই বলি।
অবিনাশ, ভুখনাকে ডেকে নিয়ে এস তো! শতদল অবিনাশের দিকে তাকিয়ে আদেশ করে।
অবিনাশ ভুখনাকে ডাকতে চলে গেল। আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম সকলে।
০৬. দ্রষ্টব্য বটে ভুখনা
ভুখনাকে ডেকে নিয়ে এল অবিনাশ।
দ্রষ্টব্য বটে ভুখনা। যেমনি লম্বা তেমনি ঢ্যাঙা। দৈর্ঘ্যে প্রায় ছয় ফুট ছয় ইঞ্চির কাছাকাছি হবে। দেহের অতিরিক্ত দৈর্ঘ্যের জন্যই বোধ হয় লোকটা একটু কোলকুজো হয়ে হাঁটে। বড় বড় ভাসা ভাসা দুটো চোখের তারায় কেমন একপ্রকার বোবা নির্বোধ দৃষ্টি। ছড়ানো চৌকো চোয়াল। মাথার চুলগুলো ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া, অন্ধকারে আচমকা লোকটাকে দেখলে আঁতকে ওঠাও কিছু অসম্ভব নয়।
লোকটা তো বলছিলেন বোবা আর কালা, তা ওকে দিয়ে কাজ চালান কেমন করে শতদলবাবু? প্রশ্ন করল কিরীটী।
অনেকদিন আমার কাছে থেকে থেকে এখন আমার মুখ নাড়া দেখলেই ও বুঝতে পারে কী আমি বলতে চাই। তাই কাজকর্মের কোন অসুবিধা হয় না। তা ছাড়া একমাত্র রান্না করানো ছাড়া ওকে দিয়ে তো আর অন্য কোন কাজই করানো হয় না। শতদল জবাব দেয়।
এখানে আসবার পূর্বে তো আপনি কলকাতাতেই ছিলেন—তাই না শতদলবাবু?
হ্যাঁ, কলকাতার একটা বেসরকারী কলেজের আমি ইংরেজীর অধ্যাপক।
কিরীটী আবার অবিনাশের দিকে ফিরে তাকিয়ে তাকেই প্রশ্ন করল, ভুখনা একেবারেই শুনতে পায় না অবিনাশ, না?
তাই তো মনে হয় বাবু, একেবারে বেহদ্দ কালা!
এমন সময় সহসা গতরাত্রের সীতার সেই ভয়ঙ্কর আলসেসিয়ান কুকুরটার ডাক শুনতে পেলাম।
ঘেউ ঘেউ করে টাইগার ডাকছে।
আমরা সকলেই কুকুরের ডাকে চমকে বোধ হয় ক্ষণেকের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম, হঠাৎ কিরীটীর দিকে তাকিয়ে দেখি, নিপলক দৃষ্টিতে সে ভুখনার দিকেই তাকিয়ে আছে।
ভুখনার চোখে কিন্তু সেই বোবা নির্বোধ দৃষ্টি। নিষ্প্রাণ, স্থির।
চলুন মিঃ ঘোষাল! কিরীটীই আবার সর্বাগ্রে দরজার দিকে এগিয়ে গেল!
আমরাও সকলে তাকে অনুসরণ করলাম।
শতদল গেট পর্যন্ত আমাদের পৌঁছে দিয়ে বিদায় নিয়ে ফিরে গিয়েছে।
নিঃশব্দে সর্বাগ্রে কিরীটী ও মিঃ ঘোষাল পাশাপাশি এবং আমি ও রাণু দেবী পাশাপাশি পাহাড়ের ঢালুপথটা দিয়ে এগিয়ে চলেছি হোটেলের দিকেই।
সকালের শীতের রৌদ্রে নীল সমুদ্র যেন চূর্ণ ঢেউয়ের মাথায় মাথায় গুচ্ছ গুচ্ছ জুঁই ফুল ছড়িয়ে আপন মনে খেলে চলেছে। আমার মনের মধ্যে তখন নিরালা ও তার অধিবাসীদের কথাই ঘোরাফেরা করছে।
শতদলবাবুর জীবন বিপন্ন সন্দেহ নেই, কিন্তু কেন? কোন গোপন রহস্য। কি ঐ নিরালার মধ্যে লুকিয়ে আছে? কিংবা কোন গুপ্তধন? শতদলই শিল্পী রণধীর চৌধুরীর যাবতীয় সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হল কি করে? আইনের দিক থেকে সীতা বা তার মা হিরাণ্ময়ী দেবীর কি কোন স্বত্বই নেই মত শিল্পীর সম্পত্তিতে? এবং শতদল সীতা ও হিরণ্ময়ী দেবী ব্যতীত আর কোন উত্তরাধিকারীই কি নেই? আর শতদলবাবুই বা বলেন কি করে তিনিই তাঁর মত দাদুর যাবতীয় সম্পত্তির একমেবাদ্বিতীয়ম উত্তরাধিকারী? কোন উইল বা ঐ জাতীয় কোন লেখাপড়া আছে কি? মৃত শিল্পী রণধীর চৌধুরীর কি কোন আইন-উপদেষ্টা সলিসিটার বা অ্যাটিনী ছিল না? না আছে? বৎসরাধিককাল হরবিলাসু তাঁর স্ত্রী হিরাণ্ময়ী ও তাঁদের কন্যা সীতা ঐ নিরালাতে আছেন এবং রণধীর চৌধুরীর জীবিতকালে তাঁরই আমন্ত্রণে রুগ্ন হিরণ্ময়ী ওখানে আসেন তাঁরা বাইরের মহলে থাকেন কেন? ব্যবস্থাটা কি রণধীর চৌধুরীরই? তাই যদি হয়, তাহলে নিজের রুগ্না ভগিনীর প্রতি এ ব্যবহার কেন? কোন কারণবশতঃই কি তিনি রণধীর চৌধুরী তাঁর রগ্ন বোনকে বাইরের মহলেই এনে স্থান দিয়েছিলেন? ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে, তথাপি হিরাণ্ময়ী দেবীরা এখনো এখান হতে অন্যত্র যাননি কেন? হরবিলাসদের কী ভাবেই বা সংসারযাত্রা নির্বাহ হয়? পূর্বেই বা কী করতেন, এখনই বা কী করেন! পেনশন পান, না কোন জমিদারী বা সঞ্চিত অর্থ আছে! তাই যদি থাকে, তাহলে এভাবে হতাদরে বহির্মহলে পড়ে থাকবারই বা কী কারণ থাকতে পারে! বাড়ির প্রত্যেকটি প্রাণীই যেন আমার মনের মধ্যে আনাগোনা করে ফিরতে থাকে। একান্তভাবে পত্নীর শরণাপন্ন ও মুখাপেক্ষী হরবিলাসু তাঁর স্ত্রী—পক্ষাঘাতগ্রস্ত চলচ্ছক্তিহীন প্রৌঢ়া স্ত্রী হিরণ্ময়ী; তাঁর চক্ষুর অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। তাঁদের একমাত্র তরুণী কন্যা সীতা যেন একটি নির্বাক দ্রষ্টা। সদা-সঙ্গী তার ভীষণাকৃতি আলসেসিয়ান কুকুর-টাইগার। বৃদ্ধ পুরাতন ভৃত্য অবিনাশ। পুরাতন মালী রঘু। শতদলের বোবা ও কালা ছত্রী অনুচর ভুখনা। সহজ সরল অধ্যাপক মানুষ শতদল ক্রোড়পতির একমাত্র কন্যা অনন্যাসুন্দরী তরুণী রাণু দেবীর অনুরক্ত।
