অমিতাবৌদির ভালো লাগে, খুব ভালো লাগে। দেহ মনে পদ্মার মাতলামী দেখা দেয় লুকিয়ে লুকিয়ে। সর্বাঙ্গে যেন শিহরণ দেখা দেয়, কানে ভেসে আসে কোকিলের ডাক।
পরের দিন সকালে অফিস গিয়েই সুধীরবাবু ডাক্তার ব্যানার্জীকে টেলিফোন করলেন, ডাক্তার সাহেব, এই মাইক্রোস্কোপ আর ঘরের গিন্নি ঠিক না থাকলে বাঁচব কি করে?
ডাক্তার হেসে বলে, কোনটা ধর্মঘট করল? মাইক্রোস্কোপ না গিন্নি?
মাইক্রোস্কোপ হলে কি আর এই সাত সকালে ফোন করতাম? গিন্নি, ডাক্তার গিন্নি। কুইন এলিজাবেথ দি থার্ড!
কি হল কি?
কি হল তা বুঝলে তো নিজেই চিকিৎসা করতে পারতাম। কিছু কাল ধরেই বলছে বুকে ব্যথা, অথচ চিকিৎসা করবে না।
তাহলে আমি আর কি করব?
সুধীরবাবু এবার রসিকতা করে বলেন, ভায়া, সুন্দরী গিন্নির বুকে ব্যথা। সহ্য করতে পারলাম না। কাল অনেক কাণ্ড করে রাজি করিয়েছি।
ডাক্তার একটু ব্যস্ত ছিল। বলল, এক্ষুনি তো পারছি না। লাঞ্চের পর গেলে কি অসুবিধা হবে?
লাঞ্চে এসে সুধীরবাবু বলে গেলেন, ডাক্তার আসবে। সব কথা বোলো, কিছু লুকিয়ে চেপেটেপে রেখো না!
.
ডাক্তার এসেছিল। তবে লাঞ্চের পরেই আসতে পারেনি। আসতে আসতে প্রায় চারটে হয়েছিল।
সুধীরবাবুর জন্য রোজ কাটলেট বানাতে শরীরটাই খারাপ করে ফেললেন?
অমিতাবৌদি হাসে। অর্ধসমাপ্ত পুলওভারটা ছোট্ট টিপাইএর উপর রেখে ভিতরে যান। ড্রইংরুমে।
ডাক্তার বলল, শুয়ে পড়ুন। একটু পরীক্ষা করে দেখি কত কাটলেট খাইয়েছেন।
শোবার ঘরে অমিতাবৌদি শুয়ে পড়েন। ডাক্তার পাশে বসে চেয়ারটা টেনে নিয়ে চুপচাপ দেখেন কিছুক্ষণ।
বাঁ হাতটা দিন।
অমিতাবৌদি বাঁ হাত বাড়িয়ে দেন। ডাক্তার ঘড়ির কাটার সঙ্গে মিলিয়ে পালস পরীক্ষা করেন।
অমিতাবৌদি জোরে জোরে নিশ্বাস নেন। বুকটা একটু বেশি ফুলে ফুলে ওঠে। বোধহয় একটু লজ্জা করে। দৃষ্টিটা সরিয়ে ঘুরিয়ে নেন বাইরের দিকে।
ডাক্তার নাড়ী দেখে। কিন্তু অসতর্ক মুহূর্তে দৃষ্টিটা আটকে যায়। অমিতাবৌদির হৃদয় স্পন্দন দেখে ডাক্তার হয়তো একটু ভালো লাগে, মনে রং লাগে। না, না, ওসব কিছু না। ছাত্রজীবনে ওসব হতো। আজকাল আবার এসব দুর্বলতা কি? তিনবছর বিয়ের পরও কি এসব দুর্বলতা কারুর থাকে? ডাঃ বোধিসত্ত্ব ব্যানার্জীরও নেই।
কিন্তু তবুও মুহূর্তের জন্য ভালো লেগেছিল ডাক্তারের। অমিতাবৌদির হৃদয়স্পন্দন দেখতে দেখতে মনে হয়েছিল, সুধীরবাবু সত্যি ভাগ্যবান।
পালস্ দেখা হয়ে গেল। ডাক্তার অমিতাবৌদির হাতটা নামিয়ে রাখে।
বুকে ব্যথা করে আপনার?
হ্যাঁ।
কোথায়? বাঁ দিকে না ডান দিকে?
বাঁ দিকে।
সব সময় ব্যথা করে?
হ্যাঁ, প্রায় সব সময়েই।
কম না বেশি?
মাঝে মাঝে খুব বেশি ব্যথা করে।
ডাক্তার স্টেথো বের করে। চেস্টপিস দিয়ে অমিতাবৌদির বুক পরীক্ষা শুরু করে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরীক্ষা করে। ডাক্তার কেন যেন একটু চিন্তিত হয়। ভ্রূ দুটো কুঁচকে ওঠে।
একটু জোরে জোরে নিশ্বাস নিন
অমিতাবৌদি জোরে জোরে নিশ্বাস নেয়। বুকটা ফুলে ফুলে উপরে ওঠে, নীচে নামে।
স্টেথোর চেস্টপিস কখনও পুরা পাশে, কখনও ব্রেস্টের পাশে ঘোরাঘুরি করে ডাক্তারের হাতটাও ঘুরে বেড়ায়। একটু এদিকওদিক লাগে বৈকি!
অমিতাবৌদির লজ্জা করে। চুপ করে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে। শুধু দৃষ্টিটা বাইরের আকাশে ভেসে বেড়ায়। ডাক্তারের স্পর্শে কি মন একটু চঞ্চলা হয়? না না, তা হবে কেন?
ডাক্তার তো পরীক্ষা করবেই।
ওপাশ ফিরে শোন
অমিতাবৌদি ওপাশ ফিরে শোন। ডাক্তার পরীক্ষা করে চলে। ডাক্তারের ভ্রূ দুটো কুঁচকে ওঠে। কপালে যেন কয়েকটা চিন্তার রেখা দেখা দেয়।
উপুড় হয়ে শোন তো।
অমিতাবৌদি উপুড় হয়ে শোন। ডাক্তারের পরীক্ষা এগিয়ে চলে। পরীক্ষা করতে করতে ডাক্তার বুঝিবা মুহূর্তের জন্য অমিতাবৌদির সর্বাঙ্গের উপর দিয়ে দৃষ্টিটা বুলিয়ে নেয়। বাঃ বেশ তো!
ডাক্তারের কথায় অমিতাবৌদি আবার চিৎ হয়ে শোন। স্টেথো নামিয়ে রেখে এবার হাত দিয়ে পরীক্ষা করে। দুপাশের প্লুরার কাছে দুটো হাত দিয়ে জোর করে চেপে ধরে ডাক্তার।
খুব জোরে নিশ্বাস নিন।
খুব জোরে নিশ্বাস নিতে গিয়েই অমিতাবৌদি হঠাৎ বলেন, আঃ ভীষণ লাগছে।
কোথায়?
এইতো বাঁ দিকটার এইখানে।
ডাক্তার এবার দুটো আঙুল দিয়ে বাঁ দিকের নানা জায়গায় আঘাত করতে থাকে।
ব্যথা লাগলেই বলবেন।
ডাক্তার জেনে নেয় কোথায় ব্যথা।
প্রায় আধঘণ্টা ধরে ডাক্তার বড় যত্ন করে পরীক্ষা করল। বড় ভালো লাগল অমিতাবৌদির।
দুজনে বেরিয়ে এসে বাইরের গার্ডেন চেয়ারে বসে।
এতদিন আমাকে খবর দেননি কেন? কাটলেট খাওয়াতে হবে বলে?
অমিতাবৌদি একটু হাসেন। বড় সুন্দর হাসি। ঢলে পড়া সূর্যের মতো মিষ্টি আলোয় ভরে যায় মুখখানা। বললেন, এমনি।
খুব বেশি পরিশ্রম করেন?
না, তেমন কি। সাধারণ সংসারে সবাই যেমন করে…।
কোনোদিন হঠাৎ কোথাও পড়ে গিয়েছিলেন বা বুকে আঘাত লেগেছিল?
একটু ভাবেন অমিতাবৌদি। একটু দৃষ্টিটা ঘুরিয়ে একটু ঠোঁটটা কামড়ান মুহূর্তের জন্য। বলেন, দিন পনেরো আগে বাথরুমে পড়ে গিয়েছিলাম।
পড়ে গেলেন কীভাবে?
সারান দিয়ে স্নান করছিলাম। হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেলাম।
ডাক্তার একটু রসিকতা করেন। এখনও সারান দিয়ে স্নান করতে পারেন না?
দুজনেই একটু হাসে
বুকে চোট লেগেছিল?
ঠিক বুকে কোনো চোট লাগেনি কিন্তু বুকের মধ্যে কেমন খচ করে উঠেছিল!
তারপর থেকেই বুকে ব্যথা তাইতো?
