কি জানাবে?
তা তো কিছু বলেনি, ঐটুকুই কেবল বলেছিল আর আমিও কিছু বলিনি।
কিরীটী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার মৃদু কণ্ঠে বললে, আচ্ছা তার পুরুষ বন্ধুদের মধ্যে কারোর প্রতি
যতদূর জানি-বন্ধুদের মধ্যে সে সুহাস ছেলেটিকে একটু বেশী বোধ হয় পছন্দ করতো।
সুহাস!
ঐ যে সুহাস মিত্র। ওর কলেজের সহপাঠী। ছেলেটি শুনেছি—লেখাপড়ায় খুব ভাল ছিল বরাবরই—বি.এ.-তে ইকনমিকসে অনার্স পেয়েও আর নাকি পড়েনি, একটা বড় ফার্মে চাকরি করছে। মধ্যে মধ্যে আসতোও এখানে বেশ স্মার্ট ও ভদ্র ছেলেটি, মনে হত মিতু যেন সুহাসকে একটু বেশী পছন্দ করতো।
আর কে আসতো এখানে?
বিদ্যুৎ আসতো।
আর কেউ?
সতীন্দ্র আর সজলও কয়েকবার এসেছে। তবে ইদানীং আর সজলকে এখানে গত দুবৎসর হতে আসতে দেখিনি—তবে দিন চারেক আগে হঠাৎ এসেছিল।
অবিনাশ ঘোষালের দুচোখের কোণ বেয়ে দুফোটা জল গড়িয়ে পড়ল।
মাস্টারমশাই, যা হয়ে গিয়েছে তা তো আর ফিরবে না। আপনি যদি এভাবে ভেঙে পড়েন—
না, না—আমার জন্য ভেবো না কিরীটী, আমি ঠিক আছি—ঠিক আছি, বলতে বলতে অবিনাশ ঘোষাল চোখের জল মুছে নিলেন।
অতঃপর কিরীটী সেদিনকার মত প্রণাম জানিয়ে বিদায় নিল।
নীচে এসে প্রণবেশের সঙ্গে তারপর অনেকক্ষণ কথা বলেছিল এবং প্রণবেশ বিদ্যুতের মুখে ও থানায় সুশীল নন্দীর কাছে যা শুনেছিল সব বললে।
প্রণবেশই একসময় অতঃপর প্রশ্ন করে, আচ্ছা কিরীটীবাবু, আপনারও কি সত্যি মনে হয় যে—
কি?
ঐ মানে মিতুর বন্ধুদের মধ্যে কেউ একজন—
নিশ্চিত হয়ে এই মুহূর্তে তা বলতে পারি না, তবে এটা ঠিক, সমস্ত ঘটনা শোনার পর যা মনে হয়—
কি! কি মনে হয় আপনার?
কিরীটী নিজেকে যেন হঠাৎ সামলে নিল। বললে, কি জানেন প্রণবেশবাবু–ইট ইজ টু আরলি টু সে এনিথিং। আচ্ছা আমি এখন চলি-মাস্টারমশাইয়ের দিকে একটু নজর রাখবেন—মিত্রানীর মৃত্যুতে একটু বেশী রকমই আঘাত পেয়েছেন বলে যেন মনে হলো—
ভাবছি কিছুদিনের জন্য বাবাকে আমি সঙ্গেই নিয়ে যাবো।
০৭. ঐদিনই দ্বিপ্রহরে লালবাজারে
ঐদিনই দ্বিপ্রহরে লালবাজারে গিয়ে কিরীটী পুলিশ কমিশনার মিঃ রায়চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করলো। লম্বা-চওড়া সুগঠিত চেহারা। অফিসেই ছিলেন রায়চৌধুরী, কিরীটী স্লিপ পাঠাতেই ঘরের মধ্যে ডাকলেন।
দুজনার মধ্যে পরিচয় ছিল। রায়চৌধুরী কিরীটীকে শ্রদ্ধা করতেন।
আসুন—আসুন, বসুন রায়সাহেব-হঠাৎ এখানে কি মনে করে!
কিরীটী বসে মিত্রানীর হত্যার ব্যাপারটা বললে।
সব শুনে মিঃ রায়চৌধুরী বললেন, ব্যাপারটা আমারও কানে এসেছে—আজই সকালে—
কি রকম!
হোমিসাইডাল স্কোয়াডের জ্যোতিভূষণ আমাকে বলেছিলেন—তার হাতে ইনভেসটিগেশনের ভার পড়েছে। আপনি মনে হচ্ছে বেশ একটু ইন্টারেস্টেড ব্যাপারটায়, রায়সাহেব!
একটু আগেই তো বললাম মিঃ রায়চৌধুরী, মিত্রানী, মানে যে মেয়েটিকে খুন করা হয়েছে, আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় একজন মাস্টারমশাইয়ের মেয়ে–
ঠিক আছে, আমি বরং জ্যোতিবাবুকে ডাকছি—তার কাছেই আপনি সব ডিটেসে পাবেন।
জ্যোতিভূষণ চাকী—বেশ একজন কর্মঠ-উৎসাহী অফিসার। বয়েস খুব বেশী নয়, ত্রিশ থেকে বত্রিশের মধ্যে—বলিষ্ঠ দোহারা চেহারা। জ্যোতিভূষণের সরেজমিন তদন্তের রিপোর্ট থেকেই সেদিনকার দুর্ঘটনার অনেক কিছুই জানতে পারল কিরীটী। ব্যাপারটা ঘটেছে ঐদিন বিকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে ছটার মধ্যে কোন এক সময়ে।
মিনিট পনেরো-কুড়ির জন্য একটা প্রচণ্ড কালবৈশাখীর ঝড় ও ধুলোর ঘূর্ণি উঠেছিল। সব অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। সেই ঝড় ও ধুলোর ঘূর্ণির মধ্যে বন্ধু ও বান্ধবীরা সব চারদিকে অতর্কিতে ছিটকে পড়েছিল। দিনটি ছিল শনিবার।
কালবৈশাখীর তাণ্ডব থেমে যাওয়ার পর প্রত্যেকে প্রত্যেককে খুঁজতে শুরু করে, একে অন্যর দেখা পায় কিন্তু দুজনের দেখা পাওয়া যায় না। মিত্রানী ঘোষাল আর সুহাস মিত্র। পরের ব্যাপারটা প্রণবেশের মুখেই শুনেছিল কিরীটী। প্রণবেশ যেমনটি বলেছিল, জ্যোতিভূষণের রিপোর্টেও তাই বলে। তারপর শিবপুর থানা অফিসার সুশীল নন্দীর রিপোর্ট।
পরের দিন সকালে হোমিসাইড্যাল স্কোয়াডের সঙ্গে সুশীল নন্দী স্পটে যান। স্পটে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে ওঁরা কয়েকটি জিনিস পান।
ঠিক যেখানে মৃতদেহটা আবিষ্কৃত হয়েছিল, তার হাত পাঁচেক দূরে একটা ঝোপের ধারে একটা বেতের টুপি–কয়েকটা পোড়া চারমিনার সিগারেটের শেষাংশ—এবং মৃতদেহ যেখানে পড়েছিল গতরাত্রে, তার আশেপাশে কিছু রাঙা কাঁচের চুড়ির টুকরো–আরো কিছু দূরে একটা বায়নাকুলার সুশীল নন্দী পেয়েছেন।
সত্যি কথা বলতে কি, কিরীটীর আগমনে সুশীল নন্দী যেন মনের মধ্যে একটা উত্তেজনাই বোধ করেন। তাই তিনি বিশেষ উৎসাহ নিয়েই কিরীটীকে তাঁর অনুসন্ধানের কাহিনী আদ্যোপান্ত বর্ণনা করে একে একে ঐ উপরিউক্ত জিনিসগুলো দেখালেন।
বললেন—মিঃ রায়, এই জিনিসগুলো আমি অকুস্থানে পরের দিন সকালে অনুসন্ধানে গিয়ে কুড়িয়ে পেয়েছি।
কিরীটী বললে—ভালই করেছেন মিঃ নন্দী, এগুলো হয়তো মিত্রানীর হত্যারহস্য উদঘাটনে যথেষ্ট সাহায্য করবে। ভাল কথা, ওদের আলাদা ভাবে জবানবন্দি, মানে ওদের কোন স্টেটমেন্ট নেননি?
নিয়েছি বৈকি। তবে সবাই প্রায় এক কথাই বলেছে—এবং বিশেষ কোন তাৎপর্য আমি কারোর স্টেটমেন্টেই খুঁজে পাইনি। এই দেখুন না, পর পর প্রত্যেকের স্টেটমেন্টই আমি লিখে রেখেছি ও পরে ওদের দিয়ে সই করিয়ে নিয়েছি—বলতে বলতে লম্বা খাতাটা এগিয়ে দিলেন সুশীল নন্দী কিরীটীর দিকে।
