এ প্রশ্নের জবাব কেউই দেয়নি। দুজনেই শুধু একটু হেসেছিল।
-তোমার বরের সঙ্গে আলাপ হলো। অমিত ওর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে।
-তাই নাকি?
-হ্যাঁ।
কেমন লাগল।
অমিত একটু হেসে বলল, তোমার মত সুন্দরী ও শিক্ষিত মেয়ের উপযুক্তই বটে।
ছবি প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলে, আমি এখন দিল্লী থাকি, তা জানো?
-জানি।
–একবার এসো না!
–সত্যি আসব?
তবে কি ঠাট্টা বলছি?
–কোন অসুবিধে হবে না?
–বিন্দুমাত্র না, বরং অত্যন্ত খুশি হব।
অমিত একটু মুচকি হেসে প্রশ্ন করল, সত্যি খুশি হবে?
–একশ বার খুশি হবো। ছবি একটু হেসে বলে তোমার মত আমিও মিথ্যে কথা বলি না।
জানি।
একে বিয়েবাড়ি, তার উপর সিঁড়িতে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলছে। পাশ দিয়ে লোকজনের যাতায়াতের বিরাম নেই। তবু এরই মধ্যে একটু সুযোগ বুঝে ছবি বলে, তুমি ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করেছ জেনে খুব খুশি হয়েছি।
অমিত একটু হেসে বলে, কী করব বলো? ঐ লিচুতলায় বসে বা আমগাছের দোলনায় দোল খেতে খেতে এমন একজনকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে কিছুতেই পড়াশুনায় ফাঁকি দিতে পারি না।
কথাটা শুনেই ছবি মুখ নিচু করে। কৃতজ্ঞতায় ওর সারা মন ভরে যায়। নাকি গর্ব হয়? ঠিক বুঝতে পারে না। তবে এ কথাও মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে, এ সংসারে ভালবাসার আদুরে গোলাপ-চারা সব মানুষের মনেই জন্ম নেয় কিন্তু সংসারের শত নির্মমতার মধ্যেও পুরুষ তাকে মন-প্রাণের সাং-জল দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে। রাখবেই। আর মেয়েরা? নতুন জীবনের উন্মাদনার ঘোরে সে প্রথম জীবনের ঐ ভালবাসার গোলাপ-চার কথা ভুলে যায়। মুছে ফেলে সে স্মৃতি।
ছবি মনে মনে একটু অস্বস্তিবোধ করলেও নিজেকে সামলে নেয়। ওর দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলে, ফাঁকি দিলেই হলো? বকুনি খাবার ভয় নেই বুঝি?
অমিত হাসতে হাসতে উপরে উঠে যায়।
ছবি ভাঁটার টানে ভাসতে ভাসতে নিজেকে যেন হারিয়ে ফেলে। কিছু টুকরো টুকরো স্মৃতি, কিছু কথা, কিছু হাসি বার বার মনে পড়ে। কিন্তু তিল দিয়েই তাল, খণ্ড দিয়েই তো অখণ্ড। সব মিলিয়ে একটা সুন্দর ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
ঐ বিয়েবাড়িতে দেখা হবার বহুকাল পর মাদ্রাজে আবার ওদের দেখা হয়। শিশির অফিসের কাজেই গিয়েছিল। মাদ্রাজ দেখেনি বলে ছবিও ওর সঙ্গে গিয়েছিল। ভেবেছিল অমিতকে আগেই চিঠি লিখে জানাবে কিন্তু তা আর শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি। ওখানে গিয়েই শিশির ফোন করল-মে আই টক টু প্রফেসর ডক্টর ব্যানার্জী?
জাষ্ট এ মিনিট স্যার।
কয়েক মুহূর্ত পরই ওর প্রাইভেট সেক্রেটারি বললেন, স্পীক অন স্যার।
-অমিতাভ ব্যানার্জী!
–আমি শিশির। ছবি আর আমি কাল রাত্রে এসেছি।
অমিত হাসতে হাসতেই বলে, রিয়েলি?
তবে কি আমি দিল্লী থেকে ফোন করছি?
-না, না, তা বলছি না। অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্যের ধাক্কা সামলাতে একটু কষ্ট হয় তো! এবার অমিত এক নিঃশ্বাসে অনেক কথা জিজ্ঞেস করে, কোথায় উঠেছেন, কদিন থাকবেন, এখানে কাজে বেড়াতে এসেছেন, ছেলেমেয়েকে এনেছেন কিনা, আরো কত কি!
শিশির একটু হেসে বলে, সবার আগে তোমার সৌভাগ্যের ধাক্কা সামলাবার জবাব দিই।
হ্যাঁ, দিন।
-তুমি তো ভাই জীবনে বহু সৌভাগ্য লাভ করেছ; সুতরাং তোমার তো এই সামান্য খবরে–
ওকে পুরো কথাটা শেষ করতে না দিয়েই অমিত বলল, বিলেত আমেরিকার ইউনিভার্সিটি থেকে দুএকটা ডক্টরেট পাওয়া কোন ব্যাপারই না। ও বহুজনে পায় কিন্তু
-তা তো বটেই!
–কিন্তু এই মাদ্রাজ শহরে হঠাৎ আপনাদের দুজনকে পাওয়া সত্যি সৌভাগ্যের ব্যাপার!
যাই হোক, শিশির এবার বলে, আমি অফিসের কাজেই এসেছি। থাকব শুক্রবার পর্যন্ত। তবে ছবি মাদ্রাজ দেখেনি বলে প্রায় জোর করেই এলো।
জোর করে এলো মানে?
–আমি তো কনফারেন্স নিয়েই ব্যস্ত থাকব। তাই ওকে বলেছিলাম, আমি তো তোমাকে নিয়ে বেড়াবার সময় পাব না।
-তারপর?
–ছবি বলল, অমিত তো আছে। দরকার হলে ওকে দুদিন ছুটি নিতে বলব।
অমিত বলল, দ্যাটস নো প্রবলেম কিন্তু আপনি কনফারেন্স শেষ করেই পালাতে পারবেন না।
-কিন্তু..
-আই টেল ইউ শিশিরদা, কোন কিন্তু বিজনেস চলবে না।
-আচ্ছা সে দেখা যাবে। ইন এনি কেস, ইউ রিং আপ কনিমারা রুম নাম্বার ফোর-ফোর-টু। আই উইল ট্রাই টু সী ইউ লেট ইভনিং।
শিশির বেরুবার সময় বলে গেল, অফিসে গিয়েই অমিতের সঙ্গে যোগাযোগ করে হোটেলে ফোন করতে বলবে। এতক্ষণ ফোন না আসায় ছবি যেন একটু আশাহত হয়। একটু অবাকও হয়। শিশির কি অমিতকে পায়নি? ও আবার বিলেত আমেরিকায় কোন বক্তৃতা দিতে গিয়েছে নাকি? অথবা
মন ঠিক বিশ্বাস করতে চায় না কিন্তু তবু একবার মুহূর্তের জন্য ভয় হয়, অমিত বদলে যায়নি তো? জীবনে এত উন্নতি করার পরও সেই লিচুতলার স্মৃতি ..
দরজার ওপাশ থেকে বোধহয় রুম-বেয়ারা বেল বাজাল। ছবি একটু বিরক্ত হয়েই বলল, কাম ইন।
দরজা খুলে অমিতকে ঘরে ঢুকতে দেখেই ছবি যেন ভূত দেখার মত অবাক হয়ে বলে, তুমি!
অমিত দরজা বন্ধ করে ঘরের মধ্যে দুএক পা এগিয়েই বলল, তুমি কি ভেবেছিলে? রুম-বেয়ারা নাকি…।
-সত্যি তাই ভেবেছিলাম। আনন্দে খুশিতে ছবির সারা মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বলে, আমি তো স্বপ্নেও ভাবিনি তুমি এভাবে এখুনি এসে হাজির হবে, বরং
অমিত বড় সোফার একপাশে বসতে বসতে বলে, বরং কি?
ছবি ঐ সোফারই অন্য দিকে ওর মুখোমুখি বসে বলে, সত্যি ভয় হচ্ছিল, হয়ত তুমি বদলে গেছ, হয়ত পুরনো দিনের কোন কিছুই এখন মনে করতে চাও না বা ..
