এইসব তথ্য বিচার ও বিশ্লেষণ করলে সহজেই অনুমিত হয় যে, ব্রাহ্মণ্য ও হিন্দু দুটি স্বতন্ত্র ধর্ম, কখনোই এক ধর্ম নয়। অতএব ব্রাহ্মণ্যবাদের সব রকম অন্যায়-অবিচার হিন্দুধর্মের উপর চাপিয়ে দেওয়াটা সুবিচার হয় না। এ ব্যাপারে শিবরাম চক্রবর্তীর বক্তব্য অনুধাবনযোগ্য— “এই হিন্দু সভ্যতায় ব্রাহ্মণের দান অতি সামান্যই, বলতে গেলে ব্রাহ্মণের থেকে যতটা এ নিয়েছে –তাই এর কলঙ্ক। ……ব্রাহ্মণের দ্বারা প্রভাবিত না হলে এ সভ্যতা আরও প্রাণবান, আরও বেগবান, আরও বীর্যবান হতে পারত। …… ব্রাহ্মণ্য সভ্যতার চেয়ে ঢের বড়ো এই হিন্দু সভ্যতা। ব্রাহ্মণ না জন্মালেও এ হত এবং ব্রাহ্মণ লোপ পেলেও হিন্দু সভ্যতা থাকবে।….. ব্রাহ্মণরা সমাজের মাথা নয়, বরং টিকি। সমাজের মাথা থেকে ওটাকে কেটে বাদ দিলে সমাজটার কোনো ক্ষতি হবে না, বরং তাকে আরও বেশি আধুনিক দেখাবে।”
সেই কারণেই বোধহয় অন্ত্যজ বা দলিতদের সম্মানের জন্য যাঁরা লড়াই করেছেন এবং করছেন, তাঁরা সকলেই প্রায় উচ্চবর্ণের হিন্দু। রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রনাথ, স্বামী বিবেকানন্দ, মহাত্মা গান্ধি প্রমুখ উচ্চবর্ণীয় ব্যক্তিগণ দলিতদের পক্ষে জোরদার আন্দোলন করেছেন। অবশ্য ড: ভীমরাও রামজি আম্বেদকরের আন্দোলনও দলিত সমাজে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও বাবা আহম্মেদকর উচ্চবংশীয় ছিলেন না, বরং তিনি দলিত শ্রেণির। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর বর্তমান ভারত’ গ্রন্থে লিখেছেন– “ভারতবাসীর কেবল ভারবাহী পশুত্ব, কেবল শূদ্রত্ব।” বিবেকানন্দের সমকালীন। ভারতে ব্রাহ্মণত্ব, ক্ষত্রিয়ত্ব, বৈশ্যত্বের অধিকারী হলেন ইংরেজ এবং তাঁদের শাসন-শোষণের ভার পশুর মতো বহন করে চলেছে শূদ্ররূপ ভারতবাসী। বিবেকানন্দ মনে করতেন, “শূদ্রজাতি মাত্রেই এজন্য নৈসর্গিক নিয়মে পরাধীন।”
ব্রাহ্মণ্যবাদী স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর ‘শূদ্র জাগরণ’ প্রবন্ধে লিখেছেন– “ব্যক্তিবিশেষ ইংরেজ কৃষ্ণবর্ণ বা নেটিভ অর্থাৎ অসভ্য বলিয়া আমাদিগকে অবজ্ঞা করিলে, ইহাতে ক্ষতি-বৃদ্ধি নাই, আমাদের আপনার মধ্যে তদপেক্ষা অনেক অধিক জাতিগত ঘৃণাবুদ্ধি আছে; এবং মূর্খ ক্ষত্রিয় রাজা সহায় হইলে ব্রাহ্মণেরা যে শূদ্রদের জিহ্বচ্ছেদ, শরীরভেদাদি পুনরায় করিবার চেষ্টা করিবেন না কে বলিতে পারে?”
‘দলিত’ কথাটির অর্থ এমন বস্তু বা মানুষ যাঁদের কেটে ফেলা হয়েছে, ভেঙে দেওয়া হয়েছে, টুকরো টুকরো করে পিষে ফেলা হয়েছে এবং ধ্বংস করা হয়েছে। মারাঠি সমাজসংস্কারক ও বিপ্লবী মহাত্মা জ্যোতিবা ফুলে হিন্দু সমাজে নিপীড়িত অবর্ণ ও অস্পৃশ্য জাতিগুলির ক্ষেত্রে এই কথাটি ব্যবহার করেন। সাধারণভাবে ‘দলিত’ কথাটির অর্থ নিম্নবর্ণ বা দরিদ্র নয়, বরং এই শব্দটি দিয়ে বোঝানো হচ্ছে এক অবদমিত অবস্থা। সামাজিক রীতি তাঁদের যে অধঃপতিত করেছে দলিত বলতে সেটাই বোঝাচ্ছে। যাঁদের দলন করা হয় তাঁরাই দলিত। ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হয় যে, যাঁরা নিচু কাজ করে তাঁরা পুনর্জন্মে খারাপ জন্ম পায়। তাঁরা কুকুর বা শুয়োর বা চণ্ডাল হিসাবে জন্মায়। এই অস্পৃশ্য দলিত/শূদ্রদেরই মহাত্মা গান্ধি বললেন ‘হরিজন’। তিনি ‘হরিজন’ নামে একটি সংবাদপত্র করতেন এবং হরিজনদের বিষয়ে লেখালেখি করতেন। সে সময়েও শূদ্ররা শুধু অস্পৃশ্যই ছিলেন না, তাঁদের ছায়া পর্যন্ত পড়তে পারত না ব্রাহ্মণদের শরীরে। ব্রাহ্মণরা যে পথে চলবেন সে পথে শূদ্রদের চলন গর্হিত অপরাধ। ব্রাহ্মণদের সামনে শূদ্রদের ছাতা মাথায় বুক চিতিয়ে যাওয়াটা চরম ধৃষ্টতা। শূদ্র, অর্থাৎ অস্পৃশ্যদের কোনো দেবতা নেই। দেবতা নেই, দেউলও নেই। এইসব অস্পৃশ্যদের কোনো মন্দিরে প্রবেশ করার অধিকার ছিল না। অপবিত্র হয়ে যাবে দেব ও দেউল। একই কুয়োয় জল ব্যবহারের অধিকার ছিল না। শূদ্ররা যেখানে বসে সেখান থেকে চলে যাওয়ার পর গৃহস্থ গঙ্গাজল গোবরজল ছিটাবে। গান্ধিজি ব্রাহ্মণ্যধর্মের এই অমানবিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। মহাত্মা গান্ধিজি অস্পৃশ্য হরিজনদের হাতে ‘অনুগ্রহণ আন্দোলন’-এর প্রথম সারির উদ্যোক্তা ছিলেন। তা সত্ত্বেও বলা যায়, মহাত্মা গান্ধি শূদ্রদের জন্য তেমন কিছু করে উঠতে পারেননি। তিনি সকলের কাছে ‘বাপুজি’ হতে সক্ষম হলেও শেষপর্যন্ত শূদ্রদের বাপুজি হতে পারেননি। অস্পৃশ্য শূদ্রদের নতুন নাম হরিজন’ দিলেন বটে, কিন্ত একবিন্দু মর্যাদা দিতে পারেননি। নাম বদলালেই মর্যাদা বদলায় না। হরিজন কেন? এই হরি কি ঈশ্বর হরি? তাই যদি হয় হরি তো সকলেরই ঈশ্বর; হরিজন তো সকলেই। তাহলে কেন শূদ্রদেরই কেবল হরিজন বলা হচ্ছে। তাঁদেরকে কি হরি আলাদাভাবে জন্ম দিয়েছেন? উচ্চবর্ণের হরি আর নিম্নবর্ণের হরি কি আলাদা? হরিজন মানে যদি ঈশ্বরের সন্তান হয় তাহলে দলিত ছাড়া বাকিরা কার সন্তান?
আসলে প্রকারান্তরে গান্ধিজি ব্রাহ্মণ্যধর্মের সৃষ্ট বর্ণবৈষম্যকে স্বীকার করে নিয়েছেন। উনি উপলব্ধি করেছেন বর্ণপ্রথার প্রয়োজন আছে। যদিও তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন না, কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ব্রাহ্মণরাই তাঁকে ঘিরে থাকতেন। তদুপরি, তিনি কোনো শূদ্রের সঙ্গে আত্মীয়তা সম্পর্ক গড়েছেন বলে জানা নেই। গান্ধিজি ভারতের ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে যেতে পারেননি। বলা যায় গান্ধিজি ব্রাহ্মণ্যবাদে বিশ্বাসী ছিলেন, ব্রাহ্মণ্যবাদে বিশ্বাস অটুট রেখে শূদ্রদের মঙ্গল করা সম্ভব নয়। হয়ওনি। গান্ধিজি যদি আন্তরিকভাবেই শূদ্রদের মর্যাদাই চাইতেন তাহলে এত সময় রাজনীতিতে ব্যয় না-করে ভারতের দলিত অর্থাৎ পিছড়ে বৰ্গদের অধিকার আদায়ের কাজে লাগাতার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে পারতেন। তিনি বদলে দিতে পারতেন ভারতের ইতিহাসের ধারা। তৈরি হতে পারত নতুন এক ভারত। মুছে যেত ব্রাহ্মণ-শূদ্রের স্বতন্ত্র পরিচয়। তিনি শূদ্রদের ‘হরিজন’ শিরোপা দিয়ে সকলকেই যদি ‘হিন্দু হতে বলতেন, তাহলে সব ব্রাহ্মণ না-এলেও অনেকেই দলিত/শূদ্রদের পাশে এসে দাঁড়াতেন। তাহলে আজকের দিনেও কোনো উচ্চবর্ণের সাহস হত না একটি দলিতকেও নগ্ন করতে। bjpwb indiawb ফেসবুক পেজ থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা একথা লিখতে সাহস পেত– “কিছুদিন পরে আমরা পুরো ভারতবর্ষ তথা পশ্চিমবাংলায় শাসন করব, তখন মুসলিম-আদিবাসী-খ্রিস্টান সকলকে হিন্দুধর্মে রূপান্তরিত করব, না-হলে ঘরে ঢুকে এক এক করে হত্যা করব। এটাই আমাদের উদ্দেশ্য। এরই নাম হিন্দুত্ব এবং হিন্দুরাষ্ট্র”? এই পেজেই আর-একটি পোস্টে বলা হয়েছে– “সামনের ইলেকশনে টিএমসি, সিপিএম এবং অন্যান্য দলগুলিকে একতরফা হারিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি পশ্চিমবাংলায় সরকার গঠন করবে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে মুল্লাদের, খ্রিস্টানদের, আদিবাসী ও দলিতদের পশ্চিমবঙ্গ থেকে চলে যাওয়া লাগবে।” বিজেপির বিধায়ক রাজা সিংহও বলতে সাহস পায়– “দলিতোঁ কি পিটাই সে খুশি মিলতি হ্যায়”। দলিত তথা আদিবাসীরা কি হিন্দু নয়? তাই যদি হয়, এই হিন্দুধর্মকে রক্ষা করার কোনো পথই খোলা রইল না। দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ব্রাহ্মণ্যবাদীরা হিন্দুধর্মের যে সর্বনাশ করার কাজ হাতে নিয়েছিল, এই বাণীগুলি কি একবিংশ শতাব্দীতেই অন্তিমপর্ব চলছে?
