মনীশ হাসে।
আজকাল আমি পথঘাটে বেরুলেই কিছু কিছু লোককে বলতে শুনি, ঐ যে মনীশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মা যাচ্ছেন। উনি এক গাল হাসি হেসে বলেন, শুনে যে কি ভালো লাগে, তা বলতে পারব না।
স্টিফেন হাউস উপন্যাসটি শেষ হবার আগে থেকেই নানা পত্রপত্রিকা থেকে লেখার অনুরোধ আসে। মনীশ সবাইকে সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানিয়ে লেখে, চাকরিবাকরি করে লেখার খুব বেশি সময় পাই না। সেইজন্য এখনই লেখা দিতে পারছি না কিন্তু ভবিষ্যতে সুযোগ মতো নিশ্চয়ই লেখা পাঠাবো। ঐ চিঠি পাবার পরও দুচারটি পত্রিকার লোকজন বাড়িতে এসে হাজির হয়। অনুরোধ উপরোধ করে। ফিস ফিস করে বলে, দরকার হলে টাকাটা অ্যাডভান্সও দিতে পারি।
মনীশ বলে, না, না, তার দরকার হবে না। লেখা ছাপা হলেই টাকা দেবেন।
স্বদেশ সম্পাদকও মহা খুশি। উনি সবার সামনেই বলেন, মনীশের উপন্যাসের জন্য কাগজের ডিমান্ড এত বাড়বে, তা আমি ভাবতে পারিনি।
মনীশ জিজ্ঞেস করে, অন্য উপন্যাসটি কবে ছাপরেন?
পূজা সংখ্যায়। উনি সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি অন্য কোনো পূজা সংখ্যায় লিখবে?
কয়েকটা কাগজের থেকে বার বার বলছে কিন্তু আমি এখনই আর লিখতে চাই না।
ভেরি গুড! সম্পাদক টেবিলের উপর জোরে একটা ঘুষি মেরেই বলেন, তাহলে দেখো আমি কী করি।
সত্যি, একজন নতুন লেখককে নিয়ে যে কোন পত্রিকা এত হৈ চৈ করতে পাবে, তা মনীশ কল্পনাও করতে পারেনি। মনীশের ছবি দিয়ে পোস্টার, মনীশের ছবি দিয়ে কলকাতার সব দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন। এর উপর সিনেমার স্নাইড আর রেডিওতে বিজ্ঞাপন। পূজা সংখ্যা বেরুবার আগেই এমন অবস্থা দাঁড়ালো যেন মনীশ প্রায় ফিল্মের হিরো! পথেঘাটে ট্রামেবাসে সবাই অবাক হয়ে ওকে দেখে। বাসের নিত্য সহযাত্রী বৃদ্ধরা বলেন, আরে, তুমি যে এত বড় লেখক, তা তো আমরা জানতামই না। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা ওকে কাছাকাছি পেলেই অটোগ্রাফ চায়। বুলা আর কচি বলে, দাদা, তোমার জন্য স্কুলে আমাদের কী খাতির, তা ভাবতে পারবে না।
সব চাইতে মজা হয় স্টিফেন হাউসে। লিফটএ ওঠার জন্য মনীশ লাইনে দাঁড়ালেই সবাই হৈ হৈ করে ওঠেন, আরে, আপনি আবার লাইনে দাঁড়াচ্ছেন কেন? যান উঠে যান।
দু পাঁচ মিনিট লাইনে দাঁড়াতে কী আর এমন কষ্ট! আপনারা উঠুন।
কে কার কথা শোনে? সবাই প্রায় জোর করে ওকে লিফটএ ঢুকিয়ে দেয়।
আর চৌধুরী সাহেব?
উনি এখন রোজই মনীশের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্পগুজব না করে নিজের চেম্বারে ঢোকেন না। তাছাড়া পুজোর ছুটির পর প্রথম অফিসে এসেই চৌধুরী সাহেব সবার সঙ্গে কোলাকুলির পর্ব শেষ করেই বললেন, গিরীশবাবু, আমি আপনাদের সবাইকে জানিয়ে একটা কথা বলতে চাই।
হা স্যার বলুন।
মনীশ ব্যানার্জীর জন্য আমরা সবাই গর্বিত, সে বিষয়ে তো কোনো সন্দেহ নেই।
গিরীশবাবু বললেন, সে তো একশ বার।
তাই বলছিলাম, আপনারা যদি আপত্তি না করেন, তাহলে আমি মনীশকে দুশ টাকা স্পেশাল ইনক্রিমেন্ট দিতে চাই।
ঘর ভর্তি সবাই হাততালি দিয়ে ওকে সমর্থন জানালেন।
এবার মনীশ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, স্যার, এই আমার প্রথম চাকরি। আপনি তাড়িয়ে দিলে না বোধহয় আমি কোনোদিনই এ চাকরি ছাড়ব না।
চৌধুরী সাহেব দাঁত দিয়ে জিভ কামড়ে বলেন, আরে, ছি, ছি! আপনাকে তাড়াব? আপনাকে তাড়ালে আমাকে আর এই স্টিফেন হাউসে ঢুকতে হচ্ছে না।
ওর কথায় সবাই হাসেন।
মনীশ বলে, স্যার, আমি এখন লিখেও কিছু আয় করতে শুরু করেছি। আপনি কাইন্ডলি শুধু আমাকে ইনক্রিমেন্ট দেবেন না।
কিন্তু এ তো স্পেশাল ইনক্রিমেন্ট! বছরের শেষে তো সবারই নর্মাল ইনক্রিমেন্ট হবে।
স্যার, আপনি সবাইকে দশ টাকা করে দিলেও…।
চৌধুরী সাহেব ওর কাঁধে একটা হাত রেখে বলেন, ঠিক আছে, আমি সবাইকে পঞ্চাশ টাকা করে স্পেশাল ইনক্রিমেন্ট দিচ্ছি কিন্তু আপনাকে ঐ দুশ টাকা।
কিন্তু স্যার…
সবাই হাততালি দিয়ে চৌধুরী সাহেবের ঘোষণাকে অভিনন্দন জানালেন।
.
মনীশের চোখে হঠাৎ পৃথিবীর রঙ বদলে গেল। চারদিকে শুধু আলো আর আলো। ডালহৌসীর জনারণ্যে এমন যে আশাহীন অন্ধকারময় কেরানিগিরির জগৎ, সেখানেও আলো ছড়িয়ে পড়ল। হাটেবাজারে, পথেঘাটে কর্মক্ষেত্রের ভেতরে ও বাইরে, অপরিচিতের অজানা মহলেও স্বীকৃতি আর ভালোবাসা। বাবার মৃত্যুর পর যারা একবারও এদিকে পা বাড়াননি, তারাও হঠাৎ এক বাক্স মিষ্টি হাতে নিয়ে আসতে শুরু করলেনবিশ্বাস করুন বৌদি, আমি ভাবতেও পারিনি, আমাদের মনীশদাই এত পপুলার লেখক। খবরের কাগজ দেখে দীপা বলল, এ তো আমাদেরই মনীশদা।
মনীশের মা একটু শুকনো হাসি হেসে বলেন, সত্যই তো আপনারা জানবেন কী করে? দীপা কলেজে পড়ে বলেই এসব খবর ওরাই রাখে।
প্রলয়বাবু এক গাল হাসি হেসে বলেন, এক রবিবার দীপাকে নিয়ে আসব। ও মনীশের সঙ্গে দেখা করার জন্য পাগল হয়ে উঠেছে।
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই নিয়ে আসবেন।
সন্ধের পর বাড়ি ফিরতেই ওর মা হাসতে হাসতে বলেন, হারে, তুই এবার থেকে আমাকে মাইনে দিবি।
কী ব্যাপার? তোমাকে হঠাৎ মাইনে দেব কেন। মনীশও হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করে।
সারাদিন তোর সেক্রেটারিগিরি করছি আর মাইনে দিবি না? উনি একটু থেমে বলেন, তোর জন্য রোজ আমাকে কত লোকের সঙ্গে বক বক করতে হয় জানিস?
মনীশ ওর মার পাশে বসে জিজ্ঞেস করে, আজ আবার কে এসেছিল?
তোর বাবার এক পুরনো সহকর্মী প্রলয় চ্যাটার্জী এসে তার প্রশংসার সঙ্গে সঙ্গে নিজের মেয়ের গুণকীর্তন করলেন ঘন্টাখানেক ধরে।
