ঘোষাল শতদলের মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন।
হ্যাঁ। মৃদু কণ্ঠে শতদল বললে, প্রথমটায় আমি বিশ্বাস করিনি। ব্যাপারটা, ভেবেছিলাম হয়তো সাধারণ ভাবেই হঠাৎ পাথরের চাঁইটা নিচের দিকে গড়িয়ে গিয়েছিল, কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, কিরীটীবাবুর কথাই ঠিক, that was also an attempt on my life!
তারপর তৃতীয় প্রচেষ্টা গতকাল সকালে সমুদ্রসৈকত হোটেলের সামনে সী বীচে কিরীটী আবার বলে।
বলেন কি মিঃ রায়? হ্যাঁ, and that was a bullet! কিন্তু আততায়ী লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ফলে
উনি তো বেঁচে যানই, আমার পৈতৃক প্রাণটাও—মানে প্রাণ ঠিক নয়, মাথাটাও বেঁচে যায়।
সত্যি? বিস্ময়ে যেন একেবারে হাঁ হয়ে গিয়েছেন ঘোষাল কিরীটীর কথায়।
হ্যাঁ, আমার মাথার টুপিটা ফুটো করে এ-ফোঁড় ওফোঁড় হয়ে বুলেটটা বের হয়ে যায়। এবং সেই ব্যাপারের পরই আকস্মিকভাবে ওঁর সঙ্গে আমাদের চেনা-পরিচয়। আমি আর সুব্রত তখন ঠিক ঐ সময় সী-বীচে বসে রৌদ্রসেবন করছিলাম।
কই, এ কথা তো তুমি কাল আমাকে বলনি শতদল! এতক্ষণে প্রশ্ন করল রাণু শতদলকে।
কী বলব তোমাকে, গতকাল ব্যাপারটা আমি কি বিশ্বাস করেছিলাম! শতদল বিষণ্ণ ভাবে জবাব দেয়।
কিন্তু দিনের আলোয় অমন জায়গায় কাউকে গুলি করে হত্যা করবার প্রচেষ্টা, এ যে তাজ্জব ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে মিঃ রায়! আপনি না হয়ে অন্য কারো মুখে ব্যাপারটা শুনলে তো আমি বিশ্বাসই করতাম না, হেসেই উড়িয়ে দিতাম। ঘোষাল বললেন।
ব্যাপারটা অবশ্য কতকটা সেই রকমই বটে, মিঃ ঘোষাল। তবে অনেক সময় দেখা গিয়েছে, সত্যিকারের তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন ক্রিমিন্যাল দু-একটা ঐ প্রকারের দুঃসাহসের কাজ করে থাকে। যাই হোক, এর পর আমি কতকটা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই শতদলবাবুকে fourth attempt সম্পর্কে বিশেষভাবে সতর্ক করে দিই!
দিয়েছিলেন ওঁকে সতর্ক করে?
হ্যাঁ। And the fourth attempt was rather too early! ভাবতেই পারিনি, এত দ্রুত আবার আততায়ী ওঁর জীবনের উপরে attempt নেবে! এবারেও গুলি এবং এই ঘরের মধ্যে।
এই ঘরের মধ্যে?
হ্যাঁ। পিছনের বাগান থেকে কেউ ওঁকে গতরাত্রে টেবিলের সামনে আলোয় বসে লেখাপড়া করতে দেখে নিশ্চিন্ত মনে বন্দুক চালায়। এবং সৌভাগ্যবশতঃ এবারের নিক্ষিপ্ত মত্যুবাণটিও লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম হয়নি আততায়ীর। আলোর চিমনিটার উপর দিয়ে গিয়েছে। এরপর আপনাকে সংবাদ না দিয়ে থাকাটা এবং সব কিছু আপনার গোচরীভূত না করাটা বিবেচনার কাজ হবে না বুঝেই আপনাকে সংবাদ পাঠানো হয়েছে। Now you are in the spot, এবারে আপনি এর একটা বিহিত করুন, কারণ আইন আপনাদেরই হাতে। আমরা সম্পূর্ণ তৃতীয় ব্যক্তি, বুদ্ধি বা মৌখিক সাহস দিতে পারি ওঁকে, কিন্তু সত্যিকারের সাহস বলতে যা বোঝায় একমাত্র তা উনি আপনাদের কাছেই আশা করতে পারেন ও পেতে পারেন। কিরীটী চুপ করল।
ঘোষালের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সমস্ত ঘটনা শোনবার পর তাঁর অবস্থা কতকটা ন যযৌ ন তস্থৌ।
ভদ্রলোক বিমুঢ় ও বিহ্বল হয়ে পড়েছেন। অসহায়ের মতই ঘোষাল কিরীটীর মুখের দিকে তাকালেন।
কিন্তু এ ব্যাপারে আমি যে ঠিক কি ভাবে ওঁকে সাহায্য করতে পারি, সেটা তো বুঝে উঠতে পারছি না মিঃ রায়। অবশ্য যদি উনি ভালো বোঝেন তো জন-দুই পাহারাওয়ালা এ বাড়িতে চব্বিশ ঘণ্টার জন্য মোতায়েন করতে পারি!
কিন্তু তাতে করে বিশেষ কোন ফল হবে বলে কি আপনার মনে হয়, মিঃ ঘোষাল? কিরীটী ঘোষালের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে।
তবে কি ভাবে আমি সাহায্য করতে পারি বলুন! I would be always at your service! ঘোষাল বললেন।
তার চাইতে যদি কোন plain dress-এর গোয়েন্দাকে সর্বদা শতদলবাবুকে পাহারা দেবার জন্য নিযুক্ত করা যায়, কথাটা আমি বললাম।
না, না মিঃ ঘোষাল, ও-সব কিছুর প্রয়োজন নেই। তার চাইতে যা বলছিলেন, রাত্রে জন-দুই যদি পাহারাওয়ালা আমার এ বাড়িটা পাহারা দেবার জন্য পাঠাতে পারেন, আমি নিশ্চিত হতে পারি। শতদলবাবু আমার কথার প্রতিবাদ জানান।
কিরীটী নিঃশব্দে চোখ বুজে আপন মনে চেয়ারটার উপর বসে পা নাচাচ্ছিল, শতদলবাবুর প্রতিবাদে একটিবার মাত্র বোজা চোখ দুটি খুলে শতদলের মুখের দিকে তাকিয়েই আবার পূর্ববৎ পা নাচাতে লাগল।
শতদলবাবুর প্রস্তাবে কতকটা যেন নিশ্চিত হয়েছেন বলে ঘোষালকে মনে হল। তিনি কিরীটীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, তাহলে সেই ব্যবস্থাই করি, মিঃ রায়?
কিরীটী সহসা উঠে দাঁড়ায়, হ্যাঁ, আপাততঃ তাই করুন। আচ্ছা শতদলবাবু আমরাও তাহলে উঠি। আপনি তাহলে হরবিলাসবাবুদের অন্দরমহলে আনার ব্যবস্থা করুন আজই।
হ্যাঁ, তাই করব। তবে আপনার সাহায্যও কিন্তু আমি চাই, মিঃ রায়!
কিরীটী হাসল, তা অবশ্যই পাবেন বইকি। তা ছাড়া ব্যাপারটায় আমি নিজেও কম interested নই। চল সুব্রত,—কিরীটী দরজার দিকে অগ্রসর হয়। ঘোষালও আমাদের অনুসরণ করলেন।
সিঁড়ির শেষ ধাপে অবিনাশের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
কিরীটী হঠাৎ থেমে দাঁড়াল, অবিনাশ?
আজ্ঞে বাবু!
অনেকদিন এ বাড়িতে আছ, না?
হ্যাঁ, বাবু, মশাইয়ের কাছেই আমি তো পনের বছর চাকরি করেছি
হঠাৎ কিরীটী শতদলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, আচ্ছা শতদলবাবু কতদিন আগে আপনার ঘরের সেই ছবিটা ছিড়ে পড়েছিল বলুন তো?
