বলুন।
এখান থেকে একটা ট্রেনে যোধপুর যেতে হবে; সেখান থেকে আরেকটা ট্রেনে দিল্লি। তারপর দিল্লি থেকে কলকাতা যেতে হবে।
জানি।
আমি কনস্টেবলকে কাল সকালেই দিল্লি পাঠিয়ে দিচ্ছি। ও আমাদের জন্য শনিবারের রাজধানী এক্সপ্রেসের দুটো টিকিট কেটে রাখুক।
আর ঐ সিপাহী মহারাজ কী করবে?
ও রবিবার সকালে কালকা মেলএ রওনা হবে।
তা হতে পারে, কিন্তু…
কিন্তু কী?
যোধপুর উদরপুর বা জয়পুরে কয়েকদিন না কাটিয়েই চলে যাব?
ওসব জায়গা তো পালিয়ে যাচ্ছে না, পরে আসবেন।
অলকানন্দা দুএক মিনিট ভাবনাচিন্তা করে বলে, ঠিক আছে, কিন্তু একটি শর্ত
বলুন কি শর্ত।
আপনার সঙ্গে আমি বাড়িতে ফিরব না। হাওড়া স্টেশন থেকে আমি একলাই যাবো। আপনি পরের দিন আমার খবর নিতে আমাদের বাড়ি আসবেন।
তাই হবে।
.
বেশ কয়েকদিন পর মাকে কাছে পেয়ে অলকানন্দা ছোট্ট বাচ্চার মতো ওকে জড়িয়ে শুয়ে কত কথা, কত আলোচনা করে।
আচ্ছা মা, মামা পুলিশে খবর দিল কেন?
দীপুই তো জোর জুলুম করে ওকে পুলিশের ওখানে নিয়ে গেল। শীলাদেবী একটু থেমে বলেন, তবে যে পুলিশ অফিসারটি বাড়িতে এসেছিল তাকে দেখে আমার মন। ভরে গেছে।
কেন?
ছেলেটাকে যেমন সুন্দর দেখতে, সেইরকম ভদ্রসভ্য ব্যবহার। ওকে দেখলে ভালোবাসতে ইচ্ছে করবে।
অন্ধকারে মুখ টিপে হাসতে হাসতে অলকানন্দা বলে, তাই নাকি?
শীলাদেবী মেয়ের মাথায় হাত দিতে দিতে বলেন, সত্যি বলছি, ঐ রকম একটা জামাই হলে বড় ভালো হত।
দাবোগাবাবুকে তোমার এতই ভালো লাগল যে জামাই করতে ইচ্ছে করছে?
শীলাদেবী একটু গম্ভীর হয়ে বলেন, দারোগা বলে ঠাট্টা করছিস কেন? দারোগারা মানুষ না?
উনি মুহূর্তের জন্য একটু থেমে বলেন, ছেলেটিকে দেখলেই বোঝা যায়, অত্যন্ত ভদ্র পরিবারের ছেলে। তাছাড়া কথাবার্তা শুনে বুঝেছি, লেখাপড়াও যথেষ্ট করেছে। তা না হলে কি আমার এমনি এমনি জামাই করতে ইচ্ছে করল?
অলকানন্দা দুহাত দিয়ে মাকে জড়িয়ে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বলে, সত্যি তুমিওকে জামাই করতে চাও?
আমার মন তো তাই চাইছে।
মার মুখের উপর মুখ নিয়ে অলকানন্দা খুব চাপা গলায় বলে, মা, আমারও তাই ইচ্ছে।
শীলাদেবী মেয়ের কপালে একবার চুমু খেয়েই দুহাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বললেন, ঠাকুর! সবই তোমার ইচ্ছা।
পাতারহাট
এমন অপ্রত্যাশিতভাবে ওর সঙ্গে আলাপ হবে, তা ভাবতে পারিনি। নাম শুনতেই চমকে উঠলাম। আমি কোনোকালেই রাজনীতি করিনি, বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। তবে বিয়াল্লিশের আন্দোলনের সময় দাদাও দাদার বন্ধুদের প্রয়োজনে ও নির্দেশে রেশন ব্যাগের মধ্যে লুকিয়ে রিভলবার পৌঁছে দিয়েছি এখানে ওখানে। আর কংগ্রেস অফিসের কোণায় মণিমেলা কেন্দ্র চালাবার সময় কিছু সর্বত্যাগী কর্মীর সান্নিধ্যে এসে শুনেছি নানা কাহিনি, পড়েছি কিছু বই, জেনেছি বিপ্লবীদের ইতিহাস। তাই তো চমকে উঠেই প্রশ্ন করলাম, আপনিই কী সেই অনাদি ঘোষ যিনি ডুরান্ড সাহেবকে…
কথাটা শেষ করার আগেই উনি হেসে ফেললেন। বললেন, তুমিও সে কাহিনি জানো।
জানব না?
উনি মাথা নেড়ে বললেন, সেসব কাহিনি আজকাল কেউ মনে রাখে না। মনে রাখার। দরকারও নেই।
ডেরাডুন বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল কিন্তু বেশীক্ষণ কথা বলার সুযোগ হল না। কন্ডাক্টর এসে হুইসেল বাজাতেই উনি হরিদ্বারের বাসে উঠলেন। তবে ঠিকানা বিনিময় হল বাস ছাড়ার আগেই। দুএকটা চিঠির আদানপ্রদানও হল কিন্তু তারপর দুপক্ষই নীরব।
.
বছর দশেক পার হয়ে গেল।
পাটনা।
জয়প্রকাশ সর্বোদয় বর্জন করে কদমফুঁয়ার বাড়িতে ফিরে এলেও আবার সংবাদপত্রের শিরোনামা। চম্পারণ সত্যাগ্রহ আর বহুকাল আগের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর বিহার আবার সর্বভারতীয় সংবাদ। সম্পাদকের নির্দেশে বিহার সফরের আগে গেছি কদমকুঁয়া। জয়প্রকাশের সঙ্গে দেখা করে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামার সময় ওঁর সঙ্গে মুখোমুখি দেখা।
আপনি! আমি বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করি।
উনি হেসে বললেন, আমি তো মাঝে মাঝেই আসি। তুমি কবে এলে?
কাল এসেছি।
কদিন থাকবে?
এখানে দুতিন দিন আছি। তারপর কয়েকটা জেলা ঘুরব।
এখানে কোথায় উঠেছ?
হোটেল পাটলিপুত্রে।
ঠিক আছে যোগাযোগ করব।
আর কথা হল না। অনাদিবাবু উপরে উঠে গেলেন। আমি বেরিয়ে এলাম।
বিহার সরকারের দুচারজন মন্ত্রী ও পদস্থ অফিসারের সঙ্গে কথাবার্তা বলে মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য যখন হোটেলে ফিরলাম, তখন দুটো বেজে গেছে। রিসেপসন কাউন্টারে। ঘরের চাবি নিতে গিয়েই একটা চিরকুট পেলামতোমার সঙ্গে গল্প করার জন্য সন্ধ্যার পর আসব। তুমি সাতটা সাড়েসাতটার মধ্যে ফিরে এলে ভালো হয়।–অনাদিদা।
রিসেপসনের সামনে দাঁড়িয়েই দুতিনবার পড়লাম। লিফটএর মধ্যে, ঘরে বসে লাঞ্চ খেতে খেতে মনে পড়ল, এই পাটনা শহরেই এই রকম একটা ছোট্ট চিরকুটের জন্যই অনাদিদা ধরা পড়েছিলেন।
.
গ্রামের অন্যান্য সবার মত অনাদিও লেখাপড়া শুরু করল ন্যায়রত্নের পাঠশালায়। পাঠশালার গুরুমশাই ন্যায়রত্ন না; ওর বাবা ছিলেন ন্যায়রত্ন। গুরুমশায়ের বিদ্যার দৌড় ব্যাকরণের মধ্যে। তা হোক। গ্রামের সবাই বলত,ন্যায়রত্নের পাঠশালা।ন্যায়রত্নের পাঠশালা শেষ করে কেউ চলে যেত সদর শহরে; কেউ বা আত্মীয়স্বজনের আশ্রয়ে অন্যত্র কোথাও। বরিশালের গ্রামের ছেলে অনাদি পিসীমার সঙ্গে চলে এল যশোর। ভর্তি হল সম্মিলনী স্কুলে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই অনাদির নাম ছড়িয়ে পড়ল স্কুলের সব শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে। কারণ ছিল। অনাদি শুধু ভালো ছাত্র না, ভালো আবৃত্তি করে। সর্বোপরি কারণ ছিল, ওর মুখের হাসি আর মধুর স্বভাব।
