ক্লাশ এইটনাইনে যখন পড়ে তখন অনাদির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। অংকে তত ভালো না হলেও আর সব বিষয়ে অনাদির সঙ্গে কেউ পেরে ওঠে না। বাংলা লিখত চমৎকার। স্কুলের ম্যাগাজিনে যে ছাত্রের লেখা প্রতিবার ছাপা হত, তার নাম অনাদি ঘোষ। ঐ অল্প বয়সেই ওর বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ হতেন সবাই। চারিত্রিক মাধুর্যের জন্য সব ছাত্র ভিড় করতে আশেপাশে।
স্কুলের জনপ্রিয়তার ঢেউ পৌঁছেছে শহরের পাড়ায়পাড়ায়, ঘরেঘরে। শহরের বহুজনের সঙ্গেই অনাদির পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা।
গরমের ছুটির দিন দশেক আগে হঠাৎ একদিন স্কুলে আসার পথে লোন অফিসের সামনে অজয়দার সঙ্গে দেখা
কিরে অনাদি, কেমন আছিস?
ভালো। অনাদি হেসে জবাব দেয়। জিজ্ঞেস করে, আপনি কেমন আছেন অজয়দা?
অজয়দা হেসে বলেন, শারীরিক ভালোই আছি কিন্তু মানসিক অবস্থা ভালো না
উৎকণ্ঠিত অনাদি জানতে চায়, কেন? বাড়িতে কেউ অসুস্থ নাকি?
অজয়দা আবার হাসেন। বলেন, এ দেশে যার বুদ্ধিবিবেচনা আছে, সে কী সুখে থাকতে পারে?
কথাটা কেমন বেসুরো লাগল অনাদির। একটু অবাক হয়ে ওর দিকে তাকায়।
অজয়দা আর হাসেন না। হঠাৎ ওঁর উজ্জ্বল সুন্দর মুখখানা কেমন ম্লান হয়ে যায়। দুঃশ্চিন্তার রেখাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে কপালে। বলেন, কাল রাত্তিরে পুলিশ নিত্যদাকে কোতোয়ালীতে নিয়ে গেলে ডুরান্ড সাহেব গুণে গুণে ওকে একশোবার লাথি মেরেছে
শুনে অনাদির খারাপ লাগে। বলে, তাই নাকি?
হ্যাঁ।
কিন্তু কারুর কাছে তো শুনলাম না।
শুনতে চাইলেই শুনতে পাবি।
ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই স্কুলের ফাস্ট বেল শোন যায়। অজয়দা বললেন, স্কুলে যা। একদিন আসিস।
নিশ্চয়ই আসব।
স্কুলে বসেও অনাদি সারাদিন ঐকথাই ভাবে। ইস! নিত্যদার মত সর্বজনশ্রদ্ধেয় মানুষকে ডুরান্ড সাহেব একশোবার লাথি মেরেছে?
গত বছরই ডুরান্ড সাহেব স্কুলের পুরস্কার বিতরণী সভায় এসেছিল। অনাদি ওকে ঐ একবারই দেখেছে। দেখলেই বোঝা যায়, লোকটা কত দাম্ভিক আর বদমেজাজী। অনাদি ওর ইংরেজি বক্তৃতা ঠিক বুঝতে পারেনি কিন্তু হেড মাস্টারমশাইয়ের তর্জমা শুনেই বুঝেছে, লোকটা ভারতবর্ষের মানুষকে কত ঘেন্না, কত তুচ্ছজ্ঞান করে।
সেদিন বিকেলেই অনাদি অজয়দার ক্লাবে হাজির। পরদিনই দুআনা দিয়ে জগজ্জননী ক্লাবের সদস্য। গরমের ছুটিতে পড়াশুনার অছিলায় বরিশাল যাওয়া বাতিল করে ব্যায়াম চর্চার আড়ালে অনাদি আরো কত কি চর্চা করে। কত কি পড়ে, শোনে। জানতে পারে কত অজানা কাহিনি। বছর খানেক পরে অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষা। নবজন্ম হল অনাদির।
.
তারপরের বছর খানেক অন্ধকার। অনাদি স্কুলে যায়। পড়াশুনাও করে, কিন্তু আর কি করে সে খবর বাইরের দুনিয়ার কেউ জানতে পারে না।
সেকেন্ড ডিভিশনে ম্যাট্রিক পাশ করল অনাদি। নিত্যদার নির্দেশে অনাদি যশোর ছেড়ে চলে গেলে বরিশাল। ভর্তি হল ব্রজমোহন কলেজে।
পুজোর ছুটির ঠিক দুদিন আগে হঠাৎ এক দূত মারফত স্বয়ং ত্রৈলোক্য মহারাজ খবর পাঠালেন, ছুটি হবার সঙ্গে সঙ্গে যশোর পিসীমার বাড়ি বেড়াতে যাও।ইঙ্গিত বোঝে অনাদি।
ছুটি হবার পরদিনই স্টীমারে ওঠে অনাদি। প্রথমে খুলনা। তারপর যশোর।পিসীমা খুশি, পিসেমশাই খুশি। খুশি ভাইবোনেরাও।
গল্পগুজব করে শুতে শুতে অনেক রাত হল। মশারি ঠিক করতে এসে জয়া বলল, রাঙাদা, ঘুমিও না। একটা থেকে সওয়া একটার মধ্যে সুনীলদা আসবে। আমি চলে গেলে দরজায় খিল দিও না। আমিও ঘুমোব না। দরকার হলে জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে আমার মাথায় হাত দিলেই উঠে পড়ব।
হ্যাঁ, ঠিক সওয়া একটায় সুনীল এল। মশারির মধ্যে বসে অনেকক্ষণ অনেক কথা বলল ফিসফিস করে।
তারপর?
তারপর যেমন চুপি চুপি এসেছিল, ঠিক তেমনি চুপি চুপি চলে গেল সুনীল। রেখে গেল ছোট একটা বালিশ।
বিছানা ছেড়ে উঠল অনাদিও। ঘর থেকে বেরুল পা টিপে টিপে। বারান্দা পার হয়ে পিছন দিক দিয়ে ঘুরে বোনেদের ঘরের জানলার সামনে এসে একটু দাঁড়াল। একবার ভালো করে এদিকওদিক দেখে জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে জয়ার মাথায় একটা টোকা দিতেই ও উঠে বসল। অনাদির মতই পা টিপে টিপে বেরিয়ে এল বাইরে। তারপর কোনো কথা না বলে ঐ অন্ধকার রাত্রে অনাদির হাত ধরে নিয়ে এল উত্তর দিকের বাগানে। চাঁপা গাছের নীচে গর্ত করাই ছিল। অনাদির হাত থেকে ছোট্ট বালিশটা নিয়ে ফেলে দিল ঐ গর্তের মধ্যে। সঙ্গে সঙ্গে দুজনে মিলে মাটি চাপা দিয়ে কিছু ঘাসপাতা ছড়িয়ে দিল। ওরা দুজনে ফিরে গেল নিজের নিজের ঘরে।
ভোরবেলায় দুজনেরই ঘুম ভাঙল হৈচৈ শুনে। পুলিশ। অনাদির পিশেমশাই, এ বাড়ির গৃহকর্তা চন্দ্রবাবু শহরের নামকরা উকিল। দারোগাবাবু তার সঙ্গে কোনো খারাপ ব্যবহার করলেন না। বললেন, আই বির রিপোর্ট এই বাড়িতে সুনীল সরকার লুকিয়ে আছে। তাই আপনাদের একটু কষ্ট দেব।
চন্দ্রবাবু বললেন, কাল আমার শালার ছেলে অনাদি এসেছে। তাছাড়া আর কেউ তো…
পুণ্য কাজে দারোগাবাবুর সহযাত্রী আই বির কালাচরণবাবু বললেন, সে তো পাড়ার সবাই জানে।
যাই হোক সারা বাড়ি খানাতল্লাসী করে ওঁরা শুধু সুনীলকেই খুঁজলেন না, আরো কিছু খুঁজলেন তন্ন তন্ন করে। বাড়ির মেয়েপুরুষ ঝি-চাকর সবাইকে জেরা করলেন, কেউ কিছু রাখতে দিয়েছে কিনা।
সবাই বলল, না, কেউ কিছু রেখে যায় নি। জয়া বলল, শুধু মিত্তির কাকার মেয়ে ছায়া এসে এক কৌটো নাড়ু দিয়ে গেছে রাঙ্গাদার জন্য।
