হ্যাঁ।
ডাক্তার আরো খোঁজখবর নেয়। শরীরের যত্ন করেন না কেন?
আর কি যত্ন করব?
অনেক দিন ধরে খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো করেন না, তাই না?
অমিতাবৌদি একটু হাসে। ভাবে খাওয়াদাওয়া তো রোজই আছে। কিন্তু একলা একলা কি খেতে ভালো লাগে? তাছাড়া কে খোঁজ করে আমার খাওয়াদাওয়ার? ডাক্তারকে বলেন, কেন? খাওয়াদাওয়া তো ঠিক মতোই করি।
কেন লুকোচ্ছেন? এবার আমি যখন নিজে খাইয়ে দেব, তখন দেখবেন মজাটা।
অমিতাবৌদি ভেতরে চলে যান। একটু পরে এক কাপ কফি আর দুটো ফ্রেঞ্চ টোস্ট নিয়ে আসেন।
স্বামীকে কাটলেট খাইয়ে তো একটা বুকে ব্যথা করেছেন। এবার আমাকে খাইয়ে আর একটা বুকে ব্যথা করবেন?
এবার অমিতাবৌদিও একটু রসিকতা করেন। স্বামীকে সেবা করে বুকে ব্যথা করেছি, আপনাকে সেবা করে সে ব্যথা সারিয়ে নেব।
সে বিশ্বাস আছে আপনার?
নিশ্চয়ই। তা নয়তো কি এত খাতির করতাম?
কফির পেয়ালা, প্লেট নামিয়ে রেখে ডাক্তার জিজ্ঞাসা করে, বুকে ব্যথা হবার পর থার্মোমিটার দিয়ে টেম্পারেচার দেখেছেন?
থার্মোমিটার দিইনি, তবে মাঝে মাঝে গাটা গরম মনে হয়।
শোবার সময় কোন দিকে ফিরে শুতে ভালো লাগে?
বাঁ দিকে ফিরে শুলেই যেন একটু ভালো লাগে।
.
সাড়ে চারটের সাইরেন বেজে উঠল! কয়েক মিনিটের মধ্যেই সুধীরবাবু আসেন। অমিতাবৌদি আবার কফি করতে ভেতরে চলে যান।
কি দেখলেন ডাক্তার?
আই থিঙ্ক ইট ইজ এ কেস অফ ড্রাই প্লুরিসি।
তাই নাকি? সুধীরবাবু একটু চিন্তিত হন।
চিন্তার কোনো কারণ নেই। তবে আপনাকে কয়েকটা কাজ করতে হবে।
কি বলুন।
নিয়ম হচ্ছে কমপ্লিট রেস্ট ইন বেড। যদি সেটা নিতান্তই অসম্ভব হয় তাহলে অন্তত ওঁকে দিয়ে রান্নাবান্না করানো বন্ধ করতেই হবে।
সুধীরবাবু যেন একটু স্বস্তি পান। সেটা বিশেষ মুশকিলের কিছুই নয়। আমার একটা ছোকরা চাকর আছে। সে মোটামুটি ভালোই রান্না করে।
সেকেন্ডলি, বেশ ভালো খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
কিন্তু খেলে তো? এক কাপ দুধ খেতে বললেই ফাটাফাটি হয়ে যায়।
ছেলেমানুষি করলে তো চলবে না। এবার খেতেই হবে।
অমিতাবৌদি দু কাপ কফি নিয়ে আসেন।
সুধীরবাবু বললেন, নিজের কানে ডাক্তার সাহেবের কাছ থেকে শুনে নাও কি কি করতে হবে।
অমিতাবৌদি উড়িয়ে দেন কথাটা, যা সম্ভব তাই শুনব।
এবার ডাক্তার মুখ খোলে, ওসব ছেলেমানুষি ছেড়ে দিন।
পরের দিন অমিতাবৌদির চেস্ট এক্সরে হলো। রক্তের ডিফারেনসিয়াল কাউন্ট আর ইএসআর দেখা হল।
ডাক্তার সুধীরবাবুকে জানিয়ে দেয়, যা সন্দেহ করেছিলাম ঠিক তাই। লেফট প্লুরায় বেশ খানিকটা প্যাঁচ হয়েছে।
.
অমিতাবৌদি শুয়ে পড়লেন বিছানায়। চিকিৎসা শুরু হয়ে গেল।
কে জানত তখন, এ শুধু প্লুরিসির চিকিৎসা নয়?
ডাক্তার রোজ সকালের দিকে আসে ড্রাই-হাইড্রো স্ট্রেপটোমাইসিন ইনজেকশন দিতে। কোনদিন দশটা, কোনদিন আবার এগারোটায় আসে।
প্রথমে বুকের মুভমেন্ট পৰীক্ষা করেন। তারপর প্যালপেসন দেখেন। হুঁ, এখনও বেশ ঘড়ঘড়ানি আওয়াজ। ঠিক যেন বেড়ালের মতো। তারপর পারকাসান। আঙুল দিয়ে টোকা মেরে পরীক্ষা করেন। আওয়াজটাও ঠিক একই রকম আছে। তারপর স্টেথো বের করেন। ইয়ারপিস কানে দিয়ে চেস্টপিসটা ঘুরে বেড়ায় অমিতাবৌদির সারা বুকে।
রোগশয্যায় শুয়ে থেকেও অমিতাবৌদির যেন একটু ভালো লাগে, শরীরে যেন একটু রোমাঞ্চ লাগে। মনে যেন একটু দোলা লাগে। ডাক্তারকেও যেন একটু ভালো লাগে।
ডাক্তার সিরিঞ্জ বের করে। স্পিরিট দিয়ে মুছে নেয়। ইনজেক্শন বের করে, ডিসটিল্ড ওয়াটারের ফাইল বের করে। সিরিঞ্জে ইনজেকশন ভরে নেয়।
নিন, কোন্ হাতে দেব?
গলা পর্যন্ত চাদর মুড়ি দিয়ে ব্লাউজের বোতামগুলো খুলে দেন অমিতাবৌদি। তারপর অর্ধেক ব্লাউজ খুলে ডান হাতটা বের করে দেন।
ডাক্তার ডান হাতের উপরের মাংসপেশীতে স্পিরিটের তুলোটা বুলিয়ে নিয়ে ইনজেকশন দেন।
অমিতাবৌদি একবার আর্তনাদ করেন, আঃ মরে গেলাম।
ডাক্তার সিরিঞ্জটা বের করে নিয়ে দুচার মিনিট ম্যাসেজ করে দেয়।
অমিতাবৌদির সব ব্যথা সেরে যায়।
এফআরআই এর প্রেসিডেন্টের স্ত্রীকে দেখে ফেরার পথে ডাক্তার রাত্রের দিকে আর একবার আসে। সুধীরবাবুকে জিজ্ঞাসা করেন, কি গিন্নী ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করছেন তো?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, অমিতা সব কথা শুনছে।
পরের দিন ডাক্তার আসতে পারে না। কম্পাউডার এসে ইনজেকশন দিয়ে যায়। অমিতাবৌদির কেমন যেন একটু বিশ্রী লাগে।
পরের দিন ডাক্তার এলে অমিতাবৌদি জিজ্ঞাসা করেন, কাল এনেন না যে?
আসবো কেমন করে? শকুন্তলা পতিগৃহে যাত্রা করলেন। রাজা দুষ্মন্তের তদারক করতে হয়েছে। সন্ধ্যায় শালাবাবু আর শকুন্তলাকে ট্রেনে চড়িয়ে দিতে হয়েছে।
অমিতাবৌদি সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করেন, তাহলে আপনার খাওয়াদাওয়ার কি হবে?
মুখার্জী বৌদির ওখানে নন পেয়িং গেস্ট হবার ব্যবস্থা হয়েছে। কাল রাতেই ওপেনিং সেরিমনি হল।
দশদিনে অমিতাবৌদির বুকের ব্যথা বেশ কমে গেল কিন্তু রোজ রোজ ইনজেকশন নিতে হাতের ব্যথা বেড়ে গেল।
হাতে না নিলে কোমরে নিন।
কোমরে? একটু লজ্জা একটু সঙ্কোচ যেন ঘিরে ধরে অমিতাবৌদিকে। একটু এগিয়ে, একটু পিছিয়ে যায়। হাত দুটো ব্যথায় বিষ হয়ে গেছে। না, না কোমরেই ভালো।
অমিতাবৌদির শাড়ির বাঁধন, সায়ার বাঁধন খুলে একটু নীচে নামিয়ে দেন। মুখটা একটু ঘুরিয়ে নেন ওপাশে।
স্পিরিটের তুলোটা বুলোত বুলোতে যেন ডাক্তারের হাতটা একটু কেঁপে ওঠে, একটু যেন থমকে দাঁড়ায়।
