খ্রিস্টান ধর্ম ও উপমহাদেশের ধর্মসমূহের মধ্যকার সাংস্কৃতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকগণ ইসলামের অনুসারীদের প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হন, সম্ভবত। একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী মুসলিমগণ খ্রিস্টান ধর্মের ‘ত্রিত্ববাদী’ মতবাদকে গ্রহণ করতে পারেনি। সাধারণভাবে মুসলিম সমাজ খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের প্রচেষ্টার আওতার বাইরে থেকে যায় এবং মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামীণ পূর্ববঙ্গে খুব অল্প কয়েকটি ধর্মপ্রচার কেন্দ্র গড়ে ওঠেছিল। শ্রীরামপুর এয়ী কিছু হিন্দু সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও আচারানুষ্ঠান, যেমন জাতিভেদ প্রথা, সতীদাহ, সন্তানকে গঙ্গায় বিসর্জন, অন্তৰ্জলি ইত্যাদি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে জনমত গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন। ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দের এই মাঝের সময়টুকুতে এ রকম কিছু আচারকে নিষিদ্ধ করতে আইন পাসে তাঁরা সহায়ক ছিলেন। সাঁওতাল মিশনে জর্জ ক্যাম্বেলের গভীর আগ্রহ এবং সাঁওতালদের শিক্ষার প্রতি তাঁর বিশেষ অনুদান ধর্মপ্রচারকদের অনুপ্রাণিত করে। উনিশ শতকের শেষ নাগাদ সাঁওতালদের শিক্ষিত করে তোলার কাজ একচেটিয়াভাবে ধর্মপ্রচারক সমিতিগুলির উপর ছেড়ে দেওয়া হয়। খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের প্রধান উদ্দেশ্য, যা ছিল খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করার মাধ্যমে বাংলার মানবগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন সাধন করা, কখনও পূরণ হয়নি। তাঁদের ভবিষ্যৎ অনেকটা নির্ভর করত জাতিচ্যুত ও উপজাতিদের ধর্মান্তরকরণের মধ্য দিয়েই। চার্চ ও ব্যাপ্টিস্ট মিশনসমূহের সর্বাধিক সংখ্যক ধর্মান্তরিতগণ আসত কর্তাভজাদের (ঈশ্বরের পূজারী) মধ্য থেকে, যাঁরা ছিল ‘নিম্নবর্গ’ পদমর্যাদার হিন্দু, যেমন চণ্ডাল ও নমঃশূদ্রদের মধ্যে গড়ে ওঠতে থাকা একটি হিন্দু সমতাবাদী ধর্মীয় সম্প্রদায়। সমাজের দরিদ্র মানুষের সেবা করার ছলে তাঁরা গরিব হিন্দু-মুসলমানদের খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করে আসছে, আজও যা অব্যাহত। খ্রিস্টান মিশনারিরা এমন সব জায়গায় যায় যেখানকার মানুষগুলো খুবই দরিদ্র, অশিক্ষিত এবং অবশ্যই দলিত শ্রেণির। খ্রিস্টান মিশনারির কর্মচারীরা এমন লোক খুঁজে বেড়ায় যাঁরা ঋণ নিয়ে পরিশোধ করতে পারছে না, অসুস্থ টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছে না, টাকার অভাবে না খেয়ে মরে যাওয়ার অবস্থা— এককথায় অভাবী এবং সমাজে ঘৃণিত মানুষদের খুঁজে বেড়ায়। খ্রিস্টান মিশনারিরা এই সুযোগে তাঁদের টাকা দিয়ে সাহায্য করে, আর সাহায্য করার ছলে ধর্মের প্রচার এবং ধর্মান্তর করতে থাকে। এদের টার্গেট দলিত, দরিদ্র এবং অনাথ। বিভিন্ন দেশের দরিদ্র এবং অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী খুব সহজেই তাঁদের ছলনায় চিন্তা করে হিন্দু অথবা মুসলমান হয়ে তো কোনো লাভ নেই। তাঁরা মনে করেন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলে তাঁদের অনেক সুবিধা, তাঁদের সমস্ত অভাব দূর হয়ে যাবে। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে ভারত ছিল পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম খ্রিস্টধর্মী দেশ। ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে তা পঞ্চমে উন্নীত হবে (সূত্র : www.worldchristiandatabase.org)। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে ভারত ছিল পৃথিবী দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। যা ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে তৃতীয়তে চলে যাবে (সূত্র : www.worldchristiandatabase.org)। মজার বিষয় হল– বৌদ্ধ, ইসলাম, গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা যতটা অসহিষ্ণু ছিলেন, খ্রিস্টান মিশনারিদের ক্ষেত্রে ঠিক ততটাই সহিষ্ণু কেন! দলিতদের খ্রিস্টধর্মে চলে যাওয়ার ঘটনায় ব্রাহ্মণ্যবাদীরা এত উদাসীন ছিলেন কেন! ইংরেজপ্রীতি, নাকি অন্য কোনো মতলব! ইংরেজপ্রীতি যে ছিলই সেটা ব্রিটিশ ভারত ইতিহাসের পরতে পরতে চিহ্ন রাখা আছে। মানবসেবা, সমাজসেবার নামে দিনের পর দিন অতীতে মাদার টেরিজা চালিয়েছিলেন, বর্তমানে স্টিভ ‘ও সহ অনেকেই ধর্মান্তরের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন ছলে আর কৌশলে! এই ধর্মান্তরযজ্ঞের জন্য কোটি কোটি ডলার আসছে বিদেশ থেকে।
কেউ কেউ বলেন জাতপাতের এই বিড়ম্বনা নাকি হিন্দুধর্মের নয়। হিন্দুধর্মে নাকি জাত-বিভাজনের বালাই নেই –এসব নাকি ব্রাহ্মণ্যধর্মের হিন্দুদের ঘাড়ের চাপিয়ে দেওয়া নিষ্পেষণ-চাক্কি। তাহলে কি ব্রাহ্মণ্যধর্ম আর হিন্দুধর্ম সমার্থক নয়! এ ভাবনার যুক্তি কী? তাঁরা বলছেন– (১) তাঁদের প্রত্যেকের ধর্মপালনের নীতি-নিয়ম একই হবে। (২) তাঁরা একই পদ্ধতিতে ধর্মাচরণ বা উপাসনা করবে। (৩) তাঁদের মধ্যে অবাধ বিবাহ সম্পর্ক চালু থাকবে। (৪) ধর্মের দৃষ্টিতে তাঁরা সবাই অভিন্ন বলে বিবেচিত হবে। (৫) তাঁদের মধ্যে কোনো উঁচু-নীচু ভেদ থাকবে না। (৬) তাঁরা সবাই সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। থাকবে। (৭) একই ধর্মের অনুগামী বলে তাঁরা পরস্পরের প্রতি একাত্মবোধ করবে। এই বৈশিষ্ট্যগুলি ব্রাহ্মণ ও হিন্দুর ক্ষেত্রে এক নয়, আলাদা। এ পরিপ্রেক্ষিত বিচার করে বোঝা যায় ব্রাহ্মণ ও হিন্দু এক ধর্মভুক্ত নয়, তাঁদের ধর্ম আলাদা। তা ছাড়া দুটি আলাদা ধর্মের মানবগোষ্ঠীর মধ্যে যে বৈসাদৃশ্যগুলি থাকে ব্রাহ্মণ ও হিন্দুর মধ্যেও তা লক্ষ করা যায়। বৈসাদৃশ্যগুলি মিলিয়ে নেওয়া যেতে পারে, যেমন— (১) ব্রাহ্মণ ও হিন্দুর মধ্যে বিবাহ সম্পর্ক হয় না। যদিও কিছু ব্যতিক্রম দেখতে পাওয়া যায়, তবে ব্যতিক্রম ব্যতিক্রমই। (২) ব্রাহ্মণ ও হিন্দুর মধ্যে সৌভ্রাতৃত্বের ভাব দেখা যায় না, বরং ঘৃণার সম্পর্ক দেখা যায়। (৩) একজন ব্রাহ্মণ ধর্মাচরণের ক্ষেত্রে যে অধিকার পায়, একজন হিন্দু তা পায় না। (৪) ব্রাহ্মণ ও হিন্দু পরস্পরের সঙ্গে একাত্ম মনে করে না। (৫) ব্রাহ্মণ হিন্দুকে তাঁর সঙ্গে সমমর্যাদার ভাবে না, তাঁর থেকে নীচু ভাবে। (৬) ব্রাহ্মণদের ধর্মপালনের উদ্দেশ্য শূদ্রদের সম্পদ হাতানো। হিন্দুদের ধর্মপালনের উদ্দেশ্য সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। (৭) ব্রাহ্মণ্যধর্মে অব্রাহ্মণ আছে এবং ব্রাহ্মণ্যধর্মের এই অব্রাহ্মণরা হল পথভ্রান্ত, নিজের অজান্তে বিপথে চালিত ধর্মচ্যুত হিন্দু, ব্রাহ্মণরা যাঁদের উপর অপমানজনক, ঘৃণ্য ‘শূদ্র’ নামের ছাপ্পা মেরে দিয়েছে। কিন্তু হিন্দুধর্মে কোনো অহিন্দু নেই। (৮) ব্রাহ্মণ্যধর্ম অনুযায়ী ব্রাহ্মণ সবার শ্রেষ্ঠ, সবার প্রভু। আর ব্রাহ্মণ্যধর্ম অনুগামী অব্রাহ্মণরা ব্রাহ্মণ অপেক্ষা নিকৃষ্ট, এমনকি কেউ কেউ আবার ব্রাহ্মণদের নিকট ঘৃণার বস্তু, অস্পৃশ্য। কিন্তু হিন্দু ধর্মে কোনো উচ্চনীচ ভেদাভেদ নেই, সবাই সমান। (৯) বর্ণভেদ, জাতপাত, অস্পৃশ্যতা, সতীদাহপ্রথা, গুরুপ্রসাদী প্রথা ইত্যাদি অমানবিক, অশালীন প্রথাগুলি ব্রাহ্মণ্যধর্মেরই অবদান। কিন্তু অপরদিকে হিন্দুধর্ম একটি সুসভ্য, যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী ধর্ম। (১০) ব্রাহ্মণ্যধর্মের অনুগামীরা সবাই ব্রাহ্মণ নয়, কেউ ব্রাহ্মণ, কেউ শূদ্র ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু হিন্দুধর্মের অনুগামী মাত্রেই সবাই হিন্দু এবং কেবলমাত্র হিন্দু। হিন্দুদের একমাত্র পরিচয়— তাঁরা হিন্দু। (১১) ব্রাহ্মণদের উপনয়ন হয়, হিন্দুদের হয় না। (১২) ব্রাহ্মণ্যধর্মে জাতপাত, বর্ণভেদ, অস্পৃশ্যতা আছে, কিন্তু হিন্দুধর্মে ওইসব কদর্য জিনিস নেই। ওগুলো সম্পূর্ণতই ব্রাহ্মণ্যধর্মের ব্যাপার, হিন্দুধর্মের নয়। (১৩) ব্রাহ্মণরা পৈতে পরে, কিন্তু হিন্দুরা তা পরে না। তাই পৈতে পরা দেখে ব্রাহ্মণকে সহজেই স্বতন্ত্র ধর্মের অনুগামী হিসাবে সনাক্ত করা যায়— যেমন টুপি (ফেজ) পরা দেখে সহি মুসলমানদের সনাক্ত করা যায়, বুকে ক্রুশ দেখে খ্রিস্টান সনাক্ত।
