নিজেকে নিজের ভালো লাগত। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখার সুযোগ কোথায়? তাইতো ঐ সিঁড়ির তলার কলকাতায় স্নান করতে গিয়ে অমিতাবৌদি নিজেকে দেখত। ভালো করে দেখত। সর্বাঙ্গ দেখত। অকারণে হাসি ফুটে উঠত নিজের মুখে।
আমহার্স্ট স্ট্রিট-মীর্জাপুর দিয়ে কলেজে যাবার সময় শুদ্ধানন্দ পার্কের কাছাকাছি প্রায়ই দেখা হত অশোকদার সঙ্গে। ছোটবেলার বন্ধু মিতালীর দাদা অশোক। ইউনিভার্সিটির ছাত্র। অমিতাবৌদির সঙ্গে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু তবুও শ্ৰদ্ধানন্দ পার্কের কাছে এসে অশোকদার সঙ্গে ঐ দেখাটুকুই ভালো লাগত। তখন যে ভালো লাগার বয়স।
কলেজের অন্য অনেক মেয়ের জীবনে বসন্ত এসেছিল। ওদের বসন্তে ভ্রমরগুঞ্জনের কথা শুনত অমিতাবৌদি। ভালো লাগত উপন্যাসের নায়িকাঁদের জীবনকাহিনি শুনতে। হয়তো লুকিয়ে লুকিয়ে তারও মনে মনে ইচ্ছা হতো নায়িকা হতে। ভালোবাসতে, ভালোবাসা পেতে। বহুর থেকে দূরে গিয়ে অনন্যা হতে।
.
সুধীরবাবুর সঙ্গে যেদিন ডুন এক্সপ্রেসে চাপল, তখন সে অনন্যা হয়েছিল। দুটি রাত্রের সে সফর যেন অনন্যার অভিষেক হয়েছিল। দেহে, মনে নতুন ঐশ্বর্যের স্বাদে ভরে উঠেছিল অমিতাবৌদির জীবন। জোয়ারের জল যে একদিন সরে যাবে, ভরা নদী যে একদিন শুকিয়ে যাবে, সেদিন অমিতাবৌদি ভাবতে পারেনি। কেউই পারে না।
দিনে দিনে, তিলে তিলে সুধীরবাবু যেন ল্যাবরেটরির মাইক্রোস্কোপের মধ্যে হারিয়ে গেলেন। সাড়ে নটা আর সাড়ে চারটের সাইরেনের মধ্যে মাইক্রোস্কোপের তলায় গাছের সেল পরীক্ষা করতে করতে অমিতবেদির মনের সেল দেখতে ভুলে গেলেন। সুখী, সাধ্বী অমিতাবৌদির জন্মের সঙ্গে সঙ্গে অনন্যা অমিতাবৌদির মৃত্যু হল। রঙিন নিউ ফরেস্ট হারিয়ে গেল। চিরকালের জন্য হারিয়ে গেল। স্বামীর দায়িত্ব, কর্তব্য, ভালোবাসার ফাঁক দিয়ে কবে, কখন কেমন করে হারিয়ে গেল অমিতাবৌদি নিজেও তা টের পেল না।
সুধীরবাবু কি পালটে গেছেন? বিন্দুমাত্র না। পৃথিবীর অন্য সব স্বামীর মতো তিনিও ছন্দা পড়াশুনা সেরে ঘুমিয়ে পড়লে অমিতাবৌদিকে কাছে টেনে নেন। আদর করেন, ভালোবাসেন। রাতের অন্ধকার আরো গাঢ় হলে, নিউ ফরেস্ট ঘুমিয়ে পড়লে সুধীরবার অমিতাবৌদিকে আরো আরো অনেক কাছে টেনে নেন। ডুবে যান, হারিয়ে যান অমিতাবৌদির মধ্যে! তাও কি রোজ? সপ্তাহে দুএকদিন। ঐ দুএকদিনই সুধীরবাবু আবার সেই বারো বছর আগের ডুন এক্সপ্রেসের যাত্রী হন।
অমিতাবোদির ভালো লাগে। বেশ ভালো লাগে। ডুন এক্সপ্রেসের কুপেতে চড়তে তার বড় আনন্দ হয়, বড় তৃপ্তি লাগে। কিন্তু ঐ রাতের অন্ধকারে যখন ডুন এক্সপ্রেস থেমে যায়, যখন একটি সপ্তাহের মতো সিগন্যাল ডাউন না পেয়ে ডুন এক্সপ্রেস দাঁড়িয়ে থাকে, তখন অমিতাবৌদির কানে ঐ সর্বনাশা কোকিলেব ডাক ভেসে আসে। হয়তো শ্ৰদ্ধানন্দ পার্কের মোড়ের আশোকদার কথা মনে পড়ে। হয়তো মনে মনে সন্দেহ হয়, একি ভালোবাসা? নাকি কর্তব্য? অভ্যাস? নাকি শুধু প্রয়োজন?
ঠিক বুঝতে পারে না অমিতাবৌদি। ভাবে সবারই কি এক ইতিহাস? সবাই কি শুধু অভ্যাস-কর্তব্য-প্রয়োজনের ত্রিসীমানার মধ্যে বন্দিনী? এর চাইতে বেশি কি পাওয়া যায় না? এর চাইতে বেশি পাবার কি অধিকার নেই? প্রয়োজন নেই?
অমিতাবৌদি চায় অনন্যা হতে। স্বপ্ন দেখে তার স্পর্শ, তার ভালোবাসা, তার হাসি, তার চোখের দৃষ্টি মাতাল করবে, পাগল করবে তার প্রাণের পুরুষকে। আর আর সেই প্রাণের পুক দায়িত্ব, কর্তব্য, অভ্যাসের দাস হয়ে ডন এক্সপ্রেসের কুপেতে সফর করবে
তবে?
তবে আবার কি? অমিতাবৌদি অনন্যা হবে। অন্তত একটি মানুষের জীবনে সে অনন্যা, অদ্বিতীয়া হবে। শুধু নিদ্রাহীন রাতে নিঃসঙ্গ হয়ে নয়, প্রতি দিন, প্রতি রাত্রে দুজনে মিলে শুনবে কোকিলের ডাক। শুনবে, বৌ কথা কও।
সকালবেলায় দিনের আলোয় অমিতাবৌদির স্বপ্ন হারিয়ে যায়, পালিয়ে যায়। সত্যি? নাকি লুকিয়ে পড়ে?
দুটোর সাইরেন বাজার সঙ্গে সঙ্গেই সুধীরবাবু লাঞ্চ খেয়ে ল্যাবরেটরিতে গিয়ে তার মাইক্রোস্কোপের ফোকাস ঠিক করতে শুরু করেন! সে লেন্সের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীব অসংখ্য সব গাছপালার অন্তরের কথা জানা যায়; কিন্তু অমিতাবৌদি তখন আউট অফফোকাস হয়ে যান। ঐ সুন্দর বাংলো বাড়ির বারান্দায় বা লনের পাশে গার্ডেন চেয়ারে বসে সুধীরবাবুর পুলওভার বুনতে বুনতে অমিতাবৌদির আবার মনে পড়ে যায় ফেলে আসা রাতের কথা। স্বপ্নের স্মৃতি। আপন মনে নিজেই হেসে ওঠে পাগলামিরও একটা সীমা থাকা উচিত। তাই না? নিশ্চয়ই। অমিতাবৌদি নিজেই নিজেকে শাসন করেন। হাতের কাঁটা দুটো যেন একটু দ্রুত চলে।
.
রাত্রে খাবার সময় সুধীরবাবু একটু যেন রেগেই বলে উঠলেন, এতদিন ধরে বুকে ব্যথা, বুকে ব্যথা বলছ অথচ ডাক্তার দেখাবে না কেন বলতে পার?
ছন্দার খাওয়া হয়ে গেছে। সে ভিতরের বেসিনে হাত ধুতে যায়। সুধীরবাবু বামহাত দিয়ে কাছে টেনে নেন অমিতাবৌদিকে। কয়েক মুহূর্তের জন্য ফিরে যান অতীতে। সেই বারো বছর আগে।
অমিতাবৌদির বেশ ভালো লাগে। মুহূর্তের জন্য তিনি যেন অনন্যা, অদ্বিতীয় হন। বলেন, আঃ ছেড়ে দাও। ছন্দা দেখবে।
সুধীরবাবু বোধহয় মাইক্রোস্কোপের লেন্সের ভিতর অমিতাবৌদির মনের সেল দেখতে পান। কি যেন একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন, অমিতাবৌদির দিকে, নিশ্বাসটাও যেন একটু ঘন, একটু গরম হয়। সুধীরবাবু কেমন যেন একটু পাগলামী শুরু করেন।
