তা ঠিক কিন্তু বাইশতেইশের মধ্যেই তো আর দুজনের বিয়ে হয়ে গেল। এদিকে সামনের অঘ্রানেই তো তুই আঠাশ পূর্ণ করে ঊনত্রিশে পড়বি।
আজকাল আঠাশঊনত্রিশেই মেয়েরা বুড়ি হয় না। তাছাড়া তিরিশবত্রিশের আগে অনেক ছেলেই বিয়ে করতে চায় না। একটু সেট না হয়ে কেউই আজকাল বিয়ে করবে না।
এইভাবেই দিন চলে।
.
আবার কদিন পর ঐ আটটা কুড়ির ট্রেনে ঠিক ওরই কামরায় ঐ লোকটাকে দেখে অদিতি চমকে ওঠে। দুচারজন যাত্রী ওঠানামা করেন কিন্তু কামরায় শুধু ওরা দুজনেই থাকে। অদিতি সতর্ক না থাকলেও সন্ত্রস্ত না হয়ে পারে না। আগের দিনের মতোই লোকটা সব সময় বইপত্তর পড়ে। না, সেদিনও কোনো ঘটনা ঘটে না।
অদিতির স্কুলের পর এক ছাত্রীর বাড়িতে কয়েকটি মেয়েকে পড়ায়। তাই সাড়ে সাতটার ট্রেন ও কিছুতেই ধরতে পারে না। এই আটটা কুড়ির ট্রেনেই ও রোজ বাড়ি যায় এবং প্রত্যেক দিন গার্ডের ঠিক পাশের কামরায় বসে।
না, অদিতি লোকটাকে রোজ দেখতে পায় না। আস্তে আস্তে খেয়াল করল, লোকটা সপ্তাহে তিন দিন যায়। তাছাড়া কয়েক মাস ধরে দেখার পর অদিতি মনে মনে স্বীকার করে, লোকটা চোরডাকাত বা ছিনতাইবাজ নয়। যদি লোকটা খারাপ হত, তাহলে অনেক কিছুই করতে পারতো। কম দিন তো সুযোগ পায়নি!
তাছাড়া লোকটা শুধু পড়ে। আশেপাশে লোকজন থাকলেও কারুর সঙ্গেই কোনো কথাবার্তা বলে না
আচ্ছা ঐ লোকটা কি বর্ধমানের কোনো কলেজে পড়ায়? না কি বর্ধমানেই কোনো অফিসে চাকরি করে?
এইভাবেই ক টা মাস কেটে গেল। গরমের ছুটিতে স্কুল বন্ধ হবার পর বাড়িতে বসে বসেই অদিতি ঐ লোকটার কথা ভাবে। না ভেবে পারে না কোনো কোনোদিন লোকটাকে দেখতেও ইচ্ছে করে।
মাঝে মাঝে অদিতি নিজেকেই ধিক্কায় দেয়। ছি! ছি! একটা নিছক ভদ্রলোককে গুণ্ডা বদমাইশ ভেবেছিলাম।
মে মাসের একেবারে শেষের দিকে আবার স্কুল খোলে। অদিতি আবার আগের মতো আটটা কুড়ির ট্রেনে ফিরতে শুরু করে, কিন্তু না, ঐ লোকটাকে আর ট্রেনের কামরায় দেখতে পায় না। ও মনে মনে অস্বস্তিবোধ করে। বোধহয় একটু অসহায়ও বোধ করে। হাজার হোক, রাত্রের ট্রেনে কামরায় একজন ভদ্রলোক থাকলে অনেক নিশ্চিন্তে থাকা যায়।
স্কুল খোলার পর পনরোকুড়ি দিনের মধ্যে লোকটার দেখা না পেয়ে অদিতি যেন মনে মনে ছটফট করে। প্রত্যেক দিন কত প্রত্যাশা নিয়ে ট্রেন ধরতে এসে হতাশ হওয়া যেন আর সহ্য করতে পারে না।
দেখতে দেখতে জুন মাসও শেষ হলো।
কদিন বৃষ্টির পর সেদিন আকাশে এক টুকরোও মেঘ নেই। রোদ্দুরে ঝলমল করছে চারদিক। অত রোদ্র দেখে অদিতি আর ছাতি নিয়ে বেরোয় না। স্কুল ছুটির পরও আকাশে বিশেষ মেঘ দেখে না কিন্তু ছাত্রীদের পড়িয়ে স্টেশনে রওনা হবার সময় দেখল সারা আকাশ কালো মেঘে ভরে গেছে। মনে করে, বেশি রাত্তিরের আগে বৃষ্টি হবে না।
প্রতিদিনের অভ্যাসমতো শেষ কামরায় উঠেই অদিতি ঐ লোকটাকে কোনোর দিকে বসে থাকতে দেখেই একটু হাসে। হঠাৎ মনে হয়, ঐ লোকটার সামনের সিটে বসে জিজ্ঞেস করে, এতদিন দেখিনি যে? কিন্তু না, ও বেশ খানিকটা দূরেই বসে।
আরো দুচারজন যাত্রী উঠলেন। ট্রেন ছাড়ল। কিন্তু দুএকটা স্টেশন পার হতেই শুরু হল তুমুল বৃষ্টি! সব জানলাগুলো ভালো ছিলনা। তাই যাত্রীরা বাধ্য হয়েই কামরার একদিকে মাঝামাঝি এসে বসেন। ট্রেন এগিয়ে চলে। যাত্রীরা ওঠানামা করেন কিন্তু বৃষ্টির বেগ আরো বাড়ে। ছাতি না আনার জন্য অদিতি মনে মনে অনুশোচনা করে।
দেখতে দেখতে ট্রেন শ্রীরামপুর এসে গেল। অদিতি শাড়ির আঁচল কোমরে খুঁজে নেয়। হাতের ব্যাগটা বগলের তলায় চেপে ধরে।
এই ছাতাটা নিন।
মুহূর্তের জন্য অদিতি বাইরের দিকে তাকিয়েছিল। দৃষ্টিটা ঘুরিয়ে আনতেই ঐ লোকটাকে সামনে দেখে অবাক হয়ে যায়।
ঐ লোকটা আবার বলে, এই ছাতাটা রাখুন। তা না হলে একেবারে ভিজে যাবেন।
কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে অদিতি বলে, না, না, ছাতির দরকার নেই। আমি দৌড়ে রিকশায় উঠে যাব।
ঐ লোকটা একটু হেসে বলে, ট্রেন থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে একেবারে ভিজে যাবেন।
আমি ছাতি নিলে আপনি কী করবেন?
আমি পুরুষ মানুষ। আমি ভিজলে ক্ষতি নেই কিন্তু কাপড়চোপড় ভিজে গেলে মেয়েদের অনেক অসুবিধে। তাছাড়া রাস্তাঘাটের লোকজন এমন বিশ্রীভাবে চেয়ে থাকে যে…
অদিতি ওর হাত থেকে ছাতিটা নিতেনিতেই রিষড়া পার হয়। ও উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগুতে এগুতে জিজ্ঞেস করে, ছাতিটা কবে ফেরত দেব?
ঐ লোকটা একটু হেসে জবাব দেয়, ছাতিটা ফেরত না দিলেও ক্ষতি নেই। তবে পরশু দিনই আবার দেখা হবে।
সেদিন সারারাত অদিতি বোধহয় শুধু স্বপ্ন দেখে।
মাঝখানের দিনটাকে যেন অসহ্য মনে হয়। পরের দিন অদিতি অন্য দিনের তুলনায় একটু আগেই স্টেশনে এসে শেষ কামবার এক কোণায় বসে। ট্রেন ছাড়ার মিনিট খানেক আগে ওকে উঠতে দেখেই অদিতি বলে, এদিকে আসুন।
পাশে না, ঠিক সামনে উনি বসতেই অদিতি ছাতাটা ফেরত দিয়ে বলে সেদিন আপনি। ছাতা না দিলে সত্যি বিপদে পড়তাম। স্টেশনে একটা রিকশাও ছিল না।
সেই শুরু।
তারপর এই রাত আটটা কুড়ির লোক্যালে সপ্তাহে তিনদিন একসঙ্গে যেতেযেতেই আলাপ-পরিচয়-ঘনিষ্ঠতা।
.
সামনের রবিবার কি তুমি ব্যস্ত? অদিতি প্রশ্ন করে।
কেন? কোনো দরকার আছে?
বাবামা প্রায় রোজই বলেন, তোমাকে নিয়ে যেতে। অদিতি একটু থেমে বলে, রবিবার বিশেষ কোনো কাজ না থাকলে সকালের দিকে চলে এসো। সারাদিন একসঙ্গে কাটানো যাবে।
