ছবি চোখ খুলেই হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করে, কোথায় পেলি রে?
অমিত নিজের মুখের মধ্যে একটা টফি দিয়ে বলে, পরশু এক বন্ধু দিয়েছিল।
ছবি অবাক হয়ে বলে, পরশু দিয়েছিল?
-হ্যাঁ।
পরশু দিয়েছিল আর আজ খাচ্ছিস?
-তোকে না দিয়ে আমি কিছু খাই?
ছবি অমিতকে দুহাত দিয়ে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বলে, তুই আমাকে খুব ভালবাসিস, তাই না?
অমিত মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ। এবার ও প্রশ্ন করে, তুই আমাকে ভালবাসিস?
ছবি ওকে খুব জোরে বুকের মধ্যে চেপে ধরে বলে, হ্যাঁ, আমিও তোকে খুব ভালবাসি।
কত দিন আগেকার কথা কিন্তু সবকিছু দিনের আলোর মত স্পষ্ট মনের পর্দায় ভেসে উঠছে ছবির। কোন কিছু ভোলেনি। ভুলতে পারে না। অসম্ভব।
ছবি অমিতের ফটোটা তখনও হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে হঠাৎ একটু হাসে।
–তুই কি বড় হয়েছিস যে শাড়ি পরতে শুরু করলি?
ছবি বলে, আমাদের স্কুলের নিয়ম ক্লাস সেভেন থেকে শাড়ি পরতে হবে।
ও একবার অমিতের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলে, তাছাড়া আমি বুঝি বড় হচ্ছি না?
দশ বছরের অমিত একটু চিন্তা ভাবনা করে বলে, স্কুলে না হয় শাড়ি পরে গিয়েছিস কিন্তু এখন শাড়ি পরে শুয়েছিস কেন?
-কাল তো আমি এই শাড়ি পরে স্কুলে যাব না। ছবি ওর মুখের পর একটা হাত রেখে বলে, তাছাড়া আমার শাড়ি পরতে ভালই লাগে।
অমিত একটু হেসে বলে, তুই শাড়ি পরলে খুব সুন্দর দেখতে লাগে।
–সত্যি বলছিস?
-এই তোকে ছুঁয়ে বলছি। অমিত ওর বুকে একবার হাত দিয়েই বলে।
এত বছর পর সেসব রাত্রির কথা ভাবতে গিয়েও যেন ছবি একটু লজ্জা পায়। পাবেই তো! এখন যে এ দেহে কামনা-বাসনা-লালসা পাকাপাকি আসন বিছিয়ে বসেছে কিন্তু তখন কিশোরী মন-এ তো ওরা ঠাঁই পায়নি। আগের মতই ছবি ওকে জড়িয়ে শুয়ে থাকে, মনের কথা বলে, শোনে।
-আচ্ছা অমিত, তুই বড় হয়ে কী হবি?
-আমি ইঞ্জিনিয়ার হবো।
তোর ডাক্তার হতে ইচ্ছে করে না?
-না।
-কেন?
–হাসপাতালের চাইতে কলকারখানা ল্যাবরেটরি আমার অনেক ভাল লাগে।
ছবি ওর মাথায়, কপালে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, তুই খুব বড় ইঞ্জিনিয়ার হবি, বুঝলি?
-আমি বড় ইঞ্জিনিয়ার হলে তোর ভাল লাগবে?
-হ্যাঁ, খুব ভাল লাগবে।
অমিত একটু ভেবে প্রশ্ন করে, তখনও তুই আমার কাছে শুয়ে শুয়ে এই রকম গল্প করবি?
–দূর বোকা! তখন তো আমার বিয়ে হয়ে যাবে।
-তখন তুই বরের কাছে শুবি?
-হ্যাঁ।
-রোজ বরের কাছে শুবি? একদিনও আমার কাছে শুবি না?
–বিয়ের পর বর আমাকে তোর কাছে শুতে দেবে কেন?
–তোর বর বুঝি রাগী লোক হবে?
ছবি ঠোঁট উল্টে বলে, ভগবান জানেন! একটু পরই ও বলে, ততদিন তো তোরও বিয়ে হবে।
-সত্যি?
বড় হলে তো সবারই বিয়ে হয়।
–আমার বউ আমার কাছে শোবে?
তোর কাছেই তো শোবে। অমিত আবার একটু ভাবে। তারপর বলে, তোর মত গলা জড়িয়ে শোবে?
-তুই বললেই শোবে।
–আমি কি তোকে গলা জড়িয়ে শুতে বলি?
–আমার ভাল লাগে বলেই আমি তোকে জড়িয়ে শুই। কেন, তোর কি ভাল লাগে না?
-তোকে জড়িয়ে শুতে আমারও ভাল লাগে।
গ্রীষ্ম-বর্ষা শরৎ-হেমন্ত শীত-বসন্তর চাকা ঘুরে চলে। অমিতের শৈশব বিদায় নেয়, শূন্য আসন পূর্ণ করে কৈশোরের ক্ষুদে রাজা। ছবিও এগিয়ে চলে। বসন্তরাজ যৌবন-এর আগমনী বার্তা অস্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছে। তা হোক। দুটি মন, দুটি আত্মা সেই একই সুরে বাঁধা থাকে।
এই ছবি, ছবি! টিফিনের সময় দূর থেকে চিৎকার করে শ্রীলা ডাকে।
ছবি ঘুরে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে শ্রীলাকে দেখে ওর কাছে যায়। জিজ্ঞেস করে, ডাকছিস কেন?
–অমিত কতক্ষণ গেটের কাছে তোর জন্য দাঁড়িয়ে আছে।
তাই নাকি?
-হ্যাঁ।
ছবি তাড়াতাড়ি মেন গেটের কাছে গিয়ে দেখে সাইকেলে হেলান দিয়ে অমিত দাঁড়িয়ে আছে। ওকে দেখেই অমিত বলল, তোকে ডেকে দেবার জন্য কতজনকে বলেছি।
তুই অনেকক্ষণ এসেছিস?
টিফিনের ঘণ্টা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি সাইকেলে চেপেছি।
–ইস্! তোকে কত কষ্ট দিলাম!
অমিত একটা ক্যাডবেরি চকোলেট ওর হাতে দিয়ে বলল, এই নে। আমি চলি।
ছবি একটু এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে খুব চাপা গলায় বলে, তুই খুব ভাল ছেলে!
অমিত ওর দিকে তাকিয়ে একটু হাসে। ও আর দেরি করে না। সাইকেলে উঠেই খুব জোরে প্যাডেল করে।
ছবি বিমুগ্ধ মনে ঐখানেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অমিতকে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখে।
অমিতের সি-এম-এস স্কুল থেকে ছবির মোক্ষদা স্কুল বেশ খানিকটা দূরে। ওটা আদমপুরে, এটা মসাকচকে। তবু ভাল-মন্দ কিছু পেলেই অমিত টিফিনের সময় ছুটে আসে। বরাবর। ছবিরও মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে টিফিনের সময় ওকে কিছু দিতে কিন্তু যাবে কি করে? টিফিনের সময় তো বেরুবার নিয়ম নেই। নিয়ম থাকলেও যেতে পারত না। ও তো সাইকেল চালাতে জানে না! হেঁটে সি-এম-এস স্কুল যাতায়াত করতে না করতেই তো টিফিনের ঘণ্টা পড়ে যাবে। তবে টিফিনের সময় স্কুলে গিয়ে কিছু দিতে না পারলেও ছবি মাঝে মাঝে ওকে কিছু না দিয়ে পারে না। দিতে ইচ্ছে করে; দিলে ভাল লাগে।
-এই অমিত, একটু লিচুতলায় চল।
-কেন রে?
-চল না! একটু দরকার আছে।
ছবির পিছন পিছন অমিত লিচুগাছের পাশে গিয়েই বলে, বল, কি দরকার?
ছবি আঁচলের আড়াল থেকে একটা সরু লম্বা প্যাকেট বের করে ওকে দিয়ে বলল, এই নে।
–এটা কী?
–খুলেই দ্যাখ।
অমিত খুলে দেখে একটা ফাউন্টেন পেন। ও একটু অবাক হয়েই বলে, হঠাৎ ফাউন্টেন পেন দিচ্ছিস কেন?
