অমিতাবৌদি টের পান। তবে কি ডাক্তারেরও!
ইনজেকশন দেবার পব স্পিবিটের তুলোটা দিয়ে ডাক্তার একটু ম্যাসেজ করে। একটু বেশি সময় ম্যাসেজ করল না? তুলোটা ফেলে দিয়ে এবার হাতের তালু দিয়ে আরো একটু ম্যাসেজ করে ডাক্তার।
অমিতাবৌদির দেহটা একটু দূলে দূলে নড়ে ওঠে।
ডাক্তারের কি একটা দীর্ঘনিশ্বাস পড়ল?
সিরিঞ্জ খুলতে খুলতে ডাক্তার হঠাৎ প্রশ্ন করে কতদিন বিয়ে হয়েছে আপনার?
বারো বছর।
বারো বছর? তাহলে খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছে আপনার?
আঠারো বছরে।
চিকিৎসা এগিয়ে চলে। অমিতাবৌদি আর ডাক্তার এগিয়ে চলে নিয়তির দিকে।
দুসপ্তাহ হয়ে গেল। দুজনে এখন অনেক সহজ অনেক সরল। রাতের বেলায় দুজনেই শুয়ে শুয়ে কোকিলের ডাক শোনে।
আর কতদিন শুয়ে থাকব ডাক্তারবাবু?
ডাক্তারবাবু অমিতাবৌদির কপালে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, কোন কষ্ট হচ্ছে?
অমিতাবৌদির দৃষ্টিটা জানালা দিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। অন্যমনস্ক হয়েই একটা হাত ডাঙারের হাতের পরে চলে যায়।
ডাক্তার আবার প্রশ্ন করে, কোন কষ্ট হচ্ছে?
অমিতাবোদি মুখে কিছু বলে না। মাথা নেড়ে বলে, না না, কষ্ট হবে কেন?
ডাক্তার একটু অমিতাবোদির গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়। অমিতাবৌদি যেন দেহের বাঁধনটা একটু ঢিলা করে ডাক্তারকে আদর করতে আমন্ত্রণ জানান। দুজনেরই নিশ্বাসটা যেন একটু ঘন হয়।
অমিতাবৌদি দুটো হাত দিয়ে ডাক্তারের হাতটা চেপে ধরেন।
সন্ধ্যার সময় ডাক্তার ঐ বল্লুপুরের যাবার রাস্তায় একলা একলা ঘুরে বেড়ায়। কোকিলের ডাক শোনে, বৌ কথা কও পাখি খুঁজে বেড়ায়।
অমিতাবৌদি লনে গার্ডেন চেয়ারে বসে সুধীরবাবু পুলওভারটা তাড়াতাড়ি শেষ করতে চায়। পারে না। হাতটা থেমে যায়। কোকিলের ডাক কানে আসে।
তিন সপ্তাহ ধরে রোজ রোজ ইনজেকশান দেওয়া হল, একটা কোর্স শেষ হল, ডাক্তার ও অমিতাবৌদির একটা অধ্যায় শেষ হলো।
.
টেম্পারেচার আর বুকের ব্যথা চলে গেল। এখন আর রোজ ইনজেকশন নয়, একদিন অন্তর একদিন।
ডাক্তার আসে, নিশ্বাস নেবার সময় বুকের মুভমেন্ট দেখে, প্যালপেসান দেখে, পারকাসান দেখে, স্টেথো দিয়ে অস্কালটেশান দেখে, না, না, অনেকটা ভালো, তারপর ডাক্তার ইনজেকশন দেয়। কোনোদিন হাতে, কোনোদিন কোমরে।
তারপর?
তারপরও ডাক্তার থাকে কিছুক্ষণ, অমিতাবৌদির গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। কখনও বা হাতটা এদিকওদিক চলে যায়।
তারপর?
তারপর অমিতাবৌদি ডাক্তারের হাতটা চেপে ধরে। গালের পাশে চেপে ধরে।
শেষ ইনজেকশন দেবার দিন আরো একধাপ এগিয়েছিল দুজনে। চাকরটা ক্যান্টিনে গিয়েছিল ডিম কিনতে, অমিতাবৌদি ডাক্তারকে বিদায় জানাবার জন্য ড্রইংরুমের দরজা পর্যন্ত এসেছিলেন। ডাক্তার আর পারেনি। কাছে, বুকের মধ্যে টেনে নিয়েছিল অমিতাবৌদিকে।
আর?
আর অমিতাবৌদির ঠোঁটে রেখে গিয়েছিল নিজের স্মৃতি।
ডাক্তার মুহূর্তের মধ্যে ঐ ছোট্ট ফিয়েট চড়ে নিউ ফরেস্টের মধ্যে মিলিয়ে গেলেন।
অমিতাবৌদি সেরে গেছে। সুধীরবাবু ভীষণ খুশি, ডাক্তারের প্রতি কৃতজ্ঞ।
অমিতাবৌদি ফিসফ্রাই পৌঁছে দেন ডাক্তারের বাংলোয়। ছন্দা লনে থাকে, ফুল দেখে। অমিতাবৌদি চলে যান ভেতরে। ড্রইংরুম পার হয়ে বেডরুমে। টিফিন ক্যারিয়ারটা খালি করে বেরিয়ে আসেন, কিন্তু মন? সে জোয়ারের জলে ভরে যায়।
লরী রোডের মোড়ে পোস্টাপিসের কাছে মিঃ মুখার্জীর মেয়ে খুকু বলে, রোজ রোজ তুমি ডাক্তারবাবুকে ফিসফ্রাই খাওয়াবে তা চলবে না।
ঠোঁটটা একটু কামড়ে হাসিমুখে অমিতাবৌদি বলেন, কি করব বল? ডাক্তার রোগ সারাল কিন্তু ফি নিল না। তাই খেসারত দিচ্ছি।
নিউ ফরেস্ট ঘুমিয়ে পড়ে। মিঃ মুখার্জীর ড্রইংরুম থেকে মৌমাছিরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিদায় নেয়। মিঃ পটাশকার হোয়াইট হর্স চড়ে অমরাবতী বেড়াতে যান। সুধীরবাবু ডুন এক্সপ্রেসের কুপেতে চড়ে পাগল হন। তারপর ডুন এক্সপ্রেস থেমে যায়।
জেগে থাকে শুধু অমিতাবৌদি। দূরের মুসৌরী পাহাড়ের আলোগুলো যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে।
আর?
আর ঐ সর্বনাশা কোকিলের ডাক শোনে শুধু অমিতাবৌদি।
ডাক্তারও বিছানা ছেড়ে উঠে বসে। কিছুতেই ঘুম আসে না।
বন্যেরা বনে সুন্দর…
তখনও পুরো জ্ঞান ফেরেনি, দুটো চোখই বন্ধ করে আছে। একটু আচ্ছন্নের ভাব কিন্তু তবু ব্যথায় কাতরাচ্ছে। বেশ বোঝা যাচ্ছে অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে। চোখে দেখা যায় না। জয় এর দাদা বৌদি আর ছোড়দির চোখে জল এসে যায়। ডাঃ সেন সকালে বলেছেন, ক্রাইসিস ইজ ওভার কিন্তু তবু ওদের ভয়ের শেষ নেই। একটা অজানা আশঙ্কায় সবারই বুক কাঁপে কিন্তু মুখে কেউই তা প্রকাশ করেন না।
শীলা নিজেকে একটু সামলে নিয়ে স্বামীকে বলে, এ কষ্ট চোখে দেখা যায় না। তুমি একবার সিস্টারকে বলো না।
হ্যা যাচ্ছি।
অজয় এক মুহূর্ত দেরি না করে সাত নম্বর কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়।
উনি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই শীলা বলে, আমি যে জয়কে কতদিন বলেছি অত স্পীডে মোটর সাইকেল না চালাতে, তার ঠিক ঠিকানা নেই কিন্তু
ছোড়দি বললেন, আমিও ওকে হাজারবার বারণ করেছি কিন্তু সব সময় ওর এক কথা, ছোড়দি, এটা সাইকেল না, মোটর সাইকেল। আস্তে চালালে এর জাত যাবে
হ্যাঁ, সব সময় ওর মুখে এক কথা। শীলা একটু থেমে একটু হেসে বলে, আমাকে নিয়ে বেরুলে তত বেশি জোরে চালাতে পারতো না। তাই সব সময় আমাকে বলতো, তুমি এবার থেকে জীন্স পরে আমার মোটর সাইকেলে উঠবে, নয়তো জোরে চালানো যায় না।
