সত্যি মিনিট খানেকের মধ্যেই সন্তোষ ফিরে আসে। রান্নাঘরের দোর গোড়ায় মোড়ার উপর বাসন্তীকে বসে থাকতে দেখেই চিৎকার করে, মা, মোড়ার উপরে কী ভূত বসে আছে?
বাসন্তী একটু হেসে বলে, না, পেত্নী।
একটু কাছে এসে সন্তোষ বলে, হাসপাতালের প্যাথোলজি ডিপার্টমেন্টের এক সামান্য কর্মচারীর বাড়িতে তুমি আসতে পারলে?
আমি কী মেডিক্যাল সুপারিন্টেন্ডেন্ট?
সন্তোষের মা কড়ায় তরকারি চাপাতে চাপাতেই বলেন, ও এই বাড়িতে আসবে না মানে? এইটাই তো ওর আসল বাড়ি। বৃদ্ধা আপনমনেই একটু হেসে বলেন, সামনের অঘ্রানেই ওকে আমি এ বাড়িতে পাকাপাকিভাবে নিয়ে আসছি।
লজ্জায় বাসন্তীর মুখ লাল হয়ে ওঠে। ও একটু সামলে নিয়েই সন্তোষকে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা সঞ্জীব চ্যাটার্জীর কোন বইতে যেন আছে বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে?
পালামৌ।
বর্ধমান লোক্যাল
কী আশ্চর্য! ঐ লোটা আজকেও আবার আমার কামরায় উঠেছে? লোকটার মতলব কী?
অদিতি মুহূর্তের জন্য লোকটাকে একবার দেখে নিয়েই দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়। মনে মনে বলে, থাক, থাক, আর ভদ্দরলোকের ভান করতে হবে না। লোক্যাল ট্রেনে বা ট্রামেবাসে একটা পত্রপত্রিকা পড়লেই ভদ্দরলোক হওয়া যায় না। ওসব আমার খুব জানা আছে।
হাজার হোক, রাত আটটা কুড়ির লোক্যাল। অন্ধকারের মধ্যে দিয়েই ট্রেন ছুটছে। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বিশেষ কিছুই দেখা যায় না। তবু অদিতি কয়েক মিনিট জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কামরার মধ্যে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়েই অদিতি মনে মনে বলে, না, না, জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকা ঠিক নয়। আমাকে অন্যমনস্ক দেখে লোকটা যদি হঠাৎ আমার মুখ চেপে ধরে?
ও লুকিয়ে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলেই ঠিক করে, একটু সতর্ক থাকতে হবে। যদি লোকটা সত্যি কোনো বদ মতলবে এগিয়ে আসে, তাহলে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে লোকটাকে জুতাপেটা করতে হবে।
মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েও অদিতি যেন হোঁচট খায়।
কিন্তু,
যদি জুতাপেটা করার সুযোগ না পায়? তার আগেই ব্যাগটা ছিনিয়ে নিয়ে ট্রেন স্টেশনে ঢোকার মুখে লাফিয়ে পড়ে?
তাহলে কী করা যাবে?
তবু ভালো, অন্য কোনো ক্ষতি তো করল না।
আচ্ছা যদি লোকটা ছুরি বেব করে? যদি গলার কাছে ছুরি ধরে হাতের কঙ্কন আর ঘড়িটা খুলে দিতে বলে?
সঙ্গে সঙ্গে অদিতির কত ঘটনা মনে পড়ে যায়।
.
এই তো মাস তিনেক আগেকার কথা। বোধহয় এই আটটা কুড়ির ট্রেনেই শেফালীদি মেয়েকে নিয়ে চন্দননগর যাচ্ছিলেন। বর্ধমানের পর দুতিনটে স্টেশন পার হতেই একটা ভদ্রঘরের ছেলে হঠাৎ শেফালীর মুখের সামনে ছুরি ধরে বলল, চটপট আপনার ঘড়ি আর গলার হারটার খুলে দিন।
ছেলেটার কাণ্ড দেখে শেফালীদি ভয়ে আতঙ্কে কিছু বলতে গিয়েও মুখ দিয়ে কিছু শব্দ বের করতে পারেন না।
ছেলেটা খ্যাপা কুকুরের মতো হুঙ্কার দিয়ে শেফালীদির মেয়েকে বলল, কী রে ছুঁড়ি গায়ে হাত না দিলে কি খুলতে পারছিস না?
আঠারো বছরের মেয়েটা ভয়ে ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠতেই শেফালীদি আর একটুও মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে নিজের ঘড়ি আর হার খুলতেখুলতেই মেয়েকে বললেন, নে রে চটপট খুলে দে।
ছেলেটা সবকিছু পকেটে পুরে অন্ধকারের মধ্যেই পরের স্টেশনে নেমে গেল। কামরায় যে তিনচারজন লোক ছিল, তারা টু শব্দটি পর্যন্ত করল না।
শেফালীদি বলছিলেন, তোমরা ভাবতে পারবেনা ছেলেটাকে দেখতে কি সুন্দর। অত্যন্ত ভদ্রঘরের ছেলে না হলে অত সুন্দর দেখতে হতে পারে না।
.
আবার অদিতি মুহূর্তের জন্য লোকটাকে দেখে নিয়েই মনে মনে বলে, এই হতভাগাকে দেখতেও বেশ সুন্দর। যেমন গায়ের রঙ, সেইরকমই চোখমুখ। দেখে তো মনে হয়, উনি অত্যন্ত ভদ্রঘরের ছেলে কিন্তু দেখতে সুন্দর হলেই কী স্বভাবচরিত্রও ভালো হয়?
অত্যন্ত দুশ্চিন্তার মধ্যেও ও একটু চাপা হাসি হাসে।
ওরে বাপু, তোমার মতলব কী আমি বুঝতে পারিনি? যদি অত সাধুই হবে, তাহলে ঠিক পর পর দুসপ্তাহ আমার কামরাতেই উঠবে কেন? এত বড় টেনে আর কোথাও উঠলে না কেন?
দৃষ্টিটা কামরার চারপাশে ঘুরিয়ে নিতেই অদিতি দেখে, সেই দুটো লোক, এখনও ব্যাগ মাথায় দিয়ে ঘুমুচ্ছে। ভগবান জানেন, ওরা কোথায় যাবে। তবে দেখে মনে হয়, বোধহয় সারাদিন পরিশ্রম করে অত্যন্ত ক্লান্ত হয়েই ঘুমুচ্ছে। নির্ঘাৎ ছোটখাটো ব্যবসাদার। এই ধরনের রাত্রের ট্রেনে নিশ্চয়ই নিয়মিত যাতায়াত করে। তা না হলে অত নিশ্চিন্তে কি ঘুমানো যায়?
হঠাৎ ট্রেনটা থামতেই ও জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকায়। হা ভগবান! এতক্ষণে দেবীপুর এলো? আমি তো ভেবেছিলাম, পাঁচসাত মিনিটের মধ্যে ব্যান্ডেল আসবে। একজন বৃদ্ধবৃদ্ধা এই কামরায় উঠলেন। যাক, তাও ভালো।
একবার মনে হল, ওদের জিজ্ঞেস করি, আপনারা কোথায় যাবেন? না, না, কী দরকার ঐ হতভাগা ঠিক মনে করবে, আমি ভয় পেয়েছি। ওকে কিছুতেই বুঝতে দেব না, আমি একটু চিন্তিত, আতঙ্কিত।
কী আশ্চর্য! ঐ বুড়োবুড়ি পরের স্টেশন বৈচিতেই নেমে গেল? আহাহা! কী দরকার ছিল এই পাঁচসাত মিনিটের জন্য এই কামরায় ওঠার?
রাগে দুঃখে দুশ্চিন্তায় অদিতি যেন নিজের উপরই রাগ করে। খেয়ালই করে না, কখন কোথায় ট্রেন থামছে।
হঠাৎ অল্পবয়সী এক দম্পতি কামরায় উঠতেই অদিতির খেয়াল হল, পাণ্ডুয়া ছাড়ল।
এদের পোশাকপরিচ্ছদ হাবভাব দেখে তো মনে হচ্ছে, এরা গ্রামগঞ্জের লোক না, নিশ্চয়ই কলকাতায় থাকে। বোধহয় কোনো আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে নেমন্তন্ন খেয়ে ফিরছে। যাক, ভালোই হল। লোকটার বদ মতলব থাকলেও ওদের সামনে বোধহয় কিছু করতে সাহস হবে না।
