শ্রীরাধা বলে, ঋষিদা, ও ঘরে চলো।
দশপনেরো মিনিট পর শুভশ্রী দেবী পর্দা সরিয়ে ও ঘরে ঢুকতে গিয়েই থমকে দাঁড়ান।
ঋষি দুহাত দিয়ে শ্রীরাধার মুখখানা ধরে বলে, অন্য কোনো মেয়েকে নিয়ে ঘর করব বলেই কী গত দশ বারো বছর ধরে তোমার ছবি পার্সে নিয়ে ঘুরছি?
শুভশ্রী দেবী এক লাফে স্বামীর কাছে ছুটে গিয়ে বলেন, তুমি এক্ষুনি ঠাকুর মশায়ের কাছে যাও। ঋষির বিয়ের দিন দেখতে হবে।
সৌমিত্রবাবু হতবাক হয়ে কোনোমতে বলেন, কিন্তু…
শুভশ্রী দেবী এক গাল খুশির হাসি হেসে স্বামীকে জড়িয়ে ধরে বলেন, তোমার ছেলে শ্রীরাধাকেই বিয়ে করবে।
তাই নাকি?
তবে আর বলছি কী?
সৌমিত্রবাবু বারান্দায় গিয়ে পাগলের মতো চিৎকার করেন, রাঙা বৌদি, শিগগির এক হাঁড়ি রসগোল্লা নিয়ে এসো।
প্রথম নায়িকা
কে স্বপ্ন দেখে না?
সবাই স্বপ্ন দেখে। শৈশবে, কৈশোরে, যৌবনে। সব শিশুই স্বপ্ন দেখে, পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে মেঘের রাজ্য জয় করার দুদিন পর স্বপ্ন দেখে, রেলগাড়ির ইঞ্জিন চালাবার। বা উড়োজাহাজ নিয়ে উড়ে বেড়াবার।
স্বপ্ন বদলে যায় কৈশোরে, বদলে যায় যৌবনে। যৌবনে স্বপ্নের মিছিল আসে। তখন চোখে কত রকমের কত স্বপ্ন। মনে কত আশা।
স্বপ্ন দেখার শেষ নেই প্রৌঢ়ত্বে, বার্ধক্যেও। তখন নাতিনাতনীকে নিয়ে মানুষ স্বপ্ন দেখে; স্বপ্ন দেখে সুখের সংসার রেখে বিদায় নেবার। হয়তো আরো কত কি।
মনীশও স্বপ্ন দেখেছে। সেই স্কুলে একটু উঁচু ক্লাসে ওঠার পর থেকেই ওর চোখে এক স্বপ্ন। সাহিত্যিক হবে। সেই এক স্বপ্ন বুকে নিয়েই কলেজের দিনগুলো কাটিয়ে এম. এ. পড়তে শুরু করল।
কী মনীশ, কী নিয়ে পড়ছো?
ডাক্তারবাবুর প্রশ্ন শুনে মনীশ একটু হেসে বলে, বাংলা নিয়ে পড়ছি।
বাংলা নিয়ে? ডাক্তারবাবু যেন ইলেকট্রিক শক্ পান। ওর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলেন, একি বিদ্যাসাগরবঙ্কিমের যুগ যে বাংলা নিয়ে এম এ. পাশ করার সঙ্গে সঙ্গেই…
মনীশ আর শুনতে চায় না। বলে, আমি বরাবরই ঠিক করেছিলাম, বাংলা নিয়ে পড়ব।
তারপর কী করবে?
মনীশ জবাব দেবার আগেই ডাক্তারবাবু বলেন, বাংলায় এম. এ. পাশ করে হয় স্কুলে মাস্টামি, নন হয় কলেজে…। উনি পুরো কথাটা শেষ না করেই একটু থেমে বলেন, তুমি এত ভালো ছেলে হয়েও কেন যে সায়েন্স নিয়ে পড়লে না, তা ভেবে পাই না।
শুভাকাঙ্ক্ষী হলেও ডাক্তারবাবুর কথায় মনীশ দুঃখ পায়। স্বপ্নরাজ্যের রাজপ্রাসাদের একটা পাথর খসে পড়ে। তবে মনে মনেই ডাক্তারবাবুকে জবাব দেয়, সবাই কী ডাক্তার এঞ্জিনিয়ার হতে পারে? না কি হওয়া উচিত? সবাই যদি ডাক্তারএঞ্জিনিয়ার হয়, তাহলে সমাজ চলবে কী করে? কারা স্কুলকলেজে পড়াবে? অফিসের কর্মী আসবে কোথা থেকে? কোর্টকাছারিতে মামলামোকদ্দমা সামলাবে কারা?
ইউনিভার্সিটির ক্লাস শেষ হবার পর মনীশ কলেজ স্ট্রিট পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়। বইয়ের দোকানগুলো দেখে আর মনে মনে ভাবে, একদিন নিশ্চয়ই ওর বই দিয়ে এই দোকানগুলো সাজানো হবে। ওর বই পড়ে মুগ্ধ হবে হাজার হাজার পাঠকপাঠিকা। প্রতিদিন কত চিঠি আসবে ওদের কাছ থেকে।
তারপর?
আমন্ত্রণ আসবে সভাসমিতি থেকে। ওকে দেখার জন্য উপচে পড়বে ভীড়। মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওরা ওর কথা শুনবে।
তারপর?
হাজার হাজার ছেলেমেয়ে ঘিরে ধরবে ওর অটোগ্রাফের জন্য, ছবি তোলার লোভে।
স্বপ্ন দেখতে দেখতে মনীশ একটু হাসে। হাসবে না। সুন্দরী শিক্ষিতা ধনীর দুলালী মনপ্রাণদেহ সমর্পণ করতে চাইলে হাসি পাবে না?
তারপর হঠাৎ ঝড় ওঠে। ভেঙে চুরমার হয়ে যায় সব স্বপ্ন। এমন কি পায়ের তলার মাটিও যেন সরে যায়। লেখাপড়া শেষ না করেই মনীশ চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায়।
এখন ওর চোখে নতুন স্বপ্ন–চাকরি চাই! বাঁচতে হবে। বাঁচাতে হবে সদ্য বিধবা মাকে, ভাইবোনকে।
.
হেমন্তবসন্তের মতো গ্রীষ্মবর্ষাও তো চিরস্থায়ী নয়। দুপুরের ডাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়েই মনীশ আনন্দে খুশিতে চিৎকার করে ওঠে, মা, চাকরি পেয়েছি।
মা আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলেন, আমি জানতাম, চাকরি তুই পাবিই। দুদিন আগে বা দুদিন পরে কিন্তু….
আঁচলের কোণা দিয়ে মুখ চেপে ধরে চাপা কান্না কাঁদতে কাঁদতে উনি বলেন, তোর বাবা তো নিজে মরলেন না, তোর ভবিষ্যৎটাও মেরে গেলেন।
মনীশ ওর মাকে জড়িয়ে একটু হাসতে হাসতে বলে, কে বলল, আমার ভবিষ্যৎ নেই? যারা দুঃখেকষ্টে অতি সাধারণভাবে জীবন কাটায়, তারাই তো সত্যিকার সাহিত্যিক হয়।
সারাদিন কেরানিগিরির পর তুই আবার লেখালেখি করবি, তাহলেই হয়েছে।
হ্যা মা, সারাদিন কেরানিগিরি করার পরই আমি লিখব।
আমাকে ভোলাবার চেষ্টা করিস না।
না মা, আমি তোমাকে ভোলাচ্ছি না; সত্যি কথাই বলছি।
না, মনীশ মাকে মিথ্যা আশ্বাস দেয়নি। ডালহৌসী পাড়ার স্টিফেন হাউসের এই অফিসে বসে সারাদিন কলম পিষতে পিষতেও ও স্বপ্ন দেখে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, ডালহৌসী পাড়ার জনারণ্যে হারিয়ে যাবে না কিন্তু তবু ভেসে যায় দায়িত্বকর্তব্য আর পরিবেশের চাপে। জোয়ারে।
ওকে বাজারহাট করতে না হলেও দুই ভাইবোনের পড়াশুনা দেখতে হয়, দেখাতে হয়। তাছাড়া টুকটাক এখানেওখানে যেতেই হয়। বাবা মারা যাবার সঙ্গে সঙ্গেই তে সামাজিক দায়দায়িত্ব শেষ হয়নি! আজ বুড়ি মাসীর মেয়ের বিয়ে, কাল রাঙা পিসীর ফুলের বিয়ে বা বড় মাসীর নাতির অন্নপ্রাশন তো লেগেই আছে। যেমন সময় নষ্ট তেমনি টাকার শ্রাদ্ধ। তবু মুখে হাসি নিয়ে মনীশকে এইসব দায়িত্ব পালন করতে হয়।
