.
ব্যতিক্রম শুধু ডাক্তার।
ডাঃ বোধিসত্ত্ব ব্যানার্জী।
ডাঃ ব্যানার্জী মাঝে মাঝেই আপন মনে ঘুরে বেড়ান এই শ্যামল বনানীর নির্জন পথে পথে। কোকিলের ডাক শোনেন, বৌ কথা কও পাখি খুঁজে বেড়ান গাছের ফাঁকে ফাঁকে, লতাপাতার আড়ালে।
নিউ ফরেস্টের কোনো অফিসারকে দেখলে ডাক্তার লজ্জা পান। ভীষণ লজ্জা পান। নিজের মনকে নিজেই লুকোতে হিমসিম খেয়ে যান। একটু সামলে নিয়ে বলেন, কী করব বলুন মিঃ সরকার? নিউ ফরেস্টের যে বাড়িতেই যাই না কেন, সেখানেই একটা একটা রুগী দেখতে হয়। প্রেসক্রিপশন লিখতে হয়। সব সময় কি ভালো লাগে?
একটু থেমে, একটু হেসে ডাক্তার বলেন, তাইতো মাঝে মাঝে সময় পেলে এদিকে একটু ঘুরতে আসি। এখানে কেউ প্রেসক্রিপশন লিখতে বলে না।
মিঃ সরকার হো হো করে হেসে উঠে ছড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে এগিয়ে যান ওদিকে। মনে মনে ভাবেন, ছোঁকরা বয়স, তারপর এইতো সেদিন এলোয় আরো কিছুদিন থাকলে এসব কবিত্ব কোথায় পালিয়ে যাবে।
ডাক্তারের ভাবতে অবাক লাগে। সত্যি নিউ ফরেস্টের মানুষগুলো যেন কেমন কেমন! নিউ ফরেস্টের মধ্যে এবা কি আশ্চর্যভাবে সারাটা জীবন কাটিয়ে দেয়। এত বড় হিমালয়ের কোলে থেকেও এদের জীবন কত সীমাবদ্ধ। সকাল সাড়ে নটা আর বিকেল সাড়ে চারটের সাইরেনের পরও এরা মুক্তি পায় না, মুক্তি পেতে পারে না, মুক্তি পেতে জানে না। সন্ধ্যার পর একটুআধটু মজলিস বসে, কিন্তু সেখানেও ট্রান্সফার প্রমোশনইনক্রিমেন্টের গল্প। অথবা টুরের কথা। অথবা পুরনো অফিসারের নিন্দা।
মেয়েরা?
নিউ ফরেস্টে মেয়ে কোথায়? মিঃ মুখার্জীর দুটি মেয়ে ছাড়া নিউ ফরেস্টে মেয়ে নেই, সবাই বিবাহিতা, সবাই গৃহিণী। সাড়ে সাতটার মধ্যে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠিয়ে স্বামীকে ব্রেকফাস্ট দিতে দিতেই সকালবেলার মেয়াদ শেষ হয়। তারপর স্বামীকে লাঞ্চ খাইয়ে ছেলেমেয়েদের তদারক করতে করতেই সাড়ে চারটের সাইরেন বিকট আর্তনাদ করে বেজে ওঠে। স্বামীকে চা দিতে না দিতেই সূর্য নিউ ফরেস্ট থেকে পালিয়ে যায়। তারপর আবার সংসার, চাল-ডাল-আটা-ময়দার কোরাস।
সন্ধ্যার পর একটু মেলামেশা। একটু গল্পগুজব। হয়তো বা একটু হাসিঠাট্টাতামাসা। তারপর নিউ ফরেস্ট ঘুমিয়ে পড়ে। একটি একটি করে বাংলোর আলোগুলো নিভে যায়। ঘুমিয়ে পড়ে সবাই।
সবাই?
না, সবাই না। মিঃ মুখার্জীর ড্রইংরুমে দুটি একটি ব্যালির মৌমাছি মধুর গন্ধে অথবা কিছু খোস গল্প করে অনেক রাত অবধি। আর ফরেস্ট কলেজের হোস্টেলের পাশের বাংলোয় মিঃ পটাশকারের ড্রইংরুমে আলো জ্বলে। তবে বড় আলোটা নয়, ছোট আলোটা। নাইট ল্যাম্পটা। হোয়াইট হর্সের শেষ বিন্দু গলায় ঢেলে দেবার পর নাইট ল্যাম্পটাও আর নজরে পড়ে না।
তারপর নিউ ফরেস্টে ঘুমিয়ে পড়ে। সবাই ঘুমিয়ে পড়ে?
.
না। স্বামীর পাশে শুয়ে থাকেন কিন্তু ঘুম আসে না অমিতাবৌদির। দূরের মুসৌরী পাহাড়ের আলোগুলো যেন হাতছানি দিয়ে অমিতাবৌদিকে ডাকে। নিউ ফরেস্টের ঐ বন্দিনী জীবনে ঐ দূরের আলো কত মিষ্টি, কত মনোরম, কত প্রিয়, কত আকর্ষণীয় মনে হয়। দূরের মুসৌরী পাহাড়ের আলোর মালার মতো ডাক্তারের হৃদয়দীপের আলোও যেন অমিতাবৌদিকে হাতছানি দিয়ে ডাকে।
ডাক্তার?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ডাঃ বোধিসত্ত্ব ব্যানার্জী। আমাদের ডাক্তার। নিউ ফরেস্টের মেডিক্যাল অফিসার।
আশ্চর্য হবার কি আছে? অমিতাবৌদি মানুষ। রক্তমাংসের মানুষ। আঠারো বছরে ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশন থেকে আইএ পাস করার পর স্বামীর হাত ধরে প্রথম যেদিন নিউ ফরেস্টে এসেছিলেন, সেদিন তার চোখে ছিল অনেক আশা, ছিল অনেক স্বপ্ন। মধ্যবিত্ত বাঙালি ঘরের সব শিক্ষিতা মেয়েই যেমন স্বপ্ন দেখে নতুন জীবনের। শিক্ষিত ভদ্র ছেলের সঙ্গে বিয়ে হলে স্বপ্ন দেখবে না? নিশ্চয়ই দেখবে কিন্তু ঐ লাল বেনারসীর মেয়াদ যে কত সীমিত তা ভাবতে পারে না স্বপ্নাতুর ভরাযৌবনাদের দল। স্বামীর একটু ছোঁয়া, একটু স্পর্শ, একটু আদর, একটু আলিঙ্গন মেয়েদের দেহে বন্যা আনে, মনে স্বপ্ন আনে।
তারপর?
তারপর বিনাইঞ্জিনের গ্লাইডারের মতো হঠাৎ আকাশে ভাসতে থাকে, উড়তে থাকে। মাটির পৃথিবী থেকে একটু উপরে গিয়েই পাগল হয় সদ্যবিবাহিতা, সদ্যপ্রস্ফুটিতার দল। কিন্তু বিনাইঞ্জিনের গ্লাইডার কতক্ষণ উড়বে? নেমে আসে মাটিতে, মাটির পৃথিবীতে। বারো বছর আগে এমএসসি পাস স্বামীর সঙ্গে যেদিন অমিতাবৌদি হাওড়া থেকে ডুন এক্সপ্রেসের কুপেতে চড়েছিলেন, তখন মনে করেছিলেন হাতে স্বর্গ পেলেন।
স্বর্গ?
স্বর্গ বৈকি। বৈঠকখানায় তিনখানা ঘরের বাড়িতে পাঁচ ভাইবোন আর বাবামা। মিত্র স্কুলের মাস্টারি আর দুটো টিউশনিব পঞ্চাশ টাকার মধ্যে সাতটি প্রাণীর সংসার
৪৮
চলত। থামত না ঠিক কিন্তু বনগাঁ লোকালের মতো থামতে থামতে হাঁপাতে হাঁপাতে কোনোরকমে চলত। কলকাতার বারো আনা লোকের সংসার যেমন চলে, অমিতাবৌদিদের সংসারও ঠিক তেমনি চলত। পাঁচপাঁচটি ভাইবোনকে স্কুলকলেজে পড়াতেই বাবার জান বেরিয়ে যেত।
সখ-আনন্দ? মীর্জাপুরের প্রতিমাদের বাড়ি যাওয়াই ছিল একমাত্র আনন্দ। প্রতিমাদের বাড়ির ছাদে উঠে একটু দূরের আকাশ দেখাই ছিল অমিতাবৌদির নিত্যকার চিত্তবিনোদনের একমাত্র সূত্র। আর কদাচিৎ কখনও এক টাকা চার আনা দিয়ে পূরবীতে সিনেমা দেখা।
ম্যাট্রিক পাস করে কলেজে ভর্তি হবার পর দৃষ্টিটা একটু পালটে গিয়েছিল। মনে রঙ লেগেছিল। দেহের গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে মঞ্জরী দেখে অমিতাবৌদি নিজেই চমকে উঠেছিল। আশপাশের সবার থেকে নিজেকে একটু স্বতন্ত্র, একটু অনন্যা মনে হয়েছিল।
