অফিসেও একটা না একটা কিছু লেগেই আছে। সামনের মাসে ত্রিদিববাবুর রিটায়ারমেন্ট। তাই শনিবার তার বিদায় সংবর্ধনা। ও মাসের প্রথম শনিবার ফুলেশ্বরে পিকনিক। পিকনিক থেকে ফিরে আসতে না আসতেই জয়ন্ত মুচকি হেসে একটা কার্ড এগিয়ে দিল।
খামের উপর প্রজাপতির ছবি দেখেই মনীশ জিজ্ঞেস করে, কার বিয়ে? তোমার?
না, আমার ছোট বোনের।
ও! তাই নাকি? এক মুহূর্তের মধ্যে মনীশ ভেবে নেয়, তাহলে এ বিয়েতে না গেলেও চলবে।
জয়ন্ত একটু থেমে বলে, ভাই, আমার বাবা নেই। আমিও সব চাইতে বড়। সব দায়িত্বই আমার। তাই তোমরা সবাই না হলে হয়তো বিপদে পড়ে যাব।
মনীশ সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বলে, কিছু চিন্তা করো না। তোমার বোনের বিয়ে মানে তো আমাদেরও বোনের বিয়ে।
আরো কত কি! আজ এক অসুস্থ সহকর্মীকে হাসপাতালে দেখতে যাবো তো গামীকাল পাশের টেবিলের বিকাশবাবুর ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি।
প্রচণ্ড কাজের চাপের উপর এসব উপরি পাওনা। সরকারি অফিস না যে এগারটায় এসে চারটেয় চলে যাও। মাঝে ঘণ্টাখানেক টিফিনের ছুটি। ঠিক সাড়ে নটায় অফিস ঢুকতে হয়। সাড়ে পাঁচটায় ছুটির কথা কিন্তু অধিকাংশ দিনই সাড়ে ছটার আগে বেরুতে পারে না মনীশ।
তবে অফিস থেকে বেরিয়েই মনীশ বাড়ি ফেবে না। আপনমনে ঘুরে বেড়ায় ডালহৌসী-এসপ্লানেড বা ইডেন গার্ডেনের পাশে, গঙ্গার ধারে। রোমন্থন করে সারাদিনের স্মৃতি।
এইভাবেই দিনগুলো কেটে যায়। শেষ হয় মাসের পর মাস। ঘুরে যায় একটি বছর।
টুকটাক পড়াশুনা করলেও মনীশ কিছু লেখার অবকাশ পায়নি গত তিন বছরে। হঠাৎ সেদিন রাত্রে খেয়াল হতেই ও চমকে ওঠে।
দিন সাতেক পরে মনীশ অফিস থেকে বেরিয়েই নিজে হাতে জিপিওতে লেখাটা পোস্ট করে দিল। মনে মনে ঠিক করল, যদি ছাপা হয়, তাহলে লিখবে; হয়তো এই শেষ। মনে মনে আশা করেছিল, মাসখানেকের মধ্যেই লেখাই ফেরত আসবে। অথবা… …অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাইতেছি, আপনার গল্পটি আগামী কানো এক সংখ্যায় প্রকাশিত হইবে এবং…
ভাবতে গিয়েও মনীশের হাসি পায়। ওর মতো লোকের প্রথম লেখাই যদি ছাপা হয়, তাহলে আর কথা ছিল না। তাও আবার সর্বজনপ্রিয় স্বদেশ পত্রিকায়।
লেখাটি অমনোনীত হবার চিঠি যদি কোনো কারণে মার হাতে পড়ে, সেই ভয়ে মনীশ ছদ্মনামে লিখেছে। অমনোনীত হলে মা দুঃখ পাবেন। তাছাড়া অমনোনীত হবার ঠিটি যদি পিওন ভুল করে পাশের বাড়ি বা সামনের বাড়িতে বিলি করে, তাহলে কে না ওকে উপহাস করবে? খারাপ খবর তো হাওয়ায় উড়ে যায়!
কিন্তু তিন মাস পরও মনোনীত বা অমনোনীত হবার কোনো চিঠি না পেয়ে মনীশ ভাবল, বোধহয় লেখাটি হারিয়ে গেছে। অথবা শতসহস্র লেখার ভীড়ে লেখাটি চাপা পড়ে আছে। একবার ভেবেছিল, স্বদেশ অফিসে গিয়ে খবর নেয় কিন্তু সাহসে কুলোয়নি।
প্রতিদিনের কাজকর্ম দায়দায়িত্বের চাপে মনীশ যখন লেখাটির কথা প্রায় ভুল বসেছিল, তখন একটা অঘটন ঘটে বসল।
.
ছুটির পর নীচে নামার জন্য লিফটএ চড়তেই পেছন দিক থেকে দুটি মেয়ের কথাবার্তা শুনে মনীশ চমকে ওঠে–আমি বলছি, এই স্টিফেন হাউসেরই কেউ এই লেখা লিখেছে।
তার কোনো মানে নেই। এই বিল্ডিংএ কী কম বাইরের লোক আসে?
তা ঠিক কিন্তু এত নিখুঁত ছবি কি বাইরের কেউ লিখতে পারবে?
যাই হোক লেখাটা চমৎকার। ভদ্রলোকের হাতটি ভারি মিষ্টি।
আমারও দারুণ লেগেছে কিন্তু এই লেখকের লেখা আর কোথাও পড়েছি বনে মনে হয় না।
না রে, আমিও কোনদিন এর লেখা পড়িনি।
মনীশ ওদের কথাবার্তা শুনে উত্তেজনায় ছট ফট করে কিন্তু চঞ্চলতায় পেছন ফি তাকাতে পারে না।
কিন্তু কোন মেয়েটিকে নিয়ে লিখেছে বলতো?
এই বাড়িতে এত মেয়ে কাজ করে যে ঠিক ধরতে পারা মুশকিল।
থার্ড ফ্লোর থেকে একটি মেয়ে লিফটএ ওঠানামা করে, তারা চেহারা হাব-ভাবের সঙ্গে
অন্য মেয়েটি উত্তর দেবার আগেই লিফট নীচে পৌঁছে যায়।
মনীশ প্রায় পাগলের মতো ছুটে গিয়ে এক কপি স্বদেশ হাতে নিয়ে সূচিপত্র দেখে আনন্দে খুশিতে ঝলমল করে ওঠে। এক কপি, দু কপি না, চার কপি কাগজ কিনল। মাসের প্রায় শেষ। তবু মোড়ের মাথার নরেন্দ্র মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে কুড়ি টাকার মিষ্টি কিনে বাড়ি ঢুকল।
নাও মা, মিষ্টি খাও। মনীশ হাসতে হাসতে বলে, বুলা আর কচিকেও দাও
তা তো দেব কিন্তু হঠাৎ এত মিষ্টি আনলি কেন?
ইচ্ছে হল, তাই আনলাম।
তাই বলে এত মিষ্টি?
মনীশ হাসতে হাসতে বলে, বেশি তর্ক করলে তোমাকে একলা এইসব মিষ্টি খাইয়ে ছাড়ব
পাঁচসাতদিন পর ও অফিস থেকে ফিরতেই মা বললেন, হ্যাঁরে, দুপুরের ডাকে তোর একটা প্যাকেট এসেছে। টেবিলের উপর রেখে দিয়েছি।
ও! তাই নাকি?
মনীশ দৌড়ে ঘরে যায়। দেখে, দুকপি পত্রিকা ছাড়াও সম্পাদক ছোট্ট একটা চিঠি লিখেছেন–আপনার লেখাটি ছেপে সত্যি আনন্দ পেয়েছি। পত্রিকা প্রকাশের সঙ্গে লেখাটির প্রশংসা করে কয়েকজন টেলিফোনও করেছেন। যাই হোক দুএকদিনের মধ্যে একবার দেখা করলে ভালো হয়।
মনীশ আনন্দে খুশিতে বার বার চিঠিটা পড়ে। ইচ্ছে করে তখনই ছুটে যায় স্বদেশ ফিসে কিন্তু না, যায় না। নিজেকে সংযত করে। পাঁচসাতদিন পরে যায়।
প্রবীণ সম্পাদক ওকে দেখেই অবাক–তোমার এত অল্প বয়স? আমি তো ভেবেছিলাম, অন্তত পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ হবেই।
মনীশ হেসে বলে, আমি গত মাসেই পঁচিশে পড়েছি।
হ্যাঁ। তাই তো দেখছি। সম্পাদক একটু হেসে বলে, কিন্তু এই বয়সেই তোমার লেখার বেশ মুন্সীয়ানা আছে। তাছাড়া তোমার হাতটি খুব মিষ্টি।
