ফোনের রিং হতেই কিরীটী বললে, দেখ তো সুব্রত, বোধ হয় লালবাজার থেকে জ্যোতিবাবু ফোন করছেন!
সুব্রত ফোনের রিসিভারটা তুলে নিল, হ্যালো—
কিরীটীবাবু আছেন?
আছে।
বলুন লালবাজার থেকে জ্যোতিভূষণ কথা বলছি।
এগিয়ে গিয়ে ফোনটা সুব্রতর হাত থেকে নিল কিরীটী। কিরীটী কথা বলছি, তারপর পেলেন পোস্টমর্টেম রিপোর্ট?
হ্যাঁ।
শ্বাসরোধ করে মৃত্যু ছাড়া দেহে আর কিছু পাওয়া গিয়েছে কি?
মিঃ রায়, মনে হচ্ছে আপনি যেন আরো কিছু আশা করছেন!
করেছিলাম বলেই তো আই অ্যাম ইগারলি ওয়েটিং ফর দি রিপোর্ট!
শি ওয়াজ রেপড। হাউ হরিবল!
হরি তো বটেই, তবে আমি ছায়ার পিছনে যেন কায়ার আভাস পাচ্ছি—দি ম্যান বিহাইন্ড দি কারটেন, আর এখন অত অস্পষ্ট মনে হচ্ছে না–ঠিক আছে, থ্যাঙ্ক ইউ।
রিপোর্টটা কি আপনি দেখতে চান?
পরে দরকার হলে আপনাকে জানাব।
ফোনটা নামিয়ে রেখে কিরীটী আবার এসে সোফায় বসল।
প্রশ্ন করে কৃষা, ময়না তদন্তের রিপোর্ট পেলে?
হ্যাঁ।
সুব্রত বললে, কার-মিত্রানী দেবীর?
হ্যাঁ, তার উপর বলাৎকার করা হয়েছিল—
তাহলে—সুব্রত যেন কি বলতে চায় কিন্তু তার বলা হলো না—
কিরীটী কতকটা যেন তাকে থামিয়ে দিয়েই বললে, তুই তো সব শুনেছিস সুব্রত—এবারে তোর কি মনে হয়, বাইরের কেউ, না ঐ মিত্রানীর পরিচিত জনদের মধ্যেই কেউ–
কৃষ্ণা জবাবটা দিল, বাইরের কেউও-তো হতে পারে।
কৃষ্ণা, না—গণ্ডিটা অত্যন্ত ছোট—মিত্রানীর পরিচিত জনদের মধ্যেই কেউ এবং সম্ভবত যারা ঐদিন ঐসময় ঐখানে উপস্থিত ছিল তাদেরই মধ্যে একজন—যার তিনটি বস্তুই ছিল, অর্থাৎ সুবিধা সুযোগ ও হত্যার উদ্দেশ্য!
কি উদ্দেশ্য হতে পারে? কৃষ্ণার প্রশ্ন।
ব্যর্থ প্রেমের আক্রোশ বা বহুদিন ধরে অবদমিত কামভাব, ঠিক প্যাশান নয়, মিত্রানীর প্রতি একটা লালসা—যে কারণে প্রথমে ঐ অকস্মাৎ হাতের মুঠোয় আসা সুযোগকে যেমন সে নষ্ট হতে দেয়নি, তেমনি বহুদিনের লালসার পরিতৃপ্তি সাধন করতেও সে এতটুকু পশ্চাদপদ হয়নি। কিঙ হার বাই থ্রোটিং অ্যান্ড দেন রেপড হার।
পর পর হত্যা ও ধর্ষণ—বিশেষ করে হত্যার নিষ্ঠুর পদ্ধতি দেখে সেটাই বেশী করে মনে হয়!
দিন দুই পরে শনিবার সুশীল নন্দীর ফোন এলো।
মিঃ রায়–কাল সকলে বিকালের দিকে আমার এখানে আসছে আপনি যেমন বলেছিলেন—
কিরীটী জবাবে বলেছিল, ঠিক আছে। আমি যাবো, কটার সময় তারা আসছে? এই ধরুন পাঁচটা থেকে সাড়ে পাঁচটার মধ্যে। আমার কথা কিছু তাদের বলছেন?
না, আমিই তাদের সঙ্গে আরো কিছু আলোচনা করতে চাই এইটুকুই বলেছি। সুশীল নন্দী বললেন।
ধন্যবাদ জানিয়ে অতঃপর কিরীটী ফোনের রিসিভারটা সবে নামিয়ে রেখেছে, সুব্রত এসে ঘরে ঢুকল।
এই যে সুব্রত–এসে গেছিস তুই, ভালই হলো, নচেৎ একটু পরেই হয়ত তোকে। ফোন করতাম।
সুব্রত কোন কথা না বলে একটা খালি সোফার উপরে উপবেশন করলো।
কিরীটীই বললে, কাল শনিবার সুশীল নন্দীর ওখানে একবার যাবো বিকেলের দিকে, তুইও থাকবি আমার সঙ্গে
মিত্রানীর বন্ধু ও বান্ধবীদের সঙ্গে কথা বলবি? সুব্রত শুধাল।
হ্যাঁ।
কিন্তু পাঁচজনকে তো আগেই লিস্ট থেকে বাদ দিয়েছিস তুই!
তা দিয়েছি ঠিকই, তবু সকলেরই মুখোমুখি একবার আমি হতে চাই—তাতে করে মিত্রানীর মৃত্যুতে কার মনে কি রকম রেখাপাত করেছে, কিছুটা অন্তত তার আভাস পাবো হয়তো।
কিন্তু ওরাই তো সব নয়—একজন তো বাকী থেকে যাচ্ছে, যদিও সে ঘটনার দিন স্পটে উপস্থিত ছিল না–
সজল চক্রবর্তী?
হ্যাঁ।
কথাটা যে আমার মনে হয়নি সুব্রত তা নয়, ঘটনার সময় সেদিনকার স্পটে সে না থাকলেও মিত্রানীর পরিচিত জনদের মধ্যে সেও একজন। সে নিশ্চয়ই এতদিনে ব্যাপারটা জানতে পেরেছে—কাজেই তার মনে মিত্রানীর হত্যার ব্যাপারটা কতখানি রেখাপাত করেছে তাও জানা প্রয়োজন তো বটেই, তাছাড়া মিত্রানী সম্পর্কে কোন নতুন তথ্যও হয়ত সে দিতে পারে।
কৃষ্ণা এতক্ষণ ঘরের এক কোণে বসে গভীর মনোযোগের সঙ্গে একখানা বই পড়ছিল, দুই বন্ধুর আলোচনায় কোন সাড়া দেয়নি, সে এবারে বললে, দেখো, একটা কথা তোমাকে গতকাল থেকেই বলবো ভাবছিলাম!
কি বল তো? স্ত্রীর মুখের দিকে তাকাল।
দলের মেয়ে দুটিকেই বোধ হয় তুমি তোমার বাদের মানে অমিশনের লিস্টে যোগ করে নিতে পারো–
তুমি বোধ হয় পোস্টমর্টেমের রিপোর্টটার কথাই ভাবছো কৃষ্ণা, কিন্তু এটা তো স্বীকার করবে ঐ চরম ঘটনাটা ঘটাবার আগে বিক্ষিপ্ত কোন ইতিহাস বা ঘটনা ঐ ব্যাপারের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
তা যে পারে না আমি বলছি না, তবে
তাছাড়া এটাও তুমি নিশ্চয়ই স্বীকার করবে কৃষ্ণা, রহস্য উদঘাটনের ব্যাপারে এমন অনেক কিছু আপাতদৃষ্টিতে অপ্রয়োজনীয় মনে হলেও, পরে কোন এক সময় সেটা কোন মূল্যবান সূত্র হয়ে দাঁড়াতে পারে! কি জানো কৃষা, ঠিক সেই কারণে ঐ দশটি নরনারীর পরিচয়ের ইতিহাস যতটা সম্ভব আমি জানতে চাই—যদি কোথাও কিছু এমন খোঁজ পাই যেটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে এগুতে পারব।
কৃষ্ণা আর কথা বাড়াল, সোফা থেকে উঠে পড়ে বললে, বোসো তোমরা, আমি চা নিয়ে আসি।
কৃষ্ণা ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
০৮. ওদের সকলের পৌঁছাবার আগেই
ওদের সকলের পৌঁছাবার আগেই কিরীটী সুশীল নন্দীর ওখানে পৌঁছে গিয়েছিল। কিরীটী সুশীল নন্দীকে আগেই ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিল, থানার মধ্যে নয়—সম্ভব হলে ঐ বিলডিংয়েরই দোতলায় সুশীল নন্দীর কোয়ার্টার্স-এ সে সকলের সঙ্গে দেখা করতে চায়। সুশীল নন্দী বলেছিল, তাতে কোন অসুবিধা হবে না, কারণ তার স্ত্রী কিছুদিনের জন্য বাপের বাড়ি গিয়েছেন–তার কোয়াটার্স খালি।
