দারোগাবাবু আর কালাচরণবাবু প্রায় একসঙ্গেই চিৎকার করে উঠলেন, কোথায় সে কৌটা?
জয়া না, জয়ার মা না, ঝি এনে দিল সে কৌটো। হুমড়ি খেয়ে পড়লেন ওঁরা দুজনেই। দুজনেই হতাশ।
জয়া হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, আপনারা কী খুঁজছেন?
কালাচরণবাবু রেগে বললেন, তাতে তোমার কী দরকার?
ঘণ্টা তিনেক ধরে খানাতল্লাসী করেও ওরা কিছুই পেলেন না। যাবার সময় দারোগাবাবু বলে গেলেন, ডুরান্ড সাহেবের হুকুম মতো এসেছিলাম। কিছু মনে করবেন না।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অনাদি আর জয়া।
কিছুক্ষণ পরেই অনাদি সাইকেলে চক্কর দিয়ে আসে সারা লোন অফিস পাড়া। ক্রীং ক্রীং ঘণ্টা বাজিয়ে অজয়দাকে জানিয়ে দেয়, সব ঠিক আছে। জলখাবার দিতে এসে জয়া অনাদিকে বলল, রাঙ্গাদা, খুব সাবধান। সুনীলদা যে আসবে, তা পর্যন্ত ওরা জেনে গেছে।
হ্যাঁ, তাইতো দেখছি।
তোমাদের মধ্যে কেউ কিছু…।
উচিত নয় তবে…। কথাটা শেষ না করেই অনাদি বলে, একটা কাজ করবি?
বল, কী করতে হবে?
একটা চিঠি দিচ্ছি। ওটা সুভাষের ঠাকুমাকে দিয়ে বলবি, কালীবাড়ির আরতির সময় জবাব নিবি।
সন্ধ্যার পর কালীবাড়ির আরতির সময় সুভাষের ঠাকুমার পাশে হাত জোড় করে বসল জয়া। প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে আরতি চলল। আরতি শেষ। এবার চোখ বুজে প্রণামের সময়। ব্যাস। ঐ সময় ছোট্ট একটা কাগজ এসে গেল জয়ার হাতে।
সকালবেলায় জয়াদের বাড়ি খানাতল্লাসী হবার খবর পাবার সঙ্গে সঙ্গেই নিত্যদা সমস্ত পরিকল্পনাটা অদলবদল করে জানিয়ে দেন অজয়দাকে। নতুন পরিকল্পনার সব কিছু খবর জয়া এনে দিল অনাদিকে।
দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে। সারা শহরে আনন্দের বন্যা। ঢাকঢোল বাজছে চারদিকে। নতুন জামাকাপড় পরে ছেলেমেয়েরা যাচ্ছে পূজা দেখতে। ছুটির আনন্দ উপভোগ করতে অফিস আদালতের অনেকেই গ্রামের বাড়ি গেছেন। ছুটি ডুরান্ড সাহেবেরও। অফিস না গেলেও বাংলোয় বসে কাজ করেন। পুলিশ অফিসাররা আসেন নানা খবর নিয়ে। ফিরে যান সাহেবের নির্দেশ নিয়ে। তবে সবাই জানে ছুটির দিনে সহেবমেমসাহেব ঘুমিয়ে থাকেন অনেক বেলা পর্যন্ত। খুব জরুরি কারণ না হলে সাহেব কখনই ভোরে ওঠেন না।
.
সেদিন মহাষ্টমী।
তখনও অন্ধকার কাটেনি। উষার আলো দেখা দেবে কিছুক্ষণ পর। সূর্য উঠবে আরো পরে। ডুরান্ত সাহেবের বাংলোর গেটের সামনে কিছু কাগজপত্র নিয়ে দুই দাবোগাবাবু হাজির। পাহারাদার কনস্টেবল হেসে বলল, এত ভোরে?
একজন দারোগাবাবু হেসে বললেন, কী করব? বড়কর্তারা যেমন হুকুম দেবেন, আমাদের তো তাই করতে হবে।
কনস্টেবল বলল, আজ তো ছুটি। সাহেব তো উঠবেন অনেক বেলায়।
আমরা বসে থাকব। সাহেব উঠলেই কাগজ সই করিয়ে ছুটব এস পি সাহেবের কাছে।
দারোগাবাবুরা ভিতরে ঢোকেন। কনস্টেবল গেট বন্ধ করে দেয়।
বিরাট এলাকার মাঝখানে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের দোতলা বাংলো। চারদিকের নেই ফুটবল খেলা যায়। গাছপালা দিয়ে ঘেরা সমস্ত এলাকা। সমনের লন পেরিয়ে বাংলোর বারান্দায় পৌঁছতেই দাবোগাবাবুদের মিনিট পাঁচেক লাগল। সেখানে খান কয়েক চেয়ার। দারোগাবাবুরা সেখানেই বসলেন। ভালো করে দেখেন চারদিক। না কেউ নেই। ছুটির দিনে এত ভোরে কোনো অর্ডালিবেয়ারা আসবে না। চাকরবাকর, খানসামারাও তাদের কোয়ার্টারে।
দারোগাবাবুদের হাতে বেশি সময় নেই। ওঁর দুজনেই উঠে দাঁড়ালেন। পায়চারি করার অছিলায় একবার ঘুরে দেখে নিলেন চারদিকের বারান্দা, সিঁড়ি। একজন সতর্ক পদক্ষেপ ফেলে উপরে উঠলেন। দেখলেন উপরের বারান্দা। না, কেউ নেই। ইশারা করলেন সহকর্মিকে। তিনিও তর তর করে উপরে উঠলেন। ডানদিকে এগিয়ে দেখলেন, ড্রইংরুমের মেঝেয় একজন ঘুমুচ্ছে। দরজা বন্ধই ছিল। একজন আলতো করে সামনের দিকে শিকল তুলে দিলেন। আর একটু এগিয়েই সাহেবের শোবার ঘর। হ্যাঁ, পশ্চিমের জানালা খোলা আছে। মেমসাহেবও নেই। কলকাতায় গেছেন গতকালই। সাহেব বিভোর হয়ে ঘুমুচ্ছেন প্রায় অর্ধউলঙ্গ হয়ে।
ইশারা বিনিময় হয় দুই দারোগার মধ্যে। একজন রইলেন সিঁড়িতে, অন্যজন সাহেবের শোবার ঘরের খোলা পশ্চিমের জানালার পাশে। দুজনের হাতেই রিভলবার। রেডি সিঁড়িব দারোগাবাবু বাঁ হাত তুলে ইশারা করতেই
দুম! দুম! দুম!
ডুরান্ড সাহেবের একটা বিকট আর্তনাদ। দুই দারোগাবাবুর চিৎকার, কে? কে? ছুটে আসে গেটের কনস্টেবল। ঘুম ভেঙে যায় দুএকজন অর্ডালীবেয়ারার। দারোগাবার রিভলবার হাতে নিয়ে দৌড়তে দৌড়তে বলেন, ধরো, ধরো, ধরো। কনস্টেবল আর অর্ডালি বেহারাদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলেন, তোমরা পিছন দিকে দেখো, ধরো শালাদের
বিভ্রান্ত কর্মচারীরা এদিকেওদিকে দৌড়াদৌড়ি করে। ছুটে যান দারোগা বাবুরাও ছুটতে ছুটতে কত দূরে চলে যান ওঁরা।
ডুরান্ড সাহেবের বাংলোয় পুলিশের কর্তারা পৌঁছবার আগেই অজয়দা আর অনাদিদ জগজ্জননী ক্লাবে ব্যায়ামচর্চা শুরু করে দেন। ওদিকে কনস্টেবল আর অর্ডালিবেয়ারদের বক্তব্য শুনেই পুলিশবাহিনী ছুটে যায় ঝিনেদার রাস্তায়।
পরবর্তী চৰ্বিশ ঘণ্টায় যশোর আর ঝিনেদার পুলিশ জন পঞ্চাশেককে গ্রেপ্তার করল অজয়দাকে ধরল দুদিন পর কিন্তু সারাদিন জেরা করে ছেড়ে দিল। বিজয়া দশমীর দুদিন পর অনাদিদা যশোর ছাড়লেন। এলেন কলকাতা। পূজার ছুটি শেষ হবার ঠিক মুখোমুখি ওঁকে বলা হল, চলে যাও বরিশালের পাতারহাট। ওখানকার হিন্দু একাডেমীর হেডমাস্টারমশাইকে বলা আছে। কোনো চিন্তা নেই। তবে হ্যাঁ, ওখানে তুমি অনাদি ঘোষ থাকবে না, হবে বিমল চৌধুরী।
