হ্যাঁ, আসব।
রবিবার কোন্নগরের নবগ্রামে অদিতিদের বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় বারোটা হয়ে গেল। ওকে দেখেই অদিতি জিজ্ঞেস করে, এত দেরি হল?
সকালে বাবা বললেন, পিসিমাকে নিয়ে একবার ডাক্তাবের কাছে যেতে হবে।
কেন, পিসিমার আবার কী হলো?
হাইপ্রেসারের রুগী…
কিন্তু পিসিমার মতো হাসি খুশি মানুষের তো হাই প্রেসার থাকা উচিত না। অদিতি একবাব নিঃশ্বাস নিযেই বলে, যাই হোক, তাই বলে এত দেরি?
ডাক্তারের কাছ থেকে এসেই দেখি, ছোট্ট ভগ্নীপতি এসেছে। হাজার হোক, একেবারেই নতুন জামাই। তাই…
সুখেন্দুবাবু বারান্দায় দাঁড়িয়েই মেয়েকে বলে, ওকে ঘরে এনে বসতে দে। তারপর কথা বলিস।
অদিতি ওকে নিয়ে কয়েক পা এগুতেই ওর মা সামনে এসে দাঁড়ান।
মা, এই হচ্ছে সার্থক। অদিতি খুশির হাসি লুকিয়ে বলে, থিসিস জমা দিয়ে দিয়েছে। সুতরাং ক দিন পরই ইনি ডক্টর সার্থক চৌধুরী হয়ে যাবেন।
অদিতির মা বলেন, এই ছেলে যদি ডক্টরেট না হয়, তাহলে আর কে হবে?
সুখেন্দুবাবুও বারান্দা থেকে নেমে এসে পাশে দাঁড়ান। সার্থক ওদের দুজনকে প্রণাম করে।
সুখেন্দুবাবু ওর মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বলেন, দীর্ঘজীবী হও বাবা।
অদিতি সাৰ্থককে নিয়ে ঘরে যাবার পরপরই অদিতির মা এসে জিজ্ঞেস করেন, বাবা, তুমি কি চা খাবে? না কি এখনই খেয়ে নেবে?
না, মাসিমা, এখনই খাবো না। পিসিমা এত লুচি খাইয়ে দিয়েছে যে
এখন চা খেতে তো আপত্তি নেই?
না, না, চা খেতে আবার আপত্তি কী?
সবাই মিলে চা খেতে খেতে গল্পগুজব হয়।
অদিতি হাসতে হাসতে বলে, জানো মা, পিসিমা এখনও ওকে ভাত মেখে দেন।
উনিও একটু হেসে বলেন, তাই নাকি?
সার্থক বলে, পিসিমার ধারণা, এখনও আমি ছোট্ট বাচ্চা আছি। ও একটু থেমে একটু থেমে একটু হেসে বলে, তাছাড়া আমারও এমন অভ্যাস হয়ে গেছে যে উনি মেখে না দিলে আমিও ঠিক খেয়ে তৃপ্তি পাই না।
তোমার পিসিমার রান্না খেয়ে তো আমার মেয়ে মুগ্ধ হয়ে গেছে।
হ্যাঁ, পিসিমা সত্যি খুব ভালো রান্না করেন। তাছাড়া কত রকমের যে খাবারদাবার বানাতে জানেন, তার ঠিকঠিকানা নেই। সার্থক একটু থেমে বলে, বাবা মাঝেমাঝেই হাসতে হাসতে পিসিমাকে বলেন, ছোড়দি, তোমার আচার তৈরির জন্য সারাজীবন যা ব্যয় হল, তা দিয়ে স্বচ্ছন্দে সল্টলেকে একটা দোতলা বাড়ি তৈরি করতে পারতাম।
ওর কথা শুনে সবাই হাসেন।
সুখেন্দুবাবু জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কলকাতায় এত টিউটোরিয়াল হোম থাকতে বর্ধমানে পড়াও কেন? আমাদের মণীন্দ্র কলেজের মর্নিং সেকশনের একজন অধ্যাপক রিটায়ার করার পর বর্ধমানে টিউটোরিয়াল হোম খুলেছেন। উনি অনুরোধ করেছিলেন বলেই…
কিন্তু সকালে কলেজে পড়িয়ে বিকেলে আবার বর্ধমানে গিয়ে পড়াতে তো যথেষ্ট পরিশ্রম হয়।
না, তেমন কিছু না। দশটার মধ্যেই কলেজের ক্লাস শেষ হয়ে যায় আর বর্ধমান যাই পৌনে তিনটের ট্রেনে।
রিসার্চ করার সময় তো তোমাকে অনেক খাটতে হত।
হ্যাঁ, তখন একটু বেশি পরিশ্রম করতে হলেও বর্ধমানে যাই তো সপ্তাহে তিন দিন। খেতে বসেও নানা কথা হয়।
সুখেন্দুবাবু বললেন, আমরা স্বামীস্ত্রী একদিন তোমার বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাব ভাবছি।
হ্যাঁ, আসুন। বাবা আর পিসিমা তো কতদিনই অদিতিকে বলছেন, আপনাদের নিয়ে যেতে
সুখেন্দুবাবুর স্ত্রী বললেন, না, না, এবার আমরা সত্যি যাবো। ওঁদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে একটা শুভদিন ঠিক করা দরকার।
সন্ধের দিকে বিদায় নেবার আগে সার্থক অদিতিকে জিজ্ঞেস করে, শেষ পর্যন্ত একটা গুণ্ডা-বদমাইশের সঙ্গে তোমার বিয়ে হবে?
এর চাইতে আর বেটার কোয়ালিফায়েড গুণ্ডা যখন পাওয়া গেল না, তখন একেই বিয়ে করতে হবে। আমার কপালই এমন।
ব্যান্ড মাস্টার
ছেলেটির বেশ মিষ্টি চেহারা। প্রথম দিন দেখেই আমার ভালো লেগেছিল। বড় ট্রে তে কাপডিশ তুলে একটা ময়লা কাপড় দিয়ে টেবিল পরিষ্কার করে চলে যেত। চলে যাবার সময় হয়তো বা একবার চাইত আমার দিকে। এক মুহূর্ত, তার বেশি না। সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি গুটিয়ে নিয়ে জনতা কফি হাউসের মধ্যে হারিয়ে যেত। তারপর উর্দিপরা বেয়ারা আসত। অর্ডার দিলে কফি এনে দিত। কফি খাওয়া শেষ হবার পরও আমি আর মৃদুলা বসে বসে গল্প করতাম। ওরই এক ফাঁকে বেয়ারা এসে পয়সা নিয়ে যেত। দশবিশ পয়সা টিপস দিতাম। কোনোদিন জাপানী পুতুলের মত হাতটা একটু তুলতো, কোনোদিন তুলতো না। চলে যেতো। আমি আর মৃদুলা তখনও গল্প করতাম। উঠতাম না। আবার ঐ ছেলেটা আসত। ট্রেতে কাপডিশ তুলতে, টেবিল সাফ করে দিত। একটু সলজ্জ দৃষ্টিতে আমার দিকে চাইত, হয়তো বা মৃদুলার দিকেও। আমি ওকে একটু ভালো করে দেখার আগেই ও জনতা কফি হাউসের জনারণ্যে হারিয়ে যেত।
এসব বেশ অনেক কাল আগেকার কথা। মুসৌরীতে বেড়াতে গিয়ে মৃদুলার সঙ্গে আলাপ হয়েছে। দিল্লিতে এসে ভাব হয়েছে। রোজ কফি হাউসে যাই, কনট প্লেসে ঘুরে বেড়াই। পাশাপাশি বসে সিনেমাথিয়েটার দেখি। একটু হাত চেপে ধরি, একটু অহেতুক হাসি। সন্ধ্যায় অন্ধকার নেমে এলে দুজনে দুদিকে চলে যাই। রাত্রির অন্ধকারেও কেমন যেন একটা সোনালি সকালের নেশায় বিভোর থাকি।
তারপর আস্তে আস্তে কফি হাউসে যাওয়া বন্ধ করলাম। অত ভীড়ের মধ্যে কথা বলে মৃদুলার মন ঠিক ভরত না। একটু নিবিড় হবার জন্য মৃদুলা নিয়ে যেতো ইন্ডিয়া গেটের আশেপাশের গাছতলায়, বুদ্ধ জয়ন্তী পার্কে অথবা অন্য কোথাও। কফি হাউসের ঐ মিষ্টি চেহারার ছেলেটার সঙ্গে আর দেখা হতো না, কিন্তু মাঝে মাঝেই আমার মনে পড়তো! মনে পড়ত ওর সলজ্জ মিষ্টি দৃষ্টির কথা।
