সে কিছু বলল না—অথচ–আমি আসছি বাবা—প্রণবেশ কোনমতে শার্টটা গায়ে চাপিয়ে যেন ঝড়ের মত বের হয়ে গেল।
স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে রইলেন অবিনাশ ঘোষাল।
কালীঘাট থেকে শ্যামবাজার অনেকটা পথ-প্রণবেশ রাস্তায় বের হয়ে দেখলো— জনহীন রাস্তা খাঁ খাঁ করছে–কোনরকম যানবাহনের চিহ্নমাত্রও নেই–যতদূর দৃষ্টি চলে। রাস্তার এ-প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত। এত রাত্রে যে ট্যাক্সি পাওয়া যাবে না তা জানত প্রণবেশ। একটু এগিয়ে গেলেই হালদার-পাড়ায় একটা ট্যাক্সির আড্ডা আছে—অনেক বছর পাঞ্জাবীদের ঐ পাড়ায় বসবাস করার জন্য প্রণবেশের সেটা জানা ছিল, আর বুড়ো ট্যাক্সি ড্রাইভার কর্তার সিংকে চিনতে প্রণবেশ-প্রণবেশ হাঁটতে লাগলো।
প্রণবেশের ভাগ্য ভাল, কর্তার সিং দূরপাল্লার এক সওয়ারীকে মাত্র কিছুক্ষণ পূর্বে পৌঁছে দিয়ে আস্তানায় ফিরে খাটিয়া পেতে শয়নের উদ্যোগ করছিল।
প্রণবেশ এসে সামনে দাঁড়াল। সর্দারজী!
প্রণববাবু–ইতনি রাত মে কেয়া বাৎ হ্যায়—
বড় বিপদে পড়েছি সর্দারজী, একবার এখুনি শ্যামবাজার যেতে হবে—অথচ কোন ট্যাক্সি এত রাত্রে পাচ্ছি না–
ঠিক হ্যায়, চলিয়ে—
শ্যামবাজারে অ্যাডভোকেট সমর সরকারের বাড়িটা খুঁজে বের করতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি প্রণবেশের। বিদ্যুৎ তখনো জেগেই ছিল।
ফোনে প্রণবেশের প্রশ্নের জবাবে সে কোন কথা বলতে পারেনি। কেমন করে দেবে সে অত বড় দুঃসংবাদটা
গলা যেন কেউ তার চেপে ধরেছিল। দোতলায় নিজের ঘরের মধ্যে একটা ইজিচেয়ারের উপরে বিদ্যুৎ জেগে বসে ছিল। গাড়ির শব্দে জানলায় উঁকি দিয়ে দেখতে পেল তাদের বাড়ির সামনে ট্যাক্সিটা থেমেছে–
কে একজন তাদের সদরে দাঁড়িয়ে।
দুর্ঘটনার সংবাদটা ছোট্ট করে সংবাদপত্রে তৃতীয় পৃষ্ঠায় নীচের দিকে প্রকাশিত হয়েছিল ঘটনার পরের পরের দিন।
বটানিক্যাল গার্ডেনে গত পরশু পিকনিক করতে গিয়ে দলের মধ্যে একটি তরুণীর রহস্যজনক মৃত্যু। মৃত্যু ঘটেছে রুমালের ফাসে। উক্ত তরুণীর নাম মিত্ৰানী ঘোষাল। পরে ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ।
কিরীটী সকালবেলা তৃতীয় কাপ চায়ের সঙ্গে ঐ দিনকার সংবা ত্রের পাতা ওলটাচ্ছিল—অন্যমনস্কভাবে–তরুণীর বাড়ি যে কালীঘাট অঞ্চলেই কিরীটী বুঝতে পারেনি এবং শুধু তাই নয়—তারই পরিচিত মাস্টারমশাইয়ের মেয়ে ঐ মিত্রানী তাও বুঝতে পারেনি। পিরবার কথাও নয়—সংবাদটার মধ্যে এমন কিছু বিশেষত্ব ছিল না, যেটা তার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে। যেমন প্রত্যহ সংবাদটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে তেমনি পড়তে থাকে কিরীটী!
ঘণ্টাখানেক বাদে কৃষ্ণা এসে ঘরে ঢুকলো,—শুনছো, তোমার মাস্টারমশাই—
কার কথা বলছো? কিরীটী স্ত্রীর মুখের দিকে তাকাল।
কালীঘাটে তোমার সেই পুরনো মাস্টারমশাই থাকেন না!
অবিনাশবাবু–
হ্যাঁ—তার মেয়ে নাকি গত পরশু বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে বটানিক্যাল গার্ডেনে পিকনিক করতে গিয়েছিল—
সঙ্গে সঙ্গে কিরীটী সজাগ হয়ে বসে, কি হয়েছে তার?
গলায় রুমালের ফাঁস দিয়ে কে যেন তাকে হত্যা করেছে—
তুমি—তুমি কার কাছে শুনলে?
এই তো একটু আগে আমাদের পাশের বাড়ির যশোদাবাবু বলছিলেন–যশোদাবাবু আর অবিনাশবাবু তো শালা-ভগ্নীপতি।
কিরীটী তাড়াতাড়ি আবার সংবাদপত্রের পাতা উল্টে সংবাদটা খুঁজে বের করে বার দুই ভাল করে সংবাদটা পড়লো, তারপর উঠে দাঁড়াল।
একটু বেরুচ্ছি কৃষ্ণা।
এই সকালে আবার কোথায় বেরুবে। সকালে তো হেঁটে এসেছো—
একবার মাস্টারমশাইয়ের ওখানে যাবো।
অবিনাশবাবুর ওখানে?
হ্যাঁ–ব্যাপারটা আমাকে একটু জানাতে হচ্ছে–
অবিনাশ ঘোষালের সঙ্গে কিরীটীর পরিচয় সেই যখন সে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবে– ফার্স্ট ক্লাসের ছাত্র—অবিনাশবাবু সেই সময়েই স্কুলে সেকেন্ড টীচার হয়ে আসেন–অঙ্ক করাতেন ক্লাসে—পরে, বৎসর চারেক পরে, ঐ স্কুলেরই প্রধান শিক্ষক হন।
সবে তখন এম, এস-সি. পাস করে অবিনাশ ঘোষাল স্কুলের শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে এসেছিলেন–
কতই বা বয়স তখন তাঁর, বছর আটাশ-ঊনত্রিশ হবে।
মাত্র মাস আষ্টেক পড়েছিল কিরীটী অবিনাশবাবুর কাছে–গণিতশাস্ত্রের প্রতি তিনিই কিরীটীর মনের মধ্যে একটা আকর্ষণ ও প্রীতি জাগিয়ে তোলেন।
যার ফলে শিক্ষা সমাপ্ত করেছিল কিরীটী পরবর্তীকালে রসায়ন-শাস্ত্রে শেষ ডিগ্রী নিয়ে এবং যে শ্রদ্ধা ও প্রীতির সম্পর্ক সেদিন শিক্ষক ও ছাত্রের মধ্যে গড়ে উঠেছিল সেটা সেদিন পর্যন্তও অক্ষুন্ন ছিল। সময় পেলেই কিরীটী যেতো অবিনাশবাবুর ওখানে। সহজ সরল আত্মভোলা মানুষটিকে ওর বড় ভাল লাগে।
অবিনাশবাবু খুব খুশি হতেন কিরীটীকে দেখলে।
এসো–এসো, কিরীটী রায় যে—-
পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করে কিরীটী বলেছে, ভাল আছেন তো মাস্টারমশাই?
হ্যাঁ-বাবা, ভালই তো আছি। তার পরই বলতেন, তোমার নতুন রহস্য উদঘাটনের কাহিনী কিছু শোনাও।
কিরীটী হাসতে হাসতে বলতো, আমার চাইতে সুব্রতই ভাল বলতে পারে মাস্টারমশাই-একদিন তাকে নিয়ে আসবো, শুনবেন।
মধ্যে মধ্যে সুব্রতও কিরীটীর সঙ্গে আসততা—সে তখন বেশ জমিয়ে বসে কিরীটীকাহিনী শোনাত।
কি শ্রদ্ধা–কি আগ্রহ নিয়েই যে শুনতেন অবিনাশ ঘোষাল সেসব কাহিনী—শোনা নয় যেন গিলতেন।
একদিন বলেছিলেন সুব্রতকে অবিনাশ ঘোষাল–-বুঝলে সুব্রত, প্রবলেম সলভ করবার অদ্ভুত এক ন্যাক ছিল কিরীটীর–কঠিন কঠিন প্রবলেম ও অনায়াসেই সলভ করে দিত—রহস্য উদঘাটনের ব্যাপারেও তার সেই প্রতিভার স্ফুরণ–
