ঐ মোটা ফাল্গুনীকে আমি ভালোবাসতাম, এ কথা কেউ বিশ্বাস করবে না।
পাড়ার এই পরিবেশেই সৌমিত্রবাবু বড় হয়েছেন। শুভশ্রী দেবীও তো এখানে তিরিশ বছর কাটিয়ে দিলেন। প্রায় সামনাসামনি বাড়ির মানিকবাবু সৌমিত্রবাবুর প্রিয় রাঙাদা। দুচার বছরের বড় হলেও রাঙাদা ওঁর ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। ঐ রাঙাদার সঙ্গেই উনি জীবনের প্রথম টেস্ট ম্যাচ দেখেছেন, স্টাররঙমহলে কত বিখ্যাত অভিনেতাঅভিনেত্রীর অভিনয় দেখেছেন। আরো কত কি!
একটু ভালোমন্দ রান্না করলেই রাঙা বৌদি বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটু গলা চড়িয়ে বলেন, এই শুভশ্রী, আনন্দ ঠাকুরপোর জন্য একটু মাছ পাঠাচ্ছি।
শুভশ্রী হাসতে হাসতে বলেন, এ বাড়িতে কি শুধু তোমার আনন্দ ঠাকুরপোই থাকে?
উনিও হাসতে হাসতে বলেন, ভুলে যাও কেন, আনন্দ ঠাকুরপো আমার একমাত্র বয়ফ্রেন্ড!
তারপর ঋষি হবার পর মানিকবাবুর স্ত্রী মাধুরী দেবীকে দেখলেই ও খিল খিল করে হেসে ওর কোলে যেত। মানিকবাবুর বড় মেয়ে অনুরাধা বলতো, মা, ভাইয়াকে বাড়ি নিয়ে চল।
এই অনুরাধার জন্যই মাধুরী দেবী ঋষিকে বাড়ি নিয়ে যেতেন। ঋষিও মহানন্দে সারাটা দিন কাটাতো।
কবছর পর ঋষি স্কুল যাতায়াত শুরু করল। ও স্কুল থেকে নেমেই এক দৌড়ে বাড়ির সামনে এসেই চিৎকার করতো, রাঙামা, আমার ছুটি হয়ে গেছে।
মাধুরী দেবী দোতলায় দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে বলেন, এক দৌড়ে উপরে উঠে এসো। আমি তোমার জন্য কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি।
উল্টো দিকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে শুভশ্রী একটু হেসে মাধুরী দেবীকে বলেন, এ ছেলেটা বোধহয় ভুল করে আমার পেটে জন্মেছে।
উনি ঋষিকে কোলে তুলে নিয়ে ভিতরে যাবার আগে হাসতে হাসতে বলেন তুই আর তোর বর যে আমার ছোট মেয়েটাকে কেড়ে নিয়েছিস?
অনুরাধা জন্মের বছর খানেক পর সৌমিত্রবাবুর সঙ্গে শুভশ্রীর বিয়ে হয়। অনুরাধা নতুন কাকা নতুন কাকিমার অসম্ভব ভক্ত হলেও শ্রীরাধার মতো ওদের কাছে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর দিনরাত্তির কাটায়নি। অবশ্য তার কারণ ছিল, শ্রীরাধা যখন মাত্র তিন মাসের, তখন ওর মার একটা বড় অপারেশন হয়। তিন সপ্তাহ পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে এলেও ঐটুকু শিশুর সব দায়িত্ব পালন করা অসম্ভব ছিল। ডাক্তারেরও নিষেধ ছিল। তখন দীর্ঘদিন শ্রীরাধা শুভশ্রীর কাছেই থেকেছে। ও যত বড় হয়েছে, এ বাড়ির সঙ্গে ওর সম্পর্ক তত গম্ভীর হয়েছে।
ছোটবেলায় শ্রীরাধা কিছুতেই নতুন কাকিমা বলতে পারতো না। তারপর আস্তে আস্তে নতুন মা বলতে শুরু করে।
দেখতে দেখতে গঙ্গা দিয়ে কত জল গড়িয়ে গেল।
অনুরাধা বিয়ের পর পরই কানাডা চলে গেল। ঋষি মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করেই এম এস পড়ার জন্য চণ্ডীগড় গেল। শ্রীরাধা ইউনিভার্সিটিতে এম এ পড়ে।
এখন?
এ বাড়ির সব ব্যাপারেই শ্রীরাধার কথাই শেষ কথা।
নতুন কাকা, এই জামাটা তুমি আর পরবে না।
নিজের জামাটার দিকে একবার তাকিয়েই সৌমিত্রবাবু বলেন, কেন রে রাধা? জামাটা তো ভালোই আছে।
কাঁচতে কাঁচতে রঙ কত ফেড হয়ে গেছে দেখেছ?
কোনো উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই শ্রীরাধা অত্যন্ত গুরুগম্ভীর হয়ে চরম সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়, তোমার অনেক ভালো ভালো জামা আছে। তোমাকে আর এই জামাটা পরতে হবে না।
শুভশ্রী দেবী সঙ্গে সঙ্গে বলেন, রাধা, তুই ঠিক বলেছিস!
সৌমিত্রবাবু একটু হেসে আত্মসমর্পণ করেন, ঠিক আছে; এই জামাটা আর পরব না।
শুভশ্রী দেবীর মা প্রায়ই নাতির খোঁজখরব নেবার জন্য এ বাড়িতে এসে মেয়েকে জিজ্ঞেস করেন, হারে, ঋষির চিঠি এসেছে?
শুভশ্রী কোনো জবাব দেবার আগেই শ্রীরাধা হাসতে হাসতে বলে, ও দিদ, তোমার নাতি আজকাল তোমাকে কোনো লাভলেটার লিখছে না।
উনি এক গাল হাসি হেসে জবাব দেন, আমাদের দুজনেব প্রাইভেট অ্যাফেয়ার্সে তোর এত উৎসাহ কেন?
শ্রীরাধাও হাসতে হাসতে বলে, তুমি যাই বল দিদা, তোমার অমন পেটুক লোভ বয়ফ্রেন্ডের নাম যে ঋষি রাখলে কেন, তা আমার মাথায় আসে না।
আমার নাচ দেখে যে ওর তপোভঙ্গ হয়েছে, তাই তো ও আমার ঋষি!
গঙ্গার জল আরো গড়িয়ে যায়।
শ্রীরাধা গত বছরই এম এ পাস করেছে। মানিকবাবু মেয়ের বিয়ে দেবার আগ্রহ প্রকাশ করতেই ও সোজা বলে দিয়েছে, আমি এখন বিয়েটিয়ে করব না। রিসার্চ করব।
এদিকে ঋষি এম এস পাস করতেই ওর বাবামা ছেলের বিয়ে দেবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। চাকরিবাকরি বা প্রাইভেট প্রাকটিশ শুরু করার আগে, বিয়ে করতে ঋষিরও আপত্তি নেই; তবে ওর বাবামা খুব ভালো করেই জানেন, ঋষি বিয়েতে কোনো যৌতুক বা উপহার কিছুতেই নেবে না।
যাই হোক, খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেবার পর এত চিঠিপত্র ও মেয়ের ছবি এলেও একজনকেও শ্রীরাধার পছন্দ হল না। দুএকটি মেয়ের ব্যাপারে শুভশ্রী দেবী একটু আগ্রহ দেখালেও উনি স্বামীকে বললেন, কোনো মেয়েকেই তেমন ভালো লাগল না। তবে দু একটি মেয়েকে দেখা যেতে পারে।
শ্রীরাধা সঙ্গে সঙ্গে বলে, তোমরা কেন ঐ ঝামেলায় যাচ্ছো? রবিবার ঋষিদা এলে সব চিঠিপত্তর আর ছবি তার হাতে তুলে দিও। তারপর সে যাকে ইচ্ছে, বিয়ে করুক।
সৌমিত্রবাবু সঙ্গে সঙ্গে বললেন, সেই ভালো।
শুভশ্রী দেবী পাশ ফিরে বললেন, হ্যাঁরে, রাধা, চিঠি আর ছবিগুলো সাবধানে রেখে দে।
ভয় নেই নতুন মা, এইসব অপ্সরীদের ছবি আমি অযত্নে রাখব না।
শ্রীরাধা হাসতে হাসতে ও ঘরে চলে যায়।
রবিবার।
মানিকবাবু অফিসের কাজে বাঙ্গালোর গিয়েছিলেন বলে সৌমিত্র রাঙা বৌদিকে নিয়ে স্টেশনে গেলেন। ঋষিকে নিয়ে বাড়ি আসার পর হইহুঁল্লোড়ের মধ্যেই ঘণ্টা খানেক কেটে গেল। তারপর মাধুরী দেবী বাড়ি চলে যেতেই শুভশ্রী দেবী বললেন, হ্যাঁরে, রাধা, ঐ ছবিগুলো ঋষিকে দেখা তো!
