কিরীটী স্টেটমেন্টগুলো পড়তে শুরু করল।
(১) প্রথমেই বিদ্যুৎ সরকার! বাপ অ্যাডভোকেট সমর সরকার—বনেদী ধনী পরিবারের ছেলে। বি. এ. পাস করবার পর বাপের এক বন্ধু নামী চিত্রপরিচালকের অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে গত কয়েক বছর কাজ করছে। সুগঠিত ও স্বাস্থ্যবান-মিত্রানীর সঙ্গে পরিচয় অনেক দিনের-একই কলেজে তিন বৎসর ওরা পড়েছে। মধ্যে মধ্যে মিত্রানীর ওখানে যেতো—মিত্রানীও আসত-পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে টেলিফোনেও কথাবার্তা। হতো মধ্যে মধ্যে। ঝড় উঠবার পর কিছুক্ষণের জন্য দল থেকে ছিটকে পড়ে। তারপর অন্যান্য বন্ধুদের সাহায্যে যেভাবে মিত্রানীকে খুঁজে পায় তারই বর্ণনা। অবিবাহিত।
(২) সুহাস মিত্র-নিয়মিত ব্যায়াম করার ফলে সুগঠিত চেহারা, কলেজ জীবনে শুধুই যে সে একজন মেধাবী ছাত্র হিসাবেই পরিচিত ছিল তাই নয়—ভাল অ্যাথলেটও ছিল। প্রাক্তন কলেজ ব্ল। বাড়ির অবস্থা তেমন ভাল নয়, তাছাড়া বাপ পঙ্গু-বিবাহযোগ্যা দুটি বোন। তাই বি. এ. পাস করবার পরই একটা মার্চেন্ট অফিসে চাকরি নিতে বাধ্য হয়েছে। তারও স্টেটমেন্ট–অনেকটা বিদ্যুৎ সরকারের মতই-অকস্মাৎ ঝড় ওঠায় দল থেকে ছিটকে পড়ে ধুলোর অন্ধকারে কিছু চোখে দেখতে পাচ্ছিল না—দুপা কোনমতে এগোয় তো পাঁচ-পা পিছিয়ে আসে এলোমেলো ঝড়ো বাতাসে–তারপরই হঠাৎ একটা ভারী গাছের ডাল মাথার উপরে ভেঙে পড়ে। মাথায় আঘাত লেগে অচৈতন্য হয়ে যায়, বন্ধুরা এসে তাকে গাছের ডাল সরিয়ে উদ্ধার করে। অন্যান্য বন্ধু ও মিত্রানীর সঙ্গে বিশেষ একটা দেখাসাক্ষাৎ হতো না—অবিবাহিত।
(৩) মণিময় দত্ত—বি. এ. পাস করে এম. এ. এক বছর পড়েছিল। ঐ সময় তার মামার সুপারিশে খিদিরপুর ডকে একটা ভাল চাকরি পেয়ে গত কয়েক বছর ধরে সেখানেই চাকরি করছে। রোগা পাতলা চেহারা—হঠাৎ ঝড় ওঠায় দল থেকে ছিটকে পড়ে। তারপর ঝড় থামলে প্রথমেই সে বিদ্যুৎকে দেখতে পায়—তখন দুজনে খুঁজতে খুঁজতে অন্য সকলের দেখা পায়–সুহাস আর মিত্রানী বাদে-তারপর তার স্টেটমেন্ট বিদ্যুতেরই অনুরূপ। তারও অন্যান্য বন্ধুদের ও মিত্রানীর সঙ্গে বিশেষ একটা দেখাসাক্ষাৎ হতো না। বিবাহিত। একটা সন্তানের বাপ।
(৪) ক্ষিতীশ চাকী—বি. এ. পরীক্ষা দুবার দিয়ে পাস না করতে পেরে পড়া ছেড়ে দেয়–কোন বিশেষ রাজনৈতিক পার্টির সভ্য-সক্রিয় সভ্য। পার্টির কাজকর্ম নিয়েই সে সর্বদা ব্যস্ত থাকে—বাকী স্টেটমেন্ট তার অন্যান্যদেরই অনুরূপ। বিবাহিত।
(৫) অমিয় রায়-বি. এ. পাস করবার পর ওকালতি পাস করে আলিপুর কোর্টে নাম লিখিয়ে প্র্যাকটিস করছে বাপের জুনিয়ার হয়ে। সেও ঘটনার যা স্টেটমেন্ট দিয়েছে অন্যান্যদেরই অনুরূপ। বন্ধুদের সঙ্গে মধ্যে মধ্যে তার দেখা হতো। বিবাহিত—গত ফাল্গুনে বিবাহ করেছে।
(৬) সতীন্দ্র সান্যাল-আবলুশ কাঠের মত গাত্রবর্ণ। গোলগাল চেহারা। বাপ কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপদস্থ অফিসার এবং বেশীরভাগই দেশে-বিদেশে চাকরির ব্যাপারে ঘুরতে হয় বলে—ওরা দুই বোন, এক ভাই ও মা কলকাতাতেই থাকেন। ফুড ডিপার্টমেন্টে ভাল চাকরি করে। অবিবাহিতবাকী স্টেটমেন্ট অন্যান্যদেরই অনুরূপ। বিবাহ হয়নি বটে এখনো, তবে স্থির হয়ে গিয়েছে।
(৭) কাজল বোস। দেখতে কালো। রোগা। বি. এ., বি. টি. পাস করে একটা স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড-মিসট্রেস—বাপ নেই—মামা-মামীর কাছে মানুষ——স্কুল বোর্ডিংয়েই থাকে আগরপাড়ায়। বিবাহ হয়নি। কলকাতার বাইরে থাকায় বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে বিশেষ একটা দেখা হতো না–কদাচিৎ কখনো কালে-ভদ্রে, একমাত্র সুহাস মিত্র ছাড়া। সুহাসের সঙ্গে প্রায়ই তার দেখা হয়–বাকী ঘটনার স্টেটমেন্ট অন্য সকলের মতই।
(৮) পাপিয়া চক্রবর্তী। বি. এ. পাস এবং ভাল এ্যাথলেট। জীবনে অনেক কাপ মেডেল শীল্ড পেয়েছে। গাত্রবর্ণ উজ্জ্বল শ্যাম, অত্যন্ত স্মার্ট চেহারা, স্লিম ফিগার, কলকাতার একটা বড় অফিসে রিসেপশনিস্ট—ভাল মাইনে। অবিবাহিতা। সকলের সঙ্গেই মধ্যে মধ্যে দেখা হতো, বিশেষ করে মিত্রানী ও সুহাস মিত্রের সঙ্গে। তার বাকী স্টেটমেন্ট অন্যান্যদেরই অনুরূপ।
কিরীটী সকলেরই স্টেটমেন্ট বা জবানবন্দিগুলো পড়লো। তারপর একসময় সুশীল নন্দীর দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে বললে, এদের মধ্যে পাঁচজনের স্টেটমেন্টের কোন গুরুত্ব নেই–
সুশীল নন্দী বললেন, কার কার কথা বলছেন? মণিময়, ক্ষিতীশ, অমিয়, সতীন্দ্র আর পাপিয়া
হ্যাঁ, মণিময় দত্ত, ক্ষিতীশ চাকী, অমিয় রায়, সতীন্দ্র সান্যাল আর পাপিয়া চক্রবর্তী। —কিরীটী বললে।
কেন? প্রশ্নটা করে তাকালেন সুশীল নন্দী কিরীটীর মুখের দিকে।
কারণ, আমার মনে হয়—কিরীটী ধীরে ধীরে বলতে লাগল, যাদের কথা একটু আগে বলছিলাম, সেই পাঁচজনের সেদিনকার পিকনিকে উপস্থিতিটা নিছক একটা উপস্থিতি-বা অন্যান্যদের সঙ্গে অনেক দিন পরে একটা মিলনের আনন্দ বলে বোধ হয় ধরে নিতে পারেন। কেন এই কথাটা বলছি, আবার একটু পরিষ্কার করে বলি। তারপর একটু যেন থেমে পুনরায় তার অধসমাপ্ত কথার জের টেনে কিরীটী বলতে লাগল, দলের মধ্যে সেদিন ঐভাবে মিত্রানীর মৃত্যুর ব্যাপারটা রীতিমত রহস্যে ঘেরা এবং সে মৃত্যু স্বাভাবিক নয়-কেউ তাকে রুমালের ফাস গলায় দিয়ে হত্যা করেছে ঝড় ও ধুলোর ঘূর্ণির মধ্যে অন্যান্যদের অগোচরে।
হত্যা যখন করা হয়েছে, তখন নিশ্চয়ই কেউ না কেউ তাকে হত্যা করেছে এবং সঙ্গে সঙ্গে একটা প্রশ্ন জাগে—কে? কে তাকে হত্যা করলো! বা কে তাকে হত্যা করতে পারে! হয় তো বাইরের কেউ ঐ সময় তাকে হত্যা করেছে গলায় রুমালের ফাঁস দিয়ে, না হয় যারা ঐ মুহূর্তে ঐখানে উপস্থিত ছিল, তাদেরই মধ্যে কেউ। তাই নয় কি?
