হ্যাঁ, মৃদু গলায় সুশীল নন্দী বললেন, কিন্তু
জানি। আপনি হয়তো বলতে চাইছেন, তারা দীর্ঘদিনের পরিচিত ও পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। কথাটা ঠিক এবং সেক্ষেত্রে কারোর প্রতি কারোর আক্রোশ থাকলে হয়তো অনেক আগেই তাকে হত্যা করত, সে ধরনের সুযোগ পেতে তার কোন অসুবিধা ছিল না। তবে ঐদিনই বা হত্যা করলো কেন! তাই নয় কি?
হ্যাঁ।
দেখুন, আপনি নিশ্চয়ই বিশ্বাস করবেন হত্যা দুই রকমের হয়—এক দীর্ঘ দিনের হত্যালিঙ্গা-হত্যাকারী একটা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে সেটা হচ্ছে পূর্বপরিকল্পিত হত্যা—আর একটা হচ্ছে সাডেন পোভোকেশন-জনিত হত্যা। এখন কথা হচ্ছে মিত্রানীর ক্ষেত্রে কোন্টা হয়েছে! যদি প্রথমটাই ধরে নিই—তাহলে স্বভাবতই যে কথাটা আমাদের মনে হওয়া স্বাভাবিক, সেটা হচ্ছে হয়তো সেই হত্যাকারী মিত্রানীর পূর্ব-পরিচিত ছিল এবং সেই পরিচয়ের মধ্যে দিয়েই কোন কারণে সে মিত্রানীর প্রতি বিরূপ হয়ে ওঠে এবং সেই বিরূপতা হয়তো এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছিল—যার ফলে ঐ নিষ্ঠুর হত্যা সংঘটিত হয়েছে।
তাহলে আপনি বলতে চান মিঃ রায়—মিত্রানীর পরিচিত জনেদের মধ্যে কেউ ঠিক তাই—আর সেই পরিচিত জনদের কথা ভাবতে গেলে প্রথমেই ঐ বন্ধুদের কথাই মনে পড়া স্বাভাবিক নয় কি?
তা অবিশ্যি—
অবশ্যই ওরা ছাড়াও মিত্রানীর আরো পরিচিতজন থাকতে পারে—সেটা তখনই আমরা ভাববো, যখন সেদিন যারা উপস্থিত ছিল, তারা প্রত্যেকে সন্দেহের তালিকা থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু আগেই যে পাঁচজনের নাম করেছি তারা সেই তালিকা থেকে আমার মতে বাদ পড়ে।
কেন?
আপনার নেওয়া জবানবন্দি বা স্টেটমেন্টগুলো ভাল করে পরীক্ষা করে দেখুন, তাহলেই আপনার প্রশ্নের জবাব পাবেন,-মণিময়, ক্ষিতীশ, সতীন্দ্র ও পাপিয়া এরা একমাত্র পাপিয়া ব্যতীত–সকলেই যে যার জীবনে প্রতিষ্ঠিত, বিবাহিত, সংসারধর্ম করছে–এদের পক্ষে ঐ ধরনের একটা নৃশংস হত্যার ব্যাপারে লিপ্ত হওয়া স্বাভাবিক কি?
কেন? ওদের মধ্যেও তো কোন আক্রোশ বা ঈর্ষার কারণ থাকতে পারে মিত্রানীকে কেন্দ্র করে–সুশীল নন্দী বললেন।
তা থাকতে পারে হয়ত এবং যদি থাকেই, স্বভাবতই যে প্রশ্নটা আমার মনে হচ্ছে—কি কারণে আক্রোশ বা ঈর্ষা—
কত কারণ তো থাকতে পারে—সুশীল নন্দী বললেন।
কথাটা মিথ্যা বলেননি আপনি—তবু একটা কিন্তু থেকে যায়—
কিসের কিন্তু–
কিন্তুটা হচ্ছে মিত্রানী কি তাহলে তার কিছুটা অন্তত আভাস পেত না। শুধু তাই নয়—ওদের জবানবন্দি থেকেও হয়ত তার কিছুটা ইঙ্গিত আমরা পেতাম—যেটা বাকী দুজনার জবানবন্দি থেকে অর্থাৎ সুহাস মিত্র ও কাজল বোসের স্টেটমেন্ট থেকে আমরা পেতে পারি–কিন্তু সে কথা আমরা পরে ভাববো। তার আগে আমি আপনার একটু সাহায্য চাই–
বলুন কি সাহায্য চান?
আমি ওদের প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদা আলাদা করে কথা বলতে চাই—
বেশ তো। সে আর এমন কঠিন কি! আমি ব্যবস্থা করবো।
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব—
তাই হবে—
তাহলে আজ আমি উঠি। কি
রীটী বিদায় নিল। জ্যোতিভূষণও কিরীটীর সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে এলেন।
বেলা তখন অনেকটা গড়িয়ে গিয়েছে, বৈশাখের সূর্য মধ্য-গগনে প্রখর তাপ ছড়াচ্ছে।
গাড়িতে উঠতে হীরা সিং শুধায়, কিধার জায়গা সাব?
লালবাজার হয়ে চল—বাবুকে নামিয়ে দিয়ে যাবো।
গাড়ি চলেছে কলকাতার পথে–চলমান গাড়ির খোলা জানালাপথে আগুনের হল্কার মত তপ্ত হাওয়া যেন এসে চোখমুখ ঝলসে দিচ্ছে।
গাড়িতে উঠে একটা সিগারে অগ্নিসংযোগ করে কিরীটী। থানায় জ্যোতিভূষণ একটা কথাও বলেননি, দুজনের কথাবার্তা শুনে যাচ্ছিলেন।
কিরীটীর দিকে একবার তাকালেন জ্যোতিভূষণ, সিগার মুখে গাড়ির ব্যাক সীটে হেলান দিয়ে অন্যমনস্কভাবে বাইরের দিকে তাকিয়ে বসে আছে।
মিঃ রায়!
কিছু বলছিলেন জ্যোতিবাবু?
আচ্ছা, মিত্রানীর হত্যার ব্যাপারটা আপনার কি মনে হচ্ছে পূর্ব-পরিকল্পিত না সাড়ন প্রোভোকেশন!
অবশ্যই পূর্ব-পরিকল্পিত বলেই মনে হচ্ছে—কিন্তু এক জায়গায় ব্যাপারটা যেন ঠিক মিলছে না—
কি রকম? প্রশ্নটা করে তাকালেন জ্যোতিভূষণ কিরীটীর মুখের দিকে।
ধরুন যদি পূর্বপরিকল্পিত হয়—হত্যাকারীর পক্ষে চান্স পাওয়াটা যেন ফিফটিফিফটি হচ্ছে, অর্থাৎ যদি ঝড় ও ধুলোর আঁধি না উঠতো, চারিদিক একটা অন্ধকারের যবনিকায় না ঢেকে যেতো, হত্যাকারী হত্যা করবার সুযোগই পেতো না, অবিশ্যি যদি হত্যাকারী মিত্রানীর পরিচিত জনেদের মধ্যেই কেউ হয়ে থাকে।
আমার মনে আছে মিঃ রায়, সেদিনকার কাগজেও আবহাওয়ার পূর্বাভাসে দেখেছিলাম বিকালের দিকে বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনার কথাটা। এবং পর পর কয়েকদিনই বিকেলের দিকে সে সময় ঝড়বৃষ্টি হচ্ছিল। হত্যাকারী হয়ত সেইটুকুর উপরেই ভরসা করে প্রস্তুত হয়েছিল।
হতে পারে—তাহলে চান্স পাওয়াটা হত্যাকারীর পক্ষে ফিফটি-ফিফটিই থেকে যাচ্ছে—অর্থাৎ চান্স না পেলে সেদিন সে মিত্রানীকে হত্যা করতে পারতো না—মিত্রানী খুন হতো না। ভাল কথা, ময়না তদন্তের রিপোর্টটা কবেক পাওয়া যাবে? পেলেই আমাকে একটু জানাবেন। আমি বাড়িতেই থাকবো।
জ্যোতিভূষণকে লালবাজারে নামিয়ে কিরীটী ফিরে এলো। এবং সারাটা দিন কিরীটী আর কোথাও বের হলো না।
লালবাজার থেকে ফোন এলো সন্ধ্যের দিকে।
কিরীটী কৃষ্ণা আর সুব্রত বসে বসে চা পান করছিল।
কিছুক্ষণ পূর্বে সুব্রত এসেছে।
