শুনে মুগ্ধ হয় অশ্রু। হঠাৎ অনাদিদার চোখ পড়ে–আরে! তুমি দাঁড়িয়ে কেন? এসো এসো।
সারাদিন স্কুল করেও ক্লান্তি অবসাদের ছাপ থাকলেও ঢাকা পড়ে গেছে তার খুশির স্পর্শে। অনাদিার এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেন না। পড়াতে শুরু করেন সঙ্গে সঙ্গে। পড়ার শেষে বলেন, আমি তো স্কুলের মধ্যেই সারাদিন থাকি। যখনই দরকার হবে চলে এসো। তাছাড়া ইচ্ছে করলে তুমি সব বিষয়ই আমার কাছে পড়তে পারো।
অশ্রু লজ্জায় খুশিতে কথা বলতে পারে না। মুখ নীচু করে চলে যায়।
কটা দিন কেটে গেল।
সেদিন স্কুল ছুটির পর অনাদিদা ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়ান। এত পরিপাটি করে কে গোছাল সারা ঘর? মাসখানেক ধরে বিছানায় যে চাদর পাতা ছিল, তা নেই; বিছানায় ধবধরে কাঁচা চাদর। ঘরের মেঝেয় একটা সিগারেটের টুকরো নেই; নেই ছেঁড়া কাগজপত্র। বইপত্র সুন্দর করে সাজান। ঘরের কোণার অস্থায়ী রান্না ঘরটিও সুন্দর করে গোছান। কে গোছাল? লাইব্রেরির বিনোদ? কিন্তু….
অশ্রু এল। সঙ্গে শুধু বইখাতা না; একটা এ্যাসট্রেও। এ্যাসট্রে টেবিলের ওপর রেখে বলল, স্যার এবার থেকে সিগারেটের ছাইটাই এর মধ্যেই ফেলবেন। অনাদিদা অবাক। প্রশ্ন করেন, তুমিই কি আমার ঘরদোর গুছিয়েছ?
কেন স্যার? কিছু ভুল করেছি?
অনাদিদা হেসে ওঠেন। বলেন, কিছু ভুল করো নি কিন্তু কি দরকার ছিল এত পরিশ্রম করার?
এতে আবার পরিশ্রম কী? অশ্রু একটু থেমে বলে, আপনি ভাবভোলা মানুষ। সারাদিন পড়াশুনা নিয়েই থাকেন। আপনার ঘরদোর তো আমাদেরই ঠিকঠাক করে রাখা উচিত।
ওর কথায় উনি খুশি হন। কিন্তু বলেন, হাতের কাছে কাগজকলম আর খানকতক বইপত্তর থাকলে আমি শ্মশানঘাটেও মহানন্দে থাকতে পারি।
আরো কটা দিন কেটে গেল। ইতিমধ্যে অশ্রুর বাবা নিজে এসে অনাদিদাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, বাড়িতে নেমতন্ন করেও খাইয়েছে দুদিন। স্কুলের মাস্টারমশাইরা, গ্রামের অন্যান্যরাও মাঝে মাঝে ওঁকে বাড়িতে নিয়ে খাওয়ান কিন্তু যেদিন ওঁকে নিজে রান্না করতে হয়, সেদিনই উনি চোখে সরষে ফুল দেখেন। অশ্রু তা বুঝতে পেরেছে। তাই সে মাঝে মাঝে নিজেই এগিয়ে আসে। অনাদিদার ওজর আপত্তি অগ্রাহ্য করেই ঝোলভাত বেঁধে দেয়।
দিন এগিয়ে চলে। মেঘনার পাড়ে পাতারহাটের গঞ্জে এসে ভীড় করে কত দূর দেশের পালতোলা নৌকা। সওদা বোঝাই করে চলে যায় মেঘনাপদ্মা পেরিয়ে জানাঅজানা, শহরেনগরে, গ্রামেগঞ্জে। শরৎ ফুরিয়ে যায়। হৈমন্তিকের গন্ধ আকাশে বাতাসে। মাঠের আমন ধানে দোলা দেয়।
শোনো অশ্রু, শুধু স্কুলের পড়াশুনা করলেই হবে না। আরো অনেক কিছু পড়তে হবে।
কনুইএ ভর দিয়ে হাতের ওপর মুখ রেখে অশ্রু মুগ্ধ হয়ে অনাদিদার কথা শোনে।
অনাদিদা বলেন, দেশে কত কি ঘটছে কিন্তু তোমরা জানতে পারো না, সেসব তোমাকে জানতে হবে।
অনাদিদা ওকে কত বই দেন। অশ্রু পড়ে। রোজ। নিয়মিত।
আর একটা কথা অশ্রু।…
বলুন স্যার।
রবীন্দ্রনাথকে খুব ভালো করে পড়তে হবে। পড়তে পড়তে মুখস্থ করতে হবে ওর কবিতা।
এই মাস দেড়েকের মধ্যেই অশ্রু কত বদলে যায়। ওর বাবামা খুশি, খুশি শিক্ষকরাও।
সেদিন কি কারণে যেন ফার্স্ট পিরিয়ডের পরই স্কুল ছুটি হয়ে গেল। এক মিনিটে সারা স্কুলবাড়ি ফাঁকা। টিচার্স কমনরুমে অনাদিদা কয়েকজন শিক্ষকদের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলেন। একটু পরে ওরাও চলে গেলেন। অনাদিদা আস্তে আস্তে ওঁর ঘরে এলেন।
ঘরের মধ্যে ঢুকেই উনি অবাক। কে? অশ্রু? তুমি কাঁদছ? কী হয়েছে তোমার?
অশ্রু কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে পারে না। দুচোখ দিয়ে আরো জল গড়িয়ে পড়ে।
অনাদিদা একটু এগিয়ে যান। ওর মাথায় হাত দিয়ে বলেন, বলো অশ্রু, কী হয়েছে। তোমার? কেউ বকেছে? কেউ কিছু বলেছে?
অশ্রু তখনও কাঁদে।
এবার অনাদিদার অভিমান হয়, আমাকে বলবে না? আমাকে তুমি বিশ্বাস কর না?
অশ্রু কাঁদতে কাঁদতে বলে, স্যার, ওরা সব…
আর বলতে পারে না।
অনাদিদা আবার ওর মাথায় হাত দিয়ে বলেন, বলো বলো। লজ্জা কি আমার কাছে?
অশ্রু আর বুকের মধ্যে চেপে রাখতে পারে না। কিছুতেই না। অবোধ শিশুর মত অশ্রু দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে অনাদিদাকে। বলে, স্যার, ওরা সবাই আমাকে ঠাট্টা করে।
কেন?
হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতেই ও বলে, আমি নাকি আপনাকে ভালোবাসি। তাই..
অনাদিদাও দুহাত দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরেন। ওর মাথার উপর নিজের মুখখানা রেখে অনাদিদা বলেন, তার জন্য কাঁদছ কেন? তুমি কি আমাকে ভালোবাসো না?
অশ্রু ওর বুকের মধ্যে মুখখানা লুকিয়ে রেখে কাঁদতে কাঁদতে বলে, হ্যাঁ স্যার, ভালোবাসি; খুব ভালোবাসি।
আমি জানি। তাই তো তোমাকেও আমি ভালোবাসি।
সত্যি স্যার?
হা অশ্রু, সত্যি তোমাকে ভালোবাসি।
শুধু আমাকেই ভালোবাসেন স্যার?
হ্যাঁ, শুধু তোমাকেই ভালোবাসি।
অশ্রু আনন্দে, খুশিতে, উত্তেজনায় পাগলের মত অনাদিদাকে জড়িয়ে ধরে। অনাদিদার লোমশ বুকের উপর মুখ ঘষতে ঘষতে বলে, আপনি খুব ভালো। আপনার মতো মানুষ হয় না। আপনাকে আমি আরো, আরো অনেক ভালোবাসব।
.
গয়ার রেস্ট হাউসে বিছানার ওশর মুখোমুখি বসে অনাদিদার ভালোবাসার কাহিনি শুনছিলাম আর মনে মনে আমি চলে গেছি বহুদূরে। পূর্ব বাংলার বরিশাল জেলার ঘোল মহাকুমার পাতারহাট। কোনোদিন যাইনি, হয়ত ভবিষ্যতেও কোনোদিন যাব না। কিন্তু চোখের সামনে দেখছিলাম, সেই উদ্দাম, উত্তাল, অনন্তযৌবনা মেঘনাকে। পাতারহাটের গঞ্জ। এঁকেবেঁকে আলোছায়ায় সবুজ শ্যামল ক্যানভাসের ওপর দিয়ে চলে গেছে যে পথ সেটাই ডাইনে গিয়ে পৌঁছে যায় হিন্দু একাডেমীতে। স্কুল বাড়িটাও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। লম্বা বারান্দার মাঝামাঝি হেটমাস্টার মশায়ের ঘর, টিচার্স কমনরুম, লাইব্রেরি। তারপরই অনাদিদার ঘর।
