হাসিমুখে গিয়ে শিশির ওকে জিজ্ঞেস করেছিল, শুনছিলাম তোমার নাকি বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল না।
–বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল না, তা ঠিক নয়। ভেবেছিলাম, আরো পড়াশুনা করব, গান শিখব। তারপর বিয়ে করব।
-এখন কী মনে হচ্ছে?
–ঠিক কী জানতে চাইছ?
শিশির বলে, এখন কি মনে হচ্ছে, বিয়ে হয়ে ভালই হয়েছে, নাকি বিয়ে না হলেই ভাল হতো?
ছবি মুগ্ধ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে শুধু হাসে। মুখে কিছু বলে না।
রাত্রে শোবার পর ছবি ওর কানে কানে ফিসফিস করে বলেছিল, তোমাকে দেখার পর সত্যি মত বদলে গেল। মনে হলো, বাবা-মা আমার বিয়ে দিয়ে ঠিক কাজই করেছেন।
ফটোগুলো দেখা শেষ হলে ছবি আঁচল দিয়ে অ্যালবামটা পরিষ্কার করে আলমারিতে তুলে রাখে। এবার ছবির হঠাৎ খেয়াল হয়, বেলা হয়ে যাচ্ছে। তাই আর সময় নষ্ট না করে দুটো তাক পরিষ্কার করে কাপড়চোপড় সুন্দর করে গুছিয়ে রাখে। কতজনের কত পুরনো চিঠি হাতে পড়ে কিন্তু ওগুলো পড়তে গেলে সারাদিন কেটে যাবে ভেবে আর খুলে দেখে না। শুধু গুছিয়ে-গাছিয়ে এক তাকের কোণায় রেখে দেয়।
দুর্গাদি চায়ের কাপ-ডিশ নিতে এসে বলে, বৌদি, তোমার একটা পুরনো সায়া আমার জন্য রেখে দিও।
-কেন? নতুন সায়া তো এই সেদিন কেনা হলো।
দুর্গাদি হেসে বলে, ও দুটো তুলে রেখেছি।
-তাই বল।
হাতের কাছেই দুতিনটে পুরনো সায়া ছিল। ছবি সেগুলো দুর্গাদিকে দিয়ে বলল, এই নাও।
লক্ষ্ণৌ চিকনের সায়া দেখে দুর্গাদি একটু হেসে বলে, এ সায়া পরলে লোকে ঠাট্টা করবে না তো?
ছবি একটু হেসে বলে, তুমি শাড়ির নিচে কি সায়া পরেছ, তা লোকে জানবে কী করে?
–তবুও..
দুর্গাদি কাপ-ডিশ আর সায়াগুলো নিয়ে চলে যায়।
হ্যাঙার থেকে ময়লা শাড়িগুলো কাঁচতে দেবার জন্য আলাদা করে রাখতে রাখতেই টেলিফোনের বেল বাজল। ছবি তাড়াতাড়ি গিয়ে রিসিভার তুলেই বলে, হ্যালো! কে-রেখা? শ্রীলা তোর ওখানে এসেছে? হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওকে নিয়ে বিকেলে আসিস। না, না, আমি কোথাও বেরুব না। যত তাড়াতাড়ি পারিস চলে আসিস। আমি? আমি কি করছি? তুই এলি না বলে আমি আলমারি গোছাতে বসেছি। কী বললি? স্বামী আমাকে প্রেমপত্র লিখেছে কিনা? ও জীবনে আমাকে চিঠি লিখেছে? বড়জোর একবার টেলিফোন করে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, ছেলের একটা পিকচার পোস্টকার্ড পেয়েছি। মেয়ের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়েছে। কবে ফিরবে? ভাশুরের কাছে গেলে মেয়ে আর ফিরতেই চায় না। না, না, আমি কিছু বলি না। তাছাড়া ঐ মেয়েকে নিয়ে বেড়াবেন বলে ভাশুরও তো ছুটি নিয়েছেন। আচ্ছা, ছাড়ছি। তাড়াতাড়ি আসিস।
বেশি বেলা হয়ে যাবার ভয়ে ছবি আর উপরের তাকে হাত দেয় না। ঠিক করে, শুধু লকার দুটো পরিষ্কার করেই স্নান করতে যাবে। ডান দিকের লকারটা গোছাতে বিশেষ সময় লাগল না। ওর মধ্যে সংসার খরচের টাকাকড়ি, ওর একটা গলার চেন, দুটো ঘড়ি আর টুকটাক কয়েকটা জিনিসপত্র ছিল। অন্য লকারে অসংখ্য পুরনো চিঠিপত্র, কিছু প্রেজেনটেশন পাওয়া জিনিসপত্র ছাড়াও আরো কত কি আজেবাজে জিনিস আছে। বাবা-মা, ভাইবোন ও আত্মীয়-স্বজনদের বেশ কিছু ফটোও আছে ওর মধ্যে। এই লকারটা পরিষ্কার করতে গিয়েই মুশকিল হলো। দশটা পুরনো চিঠি না পড়ে একটা বাজে কাগজ ফেলতে পারে না। একটা ফটো হাতে পড়লে আরো পাঁচটা ফটোর কথা মনে পড়ে। সেগুলো খুঁজতে গিয়ে আরো দশ-বিশটা ফটো দেখতে হয়। দেখতে ভালই লাগে। এইসব ফটো ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়েই ছবি অমিতের সঙ্গে ওর একটা ফটো দেখে আপনমনেই একটু খুশির হাসি হাসে। কত কথা, কত মিষ্টিমধুর স্মৃতি মনে আসে।…
সেদিন বিকেলে বাবা বাড়ি ফিরেই মাকে বললেন, হ্যাঁগো, ভাগলপুর টি. এন. জে. কলেজে ভাইস প্রিন্সিপ্যালের অফার এসেছে।
মা জিজ্ঞেস করলেন, অফার এসেছে মানে?
-আমার কলেজ জীবনের অধ্যাপক ত্রিদিববাবু তো এখন ওখানে প্রিন্সিপ্যাল। উনি খুব ধরেছেন…
বাবাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই মা বললেন, উনি ত আমার ছোট কাকার খুড়শ্বশুর হন। আমাকেও উনি খুব স্নেহ করেন।
–সব জানি। আমাকেও উনি এত ভালবাসেন যে ওঁকে না বলা মুশকিল।
মা বললেন, না বলবে কেন? ওখানে ভাইস-প্রিন্সিপ্যাল হয়ে কয়েক বছর কাটালে বরং তুমি কলকাতার কোন বড় কলেজে প্রিন্সিপ্যাল হতে পারবে।
-হ্যাঁ, তাও হতে পারে।
ব্যস! কয়েক মাস পরই ওরা পাটনা থেকে ভাগলপুর চলে গেলেন।
ছবির মনে আছে একদিন ওরা পাটনা ছেড়ে ভাগলপুর চলে গেল কিন্তু কেন গেল, তা জানা বা বুঝার বয়স ওর তখন হয়নি। একটু বড় হবার পর ও মার কাছে সব শোনে।
ত্রিদিববাবু যেমন পণ্ডিত তেমন স্নেহপ্রবণ মানুষ ছিলেন। ছবির বাবা-মা দুজনকেই উনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন। ত্রিদিববাবুর মেয়েরাই বড় এবং বহুদিন আগেই তাদের বিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র পুত্র নেহাতই শিশু। এমন কি ছবির চাইতেও ঠিক দুবছরের ছোট। নাম অমিতাভ। কেউ ডাকে আমি বলে, কেউ ডাকে অমিত বলে। স্বামী কলেজ আর লেখাপড়া নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত থাকেন বলে ত্রিদিববাবুর স্ত্রী মহিলা সমিতি, হরিসভা, রামকৃষ্ণ আশ্রম বা সাহিত্য পরিষদ নিয়ে মহাব্যস্ত থাকেন। অমিত স্কুল থেকে এসে বাড়ির মধ্যেই আপন মনে পড়াশুনা বা খেলাধুলা নিয়ে মেতে থাকে বলে ওর আরো সুবিধে হয়েছে।
ত্রিদিববাবুর স্ত্রীর পাল্লায় পড়ে ছবির মাকেও মহিলা সমিতি, হরিসভা ইত্যাদিতে ভিড়তে হয়েছে। স্বামীর মত উনিও ছবির বাবা মাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। সংসারের প্রতিটি ব্যাপারে উনি হাসিমুখে সাহায্য করেন বলে ওঁর অনুরোধ এড়ান সম্ভব নয়।
