একটু চুপ করে থাকার পর বিনয়বাবু জিজ্ঞেস করলেন, আমার ভাগ্নীকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে কী একটু এগিয়েছেন?
তেমন কিছু না।
বেশ কদিন হয়ে গেল, তাই.. বিনয়বাবু কথাটা শেষ করেন না।
আজ আমি ওসির সঙ্গে কথা বলব। দেখি, উনি কি বলেন।
আমি কী কাল একবার আসব?
একবার টেলিফোন করবেন। যদি কিছু খবর থাকে, তাহলে আপনাকে জানিয়ে দেব
.
একটা লম্বা টানা দীর্ঘশ্বাস ফেলার পর অলকানন্দা আপনমনে একটু হাসে। মনে মনে কী যেন ভাবে। তারপর স্বগতোক্তি করে, জল তাহলে অনেক দূর গড়িয়েছে।
সুদীপ্ত কোনো কথা বলে না। চুপ করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
দুএক মিনিট পর অলকানন্দা সুদীপ্তর দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে থেকে একটু চাপা হাসি হেসে বলে, যদি আমি আপনার সঙ্গে না ফিরে যাই?
সুদীপ্ত কোনো ভাবাবেগ প্রকাশ না করে বলে, আমার বিশ্বাস, আপনি আমার সঙ্গে কলকাতা ফিরবেন।
যদি না যাই?
আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার উপায় আছে কিন্তু আমি তা চাই না।
গায়ের জোরে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান?
সুদীপ্ত মাথা নেড়ে বলে, না, কখনই না।
তাহলে?
আমার স্থির বিশ্বাস, আপনি আমার অনুরোধ রাখবেন।
কিন্তু কেন আমি আপনার অনুরোধ রাখব?
বোধহয় আমি আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী।
শুভাকাঙ্ক্ষী? ঠোঁটের কোণায় চাপা কৌতুকের হাসি হেসে অলকানন্দা বলে, পুলিশের চাকরি করতে গিয়ে যেসব চোরডাকাতখুনীদের সঙ্গে আলাপপরিচয় হয়, তাদের সবারই কী আপনি শুভাকাঙ্ক্ষী?
সুদীপ্ত বিন্দুমাত্র উত্তেজনা প্রকাশ না করে বলে, অভাবঅনটনের জন্য পুলিশের চাকরি নিয়েছি বলে কি আমার সব মনুষ্যত্ব চলে গেছে?
ও মুহূর্তের জন্য থেমে আবার বলে, আপনি যত বিদ্রূপই করুন, তবু বলছি, আমি আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী।
অলকানন্দা সঙ্গে সঙ্গে কোনো কথা বলতে পারে না। বরং ওকে বিদ্রূপ করার জন্য, অপমান করার জন্য মনে মনে দুঃখ পায়। ও একটু সলজ্জ দৃষ্টিতে সুদীপ্তর দিকে তাকিয়ে বলে, আপনি কী করে পুলিশে চাকরি করছেন?
কেন বলুন তো? একটু অবাক হয়ে সুদীপ্ত পাল্টা প্রশ্ন করে।
আপনার মতো ভদ্র ছেলের পক্ষে পুলিশের চাকরি করা সম্ভব?
সুদীপ্ত একটু হেসে বলে, তিন বছর তো চাকরি করছি। তারপর একটু থেমে বলে, আপনি একটা ভালো চাকরি দিলেই পুলিশের চাকরি ছেড়ে দিতে পারি।
ভালো চাকরি মানে?
এখনও তিরিশবত্রিশ হাজার টাকা দেনা আছে। ঐ দেনাটা শোধ করার পর হয়তো নিজেই আমি চাকরিটা ছেড়ে দেব।
কেন?
পুলিশের চাকরিতে যেমন পরিশ্রম, তেমনি ঝামেলা। তাছাড়া এ কাজ করে একটুও মনের আনন্দ পাই না।
কী ধরনের চাকরি আপনার পছন্দ?
আমার বাবা সারাজীবন স্কুল মাস্টারি করেছেন বলে ওঁর স্বপ্ন ছিল, আমি কলেজে পড়াব, কিন্তু তা তো আর সম্ভব না। যে কাজে একটু বিদ্যাবুদ্ধির দরকার হয়, আমি সে ধরনের যে কোনো চাকরি পেলেই খুশি।
সে ধরনের চাকরির চেষ্টা করেছেন?
সুদীপ্ত মাথা নেড়ে বলল, না।
কেন?
মার অসুখের দেনাগুলো শোধ না করা পর্যন্ত নতুন কিছু করার উৎসাহবোধ করি না। এবার ও একটু থেমে বলল, আমার কথা বাদ দিন। আপনি মামামামীকে কিছু না জানিয়ে হঠাৎ উধাও হলেন কেন?
মামামামীর ওখানে আর ভালো লাগছে না।
কিন্তু আপনার মামাকে তো বেশ ভালো মানুষ মনে হয়।
মামা সত্যি ভালো মানুষ কিন্তু ব্যক্তিত্বহীন। তাছাড়া যে কোনো কারণেই হোক, মামী আমাকে সহ্য করতে পারে না।
সে তো খুব স্বাভাবিক। সুদীপ্ত হাসতে হাসতেই বলে।
অলকানন্দা অবাক হয়ে বলে, স্বাভাবিক কেন?
আপনি মামীর চাইতে অনেক বেশি শিক্ষিতা, অনেক বেশি সুন্দরী। সুতরাং…
সুতরাং উনি মামী হয়েও আমাকে হিংসা করবেন?
সুদীপ্ত আবার একটু হাসতে হাসতেই বলে, শুনেছি, অনেক মা নিজের মেয়েকেও একটা বিশেষ বয়সে ঠিক সহ্য করতে পারেন না।
অলকানন্দা একটু হেসে বলে, আমার এক বন্ধুও বলতো, ওর মা ওকে সহ্য করতে পারেন না।
বাই দ্য ওয়ে, দীপুবাবুকে দেখলাম, আপনার ব্যাপারে খুব উৎসাহী।
হি ইজ এ স্কাউলে!
এবার সুদীপ্ত বলে, আচ্ছা, দীপুবাবু কী আপনাকে বিয়ে করতে চায়?
শুধু দীপুবাবুর না, আমার মামীরও তাই ইচ্ছা।
ওর উপর এত রাগের কারণ?
ঐ অশিক্ষিত রুচিহীন, লোভী মানুষটাকে আমি সহ্য করতে পারি না। বিয়ে করা তো দূরের কথা, ওকে দেখলেই আমার সারা শরীর জ্বলে যায়।
একবার বুক বরে নিশ্বাস নিয়ে অলকানন্দা আবার বলে, ঘটনাচক্রে আপনি আমাদে অনেক কথাই জেনেছেন। তাইতো আপনাকে বলতে আমার দ্বিধা নেই যে ঐ দীপু আর মামীর জন্যই আমি চলে এসেছি। গত চারপাঁচ বছর ধরে ওরা দুজনে আমাকে যে কি বিরক্ত করছে, তা আপনি কল্পনা করতে পারবেন না।
এ ব্যাপারে আমাকে কেউ কিছু না বললেও আমি বুঝতে পেরেছি।
দেখুন সুদীপ্তবাবু, আমার বারো বছর বয়সের সময় বাবা মারা যান কিন্তু তিনি আমাকে বা মাকে পথের ভিখারী করে যাননি। মামী আর দীপু খুব ভালো করেই জানেন, বাবা গ্র্যাচুইটি প্রভিডেন্ট ফ্যাক্ত ইন্সিওরেন্সের একটি পয়সাও মা নষ্ট করেননি। সব ব্যাঙ্কে জমা আছে।
স্কুলকলেজে পড়াশুনার খরচ…
সুদীপ্ত প্রশ্নটা শেষ করার আগেই অলকানন্দা বলে, আমার এক পিসী আমাকে ভীষণ ভালোবাসতেন। তিনিই আমার স্কুলকলেজের সব খরচ দিতেন।
ও!
আমার ঐ পিসীর কোনো ছেলেমেয়ে হয়নি। পিসীপিসেমশাই দুজনেই আমাকে অসম্ভব ভালবাসতেন। পিসী মারা যাবার পর পিসেমশাই ওর সব গহনাপত্তর আমাকে দিয়ে দেন।
