কিন্তু…
ছুরি দেখে যদি ওরাও ভয় পায়?
তবে ওরা দুজনে তো বেশ খানিকটা দূরে বসে আছে। ওদের দুজনকে আর আমাকে একসঙ্গে ছুরি দেখাতে পারবেনা! ওদের সামনে ছুরি বের করলেই আমি অ্যালার্ম চেন… না, না, না তো হবে না। হতচ্ছাড়া রেল কোম্পানি বোধহয় লোক্যাল ট্রেনে অ্যালার্ম টেনের কারবারই তুলে দিয়েছে।
তাহলে!
যা থাকে কপালে, আমি ঠিক ট্রেন থেকে লাফ দেব। তারপর যা হয় হোক।
যে দুটো লোক এতক্ষণ অঘোরে ঘুমুচ্ছিল, তারা হঠাৎ উঠে বসেই একবার বাইরের দিক দেখে নিয়েই চুপ করে বসে থাকে। পরের স্টেশনে ট্রেন থামতেই ওরা নেমে যায়। আট-দশ মিনিট পরে মগরায় ঐ দম্পতি নেমে যেতেই অদিতির মুখ শুকিয়ে যায়। মনে মনে ভগবানের নাম স্মরণ করলেও অজানা বিপদের চিন্তায় ও শিউরে ওঠে। এখন ওকে একা পেয়ে যদি লোকটা ওর গায়ে হাত দেয়? যদি ওর সর্বনাশ করে?
ওরা দুজন ছাড়া কামরায় আর কেউ নেই। বাধা দেবারও কেউ নেই; চক্ষুলজ্জারও কোন ঝামেলা নেই।
অদিতি ভেবে কূলকিনারা পায় না।
লোকটাকে সাক্ষাৎ যমদূত মনে হয়। ওর মুখ দেখলে গা জ্বলে যাবে কিন্তু তবু একবার ওর দিকে না তাকিয়েও পারে না।
লোকটা বই পড়ছে?
ওকে দেখে অদিতির হাসি পায়। মনে মনে বলে, তোমার ভণ্ডামিতে আমি ভুলছি না। তোমার যদি কোনো বদ মতলবই না থাকে, তাহলে আমাকে দেখে এই কামরায় উঠেছিলে কেন?
এইসব আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতেই আটটা কুড়ির লোক্যাল ব্যান্ডেল পেরিয়ে গেল। দেখতে দেখতে হুগলি-চুঁচুড়া-চন্দননগরও চলে যায়। তারপর আরো কয়েকটা স্টেশন পার হয়ে শ্রীরামপুর-রিষড়া ছাড়তেই অদিতি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
কোন্নগরে ট্রেন থামতেই অদিতি প্রায় লাফ দিয়ে নেমে যায়।
ও প্ল্যাটফর্মে নেমে পিছন দিকে ফিরে দেখে, ঐ লোকটা ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
.
চার ভাইবোনের মধ্যে চাইতে বড় অদিতি। ও যখন বি এ পড়ে তখনই একদিন ওর স্বামীকে বললেন, ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছে। বড় মেয়েকে যদি এম এ পড়াও তাহলে তিনচার বছরের মধ্যে ওর বিয়ে দিতে হবে। ততদিনে তো আবার একটা মেয়ের বিয়ের চেষ্টা করতে হবে। তাই বলছিলাম, এ বছরের মধ্যেই ঘরদোর পাকা করে নাও।
সুখেন্দুবাবু চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে একটু হেসে বললেন, পরশু দিনই অফিসে লোন এর জন্য দরখাস্ত করেছি।
পুরো বাড়িটাই শেষ করবে তো?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, একবার যখন ধরব, তখন পুরোটাই শেষ করব। সুখেন্দুবাবু একটু থেমে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, এই টিনের বাড়ি দেখলে কী কোনো ভালো পরিবারের ছেলে তোমার মেয়েদের বিয়ে করতে রাজি হবে?
যাই হোক, সত্যি সত্যি মাস খানেকের মধ্যেই বাড়ি তৈরি শুরু হল। সকালবিকাল লরি বোঝাই ইটবালিসিমেন্টপাথর আসে।দশ বারোজন মিস্ত্রি আর পাঁচছজন সাগরেদ সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত কাজ করে। মাস খানেকের মধ্যেই জানলাদরজার ফ্রেম বসানো হয়ে গেল। কয়েক দিনের মধ্যেই বাথরুম পায়খানার সব সরঞ্জাম হাজির।
ছাদ ঢালাইএর ঠিক দিন দশেক আগে সুখেন্দুবাবু স্ত্রীকে বললেন, যা ভেবেছিলাম, তার চাইতে অনেক বেশি খরচ হয়ে গেল। এখন হাতে যা আছে, তা দিয়ে ছাদ ঢালাই হবে না।
তোমার হাতে একেবারেই কিছু নেই?
আছে কিন্তু ছাদ ঢালাইএর জন্য আরো সাতআট হাজার লাগবে তার উপর দোতলার ঘর বাথরুম ছাড়াও বাড়িটার একটা পাঁচিলও তো দিতে হবে।
এখন কী হবে?
কী আর হবে? পি এফ থেকে লোন নেব। সুখেন্দুবাবু একটু হেসে বলেন, একবার যখন শুরু করেছি, তখন শেষ না করে ছাড়ছি না।
ছাদ ঢালাই হতেনাহতেই দোতলার ঘর বাথরুমের সব মালমসলা জিনিসপত্র এসে গেল।
এবার সুখেন্দুবাবু বললেন, সামনের সপ্তাহেই বাথরুমের কাজ শুরু হবে। তারপর একতলার প্লাসটার আর রংটং হতে না হতেই দোতলায় ঘরদোর তৈরি হয়ে যাবে।
এভাবে বাড়ি তৈরি হচ্ছে দেখে সবাই খুশি।
ঠিক তিন দিন পর কারখানা লকআউট হয়ে গেল। সারা পরিবারের মাথায় যেন বজ্রাঘাত পড়ল।
.
ঐ কয়েকটা বছরের কথা মনে পড়লে এখনও ওরা সবাই শিউরে ওঠে। হাজার সমস্যার মধ্যেও অদিতি বি এ পাস করেই বি এড করল। তারপর কোন্নগরেই একটা প্রাইমারি স্কুলে বছর খানেক চাকরি করার পর শেষ পর্যন্ত বর্ধমান শ্ৰী বিদ্যামন্দিরে চাকরিটা জুটে গেল। যাতায়াতে পরিশ্রম থাকলেও মাইনে ভালো।
এসব বেশ কয়েক বছর আগেকার কথা! সুখেন্দুবাবুর কারখানা এখনও খোলেনি কিন্তু অদিতি নিজে বিয়ে না করলেও ছোট দুবোনের বিয়ে দিয়েছে। কপালগুণে দুটো ভগ্নীপতি বেশ ভালো। আরতির স্বামী সাধারণ গ্র্যাজুয়েট হলেও আইসিআইতে ভালোই মাইনে পায়। আরতি স্কুলে চাকরি করে প্রত্যেক মাসে মাকে শ চারেক টাকা দেয়। ছোট ভগ্নীপতি কোল ইন্ডিয়ার এঞ্জিনিয়ার। খুবই ভালো মাইনে পায়। তাই ছোট বোন নিজে কোন কাজকর্ম না করলেও প্রত্যেক মাসে মাকে আড়াই শ টাকা পাঠায়। ছোট ভাই বি এস-সি পড়ছে। ওকে একটু দাঁড় করাতে পারলেই অদিতি একটু নিশ্চিন্ত হতে পারে।
তাছাড়া দোতলায় ঘরদোর তৈরি না হলেও আরবি বিয়ের আগেই একতলার সব কাজ হয়ে যায়। আরতির বিয়ের পর একটা ঘর ভাড়া দিয়ে মাসে মাসে তিন শ টাকা আসছে। তা দিয়ে অন্তত গ্যাস আর ইলেকট্রিসিটির খরচ মিটে যায়।
সুখেন্দুবাবু কিছু না বললেও তার স্ত্রী মাঝেমাঝেই বড় মেয়েকে বলেন, তুই যে কবে বিয়েথা করে সংসারি হবি, সেই চিন্তাতেই আমি পাগল হয়ে যাই। অদিতি হাসতে হাসতে বলে, তোমার সতেরো বছরে বিয়ে হয়েছিল বলে আজকাল আর তা হয় না।
