অজয় পর্দা সরিয়ে কেবিনে ঢুকতেই শীলা আর ছোড়দি প্রায় এক সঙ্গেই জিজ্ঞেস করে, সিস্টার আসছে?
অজয় অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে জবাব দেয়, মহারাণী বললেন, ব্যথা তো করবেই।
ব্যস! ছোড়দি অবাক হয়ে বলে, তাই বলে ওদের কিছু করণীয় নেই?
তুমি ভাবতে পারবে না ছোড়দি, এই সিস্টার কী বিচ্ছিরিভাবে কথাবার্তা বলে।
অজয় একটু থেমে একবার ভালো করে নিঃশ্বাস নিয়ে বলে, এই রকম একটা সিরিয়াস অ্যাকসিডেন্ট কেসের পেসেন্টের জ্ঞান ফেরার সময় সে ব্যথায় ছটফট করবে, তা সবাই জানে কিন্তু ওষুধ ইনজেকশন তো আছে।
মেজদি বলে, সে তো একশবার।
তাছাড়া কথা বলারও একটা ধরন আছে তো! এই ভদ্রমহিলা এমন বিচ্ছিরিভাবে কথাবার্তা বলেন যে…
স্বামীকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই শীলা বলে, অথচ সকালে যে সিস্টার ডিউটিতে ছিলেন, তার ব্যবহার কথাবার্তা কী সুন্দর।
অজয় বলে,হা,হা, ঐ মেয়েটির ব্যবহার কত ভালো। আজ তিনদিন ধরে তো দেখছি..
জয়এর কত জায়গায় যে কেটেকুটে গেছে, তার ঠিকঠিকানা নেই কিন্তু সব চাইতে বেশি চোট লেগেছে ডান হাতে আর ডান পায়ে। ডান পায়ের নীচের দিকে দু জায়গায় ফ্রাকচার হয়েছে। ডান হাতের কনুইয়ের একটু উপরই হাড় ভেঙেছে। তাছাড়া ডানদিকে উরুর ওখানটা দারুণভাবে কেটে গেছে। শুধু ওখানেই চোদ্দটা স্টিচ হয়েছে। ভাগ্যক্রমে মাথায় বা বুকে তেমন কিছু চোট লাগেনি। তবে দুচারটে করে স্টিচ শরীরের অনেক জায়গাতেই করতে হয়েছে। জয়এর প্রায় সারা শরীরটাই ব্যান্ডেজ আর প্লাস্টার দিয়ে ঢাকা। হঠাৎ দেখলে চমকে উঠতে হয়। ওকে যখন অপারেশন থিয়েটার থেকে বের করে আনে, তখন তো ওকে দেখে সবার মাথা ঘুরে গিয়েছিল। ডাঃ সেন অবশ্য বলেছিলেন, আই থিঙ্ক হি উইল বী অল রাইট তবে টাইম লাগবে কিন্তু তবু আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে কেউই নিশ্চিন্ত হতে পারেননি। মনে মনে সবাই আশঙ্কা করেছিলেন এমন সিরিয়াস অ্যাকসিডেন্টের পর পেসেন্টের অবস্থা কখন কী হয় কিছু বলা যায় না। আজ সকালে ডাঃ সেনের কথা শুনে সবাই অনেকটা আশ্বস্ত হলেও কেউই ঠিক নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না। অজয় তো ওর বাবাকে শুধু বলেছে, পায়ে একটা ফ্রাকচার হয়েছে আর দু একটা জায়গায় সামান্য কেটেকুটে গেছে। উনি হাসপাতালে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু ওকে বলা হয়েছে, শুধু শুধু আপনি কেন কষ্ট করবেন? জয় তো ভালোই আছে। ভাগ্য ভালো ওদের মা এখন দিল্লিতে বড় মেয়ের কাছে বেড়াতে গিয়েছেন। উনি এখানে থাকলে কী যে হতো তা ভাবা যায় না।
ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ হবার ঘণ্টা বেশ কিছুক্ষণ আগেই বেজেছে কিন্তু ওরা তিনজনে এখনও জয়এর কাছে রয়েছে। বেচারা ব্যথায় এত কাতরাচ্ছে যে ওরা ওকে ছেড়ে যেতে পারছেন না। হঠাৎ সিস্টার ইনজেকশন দেবার জন্য কেবিনে ঢুকে ওদের দেখেই অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বললেন, এ কি! আপনারা এখনও রয়েছেন? ডাক্তাররা রাউন্ডে এসে আপনাদের দেখলে আমাদেরই বকুনি খেতে হবে।
অজয় বলে, আমরা যাচ্ছি।
হ্যা যান। সিস্টার আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না কবে জয়এর হাতে সিরিঞ্জের নিডলটা ঢুকিয়ে দেয়। ছোড়দি কেবিন থেকে বেরিয়েই শীলাকে বলে, কী নির্মমভাবে ছুঁচটা ঢোকাল দেখলে?
এর কথা আর বলো না। একে দেখলে আমার গা জ্বলে যায়।
পরের দিন সকালে গিয়ে শীলা সেই ভালো নাসটির সঙ্গে দেখা হতেই বলল, বিকেলের দিকে যে সিস্টারটি ডিউটিতে থাকেন, তাকে দেখলেই আমাদের ভয় করে।
কেন? উনি হেসে জিজ্ঞেস করেন।
ভাই, ওর বড্ড মেজাজ।
উনি আবার হেসেই জবাব দেন ও একটু কড়া আছে ঠিকই কিন্তু ও সত্যি খুব ভালো নার্স।
তা হতে পারেন কিন্তু ওর কথাবার্তা শুনলে পেসেন্টদের আত্মীয়স্বজনদের খুব খারাপ লাগে।
দেখছেন তো আমাদের কত পরিশ্রম করতে হয়। সব সময় মেজাজ ঠিক রাখাও যায় না। সিস্টার জয়এর টেম্পারেচার দেখতে দেখতে বলেন, যাই হোক, কিছু মনে করবেন না। তাছাড়া আপনার দেওর তো আস্তে আস্তে ভালোই হচ্ছেন।
শীলা একটু হেসে বলে, ভাই, আপনি একটু দেখবেন। আমরা কিন্তু আপনাকেই বিরক্ত করব।
, না, বিরক্ত হবার কী আছে? যতটা পারবো নিশ্চয়ই করবো। সিস্টার একটু থেমে শীলার দিকে তাকিয়ে বলেন, আপনি যদি একটু বাইরে যেতেন তাহলে এখনই আমি ড্রেস করে দিতাম।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি যাচ্ছি। শীলা একটু হেসে বলে, তাছাড়া টাইমও তো হয়ে গেছে। প্লাস্টার আর ব্যান্ডেজে জয়এর প্রায় সারা শরীরটা ঢেকে গেছে। কোনো জামা কাপড় পরাবার উপায় নেই। গলা পর্যন্ত একটা চাদর দিয়ে ঢাকা আছে! সিস্টাররা চাদর একটু সরিয়ে স্টিচের জায়গাগুলো ড্রেস করেন। সময়ও লাগে প্রায় ঘণ্টা খানেক। জয়এর জ্ঞান ফিরলেও এখনও বেশ আচ্ছন্নে ভাব। কানের কাছে মুখ নিয়ে বার কয়েক ডাকাডাকি করলে চোখ বুজেই জবাব দেয়। কদাচিৎ কখনও দু একটা কথা বলে। তার বেশি কিছু নয়। সিস্টাররা কখন ওকে ওষুধ খাওয়াচ্ছে বা ড্রেস করছে, তা ও জানতেও পারে না।
এই ভাবেই আরো কটা দিন কেটে গেল। জয়এব পুরোপুরি জ্ঞান ফিরেছে। ডাক্তার সিস্টার বা বাড়ির লোকজনের সঙ্গে বেশ কথাবার্তাও বলে। ডাক্তার সিস্টারদের সঙ্গে বাড়ির লোকজনদেরও বেশ হৃদ্যতা হয়েছে। ডাঃ সেন তো কালকে অজয় আর শীলার সামনেই জয়কে বললেন, প্রথম তিন চারদিন তো আপনার দাদাবৌদি আমার কথার উপরও আস্থা রাখতে পারেননি। এখন আপনিই ওদের বলে দিন কেমন আছেন।
