ছবির এই আলমারিতে কয়েক শ চিঠি আছে। যখনই আলমারি গোছগাছ করতে হাত দেয় তখনই ভাবে সব চিঠিপত্র ফেলে দেবে কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোন চিঠিই ফেলতে পারে না। সব চিঠির সঙ্গেই কিছু সুখ-দুঃখের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। সেইসব স্মৃতির কথা মনে করে আবার চিঠিগুলো আলমারির মধ্যে রেখে দেয়। আজ সত্যি সত্যি চিঠিগুলো ছিড়বে বলে প্রথমে দুটো খামের চিঠি তুলে নেয় কিন্তু ছিঁড়তে চেষ্টা করেও পারল না। বড় শক্ত কিছু ভিতরে আছে মনে হলো। খামের ভিতর থেকে চিঠি বের করতে গিয়েই ছবি অবাক। আরে! এর মধ্যে সেই ভাগলপুরের মোক্ষদা স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে তোলা ফটো আছে! ইস! ছিঁড়ে ফেললে কী সর্বনাশ হতো? ক্লাস নাইন থেকে টেন-এ ওঠার পরই ওরা কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিলে এই ছবি তুলেছিল। এই ফটো তোলার জন্য ওরা প্রত্যেকে তিন টাকা করে চাঁদা দিয়েছিল, তাও ছবির স্পষ্ট মনে আছে। এবার ছবি ফটোটার দিকে তাকাতে গিয়েই যেন ভূত দেখার মত চমকে ওঠে। যে লিপি সব সময় হাসত, সবাইকে হাসিয়ে মাতিয়ে রাখত, ভগবান তার মুখের হাসিই চিরকালের জন্য কেড়ে নিলেন? ইস্! ছবি যেন শিউরে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে ওর হাত-পা যেন অবশ হয়ে যায়। চোখের দৃষ্টিও যেন কেমন ঝাপসা হয়ে ওঠে। মনে পড়ে কত কথা! সেই মোক্ষদা স্কুলের কথা, টিফিনের সময় চৈতালীদির রূপ যৌবনের গল্প, সুন্দরবনে পিকনিক, ক্লাস নাইনে উঠেই চৈতালীদি আর সুমিত্রাদির সঙ্গে সারা ক্লাসের মেয়েরা মিলে মান্দার হিল যাওয়া, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসবে চিত্রাঙ্গদায় অভিনয় করা ও গান গাওয়া এবং আরো কত কি মনে পড়ে।
ছবি মোক্ষদা স্কুল থেকে পাস করার পর কলকাতায় বেথুনে ভর্তি হয়। নানা কারণে ওর আর ভাগলপুর যাওয়া হতো না কিন্তু লিপির বিয়েতে গিয়েছিল। মার অমত না থাকলেও বাবার বিন্দুমাত্র মত ছিল না কিন্তু ছবির কান্নাকাটি দেখে উনি শেষ পর্যন্ত মত দিয়েছিলেন। ওর বিয়ের সময় মুঙ্গের, পাটনা, কলকাতা থেকে প্রায় সব পুরনো বন্ধুরাই ভাগলপুর হাজির হয়েছিল। হাজার হোক, লিপির বিয়ে! তার উপর লাভম্যারেজ! বন্ধুবান্ধবরা না গিয়ে পারে?
সেই অবিস্মরণীয় রাত্রির কথা ছবি কোনদিন ভুলবে না। বিয়ের পর বাসরে আসতেই লিপিকে ওরা বলল, সত্যিই তাহলে সব্যসাচীকে বিয়ে করলি?
লিপি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, এতদিন বাবা-মার চোখে ধুলো দিয়ে সব্যসাচীর সঙ্গে প্রেম করার পর কি তোরা ভেবেছিলি অন্য কাউকে বিয়ে করব?
ও একটু থেমে আবার বলে, আমি তো তোদের মত ভীতু না।
সেদিন কত হাসি, কত ঠাট্টা, কত গান হয়েছিল, তা আজ আবার নতুন করে ছবির মনে পড়ছে। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই লিপির জীবন থেকে সব হাসি সব গান চিরদিনের মত চিরকালের জন্য কেন হারিয়ে গেল, তা ও ভেবে পায় না।
সর্বনাশ হবার কয়েক মাস পরে লিপি ছবিকে লিখেছিল, তোরা আমার জন্য দুঃখ করিস না। এ কথা ঠিক ভগবান আমাদের প্রথম বিবাহ বার্ষিকী উদযাপনেরও সুযোগ দিলেন না। তবু আমি জানি লক্ষ লক্ষ মেয়ে সারা জীবনে যে প্রেম, যে ভালবাসা, যে দরদ মমত্ব স্বামীর কাছ থেকে পায় না, ঐ কটি মাসের মধ্যে আমি তার চাইতে অনেক অনেক বেশী পেয়েছি। দৈনন্দিন জীবনের আঘাতে-সংঘাতে আমাদের দ্বৈত জীবন কলুষিত কর্দমাক্ত হতে পারেনি। ভালবাসার স্বর্ণশিখর প্রাঙ্গণেই আমাদের খেলা শেষ হয়েছে, এইটুকুই সান্ত্বনা, এইটুকুই তৃপ্তি।
সব্যসাচীর মৃত্যুর বছর খানেক পর লিপির দাদারা ওর আবার বিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিলেন। যেদিন ওরা লিপিকে ওদের ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেন, সেদিন লিপি পাগলের মত ক্ষেপে উঠেছিল।
বলেছিল, তোমরা কী ভেবেছ আমি বেশ্যা, যে এই দেহটা যে কোন পুরুষকে বিলিয়ে দিতে পারি?
সত্যি, বিচিত্র মেয়ে এই লিপি!
দুর্গাদি আবার এক কাপ চা দিয়ে যায়। ছবি সযত্নে ঐ ছবিটা আর লিপির চিঠিখানা লকারের মধ্যে রেখে চা খেতে খেতেই নিচের তাক গুছিয়ে ফেলে। অন্য তাক থেকে কাপড়-চোপড়গুলো টান দিতেই বড় অ্যালবামটা ওর কোলের উপর এসে পড়ল। বিয়ের অ্যালবাম! সেই আশীর্বাদের দিন থেকে বিয়ে বৌভাত-ফুলশয্যার ছবি দিয়ে অ্যালবাম ভর্তি। ছবি ফটোগুলো না দেখে পারে না। শিশির সত্যি খুব হ্যাণ্ডসাম। ছবি আপনমনেই একটু হাসে। একটু ভাবে। সত্যি, অত তাড়াতাড়ি ওর বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল না। ভেবেছিল আরো পড়বে। ভাল করে গান শিখবে। কিন্তু তবু বিয়ের কথা শুনে মনের মধ্যে কেমন একটা চাপা আনন্দ, রোমাঞ্চ অনুভব করেছিল। ঠাকুমা বলতেন, বিয়ের কথায় কাঠের পুতুলও নাচে! কথাটা বোধহয় ঠিক।
ছবি অ্যালবামের পাতা উল্টে যায়। শিশিরের ছবিগুলো দেখতে দেখতে মনে পড়ে ওকে দেখেই ওর ভাল লেগেছিল। যেমন সুপুরুষ দেখতে, তেমনি বুদ্ধিদীপ্ত দুটো চোখ! বিয়ের পর বন্ধুবান্ধবরা বলেছিল, হ্যাঁরে ছবি, তুই কি ফ্যাশন প্যারেড করে বর পছন্দ করেছিস?
মনের খুশি চেপে রেখে ছবি গম্ভীর হয়ে বলেছিল, ওর কী এমন রূপ দেখলি রে?
জয়শ্রী বলল, থাক, আর ন্যাকামি করিস না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখে আয় স্বামীর গর্বে তোর মুখের চেহারা কত বদলে গেছে!
এই অ্যালবামখানা নাড়াচাড়া করতে করতেই ছবির কত কথা মনে পড়ল।…
