-আমার বুঝি দিতে ইচ্ছে করে না?
তাই বলে এত ভাল পেন দিবি?
ছবি স্পষ্ট জবাব দেয়, আমার অনেক টাকা থাকলে আরো অনেক দামী পেন দিতাম।
হঠাৎ দুর্গাদি ঘরে ঢুকেই চিৎকার করে বলল, কিগো বৌদি, তুমি কি বাথরুমে যাবে না? নাকি খাওয়া-দাওয়া করবে না?
ছবি বিভোর হয়ে যে স্বপ্নরাজ্যে বিচরণ করছিল, সেখান থেকে বাধ্য হয়ে মাটির পৃথিবীতে নামতেই হয়। বলে, হ্যাঁ, এখনি উঠছি।
প্রায় সবকিছু আগের মতই লকারের মধ্যে ভরে দেয়, শুধু অমিতের ফটোটা ব্যাঙ্কের পাস বইয়ের মধ্যে আলাদা করে রাখে। এবার ছবি তাড়াতাড়ি আলমারি বন্ধ করে বাথরুমে ঢোকে।
খেয়ে-দেয়ে একটু বিশ্রাম নিতে নিতেও ছবি শুধু অমিতের কথা ভাবে। না ভেবে পারে না। অন্য কিছু ভাবতে মন চাইছে না।
.
ভাগলপুর থেকে চলে আসার আগের দুচারটে দিনের কথা ভাবতে গেলে এখনো ছবির চোখে জল এসে যায়। ত্রিদিববাবু ওর মাথায় হাত দিতে দিতে বললেন, তোর বাবা যখন কলকাতায় ভাল চান্স পেয়েছে, তখন তোক তো যেতেই হবে। তাছাড়া তুইও ওখানে গিয়ে ব্ৰেবোর্ন বা বেথুনে পড়তে পারবি কিন্তু তোকে ছাড়তে ঠিক মন চায় না।
ছবি পাথরের মত মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। পাশেই অমিত দাঁড়িয়ে।
উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বুঝলি ছবিয়া, তুই যদি একটু ছোট হতিস বা অমি যদি একটু বড় হতো, তাহলে বড় ভাল হতো।
ছবি আর পারে না। দুচোখ জলে ভরে যায়। কয়েক মুহূর্ত কারুর মুখ দিয়ে কোন কথা বেরোয় না। তারপর হঠাৎ ছবি পাগলের মত এক দৌড়ে লিচুতলায় গিয়ে ধপাস করে বসে পড়ে দুহাঁটুর উপর মাথা রেখে চোখের জল ফেলে।
একটু পরেই অমিত এসে ওর মাথায় হাত দিতে দিতে বলে, এই ছবি, কাঁদছিস কেন? দুবছর পর আমিও তো কলকাতার কলেজে পড়ব। তাছাড়া এর মধ্যে তুইও এখানে আসবি, আমিও ছুটিতে তোর কাছে যাব।
ছবি কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে মুখ তুলে বলে, সত্যি তুই আসবি?
নিশ্চয়ই আসব।
–ঠিক বলছিস ত?
-আমি কি কোনদিন তোকে মিথ্যে কথা বলেছি?
ছবি মাথা নেড়ে বলে, না।
তবে?
–তুই পুরো ছুটিটা আমাদের কাছে থাকবি তো?
–পড়াশুনার ক্ষতি না হলে নিশ্চয়ই থাকব। অমিত জোর করেই নিজের মুখে একটু হাসি ফোটায়। বলে, একবার তুই আসবি, অনেকবার আমি যাব।
ছবি যা যা খেতে ভালবাসে, ত্রিদিববাবু আজ বাজার থেকে সেই সবই এনেছেন। স্ত্রীকে বলেছেন, খুব ভাল করে রান্না করবে। আমার ছবিয়াকে আবার কবে খাওয়াতে পারব তার তো ঠিক নেই।
বৃদ্ধা একটু মুচকি হেসে বললেন, তুমি এমন একটা ভাব দেখাচ্ছ যেন ছবিকে শুধু তুমিই ভালবাস, আর কেউ ভালবাসে না।
-না, না, তা ভাবব কেন?
সেদিন রাত্রে এই বুড়ো-বুড়ীর পাল্লায় পড়ে কত কি ও কত বেশি খেতে হলো। তারপর কতক্ষণ ধরে সবাই মিলে গল্প হলো। দুতিনবার হাই তোলার পরই ত্রিদিববাবু বললেন, ছবিয়া, বড্ড ঘুম পেয়েছে, শুতে যাচ্ছি। আবার কাল গল্প হবে।
একটু পরে ওঁর স্ত্রী বললেন, আমারও বড্ড ঘুম পেয়েছে। তোরাও আর দেরি করিস না।
অমিত বলল, তুমি শোও। আমরাও একটু পরে আসছি। হ্যাঁ, একটু পরে ওরাও শুতে আসে। সেই আগের মতই বড় খাটে তিনজনের বিছানা। আগের মতই অমিত আর ছবি পাশাপাশি মুখোমুখি শুয়ে গল্প করে কিন্তু এখন আর আগের মত দুজনে দুজনকে জড়িয়ে শোয় না। বোধহয় দুজনেরই লজ্জা করে। হাজার হোক, ছবির ত বসন্ত জাগ্রত দ্বারে। অমিতেরও গোঁফের রেখা বেরিয়েছে, হাফপ্যান্ট পরা বছর দুই আগেই ছেড়ে দিয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনই মানুষের পায়ে অনুশাসনের শিকল পরিয়ে দেয়।
অনেক কথার পর ছবি জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা অমিত, তুই আমাকে ভুলে যাবি না?
কোনদিন না।
–যখন খুব বড় ইঞ্জিনিয়ার হবি, তখনও ভুলবি না?
–না।
ছবি একটু থেমে জিজ্ঞেস করে, যখন তোর বিয়ে হবে, খুব সুন্দর বউ আসবে, তখনও ভুলবি না?
অমিত স্পষ্ট জবাব দেয়, না।
একটু থেমে ও প্রশ্ন করে, তুই কি বর পেয়ে আমাকে ভুলে যাবি?
মেয়েরা অত সহজে কোন কিছুই ভোলে না।
কথায় কথায় রাত গড়িয়ে যায় তারপর এক সময় দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ে।
ভোরবেলায় ছবির ঘুম ভেঙে যায়। অমিত ওর গায়ের উপর একটা পা তুলে আর হাত বুকের উপর দিয়ে অঘোরে ঘুমুচ্ছে। হঠাৎ যেন ছবি লজ্জায় দ্বিধায় কুকড়ে যায়। না, দিদিও ঘুমুচ্ছেন। লজ্জা কেটে যায় কিন্তু শিহরণ অনুভব করে সারা শরীরে, মনে। ছবি অমিতকে দেখে, প্রাণভরে দেখে, মুগ্ধ হয়ে দেখে। কী একটা চাপা ইচ্ছা আত্মপ্রকাশ করার আপ্রাণ চেষ্টা করে কিন্তু অজানা অজ্ঞাত অনুশাসনের জন্য সে ইচ্ছা পূর্ণ হয় না। পারে না। সঙ্কোচ হয়। একটু যেন ভয় ভয় করে। ছবি ওর বুকের উপর থেকে অমিতের হাত সরিয়ে দিতে গিয়েও সরিয়ে দেয় না। পারে না। মায়া হয়। নাকি এক অনাস্বাদিত আনন্দের স্বাদ পেয়ে ওর বসন্তোৎসবের উদ্বোধন হয়?
এত বছর স্বামীর উষ্ণ সান্নিধ্য উপভোগের পর আজ সেই ফেলে আসা দিনের এক টুকরো স্মৃতির কথা মনে করে ছবি যেন লজ্জায় লাল হয়ে যায়। কিন্তু অমিত? ও কি সেই আনন্দ-স্মৃতির কথা জানে?
ছবির বিয়েতে অমিত আসতে পারেনি। বছর দুয়েক পর এক আত্মীয়ার বিয়েতে হঠাৎ দুজনের দেখা। তাও সিড়িতে ওঠা-নামার সময়। দুজনেই থমকে দাঁড়ায়। দুজনেই দুজনকে বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখে বেশ কিছুক্ষণ। তারপর দুজনেই হঠাৎ একসঙ্গে হাসে। দুজনেই বোধহয় একসঙ্গে প্রশ্ন করেছিল, কেমন আছ?
