শ্রীবাধা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়, দরকার হলে ঋষিদা চিরকুমার থাকবে কিন্তু এইসব পেত্নীদেব কাউকে সে কখনই বিয়ে করবে না।
বড় বাস্তা দিয়ে ট্রামেবাসে যাতায়াত করার সময় লোকে ঠিক চারু এভিন্যুকে চিনতে পারে না। মোটামুটি শত খানেক বাডি; এই পাড়ার প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকে শুধু জানাশুনাই নেই, প্রায় আত্মীয়ের সম্পর্ক। চৌরঙ্গি পাড়ার মিঃ বর্মন এখানে বর্মনদা বর্মনকাকু, বেডিওটিভি,খববেব কাগজ খ্যাত বিখ্যাত সাংবাদিক শ্যামল বসু এখানে শ্যামলদা, সাহেবী স্কুলের গুরুগম্ভীর মিস এ পাড়ার শ্যামলী বৌদি। এ পাড়ায় কেউ মিঃ ব্যানার্জি, মিসেস দত্ত না, ওঁরা এখানে বিমলকাকু আর ডলিমাসি।
কলকাতার মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া মুশকিল হলেও এ পাড়া নিয়ে বাসিন্দাদের গর্বের শেষ নেই। এই পাড়ার ব্যাপারে বন্ধুবান্ধব একটু ভাট্টা করলেই মিঃ বর্মন হাসতে হাসতে বলেন, তোরা ভুলে যাস না, চারু এভিন হচ্ছে কলকাতার নিউ ইয়র্ক। এখানে সব রাস্তা শুধু নর্থসাউথ ইস্টওয়েস্টই না, সবই নাইনটি ডিগ্রি অ্যাংণেলে। তোরা যে চৌরঙ্গি নিয়ে গর্ব করিস সেও তো ধনুকের মতো বেঁকে গেছে।
আজকের বয়স্করা গর্ব কবে ছেলেমেয়েদের বলেন, আমবা প্রত্যেকবার পরীক্ষা দিতে যাবার সময় কবিশেখর কালিদাস রায়কে প্রণাম করে যেতাম। পরীক্ষা দিয়ে বিকেলবেলায় বাড়ি ফেরার সময় দেখতাম, উনি বাড়ির সামনের ঐ ছোট্ট চাতালে ইজিচেয়ার পেতে বসে আমাদের জন্য হাঁ করে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছেন।
হারে, চিন্ময়, আজ কেমন হলো?
ভালোই।
কোনো পেপারটা বেশি ভালো হল?
সেকেন্ড পেপার।
কবিশেখর যেন আপন মনেই বলেন, অধিকাংশ ছেলেমেয়েরাই সেকেন্ড পেপারে বেশি নম্বর পায়।
চিন্ময় দত্ত বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই কবিশেখর একটু গলা চড়িয়ে ডাক দেন, এই গোবিন্দ।
গোবিন্দ সামনে এসে দাঁড়াতেই উনি জিজ্ঞেস করেন, সব কোশ্চেন লিখেছিস?
মেন কোশ্চেনগুলো লিখেছি কিন্তু শর্টনোটগুলো পারলাম না।
কবিশেখর একটু চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করেন, কেন? ওগুলোতেই তো নম্বর তোলা সহজ।
জেঠু, জাজনগর কোথায়?
একটু হেসে উনি জবাব দেন, মুসলমান আমলে উড়িষ্যার নাম হয় জাজনগর।
তাই নাকি?
হ্যাঁ।
আচ্ছা জেঠু, বান্দা কে?
কবিশেখর বলেন, শিখদের দশম গুরু গোবিন্দ সিং খুন হবার পর বান্দা শিখদের রাজনৈতিক নেতা হন। পরবর্তীকালে মুঘল বাদশা এর দুই ছেলেকে ওর চোখের সামনে হত্যা করেই ক্ষান্ত হন না; ওরা বান্দাকে হাতির পায়ের তলায় পিষে মারে।
গোবিন্দ একগাল হাসি হেসে বলে, জেই, আপনি ইতিহাসের সবকিছু জানেন!
কবিশেখর একটু হেসে বলেন, মাস্টারি করতে হলে সব বিষয়ই একটু আধটু জানতে হয়।
নবপল্লীর পূজা প্যান্ডেলে অমিয়র স্ত্রী শিখাকে দেখেই শ্যামল একটু হেসে বলে, অনেক ভাগ্য করে এ পাড়ায় বউ হয়ে এসেছ, বুঝলে?
শিখা কোনো জবাব দেয় না; শুধু একটু হাসে।
এই পূজা প্যান্ডেলে কদিন এলেই বুঝবে, এখানে আমরা সবাই সবার আত্মীয়। তোমার শ্বশুরশাশুড়ীকে আমি তো জন্ম থেকেই মেজ জেঠু-মেজ মা বলে জানি। সৌমিত্রদার স্ত্রী আমাদের এ পাড়ায় নতুন বৌমা নতুন মাসি নতুন বৌদি।
শ্যামল একটু হেসে বলে, আমি অবশ্য বলি, নতুন বৌঠান।
হ্যাঁ, আমিও ওঁকে নতুন মাসি বলি।
শ্যামল শিখার কথা কানে না তুলেই হাত দিয়ে হলদে দোতলা বাড়িটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে, ওটা কার বাড়ি জানো?
ভানু ব্যানার্জির।
দুনিয়ার মানুষ ওঁকে চিনতো বিখ্যাত অভিনেতা বলে কিন্তু আমরা ওঁকে চিনেছি সৎ, আদর্শবান, পরোপকারী ও অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত বলে। বিজয়া নববর্ষের দিন বাবামাকে প্রণাম করেই ছুটে যেতাম ভানু মামা নীলিমা মামীকে প্রণাম করতে।
শিখা চুপ করে ওর কথা শোনে।।
শ্যামল একবার নিঃশ্বাস নিয়েই বলে, ভানু মামা মারা যাবার দিন এ পাড়ার কচিকাঁচা থেকে বুড়োবুড়িরা কী কান্নাকাটি করেছিলেন, তা তুমি ভাবতে পারবে না।
অমিয় এর মধ্যে কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, ওরা খেয়াল করেনি। শ্যামলের কথা। শুনে সে বলে, সত্যি, সে দিনের কথা কোনোদিন ভুলব না।
শিখা মাথার ঘোমটা একটু সামনের দিকে টেনে দিয়েই বলে, নীলিমা মামীও খুব ভালো।
শ্যামল কিছু বলার আগেই অমিয় ওর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলে, নীলিমা মামী ভালো। মানে, অসম্ভব ভালো। অত বিখ্যাত অভিনেতার স্ত্রী ও নিজে অত বড় গাইয়ে হওয়া সত্ত্বেও কী অমায়িক আর ভদ্র!
এ পাড়ার ছেলেমেয়েদের মধ্যেও ভারি মজার সম্পর্ক। চন্দন, বিনু বাবলুরা রোজ সন্ধের পর ঐ মোড়ের মাথায় বাড়জ্যের বাড়ির পিঁড়িতে বসে আড্ডা দেয়। গ্যারেজের মধ্যে কেষ্টদার দোকান থেকে অনুরাগ বেরুতেই চন্দন ডাক দেয়, এই অনু, শোন!
আমূল স্পের টিন হাতে নিয়ে অনুরাগ ওদের সামনে এসেই বলে, বল।
তোর কেক খেলাম।
বাবলু সঙ্গে সঙ্গে বলে, হারে অনু, তুই ওদের কেক দিয়েছিস আর আমাদের দিলি না?
এর আগের বার যখন কেক করেছিলাম, তখনই তো তুই খেয়েছিস।
চন্দন বাবলুর হাঁটুতে একটা থাপ্পড় মেরে বলে, তুই চুপ কর। আমাকে বলতে দে।
অনুরাগ বলে, বল, বল, কি বলবি। আমি পড়তে পড়তে উঠে এসেছি।
চন্দন চাপা হাসি হেসে বলে, তোর তৈরি কেক আমরা খাচ্ছি, সেই ভালো কিন্তু ভুল করেও কখনো স্বামীকে খাওয়াবি না। ঐ কেক খাওয়ার পরদিনই তোর স্বামী তোকে ঠিক ডিভোর্স করবে।
ওর কথায় সবাই হেসে ওঠে।
অনুরাগ বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েই হাসতে হাসতে বলে, সামনের মাঘেই তো তোর বিয়ে। তোর বউয়ের কাছে আমি সব ফাস করে দেব। তখন মজা বুঝবি!
