–অবিলম্বে।–গম্ভীর কণ্ঠে সংক্ষিপ্ত জবাব দিলে ক্যাবলা।
ব্যাপার বুঝি এখনও বুঝতে পারোনি তোমরা? আর কী! স্রেফ টিউশনি।
ক্যাবলাই পড়াত ছেলেটাকে। এখন মাস খানেকের জন্যে ওরা সবাই বেড়াতে চলে যাচ্ছে চুনার। তাই বন্ধু হিসেবে ক্যাবলা এই সুবর্ণসুযোগটি আমার হাতে তুলে দিতে চায়।
আমিও ভেবে দেখলাম, মন্দ কী! ম্যাট্রিক পরীক্ষা হয়ে গেছে। পাশ করতে পারব কি না সে পরের কথা, এখন তো দুমাস স্রেফ নিশ্চিন্ত গায়ে ফুঁ দিয়ে কাটানো চলবে। রাতদিন হইচই না করে যদি সকালে-বিকেলে দুঘণ্টা করে হাজিরা দিলেই দশটি টাকা বাগানো যায়, তাহলে সে-সুযোগ ছাড়বে কোন্ আহাম্মক? তা ছাড়া নিজে রোজগার করতে পারা কত বড় গৌরব, আর কী সুবিধে। ম্যাটিনিতে বায়স্কোপ দেখবার জন্যে মার কাছে গিয়ে কাঁদুনি গাইতে হবে না, খেলার মাঠের টিকিটের জন্যে উমেদারি করতে হবে না খিটখিটে ছোটকাকার কাছে। বাজারের দুচার আনা হাতসাফাই করতে গিয়ে ধরা পড়ে দুচারটে চড়চাপড় খাবারও ভয় নেই। স্বাবলম্বীর চেয়ে সুখী আর কে আছে!
মনে-মনে ছেলেবেলায় পড়া পদ্যটা আউরে নিলাম, নিজের শ্রমের অন্ন খাই খুশি হয়ে। অবশ্য অন্নের জন্যে এখনও খাটতে হয় না, ওর ব্যবস্থা বাবাই করে রেখেছেন। কিন্তু ওই দশটি টাকায় কদিন তেলেভাজা, পাঁঠার ঘুগনি, কুলপিবরফ আর লেডিকেনি খাওয়া চলবে তার হিসেব রাখো? কথাটা ভাবতেও যেন নোলায় বান এল আমার। সকসক করে খানিকটা লালা গিলেই নিলাম আমি।
একেবারে দশ-দশটা টাকা! একটা নয়, দুটো নয়, একেবারে একের পিঠে শূন্য! সে কি কম? এক টাকায় চৌষট্টি পয়সা হলে দশটাকা
ওরে বাবা! ভাবতেও যেন আনন্দে দম আটকে এল আমার। লটারিতে টাকা পাওয়ার খবরে যে-লোকটা হার্টফেল করেছিল, আমার দশাও হবে নাকি তার মতো? মনকে বললাম, একটু ধৈর্য ধরে থাকো, তারপরে মাসের শেষে দেখব, কটা লেডিকেনি খেতে পারো তুমি!
পরের দিন যথাসময়ে গিয়ে হাজির হলাম ছাত্রের বাড়িতে টালিগঞ্জ।
বাড়ির চেহারা দেখেই মেজাজ বিগড়ে যায়। ছোট একতলা বাড়িযেমন নোংরা, তেমনি বিশ্রী। সামনে একটা কাঁচা ড্রেন, তা থেকে দুর্গন্ধ উঠছে। আমি গিয়ে দাঁড়াতেই একটা ঘিয়ে ভাজা নেড়ী কুত্তা খ্যাঁক-খ্যাঁক করে উঠল।
আমি বললাম, আরে থাম থাম। ওই তো রোঁয়া ওঠা, এঁটুলি কাটা শরীর, তার বিক্রম কত।
কুকুরটা আবার বললে, খ্যাঁক-খ্যাঁক-তারপর লেজটা পেটের নীচে গুটিয়ে আর বিশ্রী রকম দাঁত খিঁচিয়ে এগিয়ে এল আমার দিকে।
মহা ফ্যাচাং বাস্তবিক। কামড়াবে নাকি কুকুরটা? যা চেহারা, ও তো কামড়ালেই জলাতঙ্ক! রাস্তা থেকে একটা থান ইট তুলে নিয়ে আত্মরক্ষার জন্য তৈরি হলাম।
–হ্যাঁগা ভালমানুষের ছেলে, কী রকম আক্কেল তোমার?… কানের কাছে যেন ফাটা কাঁসর বেজে উঠল একটা। চমকে তাকিয়ে দেখি রণরঙ্গিণী মূর্তি। এক হাতে গোবরের বালতি, আর-এক হাত কোমরে দিয়ে দাঁড়িয়েছে বাঁকা হয়ে।
-বলি কী আক্কেল তোমার? কেন আমাদের রোগা বাছাকে ভয় দেখাচ্ছ? একেই দেহটা ভালো নেই, তার ওপরে অমন থান ইট তুলেছ–যদি একটা ভালোমন্দ কিছু হয়, তখন?
হাত থেকে ইট ফেলে দিলাম বেকুবের মতো।
আজ্ঞে কার কথা বলছেন আপনি?
–ন্যাকা আর কি! … আয় বিউটি, ঘরে আয়। এই খুনে ছোঁড়াটা তোকে মেরে ফেলবে।
বিউটি! ও হরি–এই নেড়ী কুত্তাটা! আমার ইটের ভয়ে এঁরই ভালো-মন্দ হবে তা হলে! আমি হেসে ফেললাম।
রণরঙ্গিণী মুখ বাঁকিয়ে বললে, হাসছ! লজ্জাও করে না? কিন্তু ভদ্র লোকের বাড়ির সামনে যে অমন হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছবাপু, মতলবখানা কী?
সভয়ে বললাম, আজ্ঞে মাপ করবেন, ভারি ভুল হয়েছে। আপনাদের বিউটিকে আর আমি ভয় দেখাব না। কিন্তু আমি জানতে এসেছিলাম, এইটেই কি উকিল এম. এন. ঘোষের বাড়ি?
হাতের গোবরের বালতিটা নামিয়ে মহিলা বললেন, এম-এন টেম-এন বুঝিনে বাপু, মহেন্দর ঘোষের বাড়ি এইটে বটে। আমার ছোট ভাই, তা তুমি কে?
–আমাকে কেবলরাম পাঠিয়েছে, এম. এন. ঘোষের ছেলে কালাচাঁদকে পড়াবার জন্য
-ওঃ বুঝেছি! মহিলা একটা স্বস্তির শ্বাস ফেললেন, কেলোর ম্যাস্টার তুমি? তা অমন খুনের মতো দাঁড়িয়েছিলে কেন? তোমার যা হালচাল, হয়তো ঠেঙিয়ে ঠেঙিয়ে ছেলেটাকে মেরেই ফেলবে।
আমি ঘাবড়ে গেলাম। এই রে–বিউটিকে ইট দেখিয়েই বুঝি দশ-দশটা টাকার আশায় আমার ছাই পড়ল। বললাম, না, না, সত্যি বলছি, আমি ছেলেপুলেকে বড্ড ভালোবাসি। কখনও হাত তুলি না তাদের গায়ে। এই ইয়ে, মানে কুকুরটা কামড়াতে চাইছিল কিনা, তাই একটু ভয় দেখাবার জন্য–মানে ইয়ে, আমি ওকে মারতাম না
কে জানে বাপু, তোমার মতিগতি আমার ভালো ঠেকছে না। তা এসেছ যখন বসো ওই ঘরে। কেলো আমাদের সোনার ছেলে, তার গায়ে যদি হাতফাত তোলো–
আজ্ঞে না, কক্ষনো না রুদ্ধশ্বাসে বললাম আমি।
পাশের ঘরে একটা ভাঙা বেঞ্চিতে আমি বসলাম। চমৎকার সাজানো ঘরটি! একটা ন্যাড়া খাটের ওপর কতকগুলো বইখাতা পড়ে আছে, সারা ঘরে মুড়ি থেকে শুরু করে শালপাতার ঠোঙা অবধি ছড়ানো। দেওয়ালে একটা কার্পেটের ছবি বাঁধানো, মনে হচ্ছে হাতি কিন্তু নীচে লেখা রয়েছে তাজমহল।
বসে বসে ঘরের শোভা দেখছি, এমন সময় নেপথ্য থেকে সেই রণরঙ্গিণীর গলা শুনতে পেয়ে আমি চমকে উঠলাম।
