ছবির বাবা মাঝে মাঝে স্ত্রীকে ঠাট্টা করে বলতেন, তুমি তো কাকিমার প্রাইভেট সেক্রেটারি হয়ে গেছ।
কি করব বল? উনি এত স্নেহ করেন যে ওঁকে না বলতে পারি না। একটু থেমে বলেন, তাছাড়া বাড়িতে বসে বসেই বা করব কী? কাকিমার সঙ্গে পাঁচটা কাজে বেশ সময়টা কেটে যায়।
–ছবিকে দেখছি না তো?
–এই তো ঘণ্টাখানেক আগে কাকাবাবু কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে ওকে নিয়ে গেলেন। আর যাবার সময় বললেন, বৌমা, ছবিয়াকে একেবারে সোমবার স্কুলে পৌঁছে দেব।
ছবির বাবা একটু হেসে বলেন, কাকাবাবু ছবিকে একদিন না দেখে থাকতে পারেন না। উনি একটু থেমে বলেন, কাকাবাবুর কাছে থাকলে ছবি অনেক কিছু শিখতে পারবে। তাছাড়া বেচারী এখানে একলা একলা কী করবে? ওখানে তবু অমিতের সঙ্গে খেলাধুলা করতে পারে।
–তা তো বটেই!
ছবি অমিতের ঐ ফটোটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবে, খঞ্জনপুরে ওদের ঐ বাড়িতে কী আনন্দেই দিনগুলো কাটত। পিছনের বাগানের ঐ লিচুতলায় দুজনে পাশাপাশি বসে গল্প করা, আমগাছের ডালে দোলনা ঝুলিয়ে দোল খাওয়া, দুজনে একসঙ্গে কবিতা আবৃত্তি করা, সন্ধ্যের পর লাইব্রেরি ঘরে বসে পড়াশুনা করা, দুজনে এক রিকশায় চেপে স্কুলে যাওয়া-আসা, আরো কত কি!
বড় ঘরের ঐ বিরাট খাটের একধারে শুতেন দিদি-ত্রিদিববাবুর স্ত্রী আর অন্য ধারে শুভ ছবি; মাঝখানে অমিত। দিদি শোবার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ঘুমে অচৈতন্য হয়ে পড়লেও ওদের দুজনের চোখে ঘুম আসত না। দুজনে গলা জড়াজড়ি করে কত কথা, কত গল্প।
–আচ্ছা ছবি, তুই কাঠবেড়ালী ধরতে পারবি?
–কেন? তুই পুষবি?
–হ্যাঁ।
ছবি সঙ্গে সঙ্গে বলে, ঠিক আছে, একটা কাঠবেড়ালী ধরে দেব। এই কথা বলেই ও প্রশ্ন করে, কিন্তু কাঠবেড়ালীকে কি খেতে দিবি?
সাত বছরের শিশু অমিত বলে, ভাত, ডাল, তরকারি, মাছ, মাংস…
নবছরের পাকা গিন্নী ছবি বলে, তুই একেবারেই বাচ্চা! কিছু জানিস না। ওরা তো রামচন্দ্রের ভক্ত। মাছ-মাংস খায় না।
-ভাত, ডাল, তরকারি তো খাবে?
ছবি স্পষ্ট জবাব দেয়, না, ওরা শুধু দুধ আর ফল খায়।
-আমিও দুধ ফল খেতে দেব।
-তাহলে ঠিক আছে। কয়েক মুহূর্ত দুজনেই চুপ করে থাকে। তারপর ছবি ওকে জিজ্ঞেস করে, কাঠবেড়ালীকে কোথায় শুতে দিবি?
–আমাদের দুজনের মাঝখানে ওকে শুতে দেব।
-না, না, আমরা দুজনে এইভাবেই শোব। কাঠবেড়ালীকে একটা নতুন বিছানা করে দেব।
-ও একলা একলা শুতে ভয় পাবে না?
–ভয় পাবে কেন? ওরা তো বনের মধ্যে একলা একলাই থাকে।
একটু ভেবে অমিত জিজ্ঞেস করে, কাঠবেড়ালীদের বাবা-মা থাকে?
-কেন থাকবে না?
-ওরা কোথায় থাকে?
-ওরাও আলাদা আলাদা থাকে।
ঐ কাঠবেড়ালী নিয়ে কথা বলতে বলতেই রাত গম্ভীর হয়। পিছনের বাগানে কি একটা পাখি বিকট চিৎকার করতেই অমিত ভয়ে ছবিকে আঁকড়ে ধরে। ছবিও ওকে আরো কাছে টেনে নেয়। বলে, ভয় কী? আমি তো আছি!
এইভাবেই দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কাটে। বছরও পার হয়। নতুন ক্যালেণ্ডার আবার পুরনো হয়।
সাতসকালে ত্রিদিববাবু সামনের দরজার কড়া নাড়তে নাড়তে হাঁক দেন, ছবিয়া, এই ছবিয়া!
শুধু ছবি না, ওর বাবা-মাও তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসেন। ..
কী ব্যাপার কাকাবাবু, এই ভোরবেলায় ছবির খোঁজে এসেছেন? স্বামী-স্ত্রী প্রায় একই সঙ্গে জানতে চান।
ত্রিদিববাবু ঘরের মধ্যে পা দিয়েই হাসতে হাসতে বলেন, ছবিয়াকে আমার হাজার কাজে দরকার। এবার উনি ছবিকে কাছে টেনে নিয়ে বলেন, দ্যাখ ছবিয়া, সাহিত্য পরিষদের বাৎসরিক উৎসবে তোকে রবি ঠাকুরের পৃথিবী কবিতাটা আবৃত্তি করতে হবে।
ছবি একটু হেসে বলে, ওটা খুব বড় কবিতা, তাই না দাদু?
-কবিতাটা বড় ঠিকই কিন্তু তুই তো বড় হয়েছিস। ত্রিদিববাবু ওর মাথায় একটা ঝাঁকুনি দিয়ে হাসতে হাসতে বলেন, এখন তুই আর কচি খুকী না, ক্লাস সিক্স-এ পড়িস। আরো কত বড় বড় কবিতা তোকে আবৃত্তি করতে হবে।
ছবি শুধু হাসে। কোন কথা বলে না।
ত্রিদিববাবুই আবার বলেন, বুঝলি ছবিয়া, রবি ঠাকুর তো শুধু কবি ছিলেন না, তিনি বৈজ্ঞানিক ছিলেন, ঐতিহাসিক ছিলেন, দার্শনিক ছিলেন। উনি একটু থেমে হঠাৎ গলা চড়িয়ে বলেন, রবীন্দ্রনাথ সবকিছু ছিলেন। এই পৃথিবী কবিতাটা ভাল করে বুঝলে লক্ষ কোটি বছরের ইতিহাস জানাও হবে, বিজ্ঞান জানাও হবে।
চা-টা খেতে খেতে ছবির বাবা-মার সঙ্গে টুকটাক কথাবার্তা বলার পর বিদায় নেবার আগে ত্রিদিববাবু বলেন, ছবিয়া আজ স্কুল থেকে সোজা আমাদের ওখানে চলে যাবে আর কয়েক দিন ওখান থেকেই স্কুলে যাতায়াত করবে।
পড়াশুনা খেলাধুলার মাঝখানে একটু একটু করে পৃথিবী কবিতা আবৃত্তি ও সঙ্গে সঙ্গে মুখস্থ করার কাজ এগিয়ে চলে। ছবি হঠাৎ প্রশ্ন করে, আচ্ছা দাদু, অমিত কোন কবিতা আবৃত্তি করবে না?
ত্রিদিববাবু মাথা নেড়ে বলেন, অমির দ্বারা এসব হবে না। এখনও খুবই ছোট, তবু মনে হয়, ও অঙ্কে ভাল হবে।
–কিন্তু অনেক কবিতা তো ও মুখস্থ বলে।
-তা বলে কিন্তু কবিতা-টবিতার চাইতে অঙ্ক করেই ও বেশি আনন্দ পায় বলে মনে হয়।
স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই অমিত ডাক দেয়, এই ছবি, শোন।
ছবি এগিয়ে এসে বলে, কী বলছিস?
–আগে চোখ বন্ধ কর।
চোখ বন্ধ করব কেন?
দরকার আছে।
ছবি চোখ বন্ধ করতেই অমিত বলে, হা কর।
ছবি কোন প্রশ্ন না করেই হাঁ করে। এবার অমিত ওর মুখের মধ্যে একটা টফি দিয়েই বলে, কেমন? ভাল না?
