শত্রু! প্রশ্ন করলো সতীন্দ্র।
হ্যাঁ–শত্রু, বললেন নন্দী, যে হয়ত সুযোগের অপেক্ষায় ছিল—আজ সুযোগ পেয়ে—-থাক সে কথা, আচ্ছা একটা কথা বলুন তো–আজ সারাটা দিন আপনাদের আশেপাশে কাউকে ঘুর ঘুর করতে দেখেছেন–
মণিময় বললে, না—তাছাড়া আমরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। কোন দিকে তাকাবার আমরা ফুরসৎ পাইনি–
কোয়াইট ন্যাচারাল–তবু–
না—অফিসার, মণিময় আবার বললে–সে-রকম কিছুই আমাদের কারো চোখে পড়েনি–
আপনারা কাউকে সন্দেহ করেন এ ব্যাপারে? আবার নন্দীর প্রশ্ন।
না—এবার সুহাস মণিময় একত্রেই জবাব দিল।
আপনাদের সঙ্গে তো গাড়ি আছে?
হ্যাঁ, বিদ্যুতের গাড়ি আছে, মণিময় বললে।
বিদ্যুতবাবু কে?
বিদ্যুৎ এগিয়ে এলো। বললে—আমিই বিদ্যুৎ সরকার।
আপনিই একা তাহলে গাড়িতে এসেছিলেন আজ? আর বাকী সব—
মণিময় জবাব দিল-ট্রামে বাসে।
বিদ্যুৎবাবু—
বলুন—
আপনাদের সকলকে একবার থানায় যেতে হবে—সুশীল নন্দী বললেন।
থানায় কেন? সুহাস বলল।
আপনাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা করে এক-একটা জবানবন্দি–আই মীন স্টেটমেন্ট চাই–
মণিময় বললে, বেশ, যাবো আমরা—
এক কাজ করুন, বিদ্যুৎবাবুর গাড়িতে যারা পারেন যান, বাদ বাকি সব জীপে উঠুন।
০৬. সে রাত্রে ছাড়া পেতে পেতে
সে রাত্রে ছাড়া পেতে পেতে প্রায় রাত সোয়া এগারোটা বেজে গিয়েছিল সকলের। শ্রান্ত-অবসন্ন হয়ে ফিরেছিল যে যার গৃহে। ফিরতে ওরা সকলে পারত না হয়, যদি থানার একজন সেপাই কলকাতার দিকে ফিরতি একটা খালি ট্যাক্সি থামিয়ে ওদের ফিরে যাবার ব্যবস্থা করে না দিত।
থানা-অফিসার সুশীল নন্দী একটা কথা বিশেষ করে ওদের বলে দিয়েছিলেন, কলকাতা থেকে কেউ যেন অন্যত্র কোথাও না যায়—তাকে না জানিয়ে।
মিত্রানীর প্রৌঢ় বাপ অবিনাশ ঘোষালকে তার কন্যার মৃত্যু-সংবাদটা ওরা কেউই দিতে সম্মত হয়নি–তাই অগত্যা সুশীল নন্দী স্থির করেছিলেন পরের দিন সকালে তিনিই অবিনাশ ঘোষালকে সংবাদটা দেবেন। কিন্তু তা আর তাকে দিতে হয়নি—তার আগেই অর্থাৎ সেই রাত্রেই–
রাত একটা নাগাদ বিদ্যুতের কাছ থেকেই সংবাদটা পেয়েছিল মিত্রানীর দাদা ডাঃ প্রণবেশ ঘোষাল।
কি একটা সরকারী কাজে প্রণবেশ কলকাতায় একদিনের জন্য এসেছিল।
রাত্রি নয়টা নাগাদও যখন মিত্রানী ফিরে এলো না—অবিনাশ ঘোষাল ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, ছেলেকে ডেকে বলেছিলেন, প্রণব, খুকী তো এখনো ফিরল না-বলেছিল সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে আসবে—
প্রণবেশ বলেছিল, বন্ধুবান্ধবরা মিলে বটানিকসে হৈ চৈ করতে গিয়েছে—একা তো নয়-ভাবছেন কেন?
রাত নটা বাজে, তুমি বরং এক কাজ করো—বিদ্যুতের বাড়িতে একটা ফোন কর—
প্রণবেশ ফোন করে জানলো, তখনও বিদ্যুৎ ফেরেনি—
তারপর রাত সাড়ে নয়টা, পৌনে দশটা—পৌনে এগারোটা-পনেরো মিনিট অন্তরঅন্তর ফোন করে গিয়েছে প্রণবেশ।
কিন্তু ঐ একই জবাব—বিদ্যুৎ এখনো ফেরেনি—-
শেষটায় কিন্তু প্রণবেশ নিজেও বেশ চিন্তিত হয়ে উঠেছিল। এত রাত হয়ে গেল, এখনো না ফেরার কারণটা কি? পথে কোন দুর্ঘটনা কিছু ঘটেনি তো? ঘটাটা এমন কিছু আশ্চর্যও নয়। সে একবার ঘর একবার বাইরে করতে থাকে।
সাড়ে এগারোটা—বারোটা-সাড়ে বারোটা না তখনো ফেরেনি বিদ্যুৎ। অবশেষে প্রণবেশই লালবাজারে ফোন করে তারা কোন সংবাদ জানে না–তারা বলে শিবপুর থানায় ফোন করতে।
রাত তখন একটা প্রায়।
হঠাৎ ঐসময় ফোন ক্রিং ক্রিং করে বেজে উঠলো।
হ্যালো-ডাঃ প্রণবেশ ঘোষাল—
প্রণবেশবাবু—আপনি তো মিত্রানীর দাদা?
হ্যাঁ—
শুনুন—একটা স্যাড নিউজ আছে।
স্যাড নিউজ–কি?
মিত্রানী ইজ ডেড।
কি-কি বললেন—চিৎকার করে ওঠে প্রণবেশ—প্রৌঢ় অবিনাশ ঘোষাল ঐ সময় পুত্রের পাশেই দাঁড়িয়ে।
হ্যাঁ-মিত্রানীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে—
না, না—এ আপনি কি বলছেন—মিতু-মিতু। কিন্তু কে-কে আপনি! কি আপনার নাম?
বিদ্যুৎ সরকার—
তারপরই অপর প্রান্তে একটা ঠং করে শব্দ ও ফোনটা ডিসকানেকটেড হয়ে গেল।
হ্যালো হ্যালো—অধীরভাবে ট্যাপ করে প্রণবেশ–কিন্তু না, অন্য প্রান্ত ফোন ছেড়ে দিয়েছে ততক্ষণে।
কি! কি হয়েছে প্রণব! অবিনাশ ঘোষাল আশঙ্কায় যেন একেবারে ভেঙে পড়ল।
বিদ্যুৎ বিদ্যুৎ সরকার কে বাবা? প্রণবেশ বলে উঠল।
মিতুর ক্লাস-ফ্রেণ্ড—
প্রণবেশ তখুনি আবার ফোন করল। কিছুক্ষণ রিং হবার পর অপর প্রান্ত থেকে সাড়া এলো—কে!
বিদ্যুৎ সরকার আছেন?
কথা বলছি—
আমি মিত্রানীর দাদা কথা বলছি একটু আগে আপনি ফোন করেছিলেন—
ফোন করেছিলাম, আমি!—বিস্ময় বিদ্যুতের কণ্ঠে।
হ্যাঁ—একটু আগে আপনিই তো আমাদের বাড়িতে ফোন করে বললেন—
আমি তো এইমাত্র—নট ইভন টু মিনিটস-ফিরছি—
আপনি আমাকে ফোন করেননি?
না—
মিত্রানী-মিত্রানীর মানে আমার বোন মিত্রানীর কোন খবর কিছু জানেন? আপনারা তো একসঙ্গে আজ সকালে বটানিকসে গিয়েছিলেন?
কিন্তু অপর প্রান্ত থেকে কোন সাড়া এলো না।
বিদ্যুৎবাবু—শুনছে–বিন্দুবাবু-হ্যালো—হ্যালো–
কোনো সাড়া নেই—অথচ প্রণবেশ বুঝতে পারছে অপর প্রান্ত তখনো ফোন ছেড়ে দেয়নি!
কি হলো প্রণবেশ? অবিনাশ ঘোষাল আবার প্রশ্ন করেন অধৈর্য কণ্ঠে।
প্রণবেশ ফোনটা নামিয়ে আবার ডায়েল করে—রিং হয়ে যাচ্ছে–কেউ ধরছে না।
প্রণবেশ শেষ পর্যন্ত ফোনটা নামিয়ে রাখল।
একটু আগে কে ফোন করেছিল প্রণব?
বিদ্যুৎ সরকার—অথচ বিদ্যুৎ সরকার এইমাত্র বললে সে ফোন করেনি—এই নাকি ফিরছে–
মিতুর খবর
