তখন ছবির কত বয়স? বড় জোর নদশ। না, না, দশও হয়নি। সবে ন বছরে পা দিয়েছে। ডায়েরী সম্পর্কে ওর কোন ধারণাই ছিল না। তাই তো ও মাস্টারমশাইকে জিজ্ঞেস করে, ডায়েরীতে কি লিখব?
বৃদ্ধ সন্তোষবাবু একটু হেসে বললেন, তোমার যা ইচ্ছে তাই লিখবে।
ছবি অবাক হয়ে বলে, যা ইচ্ছে?
–হ্যাঁ, যা ইচ্ছে। এবার উনি একটু থেমে বলেন, তুমি সারাদিনে যা করবে তাই লিখে রেখো।
সারাদিনে যা যা করব সব লিখে রাখব?
–তাহলে তো খুব ভাল হয়।
ছবি একটু ভেবে আবার প্রশ্ন করে, কখন লিখব স্যার?
–ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠেও লিখতে পারে, আবার রাত্রে শুতে যাবার আগেও লিখতে পারে। সন্তোষবাবু এক টিপ নস্যি নিয়ে বলেন, তোমার যেমন সুবিধে হবে, তেমন লিখবে। তবে একটা সময় ঠিক থাকলেই ভাল।
ছবি খাতাটা নিয়ে নাড়াচড়া করে। মাস্টারমশাই এবার বললেন, ডায়েরী লেখার সময় তারিখ লিখে রাখবে।
-কেন স্যার?
মাস্টারমশাই একটু হেসে বলেন, পরে বুঝতে পারবে কবে কি ঘটেছে।
ছবির স্পষ্ট মনে পড়ছে সেদিন মাস্টারমশাই চলে যাবার পরই ও ডায়েরী লিখতে বসল। আজ এত বছর পর সেই সেদিনের কচি মনের ডায়েরী পড়তে গিয়ে ছবি নিজেই হাসে। অদ্য সকাল ছটা আট মিনিটে শয্যা ত্যাগ করিলাম। হাত-জোড় করিয়া মা-কালীর ফুটোয় প্রণাম করিবার সঙ্গে সঙ্গেই দৌড়িয়া বাথরুমে গেলাম…
ছবি ঐ দুলাইন পড়েই মনে মনে বলে, এ রাম!
একসঙ্গে কয়েক পাতা ওল্টাতেই চোখে পড়ে–কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মকথা কবিতাটি মুখস্থ বলিতে পারায় আমাদের বাংলার দিদিমণি খুব আনন্দিত হইলেন। উনি বলিলেন, ছবি, নববর্ষ উৎসবে তোমাকে একটি কবিতা আবৃত্তি করিতে হইবে। দিদিমণির কথা শুনিয়া আমি খুব গৌরববোধ করিলাম।
ছবি হাসতে হাসতেই পাতা উল্টে যায় আর সেই সব দিনের কথা ভাবে। মোক্ষদা স্কুলের সব দিদিমণিরাই ভাল ছিলেন কিন্তু ওর সব চাইতে প্রিয় ছিলেন ঐ বাংলার টিচার চৈতালীদি। কী সুন্দর দেখতে ছিল চৈতালীদিকে! উনি খুব ফর্সা ছিলেন না কিন্তু অমন উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ রঙেই যেন ওঁকে আরো বেশ ভাল লাগত। চোখ দুটো কী সুন্দর ছিল! মনে হতো সব সময় হাসছেন। নাকটা সামান্য একটু চাপা ছিল কিন্তু মুখখানা এত সুন্দর ছিল যে ওটা চোখেই পড়ত না। তাছাড়া যেমন গড়ন, তেমন মাথায় চুল। উনি রোজই সাদা বা হালকা রঙের তাঁতের শাড়ি পরে আসতেন কিন্তু তবু মনে হতো ওঁর পাশে কোন ফিল্ম স্টারও দাঁড়াতে পারবে না। বোধহয় ওঁকে খুশি করার জন্যই ছবি খুব বেশী মন দিয়ে বাংলা পড়ত।
আনমনে ঐ ডায়েরীর পাতা ওল্টাতে ওল্টাতেই ওর আরো কত কি মনে পড়ে।
তখন বোধহয় সেভেন বা এইটে পড়ে। কী বা এমন বয়স! কিন্তু ঐ বয়সেই লিপি কি ফাজিল ছিল! রোজ টিফিনের সময় ওরা এক দল স্কুলের পিছন দিকে কোন এক গাছের ছায়ায় বসে টিফিন খেত। আর ঐ টিফিন খেতে খেতেই লিপি এক একদিন এক একজন টিচারের নানা খবর বলত।
সেদিন টিফিনের কৌটো খুলতে খুলতেই লিপি বলল, আজ চৈতালীদিকে দেখে আমারই মনে হচ্ছিল ওকে জড়িয়ে ধরে একটা কিস করি।
ওর কথায় অনেকেই লজ্জা পায় কিন্তু উপভোগ না করে পারে না। রেখা বলল, চৈতালীদিকে রোজই দারুণ দেখতে লাগে। উষা বলল, যত দিন যাচ্ছে উনি যেন তত বেশী সুন্দরী হচ্ছেন। ছবি বলল, চৈতালীদিকে দেখতেও যেমন ভাল তেমনি সুন্দর ওঁর ফিগার।
লিপি সঙ্গে সঙ্গে বলল, ঠিক বলেছিস ছবি। ওঁর বুক যেমন ডেভলপড, থাই-টাইগুলোও দারুণ; অথচ কোমর কত সরু। ও রসগোল্লার রসে টান দেবার মত আওয়াজ করে বলল, শৈবাল ডাক্তারের কী ভাগ্য!
দুতিনজন মেয়ে প্রায় একসঙ্গে প্রশ্ন করে, তার মানে?
লিপি রেখার কাছ থেকে একটু আচার নিয়ে মুখে দিয়েই বলল, কী আবার ব্যাপার! চৈতালীদি শৈবালকে ভালবাসে তাও তোরা জানিস না?
হাজার হোক চৈতালীর ব্যাপারে ছবির আগ্রহ সব চাইতে বেশী। তাই ও জিজ্ঞেস করে, সত্যি নাকি রে?
–তবে কি আমি মিথ্যে বলছি? ও প্রায় এক নিঃশ্বাসেই বলে যায়, এই তো পূজার ছুটি আসছে। তখন দেখিস, যেদিন ছুটি হবে সেইদিনই আপার ইণ্ডিয়ায় চৈতালীদি শান্তিনিকেতন যাবেন আর…
ওকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই কে যেন অবাক হয়ে বলে, শান্তিনিকেতন?
-আজ্ঞে হ্যাঁ, ওখানে চৈতালীদির মাসী থাকেন। লিপি মুহূর্তের জন্য একটু থেমে বলে, উনি চলে যাবার দুএকদিন পরই শৈবাল ডাক্তার কলকাতা ঘুরে শান্তিনিকেতন হাজির হবে।
লিপি কোথা থেকে কেমন করে এসব খবর জানতে পারে, তা জিজ্ঞেস করার কথাও ওদের মনে আসত না। ওরা সবাই মনে করত, লিপি সত্যি কথাই বলছে কিন্তু ঐ বয়সে যে এইসব বলতে ভাল লাগে, শুনতেও ভাল লাগে, সে কথাও ওদের কারুর মনে আসত না।
হঠাৎ দুর্গাদি এক কাপ চা ছবির পাশে রেখেই বলল, তাই বলি, আজ বৌদি কেন চায়ের জন্য তাগাদা দিচ্ছে না!
দুর্গাদির কথা শুনেই যেন ছবি সংবিৎ ফিরে পায়। হঠাৎ আবিষ্কার করে ঐ ডায়েরীর খাতাখানা হাতে নিয়েই অনেকক্ষণ বসে আছে। না, না, আর না। খাতাটা তাড়াতাড়ি সরিয়ে রেখে চায়ের কাপে চুমুক দিয়েই নতুন ব্লাউজ পিসগুলো গুছিয়ে একপাশে রাখে।
এবার ছবি ঐ তাক থেকে সবকিছু বের করে মেঝেয় রাখে। ঠিক করে, আজেবাজে সবকিছু ফেলে দেবে। ছেঁড়া-ফাটা সায়াগুলো একে-ওকে দিয়ে দেবে। সত্যি বেশ কিছু আজেবাজে জিনিস বেরুল। কয়েকটা ছেঁড়া সায়া দূরে সরিয়ে রাখতে গিয়েই ওর ভিতর থেকেই কয়েকটা চিঠি মেঝেয় ছড়িয়ে পড়ল। ছবি একবার ভাবে চিঠিগুলো টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে দেবে। কী হবে পুরনো চিঠিপত্র জমিয়ে? তাছাড়া কত চিঠি রাখবে?
