সীতা হেসে বলে, আরো শুনতে চাও?
-হ্যাঁ, শুনতে চাই।
ও বলে যায়, শরদিন্দু বাঁড়ুজ্যের গল্প শোনার মত মন দিয়ে স্বামীর কাছে তার অফিসের গল্প শুনতে হবে। দরকার হলে বলতে হবে, এই চোপড়া আর বোস–দুটো লোকই হারামজাদা এবং বারো আনা কাজ তো তোমাকেই করতে হয় কিন্তু তবু কেন যে জি এম বা ডিরেক্টররা তোমার মুখের দিকে তাকান না, তা ভেবেই পাই না।
এবার ছায়াদি হাসতে হাসতে বলেন, মিঃ সেন খেয়ে-দেয়ে শুতে যাওয়া পর্যন্ত বুঝি তোমাকে ডিউটি দিতে হয়?
এবার সীতা মুখ টিপে না, একটু জোরেই হাসে। বলে, শুয়ে পড়ার পর প্রায়ই উনি আবিষ্কার করেন, আমার চাইতে সুন্দরী মেয়ে নাকি ভূ-ভারতে উনি দেখেননি। ব্যস! যেদিনই ঐ প্রশংসা শুনি, সেদিনই আমার সর্বনাশ!
ওর কথা শুনে শুধু ছবি না, ছায়াদিও হাসি চাপতে পারেন না।
সীতা কিন্তু ঐটুকু বলেই থামে না। বলে যায়, শুনি স্বামীদেরই সারাদিন অসম্ভব পরিশ্রম করতে হয় কিন্তু অত পরিশ্রম করার পরও যে ওরা মাঝ রাত্তিরে কি করে সার্কাস দেখায়, তা ভেবে পাই না!
এবার ছায়াদি ওকে সমর্থন না জানিয়ে পারেন না। হাসতে হাসতে বলেন, ঠিক বলেছ সীতা।
যাই হোক, এই সীতা থাকলে ছবির সময় যে কোথা দিয়ে কেটে যায়, তা ও নিজেই টের পায় না। গতকাল রেখা ফোন করে বলেছিল, কাল-পরশুর মধ্যে আসব। ছবির দুই বন্ধু দিল্লীতে আছে। শ্ৰীলার স্বামী হিন্দু কলেজের লেকচারার। ওরা মডেল টাউনে থাকে। অত দূরে থাকে বলে শ্রীলা বিশেষ আসতে পারে না কিন্তু রেখা আসে এবং এলেই সারাদিন কাটিয়ে যায়। আজ এতক্ষণ যখন এলো না, মনে হয়, কালই আসবে। তাই ছবি কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করার পর নিজের আলমারিটা ঠিকমত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন গোছগাছ করতে বসল।
এই বাড়িতে, এই সংসারে কত কি আছে! খাট-বিছানা সোফা গার্ডেন চেয়ার থেকে শুরু করে রেডিও-টি ভি-মিউজিক সিস্টেম। কত ভাল ভাল ছবি ও বই আছে। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় ছবি সবকিছুই ব্যবহার করে, উপভোগ করে কিন্তু ঐ সবকিছুর সঙ্গেই যেন ওর প্রাণের টান নেই। ওগুলো সবার কিন্তু এই আলমারিটা শুধু ওর নিজের। একান্তই নিজের।
বিয়ের পর ছবি যখন দিল্লীতে প্রথম সংসার করতে আসে, তখন ওদের একটা আলমারিতেই স্বামী স্ত্রীর জামাকাপড় বা টাকা-পয়সা থাকত। চাকরিতে শিশিরের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ওর জামাকাপড়ের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বাড়তে থাকে। তখন একদিন ছবি একটু অভিমান করেই বলে, তোমার জামাকাপড়ের ঠেলায় এ আলমারিতে আর আমার জামাকাপড় রাখা অসম্ভব। এতদিন বলার পরও যখন আমাকে একটা আলমারি কিনে দিলে না, তখন না হয় আমাকে মা-দিদিমার আমলের একটা স্টীলের ট্রাঙ্কই কিনে দাও কিন্তু এভাবে আর চলে না।
শিশির হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে দুহাত দিয়ে ওকে জড়িয়ে কানে কানে ফিসফিস করে বলল, পর পর তিন দিন আদর করলেই তোমাকে আলমারি কিনে দেব।
ছবি গম্ভীর হয়ে বলে, যে তিনশ দিন আদর খেয়েছ সে হিসেবটা বুঝি এখন মনে পড়ছে না?
শিশির ওর মুখের পাশে মুখ নিয়ে বলে, তিনশ তিন দিন হলেই আলমারি এসে যাবে।
ছবি প্রায় জোর করেই নিজেকে মুক্ত করে বলে, আমি আলমারিও চাই না, তোমাকে আদর করতেও পারব না।
পরের শনিবারই শিশির ওকে এই আলমারিটা কিনে দেয়।
আলমারিটা যেমন সুন্দর, তেমনই বড়। ছবি নেহাৎ বেঁটে না। ৰাধারণ বাঙালী মেয়েদের তুলনায় ও একটু লম্বাই কিন্তু তবু নিচে দাঁড়িয়ে ও আলমারির উপরের তাকে হাত পায় না। একটা ট্রল বা চেয়ারের উপর দাঁড়াতে হয়। প্রথম যখন আলমারিটা কেনা হয়, তখন অর্ধেকই খালি পড়ে থাকত কিন্তু এখন শুধু ভর্তি নয়, ঠাসাঠাসি করে কাপড়চোপড় জিনিসপত্র আছে। তাই তো এই আলমারির জিনিসপত্র গোছগাছ করতে বসলেই ছবির সারাদিন লেগে যায় কিন্তু সব সময় ইচ্ছে করে না বা হাতে অত সময় থাকে না বলেই নমাসে ছমাসে ছবি এই আলমারি পরিষ্কার করে।
এই আলমারিতে কী নেই? জামাকাপড়, কিছু গহনা, দুতিনটে ঘড়ি, বাবা-মা-আত্মীয়-বন্ধুদের অসংখ্য চিঠি ও ছবি, পুরনো দিনের কিছু খাতাপত্র-ডায়েরী। লকারের একপাশে সংসারের খরচপত্রের টাকাকড়ি ছাড়াও ব্যাঙ্কের পাসবই-চেকবই। তাছাড়া কতজনের দেওয়া কত রকমের প্রেজেনটেশন। আরো কত কি!
ছবি মনে মনে ঠিক করেছিল, আগে কাপড়চোপড় না গুছিয়ে অন্য কিছুতে হাত দেবে না। এই তো কদিন আগে শিশিরের সঙ্গে একটা পার্টিতে যাবার সময় একটা টাঙ্গাইল সিল্কের শাড়ি বের করল কিন্তু ঐ শাড়ির সঙ্গে পরবার মত ব্লাউজটাই পেল না। খুব ইচ্ছা ছিল ঐ শাড়িটা পরার কিন্তু হলো না। অথচ তার পরের দিন সকালেই একটা সাধারণ তাঁতের শাড়ি টানতেই ঐ ব্লাউজটা বেরিয়ে এলো। এ প্রায় নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার।
যাই হোক, ও মেঝেতে বসে সব চাইতে নিচের তাক থেকে পুরনো সায়া আর কয়েকটি নতুন ব্লাউজ পিস টান দিতেই একটা খাতা প্রায় কোলের উপর এসে পড়ল। খাতার মলাট ওল্টাতেই ছবি আপন মনেই একটু হাসে। প্রথম পাতায় মোটা মোটা অক্ষরে লেখা আছে ডায়েরী। মাস্টারমশায়েরই হাতের লেখা। খাতাটাও উনিই দিয়েছিলেন।
কবেকার কথা?
ছবি মনে মনে একটু হিসেব-নিকেশ করে নেয়। হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। সেকেণ্ড স্ট্যাণ্ড করে ক্লাস ফাইভে উঠতেই একদিন সন্ধেবেলায় মাস্টারমশাই পড়াতে এসে এই খাতাটা দিয়ে বললেন, ছবি, এই খাতায় তুমি রোজ ডায়েরী লিখবে। যাদের ডায়েরী লেখার অভ্যাস থাকে, তারা সবকিছু ভাল লিখতে পারে।
