ভাবতে গিয়েও একটু হাসি। সর্বত্যাগী বিপ্লবী অনাদিদার ঘর। ভাবভোলা অনাদিদার ঘর। কিন্তু ঘরের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারছি, এই ভাবভোলা বাউন্ডুলে জীবনেও নিশ্চয়ই কোনো অভয়া বা রাজলক্ষ্মীর আবির্ভাব হয়েছে।
হ্যাঁ, যা ভেবেছিলাম, ঠিক তাই। এই ভাঙাচোরা অন্ধকার ঘরের এক কোণায় একটা টুকরো জ্যোৎস্নার আলো। টুপটুপ করে গলে পড়ছে। ছড়িয়ে যাচ্ছে সারা ঘর। অনাদিদার মুখে। বুকে। প্রাণে। পাতারহাট গঞ্জের পাশের যমুনার মতই টল টল ঢল ঢল করছে তার যৌবন। রূপসী বাংলার নকসী কাঁথার মাঠ সোজন বাদিয়ার ঘাটে তাকে দেখেছি বার বার বহুবার। দেখেছি আম, জাম, কাঁঠাল, অশ্বত্থ, হিজলের বনে, দেখেছি কাশ বনে, ভোরের কুয়াশায়, জোনাকির আলোয়। এরই নাম অশ্রু? আমাকে দেখে এত লজ্জা?
.
খুব জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনাদিদা বললেন, তখন আমাব ফাঁসির হুকুম হয়ে গেছে। আছি আলিপুর জেলে। হঠাৎ একদিন অশ্রু তার স্বামীকে নিয়ে হাজির। ভেবেছিলাম, খুব কাঁদবে কিন্তু না, এক ফোঁটাও চোখের জল ফেলল না।
অনাদিদা একটু থামেন। একবার বুক ভরে নিশ্বাস নিয়ে বলেন, অশ্রু কি বলল জানিস?
কী?
বলল, না, অনাদিদা, তোমার ফাঁসি হতে পারে না। তুমি মরলে যে আমি বিধবা হবো।, না, তা হতে পারে না। কিছুতেই না।
অনাদিদা থামলেন। আমিও কোনো প্রশ্ন করি না। দুজনেই চুপ করে বসে থাকি। মনের মধ্যে এত কথা, এত স্মৃতি আনাগোনা করে যে কেউই কথা বলতে পারি না।
হঠাৎ বেয়ারা এসে ডাকল, সাব খানা তৈয়ার।
স্বপ্ন ভঙ্গ হল অনাদিদার। বোধহয় আমারও। ওঁর মুখে একটু ম্লান হাসির আভা। বললেন, শুনলি আমার অশ্রুর কথা?
মুখে কিছু বললাম না; শুধু মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ।
পাত্রী চাই
দুতিন দিন পরপরই খবরের কাগজের অফিস থেকে এক বান্ডিল চিঠি আসছে। প্রত্যেক চিঠির সঙ্গেই পাত্রীর রঙিন ছবি। কোনো কোনো বাবামা মেযের দুতিনটি ছবিও পাঠিয়েছেন। শুভশ্রী দেবী বিকেলের ডাকে আসা চিঠিপত্রগুলো একটু নাড়াচাড়া করতে করতেই একটু হেসে বলেন, এর সিকি ভাগ মেয়ে দেখে বিয়ে ঠিক করতে হলে তো আমার ছেলেটা বুড়ো হয়ে যাবে।
সৌমিত্রবাবু টিভিতে স্টেফি গ্রাফের খেলা দেখতে দেখতেই সিগারেটে একটা টান দিয়ে একটু হেসে বলেন, খবরের কাগজে কী লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়েছ মনে নেই?
বিজ্ঞাপন কি আমি লিখেছি? রাধা যেমন লিখেছে, আমি তেমনই…
ঠিক সেই সময় শ্রীরাধা পর্দা সরিযে ড্রইংরুমে ঢুকেই শুভশ্রী দেবীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, কী নতুন মা, আমি কী করেছি?
তোর নতুন কাকা বলছিল, কি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল…
দাঁড়াও, দাঁড়াও, আমি এক্ষুনি বলছি।
শ্রীরাধা প্রায় এক লাফে পাশের ঘর থেকে খবরের কাগজখানা এনেই পড়তে শুরু করে। পাত্রী চাই। দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত কায়স্থ (দত্ত) পরিবারের একমাত্র সন্তান। সুদর্শন স্বাস্থ্যবান সঙ্গীতপ্রিয আদর্শবান কলকাতার M. B. B. S. ও চণ্ডীগড় TI এর M S. পাত্রের (২৮) সুন্দরী শিক্ষিতা রুচিসম্পন্না পাত্রী চাই। পাত্র কোনোরকম যৌতুক বা উপহার গ্রহণে অক্ষম। সত্বর ছবি সহ লিখুন–বক্স নং..
শ্রীরাধা এক নিঃশ্বাসে বিজ্ঞাপনটা পড়েই সৌমিত্রবাবুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, নতুন কাকা, কিছু ভুল হয়েছে কি?
না, না, তুই ঠিকই লিখেছিস। উনি একটু থেমে একটু চাপা হাসি হেসে বলেন, তোর নতুন মা আর তোর ঋষিদা যা চায়, তুই তাই লিখেছিস।
তবে? শ্রীরাধা অবাক হয়ে গেল।
এত চিঠি এসেছে দেখে তোর নতুন মা অবাক হয়ে যাচ্ছে। তাই বলছিলাম যে, এমন বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে যে দুপাঁচ হাজার মেয়ের বাবা চিঠি লিখলেও তো অবাক হবার কিছু নেই।
শ্রীরাধা সঙ্গে সঙ্গে বলে, বিজ্ঞাপনে কী অব লিখেছিঃ ঋষিদার মতো ছেলে আর একটা খুঁজে বের করো তো
শুভশ্রী দেবী হাসতে হাসতে বলেন, তোর তো ধারণা, তোর ঝমিদার মতো ছেলে এ পৃথিবীতে আর নেই।
সত্যিই তাই। ঋষিদা ইজ ঋষিদা।
সৌমিত্রবাবু সিগারেটে শেষ টান দিয়ে একটু চাপা হাসি হেসে বলেন, সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই ঋষি আসবে। এর মধ্যে তোমরা দুজনে মিলে অন্তত চারপাঁচটা মেয়ে ঠিক করো যাদের আমরা দেখতে যাব।
শুভশ্রী দেবী চিঠিপত্রগুলো গুছিয়ে নিয়েই শ্রীরাধাকে বলেন, চল রাধা, আমরা ও ঘরে যাই
চলো।
ও ঘরে গিয়েই শুভশ্রী দেবী বিকেলের ডাকে আসা চিঠিপত্রগুলো শ্রীরাধার হাতে দিয়ে বলেন, দ্যাখ তো, এব মধ্যে কাউকে তোর পছন্দ হয় কি না।
শ্রীরাধা প্রথম খামটা খুলে ছবিটা দেখেই মনে মনে বলে, ইস! কী রুপের ছিরি
আগের কদিনের আসা চিঠিপত্র আর ছবিগুলো দেখতে-দেখতেই শুভশ্রী দেবীর কানে আসে শ্রীরাধার মন্তব্য–বাবারে বাবা! এ তো জলহস্তী! এর সঙ্গে বিয়ে দিলে ঋষিদা নির্ঘাত চৈতন্যদেবের মত সংসার ত্যাগ করবে।
ওব মন্তব্য শুনে শুভশ্রী দেবী চাপা হাসি হাসতে হাসতে বলেন, তোর ঋযিদা সন্ন্যাসী হয়ে যাকে নিয়ে সংসারী হতে পারবে, সেইরকম কি আছে, তাই বল
শ্রীরাধা ওর কথা কানে না তুলেই আরো দুএকটা ছবি দেখার পর আপন মনেই মন্তব্য কবে, কী সব রূপের ছিরি! এদের ছবি দেখেই তো আমার গা ঘিনঘিন করছে।
তাবপর আরো কয়েকটা ছবি দেখার পর হঠাৎ একটা ছবি শুভশ্রী দেবীর সামনে ধরেই শ্রীরাধা বলে, দেখ, দেখনতুন মা, মেয়েটার রুচি দেখ। ঋষিদা তত এর হাতের জলও খেতে পারবে না।
ওর হাত থেকে ছবিটা কেড়ে নিয়েই শুভশ্রী দেবী বলেন, তুই স্বর্গ থেকে একটা অপ্সরী ধরে আন। তা না হলে কাউকেই তোর পছন্দ হবে না।
