কিরীটীর প্রশংসায় যেন একেবারে শিশুর মত উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠতেন।
মিত্রানীকে কিরীটী কয়েকবার দেখেছে, বেশ স্থির বুদ্ধিমতী মেয়েটি, মনে হয়েছে।
কিরীটী যখন অবিনাশ ঘোষালের ওখানে পৌঁছাল বেলা তখন প্রায় সাড়ে আটটা হবে। ইতিমধ্যে রৌদ্রের তাপ বেড়েছে–আর একটা রৌদ্রতাপ-দগ্ধ দিন।
প্রথমেই প্রণবেশের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আকস্মিক বিপর্যয়ে প্রণবেশ আর কর্মস্থলে ফিরে যায়নিকটা দিন ছুটি নিয়েছে।
কিরীটীর সঙ্গে প্রণবেশেরও পরিচয় ছিল।
এই যে কিরীটীবাবু, আপনার কথাই ভাবছিলাম, প্রণবেশ বললে।
মাস্টারমশাই কোথায় প্রণবেশবাবুঃ কিরীটী শুধাল।
বাবা উপরের ঘরে—আমাদের বাড়িতে গত পরশু একটা দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে কিরীটীবাবু-আমার বোন মিতু–
আমি জানি—
জানেন! কার কাছে শুনলেন—
সংবাদটা আজকের সংবাদপত্রেও ছাপা হয়েছে, তাছাড়া আমার স্ত্রীকে আপনার মামা যশোদাবাবু
কি করে যে হলো এখনো যেন কিছুই মাথায় আসছে না। কিরীটীবাবু, মিতুর মত মেয়েকে—কথাটা আর শেষ করতে পারে না প্রণবেশ—তার গলার স্বর যেন বুজে আসে–চোখের কোণ দুটো জলে ভরে ওঠে।
সমস্ত ব্যাপারটা আপনি বোধ হয় জানেন?
হ্যাঁ-মোটামুটি শুনেছি ওর বন্ধু বিদ্যুৎ সরকারের মুখে আর বাকিটা শিবপুর থানার ও. সি. সুশীল নন্দীর মুখ থেকে গতকাল দ্বিপ্রহরে। বাবার সঙ্গে দেখা করবেন?
হ্যাঁ—
কেমন যেন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছেন বাবা। বড় ভালবাসতেন মিতুকে—
চলুন মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করে আসি।
দুজনে দোতলায় এলো।
বাড়িতে সর্বক্ষণ লেখাপড়া নিয়েই ব্যস্ত থাকেন অবিনাশ ঘোষাল–একটা চৌকির উপরে মাদুর বিছানো—একটা বালিশ শিয়রের দিকে-গ্রীষ্মকালে ঐ মাদুর আর বালিশটিই তার শয্যা—আর শীতকালে একটি চাদর।
চারিদিকে ছোট বড় আলমারীতে একেবারে ঠাসা-গণিতশাস্ত্রের বইতে-চৌকির অর্ধেকটায়ও খাতাপত্র বই সব ছড়ানো
ঘরের মধ্যে পায়চারি করছিলেন অবিনাশ ঘোষাল। পরনে একখানি মোটা খদ্দরের ধুতি—বক্ষে মোটা উপবীত।
মাথাভর্তি কাঁচাপাকা চুল অবিন্যস্ত। একমুখ কাঁচাপাকা দাড়িও।
চোখে মোটা কালো সেলুলয়েডের ফ্রেমে পুরু লেন্সের চশমা। পায়চারি করতে করতে মধ্যে মধ্যে অবিনাশ ঘোষাল বাঁ হাতে আঙুলগুলো দিয়ে অবিন্যস্ত চুলগুলো যেন টানছেন।
ওরা যে দুজন ঘরে ঢুকেছে সেটা টেরও পান না অবিনাশ ঘোষাল। একমাত্র আদরিণী কন্যার আকস্মিক মৃত্যু যেন প্রচণ্ড আঘাত হেনেছে মানুষটার ওপরে।
মাস্টারমশাই।
পায়চারি থামিয়ে ফিরে তাকালেন অবিনাশ ঘোষাল। কে?
মাস্টারমশাই আমি কিরীটী।
ওঃ কিরীটী—ও, তুমি এসেছো। জানো, জানো কিরীটী, আমার মিতু মা—
সব শুনেছি মাস্টারমশাই—
কিন্তু কেন এমন হলো বল তো! আমার মিতু মাকে কে এমন করে খুন করলো! তুমি তো জানো, তুমি তো দেখেছো আমার মিতু মাকে—এত নিরীহ, এত সরল, এত পবিত্র—আচ্ছা কিরীটী, তুমি তো অনেক কঠিন রহস্য উদ্ঘাটন করেছে—তুমি–তুমি পারবে না কিরীটী তাকে খুঁজে বের করতে, যে আমার মিতু মাকে—
পারবো মাস্টারমশাই—
পারবে!
হ্যাঁ—আপনার আশীর্বাদে নিশ্চয়ই পারবো।
জানি, জানি, তুমি পারবে—কেউ যদি তাকে খুঁজে বের করতে পারে সে একমাত্র তুমিই পারবে–আমি, তাকে শুধু একটা প্রশ্ন করবো–কেন, কি জন্য সে আমার মিতু মাকে এমন করে খুন করলো। একবারও কি হাত দুটো তার কাঁপলো না! অমন করে শ্বাসরোধ করে—না জানি মা আমার কত কষ্ট পেয়েছে। উঃ, কি নৃশংস! আমার কি মনে হয় জানো কিরীটী—
বলুন—
সেদিন যারা গার্ডেনে পিকনিকে উপস্থিত ছিল সেই বন্ধুদের মধ্যেই কেউ একজন
বাধা দিল প্রণবেশ। বললে, না, না—এ আপনি কি বলছেন বাবা, ওদের পরস্পরের মধ্যে কত দিনের বন্ধুত্ব–সেই কলেজ লাইফ থেকে। তা ছাড়া ওদের পরস্পরের প্রতি ভালবাসা–
প্রণবেশবাবু—কিরীটী বলে, মাস্টারমশাইয়ের কথাটা হয়তো একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একজনকে দেখে বা কিছু সময়ের জন্য মিশে তার ভিতরের কতটুকুই বা আমরা জানতে পারি, তার সত্যিকারের বা আসল চেহারার কতটুকুই বা আমাদের চোখের সামনে ধরা দেয়। তাছাড়া একটা কথা ভুলে যাবেন না, ওদের সকলেরই বয়স অল্প–ঐ বয়সে সাধারণত মানুষ যতটা সেন্টিমেন্টালস্পর্শকাতর ও ভাবপ্রবণ। হয়–বয়েসটা একটু বেশী হলে ততটা হয়ত হয় না। ইমোশান বা ঝোকের মাথায় কোন বিশেষ এক মুহূর্তে এমন অনেক কিছুই হয়ত তারা করে বা করতে পারে যেটা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ থিতিয়ে আসে।
কিরীটী—
বলুন মাস্টারমশাই। অবিনাশ ঘোষালের ডাকে ফিরে তাকিয়ে কিরীটী সাড়া দিল।
দোষ হয়ত আমারও আছে, সন্তানের প্রতি বাপের কর্তব্য পালনের ত্রুটি আমারও আছে। মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেলে বোধ হয় এমন একটা দুর্ঘটনা ঘটতো না—
মাস্টারমশাই, একটা কথা বলবো।
বলো।
মিত্রানী কাউকে ভালবাসতো কিনা আপনি জানেন?
তুমি তো জানো কিরীটী, আমার সন্তানদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় কখনো আমি বাধা দিইনি—আমার কাছে সেটা অপরাধ বলেই বরাবর মনে হয়েছে–তাছাড়া আমাদের বাপ ও মেয়ের মধ্যে সব কথাই খোলাখুলি হতো–সে রকম কিছু থাকলে বোধ হয় আমি জানতাম।
আর একটা কথা মাস্টারমশাই, কখনো তার বিয়ের চেষ্টা করেছেন বা সে সম্পর্কে তার সঙ্গে কোন আলোচনা করেছেন?
করেছি বৈকি। কিছুদিন আগেও বিয়ের কথাটা তার কাছে তুলেছিলাম, সে তখন বলেছিল
কি বলেছিল মিত্রানী?
সময় হলেই সে আমাকে জানাবে।
