অমিতের মুখের হাসি দেখে ছবি থামে।
অমিত বলে, থামলে কেন? বলে যাও। শুনতে বেশ লাগছে।
ছবি দুচোখ ভরে ওকে দেখতে দেখতে বলে, যাক, বলল, কেমন আছ?
অমিত কষ্ট করেও হাসি চাপতে পারে না। বলে, কনিমারা হোটেলের রুম নাম্বার ফোর-ফোর-টুতে ছবির সামনে বসে খুব ভাল আছি।
বাঃ! বেশ কথা বলো তো আজকাল! ছবি একটু থেমে বলে, হরদম বিলেত-আমেরিকায় গিয়ে মেমসাহেবদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতেই বোধহয়
-খুব অধঃপাতে গিয়েছ, তাই তো?
–ছি, ছি, ওকথা বলো না। সবাই তোমার জন্য কত গর্ব অনুভব করে।
–তুমি?
ছবি দৃষ্টিটা একটু ঘুরিয়ে নিয়ে বলে, না, আমি গর্ব অনুভব করি না কিন্তু ..
অমিত একটু অবাক হয়ে জানতে চায়, তুমি গর্ব অনুভব করো না?
-না। চাঁপাগাছে চাঁপাফুলই ফুটবে বা ল্যাংড়াগাছে ল্যাংড়াআমই হবে। তুমি যে ভাল হবে, বড় হবে, সেটাই তো স্বাভাবিক।
ওর কথা শুনে আনন্দে খুশিতে অমিতের মনপ্রাণ ভরে যায়।
বেশ কিছুক্ষণ দুজনের কেউই কোন কথা বলে না। মাঝে মাঝে দুজনের দৃষ্টি মাঝ পথে বিনিময় হয়। অকারণে দুজনেই একটু হাসে।
–ভাগলপুর যাও?
বছরে একবার ছুটি নিয়েই যাই। তাছাড়া সেমিনার কনফারেন্সে কলকাতা-পাটনা-গৌহাটি গেলেও অনেক সময় একটা চক্কর দিয়ে আসি।
–দাদু-দিদি তো ওখানেই থাকেন?
বছরের অর্ধেক সময় ওখানেই থাকেন। বাকি সময় কখনো আমাদের কাছে, কখনো দিদিদের কাছে কাটান।
ছবি আবার জানতে চায়, সব আগের মতই আছে?
অমিত মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ।
–সেই লিচুগাছ, আম-পেয়ারার গাছগুলোও আছে?
ও একটু হেসে বলে, হ্যাঁ।
আবার ক্ষণিকের নীরবতা। মাঝে মাঝে দৃষ্টি বিনিময়। সলজ্জ হাসি।
অমিত জিজ্ঞেস করে, তোমার ভাগলপুর যেতে ইচ্ছে করে না?
ছবি আপনমনে কি যেন ভাবে। বোধহয় ওর কথা শুনতে পায়। জিজ্ঞেস করে, দোলনাটা এখনও আছে?
অমিত হেসে বলে, আমি তো এখনও গিয়ে দোলনায় চড়ি।
ইস্! তোমার কি মজা! ছবি দৃষ্টিটা একবার দূরের মুক্ত আকাশের দিকে ছড়িয়ে দিয়েই প্রশ্ন করে, বাগানে এখনও কাঠবেড়ালীগুলো দৌড়াদৌড়ি করে?
হঠাৎ খুব জোরে বেল বাজাতেই ছবি প্রায় লাফ দিয়ে উঠে পড়ে। দরজা খুলতেই রেখা আর শ্রীলা প্রায় একসঙ্গে হাসতে হাসতে বলে, এতক্ষণ ধরে বেল বাজাচ্ছি, শুনতেই পাসনি?
ছবি হেসে বলে, সত্যি শুনতে পাইনি।
রেখা ড্রইংরুমে পা দিয়েই হাসতে হাসতে বলে, জেগে জেগে কি স্বামীকে স্বপ্ন দেখছিলি?
–এত বছর বিয়ের পর কি কেউ স্বামীকে স্বপ্ন দেখে?
শ্রীলা বলে, তবে কি প্রথম প্রেমের স্মৃতি রোমন্থন করছিলি?
ছবি হোহো করে হাসতে হাসতে বলে, ঠিক ধরেছিস!
প্রাইভেট প্রাকটিশ
ডেরাডুন শহরটাকে পিছনে রেখে এগিয়ে যান চাক্ৰাতার রাস্তা ধরে। ধীরে ধীরে মানুষের ভিড় পাতলা হয়ে আসবে আর দূরের মুসৌরী পাহাড়টা আরো স্পষ্ট মনে হবে। ঐ যে কি একটা সিনেমা হলের কাছাকাছি কংক্রীটের ছোট্ট পুলটা পার হলেই ডেরাড়ুন শহরটাকে আর দেখা যাবে না।
আরো এগিয়ে যান। বেশি না, দুএক মাইল এগিয়ে গেলেই দূরের ফরেস্ট অনেকটা কাছে এগিয়ে আসবে। তারপর ছোটোখাটো দুটোএকটা কলকারখানা পড়বে। দাঁড়াবেন না। আরো একটু এগিয়ে যান। এই মাইলখানেক আর কি! ফাঁকা চাক্ৰাতা রোডের ওপর ছোটোখাটো দুচারটে দোকান চোখে পড়বে। চাপানবিড়িসিগারেটের দোকান। একটা দোকান থেকে বিবিধ ভারতীয় পচা হিন্দি গান আপনার কানে আসবে। কিছু লোককে আড্ডা দিতে দেখবেন। তবুও দাঁড়াবেন না।
এ বল্লুপুর পিছনে ফেলে সামান্য কয়েক পা এগিয়ে গেলেই এফআরআই ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক নম্বর গেট। খাকি উর্দি পরা রামবাহাদুরকে পাহারা দিতে দেখবেন। যদি প্রাইভেট গাড়ি করে যান, থামতে হবে না। আর যদি ট্যাক্সি বা অটো রিকশা করে যান, একটু থামুন। রামবাহাদুর একটা হলদে রঙের ছেঁড়া খাতা আর দেড় ইঞ্চি লম্বা একটা পেন্সিল এগিয়ে দেবে। ঐ খাতায় ট্যাক্সি বা অটোরিকশার নম্বর লিখে একটা দস্তখত দিন।
বল্লুপুরের এই গেট থেকে প্রায় মাইলখানেক দূরে এফআরআইএর কেন্দ্রবিন্দু। কলকাতায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের পিছনের ছোট্ট রাস্তাটাকে লাভার্স লেন বলে না? পদ্মপুকুরের ওদিকেও একটা ছোট্ট রাস্তার নাম লাভলক প্লেস। আসলে এফআর আইএর এই রাস্তাটাই প্রেমিক-প্রেমিকাদের উদ্দেশ্যেই নিবেদিত হওয়া উচিত ছিল। সত্যি কি সুন্দর এই রাস্তাটা! দুপাশে এফ-আর-আই এর নিজস্ব রিজার্ভ ফরেস্ট। ঐ ফরেস্টের মাঝখান দিযে পিচের রাস্তাটা লজ্জায় এঁকে বেঁকে পালিয়ে গেছে সেন্ট্রাল বিল্ডিংএর ওদিকে।
দুপাশে অত সুন্দর ফরেস্ট যে শুধু কিছু কোকিল ছাড়া আর কেউ থাকতে পারে না। হ্যাঁ, আর আছে কিছু বৌ কথা কও পাখি! এফআরআইএর এই ছোট্ট নিজস্ব শহর নিউ ফরেস্টে যারা বেশিদিন থাকেন, তাঁরা সাইকেল, মোটর, ট্যাক্সি বা অটো রিকশা করেই এই রাস্তা দিয়ে চলে যান। এই বিজননির্জন বনানীর আকর্ষণ তাদের নেই। কোকিলের ডাক বা বৌ কথা কও তাদের কানে যায় কিন্তু প্রাণে দোলা দেয় না।
কিন্তু নতুন যারা আসেন তারা বল্লুপুরের গেটে এসে ট্যাক্সি বা অটোরিকশা থেকে নেমে পড়েন। এই বনবীথিকা দিয়ে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে যান নিউফরেস্টের ঐ বাংলোগুলোর দিকে।
নিউ ফরেস্টের অফিসারের দল সপরিবারে এই রিজার্ভড় বেস্টে আসেন মাঝে মাঝে। বছরে দুতিনবার। তবে কোকিলের ডাক শুনতে নয়, পিকনিক করতে। মধু গন্ধে ভরা মৃদু মিছায়া নীপকুঞ্জে তলে বসে বসে লুচিআলুর দমচিকেনকারি আর চাটনি খাওয়া হয়। ফরেস্ট এদের কাছে মনের খোরাক নয়, ল্যাবরেটারির উপাদান মাত্র।
