মনীশ শুনে খুশি হয় কিন্তু মুখে কিছু বলে না।
তা তুমি কতদিন ধরে গল্প লিখছো?
প্রথম গল্পই আপনাকে পাঠিয়েছি।
তাই নাকি?
সম্পাদক বিস্ময়বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, আশ্চর্য! তোমার প্রথম লেখাই এত ভালো। একটু থেমে উনি বললেন, বিয়াল্লিশ বছর এই কাগজ চালাচ্ছি! অনেক লেখক-লেখিকা দেখলাম। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তোমাকে বলতে পারি, যদি তুমি ফাঁকি না দাও, তাহলে তুমি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় সাহিত্যিক হবেই।
ফাঁকি দিলে আপনি আমাকে শাসন করবেন।
উনি হো হো করে হেসে ওঠেন। বলেন, লেখকের খ্যাতিযশ হলে কি তিনি সম্পাদকদের পরোয়া করেন?
ওর কথা শুনে মনীশ অবাক হয়। বলে, আশা করি আমি কোনোদিনই আপনার মতামতকে উপেক্ষা করব না।
আচ্ছা ওসব বাদ দাও। এবার কাজের কথায় আসি।
মনীশ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকায়।
সম্পাদক প্রশ্ন করেন, তোমার কী উপন্যাস লেখার কোনো পরিকল্পনা আছে?
মনীশ একটু হেসে বলে, আমার দুটো উপন্যাস লেখা আছে কিন্তু ভয়ে কাউকে দেখাইনি।
কীসের ভয়?
যদি কেউ না পড়েই ফেলে দেন।
সম্পাদক একটু চাপা হাসি হেসে বলেন, আমি যে সব লেখাই পড়ি, তার প্রমাণ তা পেয়েছ।
মনীশ একটু হেসে বলে, সে তো একশ বার।
কালই দুটো উপন্যাস আমাকে দিয়ে যাও। আমি পড়ে দেখি।
ঠিক আছে; আমি কালই নিয়ে আসব।
হ্যা আর একটা কথা।
বলুন।
তুমি কি বিশেষ কোনো কারণে ছদ্মনামে লিখেছ?
মনীশ আবার একটু হেসে বলে, ভয়ে ভয়েই ছদ্মনাম ব্যবহার করেছি।
তুমি নিজের নামেই লেখো। ছদ্মনাম কী দরকার?
তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই।
সম্পাদক বলেন, হ্যাঁ, সেই ভালো, ছদ্মনাম ব্যবহার করে অযথা লেখক আর পাঠকের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে লাভ কী?
মনীশ স্বপ্নেও ভাবেনি, স্টিফেন হাউসের এক অখ্যাত অফিসের কেরানিগিরি করা জীবন নিয়ে লেখা উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই পাঠক পাঠিকামহলে এক আলোড়ন সৃষ্টি করবে। চারদিকে খুশির বন্যা। মনীশ খুশি; মনীশের মা খুশি; খুশি ওর দুই ভাইবোন। খুশি ওর প্রত্যেকেটি সহকর্মী। গর্বিতও।
জয়ন্ত ওর ছোটবোনের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বলে, ঐ যে বিয়ের দিন যে পরিবেশন করেছিল, সেই তো মনীশ ব্যানার্জী।
ঘরের সবাই বলেন, তাই নাকি?
জয়ন্ত গর্বের হাসি হেসে বলে, হ্যাঁ। ও তো আমার ভেরি ক্লোজ ফ্রেন্ড।
হেড ক্লার্ক গিরীশবাবু সবার সামনেই বলেন, সারাজীবন এই স্টিফেন হাউসের কেরানিগিরি করছি বলে দুনিয়ার সবাই ঘেন্না করতো কিন্তু মনীশের দয়ায় এখন বাজারে আমাদের প্রেস্টিজ বেড়ে গেছে।
মনীশ বলে, গিরীশদা, প্লীজ ঐ দয়াটয়া বলবেন না।
সে না হয় নাই বললাম কিন্তু তুমি যে আমাদের প্রেস্টিজ বাড়িয়ে দিয়েছ, সে বিষয়ে তো কোনো সন্দেহ নেই।
পিছন দিক থেকে শ্যামল আর অজিত প্রায় এক সঙ্গেই বলে, ঠিক বলেছেন গিরীশদা
কোম্পানির মালিক মিঃ চৌধুরী শুধু এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট শিপিংফ্রেট এলসি লাভ লোকসান ছাড়া কোনোদিন কোনো কথা বলেননি। তাছাড়া গিরীশদার মতো প্রবীণ কর্মীও ওর মুখে কোনোদিন হাসি দেখেননি। সেই মিঃ চৌধুরী নিজের চেম্বারে ঢোকার আগে এক গাল হাসি হেসে মনীশদাকে বলেন, আমার স্ত্রী আর দুই মেয়ে তো তোমার রীতিমত ভক্ত হয়ে উঠেছে। একদিন তোমাকে বাড়িতে নিয়ে যাবো।
মনীশ উঠে দাঁড়িয়ে বলে, হ্যাঁ সার, নিশ্চয়ই যাবো।
চৌধুরী সাহেব নিজের চেম্বারে ঢুকে যেতেই গিরীশদা মুচকি হেসে বলেন, দেখলে তো মনীশ, তোমার জন্য বড় সাহেবের মনোভাবও কেমন বদলে গেছে। আগে উনি এ ঘর দিয়ে যাবার সময় আমাদের কারুর মুখের দিকেও চেয়ে দেখতেন না।
জয়ন্ত হাসতে হাসতে বলে, এ আর কী দেখছেন গিরীশদা। এর পর দেখবেন বড়সাহেব মনীশের পাশের চেয়ারে বসে আপনাদের সবার সঙ্গে চা খাচ্ছেন।
তা হতেই পারে। গিরীশদা কাজ করতে করতেই বলেন।
স্টিফেন হাউসের অন্যান্য অনেক অফিসের লোকজন মাঝে মাঝেই এ ঘরে ঢুকে বসে যান, মনীশবাবু, লেখাটা দারুণ হচ্ছে। মনীশ একটু হেসে বলে, ধন্যবাদ। লিফটএ ওঠা নামার সময় অনেক মেয়েপুরুষই ওকে দেখে জিজ্ঞেস করে, ভালো আছেন তো? দুচারজন মহিলা তো নিজেদের খুশি চেপে রাখতে পারেন না। ওকে দেখলেই বলেন, আমরা কিন্তু আপনার দারুণ ভক্ত হয়ে উঠেছি। মনীশ শুধু একটু হাসে কিন্তু এত মানুষের এত অভিনন্দন সত্ত্বেও যেন ওর মন ভরে না। এই স্টিফেন হাউসের যে মেয়েটিকে নিয়ে ও গল্প লিখে সাহিত্য জগতে প্রবেশাধিকার পেল, সে তো কোনোদিন কিছু বলল না; এখনও মাঝে মাঝে লিফটএ ওঠানামার সময় দেখা হয় কিন্তু একবার দুচোখ তুলে তাকায় না। মনীশ মনে মনে ভাবে, ও কী জানে না আমি ওকে নিয়েই লিখেছি? কিন্তু তা কী করে সম্ভব? ঐ মেয়েটি ছাড়া আর কারুর সঙ্গেই সার্কুলার রেলের কামরায় দেখা হয়নি। নাকি ঐ মেয়েটি গল্প উপন্যাস পড়ে না? না, না, তা কখনই নয়। যদি সাহিত্যটাহিত্য বিষয়ে কোনো আগ্রহই না থাকতো, তাহলে কী ওকে বইমেলায় দুতিনদিন দেখি?
যাই হোক যত দিন যায়, তত ওর খ্যাতি ছড়ায়। বুলা বলে, জানো দাদা, আমাদের স্কুলের চারপাঁচজন মিসরা তোমার সঙ্গে আলাপ করার জন্য পাগল। কচি বলে, আমাদের লাইব্রেরিয়ান স্যার বলছিলেন, কী একটা ফাংশানে তোমাকে নিয়ে যাবেন।
মনীশ কিছু বলে না কিন্তু শুনে খুশি হয়।
ওর মা হাসতে হাসতে বলেন, তুই লিখছিস বলে কিছু কিছু মেয়ে তো আমার সঙ্গেই গল্প করতে আসে।
