পিসেমশাই কোথায় থাকেন?
উনিও বছরখানেক হল মারা গিয়েছেন।
উনি কী করতেন?
মার্টিন বার্নে সাধারণ কেরানি ছিলেন। অলকানন্দা একটু থেমে বলে, পিসীর গহনাপত্তর যেমন আমাকে দিয়েছেন, তেমনি নিজের সব টাকাকড়ি রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠান হাসপাতালে দিয়ে গেছেন।
একটু পর সুদীপ্ত একটু চাপা হাসি হেসে বলে, মোটকথা আপনি বেশ বড়লোক। সুতরাং আপনাকে বিয়ে করার ব্যাপারে দীপুবাবুর উৎসাহের যথেষ্ট কারণ আছে
আপনিও কী দাপুর সাপোর্টার হয়ে গেলেন? হাসতে হাসতে অলকানন্দা প্রশ্ন করে।
হাসতে হাসতেই সুদীপ্ত জবাব দেয়, অমন গুণী মানুষের সাপোর্টার হবার অধিকার আমার আছে?
হাসি থামলে সুদীপ্ত বলে, এবার বলুন, আপনি কী আমার অনুরোধ রাখবেন?
আপনিই বলুন না আমার কী করা উচিত।
আপনাকে পরামর্শ দেবার অধিকার কি আমার আছে?
ওসব অধিকার-টধিকারের কথা বাদ দিন। আমি যখন আপনার পরামর্শ চাইছি, আপনার তো দ্বিধা করার কারণ নেই।
সুদীপ্ত ওর দিকে তাকিয়ে বলে, দেখুন, আপনার আসল সমস্যা সমাধানের দুটি উপায় আছে। আপনি একটা চাকরি জোগাড় করে মাকে নিয়ে কোথাও চলে যেতে পারেন অথবা এমন কাউকে আপনাকে বিয়ে করতে হবে, যেখানে আপনার মা সসম্মানে থাকতে পারেন।
অলকানন্দা চুপ করে ওর কথা শোনে।
সুদীপ্ত আবার বলে, হঠাৎ মামামামীর সংসার থেকে উধাও হয়ে তো আপনার আসল সমস্যার সমাধান হয়নি, হবেও না।
ঠিক বলেছেন। অলকানন্দা গম্ভীর হয়ে বলে
কথায় কথায় অনেক বেলা হয়ে গিয়েছিল। সুদীপ্ত হাতের ঘড়ি দিকে তাকিয়েই বলে, চলুন, খেয়ে আসি। এর পর আর খাবার পাবো না।
হ্যা চলুন।
খাওয়াদাওয়ার পর কটেজের দিকে যেতে যেতে অলকানন্দা সুদীপ্তর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, দিবানিদ্রার অভ্যাস আছে নাকি?
সুদীপ্ত একটু হেসে বলে, পুলিশের চাকরি করার দৌলতে দিবানিদ্রা তো দূরের কথা, রাত্তিরে ঘুমোবার অভ্যাসও প্রায় চলে গেছে।
অলকানন্দা ওর কটেজের দরজা খুলতে খুলতে বলে, তাহলে ভিতরে আসুন; গল্প করা যাবে।
আপনি বিশ্রাম করবেন না?
সারা দিনরাত্তিরই তো বিশ্রাম করছি। অলকানন্দা ঘরের মধ্যে পা বাড়িয়েই বলে, আসুন, আসুন।
সুদীপ্ত ওর পিছন পিছন ঘরে ঢুকেই একবার ঘরের চারদিকে দৃষ্টিটা ঘুরিয়ে নিতেই বেড সাইড টেবিলের ছবিটা দেখেই জিজ্ঞেস করল, আপনার বাবার ছবি?
হ্যাঁ।
বাঃ! ভারী সুন্দর দেখতে ছিলেন তো?
অলকানন্দা ওকে চেয়ারটা এগিয়ে দিয়ে বলে, বাবা সত্যি খুব সুপুরষ ছিলেন।
সুদীপ্ত চেয়ারে বসেই বলে, আপনার মা কিন্তু খুব স্নিগ্ধ শান্ত মানুষ।
উল্টো দিকের চেয়ারে বসেই অলকানন্দা বলে, মা সত্যি খুব স্নিগ্ধ শান্ত প্রকৃতির মানুষ।
সুদীপ্ত পকেট থেকে সিগারেটদেশলাই বের করে বলে, ঘরের মধ্যে সিগারেট খেলে কি আপনার অসুবিধে হবে?
অলকানন্দা একটু হেসে বলে, সিগারেট কেন, আপনি ড্রিঙ্ক করলেও আমার আপত্তি নেই।
সুদীপ্ত সিগারেট ধরিয়ে একটা টান দিয়েই বলে, আপনার মামা কি রেগুলার ড্রিঙ্ক করেন?
না, না, আমার মামার ওসব নেশাটেশা নেই। তবে আমার প্রিয়তম অধ্যাপক নিয়মিত ড্রিঙ্ক করেন।
আপনি কী প্রফেসর চ্যাটার্জীর কথা বলছেন?
হ্যাঁ।
আপনার সামনেই উনি ড্রিঙ্ক করতেন?
উনি লুকিয়েচুরিয়ে ড্রিঙ্ক করেন না। ওর স্ত্রী বা মেয়ে ছাড়াও আমিও কতদিন ওঁর গেলাসে হুইস্কী ঢেলে দিয়েছি।
আচ্ছা!
অলকানন্দা বলে, ড্রিঙ্ক করলেই যে মানুষ মাতাল বা খারাপ হয় না, তা ওঁকে দেখেই বুঝেছি।
তা ঠিক।
আপনি ড্রিঙ্ক করেন?
না।
কেন? ভয় করে, নাকি অপছন্দ করেন?
সুদীপ্ত বলে হাজার হোক স্কুল মাস্টারের ছেলে। একটু দ্বিধাসঙ্কোচ থাকা তো খুবই স্বাভাবিক। ঐসব সখআনন্দের জন্য খরচ করার ক্ষমতাও আমার নেই।
অলকানন্দা হাসতে হাসতে বলে, আপনি নিছকই একটা ভালো মানুষ।
সুদীপ্ত হাসতে হাসতে জবাব দেয়, যাক, বড় মাসী ছাড়া আরো একজনকে পেলাম যে মামাকে ভালো মনে করে।
বড় মাসী ছাড়া আর কেউ আপনাকে ভালো বলে না?
না। প্রায় সবার ধারণা আমি বোকা মানুষ।
এ ধারণার কারণ?
যে পুলিশ অফিসার ঘুষ নেয় না, পরের পয়সায় মদ খায় না, বা কলগার্লদের ভয় খিয়ে তাদের সঙ্গে স্ফুর্তি করে না, সে বোকা না?
কথাটা শুনে অলকানন্দার মুখখানা গম্ভীর হয়ে যায়। একবার চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, হতভাগারা তো জানে না, অসৎ বা চরিত্রহীন হবার চাইতে বোকা হওয়া অনেক সম্মানের।
সুদীপ্ত একটু হেসে বলে, আমার কথা বাদ দিন। বলুন, কবে কলকাতা যাবেন?
এখন কলকাতা ফিরে যাবো?
হ্যাঁ, তাই বোধহয় ভালো।
তারপর?
চাকরি নিয়ে অন্য কোথাও চলে যান বা বিয়ে করে স্বামীর ঘর করুন। তাছাড়া ইউ সির ফেলোশিপ পাওয়াও তো একটা চাকরির সমান।
তা বলতে পারেন। সত্যি, আজকাল ওরা বেশ ভালো টাকা দেয়।
কালকের টিকিট কাটতে বলে দেব?
অলকানন্দা অবাক হয়ে বলে, কাকে টিকিট কাটতে বলবেন?
একজন বুড়ো কনস্টেবলও আমার সঙ্গে এখানে এসেছে।
হা ভগবান! আপনি আমাকে ধরে নিয়ে যাবার জন্য একজন কনস্টেবলকেও সঙ্গে এনেছেন? অত্যন্ত উত্তেজিত হয়েই অলকানন্দা কথাগুলো বলে।
সুদীপ্ত অত্যন্ত ধীর স্থির ভাবে জবাব দেয়, আপনি ছেলে হলে আমি একলাই আসতে পারতাম।
আমি মেয়ে বলে একজন কনস্টেবলকে সঙ্গে আনতে হবে?
হ্যাঁ। সুদীপ্ত একটু হেসে বলে, একলা এসে আমি যদি মাঝপথে আপনার সঙ্গে কোনোরকম খারাপ কিছু…
বুঝেছি।
মিনিট খানেক চুপ করে থাকার পর সুদীপ্ত বলে, একটা কথা বলব?
