হঠাৎ এত বছর পর!
ঠিক জানি না; হয়তো ওর মেয়ের সঙ্গে তোর বিয়ে দেবার মতলব।
বাঃ। চমৎকার।
মনীশের মা বলে যান, উনি থাকতে থাকতেই বুলার স্কুলের দুই দিদিমণি এসে হাজির।
কেন?
ওদের স্কুলের আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় তোকে প্রধান বিচারক হতে হবে।
আমি কি শম্ভু মিত্তির যে আবৃত্তি প্রতিযোগিতার বিচারক হব?
সে আমি জানি না কিন্তু আমি কথা দিয়েছি, তুই যাবি।
কথা দিয়ে দিয়েছ?
হ্যারে; না দিয়ে পারলাম না। উনি একটু থেমে বলেন, এ ছাড়া ইন্দ্রানী তার দুই বন্ধুকে নিয়ে এসেছিল।
ইন্দ্রানী আবার কে?
ওর মা একটু হেসে বলেন, ও তোর ভক্ত হিসেবেই প্রথম আসে কিন্তু এখন তো আমারই ভক্ত হয়ে উঠেছে। উনি একটু থেমে বলেন, আজকাল তো অনেক ছেলেমেয়ে আসাযাওয়া করে কিন্তু ইন্দ্রানীর মতো কেউ না।
বুলা দৌড়ে এসে বলে, আমাদের স্কুলের ক্লাস টেন এর একটা মেয়ে তোমার দারুণ ভক্ত। সে তোমার একটা ছবি চেয়েছে।
আমি কোথায় ছবি পাবো?
না, না, দাদা, প্লীজ।
এইভাবেই দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কেটে বছর ঘুরে যায়।
মনীশের খ্যাতি যশের সঙ্গে সঙ্গে অর্থও আসে পত্রপত্রিকা প্রকাশকদের কাছ থেকে দুঃশ্চিন্তা অভাবঅনটন এখন অতীত স্মৃতি মাত্র। তবে এখন মনীশের ব্যস্ততার শেষ নেই সকালবেলায় উঠেই লিখতে বসে। এরই মধ্যে পত্রপত্রিকা ও প্রকাশকদের লোকজন একে কথাবার্তা বলে। তারপর খেয়েদেয়েই অফিস দৌড়য়! অফিসেও নানাজন আসে দেখাসাক্ষা করতে। অফিস থেকে সোজা বাড়ি ফেরে না কোনোদিনই। ন্যাশনাল লাইব্রেরি বা পত্র পত্রিকার অফিসে যেতে হয় মাঝে মাঝেই। অথবা আপনমনে ঘুরে বেড়ায় এখানে ওখানে কখনও কখনও পুরনো বন্ধুবান্ধব বা অফিসের সহকর্মীদের পাল্লায় পড়ে আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফেরে।একটু কিছু খেতে খেতেই ভাইবোনের সঙ্গে গল্পগুজব হাসিঠাট্টা করে আবা লিখতে বসে। কত রাত পর্যন্ত লেখে, তার ঠিকঠিকানা নেই।
মাঝরাতে ঘুম ভাঙলেই মা ওকে বকুনি দেন, হারে, দেড়টা বেজে গেল। শিগগির শুয়ে পড়। একটা অসুখবিসুখ না হলে বুঝি..
হ্যা মা, এখুনি উঠছি
এইভাবেই আরো প্রায় বছরখানেক কাটার পর ওর মা একদিন বললেন, তুই এ বড় বড় ডাক্তার দেখালি কিন্তু তবু তো আমার প্রেসারটা কিছুতেই কমছে না। অর্ধেক সময়েই মাথা তুলতে পারি না। তাই তোকে একটা কথা বলতাম।
মনীশ বলে, হ্যাঁ, মা, বলল।
কিন্তু কথাটা তোকে মনে রাখতে হবে।
তোমার কোন কথাটা আমি রাখি না?
না, তা বলছি না, তবে…
তবে আবার কী?
এবার ওর মা বলেন, তুই যে নিজে দেখেশুনে কোনো মেয়েকে ঘরে আনবি, এমন সম্ভাবনা তো দেখছি না
মনীশ একটু হেসে বলে, তুমি কি বিয়ের কথা বলবে?
বিয়ের কথা মানে? ওর মা একবার ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন, আমি একটি মেয়েকে পছন্দ করেছি। ওর মা আর বড় ভাইকে কথাও দিয়েছি।
মনীশ মার কথা শুনে যেন গাছ থেকে পড়ে। বলে, একেবারে কথা দিয়ে দিয়েছ!
হ্যাঁ। উনি একটু থেমে বলেন, মেয়েটি সাক্ষাৎ লক্ষ্মীপ্রতিমা। অনার্স নিয়ে বি এ পাশ করে একটা প্রাইভেট ফার্মে এগারশ টাকা মাইনের চাকরি করছে! সুতরাং অপছন্দ হবার কোনো কারণ নেই।
উনি একটু থেমে বলেন, তাছাড়া তোর বয়স তো দিন দিন কমছে না। বিয়ে করার বয়স বহু দিন হয়ে গেছে।
হঠাৎ বিয়ের কথা শুনে মনীশ সঙ্গে সঙ্গে কোনো কথা বলতে পারে না।
মনীশ কিছু বলবার আগেই উনি আবার বলেন, মেয়েটিকে বুলা কচিরও ভালো লেগেছে। সামনের রবিবার তোকে মেয়ে দেখাতে নিয়ে যাব।
তার আর দরকার নেই। শুধু এইটুকুই বলেই মনীশ নিজের ঘরে চলে যায়। আর মনে মনে ঠিক করে, স্টিফেন হাউসের যে মেয়েটিকে নিয়ে ও প্রথম গল্প লিখে সাহিত্য জগতের স্বর্ণশিখর প্রাঙ্গণে প্রবেশাধিকার পেয়েছে, তার সঙ্গে একটু কথা বলবে।
কিন্তু হা ভগবান! দিনের পর দিন স্টিফেন হাউসের ঘরে ঘরে উঁকি দিয়েও মনীশ সেই প্রথমা নায়িকার দেখা পায় না। ওদিকে ওর মা যথারীতি এগিয়ে যান।
মনীশ মনের মধ্যে একটা অসহ্য জ্বালা বোধ করে কিন্তু কাউকে কিছু প্রকাশ করে না কিন্তু সময় তো দাঁড়িয়ে থাকে না। সে তার আপন গতিতে এগিয়ে যায়। এরই মধ্যে ওর মা ছেলেকে বার বার অনুরোধ করেন, চল না বাবা, একবার মেয়েটাকে দেখতে।
বলছি তো তার দরকার নেই।
আমার মন বলছে, আমি ঠিকই সিদ্ধান্ত নিয়েছি কিন্তু তবু নেমন্তন্নর কার্ডগুলো ছাড়ার আগে তুই মেয়েটাকে না দেখালে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছি না।
না, না, আমি কোথাও যাব না।
দিন তিনেক পর মনীশ অফিস বেরুবার সময় ওর মা বললেন, হ্যাঁরে, আজ তিনটের সময় ডাঃ ঘোষ আসবেন। তোকে থাকতে বলেছেন। তুই কি তখন আসতে পারবি?
উনি ঠিক আসবেন?
হ্যাঁ।
ঠিক আছে এসে যাবো।
মনীশ ট্যাক্সি নিয়ে ঠিক আড়াইটের মধ্যেই বাড়ি ফিরে আসে। বাড়ির দরজায় পা দিয়েই মাকে জিজ্ঞেস করে ডাঃ ঘোষ আসেননি তো?
না না। উনি একটু থেমে বলেন, তুই তোর ঘরে যা; আমি চা নিয়ে আসছি।
ঠিক আছে।
মনীশ তর তর করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে নিজের ঘরে পা দিয়েই সেই স্টিফেন হাউসের প্রথমা নায়িকাকে দেখে চমকে ওঠে। আমতা আমতা করে বলে, আপনি?
মা আসতে বলেছিলেন।
মা আসতে বলেছিলেন?
ও শুধু মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ
পেছন দিক থেকে মনীশের মা ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করেন, হ্যাঁরে আমি কি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি?
আনন্দে খুশিতে মনীশ দুহাত দিয়ে মাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলল, তুমি কী করে আমার মনের কথা জানতে পারলে?
