অথ নিমন্ত্রণ ভোজন

পিসতুতো ভাই ফুচুদার সবই ভালো, কেবল নেমন্তন্নের নাম শুনলেই তাঁর আর মাথাটা ঠিক থাকে না।

দিব্যি আছেন ভদ্রলোক, খাচ্ছেন দাচ্ছেন, বাঁশি বাজাচ্ছেন। কোনও ঝামেলা নেই। এমন সময় হঠাৎ শুনতে পেলেন রাঘব মুখুজ্যের বাপের শ্রাদ্ধে নেমন্তন্ন করে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে ফুচুদার ভাবান্তর। দু’দিন আগে থেকে খাওয়া কমিয়ে দিলেন, তারপর শুরু করে দিলেন ডন আর বৈঠকী। শরীর ভালো করা চাই, খিদেটাকে চাগিয়ে তোলা চাই। পরস্মৈপদী লুচি-পান্তুয়া যত বেশি পেটস্থ করে আনা যায় ততই লাভ!

বর্ণনাটা শুনে মনে হতে পারে লোকটি ইয়া তাগড়া জোয়ান–বুকের ছাতি বুঝি বাহান্ন ইঞ্চি! কিন্তু ভুল–একদম ভুল। আমি শ্রীমান প্যালারাম বাঁড়ুজ্যে–পালাজ্বরে ভুগি, বাসকপাতার রস আর চিরতা খেয়ে প্রাণটাকে ধরে রেখেছি। সুতরাং যারা আমাকে দেখনি তারাও নিশ্চয় বুঝতে পেরেছ আমার চেহারাটা কী রকম। কিন্তু বললে বিশ্বাস করবে না–সেই আমি স্বয়ং শ্রীমান প্যালারাম–ল্যাং মেরে ফুচুদাকে চিৎপটাং করে দিতে পারি। অর্থাৎ ফুচুদা রোগা একেবারে প্যাঁকাটির মতো–ঝাঁকড়া চুলওয়ালা মাথাটি দেখতে একটা খেজুরগাছের আগার মতো–আর পিলেতে ঠাসা পেটটা দেখলে মনে হয় কোনদিন সেটা বেলুন হয়ে ভদ্রলোককে আকাশে উড়িয়ে নিয়ে যাবে।

এই তো চেহারা–কিন্তু আহারের ক্ষমতাটি অসাধারণ। অত বড় পিলের সাম্রাজ্য পেটে নিয়ে লোকটা লুচি-মণ্ডাগুলো যে কোথায় রাখে এ একটা গুরুতর ভাবনার বিষয়। ক্লাসে অঙ্কের পরীক্ষায় আমি প্রায়ই গোল্লা খাই। তবু অনেক চিন্তা করে আমার মনে হয়েছে ফুচুদার পেটের পরিধি নির্ধারণ করার চাইতে স্কোয়াররুটের অঙ্ক কষাও সোজা।

এই ভদ্রলোকের পাল্লায় পড়ে একবার একটি নিমন্ত্রণ রক্ষা করেছিলাম।

জীবনে অনেক দুঃখই ভুলেছি। এমন কি গত বছর খেলার মাঠে কাটা-ঘুড়ির পিছনে ছুটবার সময় একটা নেড়ী কুকুর যে আমার বড় সাধের নতুন আলবার্ট জুতোজোড়া আমসত্ত্ব ভেবে চিবিয়ে খেয়েছিল, তা পর্যন্ত ভুলে যেতে রাজি আছি। কিন্তু ফুচুদার সঙ্গে নেমন্তন্ন রক্ষা করতে গিয়ে যে সাংঘাতিক দাগা পেয়েছিলাম মরে গেলেও সে আমি ভুলব না।

থাকি মফস্বল শহর দিনাজপুরে–পড়ি জেলা ইস্কুলে। এমন সময় আমাদের দু’ভাইয়ের পৈতে হল। আমি প্যালা, আর মেজদা ন্যালা কানে বেলকাঁটার ফুটো নিয়ে নাক টিপে প্রাণায়াম করি আর পঞ্জিকা খুলে খুলে খুঁজি কবে সায়ংসন্ধ্যা নাস্তি!

তোমাদের ভেতরে যাদের পৈতে হয়েছে তারা নিশ্চয় জানো যে, এই সময় ব্রাহ্মণবটুদের দামটা কী রকম বেড়ে যায়। পাড়ার বুড়িদের যত ফলদানের ব্রত–সে তো আমাদের বাঁধা! দ্বাদশজন ব্রাহ্মণ-ভোজনেও আমাদের ডাক পড়বেই। বেশ সুখেই ছিলাম সন্দেহ কী।

আমাদের এক আত্মীয় আছেন–নাম শ্যামানন্দ চৌধুরী। থাকেন দিনাজপুরের পরের স্টেশন বিরোলে সেখানে যেন তাঁর কী একটা ব্যবসা আছে।

হঠাৎ শ্যামানন্দবাবুর শখ হল, তিনি তাঁর বাবার বাৎসরিক শ্রাদ্ধে জন কয়েক ব্রাহ্মণ-ভোজন করাবেন।

বিরোল জায়গাটি ছোট। একটি বাজার, খান কয়েক দোকান–একটি থানা। অনেক কুড়িয়ে বাড়িয়েও ন’জনের বেশি ব্রাহ্মণের সন্ধান সেখানে পাওয়া গেল না। সুতরাং শ্যামানন্দবাবু দিনাজপুরে এলেন বাকি তিনজন ব্রাহ্মণের খোঁজে। আর যোগাড় করলেন কাকে কাকে বলো তো? আমি প্যালা, মেজদা ন্যালা, আর পিসতুতো ভাই ফুচুদাকে।

সেদিন বিকেলেই দেখলাম, উঠনে দাঁড়িয়ে ফুচুদা প্রাণপণে মুগুর ভাঁজছেন। সে একখানা দেখবার মতো জিনিস। পাড়ার যত কাক সেদিন সেব্যাপার দেখে কা কা করে মাইল তিনেক দূরে পালিয়ে গেল। বেগুনখেতে বাঁশের মাথায় কেলে হাঁড়ি দেখলেও তাদের এত ভয় করে না।

পরদিন সকাল থেকেই নামল মুষলধারে বৃষ্টি।

সারা বছরেও বোধ হয় কোনওদিন এমন বেখাপ্পা বৃষ্টি নামেনি। আকাশের চৌবাচ্চাটা কী করে সেদিন ফুটো হয়ে গিয়েছিল কে জানে–হড়-হড় করে জল যে পড়তে লাগল তার আর বিরাম নেই।

আর অবস্থা দেখে ফুচুদার চোখ দিয়েও অমনি করে বর্ষা নামবার উপক্রম। আহা হা–বিরোলের কই মাছ বিখ্যাত–তার তিনটেতে সের হয়। তা ছাড়া আগের দিন বিকেলে শ্যামানন্দবাবু দিনাজপুর থেকে যে-পরিমাণ বাজার করে নিয়ে গেছেন তাতে ওখানে যে দস্তুরমতো একটা রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেছেন তাতেও সন্দেহ নেই। কিন্তু যা বৃষ্টি–স্টেশনে যাওয়া তো দূরের কথা, বাড়ি থেকে বেরুনোও অসম্ভব।

শুধু ফুচুদা কেন–আমাদের মনটাও খারাপ হয়ে গেল।

দশটার ট্রেনে আমাদের যাওয়ার কথা। নটা বাজতে না বাজতেই ফুচুদা ছটফট করতে লাগলেন। ইচ্ছেটা–ওই বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে পড়বেন।

আর থাকতে না পেরে ফুচুদা দরবার করতে গেলেন বাবার কাছে।

-মামা, ট্রেনের সময় তো হল।

বাবা ভয়ানক রাশভারী লোক–ছুটির দিন বসে বসে পড়েন মোটাসোটা ফিলজফির বই, আর সে সময় কেউ বিরক্ত করলে ভয়ঙ্কর চটে যান। ফুচুদার কথা শুনে তিনি বই থেকে মুখ তুললেন, চশমাটা নামিয়ে আনলেন নাকের একেবারে ডগাটাতে, শান্তভাবে প্রশ্ন করলেন, তাতে কী হয়েছে?

বিরোল তো যেতেই হয়—

বাবা বললেন, হুঁ।

ব্রাহ্মণ-ভোজনের ব্যাপার, গেলে ভদ্রলোকের

মুখের কথাটা লুফে নিয়ে বাবা বললেন, ভদ্রলোকের স্বৰ্গত বাপের গলায় পিণ্ডি সেঁধোবে না–এই তো? তা নাই সেঁধোল–এই বাদলার দিনে একবেলা উপোস করে থাকলেও তাঁর ক্ষতি হবে না। ভেবেছ, এই বৃষ্টির ভেতরে আমি তোমাদের বেরুতে দেব? তারপর ভিজে তিনজনের নিমোনিয়া হলে ডাক্তারের কড়ি গুনবে কে? যাও–এখন ঘরে বসে লজিক পড়ো গে। বিকেলে আমি পরীক্ষা নেব।

হাঁড়ির মতো মুখ করে ফুচুদা পালিয়ে এলেন।

ছোট বোন আনি অত্যন্ত ফাজিল। বললে, ফুচুদা–একটা কোলাব্যাং মেরে উঠোনে চিৎ করে রাখো–এখুনি বৃষ্টি ধরে যাবে।

ফুচুদা দাঁত খিঁচিয়ে বললেন, যা-যা—

কিন্তু কপাল ভালো, হঠাৎ ঝাঁ করে বৃষ্টিটা থেমে গেল।

আর কথাবার্তা নেই-ফুচুদা আমাদের দু ভাইকে বগলদাবা করে সোজা ছুট দিলেন ইস্টেশনের দিকে। দশটার ট্রেনটা আধঘণ্টা আগেই বেরিয়ে গেছে আরও আধঘণ্টা পরে এগারোটার গাড়ি পাওয়া গেল। আত্মপ্রসাদের হাসি হেসে ফুচুদা বললেন, দেখলি তো ট্রেনটা কী রকম পেয়ে গেলাম। আরে, শাস্ত্রে কী বলেছে জানিস? ব্রাহ্মণ-ভোজনের নিমন্ত্রণ যে অবহেলা করে, তাকে চৌষট্টি হাজার রৌরব আর কুম্ভীপাক নরকে বাস করতে হয়।

আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, কোন শাস্ত্রে আছে ফুচুদা?

ফুচুদা গম্ভীর হয়ে বললেন, পেটার্থ-সংহিতায়। লিখেছেন অগস্ত্য মুনি। দুনিয়ার সেরা পেটুক–এক চুমুকে সমুদ্রটাকেই জলপান করে ফেলেছিলেন।

ট্রেনটা সবে স্টেশন ছেড়ে বেরিয়েছে এমন সময় আবার বৃষ্টি।

ফুচুদা বললেন, তা হোক। খায়েঙ্গা ইয়া মরেঙ্গা। সাইক্লোন হলেও কেউ আজ আর ঠেকাতে পারবে না। আহা হা-বিরোলের কই আর রাধিকাপুরের চমচম–একখানা মণিকাঞ্চন যোগ যা হবে।

উস্-উস্ করে জিভে জল টেনে নিয়ে বাজখাঁই গলায় ফুচুদা বিকট রাগিণী ধরলেন :

“যদি কুমড়োর মতো চালে ধরে রত
পান্তুয়া শত শত,
আর ধানের মতন হ’ত মিহিদানা
বুঁদিয়া বুটের মত,
আমি গোলা ভরে তুলে রাখতাম গো—

দশ-বারো মিনিটের পথ। বিরোল স্টেশনে এসে যখন আমরা নামলাম তখন প্রবল বৃষ্টিতে চারিদিকের কোনও কিছু আর দেখা যাচ্ছে না। মোটা মোটা ধারায় অশ্রান্তভাবে জল পড়ছে আর বৃষ্টির রেণু যেন ঘন কুয়াশার মতো আকাশ বাতাস মাঠ-ঘাটকে ঢেকে ফেলেছে। কোনওখানে জনপ্রাণীর চিহ্ন নেই।

সঙ্গে ছাতা ছিল। কিন্তু সে বৃষ্টি কি আর ছাতায় বাগ মানবার পাত্র! রাস্তাও কম নয়–স্টেশন থেকে প্রায় একটি মাইলের ধাক্কা!

আমরা বললাম, ফুচুদা–যা বৃষ্টি, একটু স্টেশনে দাঁড়িয়ে গেলে হয় না?

ফুচুদা বললেন, বৃষ্টি! বৃষ্টি তো হয়েছে কী? বর্ষাকালে আকাশ থেকে জল পড়বে না তো পাকা তাল পড়বে নাকি? চল চল। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে, আরও দেরি করে গেলে বাকি ন’টা বামুনে সব কটা কই মাছ আর সবগুলো চমচম বেমালুম মেরে দেবে। খানিকটা ঝোল আর খানিক রস ছাড়া আর কিছু জুটবে না তা হলে। নে–বেরিয়ে পড়। গায়ে একটু জলের ছিটে না লাগতেই ছাগলের মতো ঘরের দাওয়া খুঁজে বেড়াস, জীবনে কী করে উন্নতি করবি–অ্যাাঁ?

তা বটে। জীবনে উন্নতি করাটা খুবই দরকার বলে শুনেছি। কিন্তু এমন প্রাণান্তিক নেমন্তন্ন না খেলে সে-উন্নতি যে হতে পারে না, এ কথা কখনও শুনিনি। তবু বেরুতেই হল।

ফুচুদা বললেন, দুর্গা-দুগা–দুর্গে দুর্গতিনাশিনী। কিন্তু বৃষ্টির শব্দে দেবী বোধহয় ফুচুদার কথা ভাল করে শুনতে পাননি। দুর্গতিনাশিনী না শুনে শুনেছিলেন বোধ করি ‘দুর্গতি-দায়িনী’। তাই পরমানন্দে দুর্গা আমাদের দুর্গতি শুরু করে দিলেন।

রেললাইনের পাশ দিয়ে কাঁচা রাস্তা। বর্ষায় তার যা শ্রী হয়েছে ভাষায় তার বর্ণনা সম্ভব নয়। হাঁটু-প্রমাণ কাদার তলায় জুতো চালান হয়ে যেতে লাগল। পা উঠে এল জুতো এল না। কাদা হাতড়ে হাতড়ে–যেমন করে লোকে জিওল মাছ ধরে, তেমনি করে আমরা জুতো উদ্ধার করতে লেগে গেলাম।

বৃষ্টি পড়ছে সমানে। ছাতার ভেতর দিয়ে জল চুঁইয়ে পড়ছে। মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া আসছে– কই মাছের সঙ্গে চমচমের মতো মণিকাঞ্চন যোগ হয়েছে। জামাকাপড়ের আধ ইঞ্চিও শুকনো নেই ঠাণ্ডা হাওয়ায় আর বৃষ্টির জলে আমরা হিহি করে কাঁপছি।

ফুচুদা বুক ঠুকে বললেন, ইসমে ক্যায়া হ্যায়? ধৈর্য চাই বুঝলি ধৈর্য চাই। দ্যাখ–বিদ্যেসাগর মশাই

নীতিমুলক গল্পটা শেষ হওয়ার আগেই ফুচুদার আর্তনাদ উঠল : আরে–আহা-হা

দমকা হাওয়ায় ফুচুদার ছাতাটা বেমালুম উলটে গেছে। আরে মোলো

প্রাণপণে ছাতায় চাপ দিয়ে ঠিক করতে গিয়েই–মট মট। দু দুটো শিকের গয়াপ্রাপ্তি।

ধ্যাত্তোর–যাত্রাটাই খারাপ–এতক্ষণে ফুচুদার স্বীকারোক্তি, কিন্তু দমবার লোক নন তিনি। বললেন, তা হোক। খাওয়াটা ভালোই হবে কী বলিস? বিরোলের কই আর রাধিকাপুরের চম–

কিন্তু বাকি ‘চম’টা বলবার আগেই দম–একেবারে আলুর দম। ফুচুদা কাদায় ভূত হয়ে গাত্রোত্থান করতে না করতেই আবার অধঃপতন! এঁটেল মাটিতে পা আর দাঁড়ায় না।

দৃশ্যটা উপভোগ করব কী–ততক্ষণে দু’ভাই–আমি প্যালা, আর মেজদা ন্যালা, দুজনেই আছাড় খেয়ে পড়েছি। পাঁচ মিনিট ধস্তাধস্তির পরে তিনজনে যখন উঠে দাঁড়াতে পারলাম, তখন কেউ কাউকে চেনা তো দূরের কথা নিজেরাই নিজেদের চিনতে পারছি না। একটু আগেই প্যালারাম ছিলাম তাতে সন্দেহ নেই কিন্তু এখন আমি কে? কাদায় যা অবস্থা হয়েছে, তাতে তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি এখন আমিও হতে পারি, মেজদা ন্যালাও হতে পারি–এমন কি ফুচুদা হওয়াও আশ্চর্য নয় বোধহয়!

নিজের নিজত্ব সম্বন্ধে সজাগ হবার আগেই আবার পতন, আবার উত্থান, পুনরায় পতন। কখনও পর পর তিনজন, কখনও একসঙ্গে দুজন, কখনও বা তিনজনই একসঙ্গে। পতন-অভ্যুদয়ের সে কী বিচিত্র লীলা! আঘাত খেতে খেতে এখন আর ব্যথা পাচ্ছি না–আছাড় খাওয়াটা যেন নেশার মতো ধরেছে আমাদের। কারও মুখে আর কোনও কথা নেই, পড়ছি, উঠছি আবার পড়ছি। যেন জীবনে আছাড় খাওয়াই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য।

খানিক পরে পায়ের নীচে আবার শক্ত জমি পাওয়া গেল। আর মুখ খুলল ফুচুদার : উঃ–কার মুখ দেখে আজ বেরিয়েছিলাম রে! একেবারে ত্রিভুবন দেখিয়ে দিলে। আচ্ছা–এর শোধ তুলব, কই

কথাটা শেষ হল না–সঙ্গে সঙ্গে যেন ভোজবাজি। ধপাস ঝুপ করে একটা শব্দ আর ফুচুদা ভ্যানিশ।

আমি প্যালা আর মেজদা নালা–আমরা দু’ভাই নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না! সত্যিই ফুচুদা নেই, কোথাও নেই! রাস্তার পাশে একটা ছোট নালা দিয়ে বর্ষার জল যাচ্ছে–শুধু তার ওপরে একটা ছাতার বাঁট দেখা যাচ্ছে। আর স্থলে জলে অন্তরীক্ষে-উঁহু–কোথাও নেই। ফুচুদা একেবারে হাওয়া! ভুতুড়ে কাণ্ড নাকি?

আমরা দুভাই প্রাণপণে চেঁচিয়ে উঠলাম : ও ফুচুদা—

নালার জলে বিরাট আলোড়ন। ওরে বাবা, কুমির উঠছে নাকি?

না, ভয় নেই কুমির নয়, ফুচুদা উঠে এলেন। বৃষ্টির জলে যেটুকু বাকি ছিল–নালার জল তা শেষ করে দিয়েছে। গা বোঝাই পাঁক–ঘাড়ে মাথায় একরাশ পচা পাতা–নাকে মুখে ব্যাঙাচির নৃত্য–ফুচুদার সে কী রূপ খুলেছে–মরি মরি!

ফুচুদা হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, একপাটি জুতো গেল। অনেক ডুবে ডুবে খুঁজলাম–ব্যাটাকে কোথাও পাওয়া গেল না। নাঃ–কপালটাই খারাপ!

তবু সব পথের শেষ আছে, আমাদেরও শেষ হল।

নেমন্তন্ন বাড়িতে যখন পৌঁছলাম তখন আমাদের দেখে শ্যামানন্দবাবু আর্তনাদ করে উঠলেন, সর্বনাশ এ কী হয়েছে! এসো, কাপড়-জামা ছেড়ে ফেলো এখুনি

তোমরা ভাবছ এত দুঃখের পরে খাওয়াটা বোধহয় ভালোই জমল। কিন্তু হায় রে! তা হলে কি আর এ-গল্প লেখবার দরকার ছিল! দুগা দুর্গতি-দায়িনী কী কুক্ষণেই যে ফুচুদার প্রার্থনায় কর্ণপাত করেছিলেন। এ-যাত্রাও তিনি আমাদের ভুলবেন না।

কই মাছের গামলাটা সবে আমাদের বারান্দার দিকে আসছে আর সেদিকে তাকিয়ে জ্বলজ্বল করে উঠেছে ফুচুদার চোখ, এমন সময়- আরে দূর-দূর-মার-মার-মার

শ্যামানন্দবাবু চেঁচিয়ে উঠেছেন। কিন্তু তার আগেই যা হবার তা হয়ে গেছে। কোত্থেকে একটা ঘিয়ে ভাজা কুত্তা তড়াক করে লাফিয়ে উঠেছে বারান্দায়।

নতুন ব্রাহ্মণ, সবে পৈতে হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে পাতা ছেড়ে আমরা উঠে পড়লাম। খাওয়ার পর্ব ওইখানেই ইতি।

কই মাছের গামলা আবার অন্যদিকে ফিরে গেল।

শ্যামানন্দবাবু হায় হায় করতে লাগলেন। কিন্তু ফুচুদার বুকে যে আগুন জ্বলছে তাকে নেবাবে কে?

অন্যমনস্ক চোর

তোমরা কখনও অন্যমনস্ক চোর দেখেছ? আমি একবার দেখেছিলুম। সেই কথাই বলি।

আমাদের কলকাতার বাসায় তখন কেউ নেই। গরমের ছুটি হওয়াতে সবাই দার্জিলিং বেড়াতে চলে গেছে। একশো আট ডিগ্রির জ্বালায় আমি একা বসে ছটফট করছি। অথচ আমার কলকাতা ছাড়বার জো নেই– আই এ পরীক্ষার একগাদা খাতা দেখতে হচ্ছে।

সেদিন রাতে কিছুতেই ঘুম আসছে না। একে তো প্রায় সাড়ে বারোটা অবধি খাতা দেখেছি মাথার মধ্যে বানান আর ব্যাকরণের ভুলগুলো পোকার মতো কিলবিল করছে। তায় অসহ্য গরম– ঘুরন্ত পাখাটাও যেন আগুন বৃষ্টি করছে।

অনেকক্ষণ এপাশ ওপাশ করে সবে একটু ঝিমুনি এসেছে, হঠাৎ শুনতে পেলুম, ধ্যাৎ, সিন্দুকটা গেল কোথায়?

ভাবলুম স্বপ্ন দেখছি, তক্ষুনি আবার কানে এল : ড্রেসিং টেবিলটাও উড়ে গেল নাকি?

আর সন্দেহ নেই ঘরে কেউ ঢুকেছে। পুরো চোখ মেলে পরিষ্কার দেখলুম, জানালার কাছে কে দাঁড়িয়ে।

মাথার পাশেই টিপয়ের ওপরে টেবল ল্যাম্প ছিল। সুইচ টিপে সেটা জ্বাললুম। যা ভেবেছি তাই, ঘরে চোর ঢুকেছে। সাদা বেনিয়ান আর ধুতিপরা একটা বেঁটে মতো লোক– জানালার পাশটিতে চুপ করে দাঁড়িয়ে। চোর চোর বলে চেঁচাতে যাব, তার আগেই লোকটা হাতজোড় করে বললে, কিছু মনে করবেন না স্যার আপনার ঘুমের ডিসটার্ব করলুম। একটু ভুল হয়ে গেছে।

লোকটার কথার ভঙ্গিতে ভয় কেটে গিয়ে ভারি আশ্চর্য লাগল আমার। বললুম, তার মানে?

সে বললে, এটা তো বাহান্ন নম্বরের বাড়ি নয়?

আমি বললুম, না– বাইশ নম্বর।

লোকটা বললে, দেখলেন তো, ঠিক ধরেছি। বাহান্ন নম্বরের জানালা বেয়ে উঠলেই ডানদিকের দেওয়ালে লোহার সিন্দুক- এই তার নকল চাবি। বলে সে আমাকে একটা ছোট চাবি দেখালে। তারপরে বলে চলল, আর লোহার সিন্দুকের পাশেই হল ড্রেসিং টেবিল- আজ রাতে গিন্নিমা সিনেমা থেকে ফিরে তার টানায় গয়নাগুলো খুলে রাখবেন। ঘরে ঢুকেই আমি টের পেয়েছি, সব গড়বড় হয়ে গেছে। ভালো কথা, এটা প্যারীচাঁদ লেন তো?

আমি বললুম, না– পটলডাঙা লেন।

-ওই দেখুন রাস্তাতেও গণ্ডগোল। ধ্যাৎ ভালো লাগে নাকি? কী বিচ্ছিরি ভুল দেখুন তো?

লোকটার কথাবার্তা অদ্ভুত লাগছিল। মাঝরাতে জানালা বেয়ে ঘরে ঢুকে এ আবার কী রসিকতা শুরু করলে। বললুম, ব্যাপার কী হে, তোমার মাথা খারাপ নাকি?

-মাথা খারাপ হতে যাবে কেন স্যার? আমাকে দেখে কি তাই মনে হচ্ছে? আমি চোর।

-চোর!

অত অবাক হয়ে গেলেন কেন?– লোকটা প্রায় আমাকে ধমকই লাগিয়ে দিলে, একটা : রাত্তিরবেলা আপনার ঘরের জানলা দিয়ে চোর ঢুকবে না তো ডাকপিয়ন ঢুকবে নাকি? কী যে বলেন কিছু মানে হয় না।

আমি বললুম, অ, বুঝেছি। বাহান্ন নম্বর প্যারীচাঁদে চুরি করতে গিয়ে বাইশ নম্বর পটলডাঙায় ঢুকেছে!

–ইয়া, ঠিক ধরেছেন এবারে। কিন্তু কী ল্যাঠা বলুন দিকি? এতটা জানালা বেয়ে উঠেছি, জলের পাইপের ঘষায় হাঁটুর ছাল উঠে গেছে বুকের ভেতর হাঁফ ধরছে; এখন কি আর প্যারীচাঁদ লেনে যেতে ইচ্ছে করে? আপনার ঘরে একটু বসব স্যার? জিরিয়ে নেব একটুখানি?

আমার বেশ লাগছিল চোরটাকে। বললুম, তা বসতে পারো।

বলেই আমি হাঁ-হাঁ করে উঠলাম।

আরে, আরে– ওটা কিসের ওপর বসছ?

কিন্তু ততক্ষণে যা করবার তা করে ফেলেছে। টুলের পাশে কুঁজোটা ছিল, ভুল করে টুল ভেবে চেপে বসতে গেছে কুঁজোয়– আর তক্ষুনি পড়ে গেছে মুখ থুবড়ে। কুঁজো ভেঙে চৌচির। ঘরময় জল!

বোকার মতো একগাল হেসে উঠে দাঁড়াল, ভিজে জবজবে।

আমি রেগে বললুম, এটা কী হল শুনি?

লোকটা গাল চুলকে বললে, আপনার একটু ড্যামেজ করে ফেললুম স্যার! কিছু মনে করবেন না। নিজেও একদম ভিজে গেছি।

বললুম, টুলটা টেনে ভালো করে দেখে বোসো। আবার রেডিওটার ওপরে চাপতে যেয়ো না।

সে বললে, না স্যার, বার বার কি আর ভুল হয়? একটা ঝাঁটা দিন– ঘরটা সাফ করে ফেলি! এই যে পেয়েছি বলে সে আমার ছাতাটা তুলে নিলে।

আমি ব্যতিব্যস্ত হয়ে বললুম, রাখো– রাখো– ওটা ঝাঁটা নয়, ছাতা। খুব হয়েছে, তোমার আর ঘর সাফ করবার দরকার নেই।

লোকটা লজ্জিত হয়ে টুলটার ওপর বসে পড়ল। বার কয়েক কান-টান চুলকে বললে, একটা বিড়ি খাব স্যার? কিছু মনে করবেন না?

–মনে করব কেন– খাও না।

বলতেই বুক-পকেট থেকে টিনের কৌটো আর দেশলাই বের করলে। তারপর একটা দেশলাইয়ের কাঠি মুখে দিয়ে বিড়িটাকে দেশলাইয়ের গায়ে ঘষতে লাগল।

ধ্যাৎ– ধরছে না! কী যাচ্ছেতাই দেশলাইয়ের কাঠি।

আমি বললুম, কী পাগলামো হচ্ছে শুনি? ভালো করে তাকিয়ে দেখো তো, কী ঘষছে।

-এঃ হে, তাই ধরছে না! বলেই সে বিড়িটা ফেলে দিলে। তারপর ফস করে দেশলাই ধরিয়ে নিজের মুখের কাঠিতে ঠেকাল। সেটা ফড়াং করে জ্বলে উঠতেই চমকে এক লাফ।

–ইস–নাকটা পুড়ে গেল স্যার! উঃ-উঃ

বললুম, বিড়ির বদলে দেশলাইয়ের কাঠি ধরালে নাক পোড়েই।

–তাই তো দেখছি।–লোকটা ব্যাজার হয়ে উঠল; দুত্তোর, বিড়ি আর খাবই না। বলে সে রেডিওটার ওপর চেপে বসতে গেল।

–আরে, আরে–ওটায় নয়–টুলে বোসো। আমি চেঁচিয়ে উঠলুম।

–ঠিক ধরিয়ে দিয়েছেন স্যার!–লোকটা আপ্যায়িত হল : আর একটু হলেই রেডিওটা সুদ্ধ আমি আছাড় খেতুম। কিন্তু নাকটা খুব জ্বলছে- বুঝলেন। বোধ হয় ফোঁসকা পড়বে।

আমি বিরক্ত হয়ে বললুম, ফোঁসকা পড়াই উচিত তোমার– যেমন কাণ্ড! এত ভুলো মন নিয়ে চুরি করো কী করে?

নাকের ডগায় হাত বুলোত বুলোতে সে বললে, ওই জন্যেই তো মধ্যে-মধ্যে ভারি মুস্কিল হয় স্যার! মাস ছয়েক আগে কী কাণ্ড করেছিলম– জানেন? ভিড়ের মধ্যে ট্রামে উঠেছি–পকেট মারব। একজনের পয়সা বাঁধা রুমালটা তুলে নিয়ে যেই ট্রাম থেকে লাফিয়ে পড়েছি– সঙ্গে সঙ্গে কে যেন বললে, পকেটমার পকেটমার! লোকে তাড়া করলে– আমিও টেনে দৌড়। রাস্তার ডান দিকের গলি ভুল করে বাঁ দিকে ছুটলুম সোজা কোথায় ঢুকলুম গিয়ে–জানেন? থানার মধ্যে!

থানার মধ্যে?

–তাতে দুঃখু ছিল না স্যার! আসলে গোলমালটা হল অন্য জায়গায়। যেরুমালটা অন্যের পকেট থেকে নিয়েছি ভেবেছিলুম– সেটা আমারই রুমাল। ভিড়ের ভেতর অন্যের ভেবে নিজেরই পকেট মেরেছি। তাতে ছোট-ছোট আলুভাজার মতো পাঁচটা নয়া পয়সা বাঁধা ছিল।

-বলো কী।

লোকটা উত্তেজিত হয়ে বললে, একটা পাহারাওয়ালার কী আস্পর্ধা স্যার আমাকে বললে, পাগল করাচি চলে যা।

বললুম, করাচি নয়–রাঁচি।

লোকটা বললে, একই কথা স্যার! তা আমার খুব রাগ হল। পাহারাওয়ালাকে বোঁ করে একটা ঘুষি মেরে বললুম, জানিস আমি চোর, তবু তুই আমাকে পাগল বলিস! তোর ইচ্ছে হয়, তুই করাচি যা। আমি চোর, আমি হাজতে ঢুকব। এই বলে জোর করে হাজতে ঢুকতে যাচ্ছি, সবাই মিলে আমায় ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় বের করে দিলে। আর সেই পাহারাওয়ালাটা ঘুষি খেয়েও দাঁত রকুটে হাসতে লাগল।

আমি মাথা নেড়ে বললুম, ভারি দুঃখের কথা।

লোকটা বললে, এই জন্যেই তো মন খারাপ হয়ে যায় স্যার! অত কষ্ট করে চোর হয়েছি- এখন পাগল বললে কি ভালো লাগে, বলুন তো? অথচ আসবার সঙ্গে সঙ্গেই সে কথা বলে আপনি আমায় দুঃখ দিলেন।

আমি বললুম, বুঝতে পারিনি, তাই বলেছি, কিছু মনে কোরো না। তা চুরিচামারিতে কিছু হয়?

একেবারে কিছু হয় না– তা বলব না স্যার! এই তো কদিন আগে এক ঢাকাই মহাজনের বাড়িতে চুরি করতে গিয়েছিলাম। সামনে ক্যাশবাক্স ছিল, আমি ভুল করে। আর-একটা কী ধরে টান দিলুম। দড়িতে বাঁধা ছিল, টানের চোটে ছিঁড়ে এল। বেশ ভারি শক্ত– গোলগাল। বার করে আনতে মনে হল, সেটা যেন আমাকে কামড়াবার চেষ্টা করেছ। ব্যাপার কী- ক্যাশবাক্স কামড়ায়? অনেক ক্যাশবাক্স দেখেছি, গলা বের করে। কামড়াতে চায় এমন তো দেখিনি। আলোয় এনে দেখি- ধ্যাৎ একটা কচ্ছপ। পরদিন দিলুম রাস্তার একটা লোককে বেচে আটগণ্ডা পয়সা দিলে। একটা অবশ্য সীসের সিকি– তা হোক, চারগণ্ডা পয়সা তো পেলুম। কিছু লাভ তো হলই, কী বলেন?

বললুম, যাঁ– কিছু লাভ হল বই কি।

লোকটা বললে, তবেই দেখুন কাজটা নেহাত মন্দ নয়। উঃ- নাকটা বেজায় জ্বলছে। একটা বিড়ি খাই–কী বলেন?

বললুম, তা খাও। তবে এবার আর মুখ পুড়িয়ো না।

না স্যার, বার বার কি ভুল হয়।– বলে পাশের পকেট থেকে একটা মানিব্যাগ বের করে সে হাতের উপর উপুড় করলে। বিড়ি বেরুল না– ছোট-ছোট আলুভাজার মতো পাঁচটা নয়া পয়সা পড়ল।

— কী মুস্কিল-বিড়িগুলো গেল কোথায়?

লোকটার বোকামি দেখে আমার গা জ্বলে উঠল। বললুম, ওটা মানিব্যাগ। ওর মধ্যে বিড়ি কী করে আসবে?

–তা বটে–এটা মানিব্যাগ লোকটা সেটাকে টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে আবার অন্যমনস্ক হয়ে গেল; সেই রুমাল নিয়ে কেলেঙ্কারি হওয়ার পর একটা ব্যাগ কিনেছি। বুক-পকেটে রাখি। যতই মনের ভুল হোক স্যার নিজের বুক পকেট কেউ মারতে পারে না। পারে স্যার?

একমাত্র তুমিই পারো বোধ হয়।

না স্যার, তিন মাসের মধ্যে আমিও পারিনি। কিন্তু বিড়ি একটা না-খেলেই নয়। বলে, আবার বিড়ি খুঁজতে যাচ্ছে, হঠাৎ ঘরের দেওয়াল-ঘড়িতে টং টং করে তিনটে বাজল।

–অ্যা–তিনটে? কী সর্বনাশ।–

-সর্বনাশ কেন?

বাড়িতে বলে এসেছি যে। তিনটের মধ্যে না ফিরলে তারা ভাববে আমাকে পুলিশ ধরেছে। আপনি একটু উঠুন না স্যার।

-কেন?

–আমাকে থানায় দিয়ে আসবেন।

এবার আমার ভারি রাগ হল। রাত দুপুরে এ কী জ্বালাতন! একটু ঘুমুতে পেলুম না– এখন আবার থানায় দৌড়োই বললুম, তুমি বাড়ি যাও– আমার আর হাড় জ্বালিয়ো না।

লোকটা মিনতি করে বললে, একবারটি চলুন না স্যার, ধরিয়ে দিয়ে আসবেন। আমি বাড়িতে বলে এসেছি–।

ধৈর্য আর কতক্ষণ থাকে। আমি হঠাৎ বেদম চিৎকার করে উঠলুম : গেট আউট-বেরোও–বেরোও বলছি

সেই চিৎকারে বিষয় চমকে লোকটা জানালা বেয়ে টপ করে লাফিয়ে পড়ল। কেঁউ করে একটা কাতর আর্তনাদ উঠল বুঝলুম, নেড়ী কুকুরের ঘাড়ে গিয়ে পড়েছে। ভুল করে আবার জ্বালাতে না আসে, এই ভেবে শক্ত করে জানালাটা এঁটে দিলুম।

সকালে দেখি, টেবিলের ওপর পাঁচটা আলুভাজার মতো নয়া পয়সা আর মানিব্যাগটা পড়ে আছে। আমার চশমার খাপটা পাওয়া গেল না যাওয়ার সময় মানিব্যাগ ভেবে সেইটে নিয়েই পালিয়েছে।

আলু খলিফার শেষ খুন

আগে নাম ছিল আলাউদ্দিন, সংক্ষেপে দাঁড়াল আলু। আলু নয়, আলু খলিফা।

লখনউয়ের মুসলমান—জাত কশাইয়ের ছেলে। লাল টকটকে দুটো চোখ যেন হিংসায় আরক্তিম হয়ে আছে। হাতে লম্বা একখানা চকচকে ভোজালি; তার হাতির দাঁতের বাঁটটার রং প্রথমে ছিল দুধের মতো সাদা, কিন্তু অনেক পশুর রক্ত জমতে জমতে তার রং হয়েছে। কুচকুচে কালো। শুধু ভোজালির ফলাটায় এতটুকু মালিন্য পড়েনি, ক্রমাগত রক্ত-মাংসের শান পড়ে পড়ে যেন তার ওপর থেকে হিরের আলো ঝলকে যায়।

আকস্মিক একদিন দর্শন দিলে প্রেতমূর্তির মতো।

শীতের সকাল, কিন্তু সকাল হয়নি। শেষরাত থেকে নেমেছে স্তরে স্তরে কুয়াশা। দূরের নিদ্রিত নির্বাক সিংহাবাদের বিস্তীর্ণ হিজলের বন থেকে, কৃষ্ণকালীর বিলের দুর্গন্ধ-ভরা জলের ওপর থেকে সেই কুয়াশা উঠে এসেছে। সমস্ত বন্দরটা শীতের আড়ষ্টতায় পড়ে আছে মূৰ্ছাতুরের মতো। দু-হাত দূরের মানুষ চোখে দেখা যায় না।

মদ-গাঁজার সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত ভেণ্ডার জগদীশ তখন অঘোরে ঘুমে মগ্ন। জগদীশ নেশা করে না, কিন্তু দিনরাত নেশার জিনিস নাড়াচাড়া করে তার ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে এক-জাতীয় অভ্যস্ততা এসে দেখা দিয়েছে। নিজের পরিচিত জায়গাটিতে না শুলে ঘুম আসে না জগদীশের। কেরোসিন-কাঠের পুরোনো তক্তাপোশ থেকে সরাসরি ছারপোকা সারারাত সুড়সুড়ি দেয়। মাথার কাছে পায়া-ভাঙা টেবিলে গাঁজার নিক্তি আর গাঁজার পুরিয়া থেকে নিরুদ্ধ ঘরের মধ্যে অত্যুগ্র দুর্গন্ধ ভেসে ভেসে বেড়ায়। পায়ের কাছে পঁয়তাল্লিশ গ্যালন মদের পিপা থেকে পচা মহুয়া, চিটেগুড় আর অ্যালকোহলের একটা সুরভি নিশ্বাসে নিশ্বাসে জগদীশের স্নায়ুগুলোকে রোমাঞ্চিত করে তোলে। ওয়াড়হীন বাঁদিপোতার লেপে আপাদমস্তক মুড়ি দিয়ে জগদীশ মধুর স্বপ্নে তলিয়ে থাকে। স্বপ্ন দেখে বন্দরের খোকা ভুঁইমালীর সুন্দরী বিধবা বোনটা তার জন্যে এক খিলি দোক্তা-দেওয়া পান এনে সোহাগভরা গলায় তাকে সাধাসাধি করছে।

আবেগে উচ্ছ্বসিত হয়ে জগদীশ লেপের মধ্যে যখন বিড়বিড় করে উঠেছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই কানের কাছে যেন বাজ ডেকে গেল।

খোকা ভুঁইমালীর সুন্দরী বোনের কোকিলকণ্ঠ নয়, এমনকী খোকার কটকটে ব্যাঙের মতো গলাও নয়। জগদীশ লাফিয়ে উঠে বসল।

বন্ধ দরজায় তখন লাঠির ঘা পড়ছে। ঘরের মধ্যে শীতার্ত অন্ধকারে মিটমিট করছে লণ্ঠনের লালশিখা, রাত শেষ হয়েছে কি না জগদীশ অনুমান করতে পারল না। এমন অসময়ে যেভাবে হাঁকাহাঁকি করছে, ডাকাত পড়ল না কি?

শীতে আর ভয়ে জগদীশের দাঁত ঠক ঠক করে বেজে উঠল, কে?

দারু চাই বাবু।

দারু। জগদীশের ধড়ে প্রাণ এল। নিশ্চয় মাতাল। অসীম বিরক্তিভাবে দাঁত খিচিয়ে বিশ্রী একটা শব্দ করলে জগদীশ, এই মাঝরাত্তিরে দারু? ইয়ার্কি পেলি নাকি? যা ব্যাটা, পালা।

আরও জোরগলায় কথাটার পুনরাবৃত্তি শোনা গেল, দারু চাই বাবু।

ক্রুদ্ধ জগদীশ লেপটাকে গায়ে জড়িয়ে নিয়েই উঠে পড়ল, ধড়াস করে খুলে ফেললে দরজাটা। যাচ্ছেতাই একটা গাল দিয়ে বললে, সরকারি আইন জানিস? বেলা ন-টার আগে…

কিন্তু কথাটা আর শেষ হতে পারল না। শীত-মন্থর আড়ষ্ট অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে পৈশাচিকভাবে হেসে উঠল লোকটা, ঝিকিয়ে উঠল হাতের ভোজালিখানা। জগদীশ দাঁড়িয়ে রইল পাথরের মূর্তির মতো, শুধু হাঁটুর অস্থিসংস্থানগুলো যেন বিশৃঙ্খল হয়ে গিয়ে পা-দুটো থরথর করে কাঁপতে লাগল।

সরকারি আইন? আইনভাঙা মানুষ আমরা বাবু, আইন দেখিয়ো না। দু-পয়সা বেশি নেবে নাও, কিন্তু লক্ষীছেলের মতো এক বোতল কড়া মাল বার করো দেখি। ভোর বেলায় হামলি আমার ভালো লাগে না।

দেখা গেল, ভোর বেলায় হামলি জগদীশও পছন্দ করে না। নিঃশব্দে আলমারি খুলে সিল করা ত্রিশের একটা বোতল বার করলে। কর্ক স্কুর প্যাঁচ পড়ল, হিস শব্দ করে তীব্র অ্যালকোহলের খানিকটা বিষবাষ্প ছড়িয়ে গেল হাওয়ায়। কালো কোর্তাপরা রাক্ষসের মতো চেহারার মানুষটা বোতলটাকে মুখের কাছে তুলে ধরল। ঢকঢকঢক, এক নিশ্বাসেই আগুনের মতো বিশ আউন্স পানীয় নিঃশেষিত। এক বার মুখবিকৃতি করলে না, শরীরের কোনোখানে দেখা গেল না এতটুকু প্রতিক্রিয়ার লক্ষণ। তারপর দুটো টাকা ছুড়ে দিলে টেবিলের ওপর, ভোজালিখানাকে হাতে তুলে নিলে, ব্যঙ্গচ্ছলেই কি না কে জানে জগদীশকে একটা সেলাম দিলে এবং পায়ের নাগরা জুতোর মচ মচ শব্দ করে বেরিয়ে গেল বাইরে। তমসাচ্ছন্ন কুয়াশায় মিলিয়ে গেল ভৌতিক একটা ছায়ামূর্তি।

আট গন্ডা পয়সার চেঞ্জ পাওনা ছিল লোকটার, ফেলে গেছে অবজ্ঞাভরে। কিন্তু সেদিকে মন ছিল না জগদীশের। হাঁটুটা তখনও কাঁপছে, বুকের মধ্যে রেলগাড়ির ইঞ্জিনের মতো শব্দ হচ্ছে তখনও। স্তব্ধ স্তম্ভিত জগদীশ ভাবতে লাগল কে এই লোকটা? যে এক নিশ্বাসে বিশ আউন্স আগুন পান করতে পারে এবং একটুখানি পা যার টলে না, যার হাসি অমন ভয়ানক এবং যার ভোজালি অমন ধারালো।

কিন্তু কয়েক দিন পরেই তার পরিচয় কারও কাছে অজানা রইল না।

লখনউ শহরের এক্সটার্নড় গুণ্ডা। মোট পাঁচ বার জেল খেটেছে। দু-বার রাহাজানিতে, তিন বার দাঙ্গায়। অবশ্য বয়সে ভাটা পড়েছে এখন, দাঙ্গা-রাহাজানি আলুর আর ভালো লাগে না। ছোটো একটা মাংসের দোকান বসিয়ে নির্বিঘ্নে কয়েকটা শান্তিপূর্ণ দিন যাপন করবার বাসনাই তার ছিল। কিন্তু পুলিশের বুদ্ধি একটু ভোঁতা, সব জিনিসই বোঝে কিছু দেরিতে। অতএব সারাজীবন উন্মত্ততার মধ্যে কাটিয়ে যখন প্রৌঢ়ত্বে নখদন্তগুলোকে সে আচ্ছাদিত করবার চেষ্টায় আছে, সেই সময়েই তার ওপরে এক্সটার্নমেন্টের অর্ডার এল।

প্রথমে ভেবেছিল মানবে না আইনের শাসন, লুকিয়ে থাকবে এদিকে-ওদিকে। কিন্তু বৈচিত্র্যের লোভ, পৃথিবীকে ভালো করে দেখবার একটা মোহ তার মনকে আচ্ছন্ন করে দিলে। এই লখনউ শহর, নবাবি আমলের বাগ-বাগিচা, চকবাজার, এর বাইরে কোন পরিধি, কত বড়ো বিস্তীর্ণ জগৎ? লখনউয়ের লু-হাওয়া ঘূর্ণির ঝড় উড়িয়ে ডাক পাঠাল আলু খালিফাঁকে। ট্রেন ছুটে এল কলকাতায়।

ক্যানিং স্ট্রিটের এক খোলার ঘরে গ্রেট মোগলাই হোটেল। সেই হোটেলের ম্যানেজার একদিন খুন হয়ে গেল। ফুসফুসের মধ্যে ভোজালির ধারালো ফলা বিঁধে গেছে আদ্যন্ত। আলু খলিফার কিছু হাত ছিল কি না অথবা কতখানি হাত ছিল ভগবান বলতে পারেন। কিন্তু পুলিশ আবার পেছনে লাগল, আলুকে কলকাতা ছাড়তে হল।

তারপর ঘুরতে ঘুরতে সে এসে পড়েছে এই পান্ডববর্জিত দেশে। উত্তরবাংলার এক প্রান্তে মাঝারি গোছের একটা গঞ্জ। ফাঁকা মাঠের মধ্য দিয়ে ক্ষীণস্রোতা পাহাড়ি নদী বয়ে চলেছে সরীসৃপ-গতিতে। বাবলা গাছের ডালে বসে আছে শঙ্খচিল। এপারে ছোটো গঞ্জ-বাঙালি

আর হিন্দুস্থানি ধান ব্যবসায়ীর উপনিবেশ। ওপারে ঢালু ব্ৰহ্মডাঙা—শস্যহীন কুশ আর কাঁকরে আকীর্ণ। তারই ভেতর দিয়ে গোরুর গাড়ির ধূলিমলিন পথ চলে গেছে যোলো মাইল দূরের রেলস্টেশনে। ছোটো-বড়ো রাঙামাটির টিলার উপরে বিচ্ছিন্ন তাল গাছগুলো নিঃসঙ্গতার বিরাট ব্যঞ্জনা।

আলু খলিফার ভালো লাগল জায়গাটা। আকাশে-বাতাসে, ভাষায়-মানুষে আর সীমাহীন শূন্যতার কোথায় যেন তার দেশের সঙ্গে মিল আছে এর। তা ছাড়া ফেরারির পক্ষে এর চাইতে নিরাপদ জায়গা আর কী কল্পনা করা চলে। সংসারে অবলম্বন তার দুটি ছেলে, দুজনেই গেছে যুদ্ধ করতে, কোনো দিন ফিরবে কি না কেউ জানে না। সুতরাং স্বচ্ছন্দ মনে জীবনের বাকি দিন ক-টা এখানে বানপ্রস্থ যাপন করতে পারে আলু খলিফা।

দিন কয়েকের মধ্যেই বন্দরের এক পাশে গড়ে উঠল ছোটো একটা মাংসের দোকান। যে ভোজালি সে রাগের মাথায় গ্রেট মোগলাই হোটেলের ম্যানেজারের বুকে বসিয়ে দিয়েছিল এবং অন্তত সাতটি মানুষের রক্তকণিকা যার বাঁটে অনুসন্ধান করলে খুঁজে পাওয়া যায়, সেই ভোজালি দিয়ে কচাকচ খাসির গলা কাটতে শুরু করে দিলে। মানুষ আর খাসির মধ্যে তফাত নেই কিছু, কাটবার সময়ে একইরকম মনে হয়। তা ছাড়া প্রথম মানুষ মারবার যে উত্তেজনা, লখনউ শহরে দু-তিনটে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরে সে-উত্তেজনা ভোঁতা হয়ে গেছে। মানুষ কাটলে ফাঁসির ভয় আছে, কিন্তু পশুর বেলায় তা নেই। অতএব অর্থকরী এবং নিরাপদ দিকটাই বেছে নেওয়া ভালো।

বেশ অভ্যস্ত হয়ে গেছে নতুন জীবন। দৈনিক একটা খাসি, কখনো-বা একটা বকরি জবাই দেয় আলু। রুদ্ধকণ্ঠ পশুটার শ্বাসনালি বিদীর্ণ করে দেয় তীক্ষ্ণধার ভোজালি। তিরের মতো ধারায় ছুটে যায় রক্ত, মুমূর্ষ অহিংস জীবন মাটিতে লুটিয়ে ছটফট করে। অদূরে দাঁড়িয়ে পরিতৃপ্ত চোখে আলু লক্ষ করে তার মৃত্যুযন্ত্রণা। রক্ত আর ধুলোর মিলিত কটুগন্ধ ছড়িয়ে যায় আকাশে। খচ খচ করে চলতে থাকে অস্ত্র। তারপর দড়ি-ঝোলানো ছোটো-বড়ো মাংসখন্ড ক্রেতাদের লোভ বর্ধন করে।

কত করে সের? ও খলিফা?

বারো আনা।

বারো আনা? এ যে দিনে ডাকাতি?

ডাকাতি! আলু খলিফা হাসে। ডাকাতির কী জানে এরা, বোঝেই-বা কতটুকু। করকরে খানিকটা প্রবল হাসিতে মুখরিত করে দেয় চারদিক।

সেরা খাসি বাবু, থকথকে তেল। কলকাতা লখনউ হলে সের হত আড়াই টাকা।

নানা জাতের খদ্দের আসে। হিন্দুস্থানি নিরামিষাশী ব্যাবসাদারেরা লোক পাঠিয়ে গোপনে মাংস কেনে। কাঁধে কাছিম ঝুলিয়ে, বাঁশের দোলায় শুয়োর নিয়ে হাট-ফিরতি ওরাওঁ, তুড়ি কিংবা সাঁওতালেরাও এক-আধ সের মাংস নিয়ে যায়। ভোজালির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত মাংসকাটা কাঠটার নীচে জমে ওঠে রক্তমাখা সিকি-আধুলি, এক টাকার নোট। বারোটার মধ্যেই বিক্রিবাটা শেষ হয়ে যায় আলু খলিফার।

সন্ধ্যায় জগদীশের দোকান। এক বোতল তিরিশের মদ, ছিলিম তিনেক গাঁজা। জগদীশের সঙ্গে আলুর প্রগাঢ় বন্ধুত্ব আজকাল। এরকম শাঁসালো খরিদ্দার দুর্লভ। বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ মাঝে মাঝে আলু জগদীশকে মাংস খাওয়ায়।

রাত ঘন হয়ে আসে। গ্রাম বন্দরের দোকানগুলো একটার পর একটা ঝাঁপ বন্ধ করে দেয়। মদের দোকান থেকে ফিরে আসে আলু। কোনোদিন খাওয়া হয়, কোনোদিন হয় না। রক্ত আর ক্লেদের ওপরে স্যাঁতসেঁতে চট বিছিয়ে আলু তার উপরে এলিয়ে পড়ে। বাসি মাংসের গন্ধ ঘরময় ভেসে বেড়ায়, হাওয়াতে দড়িবাঁধা খাসির শেষাংশটুকু ঘড়ির পেণ্ডুলামের মতো এদিকে-ওদিকে দুলতে থাকে। নদীতে হিন্দুস্থানি মাল্লাদের ঢোলের শব্দ আর উদ্দাম চিৎকার শান্ত হয়ে আসে। শুধু বালুচরে থেকে থেকে গাংশালিক কেঁদে ওঠে টি-টি-ট্টি-টি— হট ট্রি-ডি-টি—

আলু খলিফা স্বপ্ন দেখে লখনউ শহরের। দাঙ্গা বেঁধেছে। আল্লা-হো-আকবর। লাঠির ঠকাঠক শব্দ, মানুষের চিৎকার, লেলিহান আগুন। হাতের ভোজালি বাগিয়ে ধরে ভিড়ের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল রক্তলোলুপ বন্যজন্তুর মতো। বিদ্যুতের মতো ঝলকে উঠল ভোজালি। খাসির গলা নয়—মানুষের বুক। ফিনকি দিয়ে রক্ত এসে আলুর দুখানা হাতকে রাঙিয়ে দিয়েছে।

জগদীশ ছাড়া আরও দুটি বন্ধু জুটেছে আলু খলিফার। একটি ছোটো মেয়ে—রামদুলারি তার নাম। তার বাপ বাজারে কী-এক হালুয়াই দোকানের কারিগর। মাংস কিনতে আসে না, মাংস কিনবার পয়সা নেই। মাঝে মাঝে দূরে দাঁড়িয়ে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকায়।

স্নেহ-ভালোবাসা বলে কোনো জিনিস নেই আলুর জীবনে। তবু সেই মেয়েটাকে তার ভালো লাগল। বছর পাঁচ-ছয় বয়েস, একমাথা ঝাঁকড়া চুল। কালো রঙের ওপরে সুঠাম মুখশ্রী। গলায় কাচের মালা। হাটের শেষে একটা কেরোসিনের টেরি জ্বালিয়ে রাত করে পয়সা খুঁজে বেড়ায়। কী পায় কে জানে, কিন্তু সাধনার বিরাম নেই।

আলুই নিজে থেকে যেচে আলাপ করে নিয়েছে ওর সঙ্গে। প্রথম প্রথম কাছে আসতে চায়নি, রক্ত-মাংসের মাঝখানে ওই অস্ত্রধারী ভয়ংকর মানুষটাকে দেখে ছুটে পালিয়ে গেছে।

আস্তে আস্তে তারপরে সহজ হয়ে এসেছে সমস্ত।

সকালে ঝাঁকড়া চুল দুলিয়ে দেখা দেয় ধূলিমলিন রামদুলারি।

আজকে ক-টা বকরি বানালে চাচাজি?

দুনিয়ার তামাম মানুষ বকরি হয়ে গেছে বেটি, তাই বকরি আর বানাই না। তাহলে তো দেশভর লোককে জবাই করতে হয়। তাই খাসি কেটেছি।

রামদুলারি কথাটা বুঝতে পারে না। বড়ো বড়ো বিস্ফারিত চোখে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে চাচাজির মুখের দিকে। বলে, দুনিয়ার সব লোক বকরি?

বকরি বই কী। কিন্তু সে থাক। মাটিয়া লিবি বেটি? এই নে ভালো মাটিয়া রেখেছি তোর জন্যে। একপোয়া-আধপোয়া মেটে প্রকান্ড মুঠিতে যা ওঠে, কলাপাতার ঠোঙায় করে রামদুলারির হাতে তুলে দেয় আলু খলিফা। ভালো লাগে রামদুলারিকে, ভালো লাগে এই দাক্ষিণ্যটুকু। বাংলা দেশের মাটিতে পা দিয়ে বাংলার স্নেহস্নিগ্ধ কোমলতা তার চেতনায় মায়া ছড়িয়েছে। মাঝে মাঝে মনে হয় নিজের একটা মেয়ে থাকলে খুশি হত সে।

আর একটি বন্ধু জুটেছে, তার নাম বনশিধর। আড়তদার মহাবীর প্রসাদের ছেলে। কুড়ি বাইশ বছর বয়স, এর মধ্যেই সবরকম নেশায় সিদ্ধহস্ত। আলুকে সে তার দোসর করে নিয়েছে।

ফলে এই হয়েছে যে, জগদীশের দোকানে আলুকে আর গাঁটের কড়ি খরচ করতে হয় না। বনশিধর নিয়মিত তার নেশার খরচ জোগায়। হাতে প্রকান্ড ভোজালি নিয়ে বনশিধরের দেহরক্ষীর মতো তার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে বেড়ায় আলু খলিফা। চরিত্রগুণে বনশিধরের শত্রুর অভাব নেই, কিন্তু তার সহচরের দিকে চোখ পড়তেই শত্রুপক্ষের যা-কিছু প্রতিদ্বন্দ্বিতা সব প্রশমিত হয়ে যায়। অত্যন্ত খুশি হয় বনশিধর। বলে, পঞ্চাশ টাকা মাইনে দেব তোমাকে খলিফা, তুমি আমার খাস বরকন্দাজ বনে যাও।

প্রকান্ড মুখে করকরে হাসি হাসে আলু খলিফা।

কোনো দিন গোলামি করিনি, আজও করব না। তুমি আমার দোস্ত আছ এই ভালো।

দিন কাটছিল, নিস্তাপ নিরুদ্ভেজ জীবন। আলুর মন থেকে মুছে আসছিল অতীতের যা কিছু স্মৃতি। কোথায় কত দূরে লখনউ শহর, কোথায় সেসব হিংস্র উন্মত্ত দিন! চোখ বুজে ভাবতে গেলে সত্যকেই এখন স্বপ্ন বলে বিভ্রম এসে যায়। এই ঝাঁপ-ফেলা ছোটো দোকান। সামনে বন্দর টিনের চাল, খড়ের চাল, ছোটো ছোটো ফড়িয়া আর পাইকার। সকলের ওপরে জেগে আছে মহাবীর প্রসাদের হলদে রঙের দু-তলা বাড়িটি। প্রতিদিনের চেনা নির্বিরোধ সমস্ত মানুষের মুখ, ধুলোর গন্ধ, বেনেতি মশলার গন্ধ, খাসির রক্ত আর বাসি মাংসের গন্ধ, জগদীশের দোকানে মদের গন্ধ। বাবলা গাছের তলা দিয়ে, কাঁকর আর কুশের তীক্ষ্ণাগ্রে আকীর্ণ দিকপ্রান্তের মধ্য দিয়ে তেমনি করে বয়ে যায় ক্ষীণস্রোতা নদী। নিশীথ রাত্রে তেমনি করে গাংশালিকের ডাক ট্টি-ট্টি-ট্টি-হট–ট্টি – ট্টি-ট্টি–

মায়া বসে গেছে এখানে, মায়া বসে গেছে এখানকার স্বল্পাবর্তিত সংকীর্ণ জীবনের ওপরে। স্বপ্নের মধ্যে সহস্র গলার আল্লা-হো-আকবর আর রক্তকে ফেনিল করে তোলে না, রামদুলারির মিষ্টি হাসি আর কচি মুখখানা ভেসে বেড়ায় চোখের সামনে। বয়স বেড়েছে আলু খলিফার। নিত্যসঙ্গী ভোজালির চওড়া ফলাটা ক্ষয়ে এসেছে আর তেমনি করে দিনের পর দিন ক্ষয়ে যাচ্ছে মনের সেই পাশবিক উগ্রতা, সেই আদিম হিংস্রতার খর-নখরগুলো।

দিন কাটছিল, কিন্তু আর কাটতে চায় না। বাংলা দেশে মন্বন্তর এল।

পূর্বদিগন্ত থেকে, পশ্চিমের রণাঙ্গন থেকে কার একখানা আকাশজোড়া মহাকায় থাবা বাংলা দেশের ওপরে এসে পড়ল। নেই-নেই-নেই! তারপরে কিছুই নেই। তারও পরে দেখা গেল শুধু একটা জিনিস মাত্র অবশিষ্ট আছে, সে মৃত্যু। প্রতীকারহীন, উপায়হীন তিল তিল মৃত্যু।

প্রথম প্রথম সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করত আলু খলিফা, দেশের এ কী হল ভাই?

সংক্ষিপ্ত উত্তর আসত, যুদ্ধ।

যুদ্ধ-জং। কিন্তু জং তো আজকের দিনের ব্যাপার নয়, তারই দুই ছেলে তো জঙ্গি হয়ে জার্মান ঘায়েল করতে গেছে। এতদিন এই সর্বাঙ্গীণ অভাব কোথায় লুকিয়েছিল। তা ছাড়া ছোটোখাটো যুদ্ধ সেও না-করেছে এমন নয়। সেইসব দাঙ্গা, লাঠির শব্দ, মশালের আলো যুদ্ধ ছাড়া আর কী হতে পারে? কিন্তু এমন সর্বব্যাপী অভাবের মূর্তি তো চোখে পড়েনি কখনো।

খাসির দর বাড়ল, মাংসের দর বাড়ল। একপোয়া-আধপোয়ার খদ্দেররা আর এ পথ মাড়ায় না। দলে দলে দেহাতি লোক বন্দরে আসে, ভিক্ষা চায়, কাঁদে, হাটখোলার পাশে পাশে পড়ে মরে যায়। দিনের বেলাতেই শেয়াল-কুকুরে মড়া খায় এখানে-ওখানে। যুদ্ধ।

নেই নেই, কিছুই নেই। সাধারণ মানুষ যেন মৃত্যুর সঙ্গে মুহূর্তে মুহূর্তে লড়াই করে দিন গুজরান করে। এ এক আচ্ছা তামাশা, এও এক জং। আলু খলিফার বুকের রক্ত চনচন করে ওঠে উত্তেজনায়। প্রতিপক্ষকে যেখানে চোখে পায় না অথচ যার অলক্ষ্য মৃত্যুবাণ অব্যর্থভাবে হত্যা করে চলেছে—তাকে হাতের কাছে পাওয়ার জন্যে একটা হিংস্র কামনা অনুভব করে আলু।

একপোয়া-আধপোয়ার খদ্দের নেই, কিন্তু দু-সের আধ সেরের খদ্দের বেড়েছে। একটার জায়গায় দুটো খাসি জবাই করতে হয়, হাটবারে চারটে। আলু একা মানুষ, অভাববোধ তার কম তবুও অভাব এসে দেখা দিয়েছে। দামি মাংসের দামি খদ্দের বেড়েছে, জগদীশের দোকানে সন্ধ্যায় আর বসবার জায়গা পাওয়া যায় না। বনশিধর টাটকা সিল্কের পাঞ্জাবি পরে, দোক্তা-দেওয়া পান চিবোয়; মদের জন্যে নির্বিকার মুখে নোটের পর নোট বার করে। সমস্ত জিনিসটা গোলকধাঁধা বলে মনে হয় যেন। এত টাকা বেড়েছে বনশিধরের, টাকা বেড়েছে। হনুমান প্রসাদের, টাকা বেড়েছে আড়তদার গোলাম আলির, কিন্তু এত মানুষ না খেয়ে মরে যায় কেন?

দাঙ্গায় মানুষ মারতে ভালো লাগে—যে-মানুষের রক্ত উদবেলিত, হৃৎপিন্ড উত্তেজনায় বিস্ফারিত। কিন্তু যাদের অস্থির দেহ টুকরো টুকরো করে কাটলেও একবিন্দু ফিকে জোলো রক্ত বেরিয়ে আসবে না, তাদের এই মৃত্যু দুঃসহ বলে মনে হয়। আলু খলিফার অস্বস্তি লাগে।

বনশিধর আজকাল বিষয়কর্মে মন দিয়েছে। প্রায়ই বাইরে থাকে। শহরে যায়, ইষ্টিশনে যায়, আরও কোথায় ছুটে বেড়ায়। তারপর একদিন দেখা দেয় অতিশয় প্রসন্নমুখে। গায়ে পাটভাঙা সিল্কের পাঞ্জাবি, পায়ে গ্লেজ-কিডের জুতো, মুখে সুর্তি-দেওয়া পান আর সিগারেট। মদের দোকানে খুলে দেয় সদাব্রত।

তারপরে, তামাম চিজ পাচ্ছ তো খলিফা?

কই আর পাচ্ছি। বোকার মতো মুখ করে তাকায় আলু খলিফা। বড়ো বড়ো দুটো আলুর মতো আরক্তিম চোখ মেলে তাকিয়েই থাকে বনশিধরের পানের-কষ-রাঙানো পুরু পুরু ঠোঁটের দিকে। ভাই, এ কী হল বাংলা মুলুকের হালচাল!

পুরোনো প্রশ্নের পুরোনো জবাব সংক্ষেপেই দেয় বনশিধর, লড়াই।

লড়াই! কিন্তু তোমরা এত টাকা পাচ্ছ কোথা থেকে?

খোদা মান? যাকে দেয় ছল্পর ছুঁড়ে দেয়।

তা বটে।

কিন্তু খোদা মানলেও কার্যকারণ সম্বন্ধ তো একটা থাকা দরকার। লখনউ শহরের এক্সটার্নড গুণ্ডা অনেক বুঝতে পারে, কিন্তু এই সোজা কথাটা বুঝতে পারে না কিছুতেই। জীবনের গতি তার প্রত্যক্ষ আর সরল। বাহুবলে, অস্ত্রবলে উপভোগ করো সমস্ত। কেড়ে নাও, রাহাজানি করো, মানুষ মারো। কিন্তু রাহাজানি নেই, হাঙ্গামা নেই, অথচ টাকা আসছে আর মানুষ মরছে। হ্যাঁ, একেই বলে তকদির। খোদা দেনেওয়ালাই বটে।

ছিন্নকণ্ঠ খাসির রক্তে দোকানের সামনে মাটিটা শক্ত কালো পাথরের মতো চাপ বেঁধে গেছে। কিন্তু এত মানুষ যে শুকিয়ে কঙ্কাল হয়ে মরে গেল, তাদের রক্ত জমল কোথায়? এই হাজার হাজার মানুষের রক্তে সমুদ্র তরঙ্গিত হয়ে উঠেছে কোনখানে?

তারপর একদিন আলু খলিফার খেয়াল হল আজ অনেক দিন রামদুলারি তার দোকানে আসেনি। চাচাজির কাছ থেকে মেটে চেয়ে নিয়ে যায়নি কলাপাতার ঠোঙায়। কী হল রামদুলারির?

মনে পড়ল শেষ যেদিন এসেছিল সেদিন মেটে চায়নি, চেয়েছিল আধ সের চাল। চাচাজি, কাল সারাদিন আমাদের খাওয়া হয়নি।

বারো আনা দিয়ে আলু চাল কিনে দিয়েছিল রামদুলারিকে। কিন্তু পরদিন থেকে আর আসেনি রামদুলারি। নানা বিড়ম্বনা, বন্দরের পথে-ঘাটে মড়া, সন্ধ্যায় জগদীশের দোকানে বনশিধরের টাকায় মদের অবাধ স্রোত—কালো মেয়েটার কথা ভুলেই গিয়েছিল একেবারে। কিন্তু সকালে দোকানের ঝাঁপ খুলতে গিয়ে সমস্ত মনটা খারাপ হয়ে গেল।

সতনারান হালুয়াইয়ের ঘর বন্দরের বাইরে। আলু বেরিয়ে পড়ল রামদুলারির সন্ধানে।

সতনারানের অবস্থা খারাপ, কিন্তু এত যে খারাপ আলু তা জানত না। ভাঙা খোছড়া ঘর দাঁড়িয়ে আছে অসহায়ভাবে, নদীর বাতাসে তার চালটা কাঁপছে ঠকঠক করে। বারান্দায় একটা ভাঙা খাঁটিয়া, তার উপরে আছাড়ি-পিছাড়ি কাঁদছে সতনারান হালুয়াইয়ের বউ।

রামদুলারি কাঁহা? রামদুলারি?

সতনারানের বউ আরও তারস্বরে চেঁচিয়ে কেঁদে উঠল। নামজাদা গুণ্ডা আলু খলিফার বুক কাঁপতে লাগল। জীবনে এই প্রথম ভয় পেয়েছে, এই প্রথম আশঙ্কায় তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে।

কী হয়েছে? কোথায় রামদুলারি?

রামদুলারি নেই। হ্যাঁ সত্যিই সে মরে গেছে। ভারী অসুখ হয়েছিল, কিন্তু এক ফোঁটা দাওয়াই জোটেনি। মরবার আগে চেঁচিয়েছে ভাত ভাত করে। গলা বসে গেছে, কোটরের মধ্যে ঢুকে গেছে দুটো মুমূর্ষু চোখ। চি চি করে আর্তনাদ করেছে ভাতের জন্যে, কিন্তু ভাত জোটেনি। কোথায় ভাত? রামদুলারি মরে গেছে। তার মুখে আগুন চুইয়ে শীর্ণ দেহটাকে নদীর জলে গাংসই করে দিয়ে এসেছে বাপ সতনারান।

টলতে টলতে চলে এল আলু খলিফা। সে খুন করবে, বহুদিন পরে খুন করবার প্রেরণায় তার শিরা-স্নায়ুগুলো ঝর ঝর করে উঠেছে। খুন করবে তাকেই—যে রামদুলারিকে মেরে ফেলেছে, শুষে খেয়ে ফেলেছে। কিন্তু কোথায় পাওয়া যাবে সেই অদৃশ্য শত্রুকে, যার অলক্ষ মৃত্যুবাণ অব্যর্থ লক্ষ্যে হত্যা করে চলেছে? কোথায় সেই প্রতিদ্বন্দ্বী? ভোজালির সীমানার। মধ্যে তাকে পাওয়া যায় কী করে?

জগদীশের দোকান। আলুর মুখ দেখে জগদীশ চমকে গেল।

কী হয়েছে খলিফা?

আলু সেকথার জবাব দিলে না। শুধু বললে, একটা বোতল।

এই অসময়ে!

আলু চেঁচিয়ে উঠল কদর্য একটা গাল দিয়ে, তাতে তোমার কী?

জগদীশ আর কথা বাড়াল। নিঃশব্দে বোতল খুলে দিলে আলুর দিকে। কী যেন হয়েছে লোকটার। এমন মুখ, এমন চোখ সে আর কখনো দেখেনি, যেন থমথম করছে ঝড়ের আকাশ।

এক বোতল, দু-বোতল। আলু কাঁদতে জানে না, তার চোখের জল আগুন হয়ে ঝরে পড়তে লাগল। খুন করবে, খুন করবে সে। কিন্তু কোথায় তার প্রতিদ্বন্দ্বী, তার শত্রু।

গা টলছে, মাথা ঘুরছে। বহুদিন পরে আজ আবার নেশা হয়েছে আলুর। এমনই নেশা হয়েছিল সেদিন, যেদিন গ্রেট মোগলাই হোটেলের ম্যানেজারের বুকে সে তার ছোরাখানা বিঁধিয়ে দিয়েছিল। হঠাৎ কী মনে হল—আরক্ত আচ্ছন্ন চোখ মেলে সে জগদীশকে লক্ষ করতে লাগল। একে দিয়েই আরম্ভ করবে না কি? জগদীশের পেটে বাঁটসুদ্ধ বসিয়ে দিয়ে প্রথম শান দেবে ভোজালিতে?

আলু চিন্তা করতে লাগল।

কিন্তু নিছক পিতৃপুরুষের পুণ্যেই এ যাত্রা জগদীশের ফাঁড়া কেটে গেল। গ্লেজ-কিড জুতো মচমচিয়ে ঘরে ঢুকল বনশিধর।

উল্লসিত কণ্ঠে বনশিধর বললে, কী খবর খলিফা, এই সাতসকালেই মদ গিলতে বসেছ?

আলু বললে, আমার মর্জি।

একটা বড়ো কনসাইনমেন্টের টাকা হাতে এসে পৌঁচেছে—অত্যন্ত প্রসন্ন আছে বনশিধরের মন। তাহলে এসো এসো, আরও চালানো যাক।

জগদীশ বললে, দু-বোতল গিলেছে কিন্তু।

আলু গর্জে উঠল, দশ বোতল গিলব, তোমার মুভুসুদ্ধ গিলব আমি।

দশ বোতল কেন, ভাঁটিটাই গিলে ফ্যালো-না। কিন্তু দোহাই বাবু, আমার মুন্ডুটাকে রেয়াত কোরো দয়া করে। জগদীশ রসিকতার চেষ্টা করলে একটা।

বনশিধর হেসে উঠল কিন্তু আলু হাসল না। চোখের জল আগুন হয়ে ঝরে যাচ্ছে! কে মেরে ফেলেছে রামদুলারিকে? কে কেড়ে নিয়েছে তার রোগের দাওয়াই, তার মুখের ভাত? কোথায় সেই শত্রুর সন্ধান মিলবে?

বোতলের পর বোতল চলতে লাগল! শরীরে আর রক্ত নেই, বয়ে যাচ্ছে যেন তরল একটা অগ্নি-নিঃস্রাব। বনশিধরের কাঁধে ভর দিয়ে জীবনে এই সর্বপ্রথম আলু মদের দোকান থেকে বেরিয়ে এল। এই প্রথম এমন নেশা হয়েছে তার। এই প্রথম তার পরের ওপরে নির্ভর করতে হয়েছে।

চলতে চলতে আলু জড়ানো গলায় বললে, বলতে পার দোস্ত, চাল গেল কোথায়?

চাল? বনশিধরের নেশাচ্ছন্ন চোখ দুটো পিটপিট করতে লাগল। অর্ধচেতন এই মানসিক অবস্থায় আলু অনেকখানি বিশ্বস্ত হয়ে উঠেছে তার কাছে। একটা বিচিত্র রহস্য উৎঘাটন করতে যাচ্ছে এমনই ফিসফিস করে চাপা গলায় বনশিধর বললে, দেখবে কোথায় চাল?

দেখব। প্রতিটি রোমকূপে অগ্নিস্রাব যেন লক্ষ লক্ষ শিখা মেলে দিয়েছে। দেখব আমি।

বনশিধরের অন্ধকার গুদামের ভেতর থেকে একটা তীব্র আর্তনাদ। লোকজন ছুটে এল ঊর্ধ্বশ্বাসে, দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল। পাকার চালের বস্তার উপরে চিত হয়ে পড়ে আছে বনশিধর, রক্তে ভেসে যাচ্ছে চারদিক, আর তারই হাঁটুর ওপরে বসে ভোজালি দিয়ে নিপুণ কসাইয়ের মতো আলু খলিফা তার পেটটাকে ফালা ফালা করে কাটছে-বনশিধরের মেটে

বার করবে সে। মানুষ আর খাসির মধ্যে কোনো তফাত নেই, কাটতে একইরকম লাগে।

এতদিন ঘাতকের মতো মানুষের প্রাণ নিয়েছে আলু খলিফা, কিন্তু কেউ তার কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারেনি। কিন্তু যেদিন সে খুনের প্রথম অধিকার পেল, সেদিনই সে ধরা পড়ল পুলিশের হাতে।

আলুকাবলি

সকালবেলায় বেড়াতে বেরিয়ে প্রোফেসার গড়গড়ি দেখতে পেলেন, সামনের ছোট মাঠটার ভেতরে দুটি ছেলে মারামারি করছে।

দুজনকেই স্কুলের ছাত্র বলে মনে হল। চৌদ্দ-পনেরো বছরের মতো বয়েস হবে। একটি বেশ গাঁট্টাগোট্টা জোয়ান, আর একটি রোগাপটকা। এসব ক্ষেত্রে যা হয়, রোগা ছেলেটিই মার খাচ্ছিল, জোয়ানটি তাকে ইচ্ছামতন পিটিয়ে যাচ্ছিল।

আর কেউ হলে মাঝে পড়ে থামিয়ে দিত, কিন্তু প্রোফেসার গড়গড়ি তা করলেন না। অনেকদিন তিনি বিলেতে ছিলেন। সে-দেশের পথে-ঘাটেও ছেলেদের তিনি মারামারি করতে দেখেছেন। আর এও দেখেছেন–ওপর-পড়া হয়ে আগে থেকেই কেউ থামিয়ে দেয়

–একজন সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গেলে, জয়-পরাজয়ের একটা মীমাংসা হলে, তখনই তারা ছাড়িয়ে দিয়ে বলে, এখন সব মিটে গেছে, এবার বন্ধুর মতো হ্যান্ডশেক করে বাড়ি চলে যাও।

সুতরাং প্রোফেসার গড়গড়ি মোটা ছড়িটা হাতে নিয়ে, একটু দূরে দাঁড়িয়ে, মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। রোগা ছেলেটি এখনও হার মানেনি, প্রচুর মার খেয়েও সমানে হাত চালিয়ে যাচ্ছে, অতএব এখনও তাঁর কিছু করবার নেই। সময় হলে তবেই তিনি আসরে নামবেন।

নতুন বাড়ি করে এই পাড়ায় তিনি এসেছেন মাত্র দিন তিনেক হল। প্রতিবেশীদের সঙ্গে বলতে গেলে আলাপই হয়নি, আর পাড়ার ছেলেরা তো তাঁকে চেনেই না। যদি চিনত তা হলে জানতে পারত, এই লম্বা রোগা মাঝবয়েসী লোকটির শরীর একেবারে ইস্পাতে গড়া। দুহাতে তিনি সিংহের শক্তি ধরেন; জানতে পারত, সোজা খাড়া শরীরটার মতোই তাঁর মনের মধ্যেও কোনও ঘোর-প্যাঁচ নেই। প্রোফেসার গড়গড়ি ন্যায়বিচার পছন্দ করেন আর সেকাজটা চটপট সেরে ফেলাই তাঁর অভ্যাস।

তাঁর ন্যায়বিচারের একটা নমুনা দিই। প্রোফেসার গড়গড়ি মোটামুটি অবস্থাপন্ন লোক, কিন্তু বাজে খরচ ভালোবাসেন না, মোটা চালে চলেন, ট্রেনে থার্ড ক্লাসে ওঠেন। সেবার কোন একটা স্টেশন থেকে রাত আটটা নাগাদ গাড়িতে উঠেছেন। ট্রেনে খুব একটা ভিড় ছিল তা নয়, সবাই-ই বসে যেতে পারে, তবু কয়েকজনকে দাঁড়িয়ে যেতে হচ্ছে। কারণটা আর কিছুই নয়–একটি দশাসই চেহারার লোক একখানা গোটা বেঞ্চি জুড়ে পরম আরামে লম্বা হয়ে রয়েছে।

রাত আটটার সময় একজন বয়স্ক লোকের কিছুতেই এ-ভাবে শুয়ে পড়া উচিত নয়–একথা প্রোফেসার গড়গড়ির মনে হল। মনে আরও অনেকেরই হয়েছিল, কিন্তু লোকটির ভীমের মতো চেহারা আর প্রকাণ্ড গোঁফজোড়া দেখে কেউ আর তাকে ঘাঁটাতে সাহস করেনি নির্বিবাদেই চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। প্রোফেসার গড়গড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে রাজি হলেন না। লোকটাকে একটু ধাক্কা দিয়ে ডাকলেন :এ জী।

লোকটা চোখ পাকিয়ে তাকালো। বললে, কেয়া?

প্রোফেসার গড়গড়ির হিন্দী ভালো আসে না। তবু যতটা পারেন সাজিয়ে গুজিয়ে, বেশ গরম গলায় বললেন, আপ কি চারঠো টিকিট কিয়া হ্যায়?

লোকটি ভুরু কুঁচকে বললে, কেয়া মতলব?

মতলব এই হ্যায় কি, চারঠো টিকিট নেহি কিয়া তো চার আদমির জায়গা দখল করকে কেন শুয়ে পড়া হ্যায়। উঠিয়ে হামলোগ ভি বৈঠেঙ্গে।

লোকটি সংক্ষেপে বললে, তবিয়ত খারাপ হ্যায়।

তবিয়ত খারাপ? দেখকে তো সে রকম মনে নেহি হোতা হ্যায়। বেশ তাগড়াই চেহারাই তো মালুম হচ্ছে। কেয়া বিমার? বলেই প্রোফেসার গড়গড়ি তার গায়ে হাত দিলেন : শরীর তো বেশ ঠাণ্ডা–বোখার-টোখার তো শুরু নেহি হুয়া।

লোকটা যদি বলত যে পেটে ব্যথা-ট্যথা কিছু হচ্ছে, তা হলে–মনে-মনে সন্দেহ থাকলেও প্রোফেসার গড়গড়ি সেটা বিশ্বাস করতে রাজি হতেন। কিন্তু দশাসই লোকটা সেদিক দিয়েই গেল না। গড়গড়ির হাতটা গায়ের ওপর থেকে ছুঁড়ে দিয়ে বললে, যাঃ–ভাগ। হাম শুতে রহেঙ্গে–হামারা খুশি।

শুতে রহেঙ্গে? আপকো খুশি? প্রোফেসার গড়গড়ি বললেন, তা হলে প্ল্যাটফর্মে গিয়েই শুয়ে থাকা হোক, সেখানে অনেক জায়গা হ্যায়।

বলেই, আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে–লোকটিকে সোজা পাঁজাকোলা করে তুলে ফেললেন আর পত্রপাঠ তাকে প্ল্যাটফর্মে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন কম্বল-টম্বল সবসুদ্ধুই একেবারে।

গাড়িসুষ্ঠু লোক থ! যেন কিছুই হয়নি, এইভাবে বেঞ্চিতে বসে পড়ে প্রোফেসার গড়গড়ি ধীরে সুস্থে একটা চুরুট ধরালেন, অন্য যাত্রীদের ডাক দিয়ে বললেন, দাঁড়িয়ে কেন আপনারা? বসুন–জায়গা তো রয়েছে।

আর লোকটি? প্ল্যাটফর্মে খানিকক্ষণ হাঁ করে বসে থেকে, গায়ের ধুলো ঝেড়ে, একটু খোঁড়াতে খোঁড়াতে উঠে–সেই-যে কামরার হাতল ধরে দাঁড়িয়ে রইল আর ভেতরমুখো হল না।

প্রোফেসার গড়গড়ি এইরকম ন্যায়পরায়ণ লোক। বাড়ির গোয়ালা নিয়মিত দুধে জল দিচ্ছিল–অল্প-স্বল্প ওরা দেয়ই, গড়গড়ি কিছু মাইন্ডও করেননি। কিন্তু তাঁকে চুপচাপ দেখে গোয়ালার সাহস বেড়ে গেল। শেষ পর্যন্ত দুধটা শুধু রইল রঙেই বাকিটা স্রেফ কপোরেশনের বিশুদ্ধ কলের জল।

তখন প্রোফেসার গড়গড়ি একদিন গোয়ালাকে ডেকে অনেক সদুপদেশ দিলেন। বললেন, অতি লোভ ভালো নয়, তার ফল ভবিষ্যতে খারাপ হয়। গোয়ালা মন দিয়ে সব শুনে মাথা নেড়ে চলে গেল আর পরের দিনই জলের মাত্রা আরও একটু বাড়িয়ে দিলে।

অগত্যা প্রোফেসার গড়গড়িকে ন্যায় বিচারের দায়িত্বটা নিতেই হল। তিনি একদিন গোয়ালাকে জাপটে ধরলেন, তারপর দারুণ শীতের সকালে বাড়ির চৌবাচ্চা থেকে পাক্কা তিন ঘটি কনকনে জল গোয়ালাকে জোর করে গিলিয়ে দিয়ে বললেন, নিজেই দ্যাখো এবার, জল খেতে কেমন লাগে।

গোয়ালা পালিয়ে গেল, পরদিন এল আর এক নতুন গোয়ালা। কিন্তু এর পর থেকে গড়গড়ি একেবারে নির্জলা খাঁটি দুধ পেতে লাগলেন।

এ-হেন ন্যায়পরায়ণ লোক দুটি ছেলেকে মারামারি করতে দেখে চট করে কিছু করে বসবেন, এমন হতেই পারে না। হাতের মোটা ওয়াকিং স্টিকটার ওপর ভর করে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তিনি দেখতে লাগলেন, ব্যাপারটা কত দূর গড়ায়।

কতদূর আর গড়াবে! একটু পরেই জোয়ান ছেলেটা রোগা ছেলেটিকে চিত করে ফেলে তার বুকে চড়ে বসল। তারপর যখন জুত করে আরও মারতে যাচ্ছে, তখন গড়গড়ি একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে বিজয়ীকে তুলে আনলেন। বললেন, ব্যাস, হয়ে গেছে। এইবার শেক-স্যান্ড করো–তারপর সোজা বাড়ি চলে যাও।

মোটা ছেলেটা তো আর ইংরেজের বাচ্চা নয় যে এসব কথা সে বুঝবে! সে পালটা চোখ পাকিয়ে বললে, আপনি কে মোসাই ফরফর করতে এসেছেন? আমি ওর বদন বিগড়ে দেব! আলুকে ও এখনও চেনে না।

ছেলেটির মেজাজ দেখে প্রোফেসার গড়গড়ি বেশ কৌতূহল বোধ করলেন। ওঃ, তোমার নাম বুঝি আলু? তুমি বুঝি খুব বিখ্যাত লোক?

আলু চোখ বাঁকা করে এমন ভাবে তাকাল–যেন সম্রাট আলেকজান্ডারকে প্রশ্নটা করা হয়েছে।

মোসাই বুঝি অন্য পাড়ার লোক?

ছিলুম আগে। এখন দিন তিনেক হল তোমাদের পাড়ার বাসিন্দে হয়েছি।

অ।–আলু চিবিয়ে চিবিয়ে বললে, তাই আমার নাম শোনেননি এখনও। শুনবেন শুনবেন, আস্তে আস্তে শুনবেন।

বেশি শোনবার দরকার নেই, এতেই বোধহয় তোমাকে চিনতে পারছি। তা মারামারি করছিলে কেন এর সঙ্গে?

মারামারি! ফুঃ! আলু যেন কথাটা ফুঁয়ে উড়িয়ে দিলে : ওই ফড়িংটার সঙ্গে মারামারি করব? পিটছিলুম মোসায়, হাতের সুখ করে নিচ্ছিলুম। ফড়িংটার সাহস দেখুন–পালটা লড়ে যাচ্ছে আমার সঙ্গে। আপনি চলে যান মোসাই, আমি ওকে তুলোধোনা করে দিচ্ছি।

গড়গড়ি চেয়ে দেখলেন রোগা ছেলেটির দিকে। ঘাসের ওপর বসে পড়ে সে হাঁপাচ্ছে। তার শার্ট ছেঁড়া, ঠোঁটের কোণে রক্ত। চোখে একটু জলও দেখা গেল যেন।

গড়গড়ি বললেন, তোমার নাম কী?

রোগা ছেলেটা গোঁজ হয়ে রইল, জবাব দিলে না। আলু বললে, ও? ওর নাম কাবুল।

তাই বুঝি আলু আর কাবুলে মিলে আলকাবলি তৈরি হচ্ছিল?

হে-হে-হেঃ!–আলু হেসে উঠল : মোসাই তো বেশ মজা করে কথা বলতে পারেন। তা স্যারের নামটা কী? বলে পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাল। প্রোফেসার গড়গড়ি আড়চোখে একবার চেয়ে দেখলেন কেবল।

রোগা ছেলেটি–অর্থাৎ আলুকাবলির কাবুল তখন উঠে চলে যাওয়ার উপক্রম করছিল। প্রোফেসার গড়গড়ি মোটা গলায় বললেন, দাঁড়াও হে ছোকরা, দরকারি কথা আছে। তাঁর গলার আওয়াজে এমন একটা কিছু ছিল যে ছেলেটা থমকে গেল, এমন কি বেপরোয়া আলুর পর্যন্ত হাতটা সিগারেটসুদ্ধু কেঁপে উঠল একবার।

আলু বললে,বেশ জবরদস্ত গলাটি তো মোসাইয়ের। তা নামটা বললেন না?

হবে এখন, নামের জন্যে ভাবনা কী!–গড়গড়ি হাসলেন : আমাকেও আস্তে আস্তে চিনবে। তা ওকে তুমি মারছিলে কেন?

মারব না?–আলু গড়গড়ির মুখের ওপরেই একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে দিলে : ও আমাকে গেরাজ্যি করে না।

করে না নাকি?

একেবারে না। ক্লাসের ফার্স্ট বয় কিনা, অহঙ্কারে পা পড়ে না মাটিতে, আমি ফেল করি, টুকলিফাই করি–এসব বলে বেড়ায়।

করিসই তো ফেল, টুকলিই তো করিস–কাবুল কাঁদো কাঁদো গলায় বললে।

আলু প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল তার ওপর–গড়গড়ি মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, হচ্ছে, হচ্ছে, ঠ্যাঙানি তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না। কাবুল, ডোন্ট ডিসটার্ব আলুকে বলতে দাও।

আলু বললে, ওসবে আমি গ্রাহ্যি করি না মোসাই। আমার বাপের পয়সায় আমি ফেল করি, হাতের জোরে টুকলি করি, ভয় পাই নাকি? কথাটা কী জানেন, ও আমাকে একদম খাতির করে না।

তোমাকে খাতির করা দরকার বুঝি?

দরকার নয়? আমার গায়ে জোর আছে। পাড়ার ছেলে বুড়ো আমার নামে কাঁপে।

ও কাঁপে না?

না। কাল সিনেমায় যাব বলে ওর কাছে একটা টাকা চেয়েছিলুম, দেয়নি। পরশু বলেছিলুম, চপকাটলেট খাওয়া-বলেছে গুণ্ডাকে আমি খাওয়াই না। টিংটিঙেটার আস্পর্দা দেখেছেন?- বলেই আবার সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ল।

গড়গড়ি বললেন, ঠিক।

ঠিক না?–আলু মুরুব্বিয়ানা চালে হাসল : মোসাই দেখছি বেশ সমঝদার লোক।

গড়গড়ি এবার কটমট করে তাকালেন কাবুলের দিকে। দ্যাখো ছোকরা, ক্লাসের ফার্স্ট বয় হলেই হয় না। গায়ে যদি জোর না থাকে, তা হলে জোয়ানদের কথা মানতে হবে, আর নইলে মার খেতে হবে। দুনিয়ায় এই নিয়ম।

কাবুলের চোখ জ্বলে উঠল : দুনিয়া বুঝি গুণ্ডাদের জন্যে?

না, শক্তিমানের জন্যে।–গড়গড়ির স্বর কঠোর হল : মন আর শরীর দুটোই শক্ত হওয়া দরকার। শুধু ফার্স্ট বয় হলেই চলে না। মাসলও জোরালো করতে হয়। হয় গুণ্ডার কাছে হার মানো নইলে গুণ্ডাকে ঠাণ্ডা করো–আর কোনও রাস্তা নেই। তোমাকে আলু পিটিয়েছে, বেশ করেছে। ইউ ডিজার্ভ ইট।

কাবুল আবার বোঁ বোঁ করে চলে যাচ্ছিল, গড়গড়ি সেই ভয়ঙ্কর গলায় বললেন, দাঁড়াও।

কাবুল চমকে দাঁড়িয়ে পড়ল, এমন কি গলার আওয়াজটা আলুরও ভালো লাগল না। সিগারেটে আর একটা সুখের টান দিয়ে বললে, মোসায়ের গলাটি বেশ জোরালো। কিন্তু কথাটা বলেছেন বেড়ে। জোর যার মুল্লুক তার।

গড়গড়ি বললেন, ঠিক।

আলু উৎসাহ পেয়ে বললে, যার জোর আছে তাকে মানতে হয়। নইলে ঠ্যাঙানি খেতে হয়।

গড়গড়ি বললেন, তা-ও ঠিক।

তা হলে মোসাই কথাটা বুঝিয়ে দিন ওদিকে। আজ আপনি এসেছেন বলে পার পেয়ে গেল,নইলে আমি ওকে

গড়গড়ি বাধা দিয়ে বললেন, বলতে হবে না। কিন্তু তোমাকেও যে একটা কথা বোঝাবার আছে হে আলু।

আলু খিকখিক করে হেসে বললে, আমাকে।

হ্যাঁ, তোমাকে। আমি যদি বলি, আমার গায়ে তোমার চেয়ে বেশি জোর আছে-মানবে তো আমাকে?

কী বললেন?

ঠিক বলছি, আমার গায়ে বেশি জোর আছে, সুতরাং তুমি আমাকে মেনে চলবে। কাজেই আমার মতো বয়স্ক লোকের মুখের সামনে তুমি যে অসভ্যের মতো কথা বলছ, বাঁদরের মতো সিগারেট ধরিয়েছ, তার জন্যে এক্ষুনি তোমায় ক্ষমা চাইতে হবে।

ক্ষমা চাইব?–আলু হা হা করে হেসে উঠল : হাতি ঘোড়া গেল তল, মোসা বলে কত জল! আপনার মতো কত মক্কেলকে আমি ইট মেরে–

আর বলতে হল না। এইবার ন্যায়বিচারের সময় হয়েছে।

হাতের লাঠিটা ফেলে দিয়ে গড়গড়ি বললেন, আমার জোর পরখ করতে চাও বুঝি? বেশ, বেশ!

তারপর দুম দুম শব্দে দুটি কিল পড়ল আলুর পিঠে। মাত্র দুটি। আলু তাতেই আলুর দম–একেবারে চোখ উলটে বসে পড়ল ঘাসের ওপর–মনে হল সে গুঁড়ো হয়ে গেছে!

গল্পটা এখানে শেষ নয়।

আলু অর্থাৎ আলোক চৌধুরী আজকাল প্রোফেসার গড়গড়ির সব চেয়ে ভক্ত শিষ্য। পাড়ার গুণ্ডাদমন সমিতির সে ক্যাপ্টেন, লোকে বলে, খাসা ছেলে। এমন কি টুকলি না করেই, সে ফার্স্ট ডিভিশনে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেছে এবার।

আর কাবুল–মানে স্কলারশিপ পাওয়া জুয়েল ছাত্র কমল গুপ্ত, এখন তার প্রাণের বন্ধু। কমল গুপ্তের হাতের মাসলও এখন দেখবার মতো–আলোক আর কমল পাঞ্জা লড়লে কে জিতবে, জোর করে বলা শক্ত।

আসানসোলের লোকটা

এককালে একটা নাম নিশ্চয় ছিল। সেটা তার বাপ জানত, মা-ও জানত নিশ্চয়। কিন্তু বাপ খতম হয়ে গেল জিটি রোডে মাঝরাতে নেশার ঘোরে লরি চালাতে গিয়ে, মা যে কোথায় উধাও হল কেউ জানে না।

তারপর এখানে-ওখানে। এর দোরে, তার দোরে।

একটা চোখ কানা, একটা পা ছোটো। সব দিক থেকে মার-খাওয়া। কী-আর কাজ জুটবে? হোটেলে কয়লা ভাঙা, বর্তন-উর্তন সাফ করা, উনুন-ধরানো, সবজি কাটা, ফাইফরমাস, চড় লাথি।

এ কানা, এ বদমাশ।

এক-পা ছোটো, এক চোখ কানা। বদমায়েশি করবার সুযোগ নেই কোনো। তবু এ কানা, এ বদমাশ এই নামই দাঁড়িয়ে গেল।

এখন চল্লিশ ধরো-ধরো। অনেক দেখেছে, অনেক ঘাটের জল খেয়েছে, ঘুরেছে নানা জায়গায়। কিন্তু হোটেলের কাজ ছাড়া আর কিছুই জুটল না কোথাও। আর কোনো কাজেরই যোগ্যতা নেই তার।

বিয়েও করেছিল বই কী—যদি তাকে বিয়ে বলা যায়। একটা ছোটো ঘরভাড়া করে সেই ধানবাদে থাকবার সময় হাজারিবাগ জেলার কালোকোলো একটি মেয়েকে নিয়ে সংসারও পেতেছিল একবার। কিন্তু কালো হলে কী হবে, সুরত ছিল মেয়েটার—অন্তত লোকে তাই বলত। তার মন টেকে কানা-ল্যাংড়ার ঘরে? কার সঙ্গে একদিন কোথায় চলে গেল একেবারে।

মা অন্তত বাপটা মরা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিল, কিন্তু ততটুকু দেরিও এর সইল না।

ঘেন্না ধরে গেছে তারপর থেকে। জাতটাই হারামি। নিজের মা-টাকেও তো দেখল।

এখন চল্লিশ ধরো-ধরো বয়েস। এ কানা, এ বদমাশ কেউ আর বলে না। এখন শুধুই কানা। তা চাকরিতে উন্নতি হয়েছে বই কী। আর কয়লা ভাঙতে হয় না, বর্তন সাফা করতে হয় না, চড়-লাথিও খেতে হয় না তাকে। কানা এখন রান্না করে হোটেলে। সব পথ শেষ করে আসানসোলে এসেই থিতু হয়েছে এখন। হোটেলের মালিক বুড়ো কানাইল সিং ফৌজে ছিল একসময়। মস্ত দাড়ি, মস্ত শরীর, মনটাও নেহাত ছোটো নয় তার। কানাইল সিং পছন্দ করে কানাকে।

কানা রাঁধে ভালো। তার হাতের তৈরি মাংস আর আলু-মটরের নাম আছে বাসওয়ালা আর কোলিয়ারি এলাকার সর্দারজিদের মহলে। হয়তো এইজন্যেই একটু খাতির আছে তার কার্নাইল সিংয়ের কাছে।

কিন্তু এ কানা। ওইটেই তার নাম।

তুমি তো শিখ। একজন জিজ্ঞেস করেছিল।

নিশ্চয়।

তাহলে তো শুধু কানা হতে পার না। সিং, কানা সিং।

তাই সই। একটু জাতে ওঠা গেল তাহলে। কানা সিং।

বেলা উঠতে থাকে, আসানসোলের রাস্তায় গাড়ির ভিড় বাড়ে। জিটি রোড পার হয়ে, রেলের লাইন ছাড়িয়ে, রেল কলোনির লাল লাল জীর্ণ বাড়িগুলোর মাথার উপর দিয়ে কানা আকাশটাকে দেখে। সাদা সাদা মেঘ ছিঁড়ে নীল দেখা দিয়েছে, লাল রোদ পড়েছে মেঘের গায়ে। ভোররাতের হাওয়ায় কালো ঠাণ্ডার যেন আলগা ছোঁয়া লাগল একটু। কানা জানে, জানে আর কদিন বাদেই বাঙালিদের পুজো আসবে। আসানসোল শহর, তার বাজার, সব কেঁপে উঠতে থাকবে ঢাকের শব্দে, মাইকের গানে। আকাশের ওই নীল তার খবর।

জিটি রোডে প্রাইভেট গাড়ির ভিড় ক্রমেই বাড়তে থাকবে এখন। কলকাতা থেকে পয়সাওয়ালা মাড়োয়ারি-পাঞ্জাবি-গুজরাতি-সিন্ধি-বাঙালি সব মোটর নিয়ে চলল হাওয়া বদল করতে। চলল নিয়ামতপুর থেকে ডাইনে ঘুরে চিত্তরঞ্জন হয়ে জামতাড়া-দেওঘর-জসিডির দিকে, চলল বরাকরের রাস্তা ধরে ধানবাদ-হাজারিবাগ হয়ে পাটনা-গয়া-কাশী-দিল্লির দিগবিদিকে। জিটি রোডে এখন ছুটির ডাক।

কানার আর কোথাও যাবার নেই, তার সব চলা শেষ। এখন কার্নাইল সিংয়ের হোটেল, আলুমটর, কড়াই ডাল, আলু-পালং, কুচো চিংড়ির তরকারি, মাংস, রুটি। ওই সব গাড়ি করে যারা যায় এ হোটেলে তারা থামে না, তাদের জন্যে একটু দূরে দোতলা হোটেল আছে, বিলাইতি দারুর ব্যবস্থা আছে। এখানকার খরিদ্দার আলাদা, তারা বাস-লরির ড্রাইভার কণ্ডাকটার ক্লিনার, তারা কোলিয়ারি এলাকার সর্দারজি।

কিন্তু দূরে ছুটে-যাওয়া ওই হাওয়া বদলের গাড়িগুলো কানাকে উদাস করে। হাতের ডাণ্ডাটা নিয়ে লম্বা পাত্রটার মধ্যে প্রাণপণে মাংস কষতে কষতে চোখ চলে যায় আকাশের নীলের দিকে। যে-বউটা পালিয়ে গেল, অন্য সময় যাকে স্রেফ হারামি ছাড়া আর কিছু মনে হয় না তার, তারই জন্যে বুকের ভিতর কেমন একটা যন্ত্রণা হতে থাকে।

ম্যায় প্যার করনে ওয়ালে… কানার চমক ভাঙে, কার্নাইল সিং রেডিয়োটা খুলে দিয়েছে।

ওই স্বভাব কানাইল সিংয়ের। রেডিয়ো খুলে দেয় কিন্তু কখনো শোনে না, নিজের চৌকিতে বসে সামনের ছোটো বাক্সটার ওপর একটা পাঞ্জাবি খবরের কাগজ বিছিয়ে একমনে পড়ে। সকালের কাগজ রাতে-দিনেও পড়া শেষ হয় না কার্নাইল সিংয়ের। এখন হোটেলে খরিদ্দার নেই, কাজের চাপও নেই, হোটেলের বাচ্চা ছেলেটা গানটার সঙ্গে তালে তালে পা ঠোকে, গুনগুনিয়ে ধরতে চায় সুরটা।

বিরক্ত হয়ে তাকে ধমক লাগায় কানা।

ভাগ বদমাশ কাঁহাকা।

হি-হি করে হেসে ওঠে ছেলেটা। বাইরে গিয়ে বিড়ি ধরায় একটা। যেন কানাকে শুনিয়ে শুনিয়েই বিশ্রী বেসুরো গলা চড়িয়ে দেয়।

ম্যায় প্যার করনে ওয়ালে…

বদমাস কাঁহাকা! কথাটা নিজের কানে লাগে। এ কানা এ বদমাশ। ডাকটা সেও শুনত। সেও বোধ হয় এরই মতো বয়েসে, কিংবা আরও ছোটো ছিল তখন—হোটেলে কয়লা ভাঙতে আর বর্তন-উর্তন সাফা করতে এসেছিল।

তার কেউ ছিল না, এই ছেলেটার মা-বাপ আছে। বাপ কুলি, মা গৈঠা বিক্রি করে। সে রাত কাটাত হোটেলের মেজেতে, শীতের রাতে ঘন হয়ে বসত উনুনটার পাশে। অনেক রাত পর্যন্ত গরম থাকত সেটা। তখন মায়ের বুকে ঘুমুবার কথা ভেবে তার কান্না আসত।

কীসের মা? হারামি।

সামনে দিয়ে একটা বড়ো সাদা গাড়ি বেরিয়ে যায়, বহুত ভারী আদমির গাড়ি। কোনো পাঞ্জাবি বড়োলোক। সোনার চশমাপরা একজন, একজনের মাথার পাগড়ি। ফুটফুটে কয়েকটি মেয়ের মুখ। দু-তিনটে বাচ্চা। এখন চলল হাওয়া বদলে। ক্যারিয়ার পুরো বন্ধ হয়নি, মালপত্রে বোঝাই।

কত দূরে চলল? হয়তো আগ্রা-দিল্লি ছাড়িয়ে একেবারে নিজের দেশে পাঞ্জাবে। অত বড়ো গাড়ি রেলগাড়িকে টেক্কা দিয়ে কোথা থেকে কোথায় ছুটে যাবে।

রেল কলোনির পুরোনো বাড়িগুলোর মাথার ওপর দিয়ে নীল ফুটেছে, মেঘের গায়ে রাঙা রোদ। তারও দেশ ছিল পাঞ্জাবে। কিন্তু কানা কখনো দেশ দেখেনি। দেখেনি লাহোর থেকে কোথায় বিশ মাইল দূরে তার গাঁ। দেখেনি জলন্ধর, যেখানে তার চাচা নাকি বড়ো ব্যাবসাদার আর অনেক টাকার মালিক। দেখেনি অমরুতসর, তার সোনে কা মন্দির, রানিগঞ্জ আসানসোল-দুর্গাপুর-হাজারিবাগ-কলকাতা ব্যাস, ব্যাস।

ব্যাস সব ফুরিয়ে গেছে। এক-পা খোঁড়া, এক চোখ কানা, বয়েস চল্লিশ হতে চলল। বাকি জীবনটা কেটে যাবে এই কার্নাইল সিংয়ের হোটেলে। যদি বুড়ো কানাইল মরে যায় হঠাৎ, হোটেল উঠে যায় তার, এই আসানসোলেই অন্য হোটেলে কাজ জুটে যাবে। কানা সিংয়ের নাম আছে রান্নায়।

রেডিয়োতে আবার একটা ফিলমি গান শোনা যায়। বাচ্চাটা বাইরে থেকে ফিরে এসে চেয়ার-টেবিলগুলো অকারণে নাড়াচাড়া করে—যেন কাজ করছে। কানার হাসি পায়। ওর আসল কান ওই গানের দিকে।

অ্যাই–বদমাশ বলতে গিয়েও সামলে নেয় কানা, থোড়া আদরত লাও।

আদার দরকার নেই, তবু হুকুম করতে ভালো লাগে। না, এই ছেলেটার উপর তার মায়া হয় না, কেউ তাকেও মায়া করেনি। এই ছেলেটা রাত্রে তার গৈঠাওয়ালি মায়ের বুকের ভেতর আশ্রয় পায়। সে শুয়ে থাকত উনুনের ধারে। যখন উঠত, তখন সারা গা তার ছাইয়ে মাখামাখি।

এ কানা। এ বদমাশ।

এই ছেলেটারও একটা চোখ কানা হতে পারত, একটা পা খোঁড়া হতে পারত—হয়নি। শয়তানিতে দুটো চোখই ওর বিল্লির মতো জ্বলে। কানা যদি কখনো চটেমটে এক-আধটা চড়চাপড় বসাতে যায়, একেবারে রামছাগলের বাচ্চার মতো তিড়িং করে ছুটে পালায়। খোঁড়া পা নিয়ে কানা ধরতে পারে না তাকে। প্রাণখুলে গালাগালি করে কদর্য ভাষায়—দূরে দাঁড়িয়ে হি-হি করে হাসে ছেলেটা।

কানাইল সিং নজর দেয় না ওসবে। সকালের খবরের কাগজটা দিনমান ধরে পড়ে, কী পড়ে সে-ই জানে। পয়সাকড়ির হিসেব করে। আর তেমন তেমন খরিদ্দার এলে আদর আপ্যায়ন করে একটু। কানের কাছে রেডিয়োতে গানা চলে, অথচ কখনো শোনেও না। মেজাজ খুশি থাকলে, অর্থাৎ পয়সাকড়ির আমদানি একটু বেশি হলে তাকে গুনগুন করতে শোনা যায়।

ধন ধন পিতা দশমেশ গুরু, জিনহি চিড়িয়াসে বাজ তোড়ায়ে—

দশমেশ গুরু-গুরু গোবিন্দ। তারপর আর গুরু নেই। সব বান্দা।

এসব খবরও কি রাখত নাকি কানা? কানাইলই তাকে শুনিয়েছে।

গুরু গোবিন্দ। কী অসাধ্য ছিল তাঁর? ছোটো পাখি দিয়ে বাজ শিকার করিয়েছেন, তিনিই তো শিখিয়েছিলেন শিখদের পাঁচ ক ধারণ করতে হবে—কেশ, কাঁকই, কঙ্গন, কৃপাণ…

বলতে বলতে হাসে কানাইল সিং।

কানা, তুমিও শিখ।

জি।

কিন্তু তোমার চুল নেই, দাড়ি নেই, কৃপাণ নেই, কাঁকই নেই।

থাকবার মধ্যে কেবল ডান হাতের কঙ্গন-লোহার বালাটা।

দেশে গেলে শিখেরা রাগ করবে তোমার ওপর। বঙ্গাল বলেই পার পেয়ে গেলে।

দেশ! পাঞ্জাব! সে রানিগঞ্জে জন্মেছে। কোনোদিন দেশে যায়নি, কখনো যাবে না। তার সামনে দিয়ে পাঞ্জাব যেন ছুটে যায়, ছুটে যায় কালকার গাড়ি। তার দেশের মানুষরা ছোটে ঘরমুখো। অমরুতসর, জলন্ধর, আম্বালা, লালান, চন্ডীগড়–কোথায়, কতদূরে! ভারী আদমিদের বড়ো বড়ো মোটরগাড়ি হাজারিবাগ-গয়া-বানারস পাড়ি জমায়, হয়তো অমরুতসর-চন্ডীগড়েও চলে যায় রেলগাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। কানা রেলের লাইন দেখে, জিটি রোড দেখে, আর এমনি কোনো সময়—যখন শেষরাতের হাওয়ায় গায়ে একটা শিরশিরানি জাগে হঠাৎ, তখন আকাশের নীল দেখে।

রেডিয়োতে হিন্দি গান বাজে। বাচ্চাটা আবার পা ঠোকে তালে তালে। কানা এক চোখে তা দেখেও দেখতে পায় না। পাঞ্জাব—তার দেশ। অথচ সে দেশ কখনো দেখেনি। কে যেন তাকে বলেছিল হির-রনঝার গল্প, শুনিয়েছিল তার গান। রনঝাকে ভালোবেসে শেষে মহিষের রাখাল হতে হয়েছিল হিরকে, কী সে দুঃখ! কত কষ্ট!

হারামির জাত। বেকোয়াশ মহব্বত—বেফায়দা। সে তো নিজেই দুটোকে দেখল।

মাংসটা আরও জোরে কষতে কষতে কানা দাঁত কষকষ করে। কষা মাংসের গন্ধে আকুল হয়ে একটা কুকুর এসে দাঁড়িয়েছিল সামনে, একটুকরো কয়লা ছুড়ে মারে তার দিকে।

ভাগ হারামি কাঁহাকা!

কিন্তু সামনের ওই নীলটা মন খারাপ করে। সেই কালোকোলো উজ্জ্বল চোখ মেয়েটার কথা ভেবে মোচড় দিতে থাকে বুকের ভেতরে। যে-পাঞ্জাব সে কখনো দেখেনি, তার মেঘবরণ আকাশছোঁয়া গমের খেত ভেসে ওঠে সামনে। দেখতে পায় তাদের, কতকাল পরে আজও মহিষ চরাতে চরাতে যারা হির-রনঝার গান গায়।

এই বদমাশ।

গালাগালটা দেবে না ভেবেও সামলাতে পারে না, যেন মুখফসকে বেরিয়ে আসে। যে কাজটা নিজেই করা চলত, তার দায় চাপিয়ে দেয় বাচ্চাটার ওপর।

ঢালো, পানি ঢালো ইসমে।

ছেলেটা গরম জল ঢালতে থাকে মাংসের পাত্রে। কানা প্রতিমুহূর্তে আশা করে খানিকটা গরম জল উছলে পড়বে ছেলেটার পায়ে, ফোসকা পড়ে যাবে, ষাঁড়ের মতো চ্যাঁচাতে থাকবে, যেমন তার হয়েছিল উনুনের পাশে শুতে গিয়ে একটুকরো গনগনে কয়লা পিঠের নীচে পড়বার পর। ছাই দিয়ে ঢাকা ছিল, বুঝতে পারেনি।

কিন্তু শেয়ালের মতো চালাক ছেলেটা। অসম্ভব হুঁশিয়ার, এক ফোঁটা জলও পড়ে না।

শালা হারামির বাচ্চা।

হঠাৎ ফুসে ওঠে ছেলেটা।

ঝুটমুট গাল দেতে কেঁও?

মারব এক থাপ্পর। ভাগ সামনে থেকে।

কানাইল সিং কিছুই শোনে না। এক হাতের মুঠোয় সাদা দাড়িটা চেপে ধরে খবরের কাগজ পড়ে যায়।

বেলা বাড়ে। মাংস নামে। ছেলেটা বেলে দেয়, কানা রুটি করতে থাকে। খদ্দেরদের আসবার সময় হয়ে এল। শব্দ করে একটা জিপ গাড়ি এসে থামে হোটেলের সামনে। টক টক করে লাফিয়ে পড়ে চার জন। ভারি জোয়ান চার জন শিখ। এক চোখে এক লহমা দেখেই কানা চিনতে পারে এদের। কোলিয়ারির লোক এরা—মালিকদের পোষা গুণ্ডা। মজদুরদের মধ্যে বেয়াড়াপনা দেখা দিলে এরাই দু-চার জনকে নিকাশ করে চালান করতে পারে কোনো পোড়ো খাদের অতলে, খুন করতে পারে দিনদুপুরে। এ ছাড়া ডাকাতি এদের বাঁধা ব্যাবসা। কখনো কখনো বিমা কোম্পানিকে ফাঁকি দেবার জন্যে এদের দিয়েই মালিক নিজের টাকা লুট করায়।

পুলিশে ধরে কখনো কখনো, আবার মালিকদের হাতের গুণে দু-দিনে ছটকে বেরিয়ে আসে। দরকার হলে দু-চারটে পুলিশকেও শেষ করে দেয়। একজন ফতে সিং, একজন ঠাকুর সিং, আর একজনের নাম জানে না; চতুর্থ জনও ঠিক তার মতো আসল নাম হারিয়ে ডালকুত্তা বলে বিখ্যাত।

ডালকুত্তাই বটে!

প্রকান্ড মাথা, প্রকান্ড মুখ। সারা মুখে কপালে চেচক-এর দাগ। অদ্ভুত চওড়া আর থ্যাবড়া নাক। জোড়া ভুরু দুটো এত মোটা যে প্রায় কপালের আধখানা জুড়ে গিয়েছে।

কথা কম বলে, কখনো হাসে না। আর আধবোজা মিটমিটে চোখে তাকায় ঠিক সাপের মতো। সে-চাউনিতে রক্ত হিম হয়ে যায়। এসব লোককে ভালো করে চিনিয়ে দিয়েছে কানাইল সিং নিজেই। নিজে ফৌজি হাবিলদার হয়েও সে ভয় পায় এদের। বলে, খুব হুঁশিয়ার, ডালকুত্তাকে কখনো ঘাঁটিয়ো না।

কার দায়, কে ঘাঁটাতে যাচ্ছে? বাচ্চাটা তো ওদের দেখলে ভয়েই সিঁটিয়ে যায়। আর কানা রান্না করে, খাবার সাজিয়ে দেয়। কানার হাতের মাংস খেলে খুশি হয় ওরা। যাবার সময় এক-আধটা থাবড়া আদর করে বসিয়ে যায় পিঠে। রোগা হাড়গুলো কনকন করে ওঠে তাতে।

ওদের ঢুকতে দেখে তটস্থ হয়ে উঠে দাঁড়ায় কানাইল সিং, আপ্যায়ন করে একগাল হেসে। অন্যদিন লোকগুলো খুশি থাকে, কুশল জিজ্ঞেস করে কানারও।

আজ আর ভালো করে জবাবও দেয় না। মুখগুলো কালো।

কেমন করে থাকব? বিরস মুখে জবাব দেয় ঠাকুর সিং, খবর ভালো না। জমানা বদলে যাচ্ছে।

কার জমানা, কেমন করে বদলাল, এসব নিয়ে কিছু ভাববার নেই কানার। তার জমানা তো এই কানাইল সিংয়ের হোটেলের চৌহদ্দিতেই ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু লোকগুলোর কথা শুনে কেমন ভয় পায় বুড়ো, চুপ করে ফিরে যায় নিজের জায়গায়।

এক কোনায় যেখানে একটা কালো পর্দা দিয়ে ঘেরার ব্যবস্থা আছে, সেখানে গিয়ে বসে চার জন। টেনে দেয় পর্দা। খাবারের হুকুম দেয় না। বাচ্চাটাকে বলে, দো সোডা মাঙ্গাও, আউর গিলাস।

বাচ্চা সোড়া আনতে ছোটে পাশের দোকানে। চাপা গলায় কী আলাপ করে ওরা, শোনা যায় না। রেডিয়োটার আওয়াজ কমিয়ে দিয়ে কানাইল সিং আবার ডুব দেয় খবরের কাগজে।

সোডা আসে, গেলাস যায়। বোতল খোলার শব্দ ওঠে।

হয়তো ডাকাতির মতবল ভাঁজছে, হয়তো খুনখারাপির। কিংবা পুলিশেই হুড়ো লাগিয়েছে হয়তো-বা। রুটি সেঁকতে সেঁকতে আবার কানার চোখ চলে যায় আকাশের দিকে। বাচ্চাটা বাইরে বেঞ্চিতে বসে থাকে চুপ করে। জিটি রোড দিয়ে গাড়ি ছোটে, ওধারে রেল আসা যাওয়া করে, সময় যায়।

আরও দুজন খদ্দের আসে। রুটি, আলু-মটর, জল খেয়ে পয়সা দিয়ে চলে যায় তারা। বাচ্চা টেবিল সাফ করে। বাইরে কাকের ডাক ওঠে। বেলা বাড়ে। সময় যায়।

কালো পর্দার ওপার থেকে মোটা গলায় হাঁক আসে। ফতে সিং কিংবা ডালকুত্তা আওয়াজে বোঝা যায় না।

রুটি-মাংস। চার জনের!

কানা সাজিয়ে দেয়। পরিবেশন করতে যায় ছেলেটা। আর তখনই ব্যাপারটা ঘটে যায়।

কী-একটা গেলাস-টেলাস উলটে পড়ল মনে হয়। তারপেরই শোনা যায় জঘন্য একটা গালাগাল। বাচ্চাটা ছিটকে সরে আসে, কালো পর্দার ভেতর থেকে জুতোপরা প্রকান্ড একটা লোক বেরিয়ে নিদারুণ লাথি বসায় ছেলেটার পেটে। হুমড়ি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে সে, তার হাত থেকে এক থালা রুটি-মাংস ছড়িয়ে যায় ঘরময়।

আতঙ্কে শক্ত হয়ে যায় কানা, হুড়মুড় করে লাফিয়ে ওঠে কানাইল সিং। গালাগালির ঢেউ উঠতে থাকে পর্দাটার ওপার থেকে।

টেবিলে থালা বসাতে গিয়ে একটা গেলাস উলটে দিয়েছিল ছেলেটা। খানিক মদ টলে পড়েছে ডালকুত্তার গায়ে।

মাংসের ঝোলে মাখামাখি হয়ে উঠে বসে ছেলেটা—ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। হাতজোড় করে কসুরের মাপ চায় কার্নাইল সিং, তটস্থ হয়ে ছোটে নিজের হাতে পরিবেশন করতে।

চোখের জল মুছতে মুছতে ছেলেটা মেঝে সাফ করতে বসে যায়।

কানা দেখে। মনে মনে খুশি হওয়া উচিত ছিল তার, কিন্তু খুশি হতে পারে না। স্মৃতিতে তার যন্ত্রণা চমকায়। তাকেও যেন কে অমনি করে লাথি মেরেছিল একবার, খাবার দিতে দেরি হয়ে গিয়েছিল বলে। একটা চোখ মেলে বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে সে, যেন নিজের সেদিনকার মুখটার ছায়া দেখতে পায় সেখানে।

খাওয়া শেষ করে বেরিয়ে আসে লোকগুলো। পয়সা মিটিয়ে দেয় কার্নাইল সিংকে। কানাইল সিং হাসে। খাতির করে কিছু বলতে যায়, কিন্তু আলাপ জমে না। অন্ধকার চেহারা নিয়ে শুকনো গলায় কী বলে তারা আবার বেরিয়ে যেতে থাকে রাস্তার দিকে।

বাচ্চাটা পথ ছেড়ে ভয়ে সরে দাঁড়ায়। হঠাৎ কী ভেবে দাঁড়িয়ে পড়ে ডালকুত্তা। বাচ্চাটাকে

ডাকে, এই শুনো, ইধার আও।

বাচ্চাটা নড়ে না।

ইধার আও, ডবরা মত। পকেট থেকে একটা আধুলি বের করে ডালকুত্তা, লো!

ছেলেটা তেমনি দাঁড়িয়ে থাকে।

লো লো, বকশিশ লো।

একভাবে ছেলেটা ঘাড় গুঁজে থাকে, এক পাও নড়ে না।

আধবোজা চোখ দুটো খানিক খুলে যায় ডালকুত্তার। সাপের মতো চাউনি লিকলিক করে ওঠে। চেচক-এর চিহ্নে ভরা প্রকান্ড মুখটাকে ভয়ংকর দেখায়।

গোসসা হো গয়া শালে কো? আধুলিটা ছেলেটার মুখের ওপর সজোরে ছুড়ে দেয় ডালকুত্তা। ছেলেটা যন্ত্রণায় ককিয়ে ওঠে। হা-হা করে হেসে চার জন লাফিয়ে বসে জিপে। স্টার্ট নেয় গাড়িটা, এগিয়ে যায় কলকাতার দিকে। এক বার চেয়ে দেখেই আবার কাগজটা পড়তে থাকে কানাইল সিং।

ছেলেটা দেখে না, আর কেউ দেখে না, কানা দেখে। আধুলিটা গড়িয়ে গিয়ে পড়ে নর্দমার ভিতরে।

সময় যায়, বেলা বাড়ে, খরিদ্দার আসে। একটু আগেকার সব দুঃখ ভুলে গিয়ে ছেলেটা পরিবেশন করে। গরিবের ছেলের ওসব মনে রাখলে চলে না।

কানাকে যে লাথি মেরেছিল সে বলেছিল, কাঁদছিস কেন শুয়োরের বাচ্চা। হাস, হাস বলছি, নেহি তো ফিন এক লাথসে তুমকো…

হাসতে হয়েছিল কানাকে। আর মজা দেখে মুচকে মুচকে হাসছিল হোটেলের মালিক। সেও চাবুক দিয়ে পিটতে ভালোবাসত কানাকে।

এক ফাঁকে দোকানের চাপ একটু কমে গেলে ছেলেটা এসে দাঁড়ায় কানার পাশে। ফিসফিস করে বলে, চাচা!

কেয়া?

উ তোক খুন কিয়া।

কেয়া?

হ্যাঁ, তাই। পর্দার বাইরে থেকে শুনেছে বাচ্চাটা। ওরা এবার পাঞ্জাবে পালিয়ে যাবে। জমানা খারাপ। মালিকের আর হাতযশ নেই আগেকার মতো।

কানার ঠোঁটের ওপর দাঁতের চাপ পড়ে। পাঞ্জাব! হঠাৎ কানার মনে পড়ে যায়, তার মা ও যেন কার সঙ্গে পাঞ্জাব পালিয়ে গিয়েছিল।

তীব্র গলায় কানা বলে, যাক, মরুক গে! ডাকু সব!

চাচা! বাচ্চাটা আবার ডাকে।

কেয়া?

উ লোগ মুঝে এক আধুলি দিয়া থা, কিধার গিয়া দেখা তুম?

কানা দেখেছে, ওই নালার ভেতর। জানে হাত দিলেই পাওয়া যাবে ওখানটায়।

একটু চুপ করে থাকে, তারপর জবাব দেয়, না, দেখিনি। যেতে দে বদমায়েশের পয়সা, আমি তোকে আধুলি দেব একটা।

ছেলেটা বিশ্বাস করতে পারে না। চাচার এমন দয়া এর আগে সে আর কখনো দেখেনি।

তুম?

হ্যাঁ আমিই দেব। বিশ্বাস করছিস না কেন?

ছেলেটার চোখ-মুখ খুশিতে ভরে যায়। বাচ্চা রামছাগলের মতো লাফাতে লাফাতে চলে যায় বাইরে। একটা ঘুড়ি কেটে পড়েছে কাছাকাছি, ছোটে তারই দিকে। ওরা কত সহজে ভুলে যায়।

সামনে আকাশটা নীল। গাড়ি ছুটছে একটার পর একটা। সব হাওয়া বদলে চলল। কিন্তু ওই নীলের দিকে তাকিয়ে আর মন খারাপ হয় না কানা সিংয়ের। হির-রনঝার গান ভেসে ওঠে না কোথাও। কেন যেন খুশি লাগে তার, বাচ্চা ছেলেটাকে একটা আধুলি দেবার কথা ভাবতে ভালো লাগে। কোথায় যেন একটা হাওয়া বদল হয়ে যাচ্ছে টের পায় সে।

 ইজ্জত

সমুদ্র অনেক দূরে। সেখানে ঝড়, সেখানে সাইক্লোন, আর এখানে এই এক টুকরো গ্রাম যেন প্রবালদ্বীপ। এর চারদিকে সহজ অশিক্ষা আর অজ্ঞতার শান্তি একটা স্তব্ধ লেগুনের মতো প্রবাল-বলয় দিয়ে ঘেরা।

উপমাটা দিয়েছিল গ্রামের ডাক্তার এবং আশপাশের চারখানা গ্রামের মধ্যে একমাত্র এলএমএফ ডাক্তার জয়নুদ্দিন মিয়ার ছেলে মইনুদ্দিন। সে তখন কলকাতার কলেজে বিএ পড়ত। তারপর সাত-আট বছর পার হয়ে গেছে। সে এখন দূরের মফস্বল শহরের উঠতি উকিল, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের মেম্বার, একজন নামজাদা নেতা। শান্ত স্তব্ধ লেগুনের চাইতে মাতাল সমুদ্রের গর্জনই তার ভালো লাগে বেশি।

দূরের সমুদ্রে ঝড়। কলকাতা, নোয়াখালি, বিহার, বোম্বাই, পাঞ্জাব আত্মঘাত আর অপঘাতের রক্তে লাল হয়ে গেল নীল সমুদ্রের জল। প্রবাল-বলয় ভেঙে পড়ল, লেগুনের নিস্তরঙ্গ জলে দেখা দিল মত্ততার আক্রোশ।

ব্রাহ্মণত্বের বিজয়গর্বে প্রায় আধ হাত খানেক একটা টিকি মাথার ওপরে গজিয়ে তুলেছে। জগন্নাথ সরকার। সেইটেই দুলিয়ে সে বললে, নাঃ, এর প্রতিবিধেন করতেই হবে। এমনভাবে চললে দু-দিন বাদে সব বাছাধনকেই যে কলমা পড়তে হবে সেটা খেয়াল রেখো।

তরণি মন্ডল বললে, তা লাঠি ধরতে হয়।

তাই ধরতে হবে। নিজের মান নিজে না রাখলে কে রাখবে তাই শুনি? গায়ে যতক্ষণ এক ফোঁটা রক্ত আছে, ততক্ষণ এ ঘটতে দেব না, পরিষ্কার বলে রাখলাম।

কুকুরের ছানার বেঁড়ে একটা ল্যাজের মতো জগন্নাথ সরকারের মাথার ওপরে টিকিটা নড়তে লাগল।

ব্রাহ্মণের অধিকার সম্বন্ধে একটু বেশি মাত্রাতেই সচেতন জগন্নাথ সরকার। খাঁটি ব্রাহ্মণদের কাছে স্বীকৃতিটা নেই বলেই নিজেকে আরও বেশি করে প্রমাণ করতে চায় সে, প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সমুদ্রের ওপারে একটা বিস্তীর্ণ মহাদেশ জুড়ে যেখানে ব্রাহ্মণত্বের বিজয়পতাকা উড়ছে, অস্পৃশ্য নমঃশূদ্রদের সঙ্গে ব্রাহ্মণ্য গর্বিত জগন্নাথ সরকারের কোনো পার্থক্য নেই সেখানে। তাই নিজের ছোটো গন্ডিটির ভেতরে নিজেকে সে বশিষ্ঠ-যাজ্ঞবন্ধ্যের মহিমায় স্থাপিত করে রাখতে চায়। ক্ষার দিয়ে পরিষ্কার করে কাচা লালচে রঙের মোটা পৈতের গুচ্ছটা বাগিয়ে ধরে বলে, হেঁ হেঁ বাবা–খাঁটি কাশ্যপ গোত্র, রামকিষ্ট ঠাকুরের সন্তান। একটু তপ তপিস্যে বজায় রাখলে যাকে-তাকে ভস্ম করে ফেলতে পারতুম।

কিন্তু তপ-তপস্যাটা এখন আর হয়ে ওঠে না বলেই কাউকে আর ভস্ম করাটাও সম্ভব নয় রামকিষ্ট ঠাকুরের সন্তানের পক্ষে। আর মনু-পরাশরের সঙ্গে যতই আত্মীয়তা সে দাবি করুক না কেন, আসলে সে এখন অন্ত্যজ, সে নমঃশূদ্রের ব্রাহ্মণ।

কোন সাত না দশ পুরুষ আগে অক্ষত কৌলীন্য স্বনামধন্য রামকিষ্ট ঠাকুরের কোনো বৃদ্ধ প্রপৌত্র লোভ বা অভাবের তাড়নায় নমঃশূদ্রের যাজনা করেছিল। সেই থেকে তারা পতিত। হিন্দুত্বের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য সে-পতনকে ক্ষমার চোখে দেখেনি, বিচারও করেনি। একটু একটু করে দিনের পর দিন ঠেলে দিয়েছে পিচ্ছিল পথে, এখন তারা নমঃ-র বামুন।

পৈতে আছে, উপনয়নের ব্যবস্থা আছে, ব্রাহ্মণ্য সংস্কারের ভাঙাচুরো অর্থহীন অসঙ্গতিগুলোও জড়িয়ে আছে জীবনের সঙ্গে। শিক্ষাদীক্ষা নামেমাত্র; জগন্নাথ সরকার নামটা কাঁচা হাতে সই করতে পারে, তাতে মাত্রা দিতে জানে না, লেখাটা দেখলে নাগরী বলে মনে হয়। চেহারায় ব্রাহ্মণের আর্যত্বের দীপ্তি কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। রোদে-পোড়া কালো রং, লাঙল ঠেলে চওড়া চওড়া হাত দুটো লোহার মতো শক্ত আর কড়া পড়া, পিঠে খড়ি, তামাটে রঙের খাড়া খাড়া চুল, অনেকক্ষণ ধরে স্নান করলে যেমন হয় তেমনি লালচে আর ঘোলাটে বর্ণের চোখ। বড়ো বড়ো অসমান দাঁত, তার দুটো আবার হিন্দুস্থানিদের অনুকরণে রুপো-বাঁধানো। শুধু কুকুরের বেঁড়ে ল্যাজের মতো মাথার টিকিতে ব্রাহ্মণত্বের জয়গৌরব ঘোষিত হচ্ছে।

নমঃশূদ্রদের বিয়েতে, ক্ষেত্ৰপালের পুজোয় সে-ই মন্ত্র পাঠ করে। সে-মন্ত্র বিচিত্র। খাঁটি প্রাদেশিক বাংলার ঘাড়ে কতগুলো অনুস্বার-বিসর্গ চাপিয়ে সেগুলোতে দেবমহিমা আরোপ করা হয়। পিতৃপুরুষের কাছ থেকে যেটুকু পাওয়া গেছে প্রয়োজনমতো তার সঙ্গে নতুন মন্ত্রও জুড়ে নেয় জগন্নাথ সরকার। মোটের ওপর পসার আছে এবং সেজন্যে আত্মমর্যাদা সম্পর্কেও সে পুরোপুরি সজাগ।

আজ সেই আত্মমর্যাদায় ঘা লেগেছে।

বাইরের সমুদ্রে ঝড়। কলকাতা, নোয়াখালি, বিহার—সমস্ত দেশজোড়া একটা অতিকায় ছোরার ঝলক এখানকার আকাশেও বিদ্যুৎচমকের মতো খেলা করে গেল।

অনেক দিন আগে এখানে এক ফকিরের আবির্ভাব হয়েছিল। ফকির নাকি ছিলেন অদ্ভুতকর্মা; সমস্ত হুরি-পরি-জিন ছিল তাঁর আজ্ঞাবহ। হাতে একমুঠো ধুলো নিয়ে তিনি ফু দিতেন, সঙ্গে সঙ্গে সে-ধুলো হয়ে যেত খাসা কিশমিশ মনক্কা, কখনো কখনো একেবারে সেরা মোগলাই পোলাও। কতগুলো ঘাসপাতা একসঙ্গে জড়ো করে নিয়ে মন্ত্রপাঠ করতেন ফকির, দেখতে দেখতে সেগুলো হয়ে যেত চুনি-পান্না-হিরে-জহরত। সেসব হিরে-জহরতের শেষপর্যন্ত কী গতি হয়েছে ইতিহাসে তা লেখা নেই, তবে ফকিরের মহিমা লোকের স্মৃতিতে অক্ষয় হয়ে আছে। আর সবচাইতে যেটা উল্লেখযোগ্য সেটা এই যে, এহেন করিতকর্মা মহাপুরুষ কী মনে করে এই অজগর বিজেবনেই তাঁর দেহরক্ষা করলেন।

বেশ আড়ম্বরের সঙ্গেই গ্রামের লোক তাঁর শেষকৃত্য করলে। তাঁর সমাধির ওপর রচনা করলে ছোটো একটি গম্বুজ। এখন সে-গম্বুজ আর নেই, কয়েকখানা শ্যাওলাধরা ভাঙা ইট ছড়িয়ে আছে এদিকে-ওদিকে। কিন্তু তাই বলে ফকিরের মহিমার হ্রাস হয়নি বিন্দুমাত্রও। পুরোনো মদের মতো যতই দিন যাচ্ছে সে-মহিমা ততই অলৌকিক হয়ে উঠছে।

ফাঁকা মাঠের ভেতরে টিলার মতো একটুখানি উঁচু জমির ওপরে ফকিরের সমাধি। তা থেকে একটুখানি এদিকে সরে এলে একটা জংলা বট গাছ এলোমেলোভাবে জটা নামিয়েছে চারপাশে। বহুদিনের পুরোনো গাছ, হয়তো ফকিরের সমসাময়িক, হয়তো তার চাইতেও প্রবীণ। মোটা মোটা ডাল থেকে শিকড় নেমে ঢুকেছে মাটির নীচে, রচনা করেছে কতগুলো স্তম্ভের মতো। সব মিলিয়ে গম্ভীর থমথমে একটা আবহাওয়া। নিবিড় নীলাভ ছায়ার আচ্ছন্নতা, ভিজে ভিজে মাটি, কোটরে কোটরে প্যাঁচার আস্তানা। এইখানে ডাকাতে-কালীর থান।

ফকিরের ইতিহাসের সঙ্গে ডাকাতে-কালীর ইতিহাস একই প্রাচীনতার ঐতিহ্যে গাঁথা। কোনো এক নামজাদা ডাকাত এখানে অমাবস্যার রাত্রে নরবলি দিয়ে বেরুত ডাকাতি করতে। এইখানে পঞ্চমুন্ডি আসন করে সাধনা করতেন রক্তচক্ষু এক মহাকায় তান্ত্রিক। অনেক নরবলির রক্ত এখানকার মাটিতে মিশে আছে, অনেক নরমুন্ড লুকিয়ে আছে এর মাটির তলায়। সুতরাং, এখানকার হিন্দুদের কাছে ডাকাতে-কালীর একটা নিশ্চিত ভয়ংকর মর্যাদা আছে। এই গ্রাম তাঁরই রক্ষণাধীনে এবং তাঁর কোপদৃষ্টি পড়লে দেখতে দেখতে সব কিছু উজাড় হয়ে যাবে।

সব চাইতে আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, এত বড়ো মাঠের ভেতরে এঁরা দুজন পরস্পরের প্রতিবেশী। ফকির আর ডাকাতে-কালী এতকাল পরম নিশ্চিন্তে এবং নীরবে পাশাপাশি বসবাস করে আসছিলেন। এক কম্বলে দশ জন ফকিরের জায়গা হয়–এই প্রবন্ধটির জন্যেই বোধ হয় এতকাল ফকির কিছুমাত্র আপত্তি করেননি এবং এত কাছাকাছি যবনের আস্তানা থাকাতেও কালী জাত যাওয়ার আশঙ্কা রাখতেন না।

বেশ ছিল, কিন্তু সমুদ্রে ঝড় এল; প্রবাল-বলয় ভেঙে দোলা জাগিয়ে দিলে নিদ্রিত প্রবালদ্বীপে। মাইল-দেড়েক দূরে মাঝারি গোছের একটা মাদ্রাসা। মাঝখানে একদিন এক মৌলবি সেখানে এসে ওয়াজ করলেন। কী বক্তৃতা দিলেন তিনিই জানেন, কিন্তু পরের দিন থেকেই আবহাওয়াটা বদলে গেল একেবারে। তারও দু-দিন পরে মুসলমান পাড়ার ধলা মন্তাই এসে জগন্নাথ ঠাকুরকে জানিয়ে গেল, এবার ডাকাতে-কালীর থানে পুজো করা চলবে না।

কারণ?

কারণ ওখানে ঢাক-ঢোল বাজে, ওখানে ভূত পুজো হয়। তাতে সুখনিদ্রায় ব্যাঘাত হয় ফকিরসাহেবের। জগন্নাথ ঠাকুর বোঝাতে চেষ্টা করলে–বরাবর ওখানে পুজো হয়ে আসছে। এতকাল ফকিরসাহেবের যদি কোনো অসুবিধে না-হয়ে থাকে, এবারেই-বা হতে যাবে কেন?

ধলা মন্তাই হাসল, বললে, তা হোক, অত বুঝি না। তবে এইটে বলতে পারি যে, এবারে ওখানে আর পুজো হতে দেওয়া যাবে না। এতে আমাদের ধর্মের অপমান।

কিন্তু আমাদের ধর্মেরও তো অপমান হচ্ছে।

ভূত পুজো আবার কীসের ধর্ম? ধলা মাইয়ের চোখে হিংসা চকচক করে উঠল, একটা কথা বলে যাই ঠাকুর। এ এখন আমাদের রাজত্ব। আমরা যা বলব তাই করতে হবে। এখন বেশি চালাকি করতে যেয়ো না, বিপদ হতে পারে।

গ্রামে দুজন মন্তাই। একজন রোগা আর কালো, নিরীহ নির্জীব লোক, সে শুধুই মন্তাই। ধলা মন্তাইয়ের রং ওরই ভেতরে একটু ফর্সা, লম্বা তাগড়া চেহারা, চিতানো বুক। মুসলমান পাড়ার সে সবচাইতে দুর্ধর্ষ ব্যক্তি, নামকরা দাগি। তাই ধলা মন্তাইয়ের শাসানো শুধু কথার কথাই নয়।

যা বললুম ভুলো না ঠাকুর। পরে গোলমাল হতে পারে। আর এক বার সাবধান করে দিয়ে দলবল নিয়ে ধলা মন্তাই চলে গেল।

তখনকার মতো জগন্নাথ ঠাকুর চুপ করে রইল। কিন্তু চুপ করে থাকা মানেই চেপে যাওয়া নয়। ঘা লাগল ব্রাহ্মণের আত্মমর্যাদায়, কুকুরের ল্যাজের মতো বেঁড়ে টিকিটা উত্তেজনায় খাড়া হয়ে উঠল শজারুর কাঁটার মতো।

নমঃশূদ্রদের গ্রাম। এমনিতেই জাতটা একটু সামরিক, চট করে ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়ার মতো নয়। সমাজের সবচাইতে নীচের তলায় পড়ে থাকে বলেই ধর্মের ওপরে আস্থাটা বেশি। শূদ্রশক্তির বলিষ্ঠ সহজ সংস্কারে একবার যাকে মেনে নিয়েছে তার কাছ থেকে চূড়ান্ত অপমানের আঘাত পেয়েও তাকে ছাড়তে জানে না। যুগ-প্রবাহিত রক্তধারায় শম্বুকের নিষ্ঠা, একলব্যের দৃঢ়তা। সমাজের ওপরতলার মানুষদের মতো ধর্মটা ওদের অলংকার মাত্র নয়, একেবারে নীচের তলায় থেকেও ধর্মকে ওরা অহংকার বলে আঁকড়ে রেখেছে।

সুতরাং, নমঃ-র বামুন জগন্নাথ সরকার খেপে উঠেছে।

পুজো আমরা করবই। তার পরে যা হওয়ার হোক।

একজন বললে, তাহলে সড়কি-টাঙ্গিতে শান দিতে হয়।

জগন্নাথ সরকার হাঁটু চাপড়ে বললে, আলবাত। খুনখারাপি দুটো-একটা হয় তো হোক। কিন্তু পিছিয়ে যাওয়া চলবে না। বেশি বাড়াবাড়ি করে তো ফকিরটকির সবসুদ্ধ উড়িয়ে দেব।

শ্রোতাদের মধ্যে উৎসাহী একজন উঠে দাঁড়াল। রক্তের ভেতরে চনচন করে উঠেছে নেশা —খুনখারাপির নেশা। হিংস্র জন্তুর চৈতন্যের ভেতরে যেন সাড়া দিয়ে উঠেছে আদিম অরণ্যের আহ্বান। সোজা দাঁড়িয়ে উঠে সে বিকট গলায় একটা হাঁক পাড়ল, জয় কালী মাইকি জয়।

সমবেত জয়ধ্বনি উঠল, কালী মাইকি জয়।

আর সঙ্গে সঙ্গে যেন দূরের মুসলমান পাড়া তার জবাব পাঠিয়ে দিলে, আল্লা-হো আকবর।

জগন্নাথ সরকারের নেতৃত্বে শেষ হল ওদের সভা, ধলা মন্তাইয়ের সভাপতিত্বে শেষ হল মুসলমান পাড়ার ওয়াজ। সমস্ত মুসলমান পাড়া আল্লার নামে কসম নিয়েছে, জান দেবে তবু এবার পুজো করতে দেবে না। ইসলামের ইজ্জত বাঁচাতে হলে যে করে হোক ওই ভূত পুজো বন্ধ করতে হবে।

আসন্ন ঝড়ের সংকেতে আকাশ থমথম করতে লাগল! মুসলমান পাড়ার যিনি আদত মাথা, তিনি হাবিব মিয়া। নধর গোলগাল চেহারা, টুকটুকে রং। শৌখিন মেজাজের মানুষ। দিল্লি থেকে প্রতি সপ্তাহে সুর্মা আসে তাঁর নিজের এবং তাঁর আদরের লালবিবির জন্যে। কানে থাকে আতরভরা তুলো এবং মুখ থেকে বেরোয় মশলা-দেওয়া পানের গন্ধ। পঞ্চাশ বছর বয়েস হয়েছে হাবিব মিয়ার, কিন্তু মনের তারুণ্য এতটুকু ফিকে মারেনি আজ পর্যন্ত। এ অবধি বারোটি বিবি তাঁর হাত ঘুরে গেছে। এখন যে-চারটি আছে তার প্রথমটি হচ্ছে আদি ও অকৃত্রিম, বাকি তিনটি আনকোরা নতুন। পুরোনো জিনিস বেশিদিন বরদাস্ত করতে পারেন না হাবিব মিয়া, কিন্তু বড়োবিবিকে তালাক দেবার কল্পনাও তিনি করতে পারেননি কখনো। আজ বত্রিশ বছর ঘর করে কেমন একটা মায়া বসে গেছে, তা ছাড়া ধান-পান গোরু-গোয়ালের নিপুণ তদারক করতে এমন আর একটি প্রাণী দুর্লভ।

বড়োবিবি নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত, মাঝখানের দুটি ছায়ামূর্তির মতো অবান্তর। মহিষীর মর্যাদা যে সগৌরবে ভোগ করে থাকে সে হল ছোটোবিবি বা লালবিবি। বছর সতেরো আঠারো বয়েস, ছিমছাম চেহারা, মাজা শ্যামলা রং। আদরে-আবদারে-অভিমানে হাবিব মিয়ার সমস্ত মন-প্রাণকে একেবারে পরিপূর্ণ করে রেখেছে। এক মুহূর্তের জন্যে লালবিবিকে চোখের আড়াল করতে পারেন না তিনি। তাই কানের গোলাপি আতর আজকাল আরও বেশি করে গন্ধ ছড়ায়, শহর থেকে জর্দা কিমাম আনানোর খরচটা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে, চোখের কোলে কোলে গাঢ় হয়ে পড়ছে সুর্মার রেখা। আগের চাইতে আজকাল আরও বেশি করে হাসেন হাবিব মিয়া, ভুড়িটা আগের চাইতে আরও বেশি দোল খায়, গালের গোলাপি রঙে আরও বেশি করে যেন যৌবনের আমেজ।

তা সুখী হওয়ার আইনসঙ্গত অধিকার আছে বই কী হাবিব মিয়ার। মস্ত জোত, খেতির সময় বারোখানা লাঙল নামে। ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বার, ফুড কমিটির সভাপতি। যা যা দরকার কোনোটার অভাব নেই।

সব ভালো, তবে সন্ধের দিকে একটু আফিং খান। হজমের গোলমালের জন্যে ধরেছিলেন গোড়াতে, এখন পাকাঁপাকি নেশা হয়ে গেছে। ঘণ্টা দু-তিন চোখ বুজে নিশ্চিন্তে ঝিমুতে মন্দ লাগে না একেবারে। নেশার আমেজের সঙ্গে নবযৌবনা লালবিবির ধ্যানটা একটা মধুর আরামে আচ্ছন্ন করে রাখে।

বলা বাহুল্য, এই সময় বেরসিকের মতো কেউ ডাকাডাকি করলে ভালো লাগবার কথা নয়। হাবিব মিয়ার মেজাজটা যতই ভালো হোক-না কেন, ইচ্ছে করে রসভঙ্গকারী বেয়াদবকে পায়ের চটিটা খুলে ঘা-কতক পটাপট বসিয়ে দিতে। খাঁটি সৈয়দের বংশধর হিসেবে গর্জন করে উঠতে ইচ্ছে হয়, চুপ রহো গোলামকা বাচ্ছা।

আপাতত মগজের ভেতরে সেই সৈয়দের মেজাজটা পাক খাচ্ছিল। হাবিব মিয়া গাল দিয়ে উঠলেন না বটে, কিন্তু চোখ না মেলেই দুরন্ত জবানিতে আমিরি ভাষায় প্রশ্ন করলেন, আবে কৌন চিল্লাতা?

আমি ধলা মন্তাই, জনাব!

এ এমন একটা লোক যাকে হুংকার দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া চলে না, দেখানো চলে না আমিরি মেজাজের উত্তাপ। অত্যন্ত বদরাগি গোঁয়ার লোক, খেপে গেলে সৈয়দ-মৌলবি কোনোটাই মানবে না। সুতরাং অত্যন্ত অনিচ্ছায় এবং গভীর বিরক্তির সঙ্গে চোখ মেলতে হল। লালবিবির রঙিন স্বপ্নটা আপাতত মিলিয়ে গেল বাতাসে।

জোর করে মুখে হাসি টেনে আনলেন হাবিব মিয়া, তারপর কী খবর?

দাওয়ার সামনে চাটাইটার ওপরে বসল মন্তাই, আজ্ঞে বারণ করে দিলাম।

তারপর?

গন্ডগোল পাকাবে। বিকেলে দেখেছি দল বেঁধে জটলা করছিল।

তোমরা কী করবে? ভয় পেয়ে সব পিছিয়ে যাবে নাকি ছাগীর বাচ্ছার মতো?

আল্লার কসম! পিঁজরার পোষ-না-মানা বাঘের মতো একটা চাপা গর্জন করলে ধলা মন্তাই, আমি জাত পাঠান জনাব। ধরে ধরে এক-একটাকে কোতল করে দেব তা হলে।

হাবিব মিয়ার কন্ঠস্বর বিশ্বস্ত শোনাল। সব ওই ব্যাটা ঠাকুরের জন্যে। ও-ই হচ্ছে ওদের মাথা।

মাথার মাথাটা কেটে নিতে আমার এক লহমা সময় লাগবে না জনাব। তারপরে লাশ গুম করে দেব মধুমতীর জলে। কাকে অবধি টের পাবে না।

শাবাশ!

হাবিব মিয়া চুপ করে গেলেন। মুখে আবার এক টুকরো হাসি দেখা দিল, কিন্তু এ হাসি জোর-করা নয়, সহজ প্রসন্নতার। এতদিনে কাজ হাসিল হবে মনে হচ্ছে। ষাঁড়ের শক্ত বাঘে মারবে। নিজে থেকে কিছু করতে গেলে অনর্থক দাঙ্গা-ফৌজদারির ঝামেলা বাঁধত, কিন্তু এ যা হচ্ছে তা যেমন নিরাপদ তেমনি মোক্ষম। জগন্নাথ ঠাকুরকে ভালো করেই জানেন হাবিব মিয়া, সহজে তার ন্যায্য দাবি থেকে বাঁধের দেড় বিঘে ধানিজমি ছিনিয়ে নেওয়া যাবে না। কিন্তু যে-মন্ত্র দেওয়া হয়েছে তাতে সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে জগন্নাথ ঠাকুরের মাথাটা উড়ে যাবে ধড় থেকে এবং তারপরে…

একেই বলে সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। ভাগ্যিস মৌলবিসাহেব এসে সেদিন ওইরকম গরম গরম বুলি শুনিয়ে গেলেন, নইলে কি এমন সুযোগ মিলত কোনোদিন! মনে মনে নিজের পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন হাবিব মিয়া, তারিফ করলেন নিজেকে। সকলকে লেলিয়ে দিয়ে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করার চাইতে বুদ্ধিমানের কাজ সংসারে আর কী আছে।

ধলা মন্তাই বললে, মামলা-মোকদ্দমা যদি বাঁধে তাহলে আপনি তো আমাদের পিছে। আছেন জনাব?

আলবাত। হাবিব মিয়া সোৎসাহে বললেন, সেকথা কি আর বলতে হবে?

আর কিছু জিজ্ঞাস্য নেই, বক্তব্যও নেই। তবু দ্বিধা করতে লাগল ধলা মন্তাই, আঙুল দিয়ে চাটাইটাকে খুটতে লাগল। আরও কী-একটা তার বলবার আছে কিন্তু সাহস সঞ্চয় করতে পারছে না, বলতে পারছে না সহজ ভাষাতে। বাধা আছে, সংকোচ আছে।

জনাব!

কী বলছিলে?

বলছিলাম… মন্তাই আবার চুপ করে গেল।

এতক্ষণে অস্বস্তি বোধ হতে লাগল হাবিব মিয়ার। লক্ষণটা খারাপ। সাধারণত এইসব নীরবতার ভূমিকার পরেই আসে প্রার্থীর দরবার— দু-কাঠা ধান চাই, দু-কুড়ি টাকা ধার চাই। এত বড়ো জোয়ান মানুষটা এমন সংকুচিত হয়ে গেলেই সন্দেহ দেখা দেয়।

কী বলবে, বলেই ফ্যালো-না মিয়া।

জি… চোয়াড়, রুক্ষদর্শন লোকটার মুখ-চোখ লজ্জিত আর করুণ হয়ে উঠল।

জি, ঘরের জরু-বিটির যে ইজ্জত রইল না।

ইজ্জত রইল না! বল কী হে? তোমার ঘরের ইজ্জতে হাত দেবে এমন বুকের পাটা কার আছে?

আজ্ঞে সেকথা নয়। কারও হাত দিবার ব্যাপার নয়, দু-একখানা কাপড়…

কাপড়! হাবিব মিয়া প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন, কাপড়!

জি, যদি ব্যবস্থা করতে পারেন…

তুমি খেপে গেলে মন্তাই? হাবিব মিয়ার বিস্ময় আর বাধা মানল না। সরকারি চালান যা এসেছিল সে তো ছ-মাস আগে লোপাট, একফালি কানি অবধি তার পড়ে নেই। আশমানের চাঁদ যদি চাও তাও টেনে নামিয়ে দিতে পারি, কিন্তু কাপড় নয়।

কিছুতেই কি উপায় হয় না, জনাব?

না, কোনো উপায় হয় না। হাবিব মিয়া মুখ বিকৃত করে বললেন, শালার কন্ট্রোল হয়ে সব সর্বনাশ করে দিয়েছে রে। সব গুনাহ আর সব না-পাক, দেশটা জাহান্নামে যাবে, বুঝলি?

কিন্তু দেশ জাহান্নামে যাক বা না যাক সেজন্যে মন্তাইকে খুব উৎকণ্ঠিত দেখা গেল না। একটা মস্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে উঠে দাঁড়াল, তারপর আদাব জানিয়ে নেমে গেল অন্ধকারে।

হাবিব মিয়া আবার ঘুমোবার জন্যে চোখ বুজলেন। কিন্তু আর আমেজ এল না, নেশাটা বিলকুল চটিয়ে দিয়েছে লোকটা। তা হোক, তা হোক। ষাঁড়ের শত্রু বাঘে মারবে এইটেই লাভ। দোষের মধ্যে কাপড়ের জন্য বড় ঘ্যানঘ্যান করে। কাপড়। হাবিব মিয়া মৃদু হাসলেন, কাপড় আছে বই কী, কিন্তু জোড়া বত্রিশ টাকা, মন্তাইয়ের পক্ষে তা আকাশের চাঁদের চেয়েও দুরধিগম্য।

অন্ধকার ধানখেতের আল বেয়ে বেয়ে এগিয়ে চলেছে মন্তাই। সদর রাস্তা দিয়ে গেলে ঘুরতে হয় খানিকটা, এইটেই সোজা পথ। দু-পাশে ফলন্ত পাকা ধান পায়ের ওপরে পড়ছে লুটিয়ে লুটিয়ে। বাতাসে ধানের গন্ধ। ওই গন্ধে বুকটা ভরে যায়, কেমন শিরশির করে ওঠে রক্ত। আছে, সব আছে। এই ধান, খেতভরা এত মধুগন্ধী ধান একদিন ওদের সব দিত। দিত কাপড়, দিত মুখের ভাত, বউ-ঝিকে গড়িয়ে দিত রুপোর পৈঁছে। সে-ধান আছে, তেমনি মাতাল-করা গন্ধ আছে তার। আশ্চর্য, তবু কিছু নেই! বউ-বেটির পরনে কাপড় জোটে না, পেট ভরে না ভাত খেয়ে, কন্দ আর কচু খুঁড়ে বেড়াতে হয় শুয়োরের মতো। আল্লা…!

অন্ধকারে ধাক্কা লাগল একটা। আল থেকে হড়কে ধানখেতের ভেতরে নেমে পড়ল মন্তাই।

কে? চোখে দেখতে পাও না, রাতকানা নাকি?

অন্যদিক থেকে যে আসছিল সেও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

রাগ কোরো না ভাই, আঁধারে মালুম হয়নি।

আরে, জগন্নাথ ঠাকুর যে!

জগন্নাথ ঠাকুর চমকে উঠল। আঁতকে পিছিয়ে গেল তিন-পা। ঝড়ের সংকেতে থমথম করছে আকাশ, স্তব্ধ অন্ধকারের নির্জনতায় মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। মন্তাইয়ের আক্রমণের জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করে নিলে জগন্নাথ সরকার।

বুঝতে পেরে এত দুঃখের ভেতরেও হেসে উঠল মন্তাই।

ভয় পাচ্ছ কেন ঠাকুর? এখানে তোমার সঙ্গে মারামারি করব না। যা কিছু লড়াই কাজিয়া তা হবে তোমাদেরই ওই কালীর থানে, তখন দেখা যাবে কার কলিজার জোর কত! তা এত রাত্রে চলেছ কোথায়?

জগন্নাথ ঠাকুরের গলায় স্বস্তির আভাস পাওয়া গেল, হাবিব মিয়ার কাছে।

হাবিব মিয়ার কাছে! আশ্চর্য হয়ে মন্তাই বললে, সেখানে কেন? মিটমাটের জন্যে?

মিটমাট? কীসের মিটমাট? জগন্নাথের গলার আওয়াজ উগ্র হয়ে উঠল, তোমরাও মরদ, আমরাও মরদ, লাঠিতেই মিটমাট হবে। সেজন্যে নয়, যাচ্ছি দু-খানা কাপড়ের জন্যে।

কাপড়?

হ্যাঁ, কাপড়! মানসম্মান আর রইল না মিয়া। বউ দু-দিন ঘর থেকে বেরুচ্ছে না। বলছে কাপড়ের জোগাড় না করলে গলায় দড়ি দেবে।

মন্তাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

কাপড় পাবে না ভাই, তার চেয়ে বউকে গলায় দড়ি দিতে বলো। আমাকেও তাই করতে হবে।

মন্তাই আর দাঁড়াল না, হেঁটে চলে গেল হনহনিয়ে। ধানখেতের ভেতরে চুপ করে খানিকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল জগন্নাথ, কিছু-একটা বুঝতে চেষ্টা করছে যেন।

দিনের আলোয় দেখা গেল সমান উৎসাহে দু-দলই পাঁয়তারা কষছে।

কালী মাইকি জয়। আল্লা-হো-আকবর! রক্তপাত আসছে আসন্ন হয়ে। কোনো বার এ সময় ডাকাতে-কালীর থানে পুজো হয় না, কিন্তু এবার কী মানত আছে জগন্নাথ ঠাকুরের, তাই আগামী অমাবস্যায় পুজো তার না করলেই নয়। মূর্তি তৈরি হচ্ছে কুমোর পাড়াতে, সঙ্গে সঙ্গে শান পড়ছে টাঙ্গি-সড়কি-ল্যাজাতে। এবারে এসপার-ওসপার যাহোক কিছু হয়ে যাবে একটা।

এরা দাঁড়ায় ডাকাতে-কালীর থানের পাশে ঝুরি-নামা বট গাছের শান্ত স্যাঁতসেঁতে রহস্যঘন ছায়ায়। অন্ধকার কোটরে আগুনের ভাঁটার মতো ধকধক করে প্যাঁচার চোখ। এই নীলাভ বিচিত্র ছায়ায়, এই গা-ছমছম-করা অস্বস্তিভরা পরিবেশের ভেতরে দাঁড়িয়ে ওদের রক্তের আদিমতার সাড়া আসে। মনে পড়ে যায় অমাবস্যায় নরবলি হত এখানে, থকথকে রক্ত চাপ বেঁধে থাকত মাটিতে! এখনই আধ হাত জমি খুঁড়লে বেরিয়ে আসবে নরমুন্ডু, দেখা দেবে কবন্ধ-কঙ্কাল। ডাকাতে-কালী আজ আবার নতুন করে নরবলি চাইছেন।

ওপারে ফকিরের দরগার সামনে দাঁড়ায় ধলা মন্তাইয়ের দলবল। সমানে শানানো চলছে। ল্যাজা-সড়কিতে, বাঁশঝাড় উজাড় করে লাঠি কাটা হচ্ছে, তবে আপাতত শুধু ওদের লক্ষ করে যাওয়া। যত খুশি ঘরে বসে মূর্তি তৈরি করো, যত খুশি দল পাকাতে থাকো। কিন্তু থানে মূর্তি বসিয়ে ঢাকে একটা কাঠি দিলেই হয়, রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে। সব তৈরি আছে। ভেতরে ভেতরে।

চোখ শানিত করে দেখে ধলা মন্তাই, অন্যমনস্কভাবে থুতনির নীচে ছোটো দাড়িটা আঁচড়াতে থাকে। ওদিকে কুকুরছানার বেঁড়ে ল্যাজের মতো টিকিটা সজারুর কাঁটার মতো খাড়া হয়ে ওঠে নমঃশূদ্রের ব্রাহ্মণ জগন্নাথ ঠাকুরের মাথায়।

আচমকা চিৎকার ওঠে, কালী মাইকি জয়।

ওদিক থেকে সমান উৎসাহে আসে তার প্রতিধ্বনি, আল্লা-হো-আকবর।

মনে হয় এখনই দাঙ্গা শুরু হল বুঝি। কিন্তু দু-দলই জানে এখনও সময় হয়নি। এ শুধু পরস্পরকে জানিয়ে দেওয়া চালাকি চলবে না, আমরাও সতর্ক আছি, আমরাও আছি প্রস্তুত হয়ে। শুধু দেখে যাচ্ছি, শুধু হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছি, যথাসময়ে দেখা যাবে কে কত বড়ো মরদ।

মুখোমুখি দু-দল–সমান সামরিক, সমান উৎসাহী। দু-চারটে খুনজখমে কোনো পক্ষেরই আপত্তি নেই। জমি নিয়ে, মেয়েমানুষ নিয়ে যা হামেশাই ঘটে থাকে, ধর্মের জন্যে তার চাইতে আরও কিছু বেশি মূল্য দিতেই রাজি আছে ওরা।

অমাবস্যা যত বেশি এগিয়ে আসছে, চিৎকারের মাত্রা বেড়ে উঠছে তত বেশি। দিনের বেলা পাঁয়তারা কষে সন্ধ্যা বেলায় ঘরে ফিরে যায় জগন্নাথ আর মন্তাই। দিনের দুই বীরপুরুষ নেতা সন্ধ্যা বেলায় আশ্চর্যভাবে অসহায়। এ এক প্রতিদ্বন্দ্বী, যার বিরুদ্ধে মুখোমুখি দাঁড়াবার সামর্থ্য নেই। শুধু পরাজয়কে মেনে নিতে হচ্ছে, স্বীকার করে নিতে হচ্ছে পৌরুষের মর্মান্তিক অপমানকে। মন্তাইয়ের বউ শাসায়, একদিন সে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাবে। ঘরের ভেতরে বিনিয়ে বিনিয়ে শোনা যায় জগন্নাথের বউয়ের কান্না, এবারে তার গলায় দড়ি না দিয়ে আর উপায় নেই।

গুম হয়ে দুজনেই বসে থাকে। দুজনের অবচেতন মনেই হিংস্র সাপের মতো একটা প্রচ্ছন্ন ইচ্ছা পাক খেয়ে ওঠে–কেমন হয় হাবিব মিয়াকে খুন করলে? কিন্তু শত্রুকে আঘাত করতে এখনও ওরা শেখেনি, যা শিখেছে তা শুধু আত্মঘাত।

সকাল বেলায় দলবল নিয়ে মন্তাই সবে হাবিব মিয়ার বাড়ির দিকে এগিয়েছে, এমন সময় বিশ্রী একটা কান্নার শব্দে পা আটকে গেল সকলের। কান্নাটা আসছে হাবিব মিয়ার বাড়ি থেকেই।

ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল সকলে!

সর্বনাশ ঘটে গেছে। কাল রাত্রে একটু ভালোরকম খানাপিনার ব্যবস্থা হয়েছিল, তৈরি হয়েছিল মাংস-পোলাও। কিন্তু সৈয়দি আমিরি খানার ঝাঁঝ হেলেচাষার মেয়ে লালবিবি বরদাস্ত করতে পারেনি। শেষরাত্রে বার কয়েক ভেদবমি করে তার হয়ে গেছে।

পাগলের মতো বুক চাপড়াচ্ছেন হাবিব মিয়া, তিন বিবি নাকিসুরে কাঁদবার পাল্লা দিচ্ছে। সমস্বরে। এই সুযোগ, এই কান্নার উৎকর্ষের ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে লালবিবির সৌভাগ্যটা জুটবে কার কপালে।

সমস্ত মুসলমান পাড়া বিমূঢ় আর আচ্ছন্ন হয়ে রইল। শোকটা প্রকাশ করতে না পারলে ভবিষ্যতে অসুবিধের সম্ভাবনা আছে। ঘন ঘন চোখ মুছতে লাগল, দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগল সবাই। গত মন্বন্তরেও বুঝি দেশের এত বড়ো সর্বনাশ হয়নি।

মহাসমারোহে কবর খোঁড়া হল আল্লাতলিতে। তিন বিবি এসে মুর্দাগোসল করাল, পড়া হল জানাজার নামাজ। চমৎকার রঙিন শাড়ি আর ধবধবে চাদরে কাফন করা হল, হাবিব মিয়ার বড়ো আদরের লালবিবি ঘুমিয়ে রইল মাটির তলায়।

দূরে দাঁড়িয়ে হিন্দুরা বিমর্ষ মুখে এই শোকানুষ্ঠান দেখতে লাগল। মনে হল হাবিব মিয়ার শোকে তারাও অভিভূত হয়ে পড়েছে। তাদের গলায় একটি বারও কালীমায়ের জয়ধ্বনি শুনতে পাওয়া গেল না। হাজার হোক, ফুড কমিটির সেক্রেটারি হাবিব মিয়াকে চটানো চলে না।

কেলেঙ্কারিটা হল সেই রাত্রেই।

কে একজন বেশি রাত্রে বেরিয়েছিল ছাগল খুঁজতে। সে এসে চুপি চুপি খবর দিলে হাবিব মিয়াকে। বাঁধের ওপর থেকে দশমীর চাঁদের মেটে মেটে আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, কারা যেন আল্লাতলিতে কবর খুঁড়ছে লালবিবির।

জিন? না, জিন নয়। নিশ্চয় মানুষ। জ্যোৎস্নায় তাদের ছায়া দেখতে পাওয়া গেছে, জিন হলে ছায়া পড়ত না।

এক হাতে দোনলা বন্দুক আর এক হাতে টর্চ নিলেন হাবিব মিয়া। ডেকে নিলেন দলবলকে। আমবাগানের ভেতর দিয়ে সতর্ক পায়ে এগিয়ে চলল দলটা।

সংবাদটা নির্ভুল। দুজন লোক। একজন শাবল মারছে আর একজন মাটি তুলছে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার–কাফনের কাপড় চুরি করবে।

ধর, ধর শালাদের।

লোক দুটো পালাতে চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। কবরখানার উঁচু-নীচু মাটির ঢিবি আর গর্তে পা পড়ে দুজনেই ধরা পড়ে গেল। তখন দশমীর চাঁদের মেটে মেটে আলোটা এক টুকরো মেঘে ঢাকা পড়েছে, কাফন-চোরদের চিনতে পারা গেল না।

কোন শালা হারামির বাচ্চা মুর্দাকে বেপর্দা করতে চায়?

জোরালো টর্চের আলো ফেললেন হাবিব মিয়া।

শুধু লোক দুটো নয়, দলসুদ্ধ সবাই পাথর হয়ে গেছে। টর্চটা খসে গেল হাবিব মিয়ার হাত থেকে। একজন সাচ্চা মুসলমানের বেটা ধলা মন্তাই, আর একজন বামুনঠাকুর জগন্নাথ মুসলমানের মুর্দা ছুঁলে যাকে গঙ্গাস্নান করতে হয়। ধলা মাইয়ের হাতে শাবল, জগন্নাথের কনুই পর্যন্ত গোরের মাটি।

কয়েক মুহূর্ত পরে নিজেকে সামলে নিলেন হাবিব মিয়া। বিকৃত বিকট গলায় হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন, মার মার, মেরে শালাদের তক্তা করে দে। দু-শালাই কাফের, ইবলিশের বাচ্চা!

কিন্তু লোকগুলো সব যেন পাথর হয়ে গেছে। মারবার জন্যে কারও হাত উঠল না, এমনকী আঙুলগুলো এতটুকু নড়ল না পর্যন্ত। শুধু সকলের বিস্মিত বিমূঢ় মনে একটা প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে—ফকির আর কালীর ভেতরে এত সহজে মিটমাট হয়ে গেল কেমন করে?

উত্তমপুরুষ

সামনে আরও পুরো দু-ক্রোশ রাস্তা।

মানিক সর্দারের পা আর চলতে চাইছিল না। ক্রমাগত মনে হচ্ছিল পেছন থেকে কে একটা শক্ত চাপ দিয়ে তার মেরুদন্ডটাকে বাঁকিয়ে দিতে চাইছে ধনুকের মতো হাঁটুর তলা থেকে পা দুটো আলগা হয়ে খসে পড়তে চাইছে। তৃষ্ণায় একরাশ কাঁকর খরখর করছে গলার ভেতরে।

পেছনে আসছে পনেরো বছরের ছেলে বলাই। তার দিক থেকে খুশির অন্ত নেই। জীবনে এই প্রথম সে বাপের সঙ্গে কুসুমডাঙার হাটে এসেছে। এই ছ-মাইল পথে অনেকখানি আকাশ, শাল-পলাশের বন, সীমান্তরেখায় একটা বিশাল বন্য মহিষের মত শুশুনিয়া পাহাড়, সব তার কাছে নতুন—আর এক পৃথিবীর সংবাদ।

পথে আসতে আসতে একটা গাছ থেকে কয়েক ছড়া পাকা তেঁতুল সংগ্রহ করেছিল বলাই। হাটের সওদা থেকে খানিকটা নুন বের করে নিয়ে তাই দিয়ে মনের খুশিতে সে তেঁতুল খাচ্ছিল আর বিচিগুলো দিয়ে কখনো একটা গিরগিটি, কখনো-বা একটা শালিক পাখিকে তাক করবার চেষ্টা করছিল।

হাতের বল্লমটার ওপর ভর দিয়ে মানিক সর্দার দাঁড়িয়ে পড়ল।

কী হল বাবা?

একটু জল খাব। তেষ্টায় বুকটা যেন পাথর হয়ে গেছে।

নদী পাশেই। কচ্ছপের পিঠের মতো বড়ো বড়ো পাথর চারদিকে ছড়ানো আর মোটা মোটা দানার একরাশ বালি কোনো পদ্মগোখরোর খোলসের মতো আঁকাবাঁকা ভঙ্গিতে অন্তহীন মাঠের মধ্যে এলিয়ে রয়েছে। ওই বালির রেখাটাই নদী। কিন্তু এক বিন্দু জল কোথাও নেই, শুকিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

বিকেলের সোনাঝুরি আলোয় নদীটার দিকে একবার তাকিয়ে দেখল মানিক সর্দার। মাঝখানটায় খানিক জায়গা যেন ভিজে ভিজে মনে হচ্ছে, খুঁড়লে হয়তো জল পাওয়া যাবে।

বলাই এদিক-ওদিক তাকাল।

জল কই বাবা?

পাওয়া যাবে বোধ হয় ওখানে। আয় খুঁজে দেখি।

দুজনে নদীর ভেতরে নেমে এল। হ্যাঁ, জল এখনও আছে। পায়ের চাপে চাপে ভিজে বালি থেকে জল বেরিয়ে আসতে লাগল। বল্লমের দরকার হল না, হাত দিয়ে খানিক খুঁড়তেই বালি-মেশানো জলে ভরে উঠল গর্তটা।

বালি খানিক থিতিয়ে এলে আঁজলা আঁজলা করে খানিকটা জল খেল মানিক। বাপের দেখাদেখি বলাইও খেল।

বড়ো দেখে একটা পাথরের ওপর বসে পড়ে মানিক বললে, পা আর চলছে না, একটুখানি জিরিয়ে যাই।

বিকেলের সোনাঝুরি রোদে ঝিকমিক ঝিলমিল করছিল চারদিক। হাওয়াটা এখনও সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা হয়নি—নিভে আসা হাপরের বাতাসের মতো গরম। ওপরে সারবাঁধা কয়েকটা পলাশ গাছ, কালো কালো কুঁড়ি ধরেছে তাতে; দিন কয়েক বাদেই ফুলের আগুন জ্বলবে। একটা পাপিয়া ডাকছে কোথাও। বসন্ত আসছে।

কিন্তু বসন্তের রং কোথাও নেই মানিক সর্দারের মনে। ওই বিশাল বন্য মহিষের মতো শুশুনিয়া পাহাড়ের কালো ছায়াটা ভাসছে চোখের সামনে। আধি চাষের ধান ফুরিয়ে গেছে, আজ কুসুমডাঙার হাটে একটা বলদ বেচে দিয়ে আসতে হল। বাকিটাও বেশিদিন থাকবে না, নতুন ফসল এখনও অনেক দূরে। তারপরে উপোস। তারও পরে…

মানিক সর্দার বসে রইল ভিজে বালির দিকে তাকিয়ে। খোঁড়া গর্তটা বুজে আসছে একটু একটু করে। আরও এক মাস কিংবা দু-মাস বড়োজোর, তারপরেই এ জল পালিয়ে যাবে পাতালে। কোদাল দিয়ে সাত হাত কোপালেও এক আঁজলা পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ, শুধু মুঠো মুঠো নুড়ি আর কাঁকর উঠে আসবে।

একটা বলদ গেল। পরেরটাও যাবে। তারপরে নুড়ি আর কাঁকড়।

এবারে আর আশা নেই। কিছুই করবার উপায় নেই। না, একটা উপায় এখনও আছে। গত বছরে খাদেম আলি মোল্লা যা করেছিল তাই। তারও হালের বলদ ছিল না কিন্তু বলদের দড়িটা ছিল। গোয়ালঘরের আড়ায় সেই দড়ি বেঁধে নিজের গলায় দিয়ে ঝুলে পড়েছিল।

পায়ের নীচের দিকটা খসে পড়ে যাচ্ছে হাঁটু থেকে, পেছন থেকে কে যেন সমানে চাপ দিচ্ছে কাঁধের ওপর; যেন যেমন করে হোক তার মেরুদন্ডটাকে মটকে ভেঙে ফেলবে।

তৃষ্ণায় আবার জ্বালা করে উঠছে গলার ভেতর। কিন্তু নতুন করে উঠে গিয়ে আবার খানিকটা জল খাওয়ার মতো শক্তি কিংবা উদ্যম কিছুই খুঁজে পেল না মানিক সর্দার।

ঘোলা ঘোলা চোখে চেয়ে দেখল, চঞ্চল বলাই একটু দূরেই একটা লাটাবনে গিয়ে লাটা কুড়োচ্ছে—বোধ হয় কুঁচেরও সন্ধান পেয়েছে ওখানে। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, গত বছর এমনি কোনো একটা জায়গাতেই একটা শঙ্খচূড় সাপ দেখেছিল সে। বসন্তের হাওয়া দিয়েছে এখন, এই হাওয়াতেই সাপেরা শীতের ঘুম থেকে জেগে ওঠে, খিদেয় রুক্ষ হয়ে থাকে মেজাজ-অকারণে আক্রমণ করতে চায়। এক বার মনে হল বলাইকে সে ডাক দেয়, কিন্তু গলা থেকে স্বর বেরুতে চাইল না।

লড়তে পারত মানিক সর্দার, এ অবস্থাতে লড়তে পারত। চাষের সময় না আসা পর্যন্ত মজুর খাটতে গ্রামে গ্রামে ঘুরে, নাহয় আট মাইল দূরের স্টেশনে গিয়ে কুলিগিরি করেও কয়েকটা পেট চালিয়ে নিত। কিন্তু গত বছর সেই যে সান্নিপাতিক জ্বর গেল, তা থেকে কোনোমতে বেঁচে উঠলেও শরীরে আর কোনো বস্তু রেখে যায়নি। কীভাবে এ বছরে চাষ করেছে তা কেবল ভগবানই জানেন আর সে জানে।

তবু তখন কিছু চাল দিয়েছিল মহাজন, পেট তখন ভরা থাকত। কিন্তু এখন? আধপেটা— না খেয়ে?

শুধু যদি আর একটু দাঁড়াতে পারত বলাই। আরও একটু বড়ো হত। আর খানিকটা চওড়া-চিতেন হত বুক, জোর থাকত হাতে। যদি আর একটু বুঝতে পারত যে, আগ বাড়িয়ে দুনিয়ার টুটি চেপে ধরতে না পারলে দুনিয়াই মানুষের গলা টিপে ধরে।

কিন্তু পনেরো বছর বয়সেও ছেলেটা একেবারে ছেলেমানুষ। মাইতিদের বাড়িতে কলের গান শুনেছে, সেই গান গুনগুন করে রাতদিন। একটা কাজ করতে বললে সাত বার ভুলে যায়, এখনও বনে-বাদাড়ে কুড়িয়ে বেড়ায় নীলকণ্ঠ পাখির পালক, এখনও কোঁচড় ভরে নিয়ে আসে লাটা আর কুঁচফল। বলাই এখনও লড়তে শিখল না।

পলাশ গাছের ওপর সোনাঝুরি রোদ লাল হয়ে এল। নদীর মাঝখানে গর্তটা একেবারে বুজে গেছে। একটুখানি বালিজল তিরতির করছে সেখানে। গরম হাওয়ায় কোত্থেকে একটা শুকনো পাতা উড়ে এসে মানিক সর্দারের গায়ে পড়ল, মনে হল কার একটা খরখরে কর্কশ হাতের ছোঁয়া এসে লেগেছে। চমকে উঠল মানিক সর্দার, বল্লমে ভর করে উঠে দাঁড়াল।

বলাই!

আসছি বাবা।

বলাই ফিরে এল। শুধু লাটা নয়, গিলেও পেয়েছে গোটা কয়েক।

চল বাপ, দু-কোশ রাস্তা আছে এখনও।

দু-ক্রোশ রাস্তা লাঠি নিয়ে তিন লাফে পেরিয়ে যেত একসময়। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে। গোটা শুশুনিয়া পাহাড়টাই যেন ডিঙিয়ে যেতে হবে তাকে। বুকে হাত চেপে কখন যে পথের মাঝখানে বসে পড়বে সেকথা সে নিজেই জানে না।

তার ওপর সামনে জঙ্গলটা আছে। জায়গা ভালো নয়। চোর-ডাকাতের ভয় মানিক সর্দারের নেই, তার কাছে তারা আসবে না। কিন্তু ওই জঙ্গলে প্রায়ই বুনো জানোয়ার বেরোয়। ভালুক আসে, লক্কড় ঘোরে, দু-একটা বাঘেরও খবর মেলে। লোকের মুখে শুনেছিল, কাছাকাছি কোথায় একটা চিতা নাকি মানুষখেকো হয়ে উঠেছে।

সেইজন্যেই বল্লমটা আনা। কিন্তু কতখানি কাজে লাগবে! পিঠের ওপরে সেই প্রকান্ড একটা নিষ্ঠুর চাপ, হাঁটু দুটো নড়বড় করছে ক্রমাগত। এই বল্লম নিয়ে কী করবে মানিক সর্দার? বাঘ যদি সত্যিই আসে, সে কি এ দিয়ে ঠেকাতে পারবে তাকে?

কোঁচরের ভেতরে লাটা আর গিলেগুলোকে ঝমঝম করতে করতে বলাই আসছিল। হঠাৎ তীক্ষ্ণ মিষ্টি গলায় কলের গান থেকে শেখা গুনগুনানিকে সে হাওয়ায় ছড়িয়ে দিলে।

বিরক্ত হয়ে একটা ধমক দিতে গিয়েও থমকে গেল মানিক সর্দার। বেশ তো গায় ছেলেটা —সুন্দর সুরেলা গলা। একেবারে নিখুঁতভাবে তুলেছে কলের গান থেকে। যদি পৃথিবীটা এমন কঠিন জায়গা না হত—যদি বাঁচবার জন্যে এমন করে ফোঁটায় ফোঁটায় বুকের রক্ত শুকিয়ে না যেত, তাহলে…

ও বন্ধু রে–
সোনার খাটে বসো তুমি রুপার
খাটে পাও—

সোনার খাট–রুপোর খাট। আর এক বার গানটাকে থামিয়ে দিতে চাইল মানিক সর্দার, কিন্তু পারল না। একটু একটু করে সন্ধে নেমে-আসা মাঠের ওপর দিয়ে বলাইয়ের গান দূরান্তে ছড়িয়ে যেতে লাগল, আর হাতের বল্লমটার ওপর ভর দিয়ে কুঁজো হয়ে চলতে লাগল মানিক সর্দার।

এখনও দু-ক্রোশ পথ পড়ে আছে সামনে। শুশুনিয়া পাহাড় ডিঙোনোর চাইতেও দুর্গম।

পুরোনো পেতলের মতো জ্যোৎস্নার রং। দু-পাশের গাছের পাতার ছায়া তার ভেতরে কলঙ্কের দাগের মতো কাঁপছে। হাওয়ায় হাওয়ায় কিশলয়ের গন্ধ। ভারি সুন্দর লাগছে জঙ্গলটাকে।

কিন্তু জঙ্গলের এই রূপ, কিশলয়ের সেই গন্ধকে ছাপিয়ে আর একটা গন্ধে হঠাৎ চকিত হয়ে উঠল মানিক সর্দার। সে-গন্ধ তার অচেনা নয়। এমনি বনের পথ দিয়ে যেতে যেতে কখনো কখনো এইরকম গন্ধের উৎকট উচ্ছ্বাস ভেসে এসেছে, আর…

শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মানিক সর্দার। এক হাতে তুলে ধরলে বল্লম, আর এক হাতে খপ করে চেপে ধরলে বলাইয়ের কাঁধটা।

কী হল বাবা?

চুপ! বাঘ!

বাঘ! এক বার শিউরে উঠেই পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বলাই। শিরশিরে হাওয়াটাও যেন আতঙ্কে নিশ্ৰুপ হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। পুরোনো পেতলের মতো জ্যোৎস্নাটা ছায়ার কলঙ্ক মেখে কাঁপতে লাগল অল্প অল্প। মহুয়ার একটা ডাল এগিয়ে এসেছিল ওদের মাথার উপর, মনে হল মৃত্যুর কতকগুলো ধারালো নখ যেন ছোঁ মারবার জন্যে উদ্যত হয়ে রয়েছে।

কয়েক মুহূর্ত কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না কোথাও। থেকে থেকে ঝিঝি ডাকছিল এতক্ষণ, সেটাও থমকে গেছে আপাতত। শরীরের শিরাগুলোকে টানটান করে মানিক সর্দার

অপেক্ষা করতে লাগল।

বাবা চলো, আমরা দৌড়ে পালিয়ে যাই। শুকনো স্তিমিত গলা শোনা গেল বলাইয়ের।

পালাতে গেলেই পেছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়বে ঘাড়ের ওপর। তখন আর কিছু করা যাবে না।

আরও কিছুক্ষণ প্রতীক্ষায় কাটল। তারপর সতর্ক পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল ডান দিকের ঝোপের ভেতরে। বাঘও সুযোগের অপেক্ষা করছে। মানিকের হাতের বল্লমটা দেখেছে কি না কে জানে, কিন্তু হঠাৎ আক্রমণ করবার মতো সাহস পাচ্ছে না।

বলাইকে এক হাতে টেনে পিঠের দিকে সরিয়ে দিলে মানিক সর্দার। দুর্বল ক্লান্ত শরীরে কোথা থেকে একটা ভয়ংকর হিংস্র শক্তির জোয়ার এসেছে। বল্লম ধরা হাতের পেশি থরথর করে কাঁপছে, চোখ দুটো জ্বলে উঠছে দপ দপ করে। আবার বাতাস বইল, কিন্তু কিশলয়ের গন্ধ পাওয়া গেল না—ভেসে এল বাঘের গন্ধের বীভৎস ঝলক।

প্রায় পাঁচ-সাত মিনিট প্রতীক্ষার পরে ডান দিকের ঝোপের ওপর সতর্ক চোখ রেখে একটু একটু করে এগোতে লাগল মানিক। এক হাতে বলাইকে টানতে লাগল পেছন পেছন। বাঘ যদি লাফিয়ে পড়ে তাহলে সোজা তাকে পড়তে হবে এই বল্লমের ওপরে। যদি দুটো-একটা থাবার আঁচড় লাগে, তাহলে সেটা তার ওপর দিয়েই যাবে, বলাইকে ছুঁতেও পারবে না।

একটু একটু করে দুজনে এগোতে লাগল। মানিকের চোখ আর বল্লম স্থির হয়ে রইল জঙ্গলের দিকে। বাঘই ভুল করেছে। গাছের ওপর থেকে যদি লাফ দিয়ে পড়ত, তাহলে কিছু আর করবার ছিল না। কিন্তু ডান দিকে এখন শুধুই ঝোপ, একটা গাছও নেই। আর গাছ থাকলেও আগে থেকেই সতর্ক হয়ে যাবে মানিক সর্দার।

ওরা আস্তে আস্তে এগোতে লাগল, আর তার সঙ্গে ঝোপের মধ্যেও চলল সতর্ক পদচারণা। পাতায় খস খস শব্দে বোঝা যাচ্ছিল বাঘও এগিয়ে যাচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে।

অসীম হিংস্রতায় দাঁতে দাঁত চাপল মানিক সর্দার। এক বার একটুখানি দেখতে পেলে হয়। বাঘকে কিছু করতে হবে না, তার বল্লম বিঁধিয়ে দেবে বাঘের পাঁজরায়। কিন্তু বাঘও চিনে নিয়েছে তার সশস্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বীকে। সুযোগ সেও দেবে না। আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে এমনিভাবেই চলতে থাকবে সঙ্গে সঙ্গে। তারপর যে মুহূর্তে দেখবে শত্ৰু এতটুকু অসতর্ক হয়েছে—তৎক্ষণাৎ লাফিয়ে পড়বে তার ওপরে।

প্রায় দশ মিনিট ধরে এইভাবে চলল সুযোগের অপেক্ষা। অসহ্য মানসিক পীড়নে মাথার শিরাগুলো প্রায় ছিঁড়ে যাচ্ছে মানিক সর্দারের। সামনে প্রায় আরও দু-শো গজ জঙ্গল। এতটুকু পেরোতে পারলেই ফাঁকা মাঠ। এক বার মাঠে গিয়ে পৌঁছাতে পারলে বাঘ আর তার সামনে আসতে পারবে না। শুধু একটি বাঘ কেন, তখন সারা দুনিয়ার সমস্ত বুনো জানোয়ারের সঙ্গেই লড়বার জন্যে তৈরি হয়ে আছে মানিক সর্দার।

বাতাসটা আবার বন্ধ হয়ে গেছে। বাঘের সাড়া পেয়েই ঝিঝিরাও ডাক থামিয়েছে হয়তো। শুধু বাঘের পায়ের খসখসানি ছাড়া আর এতটুকু শব্দ নেই কোথাও, যেন সমস্ত জঙ্গলটা নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করে আছে। মানুষ আর জানোয়ারের এই যুদ্ধের ফলাফলটা তারা দেখতে চায়।

বাবা! বলাইয়ের মুমূর্ষ গলার আওয়াজ পাওয়া গেল।

চাপা গর্জনে মানিক সর্দার বললে, চুপ।

পুরোনো পেতলের মতো জ্যোৎস্নার ওপর গাছের কলঙ্ক কাঁপছে। শুধু ঝোপের ভেতরে একটা মাত্র বাঘই না, যেন সমস্ত জঙ্গলটার ওপরেই কে একটা বিশাল চিতা বাঘের চামড়া বিছিয়ে রেখেছে। দু-দিন পরে এখানে মহুয়া পাকবে, পলাশের রঙে লালে লাল হয়ে যাবে সব। দুপুরের ঝিমঝিম বরাদে এখান থেকে চলতে চলতে নেশা ধরে যাবে। কিন্তু এই মুহূর্তে এই জঙ্গলে রূপ নেই, বর্ণ নেই, গন্ধ নেই, কিছুই নেই। শুধু এক-একটা উৎকট গন্ধের ঝলকে মৃত্যু তার বীভৎস অস্তিত্বকে ঘোষণা করছে। শুধু ঝোপের ভেতরে ক্ষুধিত বাঘের চোখ নিষ্ঠুর আদিমতায় ধক ধক দপ দপ করে উঠছে।

এ প্রতীক্ষা অসহ্য। মানিক সর্দারের মাথার শিরা ছিঁড়ে যেতে লাগল। যাহোক কিছু হয়ে যাক, এই মুহূর্তেই হয়ে যাক। এক বারের জন্যে একটুখানি বেরিয়ে আসুক বাঘ। যদি সাহস থাকে মরদের মতো মুখোমুখি দাঁড়াক। তারপর প্রমাণ হয়ে যাক তার বল্লমের ধার বেশি না বাঘের দাঁতের জোর।

বাবা, আমার ভয় করছে। বলাইয়ের ফোঁপানি শোনা গেল।

মানিক সর্দারের ব্রহ্মর জ্বলে গেল দপ করে। পনেরো বছর বয়েস হল কিন্তু এখনও মানুষ হল না ছেলেটা। আজ পঞ্চাশ বছর বয়েস, অসুস্থ জীর্ণ শরীর নিয়ে যখন সে বনের সবচাইতে হিংস্র শত্রুর সামনে রুখে দাঁড়িয়েছে—তখন তার পিঠের আশ্রয়ে থেকেও একটা ছোটো মেয়ের মতো ভ্যানভ্যান করছে বলাই। মানিকের ইচ্ছে করতে লাগল একটা প্রচন্ড চড় বসিয়ে দেয় বলাইয়ের গালের ওপর।

চুপ কর, চুপ কর মেয়েমানুষ কোথাকার। তীব্র চাপা গর্জন করে উঠল মানিক।

আবার সেই বাঘকে মুখোমুখি রেখে এগিয়ে চলা। আবার সেই স্নায়ুছেঁড়া প্রতীক্ষার পালা। ঝোপের ভেতরে বাঘের সতর্ক পদসঞ্চার। দুশো গজ জঙ্গল পার হয়ে যেতে এখনও অনেক সময় লাগবে।

একটা কান্ড হল ঠিক এই সময়।

ঝোপের মধ্যেই কোথাও বাসা করে ডিম নিয়ে বসেছিল বনমুরগি। খুবসম্ভব বাঘের পা পড়ল তার বাসায়। তৎক্ষণাৎ ক্যাঁ-ক্যাঁ করে একটা উৎকট চিৎকার তুলে সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল বনমুরগি। ঝটপট করে উড়ে গেল মানিক সর্দারের মাথায় পাখার ঝাপটা দিয়ে।

অদ্ভুত ভয়ে আর্তনাদ করে উঠল বলাই, চমকে উঠল মানিক সর্দার। ধনুকের ছিলের মতো টান-করা স্নায়ুর অতি সতর্ক পাহারা বিভ্রান্ত হয়ে গেল মাত্র কয়েক পলকের জন্যে। বাঘ সে সুযোগ ছাড়ল না, তীব্র হুংকার করে স্তব্ধ ভয়ার্ত জঙ্গলকে থরোথরো কাঁপিয়ে সোজা লাফিয়ে পড়ল মানিকের ওপর।

কিন্তু এই বিপর্যয়ের জন্য বাঘও লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। ঠিক গায়ে পড়ল না, পড়ল পাশে। বলাইয়ের আর্ত কান্নায় আর এক বার আঁতকে উঠল জঙ্গল। আর মানিকের হাতের বল্লম বাঘের বুক ফসকে ডান কাঁধের ওপর গিয়ে বিঁধল।

আহত যন্ত্রণায় গোঙানি তুলে বাঘ লাফ মারল উলটো দিকে। বুঝল তারও হিসেবে ভুল হয়ে গেছে। সাধারণ শত্রুর সামনে সে পড়েনি, এখানে শিকার করার চাইতে শিকার হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেশি। তারপরে যন্ত্রণায় গর্জন করতে করতে ল্যাজ গুটিয়ে ছুটে পালাল। বহুদূর পর্যন্ত শোনা যেতে লাগল তার গর্জন আর আওয়াজ। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল মানিক সর্দার। তারপর বল্লমের ফলাটা ঘুরিয়ে আনল চোখের সামনে। বাঘের কিছু রোঁয়া আর রক্ত তখনও লেগে আছে তাতে। বাঁ-হাত দিয়ে কপালের ফোঁটা ফোঁটা ঘামগুলোকে মাটিতে ঝরিয়ে দিয়ে বললে, শালা!

আহত হয়ে বাঘ পালিয়েছে। টের পেয়েছে বল্লমের স্বাদ। বুঝেছে পৃথিবীর সব জিনিসই তার খাওয়ার জন্যে তৈরি হয়নি। এর পরে মানুষের কাছে এগিয়ে আসবার আগে সে ভালো করে ভেবে নেবে।

শালা!

জঙ্গলে আবার তীব্র ঝিঝির ডাক উঠেছে। গাছের ডালে ঘুমন্ত পাখিরা জেগে উঠে ভয়ে কিচিরমিচির করছে। মানিক সর্দারের মনে হল, শতকণ্ঠে অরণ্য যেন জয়ধ্বনি তুলছে তার।

এতক্ষণে বলাইয়ের কথা খেয়াল হল। বলাই বসে আছে মাটির ওপর। গলা দিয়ে ঘরঘর করে আওয়াজ বেরুচ্ছে। যেন বোবায় ধরেছে।

ছেলের কাঁধ ধরে প্রাণপণে খানিক ঝাঁকানি দিলে মানিক।

অ্যাঁ!

মানিক সর্দারের ছেলে না তুই?

বলাই বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রইল, জবাব দিলে না।

মায়ের দুধ খেয়েছিস না ছাগলের দুধ? বলাই তেমনি বিহ্বল চোখ মেলে তাকিয়ে রইল।

পিঠে মেরুদন্ড নেই, এতটুকু সাহস নেই! হতচ্ছাড়া মেয়েমানুষের অধম! কেমন করে বেঁচে থাকবি দুনিয়ায়? কী করে লড়বি চারদিকের এতসব বুনো জন্তুর সঙ্গে?

বলাই চুপ।

এবার মানিক সর্দারের একটা প্রচন্ড চড় বলাইয়ের গালে এসে পড়ল।

ওঠ হারামজাদা, ওঠ। এমন করে ব্যাঙের মতো বসে থাকলে চলবে না, পা চালিয়ে চল। এখানে শুধু যে একটা বাঘই আছে সেকথা বলা যায় না। বার বার বুড়ো বাপ তোকে বাঁচাতে পারবে না।

বাজারের সওদায় ভরা ছোটো থলেটা ছিটকে পড়েছিল, কাঁপা-হাতে সেটা কুড়িয়ে নিলে বলাই। তারপর কুকুরছানার মতো মাথা গুঁজে মানিক সর্দারের পাশে পাশে চলতে লাগল।

এতক্ষণে যেন মানিকের শরীরের সেই ক্লান্তি সেই অবসাদটা আবার এসে নতুন করে ভেঙে পড়েছে। পিঠের ওপরে সেই অসহ্য চাপ তার মেরুদন্ডটাকে মটকে দুখানা করে দিতে চাইছে। পা দুটো খুলে পড়বার উপক্রম করছে হাঁটুর তলা থেকে। যে-হাতে এতক্ষণ বল্লমটাকে উদ্যত করে রেখেছিল সে-হাতটা অদ্ভুতরকম ঢিলা হয়ে গেছে—যেন তাল পাতার পুতুলের হাতের মতো সরু সুতোয় ঝুলছে কাঁধের সঙ্গে।

বাঘ পালিয়েছে, কিন্তু জীবন?

একটা বলদ বিক্রি হয়েছে গেছে, আর একটাও যাবে। নতুন ধান এখনও অনেক দূর, ততদূর পর্যন্ত ঝাপসা চোখের দৃষ্টি চলে। কিছুদিন পরেই আসবে উপোস, বনের কচুকন্দ খেয়ে হয়তো আর এক মাস বেঁচে থাকা চলবে, কিন্তু তারপর?

উপায় নেই, কোনো উপায় নেই।

অথবা একটা উপায় আছে, যা করেছিল খাদেম আলি মোল্লা।

বলদ না থাক বলদের মোটা দড়িগাছটা ছিল, আর ছিল শূন্য গোয়ালঘরের বাঁশের আড়া —যেখান থেকে ঝুলে পড়তে খুব বেশি সময় লাগে না।

কিন্তু শরীরে যদি একটু শক্তি থাকত, যদি গত বছরের সান্নিপাতিক জ্বরটা তাকে এমনভাবে ফোঁপরা করে রেখে না যেত, তাহলে কি এত সহজে হার মানত সে? দিনমজুরি করতে পারত, যেতে পারত রেলের ইস্টেশনে। পশ্চিমি কুলিরা মোট বয়ে বেঁচে থাকে আর সে পারত না?

কিংবা তারও দরকার ছিল না, ছেলেটা যদি মানুষ হত! অপদার্থ মেয়েমানুষ! পান্ডুর জ্যোৎস্নায় ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে শব্দ করে মাটিতে থুতু ফেলল মানিক সর্দার।

আর তক্ষুনি বাঘের গর্জনে আবার সমস্ত জঙ্গল কেঁপে উঠল। চোট-পাওয়া চিতা যে অত সহজেই পালায় না-জেনে-শুনেও সেকথা ভুলে গিয়েছিল মানিক সর্দার। খানিক দূরে গিয়েই বাঘ আবার নিঃশব্দে ফিরে এসেছে চোরের মতো, তারপর প্রতিশোধ নেবার জন্যে নির্ঘাত লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছে মানিকের ওপর।

হাত থেকে ছুটে গেল বল্লম। চিত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল মানিক। শুধু অসাড় আড়ষ্ট চোখ মেলে দেখতে লাগল একসার ধারালো দাঁত তার গলাটা ছিঁড়ে ফেলবার জন্যে নেমে আসছে ধীরে ধীরে। বিষাক্ত দুর্গন্ধ নিশ্বাসে সমস্ত মুখ জ্বলে যাচ্ছে তার। পায়ের ওপর সাপের মতো বাঘের ল্যাজ আছড়ে পড়ছে।

বলাই! অন্তিম প্রার্থনার মতো শুধু মনে হল, বলাই বাঁচবে তো? কিন্তু গলাটাকে ছিঁড়ে ফেলবার আগেই আর এক বার বাঘ আর্তনাদ করল। লাফিয়ে উলটে পড়ল মানিকের বুকের ওপর থেকে। তারপর অসহ্য যন্ত্রণায় গড়াগড়ি খেতে লাগল মাটিতে।

এবার বলাই। এতক্ষণ মানিক তাকে সুযোগ দেয়নি, আড়াল করেই রেখেছিল। সেই আড়াল সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বলাই জেগে উঠেছে। একটা পাথরের চাপে খুলে গিয়ে মুক্তি পেয়েছে তার পৌরুষ, তার পনেরো বছরের প্রথম পৌরুষ।

বল্লম এবার আর কাঁধে গিয়ে লাগেনি, পাঁজরার ভেতর দিয়ে সোজা বাঘের হৎপিন্ড ভেদ করেছে। পঞ্চাশ বছরের মানিক সর্দারের হাত কেঁপেছিল, পনেরো বছরের বলাইয়ের হাত কাঁপেনি।

শেষ মুহূর্তের নিরুপায় যন্ত্রণায় বাঘ ছটফট করতে লাগল। বল্লমের ফলায় উছলে উঠতে লাগল রক্ত-গর্জনের পর গর্জনে জঙ্গল বিদীর্ণ হয়ে যেতে লাগল।

বাবা! বাবা! বলাইয়ের কান্না শোনা গেল। মাটিতে হাতের ভর রেখে উঠে বসল মানিক সর্দার, তারপর দাঁড়িয়ে গেল টলতে টলতে।

তোমার গা দিয়ে যে রক্ত পড়ছে বাবা! আরও শব্দ করে কেঁদে উঠল বলাই।

দু-হাত বাড়িয়ে ছেলেকে বুকে টেনে নিলে মানিক সর্দার। তারপর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললে, ভয় নেই—কোনো ভয় নেই। আমার জন্যেও নয়—তোর জন্যেও না।

উন্মেষ

বড়ো রাস্তার মোড়ের কাছে একটা শোরগোল উঠল। দু-চার জন পথে নেমে এল, কিছু লোক সার দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল দু-ধারে—যেমন করে দাঁড়ায় প্রসেশন যাওয়ার সময়। যারা নামল না, তারা বকের মতো গলা বাড়িয়ে দিলে বারান্দা থেকে।

ব্যাপার আর কিছু নয় নৃপেন রায় আসছেন।

কে এই নৃপেন রায়? দেশনেতা নন, রাজা মহারাজা নন, সিনেমার অভিনেতাও নন। কোনো আশ্রমে-টাশ্রমে মোটা টাকাও দান করে বসেননি। তবু তাঁর সম্পর্কে লোকের সীমাহীন কৌতূহল।

কেন যে কৌতূহল, তার জবাব পাওয়া গেল যখন তিনি বাঁক ঘুরে সামনে এসে পোঁছালেন।

ছ-হাতের মতো লম্বা। মাথায় একরাশ কোঁকড়ানো বাবরি চুল—সম্প্রতি বিপর্যস্ত। লম্বাটে মুখের কৌণিক হাড়গুলোতে অনেক ডাম্বেল-কষা মুগুর ভাঁজার কাঠিন্য। ঢালের মতো চওড়া বুক, আজানুলম্বিত পেশল হাত দুখানিকে মহাবাহু ছাড়া আর কোনো সংজ্ঞা দেওয়া যায় না। পদ্মপলাশ বিস্তৃত চোখ এবং সে-চোখ পলাশ ফুলের মতোই আরক্তিম।

পরনে ব্রিচেস, কাঁধে ঝোলানো দু-দুটো বন্দুক, ভয়ংকর মানুষটাকে তা আরও বীভৎস করে তুলেছে। কিন্তু তিনি একা নন, তাঁর সঙ্গে একটা মেয়েও আছে—তাঁরই মেয়ে। তার আকর্ষণও কম নয়।

বছর বারোর মেয়ে। ববছাঁটা ধূলিরুক্ষ চুল। খাকিরঙা সালোয়ারের ওপর একটি খাকি শার্ট পরা। মেয়েটির গলায় টোটার মালা। শুধু টোটা নয়, আর এক ছড়া মালাও আছে। তাতে ঝুলছে রক্তমাখা গোটা পাঁচেক স্নাইপ এবং এক জোড়া চায়না ডাক। মেয়েটির জামার এখানে-ওখানে সে-রক্তের ছোপ লেগেছে—যেন ভৈরবীর মূর্তি।

সব মিলিয়ে দৃশ্যটাকে ভয়ানক বললেও কম বলা হয়। পৈশাচিক।

ভিড়ের মধ্য থেকে কে একজন মন্তব্য ছুড়ে দিলে একটা।

দেখেছ কান্ড! মেয়েটাকেসুদ্ধ কী বানিয়ে তুলছে।

আর একজন বললে, লোকটা একেবারে অমানুষ!

যা বলেছ। কেউ সরস করে ব্যাখ্যা করে দিলে—জিনিসটা মানুষ নিশ্চয় নয়, রাক্ষস।

বাপ-মেয়ে কথাগুলো কেউ শুনতে পেলেন কি না বোঝা গেল না। শুনলেও ভ্রূক্ষেপ করলেন না নৃপেন রায়। জীবনে করেনওনি কোনোদিন।

মাথার ওপর উঠে আসা দুপুরের সূর্যের কড়া রোদে দুজনে সোজা চলে গেলেন। দুজনেই বুটপরা, শুধু বহুদূর থেকেও সেই দু-জোড়া বুটের অস্পষ্ট হয়ে আসা মচমচানি শোনা যেতে লাগল।

শহরের একটেরেয় নৃপেন রায়ের বাড়ি। সামনে একখানা মাঝারি ধরনের বাগান। তাতে একটি গন্ধরাজ, একটি ম্যাগনোলিয়া এবং দুটি শিউলি। একপাশে বহু পুরোনো একটি আম গাছ, তাতে আজকাল আর ফল ধরে না। বসন্তের হাওয়ায় কয়েকটি শীর্ণ মুকুল দেখা দিয়েই ঝরে যায় বিবর্ণ জীর্ণতায়। একদিকে বেশ পুরু একটি কেয়াঝোপ। বাড়ির গায়ে কেয়াবন কোনো গৃহস্থের ভালো লাগার কথা নয়, বর্ষায় ফুল ফুটলে তার পাগল-করা-গন্ধে নাকি আনাগোনা শুরু হয় গোখরো সাপের। কিন্তু ওসব কোনো কুসংস্কার নেই নৃপেন রায়ের। আর এ ছাড়া বাগানের সবচেয়ে বিশেষত্ব হল, সযত্নরোপিত নানা জাতের ক্যাকটাস। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গা থেকে এদের সংগ্রহ করা হয়েছে। বেশিরভাগই তীক্ষ্ণকাঁটায় আকীর্ণ, নানা বিচিত্র ধরনের ফুল ফোটে তাতে। শিকার আর ক্যাকটাসের পরিচর্যা—এই হল নৃপেন রায়ের প্রধান ব্যসন।

বাড়িটা বড়ো কিন্তু এখন শ্রীহীন। প্রায় হাজার পঞ্চাশেক টাকা আর চা-বাগানের মোটা রকমের শেয়ার রেখে বাপ চোখ বুজেছিলেন। আন্তরিক নিষ্ঠার সঙ্গে ওই পঞ্চাশ হাজার টাকা কয়েকটি বছরের মধ্যেই উড়িয়েছেন নৃপেন রায়। এখন সংসার চলে বাঁধা মাইনের মতো শেয়ারের একটা নিয়মিত আয়ে। তারও পরিমাণ উপেক্ষার নয়। খুশিমতো আর অপচয় করা চলে না বটে, কিন্তু রুচিমাফিক অপব্যয়ে বাধা নেই এখনও। সে-অপব্যয়টা চলে শিকার আর বিলাতি মদের রন্ধ্রপথে।

নৃপেন আর তাঁর মেয়ে গৌরী, এই দুজনকে নিয়েই সংসার। একটা বুড়ো চাকর আছে বাপের আমলের; চোখে অল্প অল্প ছানি পড়েছে, কানেও কম শোনে। সংসারের ঝক্কিটা পোয়াতে হয় তাকেই। গৌরীর বছর দুই বয়েসের সময় নৃপেন রায়ের স্ত্রী স্বামীর আটত্রিশ বোরের রিভলবারটা দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। সেই থেকে ওদিকটাতে নিশ্চিন্ত হয়েছেন নৃপেন রায়। তারপরে আর বিয়ে করেননি। মেয়েদের তিনি সহ্য করতে পারেন না।

বাইরের ঘরে ঢুকে একটা সোফার ওপর বন্দুক দুটোকে নামিয়ে রাখলেন। তারপর বুটসুদ্ধ পা দুটোকে তুলেই এলিয়ে পড়লেন একটা কাউচে।

পাখি আর টোটার মালা গলায় নিয়ে গৌরী তখনও সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কী করতে হবে জানে না—বাপের আদেশের অপেক্ষা করছে সে।

পাখাটা খুলে দে তো গৌরী। আর ওগুলো নামিয়ে রাখ মেঝেতে।

গৌরী তাই করল।

আয়, বোস আমার কাছে। নৃপেন রায় ডাকলেন। গলার স্বরে মেশাতে চাইলেন স্নেহের নমনীয় আমেজ। সে-স্বরে স্নেহ ফুটল কি না বোঝা গেল না, কিন্তু গৌরী যেন আশ্বস্ত বোধ করল একটু। একটা টুল টেনে নিয়ে নীরবে বাপের পাশে এসে বসল।

আজ খুব কষ্ট হয়েছে, না রে? আবার সস্নেহ স্বরে জানতে চাইলেন নৃপেন রায়।

হ্যাঁ বাবা। আস্তে আস্তে জবাব দিলে গৌরী।

মিষ্টি, ক্লান্ত গলার আওয়াজ। এতক্ষণ পরে মেয়েটিকে যেন দেখতে পাওয়া গেল ভালো করে। অলঞ্জীর মতো বব-করা রুক্ষ চুলের পটভূমিতেও শান্ত কমনীয় একখানা মুখ। গভীর কালো চোখের তারায় ব্যথিত শঙ্কা। বাইরের পোশাকের সঙ্গে যেন কোনো মিল নেই তার মনের চেহারার।

আরও একটু লক্ষ করলে চোখে পড়ে—তার মুখে কোথাও যেন ভাবের স্পষ্ট আভাস নেই কিছু, কেমন প্রাণহীন। একটা জন্তুর মতো প্রাকৃতিক ভয়, প্রাকৃতিক দুঃখানুভূতি। কোনো ডাক্তার দেখলে প্রথম দৃষ্টিতেই বলে দেবে মেয়েটা হাবা। তার শিশুর মতো অপরিণত চেতনা চিরকাল নীহারিকায় বাষ্পচ্ছন্ন হয়ে থাকবে, কোনোদিন অভিজ্ঞতার কঠিন আকৃতি-বন্ধনে পূর্ণ হয়ে উঠবে না।

প্রথমদিকে একবার ডাক্তার দেখানো হয়েছিল অবশ্য। পরীক্ষা করে ডাক্তার শুধু মাথা নেড়েছিলেন বার কয়েক। তারপর ধিক্কারভরা চোখে নৃপেন রায়ের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, আপনার পাপেরই ও প্রায়শ্চিত্ত করছে, এর কোনো ওষুধ নেই।

তার মানে?

মানে এখনও জানতে চান? ডাক্তারের মুখে ঘৃণার চিহ্ন ফুটে উঠেছিল, জন্মের আগেই ওর সমস্ত জীবনকে আপনি নষ্ট করে রেখেছেন। আজ আর ওর ভালো করবার চেষ্টা বৃথা।

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন নৃপেন রায়। নিস্পন্দ হয়ে থেমে গিয়েছিল মুখের সমুদ্যত কঠিন হাড়ের সঙ্গে জড়ানো মাংসপেশিগুলো। শক্ত থাবায় চেয়ারের হাতলটাকে ধরেছিলেন মুঠো করে।

জানেন, কী বলছেন আপনি?

ডাক্তার ভয় পাননি। স্থিতপ্রজ্ঞের গাম্ভীর্য নিয়ে চশমাটা রুমালে মুছতে মুছতে বলেছিলেন, জানি। যদি বিশ্বাস না করেন, আপনার আর আপনার মেয়ের ব্লাড দিয়ে যান। কাল কান টেস্টের রিপোর্ট পাঠিয়ে দেব, তা থেকেই আশা করি সব বুঝতে পারবেন।

জীবনে এই প্রথম থমকে গিয়েছিলেন নৃপেন রায়, যেন কুঁকড়ে গিয়েছিলেন। শিথিল হয়ে গিয়েছিল মুখের পেশিগুলো, মুঠিটা ঢিলে হয়ে এসেছিল চেয়ারের গায়ে। আর দাঁড়াননি তারপর।

ডাক্তারের টেবিলের ওপর প্রায় ছুড়ে দিয়েছিলেন ফি-এর টাকাগুলো। মেয়ের হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে বলেছিলেন, চল।

কিন্তু আর চিকিৎসা হয়নি গৌরীর।

চিকিৎসা করেও কোনো লাভ হবে না, একথা বুঝতে পেরেছিলেন নৃপেন রায়। কিছুদিন একটা গভীর অপরাধবোধ তাঁকে আচ্ছন্ন করে রাখল। তারপর ক্রমশ নিজের মধ্যেই একটা জোর খুঁজে পেলেন তিনি। অন্যায় যদি তাঁর হয়ে থাকে, তবে তার প্রতিকারের দায়িত্বও তাঁরই হাতে। গৌরীকে তিনি জাগিয়ে তুলবেন, চেতনার আলো ছড়িয়ে দেবেন তার অন্ধকার মনের প্রান্তে প্রান্তে।

প্রাণ যদি নাই পায়, অন্তত অন্য দিক থেকে সজাগ করে তুলবেন একটার পর একটা নিষ্ঠুর হিংসার খোঁচা দিয়ে।

হিংসা! তাই বটে। কী বিরাট, কী প্রচন্ড শক্তি! রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার যখন তাঁকে সামনাসামনি চার্জ করেছে, তখন সে-শক্তির বিদ্যুঝলক টের পেয়েছেন রক্তের মধ্যে। শালবনের ভেতরে মাতলা হাতি শিকার করতে গিয়ে সেই শক্তির উৎক্ষেপে দুলে উঠেছে তাঁর হৃৎপিন্ড। সেই শক্তি, সেই হিংসা। জীবনে নৃপেন রায় তার চেয়ে কোনো বড়ো জিনিসের কথা ভাবতেও পারেননি।

গৌরী জাগুক, কেটে যাক তার চৈতন্যের ওপর থেকে এই কুয়াশার আবরণ। তারপর ডাক্তারকে তিনি দেখে নেবেন।

আজও অস্পষ্টভাবে তাঁর মাথার মধ্যে যেন ঘুরে যাচ্ছিল এই চিন্তাটাই। আধবোজা চোখে গৌরীর দিকে তিনি চেয়ে রইলেন আবিষ্টের মতো।

হাঁস দুটো আজ বড়ো ভুগিয়েছে, না?

তেমনি প্রাণহীন গলায় গৌরী বললে, হ্যাঁ বাবা।

শিকারে যেতে পোর ভালো লাগে না?

লাগে।

কষ্ট হয় না?

হয়। গৌরী জানলার বাইরে আম গাছটার দিকে দৃষ্টি মেলে দিলে। অনেক কাঁটা আর বড্ড রোদ, হাঁটতে পারা যায় না।

ওটুকু কষ্ট না করলে শিকারি হতে পারে কেউ? উৎসাহে নৃপেন রায় দৃষ্টিটা সম্পূর্ণ মুক্ত করে ধরলেন।

শিকার কি আর ধরা দেয় অত সহজে? অনেক পরিশ্রম করতে হয়, অনেক রোদ কাঁটা সইতে হয়। একবার নেশা ধরলে দেখবি দুনিয়ার আর সব একেবারেই ভুলিয়ে দেবে।

কিন্তু পাখি মেরে কী হয় বাবা? গৌরীর নিষ্প্রাণ চোখে একটা জান্তব বেদনা পরিস্ফুট হয়ে উঠল, কেমন সুন্দর দেখতে! আর কী মিষ্টি করে ডাকে!

হঠাৎ একটা খোঁচা খেলেন নৃপেন রায়, চমকে উঠলেন কীসের অশুভ সংকেতে। উলটো সুর বলছে গৌরীর গলা; এমন কথা ছিল না, এমন হওয়া উচিত নয়।

কাউচের উপর উঠে বসলেন তিনি। মানসিক অধৈর্যে বুটপরা পা দুটোকে সশব্দে নামিয়ে আনলেন মেঝের ওপর। স্বগতোক্তির মতো পুনরাবৃত্তি করলেন গৌরীর কথা দুটোর, খুব সুন্দর দেখতে, না? খুব মিষ্টি করে ডাকে কেমন?

হকচকিয়ে গেল গৌরী। নীহারিকার মতো অস্বচ্ছ মনের ধোঁয়াটে পর্দায় জান্তব ভীতির পূর্বাভাস পড়েছে। চাপা উৎকণ্ঠায় গৌরী বললে, হ্যাঁ বাবা!

হ্যাঁ বাবা! নৃপেন রায় বিশ্রীভাবে ভেংচে উঠলেন একটা। ইচ্ছে করল থাবার মতো তাঁর প্রচন্ড মুঠিটা সজোরে বসিয়ে দেন মেয়েটার মাথার ওপর।

আর খেতে কেমন লাগে? কেমন লাগে নরম তুলতুলে মাংসগুলো? বিকৃত গলায় তিনি একটা তিক্ত প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, চাবুকের আওয়াজের মতো যেন বাতাসে কেটে গেল কথাটা।

সভয়ে গৌরী চুপ করে রইল কিছুক্ষণ।

কী, কথা কইছিস না যে? পায়ের নীচে একটা কিছু থেঁতলে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছেন এমনই ভঙ্গিতে বুটজোড়া মেঝেতে ঠুকলেন নৃপেন রায়।

প্রায় নিঃশব্দে জবাব এল গৌরীর, খেতে ভালোই লাগে বাবা।

খেতে যা ভালো লাগে, তা মারতেও মন্দ লাগা উচিত নয়। হিপনটাইজ করবার মতো একটা নির্নিমেষ খরতা জ্বলতে লাগল নৃপেন রায়ের চোখে। যা, পাখিগুলোর পালক ছাড়িয়ে কেটেকুটে তৈরি করে রাখ গো

আমি? ব্যথিত বিস্ময়ে গৌরী বললে, আমি তো কখনো করি না বাবা। ওসব তো বৃন্দাবন করে।

না, আজ থেকে বৃন্দাবন আর করবে না, তোকেই করতে হবে। নৃপেন রায়ের সমস্ত মুখোনা মুছে গিয়ে গৌরীর দৃষ্টির সামনে প্রত্যক্ষ হয়ে রইল শুধু দুটো আগ্নেয় চোখ। তুই-ই করবি এর পর থেকে। যা।

কলের পুতুলের মতো উঠে পড়ল গৌরী। তারপর পিঠের ওপর বাপের প্রখর দৃষ্টির উত্তাপ অনুভব করতে করতে তাড়া-খাওয়া একটা জানোয়ারের মতো পাখিগুলোকে তুলে নিয়ে ছুটে পালাল।

লাল হয়ে আসা শেষ রোদে বাগানের মধ্যে পায়চারি করছিলেন নৃপেন রায়। অদ্ভুত কৌতুকের সঙ্গে লক্ষ করছিলেন সূর্য ডোবার আগেই কোথা থেকে বেরিয়ে পড়েছে একটা পাহাড়ি মথ। বেশ বড়ো আকারের, প্রায় পাঁচ ইঞ্চি করে ফিকে নীলের ওপর সাদা ডোরাকাটা ডানা। মথটা ঘুরে ঘুরে কেয়াপাতার ওপর বসবার চেষ্টা করছে, কিন্তু তারপরেই তীক্ষ্ণধার কাঁটার ঘায়ে উড়ে যাচ্ছে সেখান থেকে।

সুন্দর পাখা, খাসা রং। কিন্তু নির্বোধটা জানে না, এই কেয়াকাঁটার ঝাড়ে রঙিন পাখনা নিয়ে বসবার মতো জায়গা নেই কোথাও। হঠাৎ একটা অমানুষিক আনন্দে নৃপেন রায় থাবা দিয়ে ধরলে মথটাকে। মুঠির মধ্যে পড়তে-না-পড়তে সেটা পিষ্ট হয়ে গেল, হাতের তালুতে পরাগের মতো জড়িয়ে রইল একরাশ সাদা গুঁড়ো।

ফুলের পাঁপড়ি ছেড়ার মতো করে, ভোরের আকাশে নীলিমার বুকের ওপর প্রথম সূর্যের আলো পড়ার মতো শুভ্রতায় রেখায়িত পাখা দুটোকে তিনি নখের ডগায় টুকরো টুকরো করতে লাগলেন। বেশ লাগে ছিড়তে। অদ্ভুত সূক্ষ, আশ্চর্য নরম! কিন্তু কেয়া গাছের একটি পাতাও অমন করে ছেঁড়া যাবে না, সে-চেষ্টা করতে গেলে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে হাতের চামড়া, ভেসে যাবে রক্তের ধারায়।

বাগানের মধ্যে চলতে চলতে হঠাৎ এক জায়গায় থমকে দাঁড়ালেন তিনি। সমস্ত মুখোনা খুশির আলোয় তাঁর ঝলমল করে উঠেছে।

এই তো! এতদিন পরে তবে ফুল ফুটেছে!

রাজপুতানা থেকে আনা, মরুভূমির বালিতে বেঁচে থাকা এই ক্যাকটাস। কেয়ার চাইতেও বড়ো বড়ো খরমুখ কাঁটা। এদের ভীষণতার এইটুকুই মাত্র পরিচয় নয়। এই ক্যাকটাসগুলোর আশেপাশে থাকে এক জাতের ছোটো ছোটো বেলে সাপ; যেমন দ্রুত, তেমনি অব্যর্থ তাদের বিষ। এই বিষকন্যার আজ যৌবন এসেছে, ফুল ফুটেছে এর গায়ে!

একটি মাত্র ফুল, মাঝারি ধরনের আনারসের মতো চেহারা। হরিদ্রাভ বর্ণে হালকা হালকা লালের ছোপ। কৌতূহলী হয়ে তার গায়ে হাত দিতে গিয়েই চমকে সরে এলেন নৃপেন রায়। হাতে লাগল কাঁটার তীক্ষ্ণ খোঁচা, জ্বালা করতে লাগল। তাকিয়ে দেখলেন মধ্যমার উপরে এসে জমেছে একবিন্দু রক্ত।

নিজের রক্ত কত বার দেখেছেন, তবু এই একটি বিন্দুকে কেমন বিস্ময়কর বলে মনে হল তাঁর। আশ্চর্য স্বচ্ছ আর নির্মল দেখাল তাঁর রং। নৃপেন রায় কুঞ্চিত করে তাকিয়ে রইলেন। এই রক্তে বিষ আছে, বিষ আছে তাঁদের নিজের অপরাধের। অসম্ভব।

হঠাৎ কান দুটো সতর্ক করে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। গানের সুর। গৌরী গান গাইছে। আঙুলে ক্যাকটাসের বিষাক্ত জ্বালা নিয়ে অস্থির পায়ে ঘরের দিকে এগোলেন নৃপেন রায়। বাইরের ঘরে একটা জানলার পাশে বসে বুড়ো আম গাছটার দিকে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছে গৌরী। কোলের ওপর তার দুটি সদ্যফোঁটা গন্ধরাজ। নিজের মনেই কী-একটা গানের সুর সে গুঞ্জন করে চলেছে।

গৌরী?

তীক্ষ্ণগলায় তিনি ডাকলেন। বিদ্যুদবেগে গৌরী দাঁড়িয়ে পড়ল, মাটিতে পড়ল কোলের ওপরে রাখা গন্ধরাজ দুটো।

কী দেখছিলি?

দুটো ঘুঘু বাবা, কী সুন্দর ডাকছে! গৌরীর গলায় একটা আনন্দিত কৌতূহলের আমেজ। কিন্তু তাতে কোনো চেতন-সত্তার বোধের চিহ্ন নেই। একটা প্রাকৃতিক অনুভূতি। নদীর নীল জলের আয়নায় নিজের ছায়া দেখে অর্থহীন আনন্দে ডেকে ওঠা কোনো হরিণের মতো।

কোথায় ঘুঘু? নৃপেন রায়ের চোখ দুটো চকচক করে উঠল।

ওই যে। গৌরী আঙুল বাড়িয়ে দেখিয়ে দিলে, কেমন গায়ে গায়ে লাগিয়ে বসে আছে। এখুনি ঘু ঘু করে ডাকছিল।

ওঃ!

নৃপেন রায় সরে এলেন। তুলে আনলেন দেওয়ালের কোনায় ঠেসান দেওয়া বন্দুকটা। লোড করাই ছিল। আনলোডেড বন্দুক কখনো তিনি ঘরে রাখেন না।

গৌরীর হাতে বন্দুকটা তুলে দিয়ে বললেন, মার।

হরিণের চোখে যেন বাঘের ছায়া পড়ল।

বাবা।

মার। পাথরের মতো শক্ত শোনাল নৃপেন রায়ের গলা। জ্বলে উঠল সম্মোহকের দৃষ্টি। তারপর গৌরীর সামনে থেকে তাঁর সমস্ত মুখোনা মিলিয়ে গেল, জেগে রইল শুধু দুটো আগ্নেয় চোখ। সে-দুটো যেন ক্রমশ বড়ো—আরও বড়ো হয়ে কোনো চলন্ত ট্রেনের দুটো আলোর মতো এগিয়ে আসতে লাগল গৌরীর দিকে।

ঘামে ভেজা হাতে ঠাণ্ডা বন্দুকটা আঁকড়ে ধরল গৌরী। আস্তে আস্তে তুলে নিয়ে লক্ষ ঠিক করল। তারপরেই একটা তীব্র শব্দের সঙ্গে সঙ্গে দুটো তুলোর বলের মতো ঘুঘুজোড়া ছটফট করতে করতে পড়ল মাটিতে।

ঘর-কাঁপানো একটা অট্টহাসিতে নৃপেন রায় ফেটে পড়লেন।

খাসা টিপ হয়েছে তোর! বন্দুক ধরেই জাতশিকারি! অসীম আনন্দে আর একবার তিনি হা-হা করে হেসে উঠলেন।

কিন্তু গৌরী আর দাঁড়াল না। দু-হাতে মুখ ঢেকে পালিয়ে গেল সেখান থেকে।

আর সঙ্গে সঙ্গেই নাকের ওপর প্রচন্ড একটা ঘুসি এসে পড়বার মতো হাসিটা থেমে গেল নৃপেন রায়ের। না, এখনও হয়নি। এখনও অনেক দেরি। পায়ের নীচে গন্ধরাজ দুটোকে নির্মমভাবে দলিত-মথিত করতে করতে তিনি ভাবতে লাগলেন, বাগানে একটাও ফুলের গাছ আর তিনি রাখবেন না। কালই কাটিয়ে নির্মূল করবেন সমস্ত। আর সেখানে পুঁতে দেবেন আরও গোটা কয়েক ক্যাকটাস—আরও নির্মম, আরও কণ্টকিত।

দিন দশেক পরে বাড়িতে দুটো বড়ো বড়ো বাক্স এল। আর সেইসঙ্গে এল শক্ত তারের

জাল-দেওয়া একটা মস্তবড়ো খাঁচা। খাঁচার মাঝখানে জালের আর একটা পার্টিশন—দুটো জানোয়ার পাশাপাশি রাখার ব্যবস্থা।

গৌরী অবাকবিস্ময়ে বললে, এতে কী হবে বাবা?

মজা হবে। নৃপেন রায় হাসলেন, হাতের তেলোয় একটা প্রজাপতি পিষে ফেলবার মতো হাসি। মজার চেহারাটাও একটু পরেই স্পষ্ট হয়ে উঠল। কাঠের একটা বাক্স খুলতেই খাঁচার এদিকের ঘরে লাফিয়ে ঢুকল মাঝারি ধরনের একটা লেপার্ড। পোষমানা নয়, বন্য এবং উদ্দাম।

বাঃ, কী সুন্দর বাঘ! খুশিতে ছলছল করে উঠল গৌরী, এ বাঘটা আমাদের?

আমাদের বই কী।

আনন্দে গৌরী হাততালি দিলে, কী মজা। আর ওই বাক্সে?

দ্বিতীয় বাক্স থেকে যে বেরিয়ে এল, তাকে দেখে সভয়ে গৌরী অব্যক্ত শব্দ করল একটা। খাঁচার দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে বিদ্যুদবেগে ফিরে দাঁড়াল। তারপর তীক্ষ্ণশিস টানার মতো গর্জন করে হাত চারেকের মতো উঁচু হয়ে উঠল। বিশাল ফণা তুলে প্রচন্ড বেগে ছোবল মারল খাঁচার দরজায়।

হাত আটেক লম্বা একটি শঙ্খচূড়। উজ্জ্বল, মসৃণ চিত্রিত দেহে আরণ্যক বিভীষিকা।

গৌরী পিছিয়ে যাচ্ছিল, নৃপেন তার হাতটাকে আঁকড়ে ধরলেন। এত জোরে ধরলেন যে গৌরীর হাড়টা মড়মড় করে উঠল।

পালাচ্ছিস কেন? দাঁড়া, এইবারেই তো মজা শুরু হবে!

বাক্স যারা বয়ে এনেছিল, তারা একবার এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে সরে পড়ল সেখান থেকে। শুধু আম গাছটার ছায়ার নীচে নিশ্চিন্ত মনে বসে বসে ঝিমুতে লাগল বৃন্দাবন—সে চোখে দেখতে পায় না, কানেও শুনতে পায় না।

গৌরী বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

খাঁচায় ঢুকে বাঘটা সবে শ্রান্তভাবে বসে পড়েছিল, চাটতে শুরু করেছিল সামনের একটা থাবা। শঙ্খচূড়ের গর্জন শোনামাত্র বিদ্যুদবেগে সে উঠে দাঁড়াল।

প্রতিদ্বন্দ্বী তার পাশে, মাত্র এক ইঞ্চি সরু একটা জালের ব্যবধানে। সেই জালের ওপারে সে লতিয়ে লতিয়ে উঠতে চাইছে, তার চোখ দুটো এই দিনের আলোতেও দু-টুকরো সিগারেটের আগুনের মতো জ্বলছে।

বাঘটা পায়ে পায়ে একেবারে খাঁচার এপারে সরে এল। একটা অতিকায় বিড়ালের মতো ফুলে উঠল তার গায়ের রোঁয়াগুলো। হিংস্র হাসির ভঙ্গিতে দাঁতগুলো বের করে চাপা স্বরে সেও একটা গর্জন করল। কিন্তু সে গর্জনে বীরত্ব প্রকাশ পেল না। তার চোখ দুটোয় ফুটে উঠল মর্মান্তিক ভয়ের ছায়া।

শিরদাঁড়া ধনুকের মতো বাঁকিয়ে নিয়ে সাপটা ফণা বিস্তার করল। তারপর আবার একটা তীব্র শিসের শব্দ করে প্রচন্ড বেগে ছোবল মারল পার্টিশনের গায়ে। সমস্ত খাঁচাটা ঝনঝন করে উঠল। দুর্বলভাবে একটা থাবা তুলে লেপার্ডটা অস্ফুট গর্জন করল—গররর…

নৃপেন রায় মেয়ের দিকে তাকালেন। হ্যাঁ, প্রাণ জেগে উঠেছে, ভাষা জেগে উঠেছে। গৌরীর চোখে; ঝলমল করে উঠেছে কৌতূহলের আলোয়। শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছে। একটা অদ্ভুত প্রত্যাশায়।

সাপটা এবার ফণা তুলে দাঁড়িয়ে রইল। উদ্ধত আহ্বানের মতো হেলতে লাগল ডাইনে বাঁয়ে। সিগারেটের আগুনের মত চোখে ফুটে উঠল একটা বিষাক্ত নীলিম দীপ্তি। লেপার্ডটা এক বার লেজ আছড়াল, নির্নিমেষভাবে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল শঙ্খচূড়ের দিকে, তারপর যেন মরিয়া হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল পার্টিশনের ওপরে।

এইবার সাপটার পিছিয়ে যাওয়ার পালা। কিন্তু ভয়ের আভাস নেই, শুধু আত্মরক্ষার চেষ্টা। তারপরেই নিজেকে আবার দৃঢ় করে নিয়ে খাঁচা-ফাটানো ছোবল বসিয়ে দিলে।

বিদ্যুদবেগে বাঘ সরে এল খাঁচার নিরাপদ কোণে। কান্নার মতো আওয়াজ তুলল, গর-র-র…

গৌরী নেচে উঠল। হাততালি দিয়ে হেসে উঠল, বা-বা, কী চমৎকার!

তারপর সারাটা দিন ধরে চলল সেই অমানুষিক স্নায়ুযুদ্ধ। সন্ধ্যার দিকে ক্লান্ত বাঘটা খাঁচার মাঝখানে এলিয়ে পড়ল। কিন্তু তাকে তো ছুটি দেবে না গৌরী। একটা ছটো লাঠি দিয়ে বাইরে থেকে খোঁচা দিতে লাগল বার বার। আর বাঁচবার শেষ আকুতিতে থেকে থেকে ক্ষুব্ধ কান্নায় খাঁচার এদিক-ওদিক ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল বাঘটা।

সারাদিনের মধ্যে গৌরীকে নড়ানো গেল না খাঁচার সামনে থেকে। হিংস্র আনন্দে থেকে থেকে চেঁচিয়ে উঠতে লাগল, কী চমৎকার!

অনেক রাতে ঘুমন্ত গৌরীকে খাঁচার সামনে থেকে টেনে উঠিয়ে নিয়ে গেল বৃন্দাবন।

রাত তখন প্রায় দুটো হবে। গৌরী উঠে বসল। রক্তের মধ্যে একটা অস্থির চঞ্চলতা। বিছানা থেকে সে নেমে পড়ল, সামনের টেবিলের ওপর থেকে তুলে নিলে নৃপেন রায়ের হান্টিং টর্চটা।

পাশের ঘরে নাকের ডাকের শব্দ। পায়ে পায়ে বারান্দায় বেরিয়ে গেল সে। টর্চের আলোয় দেখা গেল কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে সাপটা। বাঘটা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে খাঁচার কোনায়। অধৈর্যভাবে খাঁচার গায়ে কয়েকটা টোকা মারতে শঙ্খচূড় এক বার নড়ে উঠল, কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া গেল না লেপার্ডের তরফ থেকে।

ছোটো লাঠিটা কুড়িয়ে এনে বাঘকে খোঁচা দিলে গৌরী। নড়ল না, গর্জে উঠল না অসহায় যন্ত্রণায়। টর্চের তীব্র আলোয় বুঝতে পারা গেল-সীমাহীন ভয়ের সঙ্গে লড়াই করতে করতে শিথিল স্নায়ু নিয়ে সে ঢলে পড়েছে।

কিন্তু শঙ্খচূড় উঠে দাঁড়িয়েছে। উঠে দাঁড়িয়েছে শিরদাঁড়ায় ভর দিয়ে। প্রতিদ্বন্দ্বীপ্রতিদ্বন্দ্বী চাই তার। পার্টিশনের ওপর আবার একটা ভয়ংকর ছোবল পড়ল, কিন্তু তার শত্রু আর নড়ল না-নড়বেও না আর। হতাশায় ক্ষোভে গৌরী চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। সহ্য করতে পারছে না। তার সমস্ত জান্তব বোধকে আচ্ছন্ন করে দিয়েছে একটা প্রাগৈতিহাসিক হিংস্র আনন্দ। উপায় চাই, উপকরণ চাই। নেশা চাই তার। যেমন করে হোক, যে উপায়েই হোক।

কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে থেকে গৌরী খাঁচাটায় সজোরে একটা ধাক্কা দিলে। সরল না। আর একটা ধাক্কা আরও জোরে। খাঁচার কাঠের চাকাগুলো গড়গড় করে এগিয়ে গেল কয়েক পা। আর একটু ঠেলে দিলেই নৃপেন রায়ের দরজা। অনেক রাত পর্যন্ত মদ খেয়ে নৃপেন রায় মেজের ওপরেই পড়ে আছেন, দরজা বন্ধ করে দেবার সুযোগ তাঁর হয়নি।

…শঙ্খচূড়ের গর্জনে আতঙ্কবিহ্বল নৃপেন রায় উঠে দাঁড়ালেন। তখনও নেশায় টলছেন, তখনও চোখের দৃষ্টি আচ্ছন্ন। দেখলেন আট হাত লম্বা আরণ্যক বিভীষিকা তাঁর মুখের দিকে স্থির তাকিয়ে আছে—হেলছে দুলছে, চোখে নীল হিংসার খরদীপ্তি!

এক লাফে দরজার দিকে সরে গেলেন। টানতে গেলেন প্রাণপণে, দরজা খুলল না। গৌরী বাইরে থেকে শিকল বন্ধ করে দিয়েছে।

গৌরী! গৌরী!

আর্তস্বরে নৃপেন রায় চেঁচিয়ে উঠলেন। গৌরীর জবাব এল না, এল হাসির শব্দ। কাচের জানলার মধ্যে দিয়ে সে ব্যাপারটা দেখছে। আর একটা নতুন খেলা, একটা নতুন আনন্দ! নেশা!

প্রচন্ড বেগে ছোবল মারল সাপটা। আটত্রিশ বোরের রিভলবারটা ড্রয়ার থেকে বার করবার আর সময় নেই। শেষ চেষ্টায় সাপকে আঁকড়ে ধরতে গেলেন নৃপেন রায়, পারলেন না। মণিবন্ধনের ওপর দংশনের তীব্র জ্বালা অনুভব করতে করতে দেখলেন কাচের জানলার হাততালি দিয়ে দিয়ে হেসে উঠছে গৌরী। সে প্রাণ পেয়ে উঠেছে, কোথাও কিছু বাকি নেই তার; আর শঙ্খচূড় সাপের মতো তারও জান্তব চোখ আচ্ছন্ন হয়ে গেছে আদিম হিংসার নীল আলোয়।

একটি খুনের ঘটনা

গোয়েন্দা বা অপরাধ কাহিনীর সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, ঘটনার আশপাশে যারা তয়েছে, তাদের প্রত্যেককেই সন্দেহের আওতার মধ্যে রাখা হয়। কিন্তু চারদিকের সাক্ষ্য প্রমাণে নিশ্চিতভাবে যাকে অপরাধী বলে মনে হয়, তাকে যদি নিরপরাধ ধরে নিয়ে, তার অনুকূলে তদন্ত শুরু করা হয়, তা হলে কী রকমটা দাঁড়ায়?

সোভিয়েত দেশে তদন্তের প্রণালী আজকাল এই। ওখানকার একজন ইন্সপেক্টরের জবানবন্দিতে একটা ঘটনা শোনাই। গল্পটা–না এটা গল্প নয়, সম্পূর্ণ সত্য কাহিনী–একটু সংক্ষেপ করে তোমাদের বলছি।

মেরু অঞ্চলে গবেষণার জন্যে গিয়েছিলেন দুজন অধ্যাপক। এদের একজন অল্পবয়সী, আর একজন বুড়োমানুষ। দুজনেই নামজাদা বিজ্ঞানী, দুরন্ত পণ্ডিত, কিন্তু সম্পর্কটা একেবারে সাপে-নেউলে।

পণ্ডিতে পণ্ডিতে যা হয়। এর মত উনি মানেন না। এঁর থিয়োরির উনি প্রতিবাদ করেন। কিন্তু মতভেদ এমন একটা স্তরে পৌঁছেছিল যে ইনি ওঁর নাম শুনলে একেবারে জ্বলে যেতেন। অথচ, অবস্থাচক্রে দুজনকে একই সঙ্গে পাঠানো হল গবেষণা করতে।

সেই ধু-ধু তুষারের দেশে দুই বৈজ্ঞানিক একসঙ্গে তাঁবু ফেলে থাকেন, গবেষণা করেন। আর একজন সহকারী আছেন এঁদের সাহায্য করেন। তিনি দেখেন, রাতদিন দুই পণ্ডিতে সমানে তর্কাতর্কি খেয়োখেয়ি চলছে।

বুড়ো বৈজ্ঞানিক-ধরা যাক প্রোফেসর একস, একটা চিঠিতে লিখছেন : আমার সঙ্গে এই বানরটাকে কেন যে পাঠানো হল। ওকে আমি এক মুহূর্ত সহ্য করতে পারি না–দেখলেই আমার পিত্তিসুদ্ধ জ্বালা করে।

আর ছোকরা বৈজ্ঞানিক–প্রোফেসর ওয়াই–তাঁর ডায়েরিতে লেখেন : বুড়ো ক্রমশই সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সব সময়ে ওর একগুয়েমি। মধ্যে-মধ্যে আগুন ধরে যায় আমার মাথায়। একদিন নিশ্চয় আমি ওকে খুন করব।

অবস্থা যখন এই রকম, তখন একদিন খবর এল, প্রোফেসর একস্ খুন হয়েছেন।

ব্যাপারটা কীরকম?

দুই বৈজ্ঞানিক এবং তাঁদের সহকারী একসঙ্গে বেরিয়েছিলেন হাঁস শিকারে। একটা জলার একধারে দাঁড়িয়েছিলেন একস– কিছু দূরে ওয়াই হাঁস খুঁজছিলেন। কী একটা জিনিস আনতে সহকারী চলে গিয়েছিলেন তাঁবুতে।

সহকারী যখন ফিরে আসেন, তখন একটা বন্দুকের আওয়াজ তাঁর কানে যায়। তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, শিকারে বন্দুকের আওয়াজ হবেই।

কিন্তু ফিরে এসে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন তিনি।

প্রোফেসর একস্ পড়ে আছেন মাটিতে। হাতের বন্দুকটাও পড়ে রয়েছে তাঁর পাশে। তাঁর বাঁ চোখে শিকারের ছুরি-অর্থাৎ হান্টিং নাইফটা একেবারে বাঁট পর্যন্ত ঢোকানো। চোখের ভেতর দিয়ে সে-ছুরির ফলা একেবারে মস্তিষ্ক পর্যন্ত চলে গেছে। মৃত্যু হয়েছে তৎক্ষণাৎ।

আর তাঁর পাশে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে প্রফেসর ওয়াই।

কী করে হল?

শুকনো মুখে প্রোফেসর ওয়াই বললেন, কিছুই জানি না। আমি ওদিকে হাঁস তাক করছিলুম। হঠাৎ বন্দুকের আওয়াজে এদিকে ফিরে দেখি, প্রোফেসর একস্ মাটিতে পড়ে আছেন। এসে দেখি, এই কাণ্ড।

সেই নির্জন তুষারের দেশে এই দুটি প্রাণী ছাড়া আর কেউ ছিল না। আর এ তো হত্যাকাণ্ড! দুজনের ভেতরে যে বিশ্রী সম্পর্ক ছিল, তাতে এমন কাজ আর কে করতে পারে প্রোফেসর ওয়াই ছাড়া?

অতএব একদিন প্রোফেসর ওয়াই এসে আমাদের অফিসে উপস্থিত হলেন।

বললুম, প্রোফেসর, আপনি যা জানেন তা বলুন।

নতুন কথা তিনি কিছুই বললেন না। আমি বন্দুকের আওয়াজ শুনে ফিরে দেখি, উনি পড়ে আছেন। চোখের ভেতরে ছোরা বেঁধানো। আর আমি কিছুই জানি না।

প্রোফেসর ওয়াই শীর্ণ মুখে হাসলেন। বললেন, জানি, কেউ বিশ্বাস করবে না। আমি তৈরি হয়েই এসেছি সেজন্যে। পড়ুন আমার ডায়েরি।

ডায়েরিটা এগিয়ে দিলেন আমার দিকে। পাতায় পাতায় সেই এক কথা। “অসহ্য–বুড়োটা অসহ্য। কী করে এই পাগলের হাত থেকে নিস্তার পাই? আজ খাবার টেবিলে–আঃ, লোকটাকে খুন করতে পারলে আমার শান্তি হয়”। পড়েই মনে হবে, কোনও সন্দেহ নেই, বিশুদ্ধ, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

আচ্ছা মানুষ এই প্রোফেসর। নিজের মৃত্যুবাণ যেন তুলে দিচ্ছেন আমার হাতে।

আমি চুপ করে রইলুম। প্রোফেসর বললেন, আমি বুঝতে পারছি আমার কী হবে। আমার আর কোনও ভাবনা নেই। আপনি অনুগ্রহ করে কেবল এই চিঠিটা আমার স্ত্রীকে দিয়ে দেবেন।

আমি বললুম, চিঠির দরকার নেই। আপনি বাড়ি যান।

তার মানে? ছেড়ে দিচ্ছেন আমাকে?–প্রোফেসর যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না।

বললুম, বিনা প্রমাণে আপনাকে গ্রেপ্তার করতে পারি না। আপাতত আপনার নামে আমাদের কোনও ওয়ারেন্ট নেই। আপনি যান।

আসলে আমার খটকা ধরিয়েছিল পোস্টমর্টেম রিপোর্টের একটি কথা।

অস্বাভাবিক–অমানুষিক শক্তিতে ছুরিটা চোখের মধ্যে বিঁধিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

অস্বাভাবিক–আনুষিক শক্তি। প্রোফেসর ওয়াই অবশ্যই খুব সবল স্বাস্থ্যবান পুরুষ, কিন্তু অমানুষিক শক্তি। কথাটা ক্রমাগত পাক খেতে লাগল ঘরের ভেতরে।

আমি ব্যালিস্টিক একসপার্ট–অর্থাৎ গোলাগুলি-বিশারদদের ডাকলুম।

আচ্ছা, মেরু অঞ্চলের স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় বন্দুকের টোটা ফেঁপে যায় তো?

তাঁরা বললেন, স্বাভাবিক।

সেই টোটা বন্দুকে ভরতে তখন তো অসুবিধে হয়?

তা হতেই পারে।

আচ্ছা বলুন–এ-অবস্থায় শিকারি কী করবেন?

একটা কিছু দিয়ে টোটাটাকে ঠেলে ভেতরে দেবার চেষ্টা করবেন।

হান্টিং নাইফের হাতল ব্যবহার করতে পারে লোকে?

কেন পারবে না?–একজন বললেন, সেটা কোমরেই থাকে, আর তার কথাই মনে পড়বে সকলের আগে।

তা হলে–আমি জিজ্ঞেস করলুম, ধরুন যদি হাষ্টিং নাইফটা এমন হয় তার হাতলটা যেমন-তেমন করে তৈরি, তার পেছনে এক টুকরো লোহার ডগা বেরিয়ে রয়েছে? আর টোটাটাকে যদি জোরে ঠেলে দেওয়া যায়, তা হলে সেটা ট্রিগারের পিনের মতো কাজ করতে পারে?

তাঁরা বললেন, নিশ্চয়।

মনে করুন–আমি আবার জিজ্ঞেস করলুম, সে-ক্ষেত্রে একজন ছুরির বাঁট দিয়ে টোটাটাকে জোরে ঠেলে দিলে। লোহার ডগাটা ট্রিগার পিন হয়ে যেই কাট্রিজে ঘা মারল, অমনি গুলি বেরিয়ে গেল। তখন বন্দুকটা তো গুলি ছোটবার বেগে পেছনে এসে ধাক্কা মারবে?

হ্যাঁ, তাই নিয়ম। আগ্নেয়াস্ত্র মাত্রেই ব্যাকপুশ দেবে।

খুব জোরে?

স্বাভাবিক।

তা হলে ছুরির ফলাটা তো তখন উলটো দিকে রয়েছে। বন্দুকটা যেই হাতে ধাক্কা দিলে, অমনি ছুরিটা ফলাটা তীরবেগে গিয়ে চোখে বিঁধতে পারে?

নিশ্চয় পারে। যদি অবশ্য সেটা চোখ বরাবর থাকে।

অস্বাভাবিক–অমানুষিক জোরে বিঁধে যেতে পারে?

বন্দুকটা চোখের কাছে থাকলে তাই সম্ভব।

ধন্যবাদ, আর আমার কিছু জানবার নেই।

তা হলে এই আমার কেস। হত্যা নয়, বিশুদ্ধ অ্যাকসিডেন্ট। ওয়াই বলেছেন, গুলির আওয়াজ শোনবার আগে একবার যখন তিনি এদিকে তাকিয়েছিলেন, তিনি দেখেছিলেন, অধ্যাপক একস্ যেন তাঁর বন্দুকটা লোড করবার চেষ্টা করছেন। অতএব দুই আর দুয়ে চার।

পরম উল্লাসে খবরটা জানালুম আমার ওপরওলাকে। তিনি একটু হাসলেন। বললেন, তোমার থিয়োরি বেশ ভালো। কিন্তু একটা মস্ত ফাঁক রয়ে গেল যে ওর ভেতরে।

আমি তাঁর দিকে চেয়ে রইলাম।

তোমার থিয়োরি যদি সত্যি হয়, তা হলে প্রোফেসর একস্ ডান হাতে ছুরি আর বাঁ হাতে বন্দুক ধরবেন। আর সেক্ষেত্রে বন্দুকের ব্যাক পুশে ছোরাটা ডান চোখেই বিঁধে যাবে। কিন্তু ওটা বিধেছে বাঁ চোখে, সেটা খেয়াল রেখো।

সব মাটি। গেল আমার সাধের থিয়োরি।

আমি বিভ্রান্তের মতো বেরোলুম। কোনও থই পেলুম না। তারপর হঠাৎ মনে হল, প্রোফেসর একস তো ন্যাটাও হতে পারেন! অর্থাৎ ডান হাতের বদলে বাঁ হাত ব্যবহারের অভ্যাস তো থাকতে পারে তাঁর?

আশা-নিরাশার দ্বন্দ্বে ছুটলুম তাঁর বাড়িতে। গেলুম তাঁর সহকর্মীদের কাছে।

অনুমান নির্ভুল। প্রোফেসর একস্ ন্যাটাই ছিলেন। বাঁ হাতই তিনি ব্যবহার করতেন।

কিন্তু জট কেটেও কাটে না।

অভিযানে প্রোফেসর একস-এর যে জিনিসপত্রের তালিকা পাওয়া যাচ্ছে-অর্থাৎ যা-যা তিনি সঙ্গে নিয়েছিলেন, তার প্রত্যেকটার বিবরণ পাচ্ছি, কিন্তু ছুরিটার তো কোনও সন্ধান নেই। কটি পেনসিল নিয়েছেন তারও খবর আছে–ছুরিটার উল্লেখ পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না!

তা হলে কোথা থেকে এটা এল

এমন হতে পারে যে, যাত্রার শেষ মুহূর্তে ওটা কিনে থাকবেন। কিন্তু কোথায়? শহরের কোনও দোকানে আমি ওধরনের হান্টিং নাইফের কোনও সন্ধান পেলুম না।

শেষে কি আমার ঘাটে এসে নৌকো ডুববে? আমি কি তখন জোর করে বলতে পারব, ওঁকে খুন করার জন্যে ওটাকে মাডার উইপন হিসেবে সঙ্গে নিয়ে যাননি প্রোফেসর ওয়াই?

সুতরাং আমি বেরিয়ে পড়লুম শেষ চেষ্টায়।

যে-পথ দিয়ে ওঁরা এগিয়ে গেছেন, তার প্রতিটি শহরে আমি ওই রকম একটি ছুরির দোকান খুঁজতে লাগলুম। হাজার হাজার হান্টিং নাইফ আমি দেখলুম, দেখিয়ে দেখিয়ে হয়রান হয়ে গেল দোকানদারেরা–কিন্তু ঠিক ওই জাতের ছুরি কোথাও পেলুম না।

এবার এসেছি সর্বশেষ শহরে। এখান থেকেই ওঁরা মেরু অঞ্চলে রওনা হয়ে গেছেন। কিন্তু না–এখানেও ও-ছুরির সন্ধান মিলল না।

হতাশ হয়ে যেদিন ফিরে আসব, সেদিন চলছিলুম, শহরের একটা পুরনো অঞ্চল দিয়ে। শ্রীহীন ছোট ছোট দোকান দুধারে, কেনা-বেচাও খুব কম। তার মধ্যে হঠাৎ ওই তো! ওই ছোট্ট দোকানটিতে ঠিক ওই ধরনের ছুরি ঝুলছে দু-তিনটে ওই জিনিস।

এক বুড়ো তার মালিক। সেই ওগুলো তৈরি করে।

হাতে নিয়ে দেখলুম, যেমন-তেমন কাঠের বাঁটে তৈরি সব সাদামাটা ছুরি। আর প্রায় প্রত্যেকটার পেছনেই একটু করে লোহার মুখ বেরিয়ে রয়েছে।

বুড়ো বললে, শিকারের সিজনে ওগুলো অনেক বিক্রি করি আমি।

আচ্ছা–অমুক মাসে, বুড়ো এক প্রফেসর কি এসেছিলেন দোকানে? তিনি কি কিনেছিলেন একটা? এই রকম চেহারা, এই রকম গোঁফ

দাঁড়ান–দাঁড়ান। প্রোফেসর একটু খিটখিটে, ভুরু কুঁচকে রয়েছেন, এই তো? দাঁড়ান-খাতাটা খুলি।

খাতায় পাওয়া গেল নাম। প্রোফেসর একস।

এই হল কেস। আদালতের রায় বললে, এটা একটা আকস্মিক দুর্ঘটনা।

প্রোফেসর ওয়াইয়ের মৃত্যুর আয়োজন তৈরিই ছিল। কেউ তাঁর সাক্ষী ছিল না, তাঁর কথা বিশ্বাস করবার মতো কেউ ছিলেন না, বরং বাড়তির মধ্যে ছিল একস-এর চিঠিগুলি আর ওয়াইয়ের নিজের সেই মারাত্মক ডায়েরি।

কিন্তু নিরপরাধের মুক্তির সূত্রও থাকে। সে-সূত্রও ছিল পোস্টমর্টেম রিপোর্টের মধ্যে : অস্বাভাবিক, অমানুষিক শক্তিতে ছোরাটা চোখের মধ্যে বিঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে।

একটি জানালা খুলতে

ঘুম থেকে উঠে ঘনশ্যাম ঘোড়ুই আবিষ্কার করল, জানালাটা খোলা যাচ্ছে না। জানালায় নতুন রং করা হয়েছিল, তার ওপর কাল রাত্তিতে গেছে ঝমঝম বৃষ্টি। সেই বৃষ্টিতে জানালার কাঠ কেঁপে উঠেছে তার কাঁচা রং–স্রেফ বজ্র আঁটুনি যাকে বলে।

প্রথমে জয় গুরু বলে ছিটকিনি ধরে টানতে লাগল, কিছুই হল না। তারপর জয় মা কালী বলে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে হেঁচকা মারতে লাগল–ফল যথা পূর্বং। লাভের ভেতর পাঁকাটির মতো আঙুলগুলো খট খট করতে লাগল, হাতের তেলো লাল হয়ে ফোঁসকা পড়বার জো হল। গা দিয়ে কালঘাম ছুটে বেরুল। হাল ছেড়ে দিয়ে কিছুক্ষণ বসে বসে হাঁপাতে লাগল ঘনশ্যাম।

আচ্ছা প্যাঁচে পড়া গেল এই সকালবেলায়। অথচ ঘরে এই একটি মাত্র জানালা খুলতে পারলে আলো বাতাস সব বন্ধ, তায় আবার বাইরে থমথমে মেঘ জমাট বেঁধে আছে।

বাড়িটা দোতলা। ঘনশ্যাম ঘোড়ই ঝোলা গুড় আর চিটে গুড়ের কারবারী, একতলায় তার দোকান গুদাম এইসব। দোতলায় এই একটি ঘর, তাতে তার শয়ন পর্ব চলে। কয়েকটা চিটে গুড়ের হাঁড়িও সাজানো আছে একদিকে। রান্নাবান্না, সময়মতো একলা বসে হিসেব-পত্তর মেলানো, সবই চলে ওই ঘরের ভেতর। অতএব সবেধন নীলমণি জানালাটাকে খুলতে না পারলে সারাদিন লণ্ঠন জ্বেলে রাখতে হবে। তাতে খামকা একরাশ কেরোসিন বরবাদ।

ঘনশ্যাম জবরদস্ত কৃপণ। স্ত্রী নেই, খুব সম্ভব কিপটেমির জ্বালায় সে বেচারা না খেয়ে মরেছে। একটা মাত্র জোয়ান ছেলে–সে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যোগ দিয়েছে মিলিটারিতে। সেজন্য ঘনশ্যামের কোনও দুঃখ নেই। অনেক খরচা বেঁচে গেছে, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে সে। বাড়িতে একা। কর্মচারী বলতে আছে একজন মাত্র-জলধর জানা। কিন্তু সে থাকে মাইল দেড়েক দূরে। বেলা দশটা নাগাদ দোকানে আসবে। তার মানে আরও তিন ঘণ্টা ঘনশ্যামকে একা থাকতে হবে এবং তিন ঘণ্টা ধরে জানালাটাকে কিছুতেই বন্ধ রাখা যায় না।

কাজেই বাধ্য হয়ে পালোয়ান মতো কাউকে ডাকা দরকার। একটা কুলিটুলি হলেই সুবিধা। কিন্তু যাকেই ডাকা যায়–কম করে অন্তত চার আনা পয়সাও তাকে বকশিশ দিতে হবে। ভাবতেই ঘনশ্যামের মন খারাপ হয়ে গেল।

গুটি গুটি ব্যাজার মুখে রাস্তায় বেরুল ঘনশ্যাম। আর বেরুতেই সঙ্গে সঙ্গে খুশির হাসিতে তোবড়ানো মুখ ভরে উঠল তার। বরাত একেই বলে।

একটু দূরেই গান গাইতে গাইতে আসছে গঙ্গারাম। গঙ্গারাম হালদার। তার বিকট বাজখাই গানের তাড়ায় উর্বশ্বাসে গোটা তিনেক কুকুর ছুটে পালাল।

গঙ্গারামের মাথা মোটা, লেখাপড়া বেশি দূর এগোয়নি। বাপের অবস্থা তার ভালো, জমিজমা আছে। ছেলের মগজ নিরেট দেখে ধর্মের নামে ছেড়ে দিয়েছে তাকে।

লেখাপড়া নাই করুক, ডন-বৈঠক করে গঙ্গারাম শরীর বাগিয়েছে একখানা। তিনটে বাঘে তাকে খেয়ে শেষ করতে পারবে না। গলার আওয়াজে তার মেঘ ডাকে। পাড়ায় শখের যাত্রাটাত্রা হলে সে তাতে ভীম সাজে। পার্ট-টার্ট বিশেষ করতে হয় না, গদা ঘুরিয়ে গোটাকয়েক গর্জন করলেই আসরসুদ্ধ লোকের পিলে চমকে যায়।

ঘনশ্যাম গঙ্গারামকে দুচক্ষে দেখতে পারে না। কিন্তু আজ গঙ্গারামকে দেখবামাত্র তার প্রাণ-মন জুড়িয়ে গেল! ঝোলা গুড়ের চাইতেও মিঠে সুরে ডাকল : বাছা গঙ্গারাম!

গঙ্গারাম বললে, কী বলছেন ঘনু জ্যাঠা?

–আমার ঘরের জানালাটা শক্ত হয়ে এঁটে বসেছে, বাবা, কিছুতেই খোলা যাচ্ছে না। একটু যদি টেনে খুলে দাও

সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গারাম উৎসাহিত হয়ে উঠল; এ আর শক্ত কথা কী জ্যাঠা, এখুনি খুলে দিচ্ছি। জানালা তো জানালা, তোমার বাড়ির সব দরজা কবজাসুদ্ধ টেনে খুলে বের করে দেব।

না-না-না–ঘনশ্যাম আঁতকে উঠল : দরজা-টরজা সব ঠিক আছে, তোমায় কিছু করতে হবে না। শুধু জানালাটা খুলে দিলেই হবে।

–এ তো এক মিনিটের কাজ। চলুন।

কিন্তুদেখা গেল, জানালা অত সহজেই খোলবার পাত্র নয়। দাঁত কিড়মিড় করে মারো জোয়ান হেঁইয়ো। বলে ডাকাত-পড়া হাঁক ছেড়ে পনেরো মিনিট সবরকম কসরত করে গঙ্গারামও ঘোল খেয়ে গেল। ঝপাৎ করে বসে পড়ল মেজের উপর, ফোঁস ফোঁস করে হাঁপাতে লাগল।

–অনেক জানালা দেখেছি মশাই, কিন্তু এমন বিদঘুঁটে বিচ্ছিরি জানালা তো কখনও দেখিনি।

-বাবা গঙ্গারাম, তুমিও পারলে না।–ঘনশ্যাম কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল : তা হলে কি ও জানালাটা আর কোনওদিন খোলা যাবে না? চিরদিনই বন্ধ হয়েই থাকবে?

গঙ্গারামের আত্মসম্মানে ঘা লাগল।

বন্ধ থাকবে–থাকলেই হল? ইয়ার্কি নাকি? জানালা না খুলে যদি আর বাড়ি ফিরি তা হলে আমার নাম গঙ্গারামই নয়। গঙ্গারামই গোঁ গোঁ করতে লাগল। তারপর মিনিটখানেক চোখ পাকিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল : আচ্ছা, এবার–এগেন!

বলেই কাঠের চেয়ারটা হড়হড়িয়ে টেনে নিয়ে গেল। বললে–জানালার মাথার দিকটা হাতে পাচ্ছি না। ওইখানেই আটকে আছে মনে হচ্ছে। এবার মাথাটা ধরে টেনে দেখব।

চেয়ারের ওপর ব্যস্ত হয়ে দাঁড়াতেই–খটাং। বাপস বলে চেঁচিয়ে উঠল গঙ্গারাম।

ব্যাপার আর কিছুই নয়। জানালার ঠিক ওপরেই দেওয়াল-ঘড়ি, তার তলার দিকের ফুলো অংশটা গঙ্গারামের মাথায় লেগেছে।

–এমন বাজে জায়গায় ঘড়ি রাখেন, আক্কেল-পছন্দ নেই আপনার? মাথায় হাত বুলিয়ে গঙ্গারাম বললে, আমার চাঁদি একেবারে ফুটো করে দিয়েছে। নিন–ধরুন–

কী ধরতে বলছে সেটা বোঝবার আগেই কেলেঙ্কারি ঘটে গেল একটা। গঙ্গারাম পত্রপাঠ উপড়ে আনল ঘড়িটাকে। আর ঘনশ্যাম হাঁ হাঁ করে ওঠবার আগেই ধাঁই করে পড়ে গেল মেজেতে। ঝনঝনাৎ আওয়াজ তুলে ঘড়ির বারোটা বাজল।

ঘনশ্যাম আর্তনাদ করে উঠল : এ কী করলি, ওরে হতভাগা এ কী করলি! চল্লিশ বছরের পুরনো বাবার আমলের এমন জাপানী ঘড়িটা–

–আপনাকে ধরতে বললুম। ধরলেন না কেন?–গঙ্গারাম বিকট গলায় ধমক দিলে : নিজের দোষেই ঘড়ি গেছে আপনার। এমন বেয়াড়া জায়গায় ওটাকে রাখলেনই বা কেন? এখন বেশি চেঁচামেচি করবেন না, কাজ করতে দিন।

হায় হায়–অমন ঘড়িটা

–শাটাপ! গঙ্গারাম হুঙ্কার করল : ডিসটার্ব করবেন না বলে দিচ্ছি।

হুঙ্কার শুনে ঘনশ্যাম থমকে গেল। গঙ্গারাম তখন জানালার মাথাটা ধরে দারুণভাবে টানাটানি করছে। চেয়ারটা মড়মড় করে উঠল।

করুণ গলায় ঘনশ্যাম বললে, বাবা গঙ্গারাম, আমি বলছিলাম, জানালা খোলবার দরকার নেই, ওটা বরং বন্ধই থাক। তুমি তো বিস্তর পরিশ্রম করলে, এবার বাড়ি যাও।

বাড়ি যাব? জানালা না খুলেই? চেয়ার থেকে নেমে পড়ে গঙ্গারাম বললে, সে-পাত্র আমাকে পাওনি। এবার আমি বুদ্ধি পেয়ে গেছি। পেছন থেকে ধাক্কা দিলেই জানালা খুলে যাবে।

–কিন্তু দোতলার জানালা যে! ধাক্কা দেবে আকাশ থেকে নাকি?

–আকাশ থেকে কেন? মইয়ে চেপে!

মই? মই আমি কোথায় পাব?

–মই আছে। ওপাশে রামকানাই কাকার বাড়িতে। নিয়ে আসছি।

-রামকানাই?–ঘনশ্যাম বিষম খেল : রামকানাইয়ের সঙ্গে আমার যে দুবছর মুখ দেখাদেখি বন্ধ, দারুণ ঝগড়া। কখনও মই দেবে না।

–দেয় কিনা দেখছি বলে গঙ্গারাম টুক করে একটা পেতলের ঘটি তুলে নিয়ে বললে–এইটে জামিন রেখে নিয়ে আসব।

–আহা-হা, করছ কী! অনেক দাম ও-ঘটিটার। ওহে ও গঙ্গারাম

আর গঙ্গারাম! তিন লাফে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। যাবার সময় বলে গেল, ঘরটা ততক্ষণ সাফ করে ফেলুন আপনি। বিস্তর ভাঙা কাচ, পায়ে ফুটলে মারা পড়বেন।

ঘর সাফ করা মাথায় রইল, ঘনশ্যামও ছুটে বেরুল পিছনে। কিন্তু গঙ্গারামকে ঠেকায় কার সাধ্যি! ঠিক তিন মিনিটের মধ্যেই ঘটি জামিন রেখে সে মই নিয়ে এল রামকানাইয়ের কাছ থেকে।

কাতর স্বরে ঘনশ্যাম বললে, দোহাই বাবা গঙ্গারাম, জানালা যেমন আছে থাক, তুমি মই ফেরত দিয়ে আমার ঘটি নিয়ে এসো।

আনবখন। ঘটি তো পালাচ্ছে না। আপনি একটু চুপ করে থাকুন না ঘনুজ্যাঠা–দেখুন না আমি কথাটা শেষ হল না। তার আগেই মচমচমড়াৎ!

দেওয়ালে মই রেখে উঠতে চেষ্টা করছিল গঙ্গারাম সামলে নিলে কোনওমতে।

মই গেল! ঘনশ্যাম গগনভেদী হাহাকার করে উঠল; তাহলে আমার ঘটিটা

-ঘটিও গেল। তাতে আর কী হয়েছে। একটা পুরনো ঘটি গেল। তিনটে নতুন কিনতে পারবেন।

ঘনশ্যামকে সান্ত্বনা দিয়ে গঙ্গারাম বললে কিন্তু ব্যাপারটা কী জানেন ঘনু জ্যাঠা-জানালা ওই ভেতর থেকেই খুলতে হবে।

না, জানালা খুলতে হবে না! ঘনশ্যাম তারস্বরে বললে, জানালা আমি কিছুতেই খুলব। কোনওদিন খুলব না, কাউকে খুলতে দেব না, তুমি এখন যাও, দয়া করে যাও–আমাকে রেহাই দাও।

জানালা আমি খুবই খুলে যাব না। হুঁ হুঁ, এ আমার ভীমের প্রতিজ্ঞা!–গঙ্গারাম তার আটচল্লিশ ইঞ্চি বুক দুহাতে থাবড়ে নিলে একবার! জানালা খুলবে, তবে আমি নড়ব এখান থেকে। কিন্তু খুলতে হবে ভেতর থেকেই। শুধু একগাছা দড়ি যদি পাই

দড়িটড়ি নেই। আকাশ মেঘে অন্ধকার করে এসেছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, তুমি বাড়ি যাও গঙ্গারাম!

–ছোঃ বজ্রবিদ্যুৎ! ও সবে আমার কী হবে?

গঙ্গারাম তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল : যদি কেবল একগাছা দড়ি পাই ইয়াঃ, ওই তো দড়ি।–

আরে-আরে–আরে—

ঘনশ্যাম চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু তার আগেই দরজার সামনে বাঁধা তার গোরুর গলা থেকে দড়ি খুলে ফেলল গঙ্গারাম।

–আরে গোরুটা বড্ড পাজি, একবার ছুটলে আর ধরা যায় না ওটা

ঘনশ্যামের চিৎকারেই কিনা কে জানে

দড়ি খোলা পাওয়ামাত্র গোক প্রাণপণে ছুটল। চার পা তুলে চক্ষের পলকে উধাও হয়ে গেল মাঠের দিকে।

ধরো-ধরো, গোরু ধরো আগে

চোখ পাকিয়ে এবার আকাশ ফাটানো হাঁক ছাড়ল গঙ্গারাম।

-গোরু ধরবেন আপনি; আমি কেন? আমি তো জানালা খুলব। লুক হিয়ার ঘনু জ্যাঠা, আমার কাজে সমানে বাধা দিচ্ছেন আপনি। ফের যদি একটাও কথা বলেন–সামনের এই ভরা পুকুর দেখতে পাচ্ছেন? ঠ্যাং ধরে সোজা ওর ভেতর ছুঁড়ে ফেলে দেব।

–আমি পথে বসলাম–ভাঙা গলায় এই কথা বলে ঘনশ্যাম রাস্তার মধ্যে বসে পড়ল।

কিন্তু বসেও কি থাকবার জো আছে? গঙ্গারাম দড়ি নিয়ে দোতলায় চড়েছে। কাজেই ঘনশ্যামকেও রুদ্ধশ্বাসে পিছু নিতে হল।

তড়িৎকর্মা গঙ্গারাম এবার জানালার কড়ার সঙ্গে গোরুর দড়ি বেঁধে ফেলল শক্ত করে।

–এইবার, এইবার যাবে কোথায়? মারো টান-টানো–আরো জোর ঘোঁ—ঘোঁ–ঘোৎ..টান–টান—টা–কড়াৎ..

শেষ কড়াৎটা দড়ি ছেঁড়বার শব্দ।

শুধু দড়িই ছিঁড়ল না–চিত হয়ে ছিটকে পড়ল গঙ্গারাম। পড়ল ঘনশ্যামের ওপর। ঘনশ্যাম পড়ল কোনায় থরেথরে সাজানো চিটে গুড়ের হাঁড়ির ওপর। একসঙ্গে চারটে হাঁড়ি ভাঙল, চিটে গুড় মেখে ভূত হয়ে ভালো করে উঠে বসবার আগেই

বাইরে মেঘে থমথম আকাশ থেকে ছুটে এল ঝোড়ো বাতাস। এল বোধহয় সওর মাইল স্পিডে।

আর এতক্ষণে বন্ধ জানালাটা সেই হাওয়ার ধাক্কায় বাজের মতো শব্দ করে খুলে গেল।

 ওস্তাদের মার

রেলগাড়ির সঙ্গে কুঁড়ির যে এমন আড়াআড়ি সম্পর্ক, এর আগে কোনওদিন সেটা টেরও পাননি শিবুমামা। ঝটাং ঝট–ঝটাং ঝট দিল্লি মেল ছুটছে। সেই সঙ্গে ছুটছেন শিবুমামাও। নামবেন হাথরাসে–সেখান থেকে বেড়াতে যাবেন মথুরায়। কিন্তু দুলুনির চোটে সন্দেহ হচ্ছে সশরীরে নয়, অশরীরী হয়েই তাঁকে মথুরায় পৌঁছুতে হবে।

চিত হয়ে শুলেন–ভুঁড়িটা অ্যাটলান্টিকের মতো দুলতে লাগল। কাত হয়ে শুলেন–পেটের মধ্যে সোডার বোতলের মতো ঝাঁকাতে লাগল। উপুড় হয়ে শুলেন সারা শরীর বলের মতো লাফাতে লাগল।

নাঃ–অসম্ভব!

টাকার শোকে শিবুমামার হৃদয় হাহাকার করতে লাগল। মিথ্যে মিথ্যিই এতগুলো টাকা খরচ করে সেকেন্ড ক্লাসে বার্থ রিজার্ভ করলেন। ঘুমোনোই যদি না গেল তা হলে ঘুষোঘুষি করে জানালা দিয়ে থার্ড ক্লাস কামরায় চাপলেই বা ক্ষতি ছিল কী? বরং সেইটেই ঢের ভালো হত, শিবুমামা ভেবে দেখলেন। ভিড়ের চাপে নড়াচড়া করা তো দুরের কথা, ট্যাঁ-ফোঁ করার জো থাকত না ভুড়ির। বরং একফাঁকে মোটাসোটা কারও কাঁধের উপর মাথাটাকে চড়িয়ে দিয়ে ঘুমিয়েও নিতে পারতেন খানিকটা।

কিন্তু সেকেন্ড ক্লাসের এই সুখশয্যা শরশয্যা বলে মনে হচ্ছে তাঁর।

কামরায় দুটি মাত্র প্রাণী। ও-পাশের বার্থে রোগাপটকা এক ছোকরা অঘোরে ঘুমুচ্ছে। শিবুমামার হিংসে হতে লাগল। এই রাত বারোটায় তিনি যখন ঠায় জেগে, তখন আর একজন এমন করে সুখনিদ্রা দিচ্ছে। তাঁর নাকে যখন শ্যামা পোকা ঢুকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে, তখন আর-একজন নাক ডাকাচ্ছে। এ কী নির্মম নিষ্ঠুরতা! কী হৃদয়হীন স্বার্থপরতা।

এ কিছুতেই বরদাস্ত করা যাবে না।

শিবুমামা আস্তে আস্তে উঠে এলেন।

মশাই শুনছেন?

সাড়া নেই।

শুনতে পাচ্ছেন, অ মশাই?

–উ?–ঘুমন্ত ছোকরার নাকের ডাক বন্ধ হল।

–শুনুন না একবার

–অ্যাঁ–কী হয়েছে?–বলে ছোকরা ধড়মড় করে উঠে বসল : ব্যাপার কী? এত রাতে এমন করে ডাকাডাকি করছেন কেন?

শিবুমামা টাক চুলকে নিলেন একবার।

না ইয়ে, এই জিজ্ঞেস করছিলুম, আপনি ঘুমোচ্ছেন কি না।

খানিকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে শেষে ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে উঠল ছোকরা।

–আচ্ছা লোক তো মশাই! ঘুমুচ্ছি কি না জানবার জন্যে আমাকে ঘুম থেকে জাগালেন!

শুনে শিবুমামা ফ্যাক-ফ্যাক করে হাসলেন।

–আহা তা নইলে বুঝব কেমন করে যে সত্যিই ঘুমোচ্ছন না চালাকি করে মটকা মেরে পড়ে আছেন।

–এই মাঝরাতে দিল্লি মেলে কোন দুঃখে মটকা মেরে পড়ে থাকব মশাই! চালাকিই বা করতে যাব কার সঙ্গে? আপনি ত ভারি ফেরেব্বাজ লোক! যান যান, কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করে বিরক্ত করবেন না। ঘুমুতে দিন।

–চটছেন কেন দাদা?–মুখভরা হাসি টেনে শিবুমামা লোকটির বিছানার পাশে বসে পড়লেন, বসে পড়লেন একেবারে গা ঘেঁষেই! বললেন–সত্যিই তো আর ঘুমুচ্ছিলেন না। দিব্যি নিরিবিলিতে শুয়ে-শুয়ে হাঁসের ডিম খাচ্ছিলেন।

কী যা তা বকছেন মশাই! মাথা খারাপ নাকি আপনার? শান্তিপুরের গোঁসাই বংশের ছেলে আমি। হাঁসের ডিম খাওয়া কী বলছেন, হাঁস দেখলে গঙ্গা স্নান করে ফেলি।

–সেই জন্যেই তো দিল্লি মেলে চাদর মুড়ি দিয়ে চুপিচুপি ডিম খাচ্ছিলেন!

লোকটা এবার তেড়ে উঠল–মিথ্যে বদনাম দেবেন না মশাই, জানেন এর জন্যে আপনার নামে মানহানির মামলা করতে পারি আমি?

না, পারেন না–শিবুমামা আবার ফ্যাক-ফ্যাক করে হাসলেন : হাতে-হাতে ধরা পড়ে গেছেন।–বলেই খপ করে লোকটার চাদরের তলায় হাত দিয়ে একটা ডিম বার করে আনলেন : এটা কী?

–অ্যাঁ–ডিম!–লোকটার চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠল।

–হ্যাঁ, ডিম।

–অসম্ভব, হতেই পারে না।

হতেই পারে না! তা হলে বালিশে ডিম পাড়ল বলতে চান? হাঁসে ডিম পাড়ে মশাই, মুরগিতেও পাড়ে, ঘোড়ও পাড়ে কখনও কিন্তু বালিশে ডিম পাড়ে–এ তো কখনও শোনা যায়নি! তাও আবার সেদ্ধ ডিম!

–তা হলে আপনিই চালাকি করে বালিশের নীচে ডিম রেখেছেন। লোকটা চেঁচিয়ে উঠল।

–আমি? আমি কেন রাখতে যাব? কী দায় আমার? পরের বিছানায় সেদ্ধ ডিম রাখার চেয়ে নিজের পেটে রাখাই আমি ঢের বেশি বুদ্ধিমানের কাজ মনে করি।

চক্রান্ত! ভীষণ ভয়ঙ্কর চক্রান্ত।–লোকটা প্রায় কেঁদে ফেলল : আমার সর্বনাশ করবার ফন্দি! জানেন, আমি ডিম খেয়েছি শুনলে বাবা দারোয়ান দিয়ে আমাকে বের করে দেবেন? তিন লাখ টাকার সম্পত্তি একেবারে বরবাদ!

শিবুমামা বললেন : আহা-হা, চুক চুক!

-চুক চুক? চুক চুক করেই চুকিয়ে দিলেন আপনি?–এদিকে যে আমার বুক ধুক ধুক করছে মশাই! উঁহু, এ সব আপনার ষড়যন্ত্র। হীন, কুটিল ষড়যন্ত্র। নিশ্চয়ই কোনও গুণ্ডাদলের লোক আপনি! নির্ঘাত লোকটার গলা কাঁপতে লাগল, চিড়বিড় করে উঠে দাঁড়াল সে : আমি–আমি এখুনি চেন টানব

চেন টানবার আগেই তাকে টেনে বসিয়ে দিলেন শিবুমামা।

–আহা-হা, অত খেপছেন কেন? আমার সামনে ডিমটা খেতে যদি আপনার চক্ষুলজ্জা হয়, তা হলে আমিই খেয়ে নিচ্ছি না হয়। সশব্দে ডিমটাকে মুখে পুরলেন শিবুমামা, চোখ বুজে পরম আরামে চিবুতে লাগলেন : হুঁ, ভালোই ডিমটা। পচা নয়।

রাখুন আপনার ভালো ডিম। ছাড়ুন আমাকে আমি চেন টানব।

–অত ঘাবড়াচ্ছেন কেন?-ডিমটাকে ম্যানেজ করে শিবুমামা বললেন : কেন ভয় পাচ্ছেন এমন করে? আমার মতো নিরীহ একটা ভালো লোককে দেখে গুণ্ডা বলে ভ্রম হচ্ছে আপনার? দুটোর জায়গায় চারটে চোখ নিয়েছেন, তবু মানুষ চিনতে পারেন না?

বলেই ধাঁ শিবুমামা ছোরার নাকের ওপর থেকে চশমাটা তুলে নিলেন।

–আহা করছেন কী? চশমা দিন মশাই।

কী হবে চশমা দিয়ে? যে-চশমা পরে ভদ্রলোককে গুণ্ডা বলে মনে হয়, সে চশমা থাকলেই কী, আর গেলেই কী?–বলেই শিবুমামা জানলা দিয়ে হাত গলিয়ে দিলেন বার করে আনলেন খালি হাত।

ছোকরা আর্তনাদ করে উঠল।

–অ্যাাঁ! করলেন কী? ফেলে দিলেন চশমাটা?

–দিলাম বই কি! চুকিয়ে দিলাম আপদ।

-সোনার ফ্রেমের চশমা মশাই, বাইফোকাল লেন্স। কমসে কম দুশো টাকা দাম। জানলা দিয়ে ফেলে দিলেন–আপনি তো বদ্ধ পাগল!

ছোকরা আবার চেঁচিয়ে উঠল : এইবার আমায় কামড়ে দেবেন দেখছি! আর পাগলে কামড়ালেই জলাতঙ্ক! আমি চেন টানব-নির্ঘাত চেন টানব

বলেই এক লাফে চেন ধরে ঝুলে পড়তে গেল। কিন্তু তার আগেই তাকে ধরে ঝুলে পড়লেন শিবুমামা। একেবারে চিত করে ফেললেন মেজের ওপর।

ছোকরা গ্যাঙাতে গ্যাঙাতে বলল : হেলপ হেলপ–মার্ডার! মার্ডার।

–কিসের মার্ডার? কে কাকে মার্ডার করে?–শিবুমামা ছোকরার ঘাড় ধরে বার্থের ওপর তুলে নিলেন : আমি থাকতে কে মার্ডার করবে আপনাকে?

আমার দুশো টাকা দামের চশমা–

চশমা চশমা করে খেপে গেলেন যে। ওই তো আপনার বুক পকেটে চশমা। রয়েছে বলেই ঝাঁ করে তার পকেট থেকে চশমা বের করে আনলেন শিবুমামা।

অ্যাঁ।

–অ্যাঁ কী মশাই। নিজের পকেটে চশমা রেখে চেন টানতে যাচ্ছিলেন। এক্ষুনি পঞ্চাশ টাকা ফাইন হত, খেয়াল আছে!

–আপনি–আপনি ভেলকি জানেন মশাই।–ছোকড়া বিড়বিড় করে বললে।

–ভেলকি! ভেলকি-টেলকির কোনও ধার ধারি না আমি। একরাশ ডিম খেয়ে আপনার পেট গরম হয়েছে, তাই ও-সব খেয়াল দেখছেন।

খবরদার বলছি, ডিম ডিম করবেন না।–এত দুঃখের মধ্যেও খেঁকিয়ে উঠল লোকটা : জানেন বাবার কানে গেলে কী অবস্থা হবে আমার? স্রেফ কান ধরে রাস্তায় নামিয়ে দেবেন। আমাকে!

ভয় নেই মশাই–আশ্বাস দিয়ে শিবুমামা খ্যাঁক-খ্যাঁক করে হাসলেন : আমি কাউকে বলতে যাচ্ছি না। বলেই বা আমার লাভ কী? আপনাকে ত্যাজ্যপুত্র করে আপনার বাবা তো আর আমাকে সম্পত্তি তুলে দেবেন না। সে-ভরসা থাকলে না হয় দেখা যেত চেষ্টা করে। আমি বলছিলাম, ভবিষ্যতে অমন করে আর রাত জেগে ডিম খাবেন না। মাথা গোলমাল হয় ওসব খেলে।

শিবুমামা উঠে পড়লেন।

–নিন, ঘুমুন এবার।

নিজের সিটে ফিরে এলেন শিবুমামা, একটা সিগারেট ধরিয়ে নিশ্চিন্তে টানতে লাগলেন। ছোকরা কিছুক্ষণ হাঁ করে তাঁর দিকে তাকিয়ে বসে রইল। অনেকগুলো কথা তার গলার ভেতর গজগজ করে উঠছিল, কিন্তু বলবার মতো সাহসই খুঁজে পেল না সে।

তারপর সত্যিই মাথা গরম হয়ে গেছে মনে করে নিজের ব্রহ্মতালুতে টক-টক করে টোকা দিলে গোটা তিনেক। দুবার পেটে থাবড়া দিয়ে বুঝতে চাইল সত্যি সত্যিই পেট গরম হয়েছে কি না। শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়ে আবার চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল–পাঁচ মিনিটের মধ্যে নাক ডাকতে শুরু করল তার।

শিবুমামা চুপচাপ বসে সিগারেট টানতে লাগলেন।

ঝটাং ঝট–ঝটাং ঝট

দিল্লি মেল অন্ধকারের মধ্য দিয়ে সমানে ছুটছে। রাত প্রায় দুটো, গভীর ঘুমের মধ্যে তলিয়ে আছে ছোকরা।

-খুন-খুন বাঁচাও

বিকট বিকৃত চিৎকার উঠল একটা। সে-চিৎকারে, ধড়মড় করে লাফিয়ে উঠতে গেল ছোকরা, তারপর চাদরে পা জড়িয়ে হুড়মুড় করে পড়ে গেল মেজের ওপর।

কিন্তু উঠে দাঁড়াতেই যে-দৃশ্য তার চোখে পড়ল, তাতে চোখ ঠিকরে বেরিয়ে এল তার। এর মুহূর্তে সারা শরীর হিম হয়ে গেল, গলা দিয়ে বেরিয়ে এল একটা ভয়ঙ্কর আর্তনাদ।

নিজের বার্থে হাত-পা ছড়িয়ে চিত হয়ে পড়ে আছেন শিবুমামা। একটা ধারালো চকচকে ছোরা তাঁর গলায় বসানো। একরাশ রক্ত জমেছে তাঁর বুকের ওপর। চোখ দুটো বিস্ফারিত–ট্রেনের তালে-তালে শুধু তার ভুড়িটাই দোল খাচ্ছে।

আর একটা আর্তনাদ তুলেই সে পেছন ফিরে চেনের দিকে লাফ মারল। এবার আর তাকে বাধা দিলে না কেউ। চেন ধরে সটান ঝুলে পড়ল সে।

ঘটাং ঘট–ঘ্যাস-ঘ্যাস-ঘ্যাস–দিল্লি মেল থেমে গেল।

বাইরে কোলাহল উঠল। ট্রেন থেকে নেমে পড়ল লোকজন। খানিক পরেই ঘটাং করে খুলে গেল কামরার দরজা। লণ্ঠন হাতে ঢুকলেন গার্ড, তার পেছনে আরও পাঁচ-সাতজন। ছোকরা তখনও চেন ধরে ঝুলছে চোখ বুজেই।

ব্যাপার কী? অমন করে ঝুলছেন কেন চেন ধরে?–হেঁড়ে গলায় জানতে চাইলেন গার্ড।

–খুন হয়েছে তেমনি চোখ বুজে জবাব দিলে ছোকরা।

–খুন? কোথায় খুন? হকচকিয়ে গার্ড উঠে এলেন ভেতরে।-কে খুন হল? লাশ কই?

পাশের বার্থে।

পাশের বার্থে!–গার্ডের বিস্ময় সীমাহীন : পাশের বার্থে তো কেউ নেই মশাই। একটা বিছানা আছে বটে, কিন্তু লাশফাশ তো দেখছি না।

–আছে–আছে, ভালো করে দেখুন।

ভালো করে দেখব? লাশ কি ছারপোকা মশাই যে বিছানার ভেতর ফস করে লুকিয়ে যাবে?–গার্ড বার্থের নীচে উবু হয়ে উঁকিঝুঁকি মারলেন : কিচ্ছু না–কোথাও কিছু নেই। লাশ গেল কোথায়?–গার্ড বিরক্ত হয়ে ছোকরার জামা ধরে টান মারলেন, নেমে পড়ুন না মশাই! খামকা ছিঁড়ছেন কেন কোম্পানির চেন?

টয়েলেটের দরজা খুলে শিবুমামা বেরিয়ে এলেন।

ব্যাপার কী, এত চেঁচামেচি কিসের? আবার গাড়িতে গার্ড সাহেব যে। কী হল?

শিবুমামার গলা শুনে ছোকরা চেন ছেড়ে দিয়ে ধপ করে পড়ে গেল মাটিতে।

–আপনি-আপনি!

–হাঁ আমি। আমি বই কি। অত ঘাবড়ে গেলেন কেন? চেন ধরেই বা ঝুলছেন কী জন্য?

–আপনি, আপনি খুন হননি?–ছোকরার গলা দিয়ে অদ্ভুত আওয়াজ বেরুল একটা।

-আমি খুন হব? কেন, কোন দুঃখে? খুন হওয়ার কী দায় আমার? এখনও খেয়াল দেখছেন বুঝি?–শিবুমামার স্বরে ভর্ৎসনা : বললাম রাত্তিরে অত ডিম খাবেন না–পেট গরম হবে…।

থামুন–গার্ড হেঁড়ে গলায় বাধা দিলেন, এগিয়ে গেলেন ছোকরার দিকে : ইনিই খুন হয়েছিলেন বলছেন আপনি?

মুখ দিয়ে আর কথা বেরল না ছোকরার। শুধু ঘাড় নাড়ল বোকার মতো।

কতটা সিদ্ধি খেয়েছিলেন?

ছোকরা ফ্যাঁচ করে উঠল : সিদ্ধি খাই না আমি।

শিবুমামা মাথা নাড়লেন : ঠিক সিদ্ধি উনি খান না। কয়েকটা ডিম খেয়েছিলেন খালি। তাইতেই পেট গরম হয়ে এই কাণ্ড।

খবরদার, ডিম-ডিম করবেন না।-ছোকরা চেঁচিয়ে উঠল।

গার্ড বললেন : হুম, চুপ করুন এবার। আপনার নাম?

ঘনশ্যাম গোঁসাই।

যাবেন কোথায়?

–এটাওয়া।

একটা নোটবই বের করে টুকে নিলেন গার্ড : নামবার আগে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে যাবেন কোম্পানিকে।

সদলবলে গার্ড বিদায় নিলেন। আবার গাড়ি ছাড়ল।

ঘনশ্যাম ঝিম মেরে বসেছিল। খানিক পরেই মাথা তুলে বললে : বুঝেছি!

শিবুমামা মিটমিট করে হাসছিলেন, বললেন কী বুঝেছেন?

–আপনি ম্যাজিসিয়ান।

খেলা যথেষ্ট দেখানো হয়েছে মনে করে খুশিতে হা হা করে হেসে উঠলেন শিবুমামা : এতক্ষণে বুঝেছেন দেখছি। বড্ড দেরিতে বোঝেন আপনি।

ঘনশ্যাম বুললে : হুঁ!

শিবুমামা বললেন : মিথ্যে ঘুমিয়েই সময় নষ্ট করতেন। তার চাইতে দিব্যি সারারাত ম্যাজিক দেখলেন। ভালো লাগল না?

ঘনশ্যাম বললে : চমৎকার! কিন্তু আপনার ম্যাজিকের টিকিটের হার বড় বেশি। পঞ্চাশ টাকা।

শিবুমামা আবার হা-হা করে হেসে উঠলেন।

ঘনশ্যাম বললে : আপনার ম্যাজিক খুব এনজয় করলাম মশাই। শুধু মনেপ্রাণে নয়, দেহেও বটে। দু-দুবার যা আছাড় খেয়েছি মেঝের ওপর, সাতদিনে গায়ের ব্যথা সারলে হয়। ঘনশ্যাম একবার ঘড়ির দিকে তাকাল : কিছু যদি মনে না করেন আমিও একটু-আধটু ম্যাজিক জানি।

–আপনিও ম্যাজিক জানেন?–এবার শিবুমামার তাজ্জব লাগবার পালা।

–হাঁ, অল্প-স্বল্প।–ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ঘনশ্যাম মনে-মনে কী একটা হিসেব করল : তবে আপনার মতো অত ভালো নয়। এতক্ষণ পরে এই প্রথম হাসল সে: দশ মিনিটের মধ্যে ট্রেনের এই কামরাটাকে আমি ফুলবাগান বানিয়ে দিতে পারি।

ফুলবাগান!-শিবু মামা হাঁ করলেন।

হাঁ, ফুল রাশি রাশি ফুল–গাছভরা ফুল

বলেন কী মশাই। অনেক ম্যাজিক দেখেছি করেছিও অনেক, কিন্তু দশ মিনিটে রেলের কামরাকে ফুলবাগান বানিয়ে দেওয়া যায়, এমন তো কখনও শুনিনি।

–এটা আফ্রিকান ম্যাজিক! সারা ভারতবর্ষে একমাত্র আমিই জানি।

বটে! তবে তো দেখতে হচ্ছে। শিখেও নিতে পারি। আজকাল ম্যাজিক দেখে কেউ পয়সা দেয় না মশাই, তাই বিনা পয়সায় দেখাতে হয় সব জায়গায়। এরকম একটা ম্যাজিক করতে পারলে তো লাল হয়ে যাব–অন্ন মারা যাবে পি সি সরকারের!–শিবুমামা ছটফট করে উঠলেন : কই দেখান ম্যাজিক।

ঘনশ্যাম এগিয়ে এল শিবুমামার দিকে।

–রেডি?

–রেডি।

শিবুমামার চোখের সামনে হাওয়ায় হাত বুলোত লাগল ঘনশ্যাম : চোখ বুজুন। একদম বুজে থাকুন। ঠিক দশ মিনিট পরে যেই বলব চোখ খুলবেন। দেখবেন।–চারিদিকে ফুল–রাশিরাশি ফুল

বাইরে গাড়ির বেগ একটু একটু করে কমে আসছে। একটা স্টেশন এল বোধ হয়।

শিবুমামা চোখ বুজলেন।

–ভালো করে চোখ বুজুন। দশ মিনিটের আগে খুলবেন না। তারপর চারিদিকে দেখবেন ফুল–শুধু ফুল–অজস্র ফুল

গাড়িটা স্টেশনে ইন করল।

ঠিক দশ মিনিট পরেই চোখ খুললেন শিবুমামা। ট্রেন ততক্ষণে আবার চলতে শুরু করেছে।

ফুল দেখলেন শিবুমামা। অজস্র অপর্যাপ্ত ফুল

কামরায় ঘনশ্যাম নেই। তার অ্যাটাচি নেই, সেই সঙ্গে নেই শিবুমামার স্যুটকেশটাও।

নগদে আর জিনিসপত্রে তাতে সাত-আটশো টাকা ছিল কমসে কম।

মোক্ষম ম্যাজিক দেখিয়েছে ঘনশ্যাম–একেবারে ভ্যানিশিং ম্যাজিক! আর শিবু মামা গাড়ি-ভর্তি অজস্র ঝুল দেখতে লাগলেন! সর্ষে ফুল।

বল্টুদা আমাকে বললে, শুক্তিগাছার নাম শুনেছিস কখনও?

আমি বললাম, না।

বল্টুদা খুব উদাস মতন হয়ে, আকাশের দিকে চোখ তুলে, কবির মতন বললে, সে এক আশ্চর্য জায়গা। সেখানে পুকুরভরা কোকিল-দোয়েল-পাপিয়া, গাছভরা রুই-কাতলা-চিংড়ি

আমি চমকে বললুম, কী বললে?

-ও-হো, ভুল হয়েছে। মানে, সেখানে গাছভরা কোকিল-দোয়েল

বল্টুদা সেই আধঘণ্টা ধরে কী রকম কবিকবি মুখ করছে, কাক-টাক দেখলেই কেন যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে আমার ভারি বিরক্তি ধরে গেল। আমার পিসতুতো ভাই ফুচুদা একবার কবি হয়ে ধোপার খাতায় পদ্য লিখেছিল আর পিসেমশাই তার কান পাকড়ে ধরে ডন-বৈঠক করিয়েছিলেন। সেই দুঃখে ফুচুদা আর কিছুতেই আই-এ পাশ করতে পারল না। আর তারপর থেকে কারও কবি কবি মুখ দেখলেই ভারি বিচ্ছিরি লাগে আমার।

আমি উঠে পড়লুম। বল্টুদা বললে, কোথাও যাচ্ছিস?

–চাটুজ্যেদের রোয়াকে। ওখানে টেনিদা আছে, হাবুল আছে–

টেনিদার নাম শুনেই বল্টুদা চটে গেল। বললে, ওই জুটেছে তোদের এক মুরুব্বি–ওই টেনি! বাজে গল্পের ডিপো, খালি গাঁ-গাঁ করে চ্যাঁচাতে পারে। ওর চ্যালাগিরি না করলে বুঝি পেটের ভাত হজম হয় না? আমার কাছে একটু বসলে আমি কি তোকে কামড়ে দেব?

আমি বললুম, তুমি যে কবি হয়ে যাচ্ছ। কাউকে কবি হতে দেখলেই আমার ভয় করে।

বল্টুদা বললে, কেন ভয় করে? কবিরা কি মানুষ খায়? বাজে বকিসনি প্যালা। কবিতা যে কখনও কখনও কী মহৎ কাজে লাগে, সেইটে বোঝাবার জন্যেই তো তোকে আমি শুক্তিগাছার কথা বলছিলুম। কিন্তু তুই সমানে ছটফট করছিস। গল্পটা শুনতে চাস তো চুপ করে বসে থাক ওখানে।

গল্প শুনতে কে আর না চায়? আমি নিমগাছটার তলায় বল্টুদার পাশেই বসে পড়লুম। বেশ মিষ্টি হাওয়া দিচ্ছিল আর টুপটুপ করে পড়ছিল পাকা নিমের ফল। ফলগুলো দিব্যি পাকা আঙুরের মতো দেখতে। কিন্তু মুখে দিলেই–ওঃ! কী বিটকেল স্বাদ আর কী যাচ্ছেতাই গন্ধ!

বল্টুদা বললে, শুক্তিগাছা–মানে, সে এক অদ্ভুত জায়গা। সেখানে নদী কুলুকুলু করে গান গায়, সেখানে পাহাড় থেকে ঝরনা-টানা নামে, সেখানে চাঁদিনী-টাদিনী যেন কীসব হয়, দোয়েল-শ্যামা বুলবুলি–এরা তো আছেই। কিন্তু হলে কী হবে, শুক্তিগাছার মেসোমশাই কবিতার নাম শুনলেই আগুন হয়ে যান। তিনি বলেন, কবিরা মনিষ্যি নয়, তাদের মাথা খারাপ, লোকগুলোকে ধরে ধরে খাঁচায় রেখে দেওয়া উচিত। ইসকুলে কবিতার পড়া থাকলেও বাড়িতে কেউ তা চেঁচিয়ে পড়তে সাহস পেত না। যদি মিহি সুরেও কারও গলা দিয়ে বেরিয়েছে : কোন দেশেতে তরুলতা সকল দেশের চাইতে শ্যামল, সঙ্গে সঙ্গে মেসোমশাই তাকে ঘোড়া-ঘোড়া ঘাস-ঘাস-এর ত্রৈরাশিক অঙ্ক দিয়ে বসিয়ে দিয়েছেন।

বললে বিশ্বাস করবিনে প্যালা, সেই মেসোমশাইয়ের ছোট ছেলে পোকন কবি হয়ে গেল। কী করে যে হল সেও এক তাজ্জব ব্যাপার। ছেলেবেলা থেকেই দাঁতে পোকা বলে ওর ঠাকুমা ওই নাম দিয়েছিল ওকে। প্রায়ই ওর পোকা-খাওয়া দাঁতে যন্ত্রণা শুরু হত, আর অমনি কাঁউমাউ শব্দে চ্যাঁচাতে শুরু করত পোকন। একদিন তা থেকেই

বল্টুদা একটু থামল : হ্যাঁরে প্যালা, কী যেন ব্যথাট্যথা থেকেই প্রথম কবিতা গজিয়েছিল? মানে ক্রৌঞ্চ নামে একজন ব্যাধ, বাল্মীকি নামে একটা পাখিকে

আমি বললুম : দ্যুৎ, যা-তা বলছো!

–অ, তা হলে বোধহয় বাল্মীকি বলে একজন ক্রৌঞ্চ, নিষাদ বলে কাকে মেরে ফেলেছিল–

আমি বিরক্ত হয়ে বললুম, কী আবোল-তাবোল বকছ বল্টুদা। মহাকবি বাল্মীকির কবিত্বলাভ কী করে হল, তাও তুমি ভুলে গেলে?

-থাম, তোকে আর শেখাতে হবে না। মানে খুব একটা কান্নাকাটির ব্যাপার থেকে কবিতা জন্মেছিল–এই তো? পোকনেরও তাই হল। দাঁতের ব্যথায় কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ বলে বসল :

হায় মোর, এ কী দন্তশূল
যেন শত বোলতার হুল
প্রাণ মোর করিল নির্মূল
বুঝিলাম, বিধি প্রতিকুল।

মাসিমা পোকা-খাওয়া দাঁতের গোড়ায় কী যেন একটা পেন্ট করে দিচ্ছিলেন। পোকনের কবিতা শুনে তো চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করলেন : দাঁতের ব্যথায় পোকন বুঝি পাগল হয়ে গেল!

শুনে পোকন বললে :

পাগল? কে কয় মোরে?
অতিশয় যাতনার ঘোরে
সরস্বতী নামিলেন মগজে আমার
ডেকেছে কাব্যের বান, বিশ্ব এবে হবে তোলপাড়।

তারপর কী যে হল সে তো বুঝতেই পারছিস। প্রথমটা মেলোমশাই ভেবেছিলেন, পোকন বুঝি মায়ের সঙ্গে ফাজলেমি করছে। তিনি এসেই পোকনের কান বরাবর এক রামচাঁটি তুললেন। তাতে পোকন বলে বসল :

মেরো না মেরো না পিতা মোর গালে চড়,
কাব্যদেবী কাঁদিবেন করে ধড়ফড়।

শুনে মেসোমশাই হাঁ করে রইলেন কিছুক্ষণ। এ তো ঠিক ইয়ারকির মতো শোনাচ্ছে না। গড়গড়িয়ে কবিতা বলে যাচ্ছে, তাতে ছন্দ আছে, মিলও আছে যে! কী সর্বনাশ!

নির্ঘাত ভূতেই ধরেছে। আর ভূতে পেলে–কে না জানে–মানুষের অসাধ্য আর কিছু থাকে না, এমন কি অখাদ্যও না।

রোজার জুতোটুতো পর্যন্ত মুখে নিয়ে নাকি হামাগুড়ি দেয়।

কাজেই ডাকো রোজা। লাগাও ঝাড়ফুঁক।

ঝাঁটা-সরষে এসব নিয়ে রোজা এসে হাজির। তাকে দেখেই পোকন বলে উঠল :

কাহারে মারিবে ঝাঁটা তুমি ভাই, সরিষা মারিবে কারে?
ভূত নয় ভাই, সরস্বতী যে চেপেছেন মোর ঘাড়ে।
ঝাঁটা, নিয়ে তুমি চলে যাও সখা, সরিষা বাটিয়া খাও,
ওঝাগিরি আর ফলিয়ো না হেথা, আমারে রেহাই দাও।

রোজার হাত থেকে ঝাঁটা-ফাঁটা সব পড়ে গেল। তার মুখের চেহারা দেখে মনে হল, এক্ষুনি সে কেঁদে ফেলবে। তারপর দুম করে পোকনকে একটা পেন্নাম করলে, আর হাতজোড় করে মেসোমশাইকে বললে আমাকে রেহাই দিন মশাই, এ আমার কম্ম নয়, ভূত-পেতনী নয়, আরও জবর কিছু চড়াও হয়েছেন এনার ওপর। কোনও রোজার সাধ্যি নেই তাকে নড়ায়। সরষে কেনার চার গণ্ডা পয়সা আমাকে দিয়ে দিন, আমি সরে পড়ি।

শুনে আমি বললুম, তাহলে সরস্বতীই ওর ঘাড়ে চাপলেন?

বল্টুদা বললে, বয়ে গেছে সরস্বতীর, তাঁর তো আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই। আরে, মা সরস্বতী এলে কি আর এসব যা-তা কবিতা বেরুত? তাহলে তো কালিদাসের মেঘদূত বধ আর মাইকেলের কী বলে–কী বই লিখেছিলেন রে মাইকেল? গীতাঞ্জলি না ব্যাকরণ কৌমুদী?

–তোমার মুণ্ডু।

অন্যমনস্কভাবে একটা নিমফল তুলে নিয়ে চিবিয়ে ফেলল বল্টুদা। একবার চিবুতেই মুখটাকে কী রকম খাস্তা কচুরির মতো করে, থুথু করে সেটা ফেলে দিলে। বললে, মরুক গে, সরস্বতী দয়া করলে ও একটা মেঘনাদ-কৌমুদী কিংবা গীতাঞ্জলি বধ-টধ কিছু লিখত। তা নয়, সমানে এইসব আবোল-তাবোল ছড়া কাটতে লাগল। এই মনে কর–মাসিমা বঁটি পেতে বসে ওল কাটছেন, পোকন অমনি বলে উঠল :

জননী গো, কাটিয়ো না ওল,
হাত যদি করে চিড়বিড়
প্রাণ তব হইবে অস্থির
লেগে যাবে ঘোর গণ্ডগোল।

শেষ পর্যন্ত সবাই হাল ছেড়ে দিলে। যদি নিতান্তই কবি হওয়া পোকনের কপালে থাকে, তাহলে খণ্ডাবে কে। তাও আবার সব সময় কবিত্ব ওর মগজে চাগিয়ে উঠত না। দাঁতের ব্যথা শুরু হলেই পোকন আর কান্নাকাটি করে না–তার বদলে কবিতা ছুটতে থাকে ওর মুখ দিয়ে :

আজ যে হইল কবিতার বেগ হবে তাহা দুর্দমনীয়।
দাঁতের ব্যথা যখন নেই, তখন কিন্তু পোকন বেশ আছে। তোর আমার মতো খাচ্ছে-দাচ্ছে, কাঁসি বাজাচ্ছে, পড়া না পেরে ক্লাসে নিল-ডাউন হচ্ছে, ফুটবল খেলতে গিয়ে গোবরে আছাড় খাচ্ছে মানে, একদম স্বাভাবিক। কিন্তু যেই একবার দাঁতে কনকনানি আরম্ভ হল, অমনি হা-রে-রে-রে-রে করে ছুটে বেরুল ওর কবিতা। একেবারে দুর্দমনীয়!

সবাই জিজ্ঞেস করত : দাঁতের ব্যথা হলে তুই কবিতা বানাস কী করে?

পোকন বলত : আমি জানি না কেমন যেন পেটের ভেতর থেকে আপনিই ঝাঁপ দিয়ে বেরিয়ে আসে।

দাঁতের ব্যথা নিয়ে বকবক করতে তোর ভালো লাগে?

–ভালোমন্দ জানি না। কবিতা না আউড়ে আমি থাকতেই পারি না।

এমনি চলছিল, হয়তো পোকন বড় হয়ে দুর্দান্ত কবি হত। দন্তশূল আরও আরও বাড়ত, আর তার ঠেলায় কী বলে ওই যে, নভেল প্রাইজ না উপন্যাস প্রাইজ কী একটা আছে, টপাস করে সেটাও পেয়ে যেতে পারত একদিন। সব হত, যদিনা একদিন ছোটমামা শুক্তিগাছায় আসতেন।

আমার ছোটমামা মানে পোকনেরও ছোটমামা–মানে মাসিমা তো আমারই মায়ের বোন কিনা! ছোটমামা আবার কড়া লোক, তায় দাঁতের ডাক্তার। এদিকে তো ছোটমামাকে আসতে দেখে পোকন বেশ হাসি হাসি মুখে সামনে এসেছে, হয়তো ভেবেছে, নিশ্চয় ভালো খাবার-দাবার আছে তাঁর সঙ্গে। কিন্তু পোকনের সেই হাসি-হাসি দাঁতের দিকে একবার তাকিয়েই ছোটমামা আর্তনাদ করে উঠলেন :হরিবোল-হরিবোল।

আমি বললুম, হরিবোল কেন? বোধ হয় হরিবল? মানে কী ভয়ানক?

বল্টুদা বললে, তা হতে পারে। তবে পোকারা সেসব নীলচে নীলচে কালো কালো নোংরা দাঁত দেখলে শুধু হরি নয়, কালী-দুগ-ছিন্নমস্তা বাবা বৈদ্যনাথ, সকলকে মনে পড়ে যায়। তারপর ছোটমামা কী করলেন, জানিস? বাক্সে সব যন্তর-টন্তর তাঁর ছিলই, পোকনকে সন্দেশ খাওয়ানো দূরে থাক, পরদিনই তাকে একটা টেবিলের ওপর চিত করে ফেলে কটাং কটাং করে তিনটে পোকা-দাঁত উপড়ে দিলেন।

আমি জিজ্ঞেস করলুম, তারপর?

তারপর আর কী? সর্বনাশ হয়ে গেল পোকনের। দাঁতও গেল, কবিত্বও গেল। দাঁতে আর ব্যথা হয় না, কবিতাও আর গজগজিয়ে বেরিয়ে আসে না। এমনকি মাসিমা যখন সামনে বঁটি ফেলে কচকচ করে চালকুমড়ো, মানকচু কিংবা পালং শাক কাটতে থাকেন, তখনও পোকন চুপ। এতদিন যে ঝিঁঝি-পোকার মতন ঝিঁঝি করত, সে এখন শুয়োপোকার মতো নীরব।

মেসোমশাই যে কী খুশি হলেন প্যালা, সে আর তোকে কী বলব। ছোটমামাকে, মানে নিজের ছোট শালাকে খুব ভালো একটা সুট বানিয়ে দিলেন। আর বাড়িতে তিন দিন ঘটা করে হরির লুট হল। তোকে তো আগেই বলেছি, কবিতার ওপরে হাড়ে হাড়ে চটা ছিলেন মেসোমশাই।

কিন্তু জানিস তো, ভগবান আছেন। আর ভগবানই বা বলব কেন, সেই-যে, যিনি পোকনের ঘাড়ে চড়াও হয়েছিলেন আর ছোটমামার পাল্লায় পড়ে নেমে গেলেন? তিনিও তো ছিলেনই।

তার ফলে এই হল যে, মাসখানেক বাদে একদিন ঘোড়া ছুটিয়ে কোথায় যেতে-যেতে উলটে পড়লেন মেলোমশাই। আর কোথাও কিছু হল না, কিন্তু দারুণ রকমের চোট পেলেন। ডান দিকের হাঁটুতে। কোমরেও খুব লাগল।

হাঁটু ভাঙল-টাঙল না, কোমরের ব্যথাও সারল, কিন্তু কিছুদিন যেতে না-যেতেই বাত দেখা দিল হাঁটুতে আর কোমরে। জানিস তো–বাতের সঙ্গে কোনও চালাকির বাত চলে না–মেসোমশাইয়ের মত দুঁদে লোকও জব্দ হয়ে গেলেন।

বাতের ব্যথা উঠলে আরও দশজন সাধারণ মানুষের মতো তিনি নিয়মমাফিক উঃ-আঃ কুঁই কাঁই করতেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন কী যে হল, ঘর কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি

এ কী হেরি অকস্মাৎ
বিনামেঘে বজ্রপাত,
ঘোড়া হতে চিতপাত
কোমরে গজালো বাত
আমারে করিল কাত
আছি খিচাইয়া দাঁত ব্যস—

শুরু হল মেলোমশাইয়ের কাব্যচর্চা। দাঁত তোলবার পরে পোকন তো ভালো মানুষের মতো অঙ্ক-টঙ্ক কষতে লাগল, কবিতার ধার দিয়েও আর যায় না, কিন্তু জানিস তো বাত একবার হলে আর ছাড়ে না? চানস পেয়ে মেলোমশাই সত্যি-সত্যিই কবি হয়ে গেলেন। মানে পোকনের মতো লাউ-কুমড়ো-কচু নিয়ে মুখে-মুখে পদ্য না বানিয়ে খাতায় কাগজে লিখতে লাগলেন। সেই-যে, কালিদাস মেঘদূতকে বধ করায় বাল্মীকি বাল্মীকি বলে কাঁদতে কাঁদতে নিষাদ যেমন করে পদ্য বানিয়েছিল, তেমনি করে বাতের চোটে কাত হয়ে মেসোমশাই কবিতা লিখে দিতে-দিস্তে কাগজ ভরে ফেললেন।

কবিতা লিখলেই ছাপতে হয়। মেলোমশাইও একটা বই ছেপে ফেললেন, নাম দিলেন এ যে মোর ব্যথার কাকলি। আর বেরুবার সঙ্গে সঙ্গে লোকে কী ভীষণ ভালো বলতে লাগল! ক্রিটিকেরা সবাই বললে, রামচরণবাবু সত্যিকারের কবি। যথার্থ বেদনা বোধ করিলেই এইরূপ মহৎ কাব্য লেখা যায়।

আরে, যথার্থ বেদনা না তো কী। বাতের ব্যথার সঙ্গে চালাকি। যখন ওঠে, তখন টের পাইয়ে দেয় কত ধানে কত চাল হয়।

পোকন তো নভেল-প্রাইজ পেল না, কিন্তু, শোনা যাচ্ছে, শিগগিরই মেলোমশাই দিল্লি-টিল্লি থেকে কী-যেন পুরস্কার পাবেন। তাই আর-একখানা বই ছাপা হচ্ছে তাঁর–তার নাম বাতায়ন। মানে, জানলা-টানলার কারবার নয়, বাতের ব্যথা থেকে লেখা বলেই বাতায়ন।

সেইজন্যে বলেছিলুম প্যালা, ব্যথা থেকেই কবিতার জন্ম হয়। আর কবিতা কী যে মহৎ জিনিস

বলতে বলতেই একটা নিমফল কুড়িয়ে নিয়ে চিবিয়ে ফেলল বল্টুদা, আর থুথু করে ফেলে দিলে সেটাকে। বিচ্ছিরি স্বাদে-গন্ধে তার মুখখানা ঠিক মোচাঘণ্টের মতো হয়ে গেল।

আমি নিমগাছতলা থেকে উঠে পড়লুম। যাওয়ার সময় উপদেশ দিয়ে বলে গেলুম, বসে-বসে আরও নিমের ফল চিবোও গোটাকয়েক, তোমারও মুখ দিয়ে গড়গড়িয়ে কবিতা বেরুতে থাকবে।

কালাবদর

উত্তরে বলে মেঘনা। তারও উত্তরে ব্রহ্মপুত্র, আরও উত্তরে যেখানে হিমালয়ের বুকের ভেতর থেকে ফেনায় ফেনায় গর্জে বেরিয়ে আসছে সেখানকার ইতিহাস কেউ বলতে পারে না।

মেঘের মতো জলের রং বলে নদীর নাম দিয়েছিল মেঘনা। এখানে এসে নাম হল কালাবদর। শুধু মেঘবরণ জল নয়, অদূর সমুদ্রের ঘন নীলিমাও যেন এর ভেতরে এসে সঞ্চারিত হয়ে গেছে। দিনে রাতে দু-বার মাতলা হাতির ঝাঁকের মতো ছুটে আসে জোয়ারের জল, এদেশে বলে শর এল। সে তো আসা নয়, বলতে হয় আবির্ভাব। পাহাড়প্রমাণ উঁচু হয়ে ঝড়ের বেগে এগিয়ে আসে খ্যাপা জলোল্লাস, রাশি রাশি মল্লিকা ফুলের মালার মতো ফেনার ঝালর দুলতে থাকে তার সর্বাঙ্গে, জলকণার একটা ছোটো কুয়াশা ঘুরতে থাকে তার মাথার ওপর; আর দু-দিকের তটের গায়ে প্রবল শব্দে আছড়ে পড়ে তার পাশব-মত্ততা। একখানা ছোটো নৌকোও যদি তখন কূলে বাঁধা থাকে, মুহূর্তে হাজারখানা হয়ে কুটোর মতো মিলিয়ে যায়, কখনো আর তার সন্ধান মেলে না।

কালাবদর। পাঁচ পির বদর বদর করে পাড়ি ধরে মাঝিরা। উৎসুক আকুল চোখে। আকাশটাকে তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখে কোথাও লুকিয়ে আছে কি না একফালি সোনামুখী মেঘ। বিশ্বাস নেই এই সর্বনাশা নদীকে। মেঘ দেখলেই কালো ময়ূরের মতো আনন্দে পেখম মেলে দেয়, নাচতে শুরু করে ভৈরবী উল্লাসে। তখন ছোটো নৌকো তো দূরের কথা, জাহাজে পর্যন্ত সামাল সামাল ওঠে।

বিশাল ভয়ংকর নদী কালাবদর। কালকেউটের মতো তার জ্বলের রং। তার গর্জনে কোটি কোটি বিষাক্ত কেউটের ফোঁসফোঁসানি। ঝড় ওঠে, নৌকো ডোবে, মানুষ মরে। শরের ঘা লেগে উঁচু ডাঙাসুদ্ধ নারকেল-সুপারির গাছ ভেঙে পড়ে করাল স্রোতে। কালীদহ ছেড়ে কালীয়নাগ কালাবদরে এসে বাসা বেঁধেছে।

আলাইপুরের খালটা যেখানে মানুষের প্রসারিত একটা মুঠির মতো হঠাৎ চওড়া হয়ে কালাবদরে এসে পড়েছে, ওইখানেই কেরায়া নৌকোগুলোর আড্ডা। পাগলা শরের ভয়ে মাঝিরা পারতপক্ষে নৌকো নদীর ওপরে রাখে না, খালের এই মুখটুকুর ভেতরে ঢুকেই লগি পোঁতে। বিশ্বাস নেই কালাবদরকে। হয়তো একটুখানি বাজার করতে গেছে কিংবা সংগ্রহ করতে গেছে দুটো-একটা মাছ, এমন সময় এল নদীর মাতলামি। ফিরে এসে মাঝি দেখলে নৌকো তো দূরের কথা, তার কাছিটির চিহ্ন অবধি নেই। খাল এদিক থেকে নিরাপদ। জলের ঝাপটা ভেতরে যতটুকু আসে তা নৌকোকে একটুখানি নাগরদোলায় দুলিয়ে যায় মাত্র, তার বেশি আর কিছুই করে না।

খালে আজ বেশি নৌকো ছিল না। কফিলদ্দি মাঝি সবে পেঁয়াজকলি দিয়ে ইলিশ মাছের ঝোলটা চাপিয়ে দিয়েছে, এমন সময় এল সওয়ারি!

ও মাঝি ভাই, কেরায়া যাবা?

যাইবেন কই?

জাউলা!

জাউলা? জাউলার হাট?

হ।

কন কী? হারা (সারা রাত্তির পাড়ি দেওনের কাম।

করুম কী কও? বিয়া আছে, যাইতেই অইবে।

হঃ, বুঝছি।

এতক্ষণ অন্যমনস্কভাবে অভ্যস্ত রীতিতে কথা বলছিল কফিলদ্দি, হুঁকোয় অল্প অল্প টান দিচ্ছিল নিরাসক্তভাবে। এইবার ধীরেসুস্থে মুখ থেকে হুঁকোটা নামালে, কলকের আগুনটা ঝেড়ে দিলে খালের ঘোলাজলে। জলস্রোতের মধ্যে ছ্যাঁক ছ্যাঁক করে পোড়া টিকের টুকরোগুলো পড়তে লাগল, কালো ছাইয়ের একটা সরল রেখা লগিটার চারদিকে পাক খেয়ে তীব্র বেগে নদীর দিকে চলে গেল।

ক্যারায়া দিবেন কত?

বুইজঝা-সুইজঝা লও ভাই, তোমাগো আর কমু কী?

তমো কয়েন? (তবু বলুন?)

পাউচগা টাহা দিমু (পাঁচটা টাকা দেব), এয়ার বেশি না।

হেইলে হাতর দিয়ে যায়েন (তা হলে সাঁতার দিয়া যান), নায়ে নায়ে চড়নের কাম নাই।

এটাও অভ্যস্ত জবাব কিন্তু এ অভ্যাস বেশিদিনের নয়, যুদ্ধ বাঁধবার পর থেকে। আগে মাঝিরাই সওয়ারির তোয়াজ করত, চার আনা ভাড়া বেশি দেওয়ার জন্যে আল্লার দোহাই পাড়ত। দু-হাত জোড় করে বলত, আইচ্ছা আইচ্ছা, বেশি না দ্যান, কুদঘাটের (সরকারি কর সংগ্রহের ঘাট) পয়সা আর এক বেলার জলপান দিবেন।

কোথায় গেল সেসব। আশ্চর্যভাবে ঘুরল পৃথিবীর চাকা, সময়ের চাকা। যুদ্ধ গেল, মন্বন্তর গেল, মরল হাজারে হাজারে মানুষ। কালাবদরের কালো জলে যারা ডুবে মরে, তারপর ভেসে ওঠে প্রকান্ড একটা জয়টাকের মতো, তাদের মতো করে নয়। বরং শুকিয়ে মরল, এত বেশি শুকিয়ে মরল যে ফুলবার মতো শরীরে আর কিছু রইল না, শুকনো হাড়ের থেকে চিমসে চামড়া গলে গলে মিলিয়ে গেল মাটিতে। হাড়ের ওপরে ঠোকা মেরে ঠোঁট ঘুরিয়ে অবজ্ঞায় উড়ে চলে গেল শকুনের পাল। পৃথিবী বদলাল। যারা বাঁচল তাদের এক টাকা কেরায়া উঠল পাঁচ টাকায়, তাদের মেজাজ হল হাজার বিঘে ধানজমির মালিক তালুকদারের মতো। সুতরাং হুকো নামিয়ে নিবিষ্টভাবে আবার ঝোলের কড়াইয়ের দিকে মনোযোগ নিবন্ধ করলে কফিলদ্দি।

লও, আর আষ্ট আনা দিমু, হোনজু (শুনছ)? কথা কও না দেহি?

কমু আর কী? পাঁচ-ছয় টাহার কাম না কত্তা, দউশগার কোমে কথা নাই।

ওরেঃ, ডাহাইত (ডাকাত)! মাথায় বাড়ি দিতে চাওনি?

অবজ্ঞাভরে খালের জলে থুথু ফেললে কফিলদ্দি, চাউলের মন হইছে কুড়ি টাহা, হেয়া দ্যাহেন না?

লও ভাই, আর অ্যাট্টা (একটা) টাহা ধরো। আর বগড় বগড় দিয়া কাম নাই।

এতক্ষণে যেন চমক ভাঙল কফিলদ্দির। এতক্ষণে সে এদের দিকে তাকাল। মধ্যবয়সি একটি পুরুষ, গায়ে ময়লা একটা ছিটের শার্ট, পায়ে এক জোড়া মলিন জুতো। রোগা চেহারা, গলার হাড়টা থুতনির নীচ দিয়ে অনেকখানি এগিয়ে এসেছে। হাতে একটা ছোটো পুঁটলি। তার পেছনে ঘোমটা-দেওয়া একটি বউ, একখানি ডুরে শাড়ির নীচে তার রোগা রোগা দুখানি পা দেখা যাচ্ছে। মুখোনি ঘোমটায় ঢাকা কিন্তু পায়ের দিকে তাকিয়েই কফিলদ্দি বুঝতে পেরেছে ওই মেয়েটির মুখে পুরুষটির মতোই ক্লান্তির কালো ছাপ আঁকা রয়েছে। মধ্যবিত্তের পরিচিত ক্লান্তি আর অবসন্নতা।

শেষপর্যন্ত রফা হল সাত টাকায়।

আলাইপুরা থেকে জাউলার হাট কোনাকুনি পাড়ি, প্রায় বারো মাইল পথ। মাঝখানে হাসানদির আধজাগা লম্বা চড়াটা ছাড়া আর ডাঙা নেই কোনোখানে। রাত্রির ছায়ায় কালাবদরের কালো জল হয়ে গেল নিকষ কালো, তারপর কখন একফালি মেঘ এসে চিকচিকে তারাগুলোর ওপর দিয়ে ঘন একটা পর্দা টেনে দিয়ে গেল।

তখন ঝিরঝির করে বাতাস বইছিল নদীতে। আস্তে আস্তে বাড়তে লাগল বাতাসের বেগ। কালাবদরের কালো ঢেউয়ের মাতন শুরু হয়ে গেল। অন্ধকার জলের ওপরে উজলে উজলে উঠতে লাগল ফেনার রাশি। একটা ঢেউয়ের মাথা থেকে নৌকোটা প্রবল বেগে আর একটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

বিরক্ত কুটি ফুটে উঠল কফিলদ্দির কপালে। কালাবদরের এমন মাতামাতি কিছু অস্বাভাবিক নয়। তার এক-কাঠের শালতি ঢেউয়ের ওপর দিয়ে ঘোড়ার মতো জোরকদমে ঝাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে চলে যাবে তাও সে জানে। হাজার ঝাপটা লাগলেও তার নৌকোর তলার জোড় খুলবে না। কিন্তু ছুটন্ত তেজিয়ান ঘোড়াকে যেমন রাশ টেনে সামলে সামলে রাখতে হয়, তেমনি তাকেও আজ সারারাত নৌকো সামলাতে হবে। পালের মুখে ছেড়ে দিয়ে গলুইয়ের ওপরে একটুখানি কাত হয়ে নেবার আশা আজ বিড়ম্বনা। নদী আজ সারারাত ভোগাবে বলে বোধ হচ্ছে।

চারদিকে জলের গর্জন উঠছে। আকাশে জোরালো মেঘ নেই, মাঝে মাঝে পাতলা পর্দাটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে গিয়ে উঁকি দিচ্ছে তারা। কিন্তু বাতাসের বিরাম নেই, ঢেউ উঠছে সমানভাবে। হাতের পেশিগুলোকে দৃঢ় করে কফিলদ্দি নৌকোটাকে আর একটা বড় ঢেউয়ের ওপর দিয়ে বার করে নিয়ে গেল।

ভেতরে স্বামী-স্ত্রী বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ চমকে উঠল তারা।

ও মাঝি ভাই, মাঝি ভাই? পুরুষটির গলা।

জলের দিকে স্থির চোখ রেখে কফিলদ্দি বললে, কী কন? কন কী?

গাং দেহি কেমন কেমন ঠ্যাকে। কাইতান (কার্তিকী তুফান) ওঠল নাকি?

চিন্তিত স্বরে কফিলদ্দি বললে, মনে তো লয়।

খাইছে! পুরুষটির স্বরে ভয়ার্ত কাতরতা ফুটে বেরুল, নাও কোনহানে (কোন খানে)?

মদ্য গাঙে (মাঝ নদীতে)।

হাসানদির চর?

ঠাহর পাইতে আছি না।

অ্যাহন কর কী? কফিলদ্দি মেয়েটির একটা অস্ফুট আর্তনাদও যেন শুনতে পেল।

ডরাইবেন না, চুপ মারিয়া শুইয়া থাহেন। আমার নাও ডোববে না।

কইবে কেডা? যে রাইকোসা (রাক্ষুসে) গাং, মানুষ খাউনের লইগ্যা জেব্বা (জিহ্বা) বাড়াইয়া রইছে।

নাও ফালাইতে (ডোবাতে) এয়ার আর দোসর নাই।

মেয়েটির আর্তনাদ এবার স্পষ্টই শুনতে পেল কফিলদ্দি। আর সঙ্গে সঙ্গেই কেমন একটা বিশ্রী বিরক্তিতে তার মনটা আচ্ছন্ন হয়ে উঠল। রূঢ় গলায় বললে, ফ্যাগড়া প্যাচাল পাড়েন ক্যান কত্তা? (বাজে বকছেন কেন?) চুপ মারিয়া শুইয়া থাহেন কইলাম। আমার নাও গেলনের আগে নদীরে পিরের শিন্নি খাইয়া আইথে লাগবে। (আমার নৌকো গিলবার আগে নদীকে পিরের শিন্নি খেয়ে আসতে হবে।)

বাচাইলে তুমি বাচাইবা, মরলে তোমার হাতেই মরুম। পুরুষটি মূঢ় অসহায় গলায় জবাব দিলে।

মরণের অ্যাহন হইছে কী? খামাকখা (খামোকা) হাবিজাবি কইয়া মাঠারইনরে ডরাইতে আছেন, চোপাহান (মুখোনা) একটু খ্যামা দিয়া থোয়ন।

চুপ করে গেল পুরুষটি। কফিলদ্দির কণ্ঠস্বরের রূঢ়তাটা তাকে নিরুৎসাহ করে দিয়েছে। বিপদে পড়লে খানিকটা প্রগলভ হয়ে ওঠে মানুষ, কথার ভেতর দিয়ে মনের থেকে নামিয়ে দিতে চায় পুঞ্জিত ভয়ের বোঝাটা। কিন্তু সে-অবস্থা নয় কফিলদ্দির। হাতের পেশিকে লোহার মতো শক্ত করে যখন খ্যাপা ঘোড়ার মতো উচ্ছঙ্খল ঢেউকে একটার পর একটা টপকে যেতে হচ্ছে, যখন চোখের দৃষ্টিকে রাত্রিচর পাখির মতো তীক্ষ্ণ তীব্র করে রাখতে হচ্ছে নিকষ কালো অন্ধকারে ঢাকা চক্রবালের দিকে, এবং যখন জানা আছে কালাবদরের এই মাঝগাঙে দুশো হাত লগিরও থই মিলবে না, তখন উৎসাহের অভাবটা কফিলদ্দির তরফ থেকে একান্ত স্বাভাবিক এবং সঙ্গত।

আকাশে হালকা হালকা মেঘ বটে, কিন্তু এককোণে পেটা লোহার এক টুকরো পাতের মতো খানিকটা ঘন কৃষ্ণতা লেপটে আছে আকাশের গায়ে। ঝড়াং ঝড়াং করে লাল বিদ্যুতের এক-একটা শিখা সেখানে কতগুলো আগ্নেয় বাহু এদিক-ওদিক বাড়িয়ে দিয়েই ফিরে যাচ্ছে আবার। কালাবদরের কালো জলটা অদ্ভুতভাবে কুটিল হয়ে উঠছে সে-আলোয়, যেন জলের তলা থেকে একটা অতিকায় অক্টোপাস তার রক্তাক্ত বহুভুজগুলি নিয়ে মুহূর্তের জন্যে ভেসে উঠেই আবার হারিয়ে যাচ্ছে ভয়ংকর গভীর অতলতায়। আর ওদিকে মাঝে মাঝে শঙ্কিতভাবে তাকাচ্ছে কফিলদ্দি। ওই ইস্পাতের পাতটা যদি ক্রমশ নিজেকে ছড়াতে আরম্ভ করে, যদি একসময় একটা দমকা হাওয়ায় আচ্ছন্ন করে ফেলে সমস্ত আকাশটাকে, তাহলে? তাহলে?

পায়ের থেকে মাথা পর্যন্ত শিউরে উঠল কফিলদ্দির। পাকা মাঝি, কালাবদরের কালো জলের সঙ্গে তার পরিচয় সুদীর্ঘ এবং ঘনিষ্ঠ। আর এই কারণেই নদীকে তার বিশ্বাস নেই। উন্মাদ কালাবদরের কাছে বড়ো বড়ো জাহাজও যা, একমাল্লাই শালতিরও সেই একই অবস্থা।

ঢেউয়ের বেগটা প্রবল হচ্ছে ক্রমশ, বাতাস এখন চোখে-মুখে যেন ঝাপটার মতো ঘা দিতে শুরু করেছে। লাল বিদ্যুতের আকস্মিক উদ্ভাসে সামনে যতদূর চোখ যাচ্ছে শুধু ঢেউয়ের ফেনা উপচে উপচে পড়ছে। ভূতগ্রস্ত মানুষ যেমন বিশৃঙ্খলভাবে মাতামাতি করতে থাকে, গ্যাঁজলা ভাঙে তার মুখ দিয়ে, তেমনি অসংবৃত উচ্ছঙ্খল হয়ে গেছে নদী, তেমনি করে ফেনা গড়াচ্ছে তার লক্ষ লক্ষ মুখে। কালাবদরকে ভূতে পেয়েছে।

হৃৎপিন্ড থেকে একঝলক রক্ত যেন উছলে উঠে কফিলদ্দির মাথার মধ্যে গিয়ে পড়ল। বইঠাতে প্রবলভাবে টান দিলে সে, নৌকোটা আকস্মিকভাবে যেন মস্ত একটা লাফ দিয়ে হাত তিনেক এগিয়ে গেল। নৌকোর ভেতরে ভয়ার্ত যাত্রী দুজন প্রায় হাহাকার করে উঠল।

কী হইল, ও মাঝিভাই, হইল কী?

চুপ করেন কইলাম-না? কফিলদ্দি গর্জে উঠল, অ্যাক্কালে চুপ!

যাত্রীরা চুপ করল। কোনো উপায় নেই, কিছু বলবার নেই। অসহায়, বিব্রত, মাঝির করুণার কাছে একান্তভাবেই আত্মসমর্পিত। কফিলদ্দি ইচ্ছা করলে ওদের খুন করতে পারে, রাত্রির অন্ধকারে পুঁতে দিতে পারে কালাবদরের যেকোনো একটা বালুচরের হোগলাবনের মধ্যে, কেউ টের পাবে না; একটা রক্তের বিন্দু দূরে থাক, এক টুকরো হাড়ও খুঁজে পাবে না কোনোদিন। নইলে একটা পাক দিয়ে চোখের পলকে ডুবিয়ে দিতে পারে নৌকো, মুহূর্তে তলিয়ে দিতে পারে ক্ষিপ্ত কালোজলের ভেতরে। কালাবদরের মাঝি—ওর আর কী, কিছুতেই ডুববে না, একটা খড়ের আঁটির মতো অবলীলাক্রমে ভাসতে ভাসতে ডাঙায় গিয়ে পোঁছোবেই শেষপর্যন্ত।

কিন্তু কফিলদ্দির আত্মবিশ্বাস নেই অতটা। কালাবদরকে সে চেনে, কালাবদরকে সে বিশ্বাস করে না। ঠিক কথা; এ সাধারণ নদী নয়, এ ভূতুড়ে। এর জলের ভেতরে শয়তান লুকিয়ে আছে। এর ঢেউয়ে ঢেউয়ে হাজার হাজার প্রেতাত্মা নেচে বেড়ায়। কত মানুষ যে এই নদীতে ডুবে মরেছে তার কি হিসেব আছে কিছু! এর অদৃশ্য অতলতায় বালির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আছে শ্যাওলা-ধরা অসংখ্য কঙ্কাল, অসংখ্য নরমুন্ডের শূন্য খোলের ভেতরে ডিম পাড়ছে গভীরচারী পাঙাস মাছের দল। ডোবা নৌকোর পচা-ভাঙা কাঠের ভেতরে কিলবিল করে বেড়ায় রাক্ষুসে কামটের ছানা। আর… আর আছে প্রেতাত্মা। দুর্যোগের রাত্রে, ঝড়ের রাত্রে তারা উঠে আসে, উদ্দাম জলের দোলায় দোলায় তান্ডব নাচে, অসহায় মানুষ পেলেই হিমশীতল কঙ্কাল বাহু বাড়িয়ে টেনে নেয় তাদের। সদ্য নোনা-কাটা চরের হোগলা আর শণঘাসের বনে ডাকাতের হাতে অপঘাতে যারা প্রাণ দিয়েছে, জলের গর্জনে গর্জনে তাদেরও বিকট অট্টহাসি বেজে ওঠে, তারাও…।

গজরাচ্ছে কালাবদর, মেতে উঠেছে ফেনায় ফেনায়। লোহার চ্যাপটা পাতটার ভেতরে বজ্র ঝলকাচ্ছে, জলের মধ্যে লিকলিক করে উঠছে রক্তাক্ত অক্টোপাস। কফিলদ্দির সারা গা দিয়ে ঘাম ছুটতে লাগল। নৌকো এগোচ্ছে না, প্রতিকূল জল ক্রমাগত বাধা দিচ্ছে। ক্রমাগত প্রেতাত্মাদের কঙ্কাল হাতগুলো যেন তাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে। হু-হু করে বাতাস বয়ে যাচ্ছে, কোথাও যেন যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে কেউ। মাঝে মাঝে ঢেউয়ের মাথায় কী চিকচিক করছে, যেন সেই তাদের চোখ, সেই যারা…

পাঁচ পির বদর বদর…

হঠাৎ আর্তনাদের মতো শব্দ করে বিকটভাবে চেঁচিয়ে উঠল কফিলদ্দি। তার ভয় করছে, ভয় ধরেছে তার। জলের ভয় নয়, এইসব প্রেতাত্মাদের ভয়। মাঝে মাঝে এইরকম এক একটা আকস্মিক ভয়ে কালাবদরের মাঝিদেরও মন আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। কিন্তু কফিলদ্দি জানে এ খারাপ লক্ষণ; ভারি খারাপ, ভারি খারাপ লক্ষণ। দুর্যোগের রাত্রে যখন মরণ ঘনিয়ে আসে, তখনই এই ধরনের ভয় পায় মাঝিরা। কেউ ডুবে মরে, কেউ পাগল হয়ে যায়, কারো কারো জবাফুলের মতো রাঙা চোখ দুটোর ভেতর দিয়ে যেন রক্ত ফেটে পড়বার উপক্রম করে মুখ দিয়ে এমনি করেই ফেনা গড়াতে থাকে।

লা ইল্লাহা, রসুলাল্লা।

না না, এ ভয় চলবে না কফিলদ্দির। এ ইচ্ছে করে নিজের মৃত্যু ডেকে আনা ছাড়া আর কিছু নয়। মানুষে ভয় পেলেই তার দুর্বল স্নায়ুর ওপরে ইবলিশ তার প্রভাব বিস্তার করে, মানুষের অসতর্কতার সুযোগ নেবার জন্যেই তৈরি হয়ে থাকে জিন-পরি-প্রেতাত্মার দল! চোখ বুজে আবার প্রবল বেগে দাঁড়ে টান দিলে কফিলদ্দি। এ অন্ধকারে চোখ বুজে আর চোখ চেয়ে থাকা একই কথা।

নৌকোর পুরুষ যাত্রীটি আবার স্তব্ধতা ভঙ্গ করলে।

ও মাঝি ভাই, হোনছ নি?

কী কইথে আছেন?

নায়ের পাল উড়াইয়া দ্যাও-না? বায়ে (বাতাসে) লইয়া যাউক।

হ, এতক্ষুণে অ্যাট্টা পন্ডিতের মতো কথা কইছেন। অত্যন্ত তিক্ত শোনাল কফিলদ্দির স্বর।

অপরাধীর গলায় পুরুষটি আবার বললে, ক্যান, অন্যে কইছি নাকি? জোর কাইতান মারতে আছে, নাও ডুবাইয়া দে (ডুবিয়ে দেয়) কি না বোঝতে আছি না। হেয়ার থিয়া (তার চেয়ে) বায়ে যেদিক লইয়া যায়…

যা বোঝেন না, হেয়ার উপার কথা কইয়েন না কত্তা। দ্যাখতে আছেন না গাঙের চেহারাডা? বায়ে যদি সুমুদুরে টানিয়া লইয়া যায়, হ্যাশে (শেষে) কী হরবেন (করবেন)? লোনা সুমুদুরে ডুবিয়া মরণের সাধ হইছে নি?

তা বটে। এ যুক্তি নির্ভুল। কালাবদরের বুকে খ্যাপা বাতাস ক্রমশ ঝড়ের রূপ নিচ্ছে। এই ঝড়ের মুখে পাল তুলে দিলে দেখতে দেখতে কোথায় উড়িয়ে নিয়ে যাবে কে জানে? সমুদ্রে না হোক অন্তত তার মোহনার মুখে নিয়ে গিয়েও যদি ফেলে দেয়, তা হলে আর আশা নেই। কালাবদর যদি-বা ক্ষমা করতে রাজি থাকে, কিন্তু ভয়ংকর বিপুল সমুদ্রের ক্ষমা নেই। কালাবদরের চাইতেও ঢের বেশি নিবিড় তার কালো রং, তার জলের মাতামাতি আরও উদ্দাম। কালাবদরে তবু কূল মিলতে পারে, কিন্তু সমুদ্র অকূল, আদি অন্তহীন।

হেইলে উপায়?

খোদা ভরসা।

খোদা ভরসা। তাই বটে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুরুষটি চুপ করে গেল। আর জলের ক্ষিপ্ত কলধ্বনির মধ্যেও কফিলদ্দি শুনতে পেল মেয়েটির চাপা কান্নার শব্দ। ওরা ভয় পেয়েছে, অত্যন্ত ভয় পেয়েছে।

জলের সঙ্গে লড়াই করতে করতে হাতের পেশিগুলো যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে কফিলদ্দির। দাঁতের ওপর দাঁত চেপে বসেছে, শরীরের সর্বাঙ্গে বয়ে যাচ্ছে ঘামের স্রোত। এতদিনের পরিচিত অভ্যস্ত নৌকোটাও যেন আজ বাগ মানছে না। কী কুক্ষণেই আজ সে কেরায়া ধরেছিল।

হু-হু হু-হু বাতাসের অশ্রান্ত আর্তনাদ। অন্ধকার জলের ওপরে থেকে থেকে রক্তাক্ত চমকানি। উঃ, বাতাসটা কি আজ আর কিছুতেই থামবে না? চারদিকে প্রেতাত্মাদের গোঙানি চলেছে সমানে। ঢেউয়ের মাথায় মাথায় তেমনি চিকচিক করে ঝিকিয়ে উঠছে কাদের বিষাক্ত কুটিল চোখ, ফেনাগুলো উছলে উছলে পড়ছে চারিদিকে—যেন কাদের পৈশাচিক কঙ্কাল মুষ্টিগুলো ওদের নিষ্পিষ্ট করবার জন্যে বারে বারে খুলছে আর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অপরিসীম ভয়ে আবার চোখ মুদে ফেলল কফিলদ্দি, শক্ত করে চেপে ধরলে চোখের পাতা দুটো, জলের দিকে আর সে তাকাতে পারছে না।

কফিলদ্দি ভয় পেয়েছে, ওদের চাইতেও বেশি ভয় পেয়েছে। নদীর ভয়? না, তার চাইতেও ভয়ানক, ভয়ানক পিশাচের ভয়, অপদেবতার ভয়। এর চাইতেও অনেক কঠিন দুর্যোগের ভেতরে তার শালতি নির্ভয়ে পথ কেটে এগিয়ে গিয়েছে, মৃত্যুর রাক্ষসরূপ কালাবদর তাকে দেখিয়েছে অনেক বার। কিন্তু পাকা মাঝির বুক তাতে এমন করে আতঙ্কে ভরে যায়নি, এমন করে তার স্নায়ুকে শিথিল নিস্তেজ করে দিতে পারেনি। বরং দুলে উঠেছে রক্ত, কলিজার ভেতর বয়ে গেছে উত্তেজনার উত্তপ্ত জোয়ার। দাঙ্গার সময় বিরুদ্ধ দলের মধ্যে লাঠি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে গেলে শিরায় শিরায় রক্ত যেমন টগবগ করে ফুটতে থাকে, তেমনি একটা কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সংকল্পে সতেজ আর সজাগ হয়ে উঠেছে চেতনা। কিন্তু আজ এমন হল কেন? যেন মন হচ্ছে আজ তার নদীর সঙ্গে সংগ্রাম নয়, এ যুদ্ধ কতকগুলো ভয়ংকর অশরীরীর সঙ্গে, কতকগুলো অপঘাতে মরা হিংস্র প্রেতাত্মার সঙ্গে। কেন হল! এমন কেন হল

বইঠা ছেড়ে দাঁড় ধরেছে কফিলদ্দি। তেমনি চোখ বুজে দাঁড় টেনে চলেছে, শরীরের সমস্ত শক্তিকে সঞ্চারিত করে নিয়েছে দুটো বাহুর মধ্যে। টানের সঙ্গে সঙ্গে শরীরটা গলুয়ের ওপর দিয়ে ঝুঁকে পড়ছে নীচের দিকে। বুকের ভেতরে কী যেন চড়চড় করে উঠছে, হৃৎপিন্ডটা হঠাৎ করে ছিঁড়ে যাবে নাকি?

কেন এমন হল? কেন? সেও কি আজ পাগল হয়ে যাবে? তার চোখ দিয়ে অমনি করে ফেটে পড়বে রক্ত? আধ হাত জিভ বার করে দিয়ে সেও হাঁপাবে একটা ক্লান্ত কুকুরের মতো, আর থেকে থেকে আকাশ-ফাটানো এক-একটা অর্থহীন ভয়ংকর আর্তনাদ করে উঠবে?

লা ইল্লাহা, রসুলাল্লা

জিন জেগে উঠেছে, প্রেতমূৰ্তিরা মাথা তুলেছে চারদিকে। এ বাতাসের শব্দ নয়, তাদের আর্তনাদ; এ জলের গর্জন নয়, ফেনায় ফেনায় তাদেরই কঙ্কাল মুঠিগুলো মানুষের গলা টিপবার একটা লোলুপ উল্লাসে প্রসারিত হয়ে উঠেছে।

কালাবদরকে ভূতে পেয়েছে, পালাতে হবে এর কাছ থেকে! এ প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ নয়, অলৌকিক সত্তার সঙ্গে। রহমান-রহিমতুল্লা! দাঁড়ের ঝাঁকিতে ঝাঁকিতে হোঁচট-খাওয়া মাতালের মতো অসংলগ্ন গতিতে চলেছে নৌকা। কফিলদ্দির হৃৎপিন্ডটা কখন বুঝি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।

হু-হু হু-হু বাতাসের বিরাম নেই। উন্মত্ত কালোজলে মুহুর্মুহু ভেসে উঠছে রক্তাক্ত অক্টোপাসটা। নৌকোর যাত্রী দুজন পরস্পরকে জড়িয়ে পড়ে আছে মূৰ্ছিতের মতো, আর অশরীরীদের সঙ্গে লড়াই করে অমানুষিক শক্তিতে দাঁড়ে ঝাঁকি মারছে কফিলদ্দি। আল্লা, আল্লা, নবি।

আকাশের মেঘের পর্দাটা আরও যেন ঘন হয়ে চেপে বসছে। অন্ধকার—দুর্ভেদ্য, আদি অন্তহীন।

সওয়ারি নামিয়ে দিয়ে কফিলদি ময়লা গামছা পেতে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। বেশ বেলা হয়েছে, মিষ্টি নরম রোদে ধুয়ে যাচ্ছে পৃথিবী, সোনা মেখে ঝলমলিয়ে উঠেছে কালাবদরের জল! দুর্যোগের চিহ্নমাত্র নেই কোনোখানে।

এমন কিছু অসম্ভব দুর্যোগ নয়, তবু কাল রাত্রে কেন এত ভয় পেল কফিলদ্দি?

আর আশ্চর্য! তখন একটা কথা বিদ্যুৎচমকের মতো মনের মধ্যে সাড়া দিয়ে উঠল। সোজা হয়ে কফিলদ্দি উঠে বসল, সরিয়ে ফেললে পাটাতনের তক্তা একখানা। চোখে পড়ল শানানো মস্ত রামদাখানা সেখানে ঝকমক করছে।

আরও মনে পড়ল মহাজনের দেনায় জ্বালাতন হয়ে কাল সে খেপে গিয়েছিল। কাল সে চেয়েছিল প্রথম ডাকাতি করতে, প্রথম মানুষ খুন করে রক্তের আস্বাদ নিতে। কিন্তু কথাটা সে ভুলে গেল কেন? কাল রাত্রে কালাবদরের জলে যারা তাকে ভয় দেখিয়েছিল তারা কি প্রেতাত্মা? নাকি আল্লার ক্রোধ সহস্র সহস্র তর্জনী তুলে শাসন করেছিল তার পাপকে, তার মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ইবলিশকে? বিমূঢ়ের মতো রামদাখানার দিকে তাকিয়ে রইল কফিলদ্দি! কী আশ্চর্য, কথাটাকে এমন করে ভুলে গেল কেমন করে?

নরম রোদে অপূর্ব প্রশান্ত হয়ে গেছে কালাবদর। কফিলদ্দির নৌকার গায়ে কুলকুল করে সস্নেহ আঘাত দিয়ে যাচ্ছে। লক্ষ লক্ষ কালনাগিনি যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেছে, শুনতে পেয়েছে কোনো সাপ-খেলানো বাঁশির সুর।

ক্ষত

পাবলিক লাইব্রেরি থেকে আনা, পাতা মুড়িবেন না ছাপ মারা এবং পাতায় পাতায় মোড়া জীর্ণ বাংলা উপন্যাসখানা পড়বার চেষ্টা করছিল সিতাংশু। রাত এগারোটার কাছাকাছি, অসহ্য গরম। জানালা দিয়ে বাতাস আসছিল না তা নয়, কিন্তু তাতে আগুনের ছোঁয়া। দিনে দুর্দান্ত গরম থাকলেও সন্ধ্যার পরেই নাকি সাঁওতাল পরগনার সুশীতল বাতাস বইতে থাকে, এমনই একটা জনশ্রুতি তার শোনা ছিল। কিন্তু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, রাত তিনটের আগে সেই বিখ্যাত শীতল হাওয়াটি প্রবাহিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

বইটি প্রেমের উপন্যাস এবং শুরু হয়েছে পাইনবনের ভিতরে একটি আঁকাবাঁকা পথের উপর। কুয়াশা কেটে গিয়ে পাইনের ঊর্ধ্বমুখী কণ্টকপত্রে সোনালি রোদ পড়েছে, দু-ধারে বরাশ ফুল ফুটেছে রাশি রাশি, আর ওভারকোটের পকেটে হাত দিয়ে একটি মেয়ে আশ্চর্য গভীর চোখ মেলে দূরের নীল পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক সেই সময়…।

ঠিক সেই সময়েই বিরক্ত হয়ে সিতাংশু পর পর কয়েকটা পাতা উলটে গেল। এই দুর্ধর্ষ গরম, ইলেকট্রিকবিহীন এই বাড়ি, নিঃসঙ্গ এই জীবন, এর ভিতরে শীতল পাহাড়ের কবোষ্ণ রোমান্স তার কল্পকামনা অনেকটা মেটাতে পারত; কিন্তু সিতাংশুর প্রতিক্রিয়া অন্যরকম হল। কেন এমন বাজে বই লেখা হয়, কেই-বা সেটা ছাপে; এবং যদিই-বা সেটা ছাপা হয়, তাহলে পাতাগুলো দিয়ে মুড়ির ঠোঙা তৈরি না-করে পাঠককে যন্ত্রণা দেবার জন্যে লাইব্রেরিতে রাখা হয় কেন? এই ধরনের গোটা কয়েক আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা তার মনের ভিতর ঘুরপাক খেয়ে গেল।

কিন্তু লাইব্রেরির বইয়ের আরও একটা আকর্ষণ আছে, সে হল অনাহূত টীকাকারদের মন্তব্য। বাঁধাইয়ের দু-ধারের সাদা পাতায়, বইয়ের মার্জিনে রসিক পাঠকদের নানারকম স্বতোৎসারিত উচ্ছাস। যেমন— বাঃ, বেশ বেশ। একেই বলে খাঁটি প্রেম, একসেলেন্ট কিংবা মণিকার এইরূপে চিন্তা করা অন্যায়। হিন্দু নারী হইয়া সে পরপুরুষের… ইত্যাদি ইত্যাদি। তা ছাড়া কাঁচা হাতের কিছু কিছু অশ্লীল মন্তব্যও থাকে। আর বই যদি পাঠকের ভালো না-লাগে, তাহলে লেখকের উদ্দেশে যেসব মন্তব্য বর্ষণ করা হয়, ভদ্রলোক সেগুলো জানতে পারেন না বলেই আত্মহত্যা করেন না।

অতএব সিতাংশুও কালিদাস ছেড়ে মল্লিনাথ পড়া শুরু করল। একটি নয়, অন্তত পেনসিলে আর কালির লেখা গুটি সাতেক মল্লিনাথের সন্ধান পাওয়া গেল। কাছাকাছি কোনো হ্যাণ্ড রাইটিং এক্সপার্ট থাকলে সঠিক সংখ্যাটা বলতে পারতেন।

কিন্তু তাই-বা ভালো লাগে কতক্ষণ। গরম, কদর্য গরম! হাওয়াটাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। জানালার বাইরে কালো ব্রোকেডের পর্দার মতো টানা অন্ধকার, তার ভিতর দিয়ে দু-তিনটে ইউক্যালিপ্টাসের বাকলহীন শুভ্রতা অতিকায় কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে। মিউনিসিপ্যালিটির একটা কেরোসিনের আলো জানালার প্রায় মুখোমুখি ছিল, সেটা সন্ধ্যা না লাগতেই নিবে গিয়েছে। ঘরের দেওয়ালে লণ্ঠনের আলোয় নিজের যে-ছায়াটা পড়েছে, সেটাকে পর্যন্ত সিতাংশুর অসহ্য বোধ হতে লাগল। ওটা যেন তার মনের ছায়া—বিকৃত, অর্থহীন, অশোভন, অশালীন। বাইরের অন্ধকারে গিয়ে ওটা দাঁড়ালেই ভালো হত, তার প্রত্যেকটা অঙ্গভঙ্গিকে এমনভাবে ক্যারিকেচার করবার প্রয়োজন ছিল না।

ঘাম ঝরছে না, সারা শরীর যেন জ্বালা করছে। এক বার স্নান করতে পারলে ভালো হত। কিন্তু ঠিক নাটকীয়ভাবে সেই সময় শব্দটা শুনল সিতাংশু। পরিষ্কার শুনতে পেল। ইদারার গায়ে দড়ি ঘষার খসখস আওয়াজ, বাঁশের একটা মৃদু গোঙানি আর ছলাৎ ছলাৎ করে জলের কলধ্বনি।

সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ল সিতাংশু। লণ্ঠনটা কমিয়ে দিয়ে পা টিপে টিপে দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর কপাটটা ইঞ্চি তিনেক ফাঁক করে তীক্ষ্ণদৃষ্টি মেলে দিলে সামনের দিকে।

বাড়ি যতই ছোটো হোক, তারের বেড়া-ঘেরা কম্পাউণ্ডটা অনেকখানি। সিতাংশুর ঘর থেকে প্রায় চল্লিশ গজ দূরে তার ইঁদারা। এই অন্ধকারে একটি ঝাঁকড়া পিপুল গাছ আরও অন্ধকার ছড়িয়েছে তার উপর। তবু স্পষ্ট দেখলে সিতাংশু, কে একজন ইদারা থেকে জল তুলছে। বালতি উপরে টানার সঙ্গে সঙ্গে তার নুয়ে-পড়া শরীরটা সোজা হয়ে উঠছে আস্তে আস্তে।

হিংস্র ক্রোধে দাঁতে দাঁত চাপল সিতাংশু। এই ব্যাপার! এই জন্যেই অতখানি টলটলে জল দু-দিনের ভিতরেই বালিতে ভরে উঠছে। সন্দেহ একটু ছিলই, এইবার বোঝা গেল সব। জল চুরি হচ্ছে।

একটা বিশ্রী উপন্যাস। কুৎসিত গরম। নিঃসঙ্গ নির্বাসিতের মতো জীবন। ইলেকট্রিকের আলোহীন ঘরে নিজের ছায়ার ভ্যাংচানি। তার ওপর চুরি? সিতাংশুর মাথায় আগুন জ্বলল।

দরজা বন্ধ করে সে ঘরে ফিরে এল। কী করা যায়? তাড়া করলে তারের বেড়া ডিঙিয়ে পালাবে, ধরা যাবে না। অসম্ভব আশায় চারদিকে এক বার সে তাকিয়ে দেখল—কোনো মিরাকলে একটা বন্দুক যদি এই মুহূর্তে হাতের কাছে পাওয়া যায়, তাহলে আর ভাবনার কিছু থাকে না। কিন্তু বন্দুকের বদলে পাওয়া গেল একটা মশারির স্ট্যাণ্ড।

আর দেরি করা যায় না। জলের বালতি নিয়ে এক বার তারের বেড়া টপকে চলে গেলে আইনত সিতাংশুর আর কিছুই বলবার নেই। সুতরাং যা করতে হয় এক্ষুনি।

মশারির স্ট্যাটা শক্ত করে ধরে পিছন দিয়ে ঘুরে সিতাংশু দারার দিকে এগোতে চেষ্টা করল। চোর তখন নিবিষ্টচিত্তে জল তুলছে। জলের ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ সিতাংশুর জ্বালাধরা রোমকূপগুলোকে পুড়িয়ে দিতে লাগল। তারপর যখন আর এগোনো চলে না, যখন প্রায় দশ-বারো গজের মধ্যে এসে পড়েছে, যখন আর এক-পা বাড়ালেই চোর তাকে দেখতে পাবে, তখন হাতের ডাণ্ডাটা সে ছুড়ে মারল সবেগে।

নির্ভুল লক্ষ্যভেদ! একটা মৃদু আর্তনাদ করে চোর মাটিতে ঘুরে পড়ল।

কিন্তু সিতাংশুর হাত-পা জমে গিয়েছে তৎক্ষণাৎ। গরম, বিরক্তি আর ক্রোধে অতখানি অন্ধ না-হলে আরও আগেই সে বুঝতে পারত। একটি মেয়ে।

কী সর্বনাশ! রোম্যান্টিক উপন্যাসের পাতা থেকে একেবারে নারীহত্যায়!

কে বলে পশ্চিমের গরমে ঘাম হয় না? মুহূর্তে ঘেমে উঠল সিতাংশু, ভিজে গেল গেঞ্জি, জিভটা চলে যেতে চাইল গলার ভিতর, মাথাটা একেবারে ফাঁপা হয়ে গেল। এইবার?

মেয়েটা নড়ে উঠল। উঠে বসতে চেষ্টা করছে। যাক—একেবারে খুন হয়নি তাহলে, বেঁচে আছে এখনও! সন্তর্পণে কাছে এগোল সিতাংশু।

এক টুকরো চাঁদ উঁকি দিয়েছে আকাশে। পিপুল গাছের পাতার ভিতর দিয়ে স্নান খানিকটা আলো এসে পড়েছে মেয়েটির মুখে। চিনতে পেরেছে সিতাংশু। পিছনের বাড়িতে পোস্ট অফিসের যে নতুন ভদ্রলোকটি এসেছেন তাঁরই কেউ হবে। ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয়নি, কিন্তু মেয়েটিকে কয়েক দিনই চোখে পড়েছে।

সিতাংশু সামনে আসতে টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল। চাঁদের আলোতেও দেখা গেল, তার কপাল বেয়ে রক্ত পড়ছে। আর সেইসঙ্গে শোনা গেল ফোঁপানো কান্নার স্বর, এক বালতি জল নিতে এসেছিলুম আপনার ইদারা থেকে, সেজন্যে এমন করে আমায় মারলেন?

আগেই মরমে মরে গিয়েছিল সিতাংশু, এবার মিশে গেল মাটিতে।

আমায় ক্ষমা করবেন। মানে, আমি ভেবেছিলুম…

কী ভেবেছিলেন? কান্নার ভিতর থেকে এবার ঝাঁঝ বেরিয়ে এল। কোনো পুরুষমানুষ? যে-ই হোক-না, এক ফোঁটা জলের জন্যে তাকে আপনি খুন করতে চাইবেন? আপনি না ভদ্রলোক?

গলার স্বরে বোঝা যাচ্ছে ব্যাপারটা খুব গুরুতর হয়নি। ভরসা পেয়ে রাগ হল সিতাংশুর। এক ফোঁটা জলই বটে! এদিককার সমস্ত হাঁদারাই প্রায় শুকিয়ে মরুভূমি, সিকি মাইল রাস্তা পেরিয়ে মিউনিসিপ্যালিটির একটা টিউবওয়েল ভরসা। তার হাঁদারায় যে দু-চার বালতি জল আছে, তা-ও এভাবে লুট হতে থাকলে মাথায় খুন চাপা অন্যায় নয়।

কিন্তু সেকথা বলল না সিতাংশু।

এসে চাইলেই পারতেন।

চাইলেই যেন দিতেন আপনি।

স্পষ্ট পরিষ্কার কথা। না, দিত না সিতাংশু। এই দুঃসময়ে অতখানি উদারতা তার নেই— কোনো মহিলা সম্পর্কেও না। বিব্রত হয়ে সিতাংশু বললে, থাক ও-সব কথা। আপনার কপালটা কেটে গিয়েছে মনে হচ্ছে। দাঁড়ান, আয়োডিন এনে দিচ্ছি।

খুব হয়েছে, আর উপকার করতে হবে না। কপাল ফাটিয়ে দিয়ে জলের দাম তো আদায় করলেন। কী করব এখন? জলটা নিয়ে যাব না আবার ঢেলে দেব ইদারায়?

সিতাংশু অপ্রস্তুত হল। আশ্চর্যও হল সেইসঙ্গে। একটুও আত্মসম্মান নেই মেয়েটার, এত কান্ডের পরেও ভুলতে পারেনি জলের কথাটা।

ছি ছি, কী যে বলেন! চলুন আমিই পৌঁছে দিয়ে আসছি জলটা।

কোথা থেকে এসে পড়ল টর্চের আলো। চমকে তাকাল দুজনেই।

পোস্ট অফিসের সেই ভদ্রলোক। পিছনের বাড়ির নতুন ভাড়াটে।

কী হয়েছে বুলু? টর্চের আলোয় বুলুর কপালের রক্ত একরাশ সিঁদুরের মতো ঝকঝক করে উঠল। কী করেছিস আবার?

সিতাংশু পাথর হয়ে গেল। আর বুলুই জবাব দিলে।

অন্ধকারে হাঁদারার ওপর পড়ে গিয়েছিলুম কাকা। ইনি ছুটে এসে…

তারের বেড়া টপকে ভিতরে এলেন ভদ্রলোক।

তোকে হাজার বার বারণ করলুম এত রাতে জলের দরকার নেই, তবু হতভাগা মেয়ের কানে গেল না। তোর জন্যে শেষে একটা কেলেঙ্কারিতে পড়ব এ আমি ঠিক জানি। নে চল। বালতি তুলে নিয়ে ভদ্রলোক সিতাংশুর দিকে তাকালেন, কিছু মনে করবেন না মশাই, এই মেয়েটার জ্বালায় আমার একদন্ড স্বস্তি নেই। কপালে যে আমার কত দুঃখ আছে সে কেবল আমিই জানি। আপনার ঘুম নষ্ট হল, অপরাধ নেবেন না।

সিতাংশু কী বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সুযোগ পেল না। বিহ্বলতার ঘোর কাটিয়ে উঠতে-না উঠতেই কাকা-ভাইঝি তারের বেড়া পার হয়ে চলে গিয়েছেন। ফিকে চাঁদের আলোয় দুটো অবাস্তব ছায়ামূর্তি।

কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে নীচু হয়ে মশারির স্ট্যাটা তুলে নিল সিতাংশু। এটা কি চোখে পড়েনি ভদ্রলোকের? না-পড়া অসম্ভব। অসহ্য গরম নিঃসঙ্গ ঘরটার দিকে যেতে যেতে সিতাংশু নিজেকে জিজ্ঞাসা করতে চাইল, কে ভালো অভিনয় করেছে? বুলু না তার কাকা?

সারাটা রাত আর ভালো করে ঘুম এল না, কাটল অস্বস্তিভরা তন্দ্রার ভিতর। চোখ কচলাতে কচলাতে সিতাংশু যখন বারান্দায় এসে দাঁড়াল, তখন তীক্ষ্ণ উজ্জ্বল রোদে চারদিক ভরে উঠেছিল। রাস্তার ওপারে ইউক্যালিপ্টাসের সারি পেরিয়ে কাঁকর-মেশানেনা ঢেউ-খেলানো মাঠ, তার ভিতরে একটা খাপছাড়া সাদা বাড়ি রোদে জ্বলন্ত হয়ে উঠেছে। দূরের রুক্ষ পাহাড়টা পড়ে আছে অপরিচ্ছন্ন বন্য মহিষের মতো, তার পত্রহীন গাছপালা আর বড়ো বড়ো ন্যাড়া পাথর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এখান থেকেও।

সব শ্রীহীন, সব কিছু আগুন দিয়ে ঝলসানো। মেঘনা-পাড়ের সিতাংশু বিরস বিতৃষ্ণ মুখে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর মনে পড়ল, একদিনের ছুটি নিয়ে তার ছোকরা চাকর ধনিয়া নিজের গাঁওমে গিয়েছিল, আজ চতুর্থ দিনেও সে ফেরেনি। গ্রামে যাওয়া খুবসম্ভব বাজে কথা —বেশি মাইনেতে আর কোথাও কাজে লেগেছে। ওর দোষ নেই। ভদ্রলোকেই যদি জল চুরি করতে পারে…

মেঘনা-পাড়ের সিতাংশু সেনগুপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সাহারা মরুভূমি নয়, বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে একশো মাইলের মধ্যেই যে জল চুরি করবার দরকার হয়, মেঘনার কালো অথই জলের দিকে তাকিয়ে সেকথা কে ভাবতে পারত!

কিন্তু ও-সব তত্ত্বচিন্তা এখন থাক। আপাতত সিতাংশুকে নিজের হাতে চা করতে হবে, রান্নার ব্যবস্থা করে নিতে হবে। তবু তো আজ বাজারে যাওয়ার সমস্যা নেই, কাল অফিস থেকে ফেরবার সময় বুদ্ধি করে আলু আর ডিম নিয়ে এসেছিল। নাঃ, আর দেরি করা চলে না।

মুখ ধুতে ইদারার পাড়ে আসতেই চোখে পড়ল তিন-চার ফোঁটা রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে আছে। আত্মগ্লানিতে সিতাংশু সেদিকে আর তাকাতে পারল না। মেয়েটিকে এক বার একা পাওয়া দরকার, ভালো করে ক্ষমা চাইতে হবে। হাঁটতে হাঁটতে একসময় যাবে নাকি ও বাড়িতে? কিন্তু আলাপ-পরিচয়টাই যখন হয়ে ওঠেনি এ পর্যন্ত, তখন…।

অন্যমনস্কভাবে ইদারায় বালতি নামিয়েছিল, অন্যমনস্ক হয়েই টেনে তুলল। আর তৎক্ষণাৎ সমস্ত অনুতাপ মুছে গেল, পা থেকে জ্বলে উঠল মাথা পর্যন্ত। অর্ধেক জল, অর্ধেক বালি।

আরও অর্ধেক শুকিয়ে গিয়েছে ইদারা, কাল ওভাবে চুরি না-হলে আজকের দিনটা কুলিয়ে যেত। চাকরটা থাকলেও-বা কথা ছিল, এখন তাকেই গিয়ে সিকি মাইল দূরের টিউবওয়েল থেকে জল আনতে হবে। আর যা ভিড় সেখানে!

দুত্তোর!

কুঁজোর জলে চা খাওয়া কোনোরকমে চলতে পারে। স্নানের আশা নেই। অফিস যাওয়ার পথে খাওয়ার জন্যে ঢুকতে হবে হোটেলে। সিতাংশুর মনে হতে লাগল, মশারির স্ট্যাণ্ড দিয়ে ঘা কয়েক ওই ভদ্রলোককেই বসিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। সবই জানতেন, অথচ কেমন ন্যাকামি করে গেলেন। আর মেয়েটা—সেই বুলু! অবশ্য রক্তপাত না-হলেই খুশি হত সিতাংশু; কিন্তু ডাণ্ডার ঘা তার যে একেবারেই পাওনা ছিল না, এই মুহূর্তে সে তা ভাবতে পারল না।

অফিস থেকে বেরিয়ে, রাস্তায় চা খেয়ে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। আবার সেই ঘর, সেই গরম, লণ্ঠনের আলোয় নিজের কদাকার ছায়া আর সেই বাংলা উপন্যাসটা। লণ্ঠনটা জ্বালাতে জ্বালাতে সিতাংশুর মনে হল— তারপর আরও অনেক রাতে ইঁদারার থেকে আবার কেউ হয়তো জল চুরি করতে আসবে, যদিও আজ বালতি ভরে বালিই উঠবে কেবল। কিন্তু কে আসবে? বুলু? না, বুলু আর আসবে না।

যদি বুলুই আসে? একটা অসম্ভব কল্পনায় রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল সিতাংশু। তা হলে আজ কী করবে সিতাংশু? দূর থেকে দেখা, পিপুল পাতায় জ্যোৎস্নায় আধখানা দেখা আর একটি ছোটো টর্চের আলো এক ঝলক দেখা বুলুর মুখের সামনে আজ লণ্ঠনটা তুলে ধরবে সে।

দেখবে কাল রাতে কতখানি ক্ষত সে মেয়েটির কপালে এঁকে দিতে পেরেছে—কতটা লিখে দিতে পেরেছে নিজের স্বাক্ষর।

আসতে পারি?

বুলু নয়, তার কাকা। সেই অনেক রাতের প্রত্যাশিত সময়টির অনেক আগেই এসে পড়েছেন তিনি।

সিতাংশু চমকে মাথা তুলে বললে, আসুন।

বুলুকে লণ্ঠনের আলোয় দেখতে চেয়েছিল সিতাংশু, দেখল তার কাকাকে। বছর পঁয়তাল্লিশেক বয়স হবে। শক্ত ভারী গোছের বেঁটে মানুষ। কপাল থেকে মাথার আধখানা পর্যন্ত মসৃণ টাক। সিতাংশুর জারুল কাঠের চেয়ারটায় সশব্দে আসন নিলেন।

আলাপ করতে এলুম। আমার নাম বিরাজমোহন মল্লিক। আপনি?

সিতাংশু সেনগুপ্ত।

দেশ?

সিতাংশুকে বলতে হল।

তাই বলুন! আমাদের ইস্টবেঙ্গলের লোক। চেহারা দেখে আমারও তাই মনে হয়েছিল।

পূর্ববঙ্গত্ব এমনভাবে তার শরীরে লেখা আছে, এ খবরটা এতদিন সিতাংশুর জানা ছিল না। মৃদু রেখায় হাসল সে।

তা একা আছেন এখানে? ফ্যামিলি কোথায়?

মা-বাবা কলকাতায় থাকেন।

ওয়াইফ?

বাঙালির স্ত্রীকে বাংলা ভাষায় ওয়াইফ বললে ভারি কুশ্রী শোনায় সিতাংশুর কানে। তবু এবারেও সে অল্প একটু হাসল। বললে, তাঁকে এখনও জোটাতে পারিনি।

বলেন কী, ব্যাচেলর! বিরাজবাবু বিস্মিত হলেন, তিরিশ তো পেরিয়ে গেছেন বোধ হয়।

হ্যাঁ, বছর দুই হল।

তবু এখনও বিয়ে করেননি! বুড়ো বয়সে যে ছেলের রোজগার খেয়ে যেতে পারবেন না!

সেই দুশ্চিন্তায় সিতাংশুর রাতে ঘুম হচ্ছিল না। তবু এবারে ভদ্রতার হাসি হাসতে হল।

বাবা-মাই বা কী বলে চুপ করে আছেন। বিরাজবাবু স্বগতোক্তি করলেন, বিমর্ষভাবে চুপ করে রইলেন কয়েক সেকেণ্ড। তারপর এলেন অন্য প্রসঙ্গে।

কিন্তু এই জলের কষ্ট তো আর সহ্য হয় না মশাই। মরুভূমিতে এলুম নাকি?

সেইরকমই তো মনে হচ্ছে।

মিউনিসিপ্যালিটিতে কড়া করে একখানা দরখাস্ত দিলে কেমন হয়?

আসছে বছর গ্রীষ্মকালে সে-দরখাস্ত নিয়ে ওঁরা আলোচনা করবেন।

যা বলেছেন! সক্ষোভে বিরাজবাবু মাথা নাড়লেন, স্বাধীনতার পরেও এরা যে-তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে গেল। এদেশের উন্নতি হতে মশাই আরও পাঁচশো বছর।

তারপর আধ ঘণ্টার মতো নির্বাক শ্রোতার ভূমিকায় নিঃশব্দে বসে রইল সিতাংশু। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত যা যা বলবার থাকে, বিরাজবাবু কিছুই তার বাদ দিলেন না। গোটা তিনেক সিগারেট খেলেন এবং সামনে অ্যাশট্রে থাকতেও ছাই ঝাড়লেন মেঝের উপর। আর সিতাংশু কালকের মতো নিজের ছায়া দেখতে লাগল লণ্ঠনের আলোয়। কান পেতে শুনতে লাগল বাইরে মাঠের ভিতর দিয়ে হু-হু করে বয়ে যাচ্ছে হাওয়া, আর ইউক্যালিপ্টাসের পাতাগুলো ঝরঝর করে ঝরে পড়ছে তাতে।

শেষপর্যন্ত বিরাজবাবু উঠলেন।

একটা লোকই তাহলে রাখা যাক, কী বলেন? দু-বেলা টিউব-ওয়েল থেকে আমাদের দু বাসায় জল দেবে। টাকাটা দেওয়া যাবে ভাগাভাগি করে।

সে তো বেশ কথা!

দেখি তবে চেষ্টা করে। দরজার দিকে পা বাড়িয়েছেন বিরাজবাবু, সেই মুহূর্তেই প্রায় মুখ ফসকে প্রশ্নটা বেরিয়ে এল সিতাংশুর।

আপনার ভাইঝি কাল পড়ে গিয়েছিলেন, কেমন আছেন আজ?

অদ্ভুত দৃষ্টিতে বিরাজবাবু সিতাংশুর দিকে তাকালেন। লণ্ঠনের আলোয় মেক-আপ করা অভিনেতার মতো দেখাল তাঁকে।

কে, বুলু? বুলু ঠিক আছে। সাংঘাতিক মেয়ে মশাই, অল্পে ওর কিছু হয় না। মাটিতে পুঁতে দিলে কাঁটাগাছ হয়ে বেরুবে।

বিরাজবাবু বেরিয়ে গেলেন।

আজও রাত বারোটা পর্যন্ত একা ঘরে ছটফট করল সিতাংশু। সেই বাংলা উপন্যাসখানার পাতা ওলটাল, রসিক পাঠকদের টীকাটিপ্পনীগুলো পড়বার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু আজ আর অক্ষম বিরক্তিতে নয়—সেই অসম্ভব দুরাশায় সে কান পেতে বসে রইল। কয়েক বার উঠে গেল জ্যোৎস্নার জাফরিকাটা পিপুল গাছটার তলায়। বুলু আজ আর আসবে না সে জানে; তবু এই রাত, এই গরম আর উত্তেজিত স্নায়ুর একটা বিচিত্র কুহকে সিতাংশু রাত আড়াইটে পর্যন্ত প্রতীক্ষায় জেগে রইল। তারপর বাতাস ঠাণ্ডা হয়ে গেল, ক্লান্ত অবসাদে ঝিমিয়ে এল শরীর, আর ঘুমের ঘোরে সিতাংশু স্বপ্ন দেখল… মেঘনার কালো জলের ওপর দিয়ে গেরিমাটির বন্যা ছুটে চলেছে।

বুলু এল না।

সে-রাতে নয়, তার পরের রাতে নয়, তার পরের রাতেও নয়। সিতাংশু কেমন একটা দুর্বোধ্য যন্ত্রণায় পীড়িত হতে লাগল। আশ্চর্যভাবে লুকিয়ে গিয়েছে মেয়েটা। যখন তাকে দেখার কোনো কৌতূহল ছিল না, তখন কত বার পিছনের বাড়ির বারান্দায়, খোলা জমিটুকুতে কতভাবে তাকে সে দেখেছে। সেদিন সে বুলুকে মনে রাখতে চেষ্টা করেনি— দরকারও ছিল না। সেই আধখানা দেখা, ঝিলিমিলি জ্যোৎস্নায় এক টুকরো দেখা আর বিরাজবাবুর টর্চের আলোয় রক্তের সিঁদুর-মাখানো একটুখানি শুভ্র ললাট, এর বেশি আর কিছু মনে আনতে পারে না সিতাংশু। সে শুধু এক বার দিনের আলোয় দেখতে চায় বুলুকে, দেখতে চায় তার কপালে…

দেখা হয় বিরাজবাবুর সঙ্গে। বাজারে, অফিসের পথে।

জল পাচ্ছেন ঠিকমতো?

পাচ্ছি।

জষ্টি মাস পার হয়ে গেল মশাই, এখনও বৃষ্টি নেই এক ফোঁটা। কী করা যায় বলুন তো।

কী আর করা যেতে পারে। আকাশের উদ্দেশে বৃষ্টির জন্যে একখানা দরখাস্ত লেখা যেতে পারে—এমনই একটা জবাব আসে ঠোঁটের কোনায়। কিন্তু বিরাজবাবুকে সত্যিই ও-কথা বলা যায় না।

আর জিজ্ঞাসা করা যায় না বুলুর কথা। খবরের কাগজ চাইবার কিংবা বাড়িতে ডিকশনারি আছে কি না জানবার যেকোনো একটা উপলক্ষ্য নিয়ে বিরাজবাবুর বাসায় এক বার যে যাওয়া যায় না তা-ও নয়। কিন্তু কিছুতেই পেরে ওঠে না সিতাংশু। নিজের এই ছেলেমানুষি কৌতূহলের উগ্রতা তাকে যত বেশি পীড়ন করে, ততখানিই লজ্জা দেয়।

কেন যে বুলুর ক্ষতচিহ্নিত কপালটাকে এক বার দেখবার জন্যে এই পাগলামি তাকে পেয়ে বসেছে, সিতাংশু নিজের কাছেই তার কোনো কৈফিয়ত খুঁজে পায় না। বুলুর কাছে ক্ষমা চাইবে এক বার? বলবে, আমাকে যত বড়ো পাষন্ড ভেবেছেন আমি তা নই। কোনো মেয়ের গায়ে হাত তোলা দূরে থাক, ছেলেবেলার সীমা পার হয়ে নিজের ছোটোভাইকে পর্যন্ত কোনোদিন একটা চড়চাপড়ও মারিনি। আর বুলুর কপালের দিকে তাকিয়ে নিজের অপরাধের সে পরিমাপ করতে চায়। জেনে নিতে চায় কোনো বড়ো ক্ষতি সে করেনি, ছোট্ট একটুখানি দাগ, দু-দিন পরেই মিলিয়ে যাবে?

ঠিক কী বলতে চায় সিতাংশু জানে না। কেবল অর্থহীন মনোযন্ত্রণার পীড়ন। ভূতের মতো ভাবনাটা তার ওপর চেপে বসেছে, নিজেকে কিছুতেই ছাড়াতে পারে না তার হাত থেকে।

কিন্তু শেষপর্যন্ত বুলুও এল।

আজও ঠিক তেমনি উত্তপ্ত সন্ধ্যা। লণ্ঠনের আলোয় নিজের বিকৃত ছায়া দেখতে দেখতে খেপে গিয়ে সিতাংশু বাতিটা নিবিয়ে দিয়েছিল। তারপর ইজিচেয়ার পেতে চুপ করে বসে ছিল জানলার কাছে। বাইরে কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে ছিল বল্কলবিহীন ইউক্যালিপ্টাসের সারি, যেন কোনো নিভন্ত চিতা থেকে উঠে আসা বাতাস ঝরঝরিয়ে তাদের পাতা ঝরাচ্ছিল।

আসব?

দরজার ফ্রেমে একটি মেয়ের ছায়াশরীর। সিতাংশুর সমস্ত সত্তা একটা নিঃশব্দ চিৎকারে ভরে উঠল। বুলু! বুলু ছাড়া আর কেউ নয়—কেউ হতেই পারে না। তবু জিজ্ঞাসা করলে, কে?

আমি বুলু। একটা চাপা হাসির আওয়াজ পাওয়া গেল, আপনার জল চুরি করতে এসেছিলুম।

আর লজ্জা দেবেন না। উদগ্র আহ্বানে সিতাংশুর শিরাগুলো টান টান হয়ে উঠল। বসুন আলোটা জ্বালি।

আলো জ্বালবার দরকার নেই, খামোখা রাস্তার লোকের চোখে পড়বে। শুধু একটা কথা বলতে এলুম। বলেই চলে যাব।

চেষ্টা করেও সিতাংশু গলার কাঁপন থামাতে পারল না। বললে, কিন্তু আপনাকে আমারও বলবার কিছু আছে। সেদিন যে অন্যায় আমি করে ফেলেছি…

অন্যায় আপনি করেননি। আমার যা পাওনা তাই-ই পেয়েছি। আমি সত্যি সত্যিই চোর।

ছি ছি, কী যে বলেন! আবছা অন্ধকারেও হাতজোড় করল সিতাংশু, আপনি জানেন না, আমি যে সেই থেকে কী লজ্জায়…

দরজার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল ছায়ারূপিণী বুলু। যেন অনেক দূর থেকে অথচ স্পষ্ট সুরেলা গলায় বললে, আগে আমার কয়েকটা কথা শুনুন, তারপরে লজ্জা পাবেন। আমি আজ আপনার কাছে কেন এসেছি জানেন? আমার মাথা ফাটিয়ে দিয়ে যে-দুঃখ আপনি পেয়েছেন, সেই দুঃখ থেকে আপনাকে মুক্তি দেব বলে। এ ছাড়া কাল আমি চলে যাব এখান থেকে, যাওয়ার আগে আপনাকে সামনে রেখে নিজের কথাগুলো বলে যাব। ইচ্ছে হলে শুনতে পারেন, নাও শুনতে পারেন।

আস্তে আস্তে এগিয়ে টেবিলের পাশটিতে বসে পড়ল বুলু। আর কেমন থমকে গেল সিতাংশু, মুহূর্তে বুলু যেন তাকে অনেকখানি দূরে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে। বিহ্বলভাবে বললে, আপনি যে কী বলছেন, আমি…

এখুনি বুঝতে পারবেন। আপনার ইদারা থেকে দু-বালতি জল নিতে এসেছিলুম, সেটা বড়ো কথা নয়। শুনুন, আমি চোর হয়েই জন্মেছি। হাতের সামনে কোনো জিনিস দেখলে আমি আর লোভ সামলাতে পারি না। সে টাকা হোক, পেনসিল হোক, একটা ফুলই হোক। ছেলেবেলা থেকে পাড়ার কোনো মেয়ে আমার সঙ্গে খেলত না, কোনো বাড়িতে ঢুকলেই আমাকে তারা তাড়িয়ে দিত। মেয়েদের বইখাতা চুরির জন্যে ইশকুল থেকে বার বার আমাকে ওয়ার্নিং দিয়েছে, শেষে অসহ্য হয়ে বিদায় করেছে। আমার দু-বছর বয়েসে মা মারা যান। দেবীর মতো পবিত্র ছিলেন তিনি। বাবা ছিলেন স্কুলের হেডমাস্টার, সারাজীবন সততারই সাধনা করেছেন। অথচ আমি…

বুলু থামল, কান্নায় ভারী হয়ে উঠছে গলা। সান্ত্বনা দেওয়া উচিত ছিল সিতাংশুর, ভাষা খুঁজে পেল না।

বুলু বলে চলল, দশ বছর বয়সে বাবা আমায় ছেড়ে গেলেন, এলুম কাকার কাছে। কাকা আমার স্বভাব বদলাবার অনেক চেষ্টা করেছেন, চাবুক দিয়ে মেরেছেন, সারা পিঠে আমার দাগ পড়ে গিয়েছে, অথচ কিছুতেই আমি পারি না। না খেতে দিয়ে ঘরে বন্ধ করে রেখেছেন, বেরিয়েই আমি তখুনি ফেরিওয়ালার ঝুড়ি থেকে কমলালেবু চুরি করেছি।

সিতাংশু একটা অস্ফুট আর্তনাদ করল। বুলু উঠে দাঁড়াল, সরে গিয়ে সিলুয়েত ছবির মতো ঠাঁই নিলে দরজার ফ্রেমে।

ভয় পাচ্ছেন, না? কান্না-মেশানো হাসির আওয়াজ এল বুলুর, সত্যি ভয় আপনি পেতে পারেন। আমি এক্ষুনি আপনার টেবিল থেকে ঘড়ি কিংবা কলম যাহোক একটা তুলে নিতে পারি। হাত আমার এমনই রপ্ত হয়ে গেছে যে, আপনি টেরও পাবেন না।

নার্ভাসভাবে গলাটা এক বার পরিষ্কার করে নিলে সিতাংশু। ছেলেমানুষের মতো বললে, কিন্তু আমি তবুও কিছুতেই…

বিশ্বাস করতে পারেন না, না? অনেকেই পারে না। ভালো করে আমাকে যদি দেখেন আপনি, স্বীকার করবেন আমি সুন্দরী। রূপটা আমার গুড কণ্ডাক্টের সার্টিফিকেট। কিন্তু আমাকে যারা চিনেছে, তারা কখনো ভুল করবে না।

সিতাংশু আবার গলাটা পরিষ্কার করে নিলে। কিন্তু এবার আর কথা বেরুল না মুখ দিয়ে।

বুলু বলে চলল, আমি জানি এ আমার রোগ। কাকাকে কত বার বলেছি আমার চিকিৎসা করাও আমি সেরে যাব, এ আমি আর সইতে পারছি না। কাকা বলেন, মারই হচ্ছে এ রোগের ওষুধ। তোর বিয়ে দিতে পারব বলে আশা নেই, তবে কোনোদিন যদি দিতেই পারি, শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বেশ করে ঠ্যাঙানি খেলেই রোগ পালাতে পথ পাবে না।

আচ্ছন্নভাবে বসে রইল সিতাংশু। বাইরে মাঠের ভিতর থেকে হাওয়ার গোঙানি ভেসে এল।

বাইশ বছর বয়স হল আমার, এ যন্ত্রণা আমি আর বইতে পারব না। তাই ভেবেছি কাল ভোরের ট্রেনে কলকাতায় চলে যাব। কাকা যেতে দেবেন না, টাকাও দেবেন না, পালিয়েই যেতে হবে আমাকে। গিয়ে আমি ডাক্তার দেখাব, ভালো হতে, বাঁচতে চেষ্টা করব। শুধু যাওয়ার আগে আপনাকে বলতে এসেছি, অন্যায় আপনি করেননি, চোরকে তার পাওনা শাস্তিই দিয়েছিলেন।

পরক্ষণেই দরজার ফ্রেম থেকে মিলিয়ে গেল বুলু। একটা লঘু পায়ের শব্দ নেমে গেল অন্ধকারে।

স্বপ্ন, মায়া, মতিভ্রম! চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠতে চেষ্টা করল সিতাংশু-পারল না, কিছুতেই পারল না। কে যেন হিপনোটাইজ করে তাকে নিশ্চল স্থবিরে পরিণত করে দিয়েছে।

একটা দমকা হাওয়ায় ইউক্যালিপ্টাসের কয়েকটা ঝরা পাতা এসে সিতাংশুর গায়ে-মাথায় ছড়িয়ে পড়ল।

সিতাংশুর ঘোর ভাঙল পরদিন।

আজ আর উজ্জ্বলন্ত সকাল নয়। এতদিনের অগ্নিদহনের পর পৃথিবীর প্রার্থনা পূর্ণ হয়েছে। আকাশ মেঘে অন্ধকার—বায়ু বহত পুরবৈয়া। ঝিমঝিম বৃষ্টি নেমেছে বাইরে। নামুক, আকাশ উজাড় করে নেমে আসুক। মরা মাটিতে নতুন অঙ্কুর মাথা তুলুক, শুকনো ইদারাগুলো জলে ভরে উঠুক, আর বুলু…

আর বুলু। স্বপ্ন-মায়া-মতিভ্রম। একটা অবিশ্বাস্য কাহিনি। বিচিত্র বিকৃতির নাগপাশে পাকে পাকে জড়ানো—তিলে তিলে মরে যাচ্ছে সে। আজ সকালের ট্রেনেই তার কলকাতা পালিয়ে যাওয়ার কথা। বাঁচুক, বেঁচে উঠুক বুলু। প্রার্থনার মতো উচ্চারণ করল সিতাংশু, এই বন্ধন থেকে সে মুক্তি পাক, এই অভিশাপের গন্ডি পার হয়ে সূর্যস্নাত জীবনের মধ্যে তার উত্তরণ ঘটুক।

ভয় পাচ্ছেন? জানেন, এক্ষুনি আপনার টেবিল থেকে ঘড়ি, কলম যাহোক কিছু… কথাটা কানের মধ্যে বেজে ওঠবার সঙ্গে সঙ্গে টেবিলের দিকে তাকাল সিতাংশু। ঘড়ি, কলম, চশমা সব ঠিক আছে। কিন্তু ব্যাগ? মানিব্যাগটা?

কালকে পাওয়া মাইনের দু-শো পঁচিশ টাকা আছে ব্যাগে। পুরো দু-শো পঁচিশ টাকা। একটা পয়সাও খরচ হয়নি।

পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিল সিতাংশু। নেই। টেবিলের টানায়? সেখানেও নেই। না, বালিশের নীচেও না।

মুহূর্তে চোখে অন্ধকার। একটু আগেকার প্রার্থনা বীভৎস অভিসম্পাত হয়ে এগিয়ে এল গলায়। হিপনোটিজম-ই বটে। সেইজন্যে বুলু আলো জ্বালাতে বারণ করেছিল আর উত্তপ্ত বিচিত্র সন্ধ্যার বিহ্বলতার সুযোগে সিতাংশুর নির্বোধ আচ্ছন্নতাকে আরও ঘনীভূত করে দিয়ে ব্যাগটা তুলে নিয়ে সে সরে পড়েছে। সিতাংশু ছুটল বিরাজবাবুর বাসায়।

শুধু আপনার ব্যাগ নিয়েছে? জান্তব চিৎকারে বিরাজবাবু ফেটে পড়লেন, আমার কী সর্বনাশ করেছে জানেন? গিন্নির চার ভরির হার, ছ-গাছা চুড়ি, সব নিয়ে শেষরাত্রে সরে পড়েছে।

সংশয়ের শেষটুকুও মুছে গেল।

কী করা যায় বিরাজবাবু?

থানায় চলুন। আর কী করবার আছে? বেঁটে ভারী চেহারার বিরাজবাবুকে নরখাদকের মতো দেখাতে লাগল। ক্রিমিনাল মশাই-বর্ন ক্রিমিনাল! ওই লজ্জাতেই দাদা অসময়ে মারা গেলেন। বিস্তর শাসন করেছি মশাই, চাবকে চামড়া তুলে দিয়েছি, দেওয়ালে ঠুকে ঠুকে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছি, তবু স্বভাব ছাড়ানো গেল না। মেয়েছেলে, তায় আমাদের বংশের। কী করে যে এমন হল ভাবতেই পারা যায় না। চলুন থানায়, ও-মেয়ের জেলখাটাই দরকার।

ঘরের ভিতর বিরাজবাবুর স্ত্রীর ইনিয়েবিনিয়ে কান্না, দুধ দিয়ে আমি কালসাপ পুষেছিলুম! আমার সর্বনাশ করে গেল…

বিরাজবাবু আরও খেপে গেলেন। হাত ধরে টানতে লাগলেন সিতাংশুর।

চলুন চলুন, আর দেরি করবেন না। এখনও বোধ হয় জসিডি পেরুতে পারেনি।

বুলু ফিরল সন্ধার পর। পুলিশ তাকে ফিরিয়ে এনেছে আসানসোল থেকে।

কিন্তু ততক্ষণে সিতাংশুর মনের আগুনটা নিবে গিয়েছে। সারাদিনের অশ্রান্ত বৃষ্টিতে পৃথিবীর মাটি স্নিগ্ধ হয়েছে, সুগন্ধ শীতল ভিজে বাতাস শরীর জুড়িয়ে দিয়েছে। আর চুপচাপ বসে বসে সিতাংশু ভাবছিল, কী দরকার ছিল দু-শো পঁচিশ টাকার জন্যে অতখানি পাগলামি করবার? বাড়ি থেকে টাকা আনিয়ে যাহোক করে এ মাসটা তার চলে যেত। কিছু ধারও হয়তো হত, সেটা শোধ দেওয়া যেত আস্তে আস্তে। কেন সে করতে গেল এসব? হয়তো বুলু সত্যিই যাবে সাইকোলজিস্টের কাছে, এই টাকাটা দিয়ে নিজের চিকিৎসা করাবে, সুস্থ স্বাভাবিক-সুন্দর হয়ে উঠবে। বুলুকে মেরে যে-পাপ করেছিল, এই টাকায় তার প্রায়শ্চিত্ত হবে খানিকটা। কেন এতটা হীন হয়ে গেল সিতাংশু, কালকের সেই অভিশপ্ত বুলুকে সে ভুলে গেল কী করে?

এমন সময় প্রায় নাচতে নাচতে এলেন বিরাজবাবু।

চলুন, চলুন। শ্রীমতী পৌঁছেছেন।

ধড়ফড় করে উঠে বসল সিতাংশু, কোথায়?

হাজতে।

বুকের ভিতর হাতুড়ি পড়ল একটা। কালো হয়ে গেল মুখ।

মাপ করবেন, আমি পারব না।

পারবেন না কী? যেতেই হবে। খবর পাঠিয়েছে থানা থেকে।

আমার শরীর খারাপ।

নিষ্ঠুর হাসি হাসলেন বিরাজবাবু।

আপনি ইয়ং ম্যান, ওসব সেন্টিমেন্ট আমি বুঝি। কিন্তু আমার অনেক বয়েস হয়েছে মশাই। উঠুন, চলুন শিগগির।

একটা মৃতদেহের মতো সিতাংশুকে টেনে তুললেন রিকশায়। তারপর থানাতে।

থানাসুদ্ধ লোকের কৌতুকভরা চোখের সামনে একটা টুলে বসে আছে বুলু। রুক্ষ চুল, ভাষাহীন চোখ। সামনের দেওয়ালের দিকে স্থিরদৃষ্টি। আজ সারাদিন সে স্নান করেনি, খেতে পায়নি।

চোরের মতো এক বার বুলুর দিকে তাকিয়ে তৎক্ষণাৎ পিছনে সরে গেল সিতাংশু, লুকিয়ে পড়তে চাইল। এইবার বুলুকে সে সম্পূর্ণ দেখছে—দেখছে কপালে এক ইঞ্চি লম্বা কাটা দাগটা এখনও শুকোয়নি। সিতাংশুর স্বাক্ষর।

কিন্তু সম্পূর্ণ কি দেখেছে সিতাংশু? না, দেখবার সাহস নেই। সাহস নেই বুলুর আরক্ত ভাষাহীন চোখের দিকে সে তাকায়।

দারোগা বললেন, এই দেখুন গয়না। হার, চুড়ি…

বিরাজবাবু প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলেন সেগুলোর উপর। বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, এ সবই আমার স্ত্রীর।

বুলু কথা বললে এইবার। সেই শান্ত সুরেলা গলা। যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে।

না, কাকিমার গয়না আমি নিইনি। ওসব আমার মায়ের জিনিস। কাকিমার কাছে ছিল।

মায়ের জিনিস? বীভৎসভাবে বিরাজবাবু ভেংচে উঠলেন, চোপরাও হারামজাদি। চোর!

বুলু আবার শান্ত গলায় বললে, আমি জানি, ওসবই আমার মায়ের। কাকিমার কোনো জিনিসই আমি ছুঁইনি।

বিরাজবাবু বুলুর উদ্দেশে প্রকান্ড একটা চড় তুলেছিলেন, দারোগা তাঁকে ধমক দিলেন, থামুন, আপনার স্ত্রী এসে গয়না শনাক্ত করবেন, আপনি গন্ডগোল করবেন না। তারপর সিতাংশুর দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, শ-খানেক ক্যাশ টাকা পেয়েছি, কিন্তু আপনার ব্যাগ পাওয়া যায়নি।

বিরাজবাবু বললেন, ব্যাগটা রেখে দেবে ওকি অমন কাঁচা চোর নাকি? আপনি ওকে চেনেন না স্যার! ও যে…

আঃ। দারোগা আবার ধমক দিলেন একটা।

বুলুর উদাস বিষণ্ণ স্বর শোনা গেল, আমি ওঁর ব্যাগ নিইনি। আমার নিজের চুড়ি বিক্রি করে…

বিরাজবাবু আবার ভেংচে উঠলেন, ওরে আমার সত্যবাদী যুধিষ্ঠির রে! নিজের চুড়ি বেচে উনি…

আর নয়। এর পরে আর কোনোমতেই দাঁড়ানো চলে না। চোরের মতো নিঃশব্দে পালিয়ে এল সিতাংশু। শুধু পথে আসতে আসতে বার বার মনে হল, আজ সারাদিন বুলুর খাওয়া হয়নি।

ব্যাগটা কিন্তু পাওয়া গেল। অফিসের ড্রয়ারেই রেখে এসেছিল।

এ সন্দেহও সিতাংশুর মনে জাগতে পারত। কিন্তু সন্ধ্যায় এসে যদি অমনভাবে নিজের কথা না বলত বুলু, যদি বিরাজবাবুর বাড়ি থেকে গয়নাগুলো সে না নিত, যদি সত্যিই সে কলকাতায় পালাতে না চাইত, তাহলে…

ব্যাগটাকে তৎক্ষণাৎ পকেটে লুকিয়ে ফেলল সিতাংশু। এখন থানায় যাওয়া যায়? বলা যায়, বুলু তার টাকা নেয়নি? ভুল করে সে মিথ্যে এজাহার দিয়েছিল?

কিন্তু আর কি সম্ভব? তাতে নিজের ওপরেই বিপদ টেনে আনা হবে। কেন তুমি এমন কাজ করলে? কেন একজন নির্দোষকে মিথ্যে নালিশ করে…।

নাঃ, সে মনের জোর নেই সিতাংশুর। তা ছাড়া এই হয়তো ভালো হল। জেলেই যাক বুলু। পাক দুঃখ, পাক লজ্জা। হয়তো এ থেকেই বুলু ভালো হয়ে উঠবে। যে সহজ-স্বাভাবিক সুন্দর জীবনের মধ্যে সে যেতে চেয়েছিল, হয়তো তারই প্রস্তুতি হবে এখান থেকে।

বাইরে বৃষ্টি। দগ্ধ মাঠে নতুন অঙ্কুর। ইদারায় নতুন জল। বুলুর চোখেও কি বর্ষা নেমেছে এখন?

আকাশ চিরে বিদ্যুৎ চমকাল—একটা রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্নের মতো। আর তখনই দেখতে পেল সিতাংশু বুলুর জীবনের দিগদিগন্ত জুড়ে অমনি একটা ক্ষতের স্বাক্ষর এঁকে দিয়েছে সে।

খড়গ

পাঁচ সের চুনের বায়না। ভোমরার হাতখানা একটু বেশি পরিমাণে ছুঁয়েই এক টাকার নোটখানা গুঁজে দিয়েছে হরিলাল। চমকে ভোমরা তিন-পা পিছিয়ে গেছে, নোটখানা উড়ে গেছে হাওয়ায়। মৃদু হেসে সেখানা কুড়িয়ে এনে চালের বাতায় রেখে দিয়েছে হরিলাল। তির্যক কটাক্ষ হেসে বলেছে, মনে থাকে যেন, সাত দিন পরেই কিন্তু বিয়ে।

হরিলাল গ্রামের তালুকদার। জমি আছে, পয়সা আছে, কারবার তো আছেই। যুদ্ধের বাজারে আরও কতদূর কী করেছে ভগবানই জানেন। সুতরাং কুড়ি টাকার চালের দিনেও সে ভালো করেই মেয়ের বিয়ে দিতে চায়। অনেক বরযাত্রী আসবে, গাঁয়ের বহু লোকের পাত পড়বে তার বাড়িতে। পাঁচ সের চুনের কমে এত বড় একটা ক্রিয়াকান্ড হওয়া শক্ত। সেরপ্রতি আট আনা দর সে দিতে চায়, সুতরাং ভোমরাকে একটু বেশি করে স্পর্শ করবার অধিকার তার নিশ্চয় আছে।

কিন্তু ভোমরা ছেলেমানুষ। অধিকার অনধিকারের ব্যাপারগুলো এখনও সে ভালো করে বুঝতে পারে না। হরিলালের লোলুপ চোখ আর অনুভূতিপ্রখর স্পর্শে তার সমস্ত শরীর শিরশির করে শিউরে উঠল। খেতু বাড়িতে নেই, দূরের ইষ্টিশনে সওয়ারি নামিয়ে দিতে গেছে। এমনসময় হরিলালের আবির্ভাবটা তার ভালো লাগল না। সংকীর্ণ জীর্ণ কাপড়ের প্রান্ত আকর্ষণ করে ঘোমটা দেবার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করল।

হরিলাল চেহারায় খাটো। হালে ঠিক ব্রহ্মতালুর ওপরে চিকচিকে একটা টাক নিশানা দিয়েছে। মোটা আর ছোটো ছোটো হাত-পা। আঙুলগুলো সবসময় চঞ্চল, কখনো স্থির থাকতে পারে না। মনে হয় তারা যেন সদাসর্বদা কী-একটা আঁকড়ে ধরবার চেষ্টায় আছে। এক বার পেলে আর ছাড়বে না, লোলুপ মুষ্টির ভেতরে নিঃশেষে সেটাকে নিষ্পেষিত করে ফেলবে। এক হিসাবে অনুমানটা নির্ভুল। হরিলালের হাতের ভেতর যা এক বার এসে পড়েছে তাকে আর কখনো সে ছাড়েনি—খত নয়, জমি নয়, নারীও নয়।

হরিলাল চলে গেলে ভোমরা আরও কিছুক্ষণ আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এ গাঁয়ের অন্যান্য ভুইমালী মেয়েদের মতো চুন সেও তৈরি করে কিন্তু আর-সকলের মতো কখনো হাটে বিক্রি করতে যায় না। খেতুই যেতে দেয় না তাকে। ভোমরাকে বিয়ে করেছে এই সেদিন, এখনও নেশা কাটেনি। একহাট লোকের ক্ষুধিত দৃষ্টির সামনে বসে সে বেচাকেনা করবে, ভুইমালীর ছেলে খেতুও এটাকে বরদাস্ত করতে পারে না।

কিন্তু পাঁচ সের চুনের বায়না তাকে নিতেই হবে। ধানের দর এবারেও গত বৎসরের মতো বেড়ে চলেছে ধাপে ধাপে। এ জেলাটা পুরোপুরি দুর্ভিক্ষের এলাকায় পড়ে না, তবু ঘটিবাটি আর রুপোর খাড় বিক্রি করে গতবছর পেটের দাবি মেটাতে হয়েছে। খেতুর জমি নেই, আধিও নেই, সওয়ারি বয়ে দিন কাটে। গাড়িভাড়া পাঁচ থেকে দশ টাকায় উঠেছে বটে কিন্তু জিনিসপত্রের দামও বেড়েছে পাঁচগুণ। যথাসর্বস্ব বিক্রি করে দিয়ে গেল বছর ওর বর্ষা কালের ধকল সামলে নিয়েছে, কিন্তু সে-দুর্দিন যদি এবারেও দেখা দেয় তাহলে প্রাণ বাঁচানোর কোনো পথই খুঁজে পাওয়া যাবে না।

সওয়ারি বয়ে খেতু যখন গ্রামের কাছাকাছি এসে পৌঁছোল, বেলা তখন দুপুর। শান দেওয়া ছুরির মতো রোদ ঝলকাচ্ছে মাথার ওপর। নির্মল আকাশে প্রখর রোদ যেন সমস্ত পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দিচ্ছে—হঠাৎ তাকালে চোখে ধাঁধা লেগে যায়, মনে হয় পূর্ব থেকে পশ্চিম অবধি সবটা যেন জ্বলন্ত একটা কাঁসার পাত দিয়ে মোড়া। জ্যৈষ্ঠ শেষ হয়ে যায় অথচ মেঘের চিহ্ন নেই কোথাও। দূরে বাবলা গাছগুলোর অপ্রচুর পাতা রোদের তাপে ঝলসে ঝরে পড়েছে, যেন আগুনে পোড়া কতগুলো এলোমেলো ডালপালা শস্যহীন মাঠের মরুভূমির মাঝখানে দাঁড়িয়ে।

ময়লা গামছায় কপালের ঘাম মুছে প্রাণপণে শাটা হাঁকড়ালে খেতু। ডাঁ-ডাঁ-ডাঁহিন। অস্থিসার গোরুর পাতলা চামড়ার ওপর শাঁটার দগদগে রক্তচিহ্ন ফুটে উঠেছে একটার পর একটা। বাঁ-দিকের গোরুটার কাঁধের ওপর জোয়ালের ঘষায় অনেকখানি জায়গা নিয়ে ঘা হয়ে গেছে, সেখান থেকে এখন ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ছে রক্ত। ডাঁশের দল সেখানে পরমানন্দে ভোজের আসর বসিয়েছে, আর মর্মান্তিক যন্ত্রণায় গোরুটা এক-এক বার থমকে থেমে দাঁড়িয়ে পড়বার চেষ্টা করছে।

কিন্তু গোরর প্রতি দরদের চাইতে প্রয়োজনের তাগিদ অনেক বেশি। ভোর বেলা সওয়ারিকে ইংরেজবাজারের রেলগাড়িতে তুলে দিয়ে খেয়েছে চার পয়সার লাহরি, আর খেয়েছে টাঙ্গন নদীর একপেট জল। অসহ্য খিদেয় নাড়িভুড়িগুলো জড়াজড়ি করছে একসঙ্গে। রাত্রিজাগরণক্লান্ত চোখের পাতাদুটো অস্বাভাবিক ভারী হয়ে উঠেছে। আড়ষ্ট একটা আচ্ছন্নতায় শরীর ঢুলে পড়তে চাইছে, কিন্তু ডাঁশ তাড়াবার জন্যে ব্যর্থকাতর গোরুর লেজের ঘা চটাস চটাস করে চাবুকের মতো পায়ে লাগতেই চটকা ভেঙে যাচ্ছে। স্বপ্নের মতো মনে পড়ছে ঘরে ভোমরা ভাত বেড়ে নিয়ে তার প্রতীক্ষায় পথের দিকে তাকিয়ে বসে আছে।

ডাঁ-ডাঁ-ড্ডাঁহিন মহামাই—শাঁটা উদ্যত করেই খেতুর হাত নেমে এল আপনা থেকে। সত্যিই কষ্ট হয় গোরু দুটোর দিকে তাকালে, দু-বছর আগে কী চেহারা ছিল ওদের, আর কী হয়ে গেছে। খেতে পায় না। যে-গোরু আগে এক দমে পনেরো ক্রোশ পথ অক্লেশে পাড়ি দিয়ে যেত, তারা আজকাল তিন ক্রোশ রাস্তা না হাঁটতেই এমন করে ঝিমিয়ে আসে কেন তার খবর খেতুর চাইতে বেশি করে আর কে জানে!

সামনে তালদিঘি। আমের বন, মহুয়ার গাছ, তালের সারি। এতক্ষণে যেন চোখ জুড়িয়ে গেল। তালদিঘির কালো জল অপরিসীম স্নিগ্ধতায় যেন ডাকছে হাতছানি দিয়ে; ঠিক যেন ভোমরার শান্ত দুটি কালো চোখের মতো। জল আর ছায়ার ছোঁয়ায় বাতাসের স্পর্শও মধুর আর শীতল হয়ে উঠেছে। এইখানে গাড়িটাকে খানিকক্ষণ জিরেন দিলে মন্দ হয় না। অন্তত বলদ দুটোকে একটু জল খাওয়ানো দরকার।

একপাশে মুচি পাড়া। এখানে এসে খেতু মাঝে মাঝে আড্ডা দিয়ে যায়, নীলাই মুচির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব বহুকালের। এখানে এসে গাড়ি থামানোর পিছনে সে-আকর্ষণটাও আছে, অন্তত এক ছিলিম তামাক টেনে যাওয়া চলবে।

জোয়াল নামিয়ে প্রথমে বলদ দুটোকে ছেড়ে দিলে খেতু। তারপর বালতি করে জল নিয়ে এল তালদিঘি থেকে। গোরুগুলো এক নিশ্বাসে সে-জল নিঃশেষ করে দিলে। বুকের ভেতরটা তৃষ্ণায় যেন শুকিয়ে পাথর হয়ে গেছে ওদের। ততক্ষণ গাড়ির পেছন থেকে কয়েক আঁটি পোয়াল টেনে নামিয়েছে খেতু, কৃতজ্ঞ এবং বেদনার্ত চোখে তার দিকে এক বার চেয়ে অনিচ্ছুকভাবে ওরা চিবুতে শুরু করে দিলে। ভাবটা এই— শুকনো খড় যে এখন গলা দিয়ে নামতে চায় না।

একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল খেতুর। খইল, ভুসি, কলাই ডালের খিচুড়ি, সেসব এখন গতজন্মের স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষই না-খেয়ে মরে যাচ্ছে তো গোরু। আস্তে আস্তে সে এসে মুচিপাড়ায় পা দিলে।

ঘরের দাওয়াতেই নীলাই বসে আছে। মাথার চুলগুলো বড়ো বড়ো, চোখের দৃষ্টি উদভ্রান্ত। বললে, মিতা যে, আয় আয়। তালদিঘির পাড়ে দেখলাম গাড়ি থামল একখানা। তোর গাড়ি যে বুঝতে পারিনি।

আশ্চর্য নিরুৎসুক কণ্ঠ নীলাইয়ের। কথা বলছে যেন নিজের সঙ্গে নিজের মনে মনেই। তার কথার কোনো লক্ষ্য বা উপলক্ষ্য নেই। সে খেতুর দিকে তাকিয়ে আছে কিংবা তার পেছনে তালদিঘির দিকে অথবা তারও পেছনে রৌদ্রঝকিত দিগন্তের দিকে, কিছুই স্পষ্ট করে বোঝা যায় না যেন।

সবিস্ময়ে খেতু বললে, তোর কী হয়েছে মিতা?

আমার? অত্যন্ত শূন্য খানিকটা হাসি হাসল নীলাই, আমার কিছু হয়নি।

কিছু হয়নি তো অমন করে বসে আছিস কেন?

নীলাই আবার তেমনিভাবে তাকাল খেতুর দিকে, অথবা খেতুর ভেতর দিয়ে লক্ষ্যহীন সীমাহীন অনিশ্চিত কোনো একটা দিগন্তের দিকে। বললে, ঘরে একরত্তি চামড়া নেই, কাল থেকে হাঁড়ি চড়েনি। বউকে পাড়ায় পাঠিয়েছি চালের চেষ্টায়, আর বসে বসে ভাবছি মানুষ না হয়ে যদি গোরু ঘোড়া হতাম তাহলে মাঠের ঘাসপাতা খেয়েও বেঁচে থাকা চলত।

এক ছিলিম তামাক চাইবার কথা খেতুর আর মনে পড়ল না। তার ঘরে আজও খাবার আছে, কিন্তু দু-দিন পরে তার অবস্থাও যে এমন দাঁড়াবে না কে বলতে পারে! ধানের দর তো বেড়েই চলেছে। নীলাইয়ের পাশে বসতে তার ভয় করতে লাগল। কী অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে আছে নীলাই, যেন মরা মানুষের চোখ। সে-চোখ দুটো ক্রমাগত বলছে…

খেতু দাঁড়িয়ে উঠল। কোনো কথা তার মনে এল না—একটা সান্ত্বনা নয়, একটা আশ্বাসের বাণীও নয়। অত্যন্ত অসংলগ্নভাবে বললে, আমি যাই।

যাবি? দুটো টাকা দিয়ে যা মিতা। সওয়ারি বয়ে এলি, ভাড়ার টাকা নিশ্চয় পেয়েছিস। কাল শোধ দিয়ে দেব, আজই কিছু চামড়া আসবার কথা আছে।

চামড়া আসবে কি না অথবা কাল টাকা সে সত্যিই শোধ দেবে কি না সে-জিজ্ঞাসা খেতুর মনে হল না। আপাতত যেন এই লোকটার হাত থেকে সে নিষ্কৃতি চায়। ট্যাঁক থেকে দুটো টাকা বের করে নীলাইয়ের হাতে তুলে দিলে খেতু।

কালো কালো ময়লা দাঁত বের করে নীলাই খানিকটা নির্জীব হাসি হাসল। বললে, বাঁচালি মিতা। কাল ঠিক শোধ দিয়ে দেব কিন্তু।

দিঘির পাড়ে দুটো বলদ কার? তোর বুঝি?

হ্যাঁ, আমার।

ইস, কী চেহারা ও-দুটোর! নীলাইয়ের ধোঁয়াটে মৃত চোখ দুটো যেন পলকে জীবন্ত হয়ে উঠল। ওরা তো আর বেশিদিন বাঁচবে না। যদি মরে যায়, চামড়া দুটো আমাকে দিস তাহলে। ভুলে যাসনি যেন। দিবি তো?

মুহূর্তের মধ্যে ক্রোধে আর আতঙ্কে খেতুর সমস্ত শরীরটা শক্ত হয়ে উঠল। ইচ্ছে হল, যে টাকা দুটো দিয়েছিল, থাবা দিয়ে তা নীলাইয়ের হাত থেকে কেড়ে নেয় আর শাঁটা দিয়ে সপসপ করে ঘা-কতক বসিয়ে দেয় অলক্ষুণে লোকটার মুখের ওপর।

কিন্তু খেতু কিছুই করল না। সোজা শনশন করে হেঁটে এল, জোয়ালে জুড়ে দিল গোরু। নীলাইয়ের চোখের আওতা থেকে পালাতে হবে, যত তাড়াতাড়ি হোক, যেমন করে হোক। বলদ দুটো হাঁটতে চায় না, থেমে থেমে দাঁড়ায়। কাঁচা মাটির পথের ধারে যে অপরিপূর্ণ বিবর্ণ ঘাস উঠেছে, কালো কালো শীর্ণ আর লম্বা জিভ মেলে সেগুলো খাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু খেতুর এবার আর রাগ হল না, বিরক্তি হল না এতটুকুও। কী চেহারা হয়ে গেছে এমন নতুন আর জোয়ান গোরুর, ওদের দিকে তাকাতেও ভয় করে এখন। হয়তো এক বার হাঁটু ভেঙে পড়লে আর উঠতেই পারবে না। হাতের উদ্যত শাঁটা পাশে নামিয়ে সে পরমযত্নে গোরুর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল, কোমল শান্ত গলায় আদর করতে লাগল, লক্ষী আমার, সোনা আমার।

যেমন করে হোক মন খানেক খইল এবার জোগাড় করতেই হবে।

বাড়ির দরজায় ফিরে সে শিকপায়া মেরে গাড়ি থামাল। আর ওদিকের ডোবার ঘাট থেকে ভিজে কাপড়ে সামনে এসে দাঁড়াল ভোমরা।

অপ্রসন্নতায় ভারী হয়ে উঠল খেতুর মন। বিশ্বাস নেই ভোমরার রূপকে। ভিজে কাপড়ের নেপথ্যে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে অপরূপ দেহকান্তি—যার চোখে পড়বে, সঙ্গে সঙ্গে তারই নেশা ধরে যাবে।

এখন আবার চান করলি যে? এই অবেলায়?

ঝিনুক কুড়তে গিয়েছিলাম।

ঝিনুক কুড়তে! খেতুর কপাল উঠল রেখাসংকুল হয়ে, আরও বেশি অস্বস্তিতে মনটা আচ্ছন্ন হয়ে গেল। আজকে ঝিনুক দিয়ে কী হবে?

হরিলাল টাকা দিয়ে গেছে। পাঁচ সের চুনের বায়না।

হরিলাল। সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত বিরক্তি ঝিমিয়ে পড়ল, ধুলোপড়া-খাওয়া সাপের মতো মাথা নত করল যা-কিছু উত্তেজনা। নামটার যাদু আছে। হরিলাল দাস এ গ্রামের শুধু মোড়ল নয়, মন্ডলেশ্বর; মহারাজ চক্রবর্তী বললেও অত্যুক্তি হবে না কথাটা। উপকার কী করে বলা শক্ত, তবে অপকারের ক্ষমতা যে তার সীমানাহীন এ সম্বন্ধে কোনো প্রমাণপ্রয়োগই দরকার হয় না। এহেন হরিলাল ঘটা করে মেয়ের বিয়ে দেবে, উপচার অনুষ্ঠানে এতটুকুও ফাঁক রাখবে না কোথাও। পাঁচ সের চুনের বায়না না নিয়ে উপায় কী।

ও। কিন্তু তুই যে খেটে মরে যাবি বউ।

ভোমরা মৃদু হাসল, বিস্বাদ নিরানন্দ হাসি। তারপর কাপড় ছাড়বার জন্যে চলে গেল ঘরের ভেতর। অসীম ক্লান্তিতে দাওয়ার একটা খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে পড়ল খেতু।

খিদেয় মরে যাচ্ছি। তাড়াতাড়ি দুটি খেতে দে ভোমরা।

একটা মাটির ঘটিতে করে জল আর কচুপাতায় খানিকটা নুন এনে ভোমরা রাখল খেতুর পাশে। সেদিকে তাকিয়ে আপনা থেকেই খেতুর দীর্ঘশ্বাস পড়ল। কাঁসা আর পিতল যা ছিল সব বন্ধক গেছে, ঘরের লক্ষী আর কোনোদিন ঘরে ফিরবে না।

ওদিকে রান্নাঘরের ঝাঁপ খুলেই ভোমরা থেমে দাঁড়াল, আর নড়ে না।

কী রে, হল কী?

কী জবাব দেবে ভোমরা? পেছন দিকের জিরজিরে বেড়া ফাঁক করে কখন ঘরে ঢুকেছিল কুকুর। হাঁড়ি-কলসি সব ভেঙে একাকার করে দিয়েছে, রাশি রাশি ভাত আর ডাল ছড়িয়ে রয়েছে ঘরময়। ডাল-মেশানো কর্দমাক্ত মাটিতে এখনও ফুটে রয়েছে কুকুরের নোংরা পায়ের এলোমেলো থাবার দাগ। ঝিনুক আনতে যখন সে বিলের দিকে গিয়েছিল, সেই ফাঁকেই কখন…

ব্যাপারটা দেখে খেতুও স্তব্ধ হয়ে রইল। দোষ নেই কারোরই—পাঁচ সের চুনের বায়না দিয়ে গেছে হরিলাল। ভোমরাকে কষে একটা লাথি মারবার জন্যে হিংস্র একটা পা তুলেই নামিয়ে নিলে খেতু। এক মুহূর্ত জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে থেকে বললে, বেশ।

বিবর্ণ পাড়ুর মুখে ভোমরা বললে, তুমি বসো, আমি আবার চারটি…

থাক থাক, চাল সস্তা নয় অত। কত লোক না খেয়ে মরে যাচ্ছে, খবর রাখিস তার?

মনের সামনে নীলাই এসে দেখা দিল। মড়ার মতো দুটো দৃষ্টিহীন চোখ, অথচ অদ্ভুত দূরপ্রসারী দৃষ্টি মেলে যেন কিছু-একটা বলার চেষ্টা করছে। যেন তার সর্বাঙ্গ ঘিরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে একটা অশুভ অভিশাপের ইঙ্গিত। এ কি সেইজন্যেই?

ট্যাঁকে টাকা আছে তিনটে, তাড়ির দোকানও ভোলা আছে এখনও—যেখানে সমস্ত ক্ষুধা তৃষ্ণার নির্বাণ, যেখানে অনায়াসে সমস্ত শ্রান্তি-ক্লান্তিকে ভুলে থাকা চলে। হনহন করে খেতু বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।

ঘরের খুঁটি ধরে আড়ষ্টভাবে দাঁড়িয়ে রইল ভোমরা। সারাদিন তার পেটেও কিছুই পড়েনি। নদীর ধারের গরম বালিতে পায়ের নীচে ফোসকা পড়ে যায়, বিলের ওপরে রৌদ্রতপ্ত আকাশ যেন হাড়-মাংস একসঙ্গে সেদ্ধ করতে থাকে। খেতুর জন্যে নাহয় তাড়ির দোকান খোলা আছে, কিন্তু তার? ভোমরার চোখ ফেটে জল নয়— মনে হল টপ টপ করে কয়েক বিন্দু টাটকা রক্ত গড়িয়ে পড়বে।

উঠোনে স্তুপাকার ঝিনুক। খানিকটা স্যাঁৎসেঁতে আঁশটে গন্ধ খালি ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে।

রাত্রেই আবার সব সহজ হয়ে গেল। তাড়ির নেশা অদ্ভুতভাবে বদলে দিয়েছে খেতুকে। স্নেহ আর আবেগে সমস্ত মনটা কোমল আর আবেশবিহ্বল হয়ে উঠেছে। সোহাগে সোহাগে ভোমরাকে অস্থির করে দিয়ে জড়িত গলায় বললে, রাগ করিসনি বউ, রাগ করিসনি। তোকে কত ভালোবাসি আমি।

পরের দিন বেলা উঠবার আগেই বাড়ি থেকে খাওয়া-দাওয়া করে বেরোল খেতু। রোহনপুরের হাটে কিছু মাল পৌঁছে দিতে হবে। মনপ্রতি বারো আনা দর ধরে দিয়েছে মহাজন। আধ সের চালের ভাত খেয়ে পরম পরিতৃপ্তিতে একটা বিড়ি ধরাল, তারপর অনেকক্ষণ ধরে সপ্রেম চোখে তাকিয়ে দেখল ভোমরাকে।

তোর জন্যে হাট থেকে কাপড় কিনে আনব বউ।

ভোমরা মৃদু ক্লান্ত রেখায় হাসল। কালকের জের আজও শরীরের ওপর থেকে মেটেনি।

কোনোখানে যেন আনন্দ নেই, উৎসাহ নেই এতটুকুও।

ফিরবে কখন?

ভোরের আগেই। সাঁঝ রাত্তিতে ওখান থেকে গাড়ি জুড়ে দিলে এই ক-কোশ হাঁটা আর কতক্ষণ। তুই কিন্তু তাই বলে রাত জেগে বসে থাকিসনে।

খেতু গাড়ি নিয়ে চলে গেল। রান্নাঘরের ভাঙা জায়গাটা পিঁড়ি আর ইট দিয়ে বন্ধ করে ভাতের হাঁড়িটা শিকেয় তুলে রেখে ভোমরাও উঠোনে এসে দাঁড়াল। আরও অন্তত দু-তিন সাজি ঝিনুক দরকার। কাল থেকেই পোড়ানো শুরু করতে হবে।

খেতু বাড়িতে আছিস?

হরিলালের গলা। ভোমরা ত্রস্ত হয়ে ঘোমটা টেনে দেওয়ার আগেই হরিলাল বাড়ির ভেতরে এসে দাঁড়িয়েছে। খেতু নেই বাড়িতে?

ভোমরা মাথা নেড়ে জানালে, না। হরিলাল কিন্তু চলে গেল না। নিজেই একটা চৌপাই টেনে নিয়ে জাঁকিয়ে বসল ঘরের দাওয়াতে। চুনের কথা ভুলে যাসনি তো?

না।

ভুলিসনি। তোর ওপর ভরসা করে বসে আছি। বিয়ের দিনে যাবি কিন্তু আমার বাড়িতে। খেটেখুটে আর খেয়ে-দেয়ে আসবি।

ভয় আর অস্বস্তিতে ভোমরা চঞ্চল হয়ে উঠল। হরিলাল বড়ো বেশি তীব্র আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে ওর দিকে। গলার স্বরে বড়ো বেশি কোমলতার আমেজ লেগেছে। পুরুষের ওই চোখ আর কণ্ঠস্বরের অর্থ বুঝতে এক মূহূর্তের বেশি সময় লাগে না মেয়েদের। সঙ্গে সঙ্গে কী-একটা বোগাযোগে ভোমরার অপাঙ্গ চোখ গিয়ে পড়ল হরিলালের হাতের ওপর। মোটা মোটাআঙুলগুলো যেন কিছু একটাকে আঁকড়ে ধরতে চায়, নির্মমভাবে নিষ্পেষিত করে ফেলতে চায় তাকে।

একটা পান খাওয়াতে পারিস খেতুর বউ?

না চাপা শক্ত গলায় ভোমরা জবাব দিলে, পান নেই।

হরিলাল মৃদু হাসল, চোখ দুটো ঝলক দিয়ে উঠল এক মুহূর্তের জন্যে। তৈলাক্ত গোলাকার গালের ওপর দুটো বৃত্ত ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। মুখে সামনের পাটিতে একটা তীক্ষ্ণধার গজদন্ত চকিতের জন্যে আত্মপ্রকাশ করলে।

তবে থাক, পানের দরকার নেই।

হরিলালের হাতখানা কঠোরভাবে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল। খেতুকে বলে দিস ঋণ সালিশির মামলাটায় ওর জন্যে বোধ হয় কিছু করা যাবে না।

ভোমরার বুকের ভেতর ধড়াস করে যেন ভারী একখানা পাথর এসে পড়ল। হরিলালের হাতে শানিত খঙ্গ হত্যার উল্লাসে ঝকঝক করে উঠেছে। রামসই ঋণ সালিশি বোর্ডের সে প্রতিপত্তিশালী সদস্য, চেয়ারম্যান তার খাতক। আর বলদ কিনবার জন্যে ইদ্রিস মিয়ার কাছ থেকে যে বাহান্ন টাকা ধার করেছিল খেতু, সে-মামলা এখনও ঝুলে রয়েছে রামসই ঋণ সালিশি বোর্ডেই। হরিলালের একটি মাত্র ইঙ্গিতে বলদ দুটি বিক্রি করে দিয়ে কালকেই হয়তো কিস্তি শোধ করতে হবে খেতুকে। আরও কত কী হতে পারে একমাত্র হরিলালই তা

জানে।

বসুন, পান দিচ্ছি।

হরিলাল আবার হাসল। বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ, একটি মাত্র অস্ত্র দেখিয়েই জয়লাভ। এমন অসংখ্য অগণ্য অস্ত্র আছে হরিলালের, যা খেতু কোনোদিন কল্পনাও করতে পারে না।

নাঃ থাক। আমারও কাজ আছে, উঠতে হবে। খেতু বাড়ি আসবে কখন?

ভোররাতে।

হরিলাল এগিয়ে এল অসংকোচে এবং নির্ভয়ে। বিস্তারিত ভূমিকা বা ভণিতা সম্পূর্ণ অনাবশ্যক এখন—সে কাজের মানুষ। নীরব আর নির্জন বাড়ি। ঝাঁঝাঁ রোদে ঝিমিয়ে পড়েছে সমস্ত। পেছনের আম গাছে একটা পাখি ডাকছে, বউ কথা কও।

লোলুপ আর কঠিন মুষ্টি একখানা মাংসাশী থাবার মতো ভোমরার হাত আঁকড়ে ধরলে। মট করে উঠল একগাছা কাচের চুড়ি, দু-টুকরো হয়ে পড়ে গেল মাটিতে। চাপা রুদ্ধ গলায় হরিলাল বললে, সন্ধের পরে আমি আসব। কোনো ভয় নেই তোর।

ভোমরার সর্বাঙ্গে যেন একটা বিষধর সাপ পাকে পাকে জড়িয়ে জড়িয়ে ধরেছে। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, মুখ দিয়ে কথা ফুটতে চায় না। শুধু তার আতঙ্কবিহ্বল মুখের ওপর সাপের প্রসারিত ফণা দুলছে, লাল টকটকে চোখ দুটো জ্বলছে, যেন আগুনের বিন্দু। কিন্তু চোখ সাপের নয়, হরিলালের।

কোনো ভাবনা নেই। টাকাপয়সা-কাপড়-চুড়ি যা চাস। কিন্তু সন্ধের পরে আমি আসব।

ভোমরার মুখ দিয়ে কথা ফুটল না।

না-ফুটল, কী আসে-যায় তাতে। নিপুণ ঘাতক হরিলাল, তার অস্ত্রের আঘাত অব্যর্থ আর অনিবার্য। বাহান্ন টাকার মামলাটা ভুলে থাকা এত সহজ নয় খেতুর পক্ষে। আরও একটু প্যাঁচ কষালে খেতুই উপযাচক হয়ে ভোমরাকে তার ঘরে পৌঁছে দিয়ে যাবে। এমন সে অনেক দেখেছে। কিন্তু কী দরকার অতটা করে। হাঙ্গামা তার ভালো লাগে না। সকলের সঙ্গে যথাসম্ভব ভালো ব্যবহার করতেই সে ভালোবাসে—লোক একেবারে খারাপ নয় হরিলাল।

একখানা বড়ো মাঠ পেরোলেই সামনে মুচিপাড়া। আকাশের রোদ যেন আগুনের মতো গলে গলে পড়ছে। ময়লা গামছায় খেতু কপালটা মুছে ফেললে। চারিদিকের মাঠে-ঘাটে চলেছে অদৃশ্য অগ্নিযজ্ঞ। এখনও মেঘ দেখা দিল না, বৃষ্টি নামল না এক পশলা! কবে যে লাঙল পড়বে মাঠে! ধান রোয়ার সময় চলে গেল, অসময়ে বৃষ্টি পড়লে ফসল বুনেই-বা কী লাভ। ধানে ঝুলন লাগবে না, হাজা ধরে শুকিয়ে যাবে সমস্ত।

কেমন একটা অশুভ আশঙ্কায় মনটা ভারী হয়ে উঠল খেতুর। পথের পাশে আলের ওপর সাদা ধবধবে একটা নরকঙ্কাল; দৃষ্টিহীন চোখের কালো গহ্বরের ভেতর দিয়ে ওর দিকে যেন প্যাটপ্যাট করে তাকিয়ে আছে। কোনো গোরস্থান থেকে শেয়াল টেনে এনেছে নিশ্চয়ই।

ডাঁ-ডাঁ-ড্ডাঁহিন।

গোরুর লেজে মোচড় লাগল, আকস্মিকভাবে ছুটতে শুরু করলে গাড়িটা। বাঁ-দিকের বলদটার রক্তাক্ত কাঁধের ওপর ডাঁশগুলো ভনভন করে উড়তে লাগল।

মুচিপাড়ার সামনে আসতেই মনে পড়ে গেল টাকা দুটোর কথা। আজকেই শোধ দেবার কথা বলেছিল নীলাই। কিন্তু নীলাইয়ের সেই মুখোনা কল্পনা করতেই গায়ের মধ্যে কেমন করে উঠল। কালকের দিনটা কি সেইজন্যই কাটল অনাহারে।

হাঁক দিতেই নীলাই বেরিয়ে এল ঘর থেকে। খুশি হয়ে বললে, মিতা যে! কোথায় চললি আবার?

মাল নামাতে যাব, রোহনপুরে। টাকা দুটো দিবি বলেছিলি।

টাকা? সে হবে। আয় বোস, তামাক টেনে যা এক ছিলিম।

নীলাইয়ের চেহারায় অনেক পরিবর্তন চোখে পড়ছে আজকে। কথার ভঙ্গিতে আবার যেন পুরোনো মিতাকে খুঁজে পাওয়া গেল। হয়তো চামড়া পেয়েছে কিছু অথবা সেই দুটো টাকাই এমন রূপান্তর ঘটিয়েছে তার। কিন্তু কারণ যা-ই হোক, মনের ওপর থেকে মস্ত একটা ভার যেন নেমে গেল খেতুর।

কিন্তু এখন গাড়ি বাঁধতে পারব না। মাল আছে সঙ্গে।

রেখে দে তোর মাল। নীলাই ভঙ্গি করলে, আধ ঘণ্টা বসে গেলে এমন কী হবে! যা রোদ্দুর, গোরু দুটোকেও একটু জিরোন দে বরং। কালকে তুই এলি অথচ তোকে একটু তামাক খাওয়াতে পারলাম না, ভারি খুঁতখুঁত করছে মনটা।

সত্যিই অসম্ভব রোদ। বেলাটা একটু ঠাণ্ডা না হলে গাড়ি হাঁকানো শক্ত। বলদগুলোর ভারী ভারী নিশ্বাস পড়ছে, দেখলেও কষ্ট হয়। তা ছাড়া কী চমৎকার নীলাইয়ের ঘরের দাওয়াটা। মহুয়া গাছের ছায়া পড়েছে, ঝিরঝির করে গান গাইছে পাতা। তালদিঘি থেকে ভিজে হাওয়া উঠে আসছে। শুধু বসা নয়, খানিকটা গড়িয়ে নিতেও ইচ্ছে করে। বলদ দুটোকে ছেড়ে দিয়ে খেতু এসে বসল।

পেলি চামড়া?

নাঃ! নীলাইয়ের বুকের ভেতর থেকে ঝোড়ো হাওয়ার মতো শব্দ করে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল, আজ এল না ব্যাপারীরা। এবার কপালে কী আছে কে জানে। সকালে ঘোষগাঁয়ে ঢোল বাজিয়ে এলাম, আট গন্ডা পয়সা দিলে। কিন্তু এভাবে ক-দিন চলবে। আচ্ছা, যুদ্ধ কবে থামবে বলতে পারিস?

মহুয়ার ঝিরঝিরে হাওয়াটা বড়ো আরাম বুলিয়ে দিচ্ছে শরীরে। চোখে যেন ঘুম জড়িয়ে ধরে। কিন্তু নীলাইয়ের কথাগুলো এই নিশ্চিন্ত প্রশান্তির মাঝখানে সাঁওতালি তিরের মতো এসে বেঁধে, বিষ বর্ষণ করে। মনে পড়ে যায় ওর মামাতো ভাই বিষ্ণুকে বুনো শুয়োরে গুতিয়ে মেরেছিল, পেটের চামড়া ছিঁড়ে নাড়িভুড়িগুলো ঝুলে পড়েছিল বাইরে। চৌকিদার আলি মহম্মদকে ডাকাতেরা ধরে জবাই করে দিয়েছিল, রক্তাক্ত গলাটা আধ হাত ফাঁক হয়েছিল একটা রাক্ষুসে হাঁ-এর মতো। নীলাইয়ের সর্বাঙ্গ ঘিরে যেন যত অপঘাত, যত অপমৃত্যু আর যত অভিশাপ এসে প্রেতের মতো ছায়া ফেলেছে।

যুদ্ধ কবে থামবে ভগবান জানেন!

তা বটে। ভগবান জানেন— ভগবান! হিংস্রভাবে কথাটার প্রতিধ্বনি করলে নীলাই। ঘরের ভেতর থেকে তামাক সেজে নিয়ে এল ওর বউ। চকিতের জন্যে মিতানের সরু সরু পা দুটো চোখে পড়ল খেতুর। কী অসম্ভব রোগা, এত রোগা হয়ে গেছে বউটা! মুখের দিকে তাকাতে ভরসা হয় না, অকারণে চেতনাকে চমকে দিয়ে মনে হল মুখে হয়তো সেই মড়ার খুলিটার সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে। ভোমরা এখনও তাজা আছে, এখনও যৌবনের ঐশ্বর্যে টলমল করছে সে। কিন্তু…

দা-কাটা তামাকের উগ্র গন্ধটা লোভনীয়। কিন্তু হুকোতে একটা টান দিয়েই খেতু সেটা বাড়িয়ে দিলে নীলাইয়ের দিকে।

না মিতা, খা তুই। কিছু ভালো লাগছে না আমার।

ভালো লাগছে না কারোরই। ভালো লাগবার কথাও নয়। অন্যমনস্কভাবে নীলাই কলকেটাকে উবুড় করে দিলে। তারপর তাকিয়ে রইল দূরে খেতুর অস্থিসার বলদ দুটোর দিকে। যা চেহারা ওদের, বেশিদিন আর বাঁচবে না। ওই দুটো গোরুর চামড়া পেলে…

খেতু বললে, নাঃ, উঠি এবার। চার ক্রোশ ঘাঁটা যেতে হবে।

বস, মিতা, বস। এত তাড়া কীসের? তুই তো সুখী মানুষ, একদন্ড নয় এখানে বসেই যা। ঘরে ঠাণ্ডা আছে, গলাটা একটু ভিজিয়ে যাবি নাকি?

ঠাণ্ডা? তাড়ি? মুহূর্তে সমস্ত মনটা নেচে উঠল। কিন্তু তাড়ির নেশায় ধরলে সব কাজ একেবারে পন্ড। বহু টাকার মাল রয়েছে গাড়িতে। রাতবিরেতে সাঁওতাল পাড়ার পথঘাট আজকাল একেবারেই ভালো নয়। অভাবের তাড়নায় লোকগুলো খেপে রয়েছে হন্যে কুকুরের মতো। কায়দায় পেলে লুটেপুটে নেওয়া আদৌ অসম্ভব নয়।

এত গরমে একটুখানি ঠাণ্ডা পেলে তো বেঁচে যাই। কিন্তু নেশা ধরে গেলে সব মাটি হয়ে যাবে রে। পথ ভারি খারাপ আজকাল।

একটুখানি গলা ভিজিয়ে যাবি, নেশা হবে কেন।

তা, তা মন্দ নয় কথাটা। সলোভে খেতু চাটল ঠোঁট দুটো।

মাটির ভাঁড়ে করে এল গাঁজিয়ে-ওঠা তালের রস। আর কটুগন্ধী সেই অম্লমধুর অমৃত পেটে পড়তেই খেতু ভুলে গেল সমস্ত। রোহনপুরের ইস্টিশন, মাল বোঝাই গাড়ি, রাত্রির অন্ধকারে শঙ্কাসংকুল সাঁওতাল পাড়া-কোনো কিছুই আর মনে রইল না। ভাঁড়ের পর ভাঁড় উজাড় করে নেশায় আর ক্লান্তিতে খেতুর সর্বাঙ্গ ঝিমিয়ে এল অতি গভীর অবসাদে। কী ঠাণ্ডা ছায়া পড়েছে নীলাইয়ের দাওয়ায়, আর কী মিষ্টি হাওয়া দিচ্ছে মহুয়ার কচি কোমল পাতাগুলো।

তারপরে বেলা গড়িয়ে এল, সূর্য নামল পশ্চিমের দিগন্তে। মহুয়া পাতার ফাঁক দিয়ে বিকেলের রাঙা আলো বাঁকা হয়ে খেতুর মুখের ওপরে এসে পড়তেই যেন আচমকা ভেঙে গেল ঘুমটা। ধড়মড় করে উঠে বসল খেতু। তাই তো, বেলা একেবারে নেমে পড়েছে যে। রাতদুপুরের আগে আর ইস্টিশনে পৌঁছোনো চলবে না।

সামনে বসে নির্বিকার মুখে বিড়ি খাচ্ছে নীলাই।

ইস! কী ঘুমটাই ঘুমোলি মিতা। বেলা একবারে কাবার।

হাত-পা কাঁপছে, মাথাটার ভার যেন বইতে পারা যায় না। হঠাৎ নীলাইয়ের ওপর একটা বিজাতীয় ক্রোধে খেতুর মনটা বিষাক্ত হয়ে উঠল।

তুই তো আমাকে এই ফ্যাসাদে ফেললি। কতদূরে যেতে হবে এই রাত্তিরে—দ্যাখ তো। ও কী!

ভয়ে বিস্ময়ে খেতুর চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল আর পাথরের মতো শক্ত হয়ে উঠল নীলাইয়ের মুখ—বলদ দুটো এমন করছে কেন?

দ্রুত পায়ে খেতু ছুটে এল বলদের কাছে। একটা তখন হাত-পা ছড়িয়ে নিঃসাড় হয়ে পড়ে আছে, দুটো চোখের ওপর নেমেছে সাদা পর্দা। সারা গায়ে ভনভন করে উড়ছে মাছি। আর একটা অন্তিম চেষ্টায় আকাশের দিকে মুখ তুলে নিশ্বাস টানছে, জিভ বেরিয়ে এসেছে, কালো দীর্ঘায়ত চোখের কোনায় টলমল করছে অশ্রুর বিন্দু।

আমার বলদ মরে গেল! আর্ত কণ্ঠে চিৎকার করে খেতু আছড়ে পড়ল বলদের গায়ে। চর্মসার প্রকান্ড পাঁজরার হাড়গুলো মটমট করে উঠল বুকের চাপে।

নীলাই নিরাসক্ত গলায় বললে, যে গরম, সর্দি-গরমি…

সর্দি-গরমি? ছিলে-ছেড়া ধনুকের মতো খেতু বিদ্যুদবেগে দাঁড়াল সোজা হয়ে।

সামনে একটা মাটির পাত্রে ভুসি-মেশানো হলুদ রঙের খানিকটা দুর্গন্ধ জল। এই জল কে খেতে দিয়েছিল বলদকে, কে দিয়েছিল!

সর্দি-গরমি? শালা, চামড়ার লোভে আমার গোরুকে বিষ খাইয়েছিস, বিষ খাইয়েছিস তুই। শালা গো-হত্যাকারী, আমি খুন করব, খুন করে ফেলব তোকে। খেতুর গলা চিরে আকাশের বাজ গর্জে উঠল, আজ যদি তোর রক্ত না দেখি তা হলে ভুইমালীর বাচ্চা নই আমি।

বেলা গড়িয়ে এল, সন্ধ্যার ঘন ছায়া নিঃশব্দে নামল মাটিতে। কালো রাত্রির ভেতরে গা ঢাকা দিয়ে হরিলাল খেতুর দরজায় এসে দাঁড়াল। হরিলাল জানে ভোমরা তাকে ফেরাতে পারবে না, নিজেকে বাঁচাতে পারবে না তার কঠিন মুষ্টির নিষ্ঠুর নিষ্পেষণ থেকে। তার হাতে যে-খড়ঙ্গ উদ্যত হয়ে আছে, খেতুকে বধ করতে তার একটি মাত্র আঘাতই যথেষ্ট।

অন্ধকারের বুক বিদীর্ণ করে বহু দূরে উত্তরের আকাশটা বিচিত্র রক্তিম ছটায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। যেন ছড়িয়ে পড়ল সদ্যোনিহত একটা মানুষের টাটকা রক্ত। কোথাও আগুন লেগেছে নিশ্চয়।

 

 খাঁড়ামশাই

বংশীবদন খাঁড়ার ছেলে হংসবদন–যার ডাকনাম চিচিঙ্গে–সে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি এল।

ঝোলাগুড়ের ব্যবসায়ী বংশীবদন তখন নাকের নীচে চশমা নামিয়ে দুশো বত্রিশ মন গুড়ের হিসেব করছিলেন। বিরক্ত হয়ে বললেন, ক্যা হয়েছে রে চিচিঙ্গে? অমন করে শেয়ালের বাচ্চার মতো কাঁদছিস কেন?

শেয়ালের বাচ্চা নিশ্চয় ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদে না, কিন্তু বংশীবদন ওসব গ্রাহ্য করেন না। আর কী–কে–এগুলোকে তিনি ক্যা বলেন।

চিচিঙ্গে বললে, হেডমাস্টার কেলাসে তুলে দেয়নি।

-ক্যা বললি?

–হেডমাস্টার আমাকে

ঠাঁই করে বংশীবদন একটি চড় বসিয়ে দিলেন চিচিঙ্গের গালে। বললেন, পাঁঠার বাচ্চা কোথাকার! হেডমাস্টার! তোর গুরুজন না? বিদ্যের গুরু। বাপের চেয়েও বড়। কেন, মাস্টারমশাই–হেডস্যার এইসব বলতে পারিসনে? তুলে দেয়নি নয় তুলে দেননি। মনে থাকবে?

চড় খেয়ে চিচিঙ্গের কান্না বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গোঁজ হয়ে, ঘাড় নেড়ে সে জানাল-মনে থাকবে

বংশীবদন বললেন, কিন্তু ক্যা হয়েছে? কেন দেননি ওপর-কেলাসে তুলে?

–আমি অঙ্ক আর ভূগোলে পাশ করতে পারিনি। সবাই বলছে, তুই পেসিডেনের ছেলে হয়ে

বংশীবদন রেগে আগুন হয়ে গেলেন : আমার বাপের নামে ইস্কুল, আমি জমি দিইছি, বাড়ি করে দিইছি–আর আমার ছেলেকেই ফেল করানো? আচ্ছা, তুই ভেতরে যা–আমি দেখছি।

চিচিঙ্গে ভেতরে চলে গেলে বংশীবদন তক্ষুনি একটা চিঠি লিখলেন হেডমাস্টার শ্রীনাথ আচার্যিকে। লিখলেন, মহাশয়, অবিলম্বে আমার সঙ্গে দেখা করিবেন। আর চিচিঙ্গির কেলাসের একখানা ভূগোল আর একখানা অঙ্কের প্রশ্নপত্র সঙ্গে লইয়া আসিবেন।

হেডমাস্টার আচার্যিমশাই তখন কেবল প্রমোশন দিয়ে, খুব ক্লান্ত হয়ে, নিজের ঘরে বসে হুঁকোয় টান দিয়েছেন। এমন সময় বংশীবদনের লোক ভূষণ মণ্ডল চিঠিটা এনে হাজির করল। বললে, বাবু আপনাকে এক্ষুনি যেতে বলেছেন।

–যাচ্ছি–তটস্থ হয়ে হেডমাস্টার বললেন, তুমি এগোও, আমি আসছি।

ভূষণ চলে গেল। তামাক খাওয়া মাথায় রইল, হুঁকো নামিয়ে হেডমাস্টার ডাকলেন, ওহে বিমল!

বিমলবাবু ইস্কুলের জুনিয়ার টিচার। কিন্তু ছেলেমানুষ হলে কী হয়, যেমন বুদ্ধিমান, তেমনি চটপটে। খুব ভালো পড়ান। সব কাজেই হেডমাস্টার তাঁর পরামর্শ নেন।

বিমলবাবু আসতেই হেডমাস্টার বললেন, দ্যাখো কাণ্ড। খাঁড়ামশাই ডেকে পাঠিয়েছেন। তখনই তোমায় বললুম, প্রেসিডেন্টের ছেলে দিয়ে দিই প্রমোশন কী হবে ঝামেলা করে। কিন্তু তোমার কথায় ওকে আটকে দিলুম, এখন

বিমলবাবু বললেন, স্যার, স্কুলের একটা নিয়ম তো আছে। প্রেসিডেন্টের ছেলে তো কী হয়েছে, ফেল করলেও প্রমোশন দিতে হবে? তাহলে গরিবের ছেলেরা আর কী দোষ করল–সব্বাইকে তো পাশ করিয়ে দেওয়া উচিত।

–আরে, উচিত-অনুচিত আর মানছে কে। যার টাকা আছে ওসব তার বেলায় খাটে না। এখন খাঁড়ামশাই যদি খেপে যান, তাহলে আমাদের অবস্থাটা ভাবো। তাঁর টাকায় স্কুল, তিনি প্রেসিডেন্ট। এদিকে সায়েন্স ব্লকের জন্যে সামনের মাসে পনেরো হ্যাজার টাকা দেবেন কথা আছে। এখন যদি বিগড়ে যান, আমরা মারা পড়ে যাব।

বিমলবাবু মাথা নেড়ে বললেন, আমার তা মনে হয় না স্যার। খাঁড়ামশাই অত অবিবেচক নন। টাকা অনেকেরই আছে, কিন্তু এরকম মহৎ মানুষ দুজন দেখা যায় না। স্কুল করেছেন, হেলথ সেন্টার খুলিয়েছেন, দুমাইল রাস্তা করেছেন। নিজেদের খরচে গ্রামের লোকের জন্যে তিনটে টিউবওয়েল করে দিয়েছেন। কত লোককে যে দুহাতে দান করেন তার হিসেব নেই। তিনি নিশ্চয় বুঝবেন।

ব্যাজার মুখে হেডমাস্টারমশাই বললেন, কে জানে! সেকেলে লোক, মেজাজের থই পাওয়া শক্ত। যা হোক, তুমিও চলে। তুমি সঙ্গে থাকলে একটু ভরসা পাব।

আচ্ছা, চলুন—

দুজনে গিয়ে হাজির হলেন খাঁড়ামশাইয়ের বাড়িতে।

বংশীবদন দুশো বত্রিশ মন ঝোলা গুড়ের কতটা ইঁদুর খেয়েছে, নাগরি ফুটো হয়ে কতটা নষ্ট হয়েছে, কতটাই বা আরশোলা-পিঁপড়ের পেটে গেছে–এইসব লোকসানের হিসেবের মধ্যে তলিয়ে ছিলেন। হেডমাস্টার আর বিমলবাবুকে দেখে প্রথমটায় বললেন, ক্যা ব্যাপার, আপনারা বলতে বলতেই তাঁর চিচিঙ্গের কথাটা মনে পড়ে গেল।

বসুন, বসুন। তারপরেই বিনা ভূমিকায় তাঁর সোজা জিজ্ঞাসা : চিচিঙ্গে ওপরের কেলাসে উঠতে পায়নি কেন?

হেডমাস্টামশাই একটা ঢোক গিলে বললেন, আজ্ঞে, ও অঙ্কে আর ভূগোলে ফেল করেছে।

কত পেয়েছে?—

অঙ্কে সাত। ভূগোলে বারো।

–হুঁম।–বংশীবদন গম্ভীর হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, ওদের কেলাসের যে দুটো কোশ্চেন আনতে বলেছিলুম, এনেছেন?

আজ্ঞে এনেছি–বিমলবাবু তক্ষনি দুখানা প্রশ্নপত্র এগিয়ে দিলেন খাঁড়ামশাইয়ের হাতে।

চশমাটাকে তুলে, জায়গামতো বসিয়ে, বংশীবাদন উলটে-পালটে প্রশ্ন দুখানা পড়লেন। একবার বললেন, ইরে বাবা, একবার বললেন, ও-ওয়াফ আর-একবার বললেন, এসব ক্যা কাণ্ড। মাথার ওপরে যেন খাঁড়া উচিয়ে রয়েছে, এইভাবে তটস্থ হয়ে বসে থাকলেন দুই মাস্টারমশাই।

তারপর :

–এটা বুঝি ভূগোল।

হেডমাস্টার বললেন, আজ্ঞে।

–অ। কেরল রাজ্যের রাজধানী ক্যা? হুম। ভারতের কোথায়-কোথায় কয়লা ও পেট্রোলিয়াম পাওয়া যায়, তাহা বলো। হু-হুম। ভারতের একখানি মানচিত্র আঁকিয়া গঙ্গা নদীর উৎপত্তিস্থল হইতে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত প্রধান-প্রধান শহরগুলি–বেশ, বেশ।–প্রশ্নপত্রটি একদিকে সরিয়ে রেখে খাঁড়ামশাই বললেন, এসব না জানলে বুঝি বিদ্যে হয় না?

কথার সুরটা বাঁকা। হেডমাস্টার ঘামতে লাগলেন।

বললেন, আজ্ঞে, নিজের দেশটাকে তো জানতে হবে।

-ক্যা? নিজের দেশ? তা ভালো, খুব ভালো। আচ্ছা হেডমাস্টারমশাই, আপনি তো জ্ঞানী লোক, নিজের দেশের সব খবরই জানেন–দুদুবার এমএ পাশ করেছেন। বলুন দিকিনি, আমাদের এই জেলায় কটা গ্রাম আছে?

দুই মাস্টামশাই এ-ওর মুখের দিকে চাইলেন। ওঁরা অনেক খবর জানেন, কিন্তু

খাঁড়ামশাই একটু হাসলেন : আচ্ছা বলুন দেখি, বাংলা দেশের কোন্ কোন্ জেলায় বেশি আখের চাষ হয়?

বিমলবাবু বললেন, মুর্শিদাবাদ।

–আর?

দুজনেই চুপ।

বলতে পারেন, আমাদের এই কাঁসাই নদীর ধারে–এই জেলায় ক্যাক্যা গঞ্জ আছে?

তিন নম্বর খাঁড়ার ঘা। বিদ্যের জাহাজ দুই মাস্টারমশাই স্রেফ বোবা বনে গেলেন।

মিটমিট করে হাসলেন খাঁড়ামশাই : আপনারা দুই জাঁহাবাজ পণ্ডিত হয়ে নিজের বাংলা দেশ, নিজের জেলার এটুকু খবর বলতে পারলেন না, আর চিচিঙ্গে কেরলের রাজধানী কিংবা কোথায় কয়লা আর পেট্রোল পাওয়া যায়–তা লিখতে পারল না বলেই ফেল হয়ে যাবে? আচ্ছা, এবার অঙ্কে আসুন। এই যে

আতঙ্কে হেডমাস্টারমশাইয়ের দম আটকে এল, এর পরে যদি কড়াকিয়া, বুড়িকিয়া, মনকষা কিংবা শুভঙ্করের ফাঁকি নিয়ে পড়েন, তা হলে আর দেখতে হবে না। হাতজোড় করে বললেন, ঠিক আছে আমি এক্ষুনি গিয়েই হংসবদনকে প্রমোশন দিয়ে দিচ্ছি! মানে, আমাদেরই ভুল হয়ে গিয়েছিল।

–প্রমোশন দেবেন?–বংশীবদনের কপাল কুঁচকে গেল : কেবল চিচিঙ্গেকেই?

আজ্ঞে, আপনার ছেলে

–আমার ছেলে বলে পীর হয়েছে নাকি? ওটা তো একটা শেয়ালের বাচ্চা। ওকে একা কেন দিতে হলে সবগুলোকেই দিতে হয়। যারা গোল্লা খেয়েছে, তাদেরও। পারবেন?

মাস্টারমশাইরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন।

–একটা কাজ করুন। সবগুলোকে কেলাসে তুলে দিন। যারা পাশ করেছে, একেবারে ডবল প্রমোশন দিয়ে দিন তাদের। বাপরে কী বিদ্যে। যারা গঙ্গা নদীর উৎপত্তি থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত ছবি এঁকে দেখাতে পারে, সব শহরগঞ্জের খবর দিতে পারে, তারা সামান্যি লোক।

খুকখুক করে একবার কাশলেন হেডমাস্টার।

আজ্ঞে, বোর্ডের নিয়ম মেনে তো আমাদের পড়াতে হয়। এসব করতে গেলে স্কুল তুলে দেবে।

খাঁড়ামশাই বললেন, দিক তুলে। যে-শিক্ষে দেশ-গাঁয়ের খবরটুকুও জানায় না, তা থাকলেই কী আর গেলেই কী। তা হলে তাই করুন। যারা ফেল হয়েছে, সব পাশ। যারা পেট্রোল আর কয়লার খবর দিয়েছে, তাদের ডবল-প্রমোশন। যান।

মামলা মিটিয়ে দিলেন বংশীবদন। তারপর খাতা খুলে আবার দুশো বত্রিশ মন ঝোলা গুড়ের হিসেব মেলাতে বসে গেলেন।

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দুই মাস্টারমশাই কিছুক্ষণ হাঁ করে চেয়ে রইলেন তাঁর দিকে। তারপর বিমলবাবু আস্তে-আস্তে ডাকলেন : খাঁড়ামশাই?

অন্যমনস্কভাবে বংশীবদন বললেন, আবার ক্যা হল?

–আমি একটা কথা বলব?

–নিশ্চয় নিশ্চয়।

–মই বেয়ে ওঠার সময় লোকে ওপরে তাকায়, না নীচের দিকে?

–নীচে তাকাবে কেন, ওপরেই তাকায়।

–আর ওপরে উঠে কাছের জিনিস দেখে, না দূরের?

–ওপরে উঠলে তো দূরেই তো চোখ যায়। কিন্তু একথা কেন?

বলছি। বিদ্যে হল সেই মই। ওপরে যত উঠবে তত দেশ-বিদেশের খবর জানবে সে। কোথায় গঙ্গার উৎপত্তি, কোথায় কেরোসিন-পেট্রোল, কেরলের রাজধানী কী, ইত্যাদি

বংশীবদন হাসলেন : বুঝেছি আপনার কথাটা। কিন্তু মইটা যে-মাটির ওপর–মানে দেশ-গাঁ, সে-মাটিটাকে কে চেনাবে?

-খাঁড়ামশাই, শিক্ষা তো কেবল স্কুলের জিনিস নয়। তার অর্ধেক ঘরে, অর্ধেক স্কুলে। আপনি জ্ঞানী লোক, এত বড় ব্যবসায়ী আপনার ছেলেকে কি আপনি শেখাবেন না, আমাদের থানায় কটা গ্রাম, কাঁসাইয়ের ধারে কী কী গঞ্জ? আপনি কি তাকে চেনাবেন না চারদিকের কোন গাছের কী নাম, কোনটা কী ফুল, কোন পোকাটা কোন জাতের? আপনারা শেখাবেন ঘরের খবর, আমরা বাইরের। অভিভাবক যদি তাঁর কাজ না করেন, আমরা কতটুকু পারি, বলুন। এই ঘরের শিক্ষাটা আমরা পাইনি বলেই তো আপনার কথার জবাব দিতে পারিনি। আপনারা এই সব শিখিয়ে-পড়িয়ে দিন, আমরা সারা দুনিয়াকে চিনিয়ে দিই। আপনি তো গুড়ের ব্যবসা করেন, আপনার ছেলেও কি জানে বাংলা দেশের কোথায়-কোথায় আখের চাষ হয়?

একটু চুপ করে থেকে হা-হা করে হেসে উঠলেন খাঁড়ামশাই।

–ঠিক বলেছেন। এ তো আমাদেরই কাজ। আপনারা মই দিয়ে তুলবেন ওপরে, আমরা ভালো করে নীচের মাটিটাকে চিনিয়ে দেব। হুঁ, আমরাই ভুল হয়েছে। আজ থেকেই আমি চিচিঙ্গিকে নিয়ে পড়ব। ফেল করিয়েছেন, বেশ করেছেন–কেরলের রাজধানীর খবর দিতে না পারলে আর সাতবার ফেল করিয়ে দেবেন। তারপর দেখি আমি ওই হতচ্ছাড়াকে নিয়ে কী করতে পারি।

বলেই চিৎকার :

ওরে ভূষণ, শিগগির মাস্টারমশাইদের জন্য ভালো করে জলখাবার নিয়ে আয়। ওঁরা অনেক খেটেখুটে এসেছেন।–বলে নিজেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠে গেলেন ভেতরে।

হেডমাস্টারের ঘাম দিয়ে জ্বল ছাড়ল।

বাঁচালে বিমল, যা ঝামেলায় ফেলে দিয়েছিলেন খাঁড়ামশাই।

বিমলবাবু আস্তে-আস্তে মাথা নাড়লেন।

না স্যার, উনি আমাদেরও চোখ খুলে দিয়েছেন। আজ বুঝতে পারছি, এতগুলো ডিগ্রি পেয়েও নিজের দেশকে আমরা কিছুই চিনিনি। সব আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।

 গজকেষ্টবাবুর হাসি

আমাদের পাড়ার গজকেষ্টবাবুকে নিয়ে ভারি মুশকিলেই পড়া গেছে।

ব্যাপারটা আর কিছুই নয়–ভদ্রলোক হাসতে ভালোবাসেন। আর সে-হাসি সাংঘাতিক।

কথাটা বোধ হয় বুঝতে পারছ না? ভাবছ, হাসতে ভালোবাসেন তাতে আর ক্ষতিটা কী!

সাংঘাতিক হাসেন, তাতেই বা কী আসে যায়? বরং ভয়ঙ্কর গোমড়ামুখো লোকের চাইতে হো-হো-হা-হা, করে হাসিয়ে লোক তো ঢের ভালো।

হুঁ-হুঁ, মোটেই তা নয়। গজকেষ্টবাবু তো শুধু হাসেনই না–একবার যদি তাঁর হাসি পায়, তা হলে তিনি মারাত্মক হয়ে ওঠেন। তখন আ-পাশের লোককে তিনি কাঁদিয়ে ছাড়েন। তাই যক্ষুনি তিনি সবার জন্য হাঁ করেন, তক্ষুনি আমরা বাপ-রে-মা-রে বলে যে যেদিকে পারি ছুটে পালাই।

তা হলে আর-একটু খুলেই বলি।

এই তো সেদিন আমাদের পটলডাঙার নকুড়বাবু কাঁধে একটা মস্ত চালকুমড়ো নিয়ে যাচ্ছেন। নকুড়বাবুর মাথা জোড়া চকচকে টাক–একটি চুল পর্যন্ত কোথাও নেই। তাই, দেখে হাবুল সেন আমাকে বলছিল, মজাটা দ্যাখছস প্যালা? নকুড়বাবুর মাথা আর চালকুমড়াটা দ্যাখতে ঠিক একইরকম! মনে হইতাছে, নকুড়বাবুর কান্ধের উপর দুইটা মাথা উঠছে।

ব্যস আর যায় কোথায়!

পাশ দিয়ে গজকেষ্টবাবু যাচ্ছিলেন। হাবলার কথা শুনেই তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। আকাশ-জোড়া হাঁ করে ত্রিশটা দাঁত (মানে, দুটো পড়ে গেছে) বার করে হাউহাউ শব্দে হাসতে-হাসতে হঠাৎ জাপটে ধরলেন হাবুলকে। তারপরেই হাবুলের কাঁধের উপরে খ্যাঁক করে এক কামড়!

–খাইছে–খাইয়া ফেলছে কম্মো সারছে বলে তো হাবুলের তারস্বরে চিৎকার।

আমরা সকলে মিলে ছাড়াতে গেলুম কিন্তু ছাড়ানো কি সোজা! অনেক কষ্টে হাবুলকে বের করে আনা গেল, কিন্তু তার মধ্যেই গজকেষ্টবাবু ঘ্যাঁচ করে আমার বাঁ কানটা কামড়ে দিলেন আর ক্যাবলাকে দিলেন একটা ঘুষি বসিয়ে।

মানে, হাসি পেলে ওঁর আর কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। হাসির সঙ্গে সঙ্গে যাকে সামনে পান আঁচড়ে কামড়ে, কিল-ঘুষি মেরে অস্থির করে তোলেন।

গত বছরের ব্যাপারটাই শোনো। সরস্বতীপুজোর সময় মাইকে বাজানোর জন্যে কতগুলো গ্রামোফোন রেকর্ড আনা হয়েছে। তাই থেকে সবে একটা হাসির গান বাজাতে শুরু করেছে আমাদের টেনিদা, আর তৎক্ষণাৎ

বাজারের ভেতরে তাড়া খেয়ে গোরু যেমন করে দৌড়তে থাকে তেমনিভাবে ছুটতে-ছুটতে–একে ধাক্কা দিয়ে, তাকে মাড়িয়ে–গজকেষ্টবাবু এসে হাজির। তাই দেখে রেকর্ড-ফেকৰ্ড ফেলে টেনিদা তো এক লাফে উধাও। তখন গজকেষ্টবাবু করলেন কি হাসতে-হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে লাগলেন, তারপর উঠে একসঙ্গে খান বারো রেকর্ডই তুলে নিয়ে মারলেন এক আছাড়! আর দেখতে হল না বারোখানা রেকর্ডেরই বারোটা বেজে গেল! তা হলেই বোঝো, কী ভয়ঙ্কর ওঁর হাসি।

এমনিতে কিন্তু খাসা মানুষ। পুজোর চাঁদা চাই? আচ্ছা, তক্ষুনি দিলেন পঞ্চাশটা টাকা। পাড়ার কারও আপদ-বিপদ হলে গজকেষ্টবাবুর অমনি সেখানে হাজির। কোনও বাড়ির রুগীকে রাত দুটোর সময় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে? গজকেষ্টবাবু নিজের মোটর-গাড়ি নিয়ে তক্ষুনি চলে আসবেন। এমন লোকের ওপর তো রাগও করা যায় না।

ওঁর মোটর-গাড়ির কথাই ধরো না। বললেই তোমাকে গাড়িতে চাপাবেন, যেখানে যেতে চাও পৌঁছে দেবেন। কিন্তু গাড়ি চালাতে চালাতে যদি ওঁর হাসি পায় আর দেখতে হবে না। তখন তুমি পৈতৃক প্রাণটা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে কি না সন্দেহ। এই তো দুমাস আগে আমি আর আমার পিসতুতো ভাই ফুচুদা মেট্রো সিনেমা থেকে বায়োস্কোপ দেখে বেরিয়ে ট্রামের জন্য দাঁড়িয়ে আছি–গজকেষ্টবাবু এসে ঘস করে আমাদের দেখে গাড়ি থামালেন।

বাড়ি ফিরবে বুঝি?

আমরা বললুম, আজ্ঞে হ্যাঁ

-তাহলে উঠে পড়ো গাড়িতে।

আমরা দারুণ খুশি হয়ে উঠেছি ওঁর গাড়িতে। দিব্যি মজাসে যাচ্ছি, হঠাৎ ফুচুদাই গোলমাল করে ফেলল। সিনেমার-শোনা একটা হাসির গান বিচ্ছিরি বেসুরো গলায় গেয়ে উঠল–

এক ছিল শৌখিন ব্যাং
সরু-সরু মোজাপরা ঠ্যাং
সাবান মাখত আর গাইত পুকুরঘাটে বসে
ট্রালা-লা-লা-লা-লা-লা-গ্যাঁ

আমি আঁতকে উঠে ফুচুদাকে বলতে গেছি–আরে করছ কী–সর্বনাশ হয়ে যাবে, কিন্তু তার আগেই যা হওয়ার হয়ে গেছে। বিকট আওয়াজ করে হেসে উঠেছেন গজকেষ্টবাবু। এক প্যাকেট মাখন আর দুটো পাউরুটি কিনেছিলেন, সেগুলো ছুঁড়ে দিয়েছেন রাস্তায়, একজন দাড়িওলা ভদ্রলোকের মুখে গিয়ে লেগেছে মাখনের প্যাকেট–দাড়িতে মাখন মাখামাখি, রুটির ঘা খেয়ে একজন ওড়িয়া চাকর বাপো-বাপ্পো বলে চেঁচিয়ে উঠছে আর

আর মোটরগাড়ির স্টিয়ারিং ছেড়ে দিয়ে পা দুটো সামনের উইণ্ড-স্ক্রিনে তুলে দিয়ে দুহাত ছুঁড়ে গজকেষ্টবাবু হাসছেন হা-হা-হা-হা-হা-হাউ

সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটা গিয়ে ধাক্কা মেরেছে সামনের ল্যাম্পপোস্টে। ভাগ্যিস আস্তে যাচ্ছিল গাড়ি, তাই মাথায়-পেটে বেদম ঝাঁকুনি খেয়েই আমরা এ যাত্রা পার পেয়ে গেলুম। স্পিডে চললে আর দেখতে হত নাব্যাস, ওইখানেই খেলা খতম। একদম হালুয়া হয়ে যেতুম আমরা।

তারপর থেকে আমরা ওঁর মোটর-গাড়ির ত্রিসীমানাতে নেই সর্বনাশ! ওঁর গাড়িতে চড়া মানেই মহাযাত্রার রাস্তায় পা বাড়ানো। কখন কী বলে ফেলব, হাসতে হাসতে উনি স্টিয়ারিং ছেড়ে দেবেন–আর তারপরে! কী মুস্কিলের ব্যাপার দ্যাখো দেখি।

ক্যাবলার খুড়তুতো ভাই মেন্টুর মুখে-ভাত। আমরা খেতে গেছি। জোর খাওয়া-দাওয়া চলছে। বেগুনভাজা, ঘাট, শাক-চচ্চড়ি, মুগের ডাল, ফ্রাই আর মাছের কালিয়া এসব খাওয়ার শেষে এসেছে মাংস-পোলাও। বেশ জমিয়ে খাচ্ছি–গজকেষ্টবাবু সবে খান বারো মাছ খেয়ে মাংসের দিকে মন দিয়েছেন এমন সময়–কে একজন আর-একজনকে বললে, এই, অত মাংস খাসনি। বেশি পাঁঠার মাংস খেয়ে শেষে পাঁঠা হয়ে যাবি, আর ব্যা ব্যা করে ডাকবি।

এমনিতেই প্রাণ ভরে খেতে-খেতে গজকেষ্টবাবুর মেজাজ বেশ খোশ হয়ে ছিল, তার উপর কথাটা যেই শুনেছেন, ব্যাস।

তড়াক করে পাতা ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন। কথাটা যে বলেছিল এক লাথি দিয়ে তার পাতাটা উলটে দিলেন, জলের গেলাস আর-এক ভদ্রলোকের কোলের উপর গিয়ে পড়ল। সে-ভদ্রলোক এঁ-এঁ-এঁ করে উঠতে গজকেষ্টবাবু তার হাঁটুটা খ্যাঁক করে কামড়ে দিলেন, তারপর

হো-হো-হো-হিয়া-হিয়া করে হাসতে হাসতে গিয়ে গজকেষ্টবাবু চেপে ধরলেন আমাদের বল্টুদাকে। বল্টুদা মাংস পরিবেশন করছিল। গজকেষ্টবাবু করলেন কি, মাংসের বালতিটা কেড়ে নিয়ে সোজা ঢেলে দিলেন বল্টুদার মাথায়। বল্টুদা ইয়া ইয়া এঃ এঃ করে লাফাতে লাগল, গা আর গেঞ্জি বেয়ে পড়তে লাগল মাংসের ঝোল, আর সব মিলে বল্টুদাকে ঠিক একটা ঝোল-মাখানো গ্রেভি চপের মতো মনে হল। মানে একটা গ্রেভি চপ লাফাতে থাকলে যে-রকম দেখায় সেইরকম হল আর কি ব্যাপারটা।

কী যে বিচ্ছিরি হল, বুঝতেই পারছ যাকে বলে দক্ষযজ্ঞ! এদিকটায় যারা বসেছিল তাদের তো খাওয়াই পণ্ড হয়ে গেল। নেহাত গজকেষ্টবাবু বলেই পার পেলেন আর-কোনও লোক হলে সবাই মিলে পিটিয়ে পোস্ত-চচ্চড়ি বানিয়ে দিত। তাই বলছিলাম, গজকেষ্টবাবু হাসলেই তোমার কান্নার পালা। কাছাকাছি যদি থাকো, একেবারে দফা নিকেশ করে ছেড়ে দেবেন।

আমরা সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকি, গজকেষ্টবাবুকে দূরে আসতে দেখলেই সব্বাই একেবারে রামগরুড়ের ছানা সেজে বসে যাই–এমন মুখ করে থাকি যে, এক্ষুনি বুঝি কেঁদে ফেলব।

সেদিন তো গজকেষ্টবাবু জিজ্ঞেসই করে বসলেন, কী হে, তোমরা যে সব হাঁড়ির মতো মুখ করে আছ? হয়েছে কী?

হাবুল সেন পট করে বলে ফেলল, আমরা মনে বড় দুঃখ পাইছি।

–কেন, দুঃখটা কিসের?

–আহা মইরা গেলেন, আহা বড় ভালো লোক আছিলেন–

–কে মারা গেলেন? গজকেষ্টবাবু জিজ্ঞাসু হয়ে উঠলেন : কে ভালো লোক ছিলেন? হাবুল তো দারুণ প্যাঁচে পড়ে গেল! কে মারা গেল সেটা ও একেবারেই ভাবেনি। হাবুলকে মাথা চুলকোতে দেখে ক্যাবলা বললে, ইয়ে মানে–গদাধরবাবু, খুরুটের গদাধরবাবু। তিনিই মারা গেছেন কালকে।

আন্দাজী একটা যা-খুশি বলে দিয়েছিল ক্যাবলা, কিন্তু গজকেষ্টবাবর হাত থেকে নিস্তার পাওয়া শক্ত। গজকেষ্টবাবু চোখ কপালে তুলে বললেন, খুরুটের গদাধরবাবু? মানে গদাধর পাল? আরে সে মারা যাবে কেন? একটু আগেই সালকেতে তার সঙ্গে আমার দেখা দেখা হল।

তখন আমি বললুম, না-না, গদাধর পাল নয়, গদাধর পাঁড়ে। খুরুটের নয়–খুর্দা রোডে থাকত। সে-ই মারা গেছে। তার জন্যেই আমরা শোকে কাতর হয়ে

গজকেষ্টবাবু কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন, তক্ষুনি একটা কাণ্ড হল।

সামনেই রাস্তা দিয়ে প্রাণধনবাবু গুনগুন করে গান গাইতে-গাইতে আপন মনে চলছিলেন। আচমকা একটা কলার খোসায় তাঁর পা পিছলে গেল, সঙ্গে সঙ্গে ধড়াম করে এক আছাড়।

দেখেই আকাশ কাঁপিয়ে, আমার পেটের পালাজ্বরের পিলেটাকে চমকে দিয়ে এক ভয়ঙ্কর অট্টহাসি হাসলেন গজকেষ্টবাবু, আর তীরের মতো ছুটে গেলেন প্রাণধনের দিকে।

আমরাও গেল–গেল বলে ছুটলুম। প্রাণধনবাবু আছাড় খেয়েছেন বলে নয়–এইবার গজকেষ্টর হাতে তিনি পড়ে যাবেন।

যা ভেবেছি, ঠিক তাই।

প্রাণধনবাবু সামলে নিয়ে যেই উঠে দাঁড়িয়েছেন, অমনি গজকেষ্টবাবু গিয়ে ক্যাঁক করে ধরেছেন তাঁকে। হ্যাঃ হ্যাঃ করে হাসতে-হাসতে প্রথমেই প্রাণধনের নাকটা কামড়ে দিলেন।

প্রাণধন ই-ই-ইরে বাঁপু-বলে বিকট গলায় চেঁচিয়ে উঠতেই গজকেষ্টবাবু দমাদম ঘুষি চালাতে লাগলেন তাঁর ওপর। প্রায় পঞ্চাশজন লোক জড়ো হয়ে যখন তাঁকে গজকেষ্টবাবুর খপ্পর থেকে বের করে আনল, তখন প্রাণধন প্রায় অজ্ঞান। নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে–গোঁ-গোঁ আওয়াজ বেরুচ্ছে গলা দিয়ে।

সকলে গজকেষ্টবাবুকে যাচ্ছেতাই বলে বকতে লাগল।

-ছি-ছি মশাই আপনি কি খুনে নাকি? এখুনি যে মেরে ফেলেছিলেন ভদ্রলোককে। লজ্জায় এতটুকু হয়ে গেলেন গজকেষ্টবাবু। নিজের মোটরে চাপিয়ে প্রাণধনকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। ঘণ্টা খানেক পরে নাকে-মুখে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে প্রাণধন বেরুলেন হাসপাতাল থেকে। আর তাঁর ফ্যাটাবাঁধা সেই অদ্ভুত চেহারা দেখেই গজকেষ্টবাবুর মাথা খারাপ হয়ে গেল। খি-খি খিক খিক বলে একটা বিকুটে আওয়াজ তুলে ছুটলেন প্রাণধনের দিকে। একেবারে সোজা চার্জ।

কিন্তু প্রাণধনও এবার হুঁশিয়ার হয়ে গেছেন। তিনি ওরে বাবা বলে একখানা পেল্লায় লাফ মারলেন, তার পরে সারলে রে- বলে রাম চিৎকার তুলে এমন দৌড় লাগালেন যে, তার কাছে অলিম্পিক রেকর্ড কোথায় লাগে।

গজকেষ্টবাবু প্রাণধনকে ধরতে পারলেন না–তার বদলে একটা পাহারাওলাকে ধরতে গেলেন।

আরে বাপ-ই ক্যা হৈ বলে পাহারাওলা পালাতে গিয়ে একটা ষাঁড়ের ঘাড়ে উলটে পড়ল। গজকেষ্টবাবু ষাঁড়টাকেই কামড়াতে যাচ্ছিলেন–সেই সময় আমরা সবাই মিলে ওঁকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে এসে গাড়িতে তুললম। তারই ভেতর গজকেষ্টবাবু খ্যাঁচ করে আমার ডান কানটা কামড়ে দিলেন।

ভাগ্যিস আমাদের মধ্যে হাবুল মোটর চালাতে জানে। সেই তাড়াতাড়ি গাড়ি চালিয়ে পালিয়ে এল ওখান থেকে। নইলে গজকেষ্টবাবুকে ঠিক পুলিশে ধরে নিয়ে যেত।

কিন্তু এই কদিন হল গজকেষ্টবাবুর হাসি একদম বন্ধ হয়ে গেছে। গজকেষ্টবাবু আর হাসেন না–হাসির কথা শুনলে আর তেড়ে গিয়ে কাউকে আক্রমণ করেন না। বরং কোনও হাসির কথা বললে ভয়ে মুখ শুকিয়ে যায়–যেন বাঘ দেখেছেন, এমনিভাবে ছুটে পালান সেখান থেকে।

এই অঘটন ঘটিয়েছেন প্রাণধনবাবু।

হাঁ–প্রাণধনই ঘটিয়েছেন। একেবারে নির্মম প্রতিশোধ নিয়েছেন যাকে বলে।

প্রাণধনকে আমরা সবাই নিরীহ ভালোমানযু বলেই জানতুম। তাঁর মনে যে এত তেজ, প্রতিহিংসা আছে তা কে জানত।

সেদিন দেখি, রাস্তার মাথায় প্রাণধনবাবু তাঁর ভাগনে কানাইকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কানাই দারুণ পালোয়ান–গোবরবাবুর আখড়ায় কুস্তি লড়ে। দুজনে মিলে ফিসফিস করে আলাপ চলছে। প্রাণধনের হাতে দেখলুম লেবেল-মারা একটা শিশি। তার গায়ে লেখা কুইনিন মিকশ্চার।

জিজ্ঞেস করলুম, হাতে কুইনিন মিকশ্চার কেন প্রাণধনবাবু? কারও অসুখ নাকি?

প্রাণধনবাবু ঠোঁটে আঙুল দিলেন। আমি দেখলুম দুলতে-দুলতে গজকেষ্টবাবু আসছেন।

প্রাণধনবাবুর মতলবটা কী বোঝবার চেষ্টা করছি, ঠিক সেই সময় কানাই গলা ছেড়ে গর্দভ রাগিণীতে গান ধরল :

এক যে ছিল গাধা
পেন্টুলুন কিনবে বলে
আদায় করত চাঁদা

যেই গেয়েছে–মাঝপথে অমনি দাঁড়িয়ে পড়েছেন গজকেষ্টবাবু। কানাই আরও গলা চড়িয়ে গাইতে লাগল :

বলত সেই গাধা :
চার আনা করে সবাই আমায়
দিয়ে যাবেন দাদা—

–হৌ-হৌ–হৌ-হোয়া বলে গগনভেদী অট্টহাসি হাসলেন গজকেষ্টবাবু-তার পরই দমদম বুলেটের মতো তেড়ে এলেন কানাইয়ের দিকে।

কানাইও তৈরিই ছিল। হা-রে-রে-রে বলে হাঁক ছেড়ে সে তক্ষুনি ধপাক করে গজকেষ্টবাবুকে ধরে ফেলল, তারপর পাক্কা কুস্তিগিরের মতো একখানা ধোপিয়া পাটের পাঁচ লাগিয়ে সোজা ফেলে দিলে রাস্তার ওপর। গজকেষ্টবাবুকে একেবারে চিত করে ফেলে কানাই তাঁর ওপর চেপে বসল।

গজকেষ্টবাবু ভীষণ ভেবড়ে গেলেন। এতকাল হাসতে হাসতে তিনিই সকলকে আক্রমণ করেছেন, পালটা এমন বেয়াড়া কুস্তির প্যাঁচের জন্যে আদৌ তৈরি ছিলেন না। তাঁর হাসি বন্ধ হয়ে গেল।

কিন্তু তাঁর হাসি বন্ধ হলে কী হয়-কানাই ছাড়বার পাত্র নয়। সে গজকেষ্টবাবুর ভূঁড়িতে আর পাঁজরায় বেদম সুড়সুড়ি দিতে লাগল। গজকেষ্টবাবু প্রাণের দায়ে খ্যাঁ-খাঁ করে হাসতে লাগলেন–চোখ দুটো তাঁর কপালে চড়ে গেল।

আর তখন

ঠিক সেই মুহূর্তেই

কুইনিন মিকশ্চারের ছিপি খুলে তার সবটা গজকেষ্টবাবুর মুখের ঢেলে দিলেন প্রাণধন। গজকেষ্ট কেবল বলতে পারলেন : ওয়া ওয়াং।

তারপরই প্রাণধন আর কানাই দেখতে না-দেখতে একদৌড়ে হাওয়া! গজকেষ্ট রাস্তার মধ্যে পড়ে রইলেন গজকচ্ছপের মতো। আমি ছুটে গিয়ে গজকেষ্টবাবুকে তুলে বসালুম। গজকেষ্ট বিকট স্বরে বললেন, ওয়াফ-ওয়াফ। বাপরে কী তেতো! প্যালা–সিরাপ এক বোতল–কুইক। ওয়াফ-ওয়াফ।

.

গজকেষ্টবাবু আর হাসেন না। তাঁর সেই মারাত্মক হাসি একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে।

এমন ভয়ঙ্কর দাওয়াইয়ের পর আর কি হাসি আসে কারও? তোমরাই বলো।

গিলটি

গলির মুখ থেকেই হিমাংশু ঘোষালের গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। রান্নাঘরে ভাতের হাঁড়ি থেকে ফেন গালতে গালতে সব কথাই স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল গৌরী। ওই একটা গুণ আছে হিমাংশুর, কখনো আস্তে কথা বলতে পারে না। অত্যন্ত খুশি হয়ে যখন সে ঘরোয়া আলাপ শুরু করে, তখন এপাড়ার কোনো নতুন লোক তা শুনলে সন্দেহ করে একটা নরহত্যার জন্যেই বুঝি তৈরি হচ্ছে হিমাংশু।

রান্নাঘর থেকেও গৌরী বুঝতে পারল, গলির মুখে কানা চোখের মতো ঘষা আলোর গ্যাস পোস্টটার নীচে দাঁড়িয়ে পড়েছে হিমাংশু। চিৎকার করে আলাপ করছে কারও সঙ্গে।

আমার টাকা মেরে দেবে? হক্কের পাওনা ঠকিয়ে নেবে আমার? গলায় গামছা দিয়ে সব টাকা আদায় করে ছাড়ব, তবে আমার নাম হিমাংশু ঘোষাল।

গৌরী জাকুটি করল। রান্নাঘরের মেজেয় ছোটো-বড়ো অসংখ্য গর্ত। হাঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়া ফেন জমা হচ্ছে তাদের মধ্যে। এই দিনদুপুরেই প্রায়ান্ধকার ঘরের এখান-ওখান থেকে কয়েকটা আরশোলা উঁকি মারছিল। অর্থহীন বিদ্বেষে একটা খুন্তির ডগায় খানিক গরম ফেন তুলে নিয়ে গৌরী ছিটিয়ে দিলে তাদের দিকে। একটা আরশোলা চিত হয়ে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে, অন্তিম যন্ত্রণায় পা ছুঁড়তে লাগল।

হাজার টাকা মাইনে পান। মোটরে চড়ে ঘুরে বেড়ান! ওঃ, ওরকম বড়ো সায়েব বিস্তর দেখা আছে আমার! আজ বারো বছর লোক চরিয়ে খাচ্ছি এই কলকাতা শহরে, ঘাড়ে ধরে যদি ও-টাকা আদায় করতে না পারি তাহলে…

তাহলে একটা ভয়ংকর কিছু করে ফেলবে হিমাংশু। কিন্তু কী করবে? গৌরী জানে হিমাংশুর দৌড় কতখানি। দাওয়ায় বসে বিড়ি টানতে টানতে গজগজ করবে, গালাগাল করবে, অশ্লীলতম ভাষা ব্যবহার করবে, তারপর একদিন সম্পূর্ণ ভুলে যাবে। ছাতাটা বগলে নিয়ে বেরুবার সময় গৌরীকে আশ্বাস দিয়ে বলবে, আড়াইশো টাকার ফ্ল্যাট, এক মাসের ভাড়া আমার কমিশন। যদি বাগাতে পারি, একটা মাস পায়ের উপর পা তুলে দিয়ে চলে যাবে–কী বলিস?

স্ত্রীকে তুই বলেই সম্ভাষণ করে হিমাংশু। ওরা দুজন একই গ্রামের। দশ বছরের গৌরীর সঙ্গে সতেরো বছরের হিমাংশুর বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের আগেকার সম্ভাষণটাই চলছে এই চৌদ্দ বছর ধরে।

ভাতের হাঁড়ি নামিয়ে রেখে উনুনে কড়াই চাপিয়ে দিলে। হিমাংশুর চিৎকার আর শোনা যাচ্ছে না। হয়তো চাপা গলায় আলোচনা করছে, কী প্ল্যানে টাকাটা আদায় করা যায়। কিংবা হয়তো সঙ্গীর সঙ্গে কথা কইতে কইতে এগিয়ে গিয়েছে বড়ো রাস্তার দিকে।

কড়াই থেকে কয়েক বিন্দু গরম তেল হঠাৎ ছিটকে এসে হাতে লাগল। মুখ বিকৃত করে গৌরী নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখল এক বার। রান্নার ধোঁয়ায় ঝাপসা হয়ে-যাওয়া ইলেকট্রিক বালবটার লালচে ম্লান আলোতেও নিজের বাহুর দিকে তাকিয়ে পোড়ার যন্ত্রণা ভুলে গেল গৌরী, মুগ্ধদৃষ্টি কিছুক্ষণ থমকে রইল সেখানে। নিয়মিত সাবান পড়ে না, তিরতিরে কলের জলে স্নান পর্যন্ত হয় না ভালো করে, তবু পুষ্ট নিটোল হাতখানার দুধ আলতা রঙে এতটুকু মলিনতার ছায়া পড়েনি। একগাছা লাল কাচের চুড়ি আর একটি শাঁখাতেই সেই হাতখানা রাজরানির হাতের মতো দেখাচ্ছে।

শুধু গৌরীর চোখেই যে তা ধরা পড়েছে তা নয়। হিমাংশু নিজেই বলেছে কত বার।

ভাগ্যিস দশ বছর বয়সেই তোকে বিয়ে করে ফেলেছিলুম। নইলে এই রূপ নিয়ে তুই কি ফিরেও তাকাতিস আমার দিকে? কপালে লাথি মেরে দিয়ে কোন জমিদারের ঘরে গিয়ে উঠতিস।

ঠিক কথা। সত্যিই কি দশ বছর বয়েসের গৌরীকে দেখে কেউ ভুলেও ভাবতে পারত যে, এই মেয়ের ভিতরে এত রূপ লুকিয়ে আছে? কেউ কি কল্পনাও করতে পারত লক্ষীছাড়া চেহারার একটা ছোট্ট পাড়াগেঁয়ে মেয়ের ভিতর থেকে একদিন বেরিয়ে আসবে ইন্দ্রাণী? এ যেন রূপকথার গল্পের ব্যাঙের হঠাৎ রাজকন্যা হয়ে যাওয়া। সেই রাজকন্যা, যে হাসলে মানিক ঝরে, কাঁদলে মুক্তো।

তখন গৌরী নিয়মিত বছরে চার মাস ম্যালেরিয়ায় ভুগত। কাঠির মতো হাত-পা, লালচে একরাশ জংলা চুল, মড়ার মাথার মতো মাংসহীন মুখ, কোটরে ডুবে-থাকা দুটো অন্ধকার চোখ, গায়ের ক্যাটকেটে সাদা রং দৃষ্টিকে যেন আঘাত করত। কুশ্রীতাকে সম্পূর্ণ করবার জন্যে গলায় দুলত ঘামের সবুজ কলঙ্ক-মাখানো দুটো আমার মাদুলি।

আর ইশকুল থেকে তাড়া-খাওয়া হিমাংশু তখন বাপের সঙ্গে যজমানির অ্যাপ্রেন্টিস খাটত।

একটু কুঁজো, সারা মুখে বসন্তের দাগ, নাকটা পাখির ঠোঁটের মতো লম্বা। মাথায় বেয়াড়া ধরনের টেড়ি, তারসঙ্গে আরও বিসদৃশ টিকি একটা। এমন বিকট বেসুরো গলায় গান গাইত যে, হরির লুটের কীর্তন থেকে পর্যন্ত তাকে বরবাদ করে দেওয়া হয়েছিল।

এই দুজনের যখন বিয়ে হল, তখন গ্রামের রসিকেরা মন্তব্য করেছিল, একেই বলে রাজযোটক। বাসরঘরে গৌরীর দূর-সম্পর্কের এক বউদি গান গেয়েছিলেন, আহা, কী-বা মানিয়েছে রে, যেন শ্যামের বামে রাইকিশোরী, আহা কী-বা মানিয়েছে রে!

কিন্তু বছর দুয়েকের মধ্যেই গৌরী একটু একটু করে ফুটে উঠতে লাগল। তখন দু একজনের মনে হল, মেয়েটা একেবারে ধূমাবতী নয়—একটু ছিরিছাঁদও আছে ওর ভিতরে। আর এরমধ্যে একদিন বাপের সঙ্গে ঝগড়া করল হিমাংশু; মাথার টিকিটাকে গোড়া থেকে ক্যাঁচ করে কেটে দিয়ে পৈতৃক উত্তরাধিকারের মূলোচ্ছেদ করল, তারপর স্ত্রীকে নিয়ে রওনা হল কলকাতায়। দূর-সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়ির সমস্ত বিরক্তি আর বিতৃষ্ণার মধ্যেও জোর করে মাত্র আট মাস কাটিয়ে দিলে, তারপর আত্মীয়টির দৃষ্টান্তে ব্যবসায়ে নেমে পড়ল।

ব্যাবসা আর কিছু নয়, বিনা মূলধনে যা করা যায় তাই—দালালি। বাড়ি আর জমির দালালি।

খাটতে হয় বই কী। সকালেই বেরুতে হয় ছাতাটাকে বগলদাবা করে। তারপর মেটেবুরুজ থেকে বরানগর, বালি থেকে ব্যারাকপুর। কোথায় বাড়ি বিক্রি হচ্ছে, কোথায় তিন কাঠা দক্ষিণমুখো জমি সস্তায় পাওয়া যাবে, কোথায় তিনখানা নতুন ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে, সব কিছু খবর রাখতে হয় হিমাংশুকে।

বলতে গেলে, কলকাতা আর আশপাশের কুড়ি মাইলের মধ্যে যত জমি আর ঘরবাড়ি আছে, হিমাংশু তার জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া।

কী বললেন স্যার? হাজরা রোডের জমি? ওই যে ব্যারিস্টার ঘোষের লালরঙের বাড়িটার লাগোয়া? নেবেন না স্যার, কখনো নেবেন না। আপনি ভালোমানুষ বলেই বলছি, ও-জমিতে বিস্তর ফ্যাঁকড়া আছে, গাঁটের কড়ি দিয়ে কিনে শেষে বিশ্রী লিটিগেশনে পড়ে যাবেন। কী বললেন? সার্চ করবেন? অনর্থক আবার অ্যাটর্নিকে এককাঁড়ি পয়সা দেবেন তো? আমি বলছি… শুনুন, উনিশশো পঁয়ত্রিশ সালে জেঠামল ভোজমল মাড়োয়ারি…

কিংবা—

জানি, জানি স্যার, ছাতু চক্কোত্তি লেনের নতুন ফ্ল্যাট দুটোর কথা বলছেন তো? ওর আদত মালিক হচ্ছে হরেরাম গায়েন, ক্যানিং-এ মাছের আড়ত আছে। বাড়ির চার্জে আছে ওদের ম্যানেজার কিষ্টপদ সাউ। সে স্যার সাংঘাতিক লোক, একটি রাঘববোয়াল, তাকে বাগানো আপনার কাজ নয়। দেখাই করবে না হয়তো। তবে আমাকে ভার দিন, দেখবেন সব ম্যানেজ করে দেব। একটা সিগারেট এগিয়ে দিয়ে বলব, কিষ্টদা ওবাড়ি আমার চাই-ই; ব্যাস, আর বলতে হবে না। আপনাদের আশীর্বাদে স্যার এই হিমাংশু ঘোষালের…।

সকলের এই আশীর্বাদ কুড়িয়ে বেড়ানো সহজ কাজ নয়। পার্টির বাড়িতে বাড়িতে ঘোরা আছে, অ্যাটর্নি আর উকিলের অফিসে দৌড়োদৌড়ি আছে। যে-পার্টির মন দ্বিধা-সন্দেহে দুলছে, দু-ঘণ্টা বক্তৃতা দিয়ে তার মন-ভেজানোর দায়িত্ব আছে। একটা ট্রানজাকশনের সময় দুটো পার্টিকে অ্যাটর্নির অফিসে হাজির করা কিংবা সময়মতো কোর্টে এনে জড়ো করা— এসবও যেন হিমাংশুর পিতৃদায়ের মধ্যে পড়ে। এমনকী ঠিকমতো কোর্ট-ফি কেনা হয়েছে কি না, সেদিকেও তার লক্ষ রাখতে হয়। কাজ তাতেও ফুরোয় না, তারপর সর্বশেষে আছে কমিশনের টাকা আদায় করা।

কেউ কেউ পুরোটা সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দেয়, কেউ ছ-মাস ঘোরায়, কেউ কেউ একেবারেই ফাঁকি দেবার মতলব করে। তখন রাস্তার দাঁড়িয়ে মাজাভাঙা সাপের মতো ব্যর্থ আক্রোশে গর্জন করে হিমাংশু।

দেখে নেব, দেখে নেব। গলায় পা দিয়ে আমার পাওনা টাকা আদায় করে ছাড়ব, তবে আমার নাম…

পাওনা টাকা অনেকের কাছ থেকেই আদায় হয়নি, কিন্তু সেজন্যে নিজের নাম বদল করতে পারেনি হিমাংশু ঘোষাল। দিন কয়েক গালমন্দ করেছে, নিরুপায় অন্তর্জালায় বিড়ি পুড়িয়েছে একটার পর একটা, ব্যবহার করেছে অশ্লীলতম ভাষা, তারপর নিজেরই বিষযন্ত্রণায় নিতান্ত তুচ্ছ কারণেই গৌরীর গায়ে হাত তুলতে গিয়ে তার আশ্চর্য রূপের দিকে তাকিয়ে মন্ত্রশান্ত ভুজঙ্গের মতো স্তব্ধ হয়ে গেছে। পরক্ষণেই ছাতাটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেছে বাড়ি থেকে। বেলেঘাটায় একটা নতুন পার্টির সন্ধান মিলেছে, নষ্ট করবার মতো সময় তার নেই।

সেই সকাল আটটায় বেরিয়ে কখনো বেলা বারোটা-একটায় এসে একমুঠো খেয়ে যাওয়া। কোনো কোনো দিন তাও নয়, একেবারে সেই রাত সাড়ে এগারোটায় বাড়ি ফেরা। দিনের খাওয়াটা সস্তার হোটেলে কিংবা ডালপুরির দোকানে।

শনি-রবিবার নেই, ছুটিছাটা নেই, পুজো-পার্বণ নেই। এক-আধদিন অসুখবিসুখে না পড়লে বাঁধনিয়মে কোথাও ছেদ পড়ে না। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, শীতে কুঁকড়ে কদাকার চেহারা আরও কদাকার হয়েছে হিমাংশুর। নাকটা ঠোঁটের মতো বাঁক নিয়েছে, উঁচু উঁচু দাঁতে পানের ছোপ কালো হয়ে বসেছে, বসন্তচিহ্নিত মুখটার দিকে তাকালে যে-কেউ সন্দেহ করে—এই লোকটা যখন খুশি খুন করতে পারে। নুয়ে-পড়া ঘাড়টাকে এখন নির্ভুল একটা কুঁজের মতো দেখায়।

এত খাটে, তবু সংসার চলে না।

মাঝে মাঝে হিমাংশু সামান্য নেশা করে আসে, কিন্তু তাকে মাতাল বলা যায় না। সেটা বড়ো খরচ নয়। হিমাংশুকে আর একটা রোগে ধরেছে, সেটা রেসের।

মাঠের ভিতরে যায় না, বাইরেই জুয়ো খেলে। তবু সামান্য আয়ের একটা বড়ো অংশ ওইখানেই নিবেদন করে আসে হিমাংশু। যেদিন বেশি হারে সেদিন ওর মুখের গন্ধেই টের পায় গৌরী। আর অনেক রাত পর্যন্ত হিমাংশু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে— কতদিন মামাবাড়ি যাইনি, দাদুকে বড়ো দেখতে ইচ্ছে করে।

গৌরী সরে যায় সামনে থেকে। একতলা জীর্ণ বাড়িটার কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ছোটো ছাতটায় উঠে আসে। খান তিনেক নীচু ছাতের পরেই সাদা রঙের বড়ো তেতলা বাড়ি একখানা। মল্লিকদের বাড়ি। দোতলার জানলায় আলো জ্বলছে। জানলার সামনে যে দাঁড়িয়ে, তাকে এখান থেকেও স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। তার সোনার চশমা চিকচিক করছে, সিগারেটের আগুনটা দীপিত হয়ে উঠছে থেকে থেকে।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হিমাংশুর কথা ভাবে গৌরী। দিনের পর দিন আরও স্থূল, আরও কর্কশ হয়ে উঠছে হিমাংশু। মধ্যে মধ্যে যখন সোহাগ করবার চেষ্টা করে, তখন ওর হাতের ছোঁয়ায় শরীর জ্বালা করতে থাকে। হিমাংশুর আঙুলগুলোকে একটা বিরাট মাকড়সার কতগুলো ক্লেদাক্ত পায়ের মতো মনে হয়। অন্ধকারেই নিজের নিটোল শুভ্র হাত দুখানি সে দেখতে পায়, সেই হাত দিয়ে তার নিজের গলাই জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে। কাঠের রেলিঙে ভর দিয়ে গৌরী দাঁড়িয়ে থাকে, বুকের ভেতর নিজের রক্তের কলধ্বনি শুনতে পায়।

দোতলার জানলায় আগুনের একটা ঝলক ফুটে ওঠে কয়েক মুহূর্তের জন্য। আর একটা সিগারেট ধরিয়েছে লোকটা। হঠাৎ গৌরীর মনে হয়–আলোর বিন্দু-ছড়ানো এই অন্ধকারটা একটা বিরাট জালের মতো তাকে জড়িয়ে ধরছে। অসহ্য গরম লাগতে থাকে, হাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, গৌরীর নিশ্বাস আটকে আসে। চঞ্চল হয়ে ফিরে আসে সিঁড়ির দিকে। নামতে নামতে মনে হয়–শ্যাওলায় শ্যাওলায় সিঁড়িটা ভরে গেছে, যেকোনো সময় পা পিছলে যেতে পারে।

ঘরের মেঝেতে তখন কুন্ডলী-পাকানো একটা কুকুরের মতো পড়ে আছে হিমাংশু। কোটরে-বসা চোখের কোনায় জলের দাগ। যে-দাদুকে সাত বছর বয়েসে শেষ বার দেখেছিল, তারই জন্যে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে।

বেশ আছি, গৌরী ভাবে। তক্তপোশের কোনায় বসে কিছুক্ষণ বিস্বাদ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে হিমাংশুর দিকে। পুরু কালো ঠোঁটের ফাঁকে পানের রংধরা দাঁতগুলো ভ্যাংচানির ভঙ্গিতে বেরিয়ে আছে। বেশ আছি, বার বার কথাটা মাথার ভিতরে ঘুরতে থাকে গৌরীর। নিজের হাতের মুঠো চোখের সামনে মেলে ধরে যেন ভাগ্যরেখাটাকে পরীক্ষা করে দেখতে চায়। কিন্তু পরক্ষণেই সব গোলমাল হয়ে যায়। নরম গোল হাতখানিকে একটা ফুটন্ত পদ্মের মতো মনে হয়। দু-চোখ ভরে মুগ্ধতা নেমে আসে।

হিমাংশু নাক ডাকতে থাকে। মুখটা আরও খানিক ফাঁক হয়ে গেছে।

গৌরী চমকে উঠল। তরকারিটা প্রায় ধরে আসবার জো হয়েছে। আর দরজার কড়ায় পাগলের মতো ঝাঁকানি দিচ্ছে হিমাংশু। আধমরা আরশোলাটা চিত হয়ে পা নাড়তে নাড়তে অনেকখানি এগিয়ে এসেছে সামনের দিকে।

উঠে গিয়ে গৌরী দরজা খুলে দিল।

ভিতরে পা দিয়েই খিচিয়ে উঠল হিমাংশু।

ঘুমিয়ে পড়েছিলি নাকি এই সন্ধে বেলায়। সেই কখন থেকে কড়া নাড়ছি, শুনতে পাসনি?

ঘুমিয়ে পড়ব কী করে? রাস্তা থেকেই তো চ্যাঁচানি শুনছি।

হাতের ছাতাটা ধপাস করে ছুড়ে দিয়ে হিমাংশু দাওয়ার উপরে বসে পড়ল। বিড়ি ধরাল।

তারপর…

বড়োলোক! ওঃ! অমন বড়োলোক ঢের দেখেছে এই হিমাংশু ঘোষাল। নিজের মুখে বললে, টু পারসেন্ট। এখন কাজ মিটে গেলে বলছে এই একশো টাকা বকশিশ দিচ্ছি, মিষ্টি কিনে খাও। বখশিশ, আমি চাকর না দারোয়ান যে বখশিশ নেব? ওঃ, বড়োলোক!

বিড়িতে একটা হিংস্র টান দিয়ে পর পর কয়েকটা কদর্য কথা আউড়ে গেল হিমাংশু।

রান্নাঘরের দিকে এগোচ্ছিল গৌরী, কী মনে ফিরে এল।

একটা কথা বলব?

স্বগতোক্তিতে ছেদ পড়ায় হিমাংশু বিরক্ত হল। ভুরু কুঁচকে বললে, তোর আবার কী হল?

পরকে তো এত বাড়ি আর জমির ব্যবস্থা করে দিচ্ছ, নিজের জন্যে কিছু করতে পার না?

হিমাংশু হাতের বিড়িটা ছুড়ে দিলে। সেটা চৌবাচ্চার জলের মধ্যে গিয়ে পড়ল। কর্কশ স্বরে বলল, আরে, চেষ্টা কি আর করছি না? ঝোপ বুঝে একখানা কোপ যখন মারব, তখন বুঝতে পারবি। নিউ আলিপুরে কিংবা পার্ক সার্কাসে…

ছুরির ধারের মতো খানিকটা তীক্ষ্ণ বঙ্কিম হাসি গৌরীর ঠোঁটের ওপর দিয়ে খেলে গেল।

রাজপ্রাসাদের কথা এখন থাক, একটা ভালো বাসার ব্যবস্থাও কি করতে পার না?

কেন, এ বাসাটাই-বা এমন মন্দ কী? তোর বুঝি দোতলার ঘর নইলে ঘুম হচ্ছে না? বাড়িটা একতলা, পুরোনোও বটে, কিন্তু সুবিধেটা দেখছিস না? একেবার সব আলাদা—মায় ছাত পর্যন্ত। কোথাও কোনো ঝক্কিঝামেলা নেই, অন্য ভাড়াটের সঙ্গে জল-চানের ঘর নিয়ে ঝগড়া করতে হয় না। এসব বুঝি তোর পছন্দ নয়? সাময়িকভাবে মনের তিক্ত যন্ত্রণাটাকে ভুলে গিয়ে রসিকতার চেষ্টা করল হিমাংশু, মেয়েমানুষ তো—স্বভাব যাবে কোথায়? ব্যাঙের মতো গলা ফুলিয়ে কারুর সঙ্গে ঝগড়া করতে না পারলে ভাত হজম হবে কেন?

সেজন্যে নয়। গৌরী আস্তে আস্তে বললে, ছাতগুলো সব গায়ে-লাগা, যেকোনো সময় চোর আসতে পারে।

চোর! হিমাংশু আরও সরস হয়ে উঠল, আরে আমার বাসায় একাদশী করতে আসবে এমন বেকুব চোর কলকাতা শহরে নেই। তোর গায়ে তো কয়েক গাছা গালার চুড়ি আছে— বোধ হয় পয়সা চারেক দাম হবে। তবে হ্যাঁ… হিমাংশু হা-হা করে হেসে উঠল। তোকে যদি কেউ চুরি করতে আসে সেটা আলাদা কথা। লাখ টাকাতেও তোর দাম হয় না। দালালির কাজে কলকাতা শহরে কত বড়লোকের বাড়িতেই তো যাই… লুব্ধ চোখ মেলে স্ত্রীকে লেহন করতে লাগল হিমাংশু, সত্যি বলছি, তোর মতো রূপসি বউ কারুর ঘরে দেখিনে।

অকারণে একরাশ রক্ত জমা হল গৌরীর মুখে, খানিকটা তপ্ত বাষ্পের মতো কী যেন কুন্ডলী পাকিয়ে উঠতে লাগল মাথার ভেতরে। নিজের হৃৎপিন্ডে ঝড়ের আওয়াজ শুনতে পেল গৌরী।

মুখ ফিরিয়ে চলে যাচ্ছিল রান্নাঘরের দিকে, হিমাংশু তাকে ডাকল, শোন!

গৌরী ফিরে দাঁড়াল। বারান্দার মিটমিটে আলোটা নয়, গৌরীর চোখে-মুখে, তার সর্বাঙ্গে আরও কিছু ছড়িয়ে পড়েছে। এই কানাগলির ভেতরেও এক টুকরো আকাশ আছে, চাঁদ উঠেছে সেখানে। তারই জ্যোৎস্নায় গৌরী স্নান করছে। ডুরে শাড়ির আবরণে ঢাকা রুপোর মূর্তির মতো দেখাল গৌরীকে, তার নিখুঁত সুন্দর কপালের উপর যেন মণির মতো কী-একটা জ্বলছে বলে মনে হল। কিছুক্ষণ হিমাংশুর চোখের পলক পড়ল না।

গা-ভরতি গয়না নইলে তোকে মানায় না গৌরী—একেবারে মানায় না! অভিভূত বিহ্বল-গলায় হিমাংশু বললে, গয়না পরবার জন্যেই যেন জন্মেছিলি তুই। সামনের ট্রানজাকশনের টাকাটা যদি পাই, সত্যি বলছি…

জ্যোৎস্নার আলোয় হিমাংশু গৌরীকে এক চোখ দিয়ে দেখছিল, হিমাংশুকে গৌরী দেখছিল আর এক চোখে। পিঠে কুঁজ নিয়ে বসে থাকা হিমাংশুকে অদ্ভুত জান্তব দেখাচ্ছে। এখন। আরও কুৎসিত, আরও কদাকার মনে হচ্ছে।

হিমাংশুর কথার শেষটুকু শোনবার জন্যে গৌরী আর অপেক্ষা করল না। এগিয়ে গেল রান্নাঘরে।

সেদিন অনেক রাত্রে, সারাদিনের অসহ্য ক্লান্তির পরে হিমাংশু মড়ার মতো ঘুমিয়ে পড়লে গৌরী দরজা খুলে ছাদে উঠে এল। তখন চাঁদ আরও আশ্চর্য রূপ নিয়েছে, জ্যোৎস্না আরও উজ্জ্বল হয়ে রেণু রেণু সোনা বৃষ্টি করে চলেছে। গৌরীর শরীরে সেই সোনা ঝরে পড়তে লাগল। গালার চুড়িপরা নিরাভরণ হাত দুটির উপর বার বার গৌরীর চোখ পড়তে লাগল, না দেখেও সে অনুভব করতে লাগল—তার দীর্ঘ শুভ্র গ্রীবাকে এই আলোয় কী করুণ আর নিরাভরণ মনে হচ্ছে!

দোতলা বাড়ির জানলায় আবার সিগারেটের আগুন জ্বলল। জ্যোৎস্নার ভিতরে অস্বাভাবিক লাল দেখাল সেটাকে, আলোর শরীরে দপ দপ করতে লাগল রক্তবিন্দুর মতো।

আর হিমাংশু স্বপ্ন দেখতে লাগল, রেসকোর্সের মাঠে একটা কালো ঘোড়া সকলকে পিছনে ফেলে তিরের মতো ছুটে চলেছে, তার পিঠে জকি হয়ে বসে আছে সেই নতুন পার্টিটা, যে তাকে তিন পার্সেন্ট কমিশন দিতে রাজি হয়েছে।

ইদানীং ফিরতে প্রায়ই বেশি রাত হয়। তার উপরে আজ শনিবার ছিল, বিকেলে রেসের

মাঠে গিয়েছিল হিমাংশু। গোটা চল্লিশেক টাকা ছিল সঙ্গে, তার প্রায় সবটাই গেছে। বিস্বাদ বিরক্ত মনটাকে সামান্য একটু রাঙা করে অল্প অল্প টলতে টলতে হিমাংশু যখন বাড়ি ফিরল, রাত তখন একটার কাছাকাছি।

গৌরী জেগেই ছিল। দরজা খুলে দিলে কড়ায় হাত পড়তেই। হিমাংশু হাতের ছাতাটা উঠোনেই ছুড়ে দিয়ে রকের উপর বসে পড়ল।

দুত্তোর, দিনটাই খারাপ। রাস্তায় বেরিয়ে যে কার মুখ দেখেছিলুম প্রথমে!

গৌরী বললে, ওঠো, হাত-মুখ ধুয়ে খেয়ে নাও।

খেতে ইচ্ছে করছে না, একরাশ তেলেভাজা এখনও যেন আটকে আছে গলায়। হিমাংশু হেঁচকি তুলল একটা, তা ছাড়া সমস্ত মনমেজাজই খিচড়ে রয়েছে। কী যে বাজে টিপস দিলে—টাকাগুলো একেবারে বরবাদ হয়ে গেল। সব জোচ্চোর বুঝলি? সব জোচ্চোর। দুনিয়ায় ভালো লোকের জায়গা নেই!

নেশা-জড়ানো চোখ তুলে সমর্থনের আসায় গৌরীর দিকে তাকাল হিমাংশু, আর দেখতে পেল এতক্ষণ পরে।

শুক্লপক্ষ ঘুরে এসেছে আবার। সেদিনের মতো চাঁদ উঁকি দিয়েছে এই জীর্ণ বিবর্ণ বাড়ির কয়েক ইঞ্চি আকাশে-ত্রয়োদশীর চাঁদ। আর গৌরীর শঙ্খগ্রীবায় কী যেন ঝিকমিক করে জ্বলছে, চাঁদমালার মতো জ্বলছে।

গলায় ওটা কী পরেছিস তুই? হার পেলি কোথায়?

মুহূর্তের জন্যে চুপ করে রইল গৌরী, মুহূর্তের জন্যে তাকে পাথরের একটা মূর্তির মতো দেখাল। তারপর একটা চাপা নিশ্বাস ফেলে বললে, ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কিনেছি পাঁচ সিকে দিয়ে!

ওঃ, নকল সোনার গয়না? গিলটির? হিমাংশু উঠে দাঁড়াল, দেখি?

গৌরী স্তব্ধ হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। হিমাংশুর কদাকার হাতের আঙুলগুলো তার গলা স্পর্শ করল, ভয়ে শিউরে উঠল গৌরী; এক বারের জন্যে মনে হল ওই আঙুলগুলো এখুনি তার গলার নরম মাংসের মধ্যে সাঁড়াশির মতো চেপে বসবে। চোখের পাতাদুটো তার বন্ধ হয়ে এল।

হিমাংশু বললে, বেড়ে মানিয়েছে হারছড়া। দূর থেকে বোঝাই যায় না, তবে হাত দিয়ে দেখলে টের পাওয়া যায় বই কী। খাঁটি সোনা লালচে হয় না, আর একটু সাদাটে হয়।

গৌরী প্রায় নিঃশব্দ গলায় বললে, খাঁটি সোনা বুঝি তুমি হাত দিয়ে দেখলেই টের পাও?

গৌরীর মুখের ওপর একরাশ অল্প গন্ধ ছড়িয়ে হা-হা করে হেসে উঠল হিমাংশু, পাই বই কী। নাহয় তোকে সোনাদানা কিনেই দিতে পারি না, তাই বলে খাঁটি-নকল চিনতে পারব না? আজ বারো বছর ধরে কলকাতা শহর চরিয়ে খাচ্ছি রে, হিমাংশু ঘোষালের অত সহজে ভুল হয় না।

গৌরী বললে, থাক ওসব, খাবে এসো।

গৌরী ঘুমিয়ে পড়লেও আজ রাত্রে হিমাংশুর ঘুম এল না। নেশাটা যতই ফিকে হয়ে আসতে লাগল, ততই তার প্রতিক্রিয়াটা তীব্র তীক্ষ্ণবেদনার মতো তাকে যন্ত্রণা দিতে লাগল। ওই গিলটির নকল হারছড়াই কী আশ্চর্য মানিয়েছে গৌরীর গলায়! বালিশের পাশে একখানা হাত এলিয়ে আছে, একগাছা লাল চুড়িতে কী দীনতা ফুটে উঠেছে তাতে! ভারি অন্যায় হয়ে গেছে হিমাংশু ভাবল। যে-করেই হোক কয়েকখানা গয়না গৌরীকে তার গুড়িয়ে দেওয়া উচিত ছিল। সোনা ছাড়া এমন সোনার প্রতিমাকে কি মানায়!

চমৎকার দেখাচ্ছে হারছড়া। তবুও গিলটির হার। দু-দিন পরেই ময়লা হয়ে যাবে, বিবর্ণ পিতলের রং ধরবে। ও শুধু গৌরীর আত্মবঞ্চনাই নয়, ওর মধ্যে কেবল গৌরীর ব্যর্থ আকাঙ্ক্ষার বেদনাই মিশে নেই, ও হিমাংশুরও চরম লজ্জা, তার অক্ষম পৌরুষের অবমাননা।

হারটার দিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে হিমাংশুর রক্তে সাপের জ্বালা ধরল। একে একে মনে পড়তে লাগল কারা তাকে ঠকিয়েছে তার দালালির পাওনায়, কার কাছ থেকে এখনও পর্যন্ত নিজের পুরো টাকাটা সে আদায় করতে পারেনি। হিংস্রচিত্তে হিমাংশু ভাবতে লাগল। এবার তারও সময় এসেছে। তাকেও বাঁকা রাস্তাই ধরতে হবে। সোজা পথে চলবার চেষ্টা করে সবাই ফাঁকি দিয়েছে, সেও অন্য উপায় দেখবে।

বারো বছর কলকাতা শহরে দালালি করছে হিমাংশু ঘোষাল। কিছুই তার অজানা নয়।

গৌরীর গলার হারছড়া ঝিকমিক করে জ্বলছে, একরাশ আলোর কাঁটা এসে তার চোখকে বিদ্ধ করে লাগল। হিমাংশু উঠে পড়ল, নিবিয়ে দিলে ঘরের আলোটা।

আর একরাশ স্তব্ধ অপরিচ্ছন্ন অন্ধকারে হিমাংশুর উত্তপ্ত উত্তেজিত মস্তিষ্কের মধ্যে কতগুলো সরীসৃপ কিলবিল করে ঘুরে বেড়াতে লাগল। ওই গিলটির হারটা যেন এক মুহূর্তে তার মনের ভেতরে একটা সাপের ঝাঁপির ঢাকনা খুলে দিয়েছে।

কিন্তু সাপের ঝাঁপির ঢাকনা খুললে কী হয়, সবাই ওস্তাদ সাপুড়ে নয়। অন্তত হিমাংশু ঘোষাল তো নয়ই। সাপ খেলাতে গিয়ে প্রথম চোটে তার নিজের হাতেই ছোবল লাগল।

টাকা পেয়েছিল বই কী হিমাংশু—একশো টাকা। কিন্তু একশো টাকাতেই কি আর এক ছড়া হার হয়? আর হলেও সরু সুতোর মতো হারে গৌরীকে কি মানাতে পারে? হাতেও কিছু চাই, অন্তত চারগাছা চুড়ি।

তার উপরে দিনটা শনিবার ছিল। অভ্যাসের সঙ্গে সঙ্গে দুর্জয় দুরাশা হিমাংশুকে আকর্ষণ করতে লাগল। জাদুকরের হাতের ছোঁয়ায় যেখানে একশো টাকা কয়েক মিনিটে তিনশো টাকায় পরিণত হয়ে যায়—হিমাংশু সেই ঐন্দ্রজালিক জগতের দিকেই পা বাড়াল।

কিন্তু একশো টাকা তিনশো হল না। বনমানুষের হাড়ের উলটো ভেলকিতে পকেটে সাত আনা পয়সা নিয়ে রাত বারোটায় গলিতে পা দিলে হিমাংশু।

ওরা ওঁত পেতেই ছিল। তিন জন লোক, তাদের দুজন গুণ্ডা গোছের।

বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল হিমাংশুর ওপরে। নিশ্বাস একেবারে আটকে না দিয়ে যতখানি গলা টিপে ধরা যায়, সেই নিপুণ কৌশলে হিমাংশুকে তারা আয়ত্ত করল। তারপর আত্মীয়তার সম্ভাষণ জানিয়ে বললে, ফোর টুয়েন্টির আর জায়গা পাসনি? টাকা বার কর।

চোখের তারা কপালে তুলে হিমাংশু গোঁ-গোঁ করতে লাগল। ওই অবস্থাতেই হিমাংশুর গালে আর একজন প্রচন্ড একটা চড় বসিয়ে দিল।

জাল মালিক সাজিয়ে ভুয়ো ফ্ল্যাটের টাকা আগাম নেবে? আমার টাকাটা হজম করা এত সোজা?

যে গলা টিপে ধরেছিল সে গোটা কয়েক ঝাঁকুনি দিলে হিমাংশুকে–যেমন করে বেড়াল মুখের দুরকে ঝাঁকুনি দেয়। টাকা বের কর বলছি, খুন করে ফেলব নইলে।

তৃতীয় জন ততক্ষণে পকেট হাতড়ে যা-কিছু সব বের করে ফেলেছে। খুচরো পয়সা ক-টা, ময়লা রুমাল, পুরোনো নোটবই আর ক্লিপ-লাগানো পেনসিলটা ছুড়ে ফেলে দিয়েছে মাটিতে।

হিমাংশুর কুঁজের ওপর কিল বসিয়ে দিয়ে তিক্ত ক্রোধে সে গর্জন করে উঠল, কিচ্ছু নেই, সব গিলে খেয়েছে!

গলা টিপে বের করব। আর এক বার ঝাঁকুনি পড়ল।

হিমাংশু সমানে গোঁ-গোঁ করতে লাগল।

তার আগেই বেরিয়ে এসেছিল গৌরী। এসে দাঁড়িয়েছিল দরজার সামনে।

গলা থেকে এক টানে হারছড়া খুলে নিয়ে এগিয়ে এল এবারে।

আমার স্বামী কত টাকা ঠকিয়েছেন আপনাদের?

লোক তিনটে চমকে উঠল। ফিরে তাকাল একসঙ্গে। গ্যাসের মরা আলোয় এই মাঝরাতের নির্জন গলিতে এমন আশ্চর্য একটি রূপসি মেয়ের আবির্ভাব স্বপ্নের মতো মনে হল তাদের।

যে গলা চেপে ধরেছিল, তার হাতের মুঠো আলগা হয়ে গেল। ধুপ করে গলির স্যাঁতসেঁতে কালো মাটির উপরে বসে পড়ল হিমাংশু।

তিন জোড়া চোখ মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে রইল গৌরীর দিকে।

কত টাকা নিয়েছেন উনি?

যে চড় বসিয়েছিল, সে একটা ঢোঁক গিলে বললে, একশো, একশো টাকা।

হারসুদ্ধ হাতখানা তার দিকে বাড়িয়ে ধরে গৌরী বললে, এটা নিয়ে ওঁকে ছেড়ে দিন। এর দাম একশো টাকার বেশিই হবে।

গৌরীর দিকে চোখ রেখেই হারছড়া নিলে লোকটা। তারপর আচ্ছন্নের মতই তিন জন। নিঃশব্দে গলি পার হয়ে রাস্তার দিকে এগিয়ে চলে গেল। একটা কথাও বলতে পারল না। হয়তো তখনও সমস্ত জিনিসটা ওরা বিশ্বাস করতে পারছিল না। এমন অপূর্ব, এমন অবিশ্বাস্য স্বপ্নের জালটাকে ছিড়তে চাইছিল না কথার আঘাত দিয়ে।

হিমাংশুকে মাটি থেকে টেনে তুলল গৌরী, একরকম ধরেই নিয়ে এল বাড়ির মধ্যে। হিমাংশুর গোঙানি থেমে গেছে তখন, চাপা গলায় কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে।

হিমাংসুকে জোর করে বিছানায় শুইয়ে গৌরী তার মাথাটা টেনে নিলে কোলের মধ্যে।

ভয় নেই তোমার, ওরা চলে গেছে।

হিমাংশু অবরুদ্ধ গলায় বললে, আমার জন্যে তো তোর সব গেল গৌরী, গিলটির হারছড়াও গেল। কিন্তু ওরা তো অত কাঁচা নয়, একটু পরেই টের পাবে, তখন তো ফিরে আসবে আবার।

দাঁতে দাঁতে চেপে গৌরী আবার বললে, আসে তো দেখা যাবে। তোমার ভয় নেই, আমি আছি।

হিমাংশু ছেলেমানুষের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। পিঠের কুঁজটা ওঠা-পড়া করতে লাগল ঢেউয়ের মতো।

তুই আমাকে এত ভালোবাসিস গৌরী, আমি তোকে কিছুই দিতে পারলুম না, কিছুই না! গৌরীর দাঁতের চাপ ঠোঁটে এসে পড়ল, রক্ত গড়িয়ে পড়তে চাইল ঠোঁট দিয়ে। হারটা গিলটির নয়, কিন্তু যে-ভালোবাসার ভিতরে নিজেকে অসহায় শিশুর মতো ছেড়ে দিয়ে। হিমাংশু এমন করে কাঁদছে, তার গিলটিকরা নিষ্ঠুরতার কথা ভেবে গৌরীর চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে এল।

গুরুপ্রাপ্তি

বেলেঘাটা সি আই টির ওদিকটায় তৈরি হচ্ছে নতুননতুন বড় রাস্তা আর খুব সুন্দর সব পার্ক। এখনও লোকের ভিড় নেই ওদিকে, তাই সন্ধের পর কোনও কোনও পার্কে ভারি নিরিবিলিতে বসা যায়। যারা ওদিকটা দেখোনি, তারা ভাবতেও পারবে না, এখনও কলকাতার পার্কে কী চমৎকার নির্জনতা আছে কোথাও কোথাও।

তায় শীতের সন্ধ্যা। প্রকাণ্ড পার্কের এক ধারে একটা বেঞ্চিতে একা বসে আছি। এমন সময়

এমন সময় যেন ঝুপ করে আকাশ থেকে পড়ল লোকটা।

বেঁটে কালো-কোলো চেহারা, গায়ে হাফ শার্ট, পরনে সরু প্যান্ট। কোত্থেকে এসে আমার পাশে বসে পড়ল ঝুপ করে। ডাকল : দাদা!

ভীষণ চমকে গেলুম আমি। গুণ্ডা-টুণ্ডা নয় তো? কাছাকাছি লোকজন তো কেউই নেই, ফস করে একখানা ছোরা বার করলেই তো গেছি।

বললুম, কোনও মতলব আছে নাকি? কিন্তু আমার পকেটে আছে নগদ বেয়াল্লিশ পয়সা আর হাতে এই যে ঘড়িটা রয়েছে, এটা ঠাকুর্দার আমলের। দিনে পাঁচ বার দম দিতে হয়, রোজ কুড়ি মিনিট করে শ্লো হয়, আর মাসে একবার করে অয়েল করাতে হয়।

লোকটা জিভ কাটল।

–ছি ছি দাদা, কী বলছেন? আমি ও-লাইনের লোক নই। আমি যা রোজগার করি, ট্রামে বাসে, টুক করে না জানিয়ে পকেট থেকে তুলে নিই। আপনার পকেটই যদি মারব, তা হলে আর পাশে এসে বসে ভাব জমাতে চাইব কেন?

বললুম, তা ঠিক। কিন্তু আমার পকেটে হাত ঢোকালে যা পাবে সে তো বলেই দিয়েছি। নিট বেয়াল্লিশ পয়সা, কয়েকটা সুপুরির কুচি আর একখানা ময়লা রুমাল। তোমার মজুরি পোষাবে না।

–দাদা, ভীষণ মনোকষ্ট হয়েছে। ও-লাইন ছেড়ে দেব।

–কেন, লোকে ধরে খুব ঠেঙিয়েছে নাকি?

আহা, ধরা পড়লে পিটুনি তো খেতেই হয়। ওতে কিছু লাগে না দাদা, গায়ের চামড়া পুরু হয়ে গেছে। আর দু-এক মাস জেল? সে তো নস্যি। বিনি পয়সায় একটু চেঞ্জে যাওয়া আর কী! মন্দ লাগে না, কী বলেন?

বললুম, ঠিক বলতে পারছি না। ওরকম চেঞ্জে আমি কখনও যাইনি, যেতেও চাই না। কিন্তু তোমার এত ব্যথা হল কেন হঠাৎ!

–দাদা, জীবনে অনেক দুঃখু আছে, যা একেবারে হৃদয় ভেঙে দেয়। প্রাণ নিয়ে টানাটানি পড়ে। না, আর এসব নয়। আমার মামার একটা রেস্টুরেন্ট আছে আসানসোলে, সেখানে গিয়েই বরং চপ কাটলেট আর পরোটা ভাজব।

–ভাজতে জানো নাকি ওসব?

জানতে আর কতক্ষণ? চক্ষের নিমেষে কলম ব্যাগ লোপাট করতে পারি, আর কাটলেট ভাজতে পারব না?

–আলবাত পারবে। চক্ষের পলকে খেয়েও ফেলতে পারবে খান কয়েক, তোমার মামা টেরও পাবে না।

-ঠাট্টা করবেন না দাদা, মনে বড় ব্যথা। আজ কী হয়েছে জানেন?

পকেট থেকে একটা সুপুরির কুচি বের করে মুখে পুরে বললুম, বেশ–বলো।

বিকেল থেকে অসম্ভব কষ্টে আছি। ভাবছি কাকে প্রাণের কথা বলি। এই পার্কে এসে আপনাকে দেখলুম, বেশ সদাশয় ভদ্রলোক মনে হল। তাই এলুম আপনার কাছেই।

খুশি হয়ে বললাম, অতি উত্তম। ভনিতা রেখে এবারে বলে যাও।

–দাদা– বলেই ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল : পকেট মারতে গিয়ে ধরা পড়লুম, ঠ্যাঙানি খেলুম, থানায় নিয়ে গেল–সেসব সয়ে যায়। কিন্তু কেউ যদি পকেটমারকে আদর করে ডেকে নিয়ে গিয়ে লুচি-মাংস আর কোকাকোলা খাইয়ে দেয় তা হলে কেমন লাগে?

আমি বললুম, ভালোই লাগে। খারাপ লাগবে কেন?

–উহুঁ, সবটা শুনুন। আজ শেয়ালদার মোড়ে তাক করে দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ মোটাসোটা আধবুড়ো এক ভদ্রলোক এসে আমার কাঁধে হাত রাখলেন। কানে কানে চুপিচুপি বললেন, তোমার সঙ্গে দুটো গোপন কথা আছে।

আমি ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে বললুম, কে মশাই, আপনাকে তো আমি চিনি না। তিনি বললেন, আমি তোমায় চিনি। তুমি পকেট মেরে বেড়াও। শেয়ালদা থেকে পার্ক সাকাস আর শ্যামবাজারের চৌরাস্তা পর্যন্ত তোমার এরিয়া।

আমি আরও ঘাবড়ালুম : আপনি পুলিশ নাকি স্যার?

তিনি বললেন, পুলিশ। পুলিশ-টুলিশ আবার কী, ওসব আমি পছন্দ করি না। আমি একজন মানুষ, তুমিও একজন মানুষ। তাই মানুষ হিসেবে তোমাকে আমি কিছু বলতে চাই। চলো ওই সামনের হোটেলে।

বলে, আমার হাত ধরে প্রায় টেনেই সামনের একটা হোটেলে নিয়ে গেলেন। তারপর বেশ করে আমাকে লুচি-মাংস আর ঠাণ্ডা একটা কোকাকোলা খাইয়ে দিলেন।

আমি বললুম, এতে তোমার মনে ব্যথা পাওয়ার কী আছে? পরের পয়সায় খেলে তো মন। আরও ভালো হয়ে যায় হে।

–আহা, শুনুন না সবটা। তারপর ভদ্রলোক বললেন, এবার তোমাকে কাজের কথা বলি। আমি এই ছমাস ধরে তোমায় ওয়াচ করছি। কোথায় থাক, কোথায় যাও–কবার পকেট মারলে, কবার থানায় গেলে সব দেখেছি। তুমি টেরও পাওনি, আমি নিয়মিত ফলো করেছি তোমাকে।

আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম, কেন স্যার? আপনার কি কাজকর্ম নেই?

তিনি বললেন, না। আমি রিটায়ার করেছি, আমার ছেলেরা চাকরি-টাকরি করে, সংসার চলে যায়। তাই ভেবেছি, এখন কিছু পরোপকার করব। দু-একজনকে আমি উদ্ধার করব, অন্ধকার থেকে আলোয় আনব। একদিন তুমি যখন ধরা পড়ে বৌবাজারে পিটুনি খেতে-খেতে সড়াক করে একটা গলি দিয়ে পালালে–সেদিনই চিনে রেখেছি তোমায়। রোজ ওয়াচ করেছি। তারপর আজ ধরেছি এসে। তোমাকে আমি ত্রাণ করব, অন্ধকার থেকে আলোয় আনব। একজনকেও যদি সৎপথে আনতে পারি, তবে এই নশ্বর জীবন ধন্য। শোনো, আজ থেকে আমি তোমার গুরু।

গুরু। আমি চমকে বললুম, আমার গুরু তো স্যার কলাবাগানের গ্যাঁড়া মিঞা।

উঁহু, ওসব পকেটমারা গুরুতে চলবে না। আসল গুরু। গীতায় শ্রীভগবান কী বলেছেন, জানো? সদ্গুরু দরকার। তদ্বিদ্ধি প্রণিপাতেন, উঁহু, ওসব সংস্কৃত-টংস্কৃত তুমি বুঝবে না। মানে-গুরুর কাছে উপদেশ নেবে; সেবা করবে, জিজ্ঞেস করবে। তুমি গোরুর সেবা করতে পারো? বিচুলি কাটতে পারো? গোবর সাফ করতে পারো? তা হলে চলো আমার বাড়িতে। আমার তিনটে গোরু আছে, সেবা করবে।

বললুম, না স্যার, গোরুর সেবা আমার আসে না। আমাকে ছাড়ুন, আমি যাই।

কপাৎ করে আমার হাত চেপে ধরে বললেন, যাবে কী হে, এখুনি যেতে দিচ্ছে কে তোমায়? আর একটা কোকাকোলা খাবে নাকি?

দারুণ জোর ভদ্রলোকের গায়ে, বোধহয় মুগুর-টুগুর ভাঁজতেন, হাত ছাড়াতে পারলুম না। বললুম, না স্যার, আর কোকাকোলা নয়। খুব হয়েছে।

ভদ্রলোক বললেন, ঠিক আছে, খেয়ো না। কিন্তু আর আমাকে স্যার বলবে না, গুরুদেব বলবে। এই লুচি-মাংস খাইয়ে আজ থেকে তোমায় দীক্ষা দিলুম। তুমি আমার শিষ্য। তোমার বস্তির ঘর পিছে পিছে গিয়ে আমি চিনে রেখেছি, তুমি যদি আমার গোরুর সেবা না করতে চাও, কোরো না। আমি নিজেই কাল থেকে রোজ ভোর সাড়ে পাঁচটায় তোমার কাছে যাব, তোমাকে উপদেশ দেব দুঘণ্টা ধরে। তুমি আমার পা টিপবে–হাওয়া করবে, উপদেশ শুনবে, আর মানুষ হয়ে যাবে।

শুনে আমার দম আটকাবার জো। বললুম, কালকের কথা কাল। আজ ছেড়ে দিন স্যার, বাড়ি যাই। খিদে পেয়েছে।

খিদে পেয়েছে? এখুনি যে লুচি-মাংস খেলে? আরও খাবে? আচ্ছা–এই বয়—

তাড়াতাড়ি বললুম, না স্যার, ভুল হয়েছিল। খিদে পায়নি, পেট কামড়াচ্ছে।

–পেট কামড়াচ্ছে? ও কিছু না। সদুপদেশ শোনো, কোথায় মিলিয়ে যাবে ওসব। দীক্ষার দিনে কিছু উপদেশ নিতে হয়। তা হলে প্রথমেই বোঝা দরকার : তুমি কে? তুমি মানুষ। মানুষ কে? নারায়ণ। তা হলে সব মানুষই নারায়ণ। তুমি এক নারায়ণ হয়ে আর এক নারায়ণের পকেট মারবে? ভগবান কি নিজের পকেট নিজে কাটেন? শুনেছ কখনও? নিশ্চয় শোনননি। তা হলে জীবাত্মা আর পরমাত্মার তত্ত্ব তোমায় গোড়াতে বুঝতে হয়। জীবাত্মা কী? না–আমাদের শরীরে

বলব কী দাদা-বিকেল চারটে থেকে সাড়ে ছটা অবধি আমার কানের কাছে যেন কামান দাগতে লাগলেন আমার মাথা ঘুরতে লাগল, কান বোঁ বোঁ করতে লাগল, কেঁদে ফেললুম, বারবার বলতে চাইলুম, থামুন থামুন কে থামে। শেষকালে আমি ভিরমি গেলুম।

–ভিরমি গেলে?

আর কেউ হলে বেঘোরে মারা যেত দাদা, আমি পকেটমার বলে সামলে গেছি। উনিই মাথায় জল-টল দিয়ে চাঙ্গা করলেন আমায়। বললেন, ঠিক আছে, আজ এই পর্যন্তই। কিন্তু কাল ভোরেই আমি তোমার বাসায় যাচ্ছি। একটা কুশাসন রেডি রেখো, তাইতে বসে উপদেশ দেব। সাত দিনের মধ্যেই দেখবে তোমার আত্মার কী উন্নতি হচ্ছে।

কিন্তু সাত দিন। অত দেরি হবে না স্যার, কাল ভোরে যদি এসে পৌঁছে যান–আসবেনই-তা হলে সকাল সাতটার মধ্যেই আমার আত্মার উন্নতি কমপ্লিট প্রাণ দেহ ছেড়ে লাফিয়ে বেরিয়ে যাবে। একবার ভেবেছিলাম বাসা বদলাই, কিন্তু গুরুদেবের যে রোখ দেখলুম কলকাতার যেখানে যাব, সেখানেই খুঁজে বের করবেন, আর বলতে থাকবেন : জীবাত্মার পর পরমাত্মা-কিনা ব্ৰহ্ম! না স্যার, আর নয়–আজ রাত্রেই আমি চলে যাব আসানসোলে, কাল থেকে মামার দোকানে কাটলেটই ভাজব।

শুনে আমি বললাম, তা ভেবে দেখতে গেলে উনি তো ভালোই চান। এই সব পকেট-মারা চুরি-চামারি-এতে করে তোমার আত্মা তো

আত্মা পর্যন্ত বলার ওয়াস্তা। চোখ দুটো গোল করে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল তখুনি।

–অ্যাঁ দাদা, আপনিও। আর আপনাকে আমি সদাশয় ভেবেছিলাম।

বলেই টেনে দৌড়। প্রায় ত্রিশ মাইল স্পিডে। একলাফে পার্কের রেলিং পেরিয়ে হাওয়া।

তা মন্দ না–আমি ভাবলুম। এই রেটে যদি ছুটতে পারে, তা হলে ট্রেনের দরকার হবে আর, ঘণ্টা পাঁচেকের মধ্যেই পৌঁছে যাবে আসানসোলে।

গোখরো

চেঁচিয়ে উঠল বিভা। সজোরে ভূপতিকে ধাক্কা দিয়ে বললে, শুনছ, সাপ!

ওভারটাইম খেটে ভূপতি ফিরেছে রাত সাড়ে দশটায়। ঘুমে আর ক্লান্তিতে ধসে-পড়া বাড়ির মতো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শিথিল হয়ে আছে তার। তুলোয়-গিট-ধরা চ্যাপটা বালিশটা থেকে মাথা বেকায়দায় সরে গিয়ে এক-আধটু নাক ডাকছিল বটে, তবু অচেতনার একেবারে গভীর অতলে নিমগ্ন হয়ে ছিল সে। সাপ তো সাপ, এই সময়ে একটা রয়াল-বেঙ্গল তাকে মুখে করে তুলে নিয়ে গেলেও জানবার সম্ভাবনা ছিল না ভূপতির।

কিন্তু বিভা রয়াল-বেঙ্গলের চাইতেও মারাত্মক। তারপর গত বছর আট মাসের ছেলেটা মরে যাওয়ার পর থেকে অদ্ভুত হিংস্র হয়ে আছে সে। কিছুদিন আগেও মিষ্টি মিনমিনে বউ বিভাকে যারা দেখেছে, আজ আর তারা তাকে চিনতেও পারবে না। বাঁশির মতো গলা এখন কাঁসির মতো প্রখর এবং প্রবল, শান্ত ঠাণ্ডা মেজাজ এখন যেন বিস্ফোরক দিয়ে তৈরি। অতএব অতলান্ত বিরাম থেকে আস্তে আস্তে ভূপতি চেতনার সীমান্তে ভেসে উঠতে লাগল।

ঘরে যে সাপ ঢুকেছে, শুনছ না? মরেছ নাকি? বিভার গলা ঝনঝন করে বেজে উঠল। জোরে ধাক্কা দিতে গিয়ে হাতের নোয়াটার একটা মোলায়েম আঘাত লাগল ভূপতির পিঠে।

উ-হু-হুঁ! মরলে তো বেঁচে যেতাম! ভূপতি ধড়মড়িয়ে উঠে বসল, কই সাপ?

আমার পায়ের ওপর দিয়ে নেমে গেল। হিম ঠাণ্ডা! খাটের তলায় ঢুকেছে বোধ হয়।

গৌরবে খাট, আসলে মাঝে মাঝে তক্তার জোড় খুলে-যাওয়া, নড়লে-চড়লে শব্দমুখর পুরোনো একটি তক্তাপোশ। আর তলায় টিনের তোরঙ্গ, থালাবাটি আর খুঁটিনাটি গৃহস্থালির একটি বিশুদ্ধ সুন্দরবন। মশা, আরশোলা আর নেংটি ইঁদুরের মনোরম উপনিবেশ। তার ভেতর সাপ যদি আশ্রয় নিয়ে থাকে, তা হলে তাকে খুঁজে বের করা আস্তিকেরও অসাধ্য।

কিন্তু সমস্যাটা অন্যত্র।

হাত বাড়িয়ে পাশের ছোটো টিপয়ের ওপর রাখা লণ্ঠনটাকে উজলে দিলে ভূপতি। ম্লান। মুখে বললে, খাটের তলায়? কী হবে তাহলে?

বের করে পিটিয়ে মারো! নইলে অন্তত হুড়োতাড়া দাও, পালিয়ে যাক। খাটের নীচে সাপ নিয়ে বসে থাকব, বলো কী গো! মাঝরাত্তিরে যদি ফোঁস করে অলক্ষুণে কথা আর শেষ করতে পারল না বিভা। অ্যানিমিয়ায় হলদে শীর্ণ মুখে পাঁশুটে ঠোঁট দুটো কাঁপতে লাগল একটু একটু।

ভয়ে এতক্ষণে ভূপতিও কাঠ হয়ে গেছে। চোখভরা ঘুম ঊর্ধ্বশ্বাসে প্রায় আসানসোল পার। ফিসফিস করে বললে, কী সাপ?

আতঙ্কের মধ্যেও বিরক্তিতে বিভা খিচিয়ে উঠল, কী সাপ আমি দেখেছি নাকি? খরিশ টরিশ হবে বোধ হয়। শোল মাছের মতো মোটা, লম্বাও হবে হয়তো হাত চারেক।

হাত চারেক! খরিশ!

কই, কী করবে? অধৈর্য বিভার জিজ্ঞাসা।

নিরুপায় ভূপতির এইবার খেঁকিয়ে ওঠার পালা।

কী করব? খাট থেকে নামতে যাই আর তলা থেকে বসিয়ে দিক আমার পায়ে! তখন?

তাইতো, একথাটা বিভার মনে হয়নি। এবারে কান্না এল তার গলায়।

ওগো, তবে কী হবে? সারারাত এমন সাপ কোলে নিয়ে বসে থাকব?

উপায় তো কিছু দেখছি না। সকাল হোক, আপনিই বেরিয়ে যাবে ঘর থেকে। এটুকু সময় নয় বসে বসেই কাটানো যাক।

এটুকু সময়! সবে গোটা বারো এখন। অসুস্থ দুর্বল শরীর নিয়ে সারাদিন সংসার ঠেলেছে বিভা, ওভারটাইম খেটে প্রায় অ্যাম্বুলেন্সে চেপে ঘরে ফিরেছে ভূপতি। এই অবস্থায় দুজনে ঠায় বসে ঘণ্টা পাঁচেক জেগে থাকা খুব লোভনীয় প্রস্তাব নিশ্চয়!

বিভা আকুল হয়ে বললে, না না, সে হবে না। তলায় আছে, ওপরে উঠে আসতে কতক্ষণ? আমি পাগল হয়ে যাব। হাঁকডাক করো, লোকজন জড়ো হোক।

হাঁকডাক করলেই-বা শুনছে কে এখন? এই বাদলার এমন রাত্তিরে খুন হয়ে গেলেও কেউ সাড়া দেবে না। এ তো আর কলকাতা শহর নয়!

তা নয়। কলকাতা থেকে বারো মাইল দূরে শহরের উচ্ছিষ্ট অঞ্চল এটা। পাড়াগাঁয়ের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে আশপাশে গোটা কয়েক কারখানা তৈরি করে, কিন্তু নগরলক্ষীর দাক্ষিণ্যও ছড়িয়ে পড়েনি। দূরে দূরে বিজলি আলো যেন অনুকম্পার কৌতুকে চোখ মিটমিট করে। ভাঙাচুরো বাড়ি, মুখ-থুবড়ানো বস্তি, একটা পিচের রাস্তায় সম্প্রতি বোমার ক্রেটারের মতো অসংখ্য গর্ত। এদিক-ওদিকে দু-একটা পোড়ো ইটের পাঁজা থাকায় সাপের বংশবৃদ্ধির সুযোগ হয়েছে। এলোমেলো ঝোপ-জঙ্গল, ন্যাড়াটে গাছগুলোর প্রাণহীন পাতায় আধ ইঞ্চি পুরু কালির আস্তরণ।

ভূপতির দৌলতখানা এর মধ্যে আবার একটু একটেরে। রাস্তার ওধারে হঠাৎ-বড়োলোক ঘোষবাবুদের নতুন লালবাড়িটা ছাড়া নিকট প্রতিবেশী কেউ নেই আর। ঘোষবাবুদের ছোটোছেলে করুণাসিন্ধু অবশ্য মাঝে মাঝে করুণাবৃষ্টি করতে চায়। কিন্তু নানা কারণে সেটা পছন্দ করতে পারে না ভূপতি, তার স্ত্রী বিভা এবং বিভার ছোটোবোন প্রাইভেটে আইএ পরীক্ষার্থিনী আভা।

পড়শিকে হাঁকডাক করতে হলে অবশ্য করুণাসিন্ধুকেই ডাকতে হয়। কিন্তু… ডাকলে তারও কি এখন সাড়া মিলবে? খানিকক্ষণ কান পেতে শুনল ভূপতি। টিনের চালের ওপর বৃষ্টির ঝিমঝিমে আওয়াজ। বাইরের আমলকী গাছটার শিরশিরানি। পেছনের ডোবায় ব্যাঙের আনন্দধ্বনি।

ঘর ছেড়ে ওই মোটা মোটা কোলা ব্যাংগুলোর সন্ধানে কেন যায় না সাপটা? ভূপতির মনে কূট জিজ্ঞাসা উদিত হল। বিভা চেঁচিয়ে উঠল, কী আশ্চর্য, একেবারে পাথর হয়ে বসে রইলে যে! কিছু-একটা করো। মারা যাব নাকি সাপের কামড়ে?

কী হয়েছে দিদি? তখন থেকে সমানে চেঁচামেচি করছিস কেন? দরজার বাইরে আর গলা পাওয়া গেল। পাশের ঘর থেকে এতক্ষণে টের পেয়েছে আভা—উঠে এসেছে।

বিভা আর্তস্বরে বললে, ঘরে সাপ!

কী সাপ?

ভূপতিই জবাব দিলে। নিজের অজ্ঞাতেই এক পোঁচ রং চড়িয়ে ফেলল বিভার বর্ণনায়। মস্ত খরিশ। পাঁচ হাত লম্বা।

তাতে কী হয়েছে? দাঁড়াও আমি লাঠি নিয়ে আসছি।

দুপ দুপ করে আভার চলে যাওয়ার আওয়াজ শোনা গেল।

গরিব বোনের গলগ্রহ, দু-বেলা খেতেও পায় না পেটপুরে। তারপরে আছে একটা এম ই স্কুলের হাড়ভাঙা চাকরি। তবু আশ্চর্য সতেজ আর সুস্থ এই আঠারো-উনিশ বছরের মেয়েটা। আরও আশ্চর্য, আভা রূপবতী। এই বিবর্ণ বিষণ্ণ আনন্দ থেকে কেমন করে এমন প্রাণ আর স্বাস্থ্যকে আহরণ করে, কে বলবে

একটু পরেই দরজায় বাঁশ ঠোকার শব্দ। আভা অস্ত্র সংগ্রহ করে এসেছে।

দরজা খোল দিদি।

খাট থেকে নামতে পারছি না যে! বিভার হতাশ আর্তনাদ, তলাতেই কুন্ডলী পাকিয়ে আছে। নীচে পা দিলেই যদি ছোবল মারে?

বুঝেছি।

ওপাশ থেকে ধাক্কা দিতেই কপাটের জোড় একটু ফাঁক হয়ে গেল মাঝখানে। তার ভেতরে আঙুল চলিয়ে ভেতরের খিলটা খুলে ফেলল আভা। এবাড়ির ঘর-দরজা সবই তার নাড়িনক্ষত্রে জানা।

এবারে নড়েচড়ে উঠল ভূপতি।

এই আভা, কী হচ্ছে ওসব পাগলামি। মস্তবড় সাপ। বরং পাড়ার লোকজন ডেকে…

একটা সাপ মারবার জন্যে সাত পাড়া জড়ো করতে হবে! তুমি পুরুষ মানুষের নাম। ডোবালে ভূপতিদা।

দরজা ঠেলে সদর্পে আভা ঢুকল। গাছকোমর বাঁধা, হাতে একটা বাঁশের টুকরো।

আভা, মুখপুড়ি, সর্বনাশ করবি তুই! তারপরে বিভা ককিয়ে উঠল বেরো, বেরিয়ে যা ঘর থেকে।

কিন্তু সেসব শোনবার পাত্রী আভা নয়। ততক্ষণে সে উবু হয়ে খোঁচা দিয়েছে খাটের তলায়। বিভার একরাশ হাঁড়িকুড়ি ঝনঝনিয়ে উঠল, তারপরেই ফোঁস করে একটা হিংস্র আওয়াজ।

বিভা পৈশাচিক আর্তনাদ তুলল, ভূপতির গলা দিয়ে বেরুল খানিক অর্থহীন জান্তব ধ্বনি। তারপরেই তক্তাপোশের আরেক প্রান্তে খোলা জানালা বেয়ে আবির্ভূত হল একটি নিকষ কালো গোখরো সাপ। লণ্ঠনের আলোয় তার চক্রাঙ্কিত ভয়ংকর সুন্দর দেহটা ঝিকমিকিয়ে উঠল।

মাঝখানে চৌকির ব্যবধান, আর তার ওপরে বসে সমানে চিৎকার করছে স্বামী-স্ত্রী। আভা খানিকক্ষণ যেন হতভম্ব হয়ে রইল, তারপর চৌকির পাশ ঘুরে সাপের গায়ে আঘাত করার আগেই জানালার বাইরে সেটা নেমে গেল আগাছা-ভরা ছাইগাদার ভেতরে।

আভা ক্ষুব্ধ হয়ে বললে, পালাল। চেঁচিয়েই তোমরা সব মাটি করে দিলে। নইলে…

এতক্ষণে ধড়ে প্রাণ এসেছে বিভার। সশব্দে জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে বললে, খুব হয়েছে—থাম! মেয়ের কী দুঃসাহস বাবা! যে-সাপের চেহারা দেখে জোয়ান মানুষের বুক কাঁপে, একটা ভাঙা বাঁশ নিয়ে উনি তাই মারতে গেছেন। যদি ফসকে যেত তাহলে?

ফসকাত না।

নাঃ, ফসকাত না। মস্ত এক লাঠিয়াল এসেছেন উনি! যা, এখন ঘরে গিয়ে শো, খুব বাহাদুরি দেখানো হয়েছে।

ও, ভালো করলাম কিনা? নিজেরা তো ভয়ে হার্টফেল করার দাখিল হয়েছিলে! ক্ষুন্ন। বিষণ্ণ মুখে আভা বেরিয়ে গেল।

একটা বুকচাপা নিশ্বাস ছেড়ে ভূপতি এতক্ষণে বিড়ি ধরাতে পারল ধীরেসুস্থে।

উঃ, এক নম্বরের ডাকাত হয়েছে মেয়েটা!

ডাকাত বলে ডাকাত। ও দরকার হলে মানুষ মারতে পারে! বিভা সায় দিলে। তারপর পড়ল ভূপতিকে নিয়ে। তবু তো ও-ই এসে সাপটা বের করে দিলে ঘর থেকে। আর তুমি পুরুষ মানুষ হয়ে…

বা রে, আমি কী করব! ঘরের বাইরে থাকলে আমিও…

ঢের হয়েছে, চুপ করো! আর তোমাকে আমি বার বার বলিনি আস্তাকুঁড়ের ওদিককার জানালাটা খুলে রেখো না? খানাখন্দল ঝোপঝাড় আছে, চাই কী চোরে হাত বাড়িয়ে গলার হারটারও টেনে নিতে পারে। তা বাবুর গরম লাগে! এখন হল তো? বাদলা পেয়ে সাপ এসে ঢুকেছিল, যদি আমি ঠিক সময়মতো টের না পেতাম তাহলে…।

বিভার আত্মস্তুতি শেষ হল না। তার আগেই বাইরের বারান্দায় জুতোর শব্দ শোনা গেল, আর তার সঙ্গে এল ভরাট গলার ডাক, ভূপতিবাবু, ভূপতিবাবু।

বিভা ফিসফিসিয়ে বললে, করুণাসিন্ধু।

এস্ত উঠে পড়ল ভূপতি, কাপড়ের কষিটা বেঁধে নিয়ে সসম্রমে বাইরের দিকের দরজা খুলে দিলে।

আসুন আসুন। গায়ে বর্ষাতি ফেলা, হাতে বন্দুক, নাটকীয়ভাবে করুণাসিন্ধু প্রবেশ করলে। ঘোমটা টেনে মুখ ফিরিয়ে বসল বিভা। লোকটার চাউনি ভালো নয়, মদও খায় এক-আধটু, গায়ে পড়ে আলাপ করতে চায়। কিছুদিন থেকে কারণে-অকারণে বড়ো বেশি খোঁজ করছে সে। বিভার মনে একটা গভীর সন্দেহ জেগেছে, অত্যন্ত বিব্রত হয়ে উঠেছে ভূপতিও।

বন্দুকটাকে বাগিয়ে ধরে করুণাসিন্ধু বললে, সাপ সাপ বলে খুব চিৎকার শুনলাম। ভাবলাম বন্দুকটা হয়তো কাজে লাগতে পারে, তাই এলাম। তা কোথায় সাপ?

সে আর নেই, বাইরে পালিয়েছে। ভূপতি জবাব দিলে, তবু আপনি যে কষ্ট করে এসেছেন, সেজন্যে অনেক ধন্যবাদ! বিভার দিকে তাকিয়ে অস্বস্তিভরে যোগ করল, তা এলেন যখন, বসুন-না একটু। দাঁড়িয়ে আছেন কেন?

এরপরে ভদ্রতার খাতিরেই করুণাসিন্ধু বিদায় নেবে এমনই একটা আশা ছিল ভূপতির। কিন্তু আশাটা ব্যর্থ হল। একটা চেয়ার নিয়ে জমিয়ে বসল করুণাসিন্ধু।

এই সময়টা বড়ো খারাপ, সাবধানে থাকবেন। কোনো দরকার পড়লেই ডাকবেন আমাকে। একটা সোনার সিগারেট কেস বের করে সেটা এগিয়ে দিলে ভূপতির দিকে। হ্যাভ ওয়ান?

নাঃ, বিড়ি নইলে আমাদের নেশা জমে না। বিভার কুন্ডলী-পাকানো চেহারার দিকে আবার আড়চোখে তাকিয়ে শুকনো গলায় ভূপতি জবাব দিলে।

তা বটে! আপনারা আবার কড়ার ভক্ত। বিড়ির দীনতাকে ভদ্রতার প্রলেপ দিয়ে ঢেকে দিলে করুণাসিন্ধু, যার যা।

আজ্ঞে হ্যাঁ।

করুণাসিন্ধু সিগারেট ধরিয়ে এক বার কাশল, যা বলব ভাবছিলাম। ভালো কথা ভূপতিবাবু, আপনার শালি বোধ হয় আইএ পড়ছেন আজকাল?

বিভা এক বার নড়ে উঠল। সভয়ে মাথা নাড়ল ভূপতি।

করুণাসিন্ধু বলে চলল, ক-দিন থেকেই বলব ভাবছি। আমাদের কলকাতার অফিসে শ দেড়েক টাকা মাইনের একটা ভ্যাকেন্সি হচ্ছে শিগগিরই। যদি বলেন, ঢুকিয়ে দিই ওকে। আমার হাতেই সব।

বলেন কী? দেড়শো টাকা! এ যে এমএ পাসের মাইনে! ও তো শুধু ম্যাট্রিক পাস!

আমি বাবাকে বললে সবই হয়ে যাবে। করুণাসিন্ধু করুণায় বিগলিত হয়ে পড়ল, আপনারা আমাদের প্রতিবেশী, যদি কিছু সাহায্য করতে পারি, নিজেকেই ধন্য মনে করব। করুণাসিন্ধু এবার ঠোঁট চাটল, কাল যদি আমার সঙ্গে এক বার ওকে কলকাতায় পাঠিয়ে

দেন…

বাইরে ছাইগাদার ওপরে ধপ ধপ করে আওয়াজ হল গোটা দুই। ভূপতি চমকে গেল, ও কী! কে ওখানে?

আমি আভা ভূপতিদা!

করুণাসিন্ধুর অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে বিভা আর্তনাদ ছাড়ল, হতভাগী, এই অন্ধকারে ওখানে গেছিস কেন? চলে আয় শিগগির, চলে আয়।

আসছি। আবার ধপাধপ করে গোটা কয়েক আওয়াজ!

সর্বনাশ করবে, ও আমার সর্বনাশ করবে! বিভা কেঁদে ফেলল।

ডাকাতটা ওখানে এই অন্ধকারে সাপ খুঁজতে গেছে!

অ্যাঁ! সাপ খুঁজতে গেছেন? করুণাসিন্ধু লাফিয়ে উঠল, অসম সাহস ওঁর! বন্দুকটা তুলে নিয়ে বললে, যদি আমি ওঁকে সাহায্য করতে পারি।

আভা–আভা। ভূপতি হুংকার ছাড়ল!

আসছি ভূপতিদা।

করুণাসিন্ধু আভার উদ্দেশেই বেরিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু দরজার কাছে গিয়েই আতঙ্কে পিছু হটে এল। এক হাতে টর্চ আর এক হাতে লাঠির মাথায় কালো কুচকুচে গোখরোটার মৃতদেহ ঝুলিয়ে নিয়ে ঘরে ঢুকেছে আভা। সাপটার ঝুলে-পড়া থ্যাঁতলানো মুখ থেকে সুতোর মতো আঠালো লালা গলে পড়ছে।

সুন্দর গালে কাদার ছিটে, ভিজে চুল বেয়ে জলের ফোঁটা নামছে, একটা অদ্ভুত বন্য আলোয় জ্বলছে আভার চোখ। তীক্ষ্ণ হাসি হেসে বললে, কেমন দিদি, তুই যে বলেছিলি সাপটা আমি মারতে পারব না। পাথরের মতো দৃষ্টি মেলে স্তম্ভিত ভূপতি আর বিভা যেখানে ছিল, ঠিক সেইখানেই বসে রইল। আর আভার চোখের বন্য আলোয় কী ছিল কে জানে—হঠাৎ পাংশু হয়ে নিবে গেল করুণাসিন্ধুর মুখ! বিনা সম্ভাষণেই সে দ্রুতবেগে ঘরের বাইরে ছিটকে পড়ল, ক্ষিপ্রগতিতে নেমে যেতে যেতে ডাক দিয়ে বললে, চলি ভূপতিবাবু, আপনারা তাহলে বিশ্রাম করুন।

 ঘণ্টাদার কাবলুকাকা

ঘণ্টাদা বললে, ভীষণ প্যাঁচে পড়ে গেছি রে, প্যালা। চোখে সর্ষের ফুল দেখছি আমি।

কী হল তোমার? সর্ষের চাষ করছ নাকি আজকাল? আমি উৎসাহিত হয়ে বললুম, তোমার অসাধ্য কাজ নেই। তুমি পাটের দালালি করেছ, ঝোলা গুড়ের ব্যবসা করছ, সিনেমার জনতার দৃশ্যে অভিনয় করেছ বাজি রেখে কাঁচা ডিম খেতে গিয়ে বমি করেছ, পোড়ো বাড়িতে ভূত দেখতে গিয়ে ভিরমি খেয়েছ। শেষকালে কি সর্ষের চাষ আরম্ভ করে দিলে?

–থাম, মেলা বকিসনি! নাকটাকে পান্তুয়ার মতো করে ঘণ্টাদা বললে, আমি মরছি নিজের জ্বালায়– উনি ইদিকে এলেন ইয়ার্কি দিতে। হয়েছে কী, জানিস? আজই খবর পেলুম, বিকেলের গাড়িতে কাশীর কালুকাকা আসছেন।

–সে তো খুবই ভালো কথা! আমি আরও উৎসাহ বোধ করলুম; কাশী থেকে যখন আসছেন, তখন নিশ্চয়ই কিছু চমচম আর গজা নিয়ে আসছেন। আমিও খাব, বিকেলে।

-সে গুড়ে বালি, বুঝলি, সে জ্যাগারিতে স্রেফ স্যাণ্ড।–ঘণ্টাদা কথাটার ইংরেজী অনুবাদ করে নিলে : কাশী থেকে গজা-চমচম নিশ্চয়ই আনবেন, কিন্তু সে আর হাওড়া পর্যন্ত পৌঁছবে না। মোগলসরাইয়ের আগেই কাবলুকাকা ওগুলোকে সাবাড় করে ফেলবেন। …গলা নামিয়ে ঘন্টাদা বললে, কাবলুকাকা ভীষণ খেতে ভালোবাসেন, জানিস? একটা আস্ত পাঁঠা খেয়ে নেন একেবারে।

ল্যাজ-ট্যাজ, শিং-টিং সুব্ধ?–আমি জানতে চাইলুম।

–চুপ কর বাজে বকিসনি।…আমাকে একটা ধমক দিয়ে ঘণ্টাদা বললে, তা কথাটা যে একেবারে মন্দ বলেছিস তা-ও নয়। কাবলুকাকা যা খাদক- পাঁঠার শিং তো দূরে থাক, বেঁধে দিলে গলার দড়িগাছটাও খান বোধ হয়। বিশ্বখাদক বুঝলি, প্যালা– বিশ্বখাদক। তিন দিন থাকবেন। আর এই তিন দিনের মধ্যে আমাকেও খেয়ে যাবেন এই তোকে বলে দিলাম।

সত্যি বলতে কি, কথাটা বিশ্বাস হল না। ঘণ্টাদার মতো অখাদ্য জীব আমি দেখিনি। কালোবাজার করে বেশ টাকা জমিয়েছে, কিন্তু একটা পয়সা খরচ করবে না। পাড়ার ছেলেরা একটা ভালো কাজে চাঁদা চাইতে গেলে লাঠি নিয়ে তেড়ে আসে। বাজারে গিয়ে মরা মাছ কুড়িয়ে আনে, সস্তায় কেনে পচা আলু। কাবলুকাকা যতো দিকপাল খাইয়েই হোক, ঘণ্টাদাকে খাওয়া তাঁর পক্ষেও সম্ভব নয়।

ঘণ্টাদা বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

যাই দেখি, বাজারে। সের দুই মাংস, সের তিনেক মাছ আর সের খানেক ঘি কিনেআনিগে। এই তিন দিনে যদি আমার দুশো টাকা খসিয়ে না যান, তা হলে আমার নামে কুকুর পুষিস, প্যালা।

–তোমার নামে কুকুর পুষলে লজ্জায় সে বেচারা সুইসাইড করবে– আমি মনে-মনে বললুম। তারপর জিজ্ঞাসা করলুম, তা, তোমারই বা হল কী, ঘণ্টা? তুমিই বা খামকা কাবলুকাকার জন্যে এত অপব্যয় করছ কেন?

আরে, করছি কি সাধে? কাবলুকাকার ছেলেপুলে নেই– বিষয়-সম্পত্তিও অঢেল। যদি উইল-টুইল করবার সময়!

আমি মাথা নাড়লুম : বিলক্ষণ!

তবে, এই তিন দিনেই আমাকে আদ্ধেক মেরে রেখে যাবেন। এমন করে খেয়ে যাবেন যে, আমার হার্টফেল হওয়াও অসম্ভব নয়। তখন কাবলুকাকার সম্পত্তি পেলেই কি আর না পেলেই বা কি। রাস্তায় একটা কাকের পালক পড়েছিল, সেটা তুলে নিয়ে কান চুলকোতে-চুলকোতে ঘণ্টাদা বললে, তা আমিও একটা প্যাঁচ কষেছি, বুঝলি? আমার বাড়িতে একখানা ঘোরতর ফিতের খাটিয়া আছে। তাতে অন্তত দুকোটি ছারপোকার বাস। তাইতেই কাবলুকাকাকে শুতে দেব। তারপর

–তারপর যদি চটে গিয়ে উইল-টুইল বদলে ফেলে তখন?

-না না, কাশীর লোক, অত ঘোরপ্যাঁচ বুঝবেন না। খেতে পেলেই খুশি। এদিকে আমি ভুরি-ভোজের ব্যবস্থা করব। খেয়ে কাবুলকাকা মশগুল হয়ে যাবেন, আবার ছারপোকার কামড়ে জেরবার হয়ে পালাতেও পথ পাবেন না–অ্যাঁ?

–তা বটে–তা বটে! ভেবেচিন্তে আমি মাথা নাড়লুম।

সেই কাকের পালকটা দিয়ে কান চুলকোতে-চুলকোতে ঘণ্টাদা বাজারে চলে গেল।

আমার দুর্দান্ত কৌতূহল হল। সেদিন সন্ধেবেলাতেই আমি সেই রোমাঞ্চকর কাবলুকাকাকে দেখতে পেলুম।

দোরগোড়ায় আলুর দমের মতো মুখ করে ঘণ্টাদা দাঁড়িয়েছিল। ঘরের ভেতরে আঙুল বাড়িয়ে বললে, ওই দ্যাখ। মানুষ নয় প্যালা,–মানুষ নয়। সাক্ষাৎ বক-রাক্ষস।

বক রাক্ষসটাকে দেখবার জন্যে আমি ঘরে পা দিলুম। একটা টেবিলের ওপরে প্রকাণ্ড একটা বারকোশ দেখা গেল, আর তার ওপর দেখা গেল শখানেক লুচি। আর কিছু না।

হঠাৎ লুচির স্তূপের ওপাশ থেকে প্রকাণ্ড একখানা হাত বেরিয়ে এসে খান-দশেক আন্দাজ একসঙ্গে তুলে নিলে। খচ খচ করে লুচি চিবোবার আওয়াজ পাওয়া গেল… কিন্তু তবু কাউকে দেখতে পাচ্ছি না; ভৌতিক কাণ্ড নাকি?

আবার সেই প্রকাণ্ড হাতখানার আর্বিভাব এবং খান-পনেরো লুচির তিরোধান। তারপর লুচির পাহাড়টা একটু নীচের দিকে নামতে কাবলুকাকাকে দেখা গেল।

বাপ…কী চেহারা! ওজন বোধহয় মন চারেক হবে, মুখখানা একেবারে ঢাকাই জালা। চেহারা দেখে মনে হল, একটা আস্ত পাঁঠা তো তুচ্ছ ব্যাপার…নগদ একটা ঘোড়া খাওয়াও অসম্ভব নয়, কাবলুকাকার পক্ষে।

কিন্তু চেহারা অমন জগঝম্প হলে কী হয়…লোকটির মেজাজ ভালো। আমাকে দেখে একগাল হাসলেন।

–তুমি আবার কে হে? কোথায় থাকো?

আমার হাত-পা পেটের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিল। কাবলুকাকার হাসি দেখে কেমন সাহস এল গায়ে। বললুম, আমার নাম প্যালারাম বাঁড়ুজ্যে, আমি পটলডাঙায় থাকি।

ততক্ষণে ছোলার ডালের মতো মুখ করে ঘণ্টাদা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। দেখছে লুচির পরমাগতি। ওর একটা বুক-ভাঙা দীর্ঘশ্বাসও আমি শুনতে পেলুম।

কাবলুকাকা থাবা দিয়ে আধ সেরটাক কুমড়োর ছক্কা মুখে তুললেন। ঘণ্টাদার মুখটাও কুঁচকে-টুচকে প্রায় কুমড়োর ছক্কার মতো হয়ে গেল।

কাবলুকাকা ভরা-মুখে বললেন, তুমি এত রোগা কেন?

আজ্ঞে পালাজ্বরে ভুগি, আর বাসক পাতার রস খাই

–আরে দূর-দূর–পালাজ্বর! জুত মতো খেতে জানলে ও পালাজ্বর ল্যাজ তুলে পালাবে। শোনো, এক কাজ করবে। সকালে উঠে চা খাও? খেয়ো না আর। ওতে কোনও ফুড-ভ্যালু নেই– অনর্থক শরীর নষ্ট। তার চেয়ে ভোরে উঠেই একপো খাঁটি গাওয়া ঘি চোঁ-চোঁ করে খেয়ে নেবে।

এক পোয়া খাঁটি গাওয়া ঘি!– আমার চোখ কপালে চড়ল।

–এ আর বেশি কী? আমি তো আধসের করে খাই। ওরে ঘণ্টা, আমার ঘিয়ের ব্যবস্থা করে রাখিস কাল। মনে থাকবে?

ঘণ্টাদা মাথা নাড়ল। মনে থাকবে মানে? সারারাত বেচারার ঘুম হলে হয়।

–আর শোনন, দুবেলা দুটো করে মুরগির রোস্ট- সেরটাক দাদাখানি চালের ভাত আর দুসের করে দুধ খাবে। তুমি ছেলেমানুষ তাই লঘু পথ্য দিলুম। আমি ছটা করে মুরগি খাই, তিন সের চালের ভাত লাগে, আর ছসের করে দুধ খেয়ে থাকি। ঘণ্টা, মনে থাকবে তো?

ঘণ্টাদার হাত-পা কাঁপছিল। গলা দিয়ে কেমন একটা আওয়াজ বেরুল তার। ওর হয়ে আমিই জবাব দিলুম : নিশ্চয় থাকবে। হাজার বার থাকবে। ঘণ্টাদার মেমারি খুব ভালো।

ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে-আসতে ঘণ্টাদা ধরা গলায় আমায় বললে–কী রকম বুঝছিস, প্যালা?

-সঙিন।

-খাওয়ার যা লিস্টি দিচ্ছে, জগুবাবুর বাজারে কুলুবে না– গড়িয়াহাট মার্কেটে যেতে হবে। এই তিন দিনেই আমি ফতুর হব, প্যালা- আমায় রাস্তায় দাঁড়াতে হবে।

ইচ্ছে হল বলি, কালোবাজারি করে কয়েক লাখ টাকা তুমি জমিয়েছ, কাবলুকাকাই হচ্ছে তোমার আসল দাওয়াই। কিন্তু অনর্থক ঝগড়া করে কী হবে?

ঘণ্টাদা মুড়িঘণ্টর মতো মুখ করে বললে, তবে সেই দুর্ধর্ষ খাটখানা আছে, আর দুর্ধর্ষ ছারপোকা আছে। এখন ওরা যদি ম্যানেজ করতে পারে–তবেই।

–হ্যাঁ, আপাতত ওরাই তোমার ভরসা। বলে ঘণ্টাদার কাছ থেকে আমি বিদায় নিলুম।

সকালে উঠে সবে লজিকের বই খুলে বসেছি। কী যে মুস্কিল– ওই বারবারা সিলারেন্ট আমার কিছুতেই মনে থাকে না।

হঠাৎ দ্বারপ্রান্তে– ঘণ্টাদা।

ঘণ্টাদার মুখখানা তখন ডিমের কারির মতো হয়ে গেছে। কেঁদে ঘণ্টাদা বললে– প্যালা, সর্বনাশ হয়েছে। এবার আমার ফাঁসি হবে।

বলল কী? খাওয়ার বহর দেখে রেগেমেগে তুমি কাবলুকাকাকে খুন করে ফেলেছ নাকি?

–জানিস তো, আমি একটা আরশোলাও মারতে পারিনে।

তা হলে খামকা তোমার ফাঁসি হবে কেন?

বরাত প্যালা– স্রেফ বরাত। কাবলুকাকা মারা গেছেন।

–অ্যাঁ।

তা ছাড়া কী আর? ওই দু কোটি ছারপোকা, জানিস তো? ওদের হাতে কারও রক্ষা আছে? নির্ঘাত ওদের কামড়ে কাবলুকাকা পটল তুলে বসেছেন। এই দ্যাখ না– সকাল থেকে দুঘণ্টা দরজায় ধাক্কা দিয়েছি, জানলার ফাঁক দিয়ে পিচকিরি করে বরফ জল দিয়েছি। গায়ে, তবু নট নড়নচড়ন, কিসসু না।

–তবে পুলিশে খবর দাও!

–পুলিশ! ওরে বাবা! এমনিতেই ওরা দুবার আমার বাড়ি সার্চ করেছে, আমি নাকি চায়ের সঙ্গে চামড়ার কুঁচো মেশাই। এখনও ধরতে কিছু পারেনি বটে, কিন্তু নেকনজরটা তো আছে! নির্ঘাত বলবে, চক্রান্ত করে এই ভয়ঙ্কর খাটিয়ায় শুইয়ে আমি কাবলুকাকাকে খুন করিয়েছি। তখন ফাঁসি না হোক– বিশ বছর জেল আমার ঠেকায় কে?

তোমাকে জেলে রাখলে দুনিয়ার অনেক উপকার হবে আমি মনে-মনে বললুম। মুখে সাহস দিয়ে বললুম– চলো দেখি, যাই একবার। বুঝে আসি ব্যাপারটা।

যেতে যে আমার পা সরছে না, প্যালা।

–তবু যেতেই হবে। আমি কঠোর হয়ে বললুম- সেই ভয়াবহ খাটে শোয়াবার সময় মনে ছিল না? চলো বলছি– আমি প্রায় জোর করে ঘণ্টাদাকে টেনে নিয়ে গেলুম।

কিন্তু বসবার ঘরে ঢুকে আমরা ভূত দেখলুম।

ভূত নয়– সশরীরে কাবলুকাকা বসে। সামনে একটা কাচের গ্লাস– তাতে আধ সের আন্দাজ গাওয়া ঘি। একটু একটু করে পরম আরামে চুমুক দিচ্ছেন কাবলুকাকা।

আমাদের দেখেই তিনি হাসলেন। বললেন, এই যে ঘণ্টা–কোথায় গিয়েছিলি? আঃ কাল রাতে যা ঘুমিয়েছি– সুপার্ব। তাই উঠতে আজ একটু দেরিই হয়ে গেল।

ঘণ্টাদা একবার হাঁ করল। কিন্তু মুখ দিয়ে কোনও আওয়াজ বেরুল না তার।

কাবলুকাকা ঘিয়ের গেলাসে চুমুক দিয়ে বললেন– চর্বি একটু বেশি হয়েছে শরীরে রাত্তিরে তাই ভালো ঘুম হয় না। কেমন গা জ্বালা করে। কিন্তু কাল সারারাত কারা যেন মোলায়েমভাবে গা চুলকে দিয়েছে। সে কী আরাম। এক বছরের মধ্যেও আমার এমন নিটোল ঘুম হয়নি। তাই উঠতে একটু দেরিই হয়ে গেল আজ। আমি ভাবছি কী জানিস ঘণ্টা– তিন দিন কেন, মাসখানেকই থেকে যাব তোর এখানে।

হঠাৎ গোঁ-গোঁ করে আওয়াজ। ঘণ্টাদা পপাত ধরণীতলে।

–কী হল? ঘণ্টার আবার মৃগী আছে নাকি?

আমি বললুম- মৃগী নয়। আপনি একমাস ওর কাছে থাকবেন জেনে আনন্দে মূর্ছা গেছে।

 ঘাসবন

হাতের লম্বা লাঠিটার ওপর ভর দিয়ে শরীরটাকে ঝুঁকিয়ে দিলে সামনের দিকে; তারপর সেই অবস্থাতেই একটা লাফ দিলে শ্যামলাল। সঙ্গে সঙ্গে লাঠির মাথা আর শরীরটার একটা নির্ভুল সমকোণ রচনা করে শূন্যে উড়ন্ত একটা পাখির মতো ছোটো নালাটা সে পার হয়ে গেল। লাঠির নীচেটা গিয়ে পড়েছিল জলের মধ্যে, সেটাকে তুলে নিতে বেশি সময় লাগল না।

কোমর সমান নরম ঘাসের ভেতর দাঁড়িয়ে সে উৎকর্ণভাবে তাকাতে লাগল চারদিকে। হাতের একটা মুঠোকে চোঙার মতো গোল করে ধরলে চোখের সামনে, যেন ওতে আরও বেশি করে দেখতে পাবে। কিন্তু দিগদিগন্তজোড়া ঘন শ্যামল ঘাসবনের মধ্যে কোথাও দেখা গেল না আকাশের কোণে আঁকা গাঢ় নীলরঙা তিন পাহাড়ের রেখার মতো একটা পিঠের আভাস কিংবা শিংওয়ালা অতিকায় মাথাটা।

একটু দূরেই সবুজ তৃণপ্রান্তরের মাঝখানে আকস্মিক ব্যতিক্রমের মতো খানিকটা রাঙামাটির জাঙ্গাল বিকীর্ণ হয়ে আছে। হঠাৎ দেখলে মনে হয় কেউ যেন মস্ত উঁচু করে একটা রাস্তা তৈরি করতে চেয়েছিল এখানে, কিন্তু যে-কারণেই হোক তার ইচ্ছাটা সম্পূর্ণ হয়নি। প্রাকৃতিক হোক আর ভুলে-যাওয়া কোনো মানুষের হাতের কাজেই হোক, এখন ওর নাম ভূতের জাঙ্গাল। কঠিন লালমাটি, ছোটো-বড়ো অসংখ্য কাঁকরে একেবারে বোঝাই। কেউ যেন আগুনে পুড়িয়ে মাটিটাকে লোহার মতো শক্ত আর নীরস করে দিয়েছে; তাই গোটা দুই শিমুল ছাড়া আর কিছু গাছগাছালি গজাতে পারেনি, হাঁ হাঁ করছে ন্যাড়া জাঙ্গাল। শুধু সর্বাঙ্গে জলার হিংস্রতম সাপ আলাদ গোখুরের ফোকর নিয়ে পড়ে আছে অতিকায় একটা কঙ্কালের মতো, আর তারই চারপাশে সবুজের ঐশ্বর্য ঢেউয়ে ঢেউয়ে দোলা খাচ্ছে।

কপাল কুঁচকে এক বার জাঙ্গালটার দিকে তাকাল শ্যামলাল। উঠবে নাকি ওর ওপরে? সুবিধে হয় তাহলে, চারদিকের অনেকটা ভালো করে দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু উঠতেও ভরসা হয় না। সবাই জানে জাঙ্গালটা গোখরো সাপের আস্তানা, তাদের ভয়ে একটা শেয়াল পর্যন্ত এগোয় না জাঙ্গালের দিকে।

শেয়াল নাহয় এগোয় না, কিন্তু আপাতত যা দেখা যাচ্ছে, না-এগিয়ে উপায় নেই শ্যামলালের। চোখ গিয়ে পড়ল মাঠের ওপারে প্রান্তরেখায়। সেখানে ম্লান হয়ে আসছে সূর্য। ছাড়া ছাড়া মেঘে রক্তাভ দীপ্তি। আর বেশি দেরি নেই। দেখতে দেখতে ধাঁ করে নেমে যাবে বেলাটা। তারপর মাঠের ওপরে ঘনাবে আলেয়া-জ্বলা কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার। সে-অন্ধকারে এই মাঠকে ভয় করতে থাকবে শ্যামলালের, নিজের লাঠির ওপরেও তার বিশ্বাস থাকবে না।

তবে আপাতত আকাশে সূর্য জেগে আছে এবং আস্থা আছে লাঠিখানার ওপরে। এক বার চোখাচোখি হয়ে গেলে যত জাঁদরেল আলাদ গোখুরই হোক, তাকে আর ট্যাঁ-ফোঁ করতে হবে না। অলক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্ভাবনা কল্পনা করতেই কাঁধের পেশিগুলো ফুলে উঠল শ্যামলালের। নীচের ঠোঁটটাকে এক বার সে শক্ত করে চেপে ধরলে দাঁত দিয়ে, তারপর নির্ভীক পায়ে এগিয়ে চলল জাঙ্গালের উদ্দেশে। ওর ওপর থেকে ভালো করে চারদিকটা এক বার দেখে নেওয়া দরকার।

সন্তর্পণে মাটির দিকে চোখ রেখে শ্যামলাল উঠল জাঙ্গালে। কাঁকরগাঁথা শক্ত মাটির গা দিয়ে বর্ষার জল গড়িয়ে গড়িয়ে নামে, তাই তার সর্বাঙ্গে কতকগুলো খাঁজের মতো সৃষ্টি হয়েছে। সেই খাঁজের ভেতরে লাঠি ফেলে ফেলে শ্যামলাল উঠতে লাগল।

একটা শিমুল গাছের নীচে এসে সে দাঁড়াল। তলায় মসৃণ তকতকে মাটি, যেন যত্ন করে নিকিয়ে রাখা। দুটি-চারটে শিমুলের ঝরাপাতা ছাড়া আর কিছুই নেই। এখানে আর যা-ই হোক, ফস করে সাপে এসে ছোবল মারতে পারবে না।

চারদিকে তাকাতে একটা আশ্চর্য আর অপরূপ পৃথিবী ধরা দিল শ্যামলালের চোখে। সবুজ আর সবুজ—ধান নয়, ঘাস। বর্ষার জল নেমে গেছে জলা থেকে, নরম মাটির ওপরে স্তবকে স্তবকে গুচ্ছে গুচ্ছে ঘন সবুজ ঘাস উঠেছে, মাটিকে ঢেকে দিয়েছে। যতদূর চোখ যায়, এর আর শেষ নেই, ছেদ নেই। কোথাও ঢেউ-খেলানো জমি নেমে গেছে, কোথাও আস্তে আস্তে উঠে গেছে পাহাড়ের মতো অনেকখানি, মাথার ওপর হাতছানি দিচ্ছে তালের গাছ। সবুজ আর শান্ত, বিকেলের পড়ন্ত বেলা নিবিড় হয়ে আসছে, পাখপাখালির শব্দ নেই, শুধু বাতাসে একটা শিরশির আর সোঁ সোঁ স্বনন বাজছে।

ওরই মাঝখানে সাদা সাপের মতো আঁকাবাঁকা একটা রেখা, ডুবে আসা রোদে এখন সোনার মতো ঝলমলে। এই নদীটা কাঞ্চন। ওর গায়ে খান কয়েক চালাঘরের আভাস, একটা লম্বা বাঁশের ওপর মহাবীরজির লালপতাকা। অস্ফুটস্বরে শ্যামলাল বললে, শালা!

কিন্তু মহিষটার কোনো চিহ্নই তো দেখা যাচ্ছে না।

হঠাৎ গলা ফুলিয়ে একটা বিশ্রী আওয়াজ তুলল শ্যামলাল। তার কর্কশ আওয়াজটা চারপাশের শান্ত স্তব্ধতাকে বিদীর্ণ করে দিলে। বাতাসের তরঙ্গে তরঙ্গে ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগল লহরে লহরে। শিমুল গাছের মাথার ওপর থেকে ভয়ার্ত দুটো বক ডানা মেলে দিলে আকাশে।

শ্যামলাল ডাকলে, আঃ আঃ আঃ–আঃ ইঃ–।

এক বার, দু-বার, তিন বার। কিন্তু দিগন্তবিস্তার ঘাসের বনে কোনোখানে এতটুকু সাড়া পাওয়া গেল না। শুনতে পাওয়া গেল না পরিচিত গম্ভীর গলার মৃদু প্রত্যুত্তর। এমন তো হয় না। শ্যামলালের মন আশঙ্কায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠল। বাথানের সবচাইতে দুধেল মহিষ, খোয়া গেলে সর্বনাশ। কিন্তু গেল কোথায়?

শালা। মহিষটার বাপ-মা তুলে একটা অশ্লীল গাল দিলে শ্যামলাল। তারপরে আবার তারস্বরে ডাকলে, আঃ আঃ আঃ…

এবার ডাকটা শেষ করবার আগেই শ্যামলাল চমকে থেমে গেল। সাড়া পেয়ে গেছে; কিন্তু মহিষটার নয়। একটা অপ্রত্যাশিত শব্দ-কাছাকাছি কোথায় কে যেন খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়ল।

পাথরের মতো শক্ত জোয়ান, বাইশ বছরের নির্ভীক গোঁয়ার মানুষটার বুকের ভেতর ধক করে চমক লাগল। এই নির্জন মাঠের ভেতরে এমন করে কে হাসল? সন্ধ্যা হয়ে আসছে, শ্যামলাল দাঁড়িয়ে আছে ভূতের জাঙ্গালের ওপরে। চারদিকে জনপ্রাণীর সাড়া নেই, এমন সময় কে হাসতে পারে?

সারা শরীরটা নিজের অজ্ঞাতেই শিউরে উঠল এক বার। শক্ত মুঠোয় শ্যামলাল আঁকড়ে ধরলে লাঠিগাছকে। ভূত হোক, অপদেবতা হোক, বিনা যুদ্ধে কাউকে আমল দেওয়া হবে না। দু-চার ঘা লাঠি আগে হাঁকড়াতে হবে। তারপরে যা হওয়ার হোক।

আবার হাসির শব্দ শোনা গেল, খিলখিল করে মিষ্টি হাসি। একটু আগেই যে কর্কশ শব্দ তুলে সমস্ত মাঠখানাকে ভরিয়ে তুলেছিল শ্যামলাল, এরসঙ্গে তার কোনো মিল নেই। এ যেন শান্ত স্তব্ধ পৃথিবীকে গানে আর সুরে উল্লসিত করে দিলে। শ্যামলালের মন বললে, ভয় পাওয়ানোর হাসি এ নয়, খুশি করে তোলার; এমন হাসি আর যে-ই হাসুক, ভূতে হাসতে পারে না।

অনুমান নির্ভুল। এতক্ষণ দূরে দূরে দৃষ্টিটাকে ছড়িয়ে রেখেছিল বলেই কি এত কাছের জিনিসটা দেখতে পায়নি শ্যামলাল? জাঙ্গাল থেকে কয়েক-পা এগিয়েই ঘাসবনের ভেতর একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। হিন্দুস্থানি মেয়ে, কানের বড়ো বড়ো রুপোর গয়না দুটো দেখেই তা বুঝতে পারা গেল। মাথায় লালশাড়ির ঘোমটা তোলা, কালো সুছাঁদ মুখোনা সকৌতুক মিষ্টি হাসিতে উজ্জ্বল। তার পাশেই লটপটে-কান একটা রামছাগলের মুখ চোখে পড়ছে। সেটাও যেন শ্যামলালের দিকে তাকিয়ে আছে কৌতুকভরা ভঙ্গিতে।

গোঁয়ার শ্যামলালের ব্রহ্মরন্ধ্র পর্যন্ত রাগে জ্বলে উঠল। মহিষটা পাওয়া যাচ্ছে না, তারজন্যে একেই মেজাজ বিগড়ে আছে, তার ওপরে এইরকম মর্মান্তিক ঠাট্টা! কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে পড়বার মতো অনুভূতি হল শ্যামলালের। তা ছাড়া আচমকা ভয় পাইয়ে মেয়েটা যেভাবে তাকে অপদস্থ করে দিয়েছে, সেটাও ক্ষমাযোগ্য অপরাধ নয়।

হাতের লম্বা লাঠিতে ভর দিলে শ্যামলাল, শরীরটাকে আকাশে ভাসিয়ে দিলে সরলরেখায়। তারপর মস্তবড়ো একটা অর্ধবৃত্ত রচনা করে সোজা লাফিয়ে পড়ল ঘাসবনের ভেতরে। এসে দাঁড়াল একেবারে মেয়েটার মুখোমুখি। ভয় পেয়ে দু-পা পিছিয়ে গেল মেয়েটা।

রূঢ়স্বরে শ্যামলাল হিন্দিতে বললে, এই, তুম কৌন হ্যায়?

শ্যামলালের হিন্দি শুনে মেয়েটা ফিক করে হেসে ফেলল। গোঁয়ারগোবিন্দ মানুষ, পাথরে গড়া শরীর, মেজাজ সম্প্রতি বিলক্ষণ চড়া! হাতে প্রকান্ড একটা পাকা বাঁশের লাঠি, ইচ্ছে করলে এই নির্জন ঘাসবনের ভেতরে পিটিয়ে ঠাণ্ডা করে দিতে পারে তাকে। আশ্চর্য, তবু ভয় পেল না মেয়েটা। স্বাভাবিক সংস্কারেই বোধ হয় কেমন করে জানতে পেরেছে লোকটা যত চোয়াড়ই হোক, সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ তার পক্ষে।

জবাব দিলে, আদমি হ্যায়।

আরও চটে গেল শ্যামলাল, আদমি হ্যায় সে তো হাম জানতাই হ্যায়। তুম যে ভূত নেহি হ্যায়, সে হাম বুঝতে পারা থা। লেকিন হাসত কেঁও!

আশ্চর্য বুকের পাটা মেয়েটার। বললে, হামারা খুশি।

তাজ্জব লাগল শ্যামলালের। এই এক ফোঁটা মেয়ের দুঃসাহসের পরিমাণ দেখে রাগ। করতেও ভুলে গেল শ্যামলাল। জানতা হ্যায়, হাম কৌন?

হাম কথাটার উপর জোর দিলে শ্যামলাল, কৌন শব্দটা উচ্চারণ করলে বেশ দরাজ কণ্ঠে। কিন্তু এবারেও মেয়েটা তাক লাগিয়ে দিলে। তুম ঘোষ হো৷

আর রাগ করা চলে না, এবার অবাক হওয়ার পালা। হিন্দি ভুলে গিয়ে শ্যামলাল বললে, কী করে জানলে। মেয়েটা হাসতে লাগল, জবাব দিলে না।

আর তুম?

ঘাটোয়ালকা লেড়কি। রুকনি।

মুহূর্তে ভাবান্তর ঘটে গেল শ্যামলালের। বিস্ময়, কৌতূহল, সব কিছু মিলিয়ে গিয়ে ক্রোধে দপ করে জ্বলে উঠল রক্ত। তাই বলো। শত্রুর মেয়ে না হলে এমন বুকের পাটা হয়! এতক্ষণে সে কৌতুকভরা হাসিটা একটা নতুন অর্থ নিয়ে দেখা দিল তার কাছে।

রাগে বেশি কথা আর বেরুতে চাইল না মুখ দিয়ে। হাতের লম্বা লাঠিটাকে সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শ্যামলাল বললে, ভাগো।

তারপর নিজেই আর অপেক্ষা করল না। লাঠির ওপর ভর দিয়ে এক লাফে উঠে পড়ল জাঙ্গালের ওপরে, আর একটা লাফে চলে গেল ওপারে। দুজনের মাঝখানে ব্যবধানের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রইল ভূতের জাঙ্গালটা। বাতাসে শোনা যেতে লাগল ঘাসবনের শিরশির আর সোঁ সোঁ শব্দ।

পশ্চিম আকাশে তালবনের মাথার ওপর দিয়ে ডুবছে সূর্য। আর দেরি করা চলে না, লম্বা লম্বা পা ফেলে ঘাসবন ঠেলে ঠেলে এগোতে লাগল শ্যামলাল। সমস্ত ক্রোধ, বিদ্বেষ, ক্লান্তি আর হতাশা ছাপিয়েও কী আশ্চর্য! সেই খিলখিল মিষ্টি হাসিটা অপূর্ব মাদকতার মতো ছড়িয়ে রইল তার চেতনার মধ্যে।

খেয়াঘাটের ঘাটোয়ালের ওপর জাতক্রোধ শ্যামলালের। ঘাটোয়ালকে এক বার কায়দামতো হাতের কাছে পেলে লাঠির মুখে তার মাথাটা গুঁড়িয়ে দেবে, পুঁতে দেবে জলার পানা আর গুঁড়ি কচুরির ভেতর, এইরকম একটা সাধু সংকল্প মনে মনে পুষে আসছে অনেক দিন থেকে। কিন্তু ঘাটোয়াল শ্যামলালের চাইতেও চালাক, সুতরাং এ-পর্যন্ত সুযোগটা আর ঘটে ওঠেনি।

এই নীরব নির্জন মাঠের মাঝখানে উল্লেখযোগ্য মানুষ বলতে এরা দুজন। সুতরাং শত্রুতার চেয়ে মিত্রতা হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল বেশি, কিন্তু হয়নি।

ডুবা জলাজমি-বর্ষায় সমুদ্র। বর্ষার পরে ঘাসের জমি। সেও সমুদ্র, কিন্তু নীলচে ঘোলাজলের নয়, সবুজ ঘাসের। আদি অন্তহীন এমন একটা গোচারণভূমি সারা উত্তরবাংলার কোথাও নেই। এর একপ্রান্তে ছ-মাইল দূরে গ্রাম, আর একপ্রান্তে চার মাইল। মাঝখানে এই দশ মাইল জায়গাজুড়ে বিস্তীর্ণ প্রকৃতি-প্রাথমিক পৃথিবী। আর এরই ভেতরে প্রক্ষেপের মতো ঘাটোয়ালের ঘাট আর শ্যামলারের মহিষের বাথান।

চার-পাঁচ পুরুষ আগে হিন্দুস্থানি ছিল শ্যামলালেরা। কিন্তু সে-কৌলীন্য আর নেই এখন। মাতৃভাষার জায়গা দখল করেছে প্রাদেশিক বাংলা, কখনো কখনো তার ভেতরে বালিয়া জেলার এক-একটা বেখাপ্পা শব্দ উত্তরাধিকারসূত্রে অর্জিত। পিতৃপুরুষের ভাষা আর নেই, রুচিরীতিও বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি পেশাটা।

এই দিগবিস্তার মাঠের ভেতরে মহিষের বাথান। মহিষের সংখ্যা কম নয়, ছোটো-বড়ো বাছুরগুলোসুদ্ধ প্রায় আঠারোটি। আগে আরও ছিল, তবে দু-বছর আগে মড়ক লাগাতে অনেকগুলো শেষ হয়ে গেছে। সেজন্যে শোকবোধটাও পুরোনো হয়ে গেছে। আপাতত ওই আঠারোটিকে নিয়েই খুশি আর পরিতৃপ্ত আছে শ্যামলাল।

প্রায় তিন মাইল এগিয়ে উঁচু টিলার ওপরে শ্যামলালের ঘর, চাকরদের আস্তানা, মহিষের গোয়াল। আপনার বলতে কেউ নেই, একান্তভাবে একা। কিন্তু ক্ষোভ নেই এই একাকিত্ববোধের জন্যে, বেদনাও নেই। এই মহিষগুলোকে নিয়েই তার দিন কাটে। বড়ো ভালো লাগে অতিকায় চেহারার অবোলা প্রাণীগুলিকে। জলার ঘাস খেয়ে নধর মসৃণ দেহ তাদের তৈলাক্ত স্বাস্থ্যে চকচক করে, তাদের স্নেহস্নিগ্ধ পরিতৃপ্ত চোখগুলির দিকে তাকিয়ে ভারি তৃপ্তি বোধ হয় শ্যামলালের। মায়ের মতো আদর করে সে, মহিষগুলোর গলার নীচে হাত বুলিয়ে দেয়, আরামে চোখ বুজে আসে তাদের। এত বড়ড়া বড়ো বিশালকায় পশুগুলোকে শিশুর মতো অসহায় বলে বোধ হতে থাকে।

আবার বর্ষায় আর একরকম। মাঠে তখন থইথই করে জল, মহিষগুলোর স্বেচ্ছাভোজনের পথ বন্ধ। বছরের সঞ্চিত পোয়ালগুলো দিয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে হয়। কিন্তু অত বড়ো বড়ো পেট তাতে ভরে না, খড়ি-ওঠা চামড়ার নীচে দেখা যায় পাঁজরের হাড়, সারা গায়ে ডাঁশ আর এঁটুলি, পিঠের হাড়টা উঁচু হয়ে ওঠে তলোয়ারের ফলার মতো। ভারি কষ্ট হয় শ্যামলালের।

সুখে-দুঃখে এমনি করে দিন কাটে। মাঝে মাঝে আসে নবিপুরের বাজার থেকে হিন্দুস্থানি ভগৎজি আর পাঁড়েজি, পাইকারি দরে ঘি কিনে নিয়ে যায়, ভেজিটেবল মিশিয়ে এক নম্বর ঘি বানিয়ে ছেড়ে দেয় বাজারে।

খোলা মাঠে, সবুজ ঘাসের জগতে দিন কাটে শ্যামলালের। ভালোই কাটছিল, কিন্তু একদিন গন্ডগোল বাঁধল ঘাটোয়ালের সঙ্গে।

কাঞ্চন নদীর ওপারে ছোটো খেয়াঘাটের সে ইজারাদার। নবিপুরের যাত্রী পার করে আদায় করে দু-পয়সা ধানের গাড়ি এলে ছ-আনা, খালি গাড়ি তিন আনা। কানে আংটি, ন্যাড়া মাথা আধবুড়ো লোক। সারাদিন গাঁজা খেয়ে চোখ লাল করে বসে থাকে, রোজগারপাতি মন্দ হলে খিটখিট করে বিশ্রী রকমে।

তা করুক, শ্যামলালের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল না বিশেষ। কিন্তু মহিষের পিঠে একদিন সবে নদী পার হয়ে ডাঙায় উঠেছে শ্যামলাল, এমনসময় এসে পথ আগলাল ঘাটোয়াল।

শ্যামলাল বললে, কেয়া হুয়া?

ঘাটোয়াল জবাব দিলে, পয়সা?

কীসের পয়সা?

পারানির।

পারানি! শ্যামলাল আশ্চর্য হয়ে গেল, নৌকায় পার না হলেও পয়সা?

জরুর। গাঁজার ঝোঁকে ঘাটোয়াল ব্যাখ্যা করে দিলে, এ ঘাট তার ইজারা। এ ঘাট যে পেরুবে, তাকেই পয়সা দিতে হবে। জমিদারের কাছ থেকে বহু টাকার ডাক দিয়ে ঘাট নেওয়া হয়েছে, ইয়ার্কি নয়। পয়সা জরুর দিতে হবে, তা নৌকোতেই পার হও আর ভৈঁসায় চেপেই চলে যাও।

বলা বাহুল্য যুক্তিটা শ্যামলালের ভালো লাগবার কথা নয়। মহিষের পিঠ থেকে তখনি সে লাফ দিয়ে পড়ল—মারামারি করবে। ঘাটোয়ালও তৈরিই ছিল, উরু চাপড়ে বললে, ত আও বাবুয়া!

ঘাটোয়ালের লোকজন মাঝে পড়ে ছাড়িয়ে দিলে। বিদায়লগ্নে দুজন পরস্পরের দিকে যে দৃষ্টিক্ষেপণ করলে তার অর্থ জলের মতো প্রাঞ্জল।

একজন মনে মনে বললে, ফিন ইধার আয়েঙ্গে তো…

আর-একজন স্বগতোক্তি করলে, এক বার ওদিকে যায়েগা তো…

আসতে আসতে গভীর ক্ষোভের সঙ্গে শ্যামলালের মনে হয়েছিল, কেন আজ সে লাঠিটা সঙ্গে আনেনি!

এই হল শত্রুতার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

সন্ধ্যার মলিন ছায়ায় যখন ঘাসের বন ধরেছে কালো সমুদ্রের রূপ, তখন ঘরে ফিরল শ্যামলাল। আর ফিরে এসে দেখল, কখন কোন ফাঁকে দু-দিনের হারানো মহিষটা আপনা থেকেই বাথানে ফিরে এসেছে।

কষে মহিষটাকে একটা চাঁটি বসাল শ্যামলাল। গাল দিয়ে বললে, কাল থেকে বেঁধে রাখব। রাত্রে নিজের খাঁটিয়াতে শুয়ে শুয়ে একটা আশ্চর্য নতুন ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল মন। ঘাটোয়ালের মেয়ের ওপরে একটা অপরিসীম ক্রোধ আর বিরক্তি নিয়ে যে-চিন্তাটা শুরু হয়েছিল, কখন তার ধারাটা ঘুরে গেছে সম্পূর্ণ উলটো দিকে সেটা টেরই পায়নি শ্যামলাল। মন বলতে লাগল, ভারি সুন্দর তার মুখোনা, নদীর স্রোতের মতো তার হাসির শব্দ। ঘাসবনের নিরবচ্ছিন্ন শিরশির আর সোঁ সোঁ শব্দের মধ্যে পড়ন্ত রোদের শান্ত কোমল নির্জনতার একটা অপরূপ আবির্ভাবের মতো এসে দাঁড়িয়েছিল মেয়েটা।

সমস্ত রাত্রি ধরে ওই ছবিটা স্বপ্নসঞ্চার করতে লাগল তার ঘুমের মধ্যে। শ্যামলাল স্বপ্ন দেখতে লাগল— শত্রুর মেয়ের সঙ্গে ক্রমাগত সে ঝগড়া করে চলেছে।

পরের দিনটা আবার শুরু হল বাঁধা কাজের তাগিদে। চাকরগুলোকে দিয়ে দুধ-দোয়ানো, সেই দুধ জ্বাল দিয়ে ঘি-তৈরির বন্দোবস্ত। কাল সকালেই আসবে রামরতন ভগৎ, এক মন ঘি চাই তার।

কিন্তু বেলা যেই পড়ে গেল, যেই আকাশের ছাড়া ছাড়া মেঘে ধরল লালের রং, সঙ্গে সঙ্গে অকারণে চনমন করে উঠল বুকের ভেতরে। আগুনে পোড়া তামাটে রঙের বিশাল কঙ্কালের মতো ভূতের জাঙ্গালটা তার শিমুলের শাখা দুলিয়ে দূর থেকে হাতছানি দিলে তাকে। আজ মহিষ হারায়নি, সবগুলোই আছে চোখের সম্মুখে, তবু লম্বা লাঠিটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল শ্যামলাল। আর রওনা হল সেদিকেই, যেদিকে হিংস্র আলাদ গোখুরের ভয়ে মানুষ এগোতে চায় না।

লাঠিতে ভর দিয়ে মাটির সঙ্গে শরীরটাকে সমান্তরাল করে একটা অর্ধবৃত্ত রচনা করে শূন্যের ওপর দিয়ে খালটা পার হয়ে গেল শ্যামলাল। দাঁড়াল এসে জাঙ্গালের নীচে। আর তখনি যেন ফিরে এল চৈতন্য, খেয়াল হল এ সে করেছে কী!

একে তো এই সাপের জাঙ্গালে আসা এমনিতেই বিপজ্জনক। তার ওপরে কাল যে মেয়েটি দৈবাৎ এখানে ছাগল চরাতে এসে পড়েছিল, আজও যে এখানে সে আসতে পারবে তার সম্ভাবনা কোথায়! তা ছাড়া শত্রুর মেয়ে।

ফিরে যাবে কি না ভাবতে ভাবতেই শ্যামলাল দেখলে কখন সেই বর্ষার জলনামা টিলার খাঁজে খাঁজে লাঠি আটকিয়ে উঠে বসেছে জাঙ্গালের মাথায়। এসে দাঁড়িয়েছে সেই শিমুল গাছটার নীচে, ঝরাপাতাগুলোর ওপরে। কিন্তু…

মুহূর্তে ম্লান হয়ে গেল মুখ, বিষণ্ণ হয়ে গেল চোখের দৃষ্টি। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল নিরাশায়। তবু চেষ্টা করতে দোষ নেই। মুখে হাতটা চাপা দিয়ে অকারণেই বিশ্রী বাজখাঁই আওয়াজ তুললে শ্যামলাল, আঃ-আঃ-আঃ–

কিন্তু ডাকটা শেষ হওয়ার আগেই জলতরঙ্গের মতো উচ্ছল হাসির কলরোল ভেসে উঠল। এবারে আর ঘাসবনের ভেতরে নয়, ঠিক তার পেছনে, শিমুল গাছটার আড়াল থেকে।

চমকে পেছন ফিরল শ্যামলাল। বিশ্বস্ত পরিচিত গলায় বললে, এখানে উঠলে কেন? বড্ড সাপের ভয়।

রুকনি হাসল, এখানে না উঠলে তো দেখা যেত না তুমি আসছ কি না।

তাহলে ব্যাপারটা একতরফা নয়। শত্রুর মেয়েও তারই মতো ঝগড়া করবার প্রতীক্ষা করছিল, জাঙ্গালে উঠে দেখছিল শ্যামলাল আসছে কি না। চোয়াড় কাঠখোট্টা মুখে হাসি দেখা দিল। বলল, চলো, এখানে নয়, ঘাসবনের ভেতরে গিয়ে বসি।

উজ্জ্বল চোখে রুকনি বলল, চলো।

পাখির মতো হালকা মেয়েটা, এক হাতে তাকে তুলে নেওয়া চলে।

অনাবৃত আদিম পৃথিবীতে আদি অন্তহীন ঘাসের বন। অনাবৃত, অনায়োজন সহজ ভালোবাসা। আজ ঘরে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল শ্যামলালের। কিন্তু আজ আর ভয় করল না, ভয় করল না জলার ওপরে তমিস্রাঘন রাত্রিকে। ঘন অন্ধকারেও তারার আলোয় এমন করে পথ দেখতে পাওয়া যায়, একথা কি আগে কোনোদিন জানতে পেরেছিল শ্যামলাল?

খেয়া পারাপার করে ঘাটোয়াল। পারানির পয়সা আদায় করে, ঝগড়া করে গোরুর গাড়ির গাড়োয়ানদের সঙ্গে। গাড়ি বেশি বোঝাই থাকলে ছ-আনার জায়গায় আট আনা আদায় করতে চায়, মুখচেনা থাকলে কখনো এগারো আনায় রফা করে দু-খানা গাড়িকে। কাঞ্চনের শান্ত নীল জলের ওপর দিয়ে অনবরত পারাপার করে ঘাটোয়ালের জোড়া নৌকো। আর আনে নবিপুরের বাজার থেকে তোলায় তোলায় গাঁজা, কখনো কখনো দু-চার বোতল তিরিশ লম্বর কা দারু। মদের মধ্যে এইটেই সবচেয়ে কড়া, আর এটা নইলে গাঁজাখোরের কড়া মগজে নেশা চড়তে চায় না।

ওদিকে পার হয়ে গেছে কৃষ্ণপক্ষ। ফালি ফালি করে আকাশে বড় হচ্ছে চাঁদ, ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে ঘাসের বন, জ্যোৎস্নায় আশ্চর্য সুন্দর আলোছায়া নেচে যায় তার ওপর দিয়ে। বহুদূরের সাঁওতাল পাড়া থেকে নিশুতি রাত্রে বাঁশির সুর আসে, আসে মাদলের শব্দ। জল-মেশানো পাতলা মহিষের দুধের মতো রংধরা আকাশের তলা দিয়ে উড়ে যায় রাজহাঁসের ঝাঁক, খাঁটিয়ার ওপরে বসে বসে জাগ্রত স্বপ্ন দেখে শ্যামলাল।

মহিষগুলোকে এখনও আদর করে, যত্ন করতে চেষ্টা করে এখনও। কিন্তু সে-আন্তরিকতা আর নেই, এখন পরিষ্কার দ্বিমুখী হয়ে গেছে মনের গতিটা। যা নিয়ে এতদিন সে সম্পূর্ণ হয়েছিল, আজ মনে হয় তার ভেতরে কত বড়ো একটা ফাঁকি লুকিয়ে ছিল। এভাবে একা একা আর বাস করা চলে না, একা একা থাকা এখন অসম্ভব তার পক্ষে।

আজকাল আর অপেক্ষা করতে হয় না বিকেলের ছায়া ঘনানো পর্যন্ত। দুপুরের পরেই আসে রুকনি। নিরিবিলি ভূতের জাঙ্গালের পাশে ঘন সবুজ ঘাস স্নিগ্ধ নিবিড় আবরণ দিয়ে ওদের ঢেকে রাখে। এমনিতেই বুক পর্যন্ত ঘাস, মাথা উঁচু করে না দাঁড়ালে দেখতে পাওয়া যায় না। তার আড়ালে নিভৃত নিঃসঙ্গ অপরূপ অবকাশ।

সবুজ ঘন ঘাস। বিচিত্র একটা মিষ্টি গন্ধে ভরা। প্রজাপতি উড়ে আসে, উড়ে আসে ফড়িং; মাথার ওপর সকৌতুকে চক্র দিয়ে উড়ে যায় ওদের নিভৃত প্রেমের নিঃশব্দ সাক্ষী। রাজারাজড়াদের বিছানা কি এই সবুজ ঘাসের চাইতেও নরম?

শ্যামলালের বাহুতে নিজেকে এলিয়ে দিয়ে গুনগুন করে গান গায় রুকনি। শিরশির শরশর সোঁ সোঁ করে তার সঙ্গে সুর মেলায় ঘাসবনের গান। ভূতের জাঙ্গালের ওপরে শিমুলের ছায়াটা ঘন হয়ে আসতে থাকে, সূর্য পাটে নামে পশ্চিমের তালবনের ওপারে, এদিকে উঁকি মারে চাঁদের পান্ডুর রেখা। রুকনি ছাগল নিয়ে ফিরে যায় খেয়াঘাটের দিকে, লম্বা লাঠির ওপরে লাফ দিয়ে ঘরের দিকে রওনা হয় শ্যামলাল।

তারপর জ্যোৎস্নার মাতাল-করা সন্ধ্যা। একা একা খাঁটিয়ায় পড়ে ঝিমুতে অসহ্য লাগে এখন। অথচ উপায় নেই। ঘাটোয়ালকে বলা যাবে না, তেড়ে মারতে আসবে। অবশ্য মারামারিতে ভয় পায় না শ্যামলাল, কিন্তু তাতে কোনো ফয়দা হবে না। লাভের ভেতরে ঝামেলাই বাড়বে খানিকটা, ওতে করে রুকনিকে পাওয়া যাবে না।

একদিন রুকনির দুখানা সুডৌল হাত প্রাণপণে আঁকড়ে ধরলে শ্যামলাল।

চল পালিয়ে যাই।

রুকনি হাসল, কোথায়?

যেখানে খুশি, যতদূরে হোক। পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করব তোকে।

রুকনি তেমনি হাসতে লাগল, পারবে?

মাথার ভেতরে টগবগ করে রক্ত ফুটছিল শ্যামলালের। পারব না কেন? নিশ্চয় পারব। এই বাথান, এই ভৈঁসার পাল? এগুলোকে তো সবসুদ্ধ তাড়িয়ে দিতে পারবে না। ফেলে যেতে পারবে?

হাত দুটো আপনা থেকে ছেড়ে দিলে শ্যামলাল। এই মহিষের পাল। কত যত্ন, কত আশঙ্কা, কত সজাগ পরিচর্যা! মুখে যত সহজেই বলা যাক, মনের দিক থেকে অত জোর নেই তার।

তা ছাড়া যাবেই-বা কোথায়? এত বিরাট, এত বিপুল পৃথিবীতে কতটুকু জানে শ্যামলাল, কতটুকুই-বা তার চেনা? এই ঘাসের বন—সমুদ্রের মতো যার বিস্তার, ওই রাঙামাটির টিলাগুলো, দূরে দূরে তাল গাছ, আকাশে ছাড়া ছাড়া মেঘে সূর্যাস্ত-সূর্যোদয়ের রং, তাল গাছের মাথার ওপরে রুকনির হাসিভরা মুখের মতো উঁকি দেওয়া চাঁদ, কাঞ্চন নদী, খেয়াঘাট, আর দুরের নবিপুরের বন্দর—কী আছে এর বাইরেও সেখানে অপরিচয়, সেখানে এমন কি কিছু আছে যার ওপরে ভর দিয়ে সে দাঁড়াতে পারে নিজের পায়ে। গভীর রাত্রিতে এই দিগন্তসমাকীর্ণ মাঠের ভেতরে কেউ যদি পথ হারায় তাহলে যেমন আলেয়ার আগ্নেয়শিখা বিভ্রান্ত করে ঘুরিয়ে মারে তাকে, তেমনি করে সেই অচেনা জগৎ ঘুরিয়ে ভুলিয়ে মারবে তাকে। এবং সেই অন্ধকারে তাকে কি পথ দেখাতে পারবে রুকনি?

সংশয় কাটে না মনের ওপর থেকে।

তবু জোর করে জবাব দিলে শ্যামলাল, তোর জন্যে সব পারব।

আচ্ছা, ভেবে দেখো।

রুকনির চোখ তেমনি লীলামধুর কৌতুকে জ্বলজ্বল করছে। প্রতিবাদ করা উচিত, রুকনি বিশ্বাস করেনি বুঝতে পারছে শ্যামলাল; কিন্তু তবুও প্রতিবাদ করা চলে না। মুখে বলা সোজা, কিন্তু কাজটা নয়। ভয় আছে অপরিচিত অনাত্মীয় পৃথিবীর। সমস্ত নাড়িতে নাড়িতে জড়িয়ে আছে বাথানের প্রতি অন্ধ দুর্বলতা—সারাটা জীবন ধরে সবচাইতে একান্ত করে জেনেছে যাকে; আর আশঙ্কা আছে সেইসব আলেয়ার, রাত্রির অন্ধকারে নিথর কালো ঘন ঘাসবনে যারা অসতর্ক পথিককে বিভ্রান্ত করে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ায়, কখনো কখনো-বা ডুবিয়ে মারে জলার হাতি-তলিয়ে-যাওয়া অথই কাদাজলের মধ্যে!

মনের ভেতরে অসহ্য অস্বস্তি। নিজের হাত কামড়ে খেতে ইচ্ছে করে শ্যামলালের। ছুটে যেতে ইচ্ছে করে ওই শালা গাঁজাখোর ঘাটোয়ালের কাছে। তার পা ধরে সে বলতে পারে…

কিন্তু বাধা দিয়েছে রুকনি। কেমন চমকে উঠেছে, আশঙ্কায় ছলছল জ্বলজ্বল করে উঠেছে কালো চোখ, বলেছে, না না।

না না কেন? টাকা যদি চায়, আমি দেব। শ রুপেয়া, দেড়শো রুপেয়া— আমার টাকার অভাব নেই।

রুকনি তবুও বলেছে, না, সে হবে না!

কেন?

হঠাৎ একটা ঢোঁক গিলেছে রুকনি, কী-একটা কথা সামলে নিয়েছে মুহূর্তের মধ্যে। রপর দ্বিধা করে বলেছে, আমার বাপের ভারি রাগ তোমার ওপরে। হাজার টাকা দিলেও রাজি হবে না। বরং ঝামেলা হবে খানিকটা। তার চাইতে এই ভালো।

এই ভালো! মনের দিক থেকে মেনে নিতে পারে না শ্যামলাল। এ ভালো নয়, এ লুকোচুরি এখন রীতিমতো পীড়া দিচ্ছে তাকে। অপরাধবোধ, লজ্জা। কারও কাছে কখনো ছোটো হয়নি শ্যামলাল, চলেছে মাথা উঁচু করে, সোজা মনের মতো হাতের সোজা লম্বা লাঠিটার ওপরে নিঃসংকোচ জোর রেখে। আজ হীন মনে হয় নিজেকে, মনে হয় ঘাটোয়ালের কাছে সে হেরে যাচ্ছে। এমন একটা জায়গাতে এখন দাঁড়িয়ে আছে ঘাটোয়াল, যেখানে তার দিকে মুখ উঁচু করে তাকানোর সাহস নেই শ্যামলালের।

আরও অসহ্য লাগে রাত্রি। দুর্বিষহ বোধ হয় একেবারে। খোলা বারান্দায় খাঁটিয়ায় ঘুমোয় শ্যামলাল। গভীর রাত্রে শুনতে পায় বহু দূরের সাঁওতাল পাড়া থেকে বাঁশির সুর, ওই সুরটা রক্তের ভেতরে যেন ঝিনঝিন করে বাজে—দক্ষিণের হাওয়াটায় যেমন বিশ্রী একটা অস্বস্তি, শরীরকে আচ্ছন্ন করে তুলতে চায়। বড়ো একা, বড়ো বেশি নিঃসঙ্গ।

নাঃ, আর পারা যায় না। এবার বলতেই হবে ঘাটোয়ালকে, কপালে যা থাকে তাই হোক। সারারাত ছটফট করে বলেই ঘুমটা ভাঙতে দেরি হচ্ছে আজকাল। মুখের ওপরে রোদ এসে পড়েছে শ্যামলালের, ঘুমের ভেতরে কেমন অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। হঠাৎ–

চমকে ধড়মড় করে উঠে বসল শ্যামলাল।

এ কি সত্যি? এ কি বিশ্বাস করবার মতো? তার দাওয়ার নীচে দাঁড়িয়ে ঘাটোয়াল। ন্যাড়া মাথা, কানে আংটি। এই সকালেই নেশা করে এসেছে—টকটকে লাল চোখের দৃষ্টি। হাতে একখানা তেল-পাকানো মস্ত লাঠি। ডাক দিচ্ছে, হোই হো ঘোষ, শুনত হো?

আতঙ্কে মড়ার মতো পাড়ুর হয়ে গেল শ্যামলাল। রুকনির ব্যাপারটা টের পেয়েছে নাকি ঘাটোয়াল? বিহ্বল চোখ বুলিয়ে এক বার তাকিয়ে দেখে নিলে লাঠিটা তার তৈরি আছে কি না।

কিন্তু তাজ্জব লাগিয়ে দিয়ে ঘাটোয়াল হাসল। বললে, এত বেলা পর্যন্ত শুয়ে থাক কেন? কাজের কথা আছে তোমার সঙ্গে।

কাজের কথা! এবং ঘাটোয়াল হাসছে। তাহলে…

এবারেও চমক লাগল শ্যামলালের, কিন্তু আনন্দের চমক। রুকনিই তবে ব্যবস্থা করে ফেলেছে সব! কিন্তু ঘাটোয়াল পাকা লোক, অনেক টাকা চাইবে নিশ্চয়। তা হোক, তা হোক। রুকনির জন্যে দুশো টাকা খরচ করতে তার আপত্তি নেই।

আও, বৈঠো খাঁটিয়ামে

আমন্ত্রণ গ্রহণ করে খাঁটিয়ার এসে বসল ঘাটোয়াল। রোমাঞ্চিত আনন্দে সর্বাঙ্গ কাঁপছে শ্যামলালের। তার উড়ে যেতে ইচ্ছে করছে এই সবুজ ঘাসবনের ওপর দিয়ে, ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে রুকনির বুকে। কিন্তু আর একটু ধৈর্য ধরতে হবে, করতে হবে আরও একটু প্রতীক্ষা।

কথা আরম্ভ করবার আগে হাতের চেটোতে বেশ খানিকটা খৈনি পাকিয়ে নিলে ঘাটোয়াল। ভাগ দিলে শ্যামলালকে, নিজে মুখে পুরলে খানিকটা। তারপর ধাতস্থ হয়ে বললে, ভেবে দেখলাম তোমার সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি করে কোনো লাভ নেই।

শ্যামলাল বললে, জরুর।

যা হয়ে গেছে ভুলে যাওয়াই ভালো। পিচ করে দাঁতের ফাঁক দিয়ে খানিকটা থুথু ফেললে ঘাটোয়াল, এখন একটু কাজে এসেছি।

নিজের বুকের স্পন্দন যেন শুনতে পাচ্ছে শ্যামলাল। কী কাজ?

দু-সের ভালো ঘি চাই। কত দাম?

এও কি ভূমিকা, না শুধু এইটুকুই মাত্র বলতে এসেছে ঘাটোয়াল? আশায় আশঙ্কায় দুলতে লাগল শ্যামলালের মন। দু-সের ভালো ঘি? ওর আর দাম লিব না তোমার কাছ থেকে, হাজার হোক যখন দোস্তি হয়ে গেল।

খুশিতে ঘাটোয়ালের মুখ ভরে গেল। আচ্ছা, আচ্ছা, তব তো ঠিক হ্যায়। আজ থেকে তোমার আর পারানির পয়সা লাগবে না দোস্ত। আসল কথাটা কী জান? ঘি আমার জন্যে নয়, আমার বেটির বর আসবে, তাকেই…

তোমার বেটির বর? শ্যামলালের মাথার ওপর মস্ত একটা লাঠির ঘা এসে পড়ল, মাথাটা যেন চুরমার হয়ে গেল মুহূর্তে। কোন বেটি?

একটাই তো বেটি আমার। ওই রুকনি।

রুকনি! প্রতিধ্বনি করলে শ্যামলাল। কিন্তু এত ক্ষীণকণ্ঠে যে ঘাটোয়াল তা শুনতে পেল না। ঘাটোয়াল বলে চলল— শাদি তো হয়েছে দু-বছর বয়েসে, কিন্তু এতদিন গাওনা হয়নি কিনা, তা এইবারে নিতে আসবে। জামাই আমার খুব মানী লোক, হবিবপুর থানার সিপাহি। শনিবারে সে আসবে মেয়েকে নিতে। বলেছে একটু ভালো ঘিয়ের জোগাড় রাখতে।

নিস্পন্দ হয়ে রইল শ্যামলাল। হাতের চেটোয় আবার নতুন করে খানিকটা তামাক পাতা নিয়ে ঘাটোয়াল ডলতে লাগল, জামাই বড়ো ভালো লোক। খত পাঠিয়েছে চৌকিদারের সঙ্গে, মেয়েকে পাঠিয়েছে লালশাড়ি। লিখেছে গয়নাও নিয়ে আসবে। বরাত ভালো রুকনির, কী বল। দোস্ত?

হঠাৎ শ্যামলাল হেসে উঠল, জরুর।

কেমন সন্দিগ্ধ হয়ে তাকাল ঘাটোয়াল, হাসিটার অর্থ যেন ঠিক বুঝতে পারল না। তারপর জিজ্ঞাসা করলে, ঘি-টা কখন পাওয়া যাবে?

কাল। কাল সন্ধের পরে নিজেই দিয়ে আসব আমি।

রুকনি অস্বীকার করেনি কিছুই। তেমনি ঘাসবনের শান্ত কোমল ছায়ায় নিজেকে লীলাভরে এলিয়ে দিয়েছে শ্যামলালের বুকের ভেতরে। বলেছে, তোমাকে বলিনি, বললে তোমার কষ্ট হত। তা ছাড়া তোমার মতো জোয়ান মানুষটাকে পাওয়ার জন্যে ভারি লোভও হয়েছিল।

ঠিক কথা, কোনো অন্যায় হয়নি। ঘৃণাভরে রুকনিকে বুকের ভেতর থেকে ছিটকে ফেলে দেয়নি শ্যামলাল। এই ঘাসের বনে, এই দিগন্তজোড়া মুক্ত মাঠের ভেতরে এমনি নির্ভাবনায় ভালোবাসাই তো ভালো। এখানে যেমন ঘরের বেড়া নেই, তেমনি কোনো নিয়মের বেড়া নাই-বা থাকল এই গোপন ভালোবাসায়। পৃথিবীর ধর্মকেই মেনে নিয়েছে রুকনি। ক্ষতি কী? নির্জন প্রেম মাঠের খোলা বাতাসেই উড়ে চলে যাক।

আস্তে আস্তে শ্যামলাল বললে, তুই চলে যাবি?

কথাটার সোজা জবাব দিল না রুকনি। হয়তো বেদনাবোধ হয়েছে, হয়তো জেগে উঠেছে মৃদু করুণ একটুখানি সহানুভূতি। ঘুরিয়ে বলল, তোমাকে ভুলব না।

আশ্বাসের কোনো প্রতিক্রিয়া হল না শ্যামলালের মুখে। বললে, কাল এক বার আসবি শেষ বারের মতো? এর পরে তো তোকে আর দেখতে পাব না।

রুকনি ম্লানমুখে বললে, আসব।

আর একটা অনুরোধ। তোর নতুন রাঙাশাড়িটা পরে আসবি রুকনি, যেটা টকটকে লাল। আমার দেখতে ভারি ইচ্ছে করছে।

রুকনি এবার টিপে টিপে হাসল একটু, আচ্ছা।

পরদিন দুপুরে বাথানের সবচাইতে বড় মহিষটাকে বেছে নিলে শ্যামলাল। হিংস্র চেহারা, খাঁড়ার মতো প্রকান্ড দুটো শিং। মাঠের প্রচুর ঘাস খেয়ে ইদানীং এটাই একটু বেয়াড়া হয়ে উঠেছে, মাঝে মাঝে চলতি দেহাতি লোককে তেড়ে যেতে চায়। চোখের দৃষ্টিতে লালের আভাস লেগেছে, আজকাল কেমন আশঙ্কা হয় সেদিকে তাকালে।

সেই মহিষটার পিঠে চড়ে বসল শ্যামলাল। এগিয়ে চলল জাঙ্গালের দিকে। খানিকটা আসতেই পেছনের জগৎটা হারিয়ে গেল ঘন ঘাসবনের নেপথ্যে। শুধু জেগে রইল নিস্তব্ধ নির্জনতা। বাতাসে রাশি রাশি ঘাসের আনন্দিত আন্দোলনে শব্দ উঠেছে শিরশির সোঁ সোঁ। এ সেই স্তব্ধতা যেখানে নির্জনে ভালোবাসা চলে, আর আর হত্যা করা চলে নিঃশব্দে।

নালা পার হয়ে মহিষটা শ্যামলালের তাড়া খেতে খেতে অনেকটা মাটি আর পাথর ভেঙে বহু কষ্টে উঠে পড়ল জাঙ্গালে। ফোঁস ফোঁস করে হাঁপাচ্ছে মহিষটা, মাঝে মাঝে অসন্তুষ্টভাবে নাড়ছে শিং দুটো, মুখের কষ দিয়ে গড়াচ্ছে ফেনা। তা ছাড়া আকাশে প্রখর রোদ—মাথাটা যে দস্তুরমতো তেতে উঠেছে তার, সে-বিষয়ে আর সন্দেহ নেই।

হ্যাঁ, রুকনি এসেছে, লালশাড়ি পরেই এসেছে। শ্যামলালের শেষ অনুরোধটা ভোলেনি। হাসিমুখে এগিয়ে এল সামনের দিকে। আজ শেষ বাসর।

আর সেই মুহূর্তেই একটা ভৈরব গর্জন করল মহিষটা। সজোরে সামনের পা-দুটো ঠুকল জাঙ্গালের ওপরে, ঠিকরে ছড়িয়ে পড়ল একরাশ মাটি আর পাথর, লাফিয়ে নেমে পড়ল শ্যামলাল। টকটকে লাল রং দেখে খুন চেপেছে উত্তেজিত মহিষের। চোখ দুটোতে ঠিকরে বেরুল আদিম পৃথিবীর আরণ্য হিংসা। শিং দুটো নীচু করে সোজা ছুটল রুকনির দিকে।

আর্তনাদ করে পালাতে গেল রুকনি, পারল না। টিলা থেকে দৌড়ে নামতে গিয়ে হুড়মুড় করে পড়ে গেল ঘাসবনের মধ্যে। চেঁচিয়ে উঠল, বাঁচাও—বাঁচাও–

কিন্তু বুনো খ্যাপা মহিষের হাত থেকে কাউকে বাঁচানো কি সম্ভব? অনর্থক চেষ্টা করে লাভ নেই। পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে একটা বিড়ি ধরাল শ্যামলাল।

নির্জন দিগন্তপ্রসার ঘাসের বন। বাতাসে সোঁ সোঁ শব্দ। খানিকটা এগিয়ে গেলেই বাতাসের শব্দ সব কোলাহল উড়িয়ে নিয়ে যায়, কয়েকটা চাপা আর্তনাদের তো কথাই নেই। কিছুক্ষণ পরে যখন পেছনের গোঙানিটা একটু কমে এসেছে, তখন এক বার, শুধু এক বারের জন্যে ফিরে তাকিয়ে দেখল শ্যামলাল। ঘাসবনের মধ্যে কিছু দেখা যায় না, তবে ল্যাজটা ওপরের দিকে তুলে মহিষটা ক্রমাগত কী যেন গুঁতিয়ে চলেছে আর গর্জন করছে হিংস্র ভয়ংকরভাবে। পায়ের দাপটে ঘাসের বন ছিঁড়ে ছিঁড়ে বাতাসে ঘুরপাক খাচ্ছে ঘূর্ণির মতো। পলকের জন্যে শিং দুটো চোখে পড়ল; লালশাড়ির চাইতে আরও গাঢ়, আরও গভীর রঙে সে-দুটো টকটক করছে। সে-রক্ত ঘাসবনের হিংসা, ঘাসবনের ভালোবাসার মতোই নগ্ন আর নিরাবরণ।

শ্যামলাল নিশ্চিন্তে বিড়িটায় একটা টান দিল, তারপর হাতের লাঠিটা বাগিয়ে ধরে জাঙ্গালের ওপর দিয়ে সোজা হেঁটে চলল। তার কাজ এখনও আর একটু বাকি। একটা আলাদ গোখুর দরকার, দরকার খানিকটা তাজা বিষ। ঘাটোয়ালের জামাইয়ের জন্যে খাঁটি ঘি-টা সন্ধের মধ্যেই পৌঁছে দিতে হবে যে!

ঘূর্ণি

অনেক দূরের গ্রাম থেকে বিয়ে করে এনেছিল কালাচাঁদ। বউ যমুনা তখনও কিছু জানত না।

বাবরি চুল ষন্ডা মানুষটাকে দেখে তার ভালোই লেগেছিল। মস্ত ছাতি, মোষের মতো চওড়া কাঁধ। গায়ের কুচকুচে কালো রং রোদ পড়লে যেন উজলে উজলে ওঠে। আর কী অসম্ভব শক্তি তার শরীরে। একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে তিনমনি ধানের বস্তাটাকে কতদূরে ছিটকে দিলে!

এমন জোয়ান, অথচ মুখোনা ঠিক বারো বছরের ছেলের মতো শান্ত আর কোমল। হাসলে ভারি লাজুক মনে হয়। যমুনা খুশি হয়েছিল। সরল মানুষটি প্রাণভরে তাকে ভালোবাসবে, আপদ-বিপদের দিন এলে লোহার মতো চওড়া বুকের ভেতরে ছোট্ট একটা পাখির মতো লুকিয়ে রাখবে—বলবে, আমি আছি, ভাবনা কী!

আসবার দিন ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল বুড়ো বাপ।

তোর মা নেই যমুনা, এইটুকু বয়েস থেকে তোকে বড়ো করে তুলেছিলুম। আজ তুই দূরদেশে চলে যাচ্ছিস, বছরে এক বারও তোকে দেখতে পাব না। কী নিয়ে আমি বাঁচব বল দিকি?

যমুনা কিছু বলতে পারেনি। চোখের জলে গলার স্বর থমকে গিয়েছিল।

কালাচাঁদ বলেছিল, তুমি ভেবো না মোড়ল। দু-চার মাস বাদ এক বার করে তোমার মেয়েকে আমি দেখিয়ে নিয়ে যাব।

কথা দাও।

কথা দিচ্ছি।

বুড়ো মোড়ল আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু সময় পেল না। নোঙর আগেই তুলে ফেলেছিল কালাচাঁদ, এবার একটা খোঁচ দিলে লগিতে। পদ্মার স্রোতে ছোট্ট একটা দুলুনি খেয়ে নৌকা ছুটল তিরের মতো। পড়ে রইল ভাঙনের মুখে হেলে-পড়া মন্দিরটা। দেখতে দেখতে মিলিয়ে এল গ্রামের চিহ্ন, কখন ছাড়িয়ে গেল শ্মশানটা। নৌকা চলল।

কালাচাঁদ বইঠা ধরে বসেছিল। যমুনার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলে, ভয় করছে তোমার?

লালশাড়ির ঘোমটাটা আস্তে আস্তে মুখ থেকে সরিয়ে দিলে যমুনা। ভিজে ভিজে পাতার তলা থেকে দুটো ডাগর চোখ মেলে ধরল স্বামীর দিকে। বললে, না।

বাপের জন্যে মনখারাপ করছে?

যমুনা জবাব দিলে না। আবার দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে এল চোখ থেকে।

কালাচাঁদ এক বারের জন্যে বইঠাটা তুলে ধরল। তারপর বললে, মনখারাপ করবারই কথা। তুমি ভেবো না, যখনই তোমার ইচ্ছে হবে নিয়ে আসব বাপের বাড়িতে। কেমন?

কৃতজ্ঞতায় যমুনা ঘাড় নাড়ল, আচ্ছা।

পদ্মার ভরা স্রোতে নৌকা চলল। যমুনা তাকিয়ে রইল জলের দিকে। গহীন অথৈ পদ্মা। এপারের গাছপালাগুলো দেখা যায়, ওপারটা একেবারে ঝাপসা। মাঝখানে জল আর জল। উঃ, কত জল আছে এই নদীতে।

হঠাৎ যমুনা জিজ্ঞেস করল, তুমি বুঝি পদ্মায় খুব নৌকা বাও?

কালাচাঁদ হা-হা করে হেসে উঠল। হাসিটা যেন কেমন বেয়াড়া আর নতুন রকমের শোনাল যমুনার কানে। চমকে চোখ তুলল যমুনা।

পদ্মার জলেই তো বাস করি বলতে গেলে। অমাবস্যার ঘুটঘুটে আঁধারে পাড়ি জমাই। ঝড়-তুফান পেরিয়ে চলে আসি।

যমুনা শিউরে উঠল মনে মনে।

ভয় লাগে না তোমার?

কালাচাঁদ শব্দ করে হাসল না বটে, কিন্তু হাসি এবার ঝরে পড়ল গলা দিয়ে।

পদ্মার ধারে যে ঘর বাঁধে, পদ্মাকে ভয় করলে তার চলে?

কিন্তু এ যে রাক্ষুসি নদী!

কালাচাঁদ বললে, উঁহুঁ, মা। মা কালী। ঝড় উঠলে, রাত কালির মতো কালো হয়ে গেলে খাঁড়া নিয়ে নাচতে শুরু করে। সে-নাচ দেখলে আর ভয় হয় না বউ, সঙ্গে সঙ্গে নেচে উঠতে ইচ্ছে করে। তোমাকেও সে-নাচ দেখাব বউ, কোনোদিন ভুলতে পারবে না।

আমার দেখে দরকার নেই। যমুনা কেঁপে উঠল।

কালাচাঁদ একটু চুপ করে রইল, বইঠা বাওয়া বন্ধ করে স্নেহভরা চোখ মেলে চেয়ে রইল যমুনার দিকে। ছেলেমানুষ, এখনও কিছু জানে না। কিন্তু আস্তে আস্তে সব সয়ে যাবে ওর। রাত্রের পদ্মাকে চিনবে, রাত্রের পদ্মায় যা ঘটে তা-ও ওর কাছে তখন আর ভয়ংকর ঠেকবে না। ঠিক কথা, মা-র সেই কালীমূর্তি এক বার যে দেখেছে, তার চোখ সে-রূপে একেবারে ডুবে গেছে। যমুনারও তাই হবে।

কিন্তু এখনই নয়। এই দিনের আলোয় পদ্মা আর এক রকম। এ মা-র আর এক চেহারা। কোলে তুলে নেয়, আদর করে, ঠাণ্ডা হাওয়ার আঙুল বুলিয়ে দেয় গায়ে। এই পদ্মার মাঝিরা সারি গায়, ধানের নৌকা গঞ্জে এসে ভেড়ে, বাচ্চারা মোচার খোলা ভাসায়, দামাল ছেলে ঝাঁপাই ঝোড়ে, বউ-ঝিরা কলসি ভরে নিয়ে যায়, জেলের জালে রুপোলি ইলিশ ঝিলমিল করে। এই পদ্মা ফসল দেয়, বাঁকে বাঁকে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। তুফানের রাতের কথা এখন থাক।

কালাচাঁদের চোখ আর মন পদ্মার ওপর দিয়ে ছড়িয়ে গেল। সাদা ঘোলাজল তো নয়, যেন মায়ের দুধ! মাটি সেই দুধ টেনে নিচ্ছে শিশুর মতো, পুষ্ট হয়ে উঠছে ধানের চারা, আম-জাম নারকেল-সুপুরি রসে-শাঁসে ভরে উঠেছে। যমুনার ভীরু মুখের ওপর দৃষ্টি ফিরিয়ে এনে একটু চেয়ে রইল কালাচাঁদ, গুনগুন করল বার কয়েক, তারপর গান ধরল গলা ছেড়ে :

পদ্মা মোদের মা জননী রে,
পদ্মা মোদের প্রাণ,
তার সোনার জলে মোদের খেতে
ভরে সোনার ধান রে
ভরে সোনার ধান–

মুগ্ধ আনন্দে চোখের তারা দুটো বড়ো হয়ে উঠল যমুনার। এমন ষন্ডা জোয়ান মানুষটা, এত বড়ো বুকের ছাতি, এমন লোহার মতো হাতের গুল, তার গলায় এই গান! আর এত মিষ্টি তার গলা! পদ্মার বুকের ওপর দিয়ে দরাজ গলার এই গান যেন দূরদূরান্তে ভেসে যেতে লাগল।

যমুনার মুখের দিকে আড়চোখের দৃষ্টি রেখে কালাচাঁদ গেয়ে চলল :

রঙ্গিলা নাও স্রোতে বাইয়া
বন্ধু আসে ভিনদেশিয়া
আর আপন ভুলে রূপবতী
ভাসায় কলসখান–

যমুনার চোখে আর পলক পড়ে না। এই রূপবতী কে? সে-ই? আর এই কি সেই ভিনদেশিয়া বন্ধু, যে এমন করে তাকে রঙিলা নায়ে তুলে নিয়ে ভেসে চলেছে?

যমুনা স্বপ্ন দেখছিল, কিন্তু স্বপ্নটা ভেঙে গেল আচমকা।

নৌকার সঙ্গে সঙ্গে ওটা কী চলেছে? শ্যাওলা-ধরা কাঠের গুড়ি? না, তা তো নয়! পিঠের ওপরে কাঁটার মতো উঁচু উঁচু হয়ে আছে, চারটে ছোটো ছোটো কদাকার পা জল টানছে, সরু সুচালো মুখ, আর জলের একটু ওপরে দুটো হিংস্র পলকহীন চোখ যেন একভাবে চেয়ে আছে তার দিকে!

কুমির! কুমির! ভীত বিকৃত গলায় চেঁচিয়ে উঠল যমুনা।

সঙ্গে সঙ্গে জলের দিকে চোখ গেল কালাচাঁদের, আচমকা থেমে গেল গানটা! হিংস্র কর্কশ গলায় বললে, শা-লা। তারপর বইঠাটা বাগিয়ে ঢপাস করে একটা প্রচন্ড ঘা বসাল কুমিরটার পিঠের উপর।

ল্যাজের একটা বিরাট ঝাপটা দিয়ে, একরাশ জল ছলকে দিয়ে কুমির ডুবে গেল। যমুনা তখনও কাঠের পুতুলের মতো শক্ত হয়ে আছে। কালাচাঁদ হেসে বললে, ভয় নেই—ভয় নেই। আমরা আছি নৌকার উপর, ও-শালা আমাদের কী করবে। আর জলের তলায় হলেই বা কী করত? কালাচাঁদ দুলেকে চেনে না, গলা টিপে মেরে ফেলতুম ওকে।

কুমিরের চাইতে আরও নিষ্ঠুর—আরও বীভৎস দেখাল কালাচাঁদের চোখ। যমুনা ভরসা পেল না, আরও শক্ত হয়ে ঠায় বসে রইল, বুকের ভিতরটা তার হিম হয়ে গেছে। কিছুই জানত না যমুনা, তবু এই মুহূর্তে কেমন করে যেন টের পেল–কালাচাঁদকে সে যা ভেবেছিল, কালাচাঁদ ঠিক তা নয়।

২.

চাষির ছেলে, অথচ চাষবাস করে না। জমিজমা বলতেও কিছু নেই। অল্পস্বল্প ঘরামির কাজ জনমজুর খাটা। তবু টিনের নতুন দো-চালা ঘর, গোয়ালে তিন-তিনটে গোরু। ত্রি-সংসারে কোথাও কেউ নেই।

এই হল কালাচাঁদের সংসার।

তখনও কিছু টের পায়নি যমুনা। পেল সেদিন, যেদিন অনেক রাতে কোত্থেকে একপেট মদ খেয়ে ফিরল কালাচাঁদ। ভাত আর মাছের ঝোল রান্না করে যমুনা ঝিমুচ্ছিল দাওয়ায় বসে বসে। পেয়ারা গাছের পাশে হলদে রঙের এক টুকরো চাঁদ ঝুলে পড়ছিল, থেকে থেকে ডাহুক ডাকছিল ঝোপের ভেতর। যমুনা ঝিমুচ্ছিল আর আলগা আলগা স্বপ্নের মধ্য দিয়ে টুকরো টুকরো মেঘের মতো ভেসে যাচ্ছিল ছাড়া ছাড়া কতগুলো ছবি। মাকে উঠোনে নামানো হয়েছে, একমাথা রুখো চুল ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। ছোট্ট যমুনা কাঁদছে লুটোপুটি খেয়ে, পাশের বাড়ির মানিকের মা কী যেন বোঝাতে চাইছে তাকে। বাবা একটা নারকেল গাছে হেলান দিয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে। তারপরে বৃষ্টি পড়ছে, অনেক-অনেক বৃষ্টি। উঠানে ব্যাং লাফাচ্ছে–একটা-দুটো-তিনটে-চারটে। বাবা হাট থেকে আসছে, বেলা ডুবে যাচ্ছে, যমুনা দাঁড়িয়ে আছে দোরগোড়ায়। বাবা এসে যমুনাকে দু-হাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নিলে, বললে, কী সুন্দর শাড়ি কিনে এনেছি তোর জন্যে। বিক্রমপুরের তাঁতের শাড়ি, ময়ূরকণ্ঠী রং…

কড়-কড়াং! যেন বাজ পড়ল কোথাও। চমকে উঠে বসল যমুনা। সদর দরজাটা আছড়ে ফেলে বাড়িতে ঢুকল কালাচাঁদ, টলতে টলতে এগিয়ে এল।

মদ খাও নাকি তুমি? যমুনা চেঁচিয়ে উঠল।

কারও বাপের পয়সায় খাই নাকি? রূঢ় কর্কশ জবাব এল একটা।

ছি, ছি!

চুপ কর হারামজাদি। গলাটাকে সপ্তমে চড়িয়ে কালাচাঁদ জানোয়ারের মতো গর্জন করে। উঠল, চেঁচাবি তো গলা টিপে মেরে ফেলব!

নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না যমুনা, নিজের কানকেও নয়। লণ্ঠনের একমুঠো আলো গিয়ে পড়েছে কালাচাঁদের মুখে। সেই কালাচাঁদ, কিন্তু এক মাস ধরে যমুনা যার ঘর করেছে এ সে নয়। সমস্ত চেহারার আদলটাই বদলে গেছে তার। এখনই একটা লোহার মতো থাবা বাড়িয়ে সে যমুনার গলা টিপে ধরতে পারে।

যমুনা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

আস্তে আস্তে স্বামীকে চিনল যমুনা। কালাচাঁদের আসলে পেশা ডাকাতি। রাতের অন্ধকারে পদ্মার বুকে সে ডাকাতি করে বেড়ায়।

প্রথম জানবার পর তিন রাত সে ঘুমোতে পারেনি। চোখের জলে ঘরের দাওয়া ভিজিয়ে ফেলেছে, ছুটে পালিয়ে যেতে চেয়েছে বাপের কাছে। কিন্তু কালাচাঁদের চোখের দিকে তাকিয়ে সে সাহসও পায়নি। কোথায় যাবে, কোনখানে পালাবে? কালাচাঁদের হাত থেকে তার পরিত্রাণ নেই কোথাও।

কেঁদেছে, নিজের মাথা খুঁড়েছে মাটিতে, তারপর ভাগ্যের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। দেখেছে সন্ধ্যার অন্ধকারে ছায়ামূর্তির মতো একদল মানুষ এসে জড়ো হয় তাদের বাড়ির দাওয়ায়, ফিসফিস করে কথা বলে, মদ খায়, গাঁজা খায়, তারপর একসঙ্গে কোথায় বেরিয়ে চলে যায়। অসম্ভব ভয়ে সারারাত জেগে জেগে দুঃস্বপ্ন দেখে যমুনা। ভোর হওয়ার আগে ফেরে কালাচাঁদ, টাকা এনে ঢালে মেজের ওপর, আনে রক্তমাখা গয়না। দাঁতে দাঁত চেপে যমুনাকে বলে, একটা টু শব্দ যদি করবি কারও কাছে, তাহলে গলা কেটে পদ্মায় ফেলে দেব—মনে থাকে যেন।

যমুনা বালিশ কামড়ে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে, নিশ্বাস পর্যন্ত বন্ধ হয়ে আসে তার। তারপর একটা ছোটো শাবল দিয়ে ঘরের কোনায় গর্ত করে টাকা-গয়নাগুলো পুঁতে রাখে কালাচাঁদ। বিড়ি ধরিয়ে যমুনার পাশটিতে এসে শোয়। আতঙ্কে শরীর সিঁটিয়ে ওঠে যমুনার, স্বামীর গা থেকে যেন মানুষের রক্তের আঁশটে গন্ধ পায় সে!

কালাচাঁদের মনটা নরম হয় এতক্ষণে, হাত বাড়িয়ে যমুনাকে টেনে নিয়ে আদর করতে থাকে। যমুনার মনে হয় একটা বাঘ যেন মেরে ফেলবার আগে খেলা করছে শিকারটাকে নিয়ে। চোখের পাতা চেপে ধরে সে শক্ত হয়ে থাকে।

চোখ মেলে চা বউ, চোখ মেলে চা। তোর জন্যই তো এসব করি। একছড়া সুন্দর হার পেয়েছি, পরিয়ে দেব তোকে।

প্রায় নিঃশব্দ গলায় যমুনা বলে, হার আমি চাই না, তোমার পায়ে পড়ি, এই মানুষ মারার কাজ তুমি ছেড়ে দাও। তারপর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করে।

বিরক্ত হয়ে কালাচাঁদ বিড়বিড় করে, দুত্তোর, মেয়েমানুষের নিকুচি করেছে।

যমুনাকে ছেড়ে দিয়ে কাত হয়ে শোয়। ভাবে, বিয়ে না করেই বেশ ছিল। দলের শাকরেদ রাখালের সেই বিধবা বোনটাই ছিল তার সত্যিকারের যোগ্য। যমুনার মতো একটা ভিজে কাঁথা নয়, তেতে থাকত আগুনের মতো। তেমনি ছিল সোনা আর পয়সার খাঁই। কালাচাঁদের সড়কিতে নিজের হাতে শান দিয়ে বলত, একসঙ্গে তিনটেকে ফুড়তে পারবে এমনি করে ধার দিয়ে দিলুম।

তিন দিনের জ্বরে মরে গেল। নইলে কি আর যমুনাকে বিয়ে করে আনত সে? রাখালের বোনটার কথা ভাবতে ভাবতে কালাচাঁদের ক্লান্ত শরীর ঘুমে জড়িয়ে আসে, নাক ডাকতে শুরু করে। আর আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে যায় যমুনা—আকাশে সকালের আলো ফুটেছে।

তবু চেষ্টা করেছে যমুনা। দিনের আলোয় কালাচাঁদের মনটা ভালো থাকলে, তার মুখোনাকে বারো বছরের ছেলের মতো শান্ত আর কোমল দেখালে—সেই সময়।

আচ্ছা, তোমার পরকালের ভয় নেই?

দুত্তোর পরকাল! ওসব বুঝি না!

খুন কর কেন?

সহজে করি না তো? চিনে না-ফেললে কিংবা বাধা না-দিলে হাত ছোঁয়াই না কারুর গায়ে।

মানুষ মারতে কষ্ট হয় না?

কই মাছ কুটতে কষ্ট হয় তোর? হাঁস কাটতে?

এক হল?

কালাচাঁদ হাসে, তফাত কিছু নেই। লাল রক্ত বেরোয়, ছটফট করে, তারপর সব ঠাণ্ডা।

যমুনা চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। আবার বলে, পরকালের ভয় না-ই করলে, পুলিশকে ভয় হয় না? ধরতে পারলে যে নিয়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেবে।

এই ভয়টা কালাচাঁদেরও নেই তা নয়। পুলিশের নজর তার ওপর আছেই। যমুনাকে বিয়ে করে আনবার আগে দু-তিন বার দারোগা এসে এটা-ওটা জিজ্ঞেস করে গেছে তাকে। কিন্তু এত সাবধান তার দলটা, এমন হিসেব করে কাজ করে যে আজ পর্যন্ত কাঁটার আঁচড়টি লাগেনি তার গায়ে। তবু মধ্যে মধ্যে বুক ধুকপুক করে। জলপুলিশের লঞ্চ ইদানীং একটু বেশি যাওয়া-আসা করছে এই তল্লাট দিয়ে। ভয় করে বই কী কালাচাঁদের।

আর ভয় করে বলেই সেটাকে আরও বেশি করে উড়িয়ে দিতে চায়। হা-হা করে হাসে এবারে।

ওঃ, পুলিশ। পুলিশ ঢের দেখেছি।

বেশ, পুলিশও নয় কিছু করতে পারবে না। কিন্তু টাকা তো কম জমল না। কেন আর এসব করে বেড়াও তুমি? যা আছে তাই দিয়ে জমিজমা কেনো, বলদ আনো, চাষবাস করো।

বলিস কী! সড়কি ফেলে লাঙল নেব! জোয়ানের কাজ ছেড়ে চাষা হয়ে যাব।

কোনো লজ্জা নেই। চাষেই তো লক্ষ্মী। দোহাই তোমার—অনেক তো করলে, এবার ছেড়ে দাও এসব।

দাঁড়া দাঁড়া। আর দু-চারটে ভালো খেপ মেরে নিই, তারপর…

না না, এখুনি। আজ থেকেই ছেড়ে দাও। যমুনা পা জড়িয়ে ধরে, ছেড়ে দাও এসব।

আবার রাখালের বোনটাকে মনে পড়ে, বুকের ভেতরটা যেন জ্বালা করতে থাকে কালাচাঁদের। উঠে দাঁড়িয়ে বলে, দেখব, দেখব ভেবে।

ভাবে কালাচাঁদ। পুলিশের ভয়, ফাঁসির দড়ি। ছেড়েছুড়ে দিলেও মন্দ হয় না। কিন্তু তার বদলে চাষা? লাঙল চেপে ধরে দুপুরের রোদে হাল দেওয়া, জল-কাদার ভেতর ধান রোয়া, সকাল থেকে নুয়ে নুয়ে পিঠ কুঁজো করে ফসল কাটা। পারবে কালাচাঁদ? তার মেজাজে কুলোবে?

তা ছাড়া রাত? ডাকিনীর মতো কালো হয়ে আসে। পদ্মা তার ঝোড়ো চুল মেলে দিয়ে ডাক দেয়। অথই গহীন জলের ওপর খাঁড়া নাচতে থাকে। সঙ্গীরা আসে, ফিসফিস করে খবর দিয়ে যায় পাট বিক্রি করে ফিরছে নামকরা মহাজন, নৌকাটা ধরতে পারলে…

বুকে ঢেউ দোলে, খাঁড়া নাচিয়ে পদ্মা ডাক দেয়। মাথার ভেতর মদের নেশা আগুনের চাকা হয়ে ঘুরতে থাকে। কালাচাঁদ আর থাকতে পারে না। খিদেয় ছটফটিয়ে ওঠা বাঘ হরিণের গন্ধ পায়।

তারপর নদী।

ছিপের দাঁড় তালে তালে পড়তে থাকে, জল কেটে সোঁ সোঁ করে এগিয়ে চলে। বারো চোদ্দো জোড়া চোখ অন্ধকারে জোনাকির মতো জ্বলে, একটা মিটমিটে আলো দুলতে থাকে–পাটবেচা মহাজনের নৌকাটা আসছে। মাঝপদ্মা, নিথর রাত—পদ্মার জলে খড় ঝলকায়। তখন কোথায় যমুনা, কোথায় কে?

দাওয়ার খুঁটি ধরে বসে আছে যমুনা। জল গড়াচ্ছে চোখ দিয়ে।

সকালে দৃশ্যটা দেখেই বিরক্ত হয় কালাচাঁদ।

এই সাতসকালেই কাঁদতে বসলি কেন?

যমুনা চুপ করে রইল।

তবে তুই কাঁদ বসে বসে, আমি চললুম কালাচাঁদ পা বাড়াবার উদ্যোগ করল।

একটু দাঁড়াও। যমুনা চোখের জল মুছল, কথা শুনবে একটা?

আবার ওইসব বলবি তো? কালাচাঁদের মুখে মেঘ ঘনিয়ে এল, তুই যা শুরু করেছিস, এরপর বাড়ি ছেড়ে পালাতে হবে আমাকে। নইলে গিয়ে ধরা দিতে হবে পুলিশের হাতে।

যমুনা চোখ দুটো মেলে ধরল কালাচাঁদের দিকে। কাঁপা গলায় বললে, আমার কথা নাহয়–ই ভাবলে। আমার পেটে যে আসছে তার কথা এক বার ভাবো। তোমার যদি একটা-কিছু হয় তাহলে…

যমুনাকে শেষ করতে দিলে না কালাচাঁদ। সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ল বউয়ের পাশে, দু-হাতে জড়িয়ে ধরল কোমরটা।

তোর ছেলে হবে বউ? সত্যি, ছেলে হবে তোর?

আনন্দে আদরে যমুনাকে ভরে দিলে এক মুহূর্তে। বদলে গেছে কালাচাঁদ—আবার সেই মানুষটা, বিয়ের আগে যার মস্ত জোয়ান শরীরটার ওপর ছেলেমানুষের মতো একখানা মুখ দেখে ভারি ভালো লেগেছিল যমুনার।

অনেকক্ষণ পরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললে, ডাকাতের ছেলে ডাকাত হবে—এই কি তুমি চাও?

কালাচাঁদ চুপ করে রইল একটু। তারপর ধীরে ধীরে বললে, না, এবার থেকে ভালো হয়ে যাব, সব ছেড়ে দেব–দেখে নিস তুই।

৩.

ছেলেই হল। গোলগাল, হৃষ্টপুষ্ট। কোলে তুলতে কাঁকাল বেঁকে আসে যমুনার। বড়ো হলে বাপের মতো হয়ে উঠবে, এখুনি ফুঠে বেরুচ্ছে তার লক্ষণ।

কিন্তু কেবল জোয়ানই হবে বাপের মতো? ভাবতে গিয়ে চোখে অন্ধকার নামে।

কথা রাখতে চেষ্টা করেছিল কালাচাঁদ। প্রায় এক বছর সে যেন নতুন হয়ে গিয়েছিল। ঘরে পোঁতা টাকাকড়ি যা আছে আছেই, তবুও আবার মন দিয়ে ঘরামির কাজ শুরু করেছিল এখানে-ওখানে। জনমজুরির খোঁজে আসা-যাওয়া করেছিল দূর দূর গ্রামে। যমুনাকে নিয়ে গিয়েছিল বাপের বাড়ি, বুড়োকে দেখিয়ে এসেছিল নাতির মুখ।

বুড়ো কেঁদে অস্থির হয়ে গিয়েছিল।

তবু ভাগ্যিস এতদিনে মনে পড়ল বাপটাকে।

কী করব বাবা, অনেক দূরের পথ যে।

না-এলি, না-এলি। তোরা সুখে থাকলেই আমার সুখ। হ্যাঁ রে, তোকে তো কালাচাঁদ কোনো কষ্ট দেয় না? ভাত-কাপড়ের দুঃখু পাসনে তো?

এক বারের জন্যে মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল যমুনার। না, ভাত-কাপড়ের কষ্ট নেই। কষ্ট যে তার কোথায়, সেকথা মুখফুটে কোনোদিন বলতে পারবে না যমুনা, শুধু ভেতরে ভেতরে পুড়ে খাক হয়ে যাবে তুষের আগুনে।

না বাবা, কোনো কষ্ট নেই।

বলে যমুনা ভেবেছিল— সত্যিই তো। এই সাত-আট মাসের ভেতরে কালাচাঁদ এক বারও রাত্রে বেরোয়নি পদ্মার বুকে হানা দিতে, রক্তমাখা পাপের ধন নিয়ে আসতে। ছেলের ভবিষ্যৎ ভেবে বদলে গেছে সে। জমি কেনবার কথা ভাবছে, বলদও মনের মতো খুঁজছে হাটে হাটে। না, যমুনার কোনো দুঃখ নেই।

ফিরে আসবার সময় তেমনি করেই বুড়ো বাপ এসে দাঁড়িয়েছিল ঘাটে। আর পদ্মার স্রোতে তেমনি তিরের মতো ভেসে গিয়েছিল নৌকা। এবার আর কালাচাঁদ কথা বলেনি, গান গায়নি, নিঃশব্দে বইঠা টানতে টানতে তাকিয়ে ছিল জলের দিকে।

কী ভাবছ? যমুনা জিজ্ঞেস করেছিল।

উঁ?

কী ভাবছ চুপ করে?

ক্লান্তভাবে হেসেছিল কালাচাঁদ। বলেছিল, ভাবছি তোর কথাই সত্যি হল তাহলে। এরপর থেকে একেবারে চাষাই হয়ে যাব। রাতের পদ্মা যখন কালো আঁধারে ডাক পাঠাবে, তখন সে-ডাক আমি আর শুনতে পাব না, একপেট পানতা ভাত খেয়ে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোব কেবল।

আবার ওই কথা? ফের যদি ওসব বলবে, তাহলে ছেলে বুকে করে আমি সোজা গাঙের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে পড়ব এই বলে দিচ্ছি তোমাকে।

কালাচাঁদ আর কথা বলেনি। চুপ করে বইঠা টেনেছে বসে বসে।

হ্যাঁ, চেষ্টা সে করেছিল। মদ ছেড়ে তাড়ি ধরেছিল, তাও হপ্তায় এক-আধ দিনের বেশি নয়। সন্ধ্যার অন্ধকারে যারা ছায়ামূর্তির মতো আসা-যাওয়া শুরু করেছিল, টিটকিরি দিত তারা।

কী হল তোর? বউয়ের আঁচল ছেড়ে যে নড়তে চাসনে?

আর ভালো লাগে না এসব। আমাকে আর ডাকিনি। পাপ কাজের ভেতরে আমি আর নেই। ছেলের আখেরটা তো দেখতে হবে।

আরে ছেলের আখেরের কথাই তো হচ্ছে। একটু বড় হলেই সঙ্গে নিবি। নিজের হাতে শিখিয়ে পড়িয়ে নিবি এখন থেকে। তবে-না বাপের নাম রাখতে পারবে।

না। ওসব করব না আমি।

পাগলামো করিসনি কালাচাঁদ। একজন ধমকে দেয়, ওই বউ-ই তোর মাথা খেয়েছে। দে ওটাকে তাড়িয়ে। তুই সঙ্গে না বেরুলে আমরা জোর পাই না—কানা হয়ে যাই। বউটাকে দে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে।

কালাচাঁদ চুপ করে থাকে। তার মুখের চেহারা দেখে বোঝা যায়, কথাটা তার পছন্দ হয়নি।

একজন টিপ্পনী কেটে বলে, তাহলে একদিন রাতে মুখে কাপড় বেঁধে দিই বউটাকে লোপাট করে। তারপর…

হঠাৎ কালাচাঁদ বেসুরো গলায় গর্জন করে ওঠে। দপ দপ করে জ্বলে ওঠে চোখ, মুখের চেহারা হয়ে ওঠে হিংস্র জানোয়ারের মতো। কালাচাঁদ বলে, খবরদার-খুন করে ফেলে দেব এসব বললে। মুখ সামাল!

আহা-হা! ঠাট্টাও বুঝতে পারিসনে?

না, ওসব ঠাট্টা আমার ভালো লাগে না।

দলের লোকেরা নিরাশ হয়ে চলে যায়। কিন্তু কালাচাঁদ খুশি হতে পারে না। মনের ভেতর সমানে জ্বলে যেতে থাকে। ওদের কথাগুলো বাজতে থাকে কানে।

যমুনা এসে বলে, অনেক রাত হল যে। খাবে না?

না।

কী হল?

কালাচাঁদ ধমক দিয়ে বলে, বিরক্ত করিসনি আমাকে। তোর ইচ্ছে হয়, একপেট গিলে পড়ে থাক গে।

নিজের ওপর রাগ হয় কালাচাঁদের, অকারণ বিদ্বেষে মনটা ভরে ওঠে। ঘরামি-জনমজুর চাষি! রাত্রের পদ্ম আর তাকে কোনোদিন ডাক পাঠাবে না। সে তার জীবন থেকে সরে গেছে চিরকালের মতো। এখন ভালোমানুষ হবে কালাচাঁদ, পরের ঘর ছেয়ে দেবে, বেড়া বাঁধবে, ফসল কাটবে।

অসহ্য মনে হয়।

সব ওই যমুনার জন্যে। যদি রাখালের বোনটা অমন করে না মরে যেত, যদি সে বিয়ে করে না আসত, যদি ছেলেটা না হত কীসের ভয় ছিল কালাচাঁদের, কাকেই-বা পরোয়া করত সে? যেমন চলছিল, তেমনিই চলত। পুলিশের হাতে ধরা পড়ে ফাঁসিতে ঝুলতে হলেই-বা কী আসত-যেত তার! জোয়ান চিরকাল জোয়ানের মতোই মরে।

কিন্তু…

মাথাটা দু-হাতে টিপে ধরে বসে থাকে কালাচাঁদ। কিছু ভালো লাগে না। বিশ্রী অশ্লীল ভাষায় পৃথিবীসুদ্ধ লোককে তার গালাগাল দিতে ইচ্ছে করে।

যমুনা আবার এসে জিজ্ঞেস করে, খেয়ে নিলে হত না?

দূর হয়ে যা সামনে থেকে। উঠে ছিটকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় কালাচাঁদ।

আরও এক মাস যায়, দু-মাস যায়, জমি কিনব কিনব করেও কেনা হয় না। হাটে হাটে ঘুরেও বলদ পছন্দ হয় না কিছুতেই। আর রাত জেগে জেগে শোনে দূরে পদ্মার ঢেউ ভাঙার শব্দ। ভাবে অন্ধকারে নিশ্চিন্ত টাকার থলে নিয়ে পদ্মায় পাড়ি দিচ্ছে পাটবেচা মহাজন, ভারী ভারী গয়নাপরা মেয়েদের নিয়ে নৌকা চলেছে দূরের শহরে। কালাচাঁদের মাথার ভেতর তুফান ছুটতে থাকে।

ছেলেটাকে বুকে নিয়ে যমুনা ঘুমিয়ে পড়লে এক-একদিন এসে দাঁড়ায় পদ্মার ধারে। কালো উজ্জ্বল জল যেন হাতছানি দিয়ে তাকে ডাক পাঠায়। মানুষ শিকার করার স্মৃতিগুলো সব ভেসে ওঠে চোখের সামনে। থাকতে পারে না কালাচাঁদ, একটা ডিঙি খুলে নিয়ে ভাসিয়ে দেয় অন্ধকার নদীতে, ঘণ্টা খানেক পাগলের মতো বইঠা টেনে মনের অসহ্য অস্থিরতাটাকে খানিক শান্ত করতে চেষ্টা করে।

কিন্তু আর পারল না শেষপর্যন্ত।

সেই ছায়ামূর্তিরা এল, অনেকক্ষণ ধরে আলাপ করল ফিসফিসে গলায়। তারপর… কালাচাঁদ বললে, বউ যাচ্ছি!

কালাচাঁদের মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পেরেছিল যমুনা। ভয়ে পিছিয়ে গেল দু-পা। কোথায় যাবে?

শিকারে।

আবার? তুমি যে আমায় কথা দিয়েছ।

কথা দিয়েছি! কদর্যভাবে মুখ ভ্যাংচাল কালাচাঁদ, তুই আমায় ভেড়য়া বানিয়েছিস, সকলের কাছে ইজ্জত নষ্ট করেছিস। আমি আর এভাবে থাকতে পারব না, পাগল হয়ে যাব।

যাবার জন্যে পা বাড়াল কালাচাঁদ। যমুনা দু-হাতে পা জড়িয়ে ধরল তার।

আমার কথা না-শোনো না-ই শুনলে। কিন্তু ছেলেটা…

কালাচাঁদের সমস্ত চেহারাটাকে বুনো মোষের মতো দেখাল। হিংস্র গলায় বললে, পা ছাড়, ছেড়ে দে বলছি।

দোহাই তোমার, ছেলেটার কথাও একটি বার…

ছেলে নিয়ে পদ্মায় ডুবে মর তুই। তোরও শান্তি, আমিও বেঁচে যাই। পা ছাড় হারামজাদি।

ধৈর্যের শেষ সীমায় এসে লাথি মারল কালাচাঁদ। যমুনা ছিটকে পড়ল তিন হাত দূরে। এক বারের জন্য অনুতাপ এল মনে। এক বার ভাবল…

কিন্তু ভাবলেই জট পাকায়। এতদিন ধরে যত ভেবেছে ততই যমুনার জালে সে জড়িয়ে গেছে, টের পেয়েছে ধীরে ধীরে তার শক্তি শুকিয়ে আসছে, সাহস থমকে দাঁড়াচ্ছে। কালাচাঁদ আর অপেক্ষা করল না, পদ্মা তখন তার নাড়ি ধরে টান দিয়েছে।

নৌকাতে ছিল চক্রবর্তী। মেয়ের বিয়ের জন্যে গয়না কিনে নিয়ে ফিরছিল।

কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে এল, ছাইয়ের মতো তার মুখ।

দোহাই বাবা, গরিব ব্রাহ্মণকে ছেড়ে দাও, ব্রহ্মস্ব হরণ কোরো না।

জবাব দিলে রাখাল। চক্রবর্তীর গলার ওপর রামদা বাগিয়ে ধরে বললে, চুপ কর বুড়ো শয়তান কোথাকার। যা আছে বের করে দে এখুনি। নইলে এক কোপে মাথা উড়িয়ে দেব।

তেমনি থরথর কাঁপতে কাঁপতে হাঁটু ভেঙে বসে বড়ল চক্রবর্তী। ভাঙা ঘ্যাসঘেসে গলায় বললে, বাবাসকল, দয়া করে… চুপ। কী আছে দে এখুনি!

চক্রবর্তী বেঁচে যেত, অনর্থক একটা বুড়ো মানুষকে খুন করে হাত নোংরা করবার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু নৌকার লণ্ঠনের মিটমিটে আলোয় কালাচাঁদের মুখের দিকে তার চোখ পড়ল। দুগ্রহ।

চক্রবর্তী যেন সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে কুটো কুড়িয়ে পেল।

তুমি বাবা কালাচাঁদ না? রায়নগরে চাটুজ্জেদের রান্নাঘর ছেয়ে দিয়েছিলে না গত বছর? বলতে বলতে আশায় জ্বলে উঠল চক্রবর্তীর মুখ। আমি সে-বাড়িতে ছিলুম, তারা আমার কুটুম। বসে বসে তামাক খেতুম আর তোমার সঙ্গে কত গল্প…

কথাটা আর শেষ হল না। রাখালের হাতের রামদা নেচে উঠল বিদ্যুতের মতো। চক্রবর্তীর মনে হল ঘাড়ের ওপর খুব জোরে কে একটা ধাক্কা দিয়েছে। তারপরেই মাথাটা ছিটকে পড়ল পাটাতনের ওপর। চোখ দুটো তখনও জ্বলজ্বল করছে, ঠোঁট দুটো বাকি কথাটা শেষ করতে চাইছে তখনও। কবন্ধটা কয়েক সেকেণ্ড স্থির হয়ে বসে রইল। আট-দশটা শিরা থেকে ফোয়ারার মতো ছিটকে উঠল রক্ত, তারপর উবুড় হয়ে পড়ে গেল শরীরটা।

শা-লা! চিনে ফেলেছিস। রাখালের চোখ দুটো অদ্ভুত দেখাচ্ছে, মনে হল এখন সে রক্ত খেতে পারে।

একটা মাঝি নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তাকে ধরা গেল না। আর-একটা বল্লমের মুখে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেল।

এ খুন এই প্রথম নয়, এমন আরও অনেক বারই ঘটেছে কালাচাঁদের। নিজের হাতেই যে কতগুলোকে শেষ করেছে সেকথা আঙুল গুনেও বলতে পারে না। তবু হঠাৎ রক্ত দেখে মাথাটার ভেতর কেমন পাক খেয়ে গেল তার। চোখ বুজে বসে পড়ল পাটাতনের ওপর।

ঝিম ভাঙল কার যেন ঝাঁকুনিতে।

কী হল তোর? এই কালাচাঁদ, এই…

কিছুই হয়নি, চোখ খুলে উঠে পড়ল কালাচাঁদ। চক্রবর্তীর রক্তে সারা গা তার মাখামাখি।

শেষরাতে যখন স্নান করে বাড়ি ফিরল, রক্তের গন্ধটা তখনও যেন জড়িয়ে আছে শরীরে, কেমন গুলিয়ে উঠছে শরীর।

চক্রবর্তীকে খুন না করে উপায় ছিল না, চিনে নিয়েছিল। তবু–তবু–

শালা!

নিজের উদ্দেশেই গালাগাল করলে কালাচাঁদ। এই অধঃপাত হয়েছে যমুনার জন্যেই।সে-ই তাকে এমনভাবে সব কাজের বার করে দিয়েছে। মানুষের রক্ত দেখে আজ তার মাথা ঘুরে গেল—ছি ছি! এরপরে আর তার মুখ-দেখানোর জো রইল না। বাড়ির দরজায় পা দিয়ে কালাচাঁদ ভাবল, আজ বউটা একটা কথাও বলতে এলে একচোট বোঝাপড়া হয়ে যাবে তার সঙ্গে।

কিন্তু কিছুই করবার দরকার হয় না কালাচাঁদের।

ভাঙা চাঁদের আলো পড়েছে বারান্দায়। সেইখানেই মুখথুবড়ে শুয়ে আছে যমুনা।

এই ওঠ, ওঠ। ওঠ-না হারামজাদি! দরজা খোলা রেখে এইভাবে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিস!

যমুনার সাড়া এল না। কালাচাঁদের পায়ের গুতোয় সমস্ত শরীরটা একবার নড়ে উঠল কেবল। আর তখনি একটা তীব্র দুর্গন্ধ এসে লাগল নাকে-মুখে, চাঁদের বিবর্ণ আলোয় দেখল খানিকটা তরল জিনিস লেপটে আছে যমুনার সর্বাঙ্গে, সারা বারান্দায়।

ঘরের বারান্দায় মিটমিট করছে লণ্ঠন। পলতেটা বাড়িয়ে দিল কালাচাঁদ, তারপর সেটা নিয়ে যমুনার মুখের ওপর এক বার ঝুঁকে পড়েই দু-হাত পিছিয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে।

দুটো সাদা পর্দা নেমে এসেছে যমুনার খোলা চোখে—যেন মরা পাখির চোখ। ঠোঁটের দু পাশে গলায় বুকে বমি চিকচিক করছে এখনও।

কলেরা।

কখন বার কয়েক ভেদবমি করে এই বারান্দার ওপরেই মুখথুবড়ে মরেছে যমুনা। কালাচাঁদকে ছুটি দিয়ে গেছে চিরকালের মতো। আর কাঁদবে না, বাধা দেবে না, বারণ করবে না কোনোদিন।

চক্রবর্তীর রক্ত দেখে যেমন হয়েছিল, তেমনি আর এক বার মাথাটা ঘুরে গেল কালাচাঁদের। একদিনে দু-বার। অন্ধের মতো বসে পড়ল সেই দুর্গন্ধ ময়লাগুলোর ওপর। ঘরের ভেতর ককিয়ে ককিয়ে কেঁদে উঠল ছেলেটা, শুকনো কাতর গলায়। ওর খিদে পেয়েছে, মায়ের দুধ চায় এখন।

৪.

ক্রমশই দূর আকাশের একেবারে শেষ সীমায় বন্দরের আলোগুলো অস্পষ্ট হয়ে মিলিয়ে এল। মিঠাইয়ের দোকানে যে বড়ো পেট্রোম্যাক্স ল্যাম্পটা জ্বলছিল, সেটা পর্যন্ত একটা তারা হয়ে গেল কেবল। তারপরেই নীরেট অন্ধকার আর অতল গহীন পদ্মা ছাড়া ডাইনে-বাঁয়ে সামনে পেছনে দেখবার মতো কিছুই রইল না।

উজানের মুখে শিরশিরিয়ে খানিক বাতাস দিচ্ছিল, তবু স্রোতের একরোখা টানে নৌকা এগিয়ে চলল সামনের দিকেই। পদ্মার ওপর কোনাকুনি পাড়ি জমালে লক্ষ্মীপুরের বাজার, সেখান থেকে কুমারহাটির খাল বেয়ে আরও ঘণ্টা খানেকের পথ। ভোরের আলো ফুটতে-না-ফুটতেই বাড়ি পৌঁছে যাব—মথুরানাথ ঘোষাল ভাবল।

বিশাল পদ্মা, মাথার ওপর তারা-জ্বলা বিরাট আকাশ। মাঝখানে অন্ধকারের কালো পর্দা এই দুটোকে যেন একসঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। ওপরের তারারা স্থির, নীচে পদ্মার জলে লক্ষ লক্ষ তারা নেচে উঠছে একসঙ্গে, ঠিকরে পড়ছে, ছিটকে যাচ্ছে। স্রোতের মুখে ভেসে-যাওয়া পচা কচুরিপানার গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। এক-একটা কচুরির ঝাঁক পাশ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে পচা মড়ার মতো। দাঁড় টানা আর ফেলার আওয়াজ উঠছে তালে তালে। তরতর করে এগিয়ে চলেছে নৌকা। অন্ধকারে যাদের চোখ ভামবেড়ালের মতো তীক্ষ্ণ আর উজ্জ্বল হয়ে যায়, সেই মাঝিরাও কপালে হাত রেখে একাগ্রভাবে তাকিয়ে। এপার-ওপারের একটা গাছপালার আভাস পাচ্ছে না। এ বছর বান ডেকেছে অস্বাভাবিক, খ্যাপা পদ্মা মাত্রা ছাড়িয়ে নিজেকে এলিয়ে দিয়েছে।

অনেকটা আন্দাজ, অনেকখানি অভ্যাস আর রক্তের সংস্কারের ওপর ভরসা রেখে মাঝিরা পাড়ি জমিয়েছে। এক বার ওপারের ডাঙা ধরতে পারলে লক্ষ্মীপুরের বাজার খুঁজে নিতে আর কষ্ট হবে না। তবু মনের ভেতর অনিশ্চিত অবস্থা একটা আছেই। আর সেইটে কাটাবার জন্যে একজন গান ধরেছে :

কোন দেশেতে গেলা বন্ধু
পাথার দিয়া পাড়ি,
আমার সাথে দিয়া গেলা
জীবন-ভরা আড়ি রে–

যে দুজন দাঁড় টানছিল, তাদের একজন মাঝপথে থামিয়ে দিলে গানটাকে।

একটু সামাল ভাই, খেয়াল থাকে যেন। বড় পাকটা অনেক নৌকা গিলেছে এবার।

হালের মাঝিই গান ধরেছিল। সে বললে, ভয় নেই—ভয় নেই, টেনে যা। সে আরও ঢের দক্ষিণে, অনেক নীচুতে।

ভয় নেই, ভরসাও নেই।

আমার হাল ঠিক আছে। হালের মাঝি অভয় দিলে, নিজেদের কাজ করে যা তোরা।

মথুরানাথ ঘোষাল ছইয়ের বাইরে বসে হুঁকো টানছিল। এই রাতে এমন দুরন্ত পদ্মায় পাড়ি দেওয়ার ইচ্ছে তার বিশেষ ছিল তা নয়। কিন্তু বন্দরে দু-তিন দিন আটকে পড়তে হল। ওদিকে কাল থেকে ভাগীদারেরা গোলায় ধান তুলতে থাকবে। সামনাসামনি দাঁড়িয়ে নজর না রাখলে ঠিক বোকা বুঝিয়ে যাবে বউ-ছেলেকে। তাই আজ রাতে না ফিরলেই তার নয়।

কিন্তু মাঝখানে ভাবনায় বাধা পড়ল মথুরার।

অন্ধকারে তাকাতে তাকাতে তার চোখের দৃষ্টি এতক্ষণে অনেকটা স্পষ্ট আর স্বচ্ছ হয়ে গিয়েছিল। তা ছাড়া তারাজ্বলা আকাশের ছায়া পদ্মার ঘোলা জলের ওপর পড়ে একটা চঞ্চল আলোর দীপ্তি যেন নেচে উঠছিল, ছুটন্ত স্রোতের ওপর কাঁপছিল। সেই আলোয় একটা কীসের ওপর যেন মথুরার চোখ পড়ল।

একখানা নৌকা আসছে না এদিকপানে?

পেছন ফিরে যারা দাঁড় টানছিল, তারা দেখতে পায়নি। কিন্তু হালের মাঝির ভামবেড়ালের মতো জ্বলন্ত সজাগ চোখ ঠিকই লক্ষ করেছিল। মনের ভেতর ছায়া ঘনাচ্ছিল তার।

ঠিকই বলেছেন কর্তা। বড়ো একটা জেলেডিঙির মতো এগিয়ে আসছে তরতরিয়ে। কিন্তু

আলো নেই কেন? এই রাত্তিরে যেভাবে পাড়ি মেরে এগিয়ে আসছে…

মাঝপথেই সে থেমে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গেই আতঙ্কে গলা বুক শুকিয়ে উঠল মথুরার।

হ্যাঁ রে, এ তল্লাটে তো কোনো ভয়ডর ছিল না।

একেবারে যে নেই তাই-বা কী করে বলি কর্তা? দিন বারো আগেই মাইল সাতেক উজানে একটা বড়োরকম ডাকাতি হয়ে গেছে!

জলপুলিশ কী করে?

ঘুরে তো বেড়ায়। কিন্তু এত বড়ো গাং। তারপর কে কোনদিক দিয়ে কোন খাল বেয়ে সুট করে সরে পড়ে, তার কি ঠিকঠিকানা আছে! শয়তানের সঙ্গে কে পেরে উঠবে বাবু?

বলিস কী! মথুরার জিভটা কে যেন ভেতর থেকে টানতে লাগল। রাত্রির এই ঠাণ্ডা ভিজে হাওয়াতে সারা গা দিয়ে যেন আগুনের হলকা বেরিয়ে এল। ভাঙা গলায় বললে, হাঁকডাক করব?

দাঁড়ের মাঝিরা দাঁড় বন্ধ করে ঝুঁকে বসল সামনের দিকে। নীরস গলায় একজন বললে, এত রাত্তিরে মাঝগাঙে চেঁচিয়ে গলা ফাটালেও কেউ সাড়া দেবে না কর্তা। এ বড়ো বিষম ঠাঁই। ধারেকাছে দু-একখানা এক-মাল্লাই থাকলেও এখন তারা কিছুতেই কাছে ভিড়বে না।

হালের লোকটি নড়েচড়ে বসল। পদ্মায় মাঝি, রক্ত গরম হয়ে উঠেছে। সে বললে, লগি বাগিয়ে ধর মকবুল। যদি ডাকাতই হয় একটা মোকাবেলা করে ছাড়ব।

মকবুল সংক্ষেপে শান্ত গলায় বললে, খেপেছ ইয়াকুবচাচা!

সত্যি কথা। কী স্বার্থ আছে তাদের? সামান্য দু-একটি ময়লা জামাকাপড়, এক-আধটা তেলচিটে বালিশ, হুকো আর আগুনের মালসা, রান্নার মাটির হাঁড়ি আর কলাইকরা বাসন, সঙ্গে দু-চার ছ-গন্ডা পয়সা বা এক-আধটা টাকা। এর লোভে কেউ আর ডাকাতি করতে আসবে না, মজুরিই পোষাবে না তার। অনর্থক পরের জন্যে মারামারি করতে গিয়ে তারা নিজেদের মরণকে ডেকে আনবে কেন?

এর মধ্যেই অন্ধকারে নৌকাটা অনেকখানি এগিয়ে এসেছে। বারো-চৌদ্দোটি কালো কালো মাথা। বারো-চৌদ্দোটি হাতের দাঁড়ে জলের ওপর দিয়ে ছুটে আসছে বাইচের নৌকার মতো। ছিপ-নৌকা। এত রাত্রে এই সময় কোন বাইচ খেলায় তারা বেরিয়ে পড়েছে সেটা বুঝতে কারও আর এক মিনিটও সময় লাগল না। মথুরা ঘোষাল গেঞ্জির তলায় কাঁপা আঙুল ঢুকিয়ে পৈতে খুঁজতে লাগল, কিন্তু সময় বুঝে পৈতের সন্ধান পাওয়া গেল না।

ছিপ-নৌকা প্রায় ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে। ইয়াকুব অনর্থক জেনেও হাঁক ছাড়ল, এই নাও সামলে, আপন ডাইন…

আপন ডাইনে নৌকা সামলাবার কোনো গরজ দেখা গেল না তাদের। তার বদলে বেশ মোলায়েম গলায় কে যেন জানতে চাইল, নৌকা কোথায় যাবে হে?

কুমারহাটি।

কুমারহাটি? বেশ বেশ। তা একটু তামাক খাওয়াও-না মিয়াভাই, গলা শুকিয়ে গেছে।

দু-চোখ বুজে বসে রইল মথুরা ঘোষাল, কানের মধ্যে তার ঝিঝি ডাকছে। সব নিয়মমাফিক চলছে, এমনিভাবেই ওরা এসে আলাপ জমায়।

মকবুল গলা চড়িয়ে বললে, না, তামাক আমাদের নেই।

ও-নৌকা থেকে হাসির আওয়াজ এল। মিষ্টি খিলখিল হাসি।

আছে শেখের পো, আছে! কেন আর মিছে কথা বাড়াচ্ছ বলো দেখি! ভালো মানুষের মতো হুঁকোটা বাড়িয়ে দাও, এক ছিলিম টেনে নিয়ে চলে যাই।

মকবুল বোধ হয় একটা অসম্ভব আশায় হুঁকোই খুঁজতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই খটখটাং করে ছিপ এসে নৌকার গায়ে ভিড়ে গেল। টলমল করে দুলে উঠল নৌকা।

ইয়াকুব চেঁচিয়ে উঠল, গায়ে এসে পড়লে যে, তফাত যাও তফাত যাও!

থামো হে সুমুন্দি, আস্তে। ভালো কথায় কান দেওয়ার পাত্তর তো নও, তাই বাঁকা আঙুলেই ঘি ওঠাতে হবে। আচ্ছা, তামাক তোমাদের আর দিতে হবে না, আমরাই খুঁজে নিচ্ছি।

কথাটা বলেই তারা আর সময় দিলে না। চোখের পলকে তিন-চার জন লোক প্রায় একসঙ্গেই এই নৌকার ঝাঁপ দিয়ে পড়ল। একদিকে কাত হয়ে নৌকাটা সোজা হয়ে উঠতে না-উঠতেই দেখা গেল একখানা বিরাট রামদার উজ্জ্বল চেহারা তিন-চারখানা সড়কির ক্ষুধার্ত ফলক। অন্ধকার পদ্মার অতল থেকে একদল প্রেত এসে যেন তাদের সামনে দাঁড়াল।

রামদা যার হাতে ছিল, কালভৈরবের মতো তার চেহারা। মাথার বিরাট বাবরি নাচিয়ে রামদাখানাকে বার কয়েক শূন্যে ভেঁজে নিয়ে সে মথুরাকে বললে, তাড়াতাড়ি বের করে দাও সব। একটু শোরগোল তুলেছ কী ধড় থেকে মাথা তফাত করে দেব!

মথুরা অস্পষ্টভাবে কী-একটা হাউমাউ করে বলবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তেই বুঝতে পারলে, ঠিক তার হৃৎপিন্ডের ওপরটিতে বুকের চামড়ায় পিনের মতো খোঁচার একটুখানি মৃদুযন্ত্রণা। সড়কির একটা ধারালো ফলা অত্যন্ত পরিষ্কার অর্থ নিয়ে জায়গাটি স্পর্শ করে আছে।

চুপ। নইলে এখুনি এফোঁড়-ওফোঁড় করে ফেলব।

মথুরা যেমন ছিল তেমনি বসে রইল। একটা নিশ্বাস পর্যন্ত শব্দ করে ফেলবার মতো সাহস তার নেই।

লুট শুরু হয়ে গেল। বাক্স-বিছানা থেকে শুরু করে জার্মান সিলভারের পান খাওয়ার ছোটো কৌটোটি পর্যন্ত বাদ পড়ল না। স্পর্শ করল না কেবল মাঝিদের ছেঁড়াখোঁড়া বিছানা, গোটা দুই লোহার কড়াই আর তিন-চারখানা কলাই-করা এনামেলের থালা।

সমস্ত চেষ্টা-ভাবনা ছেড়ে দিয়ে মাঝিরা গলুইয়ের উপর নিশ্ৰুপ হয়ে বসে ছিল। যেন নিতান্তই দর্শকের দল, যেন কিছুই তাদের করবার নেই। হঠাৎ যেন মকবুলের জ্ঞান ফিরে এল। চমকে জিজ্ঞেস করল, এমন করে নৌকা ছুটেছে কেন ইয়াকুব চাচা? জলের এমন টান কেন?

টান!

সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল হল সকলের। সত্যিই তো! দুরন্ত একটা স্রোতের টানে দুখানা নৌকাই যেন ঝড়ের পালে ছুটে চলেছে। এ স্বাভাবিক টান নয়, পদ্মার স্রোতের চাইতে অনেক প্রখর, অনেক দুরন্ত এর শক্তি।

মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল সব। শিকার আর শিকারি দু-দলের মধ্যেই একসঙ্গে হাহাকার উঠল একটা। রামদা হাতে করে যে এতক্ষণ সকলকে শাসাচ্ছিল, তৎক্ষণাৎ তার হাতখানা ঝুলে পড়ল দুর্বলভাবে। ভয়-জড়ানো গলায় সে বলল, বড়ো পাকের টান!

বড়ো পাকের টান! পদ্মার এই অঞ্চলে সে-পাকের খ্যাতি কে না জানে! চুম্বক যেমন অনিবার্য আকর্ষণে লোহাকে টেনে আনে, তেমনি এই বড়ো পাকের টানও বহুদূর থেকে নৌকা বা যা-কিছু পায় সকলের অজ্ঞাতে বুভুক্ষু জলচক্রের ভেতর সেগুলিকে গ্রাস করতে নিয়ে আসে। সাপের চোখের মতো তার আকর্ষণ-প্রভাব। হুশিয়ার মাঝিরা দূর থেকে সে প্রভাব অনুভব করে প্রাণ বাঁচায়। যারা পারে না, সেই অনিবার্য নিষ্ঠুর আকর্ষণে মোহমুগ্ধের মতো ছুটে আসে। বিশাল ঘূর্ণি প্রচন্ড কয়েকটি আবর্তে বার কয়েক তাদের ঘুরিয়ে সোঁ করে অতলগর্ভে তলিয়ে নেয়, জলের উপর কোনোখানে এতটুকু চিহ্ন রেখে যায় না। তারপর হয়তো তিন মাইল দূরের বাঁকের মুখে কয়েকটা দেহ বা একখানা উবুড়-করা নৌকা ভেসে ওঠে। এ নিয়তির টান, এর হাত থেকে পরিত্রাণ নেই। এই পাকের টানে এক বার পড়লে কোনো মাঝির সাধ্য নেই যে নৌকা কিংবা প্রাণ বাঁচিয়ে আসতে পারে।

ডাকাতির উত্তেজনায় হোক কিংবা অসাবধানেই হোক—কোন অশুভক্ষণে যে নৌকা পাকের টানের মধ্যে এসে পড়েছে কেউ তা বুঝতে পারেনি। যখন পারল তখন আর সময় ছিল না। নৌকার গায়ে ঘা দিয়ে দিয়ে পদ্মার জল বাজতে লাগল খানিকটা ক্রুর কুৎসিত হাসির মতো।

লুটের মাল যেমন ছিল তেমনিই পড়ে রইল। সড়কি, বল্লম, রামদা ফেলে দিয়ে দু-দলই দাঁড় টানতে লাগল পাগলের মতো। ছিঁড়ে যেতে লাগল হাতের পেশি, ফেটে যেতে লাগল। হৃৎপিন্ড। কিন্তু প্রকৃতির এই অসম্ভব শক্তির কাছে মানুষের সমস্ত চেষ্টা হার মানল। এক-পা এগিয়ে তিন-পা পিছিয়ে এল নৌকা। উজানের বাতাসটুকুও পড়ে গেছে, পালের কাছ থেকে কোনো সাহায্যের আশা নেই।

নৌকা আর বাঁচবে না।

এবার ঝুপঝাপ করে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল সবাই। নৌকার যা হওয়ার হোক, কোনোমতে বাহুবলে যদি আত্মরক্ষা করা যায়, যদি চড়া কিংবা অন্য কিছুর আকস্মিক আশ্রয় জুটে যায়। নৌকা দুখানা উল্কার গতিতে ছুটে চলে গেল সেই অনিবার্য মৃত্যুচক্রের দিকেই।

৫.

জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল বটে, কিন্তু স্রোতের টানে কে যে কোন দিকে বুদবুদের মতো নিশ্চিহ্ন হল তার আর সন্ধানই মিলল না। সে-আকর্ষণে মথুরা ঘোষালও কুটোর মতো ঘূর্ণির রাক্ষসগর্ভের দিকে ভেসে চলল। আগেই প্রায় মরে গিয়েছিল সে, এখন আচ্ছন্ন চেতনার ভেতর তার মনে হতে লাগল পেছন থেকে মরণের দূতেরা লক্ষ লক্ষ ঠাণ্ডা হাতে তাকে পাতালের অন্ধকারে ঠেলে নিয়ে চলেছে, একবিন্দু করুণা নেই তাদের। জলের গর্জন ক্রমশ একটা ক্রুদ্ধ জন্তুর আক্রোশধ্বনির মতো বেড়ে উঠছে, পাকটা আর কত দূরে?

সেই সময় হটাৎ জলের ভেতরে কীসে পা আটকাল মথুরার। কী যেন একটা জিনিস স্থির হয়ে আছে এই ভয়ংকর স্রোতের ভেতরেও। দু-হাতে সেটাকে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরল মথুরা, টের পেল পাড়-ভেঙেপড়া একটা নারকেল গাছের আশ্রয় পেয়েছে সে। পাড় কবে ভেঙেছে, পদ্মাতীরের সীমানা কত দূর সরিয়ে দিয়েছে ঠিক নেই, তবু অল্প গভীর এখানকার জলে ঘূর্ণির প্রবল টানকে উপেক্ষা করেও মাত্র মাথাটুকু জাগিয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে নারকেল গাছটা।

পিঠের ওপর দিয়ে একটানা স্রোত। আশ্রয় পেয়েও অস্বস্তি বোধ করছিল মথুরা। নিশ্চিত মরণের ভেতর বাঁচার এতটুকু আশা মনকে চাঙ্গা করে তুলল অনেকখানি। শরীর ক্রমশ অচল হয়ে আসছে, গায়ে যে প্রচুর শক্তি অবশিষ্ট আছে তাও নয়। আর একটু দুর্বল হয়ে পড়লে নিঃসন্দেহে আত্মসমর্পণ করতে হবে নদীর করুণার সামনে।

অবশিষ্ট শক্তিটুকু কোনোমতে গুছিয়ে নিয়ে মথুরা বহুকষ্টে নারকেল গাছটার আগায় এসে পৌঁছুল। জল থেকে মাথাটা হাত তিনেক মাত্র উপরে। কিন্তু মাথা বলতে কিছুই এখন আর অবশিষ্ট নেই। কালক্রমে শুকিয়ে শুকিয়ে তারা পদ্মার জলে ঝরে পড়েছে। শুধু দু-একটা শুকনো ডাঁটা ন্যাড়া মাথার ওপর কাঁটার মুকুটের মতো দাঁড়িয়ে আছে।

নক্ষত্র-ছাওয়া আকাশে এতক্ষণ কেবল অন্ধকারের উৎসব চলছিল। কিন্তু এতক্ষণে সেটা ফিকে হয়ে এল। ভাঙা ভাঙা হয়ে টুকরো মেঘের ওপার থেকে চাঁদ উঠল এতক্ষণে। খন্ড চাঁদ, নিষ্প্রভ আলো, তবু সেই ম্লান করুণ আলোয় পদ্মার এই নিশীথ রূপটাকে আরও রহস্যময়, আরও ভয়ংকর মনে হতে লাগল। নারকেল গাছটা থরথর করে উঠছে স্রোতের বেগে, দীর্ঘকাল এই টান সয়ে জলের ভেতর ডুবে থেকে তার দাঁড়াবার শক্তিও কমে আসছে। ক্রমশ তিল তিল করে ক্ষয় হচ্ছে তার তলার মাটি, যেকোনো সময়ে উপড়ে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এত কথা ভাববার সময় মথুরার ছিল না। শেষ অবলম্বনটুকু দু-হাতে জড়িয়ে ধরে সে অজ্ঞানের মতো পড়ে রইল। তার চারদিকে মুখের শিকার ছেড়ে যাওয়া কালনাগিনি আক্রোশে গর্জে চলল।

বোধ হয় পাঁচ মিনিটও নয়, হঠাৎ সে টের পেল নারকেল গাছটায় জোরালো ঝাঁকুনি লেগেছে একটা। চমকে তাকিয়ে দেখল স্রোতে ভাসতে ভাসতে এসে আর একটি মানুষও তারই মতো এই গাছটাকে আঁকড়ে ধরেছে। লোকটার সারা শরীর জলের মধ্যে, ঝাঁকড়া চুলওয়ালা মাথা আর দুখানি হাত মাত্র ভেসে আছে জলের ওপর।

এক বারের জন্য শিউরে উঠে পরক্ষণেই হাসি ফুটে উঠল মথুরার মুখে। একেই বলে বিধাতার ঠাট্টা। রামদা মাথার ওপর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এই লোকটাই-না এতক্ষণ শাসাচ্ছিল তাদের। এতক্ষণ জলে ভিজলেও তাকে চিনতে কষ্ট হয় না। তার ঝাঁকরা বাবরি আর বুনো মোষের মতো শরীরটা এক বার দেখলে আর ভোলবার নয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই লোকটার এত পরাক্রম চুপসে এতটুকু হয়ে গেছে। ইচ্ছের বিরুদ্ধেও মথুরা শব্দ করে হেসে উঠল।

লোকটা চমকাল-দারুণভাবে চমকাল। যেন মাথার ওপর কালো পদ্মার প্রেতাত্মার হাসি শুনেছে সে। আতঙ্কে বিষণ্ণ চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল, চাঁদের আলোয় চিনতেও পারল মথুরাকে।

ওঃ, তুমি!

সমস্ত ভয় আর ভাবনার একেবারে শেষ ধাপে পৌঁছেছে মথুরা। এখন আর ঘাবড়াবার মতো কিছু নেই। লোকটার দশা দেখে ভারি কৌতুক বোধ হল তার।

ঠাট্টা করে মথুরা বললে, তোমাদেরই দয়ায় এখানে আসতে হল বাবা। কিন্তু যাত্রাটা দেখছি তোমাদেরও শুভ হয়নি।

নাঃ! একটু চুপ করে থেকে লোকটা বড়ো রকমের নিশ্বাস ফেলল। পদ্মার হাওয়ায় আর কলধ্বনিতে নিশ্বাসের আওয়াজটা মথুরা শুনতে পেল না। লোকটা আবার বললে, ছ-মাস আগেও জেল খেটে বেরিয়েছি, দু-বছর, কিন্তু এমন বিপদে আর কখনো পড়িনি।

মথুরা চুপ করে রইল।

লোকটা বলে চলল, কাল পূর্ণ হয়েছিল আর কী। ধর্মের ঢাক হাওয়ায় বাজে কিনা? বউটা বলত, এত পাপ ধর্মে সইবে না, এমন কাজ কোরোনি। আমি তার কথা শুনিনি। মরণ তাকে টেনে নিলে। দু-তিন বছর ভালো হয়ে থাকলুম, তারপর আবার মানুষ মারার জন্যে পদ্মা ডাক পাঠাল। মায়ের কাছে অনেক বলি দিয়েছি, এবার আমাকেই বলি নেবে।

আশ্চর্য! কান্নায় ভরা লোকটার গলা। একটা নিষ্ঠুর ভয়ংকর ডাকাত কোথাও নেই— নিতান্তই সাধারণ মানুষ। মরণের সামনে দাঁড়িয়ে বুকের ভেতর থেকে তার হাহাকার উঠছে।

মথুরা শুনতে লাগল।

ছেলেটাকে মানুষ করতে চেয়েছিলুম চাষি গেরস্থর মতো লাঙল ঠেলে, মাটি কুপিয়ে। বউয়ের শেষ মিনতি। পারলুম না। কিছুদিন পরেই আবার ওরা আমায় টানতে লাগল। বললে, চল কালাচাঁদ চল। আবার ধরিয়ে দিলে ডাকাতির নেশা। ছেলের কথা ভাবলুম না, বউয়ের শেষ কথা ভুলে গেলুম। কিন্তু এবার দারোগা দল-কে-দল ধরে নিয়ে গেল। তিন বছর ফাটক খেটে এলুম।

তারপরেও আবার বেরিয়েছিলে ডাকাতি করতে?

ও যে রক্তের টান বাবু, ওখানেও যে সর্বনাশা বড়ো পাকের টান। নদীর ওপর কালো হয়ে রাত নামলে, পদ্মার জল খাঁড়া দুলিয়ে ডাক পাঠালে, হু-হু করে হাওয়ার তুফান বইলে তখন যে আর কিছুতেই ঘরে থাকা যায় না। অনেক চেষ্টা করেছি, দড়ি দিয়ে নিজেকে বেঁধে রেখেছি, তারপর নিজেই দড়ি কেটে পালিয়ে গেছি। এতদিনে সব মিটল। শুধু ছেলেটাকে যদি…

কালাচাঁদ থামল। পদ্মা গর্জন করে চলল একটানা। ঘুমের ঘোরে কোন দূরের বাসা থেকে ভুলে বেরিয়ে এসে একটা গাংচিল কেঁদে চলে গেল।

জল থেকে ওপরে উঠে যাওয়ার চেষ্টা করল কালাচাঁদ, কিন্তু বসবার জায়গা কোথাও নেই। বৃষ্টিবাদলায় শ্যাওলা পড়ে পড়ে গাছটা পেছল হয়ে আছে, বার বার হাত ফসকে যেতে চায়। আবার ভালো জায়গাটি মথুরা দখল করে বসে আছে, এক বার হতাশভাবে কালাচাঁদ সেদিকে তাকিয়ে দেখল। তার পা দুখানা তখনও জলের ভেতর, বড়ো পাকের টান হিংস্রভাবে সে-দুখানাকে যেন শরীর থেকে ছিঁড়ে নিতে চাইছে। হাতের মুঠা একটু আলগা হলেই সঙ্গে সঙ্গে টেনে নেবে নিজের ঘুরন্ত রাক্ষসগর্ভের মাঝখানে।

কালাচাঁদ আবার বললে, তোমার বাড়ি তো কুমারহাটি না?

হুঁ।

আমার হল মাদারঘাটা। একই দেশের মানুষ তাহলে।

সে তো বটেই। একটু খোঁচা দেওয়ার লোভটা সামলাতে পারল না, না হলে আর সর্বনাশ করতে আসবে কেন আমার?

জ্যোৎস্না আর একটু উজ্জ্বল হলে দেখা যেত কালাচাঁদের কালো মুখ লজ্জায় আরও কালো হয়ে উঠেছে।

আর লজ্জা দিয়ো না ও-কথা বলে, শাস্তি তো আমার শুরু হয়েছে। নামটা কী?

মথুরা নাম জানাল।

ঘোষাল? ব্রাহ্মণ? কালাচাঁদ জিভ কাটল, ব্রহ্মস্ব লুট করতে গিয়েছিলুম! হবেই তো, হবেই তো। নিজে নিজেই এক বার মাথা নাড়ল, এমনিই হয়।

আর কখনো ব্রহ্মস্ব লুট করনি বোধ হয়?

না জেনে ক-বার করেছি বলতে পারিনে, কিন্তু জানিতে এক বার। কালাচাঁদ থামল। চক্রবর্তীর কবন্ধ থেকে একরাশ রক্ত যেন ফিনকি দিয়ে চোখে-মুখে ছিটকে পড়ল তার। একটু চুপ করে থেকেই বললে, দন্ড হাতে হাতেই পেয়েছিলুম। ঘরে ফিরে দেখি বউটা মরে কাঠ হয়ে আছে। কলেরা।

আবার চুপ। পদ্মার গর্জন, ঘূর্ণির একটা ক্রুদ্ধ আহ্বান। কালো আকাশ আর কালো জল, দুয়ের মাঝখানে খানিকটা কাকজ্যোৎস্না জ্বলছে কুয়াশার একটা পর্দার মতো। পাখার শব্দ বাজিয়ে উড়ে চলেছে গোটা কয়েক বাদুড়, মরা জ্যোৎস্নায় তাদের ছায়া ওদের ওপর দিয়ে ভেসে গেল। নীচে জলের অবিশ্রান্ত গতি, সময়ের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন কলরোল ছুটেছে দ্বৈতসংগীতে। কাল যেমন করে সব ভেঙে এগিয়ে যায়, ঠিক সেই একই নিয়মে ছুটেছে কীর্তিনাশা পদ্মা। দুই কূলে তার ভাঙনের ডমরু বাজছে।

মানুষের দেহ-মন দুই-ই আশ্চর্য! সব অবস্থার সঙ্গেই যেমন করে হোক মানিয়ে নিতে পারে। তাই এর মধ্যেও মথুরার চেতনা অসাড় হয়ে আসছিল। চট করে ঘোর ভেঙে গেল। সত্যি সত্যিই ঝিমুচ্ছে নাকি সে! এক বার হাত খুলে পড়ে গেলেই আর দেখতে হবে না, একটা টানেই পদ্মা একেবারে পনেরো-ষোলো হাত দূরে নিয়ে চলে যাবে। তখন আর ফিরে আসা মানুষ কেন–দৈত্যের পক্ষেও সম্ভব নয়।

চোখ মেলে মথুরা চেয়ে দেখল। তেমনি জলের ভিতর বারো আনা শরীরটাকে ডুবিয়ে প্রাণপণে গাছটাকে আঁকড়ে আছে কালাচাঁদ। চাঁদ আরও খানিকটা উঠে এসেছে, প্রায় মাথার ওপর। সেই আলোয় মথুরা আরও স্পষ্ট করে দেখতে পেল তাকে। ক্লান্তি, যন্ত্রণা আর ভয় সমস্ত মুখের ওপর থমকে আছে তার বেঁচে থেকেও যেন নরকবাস করছে।

কেমন আছ হে কালাচাঁদ?

ভালো নেই ঠাকুরমশাই। ক্লিষ্ট গলায় জবাব এল, জলে পড়বার আগেই পাঁজরাতে একটা চোট পেয়েছিলাম। ভিজে ভিজে আর জোর পাচ্ছিনে গায়ে। বেশিক্ষণ যে ধরে থাকতে পারব, সে-ভরসা আর নেই।

ওপরে উঠতে পারবে? ওপরে দুজনের জায়গা হওয়ার কথা নয়, কিন্তু এই চরম বিপদে পরমশত্রুকে মথুরা ডাক না দিয়ে থাকতে পারল না। লোকটার জন্যে এখন তার কষ্ট হচ্ছে।

কিন্তু কালাচাঁদের মনও বদলে গেছে এখন।

না ঠাকুরমশাই, দুজনের জায়গা হবে না ওখানে। তা ছাড়া শরীরেও এমন বল নেই যে। এতটুকু উঠে আসতে পারি। হাত-পা আমার অসাড় হয়ে যাচ্ছে।

তাহলে?

আর উপায় নেই ঠাকুর, মরণ আমার ঘনিয়ে এসেছে। তার আগে…

বার-বার-বারাং–

একটা ভয়ংকর শব্দ চারদিক কাঁপিয়ে জেগে উঠল, কোথায় যেন তোলপাড় হয়ে উঠল জল। পদ্মা ভাঙছে, ভেঙে চলেছে— মানুষের নীড়, পৃথিবীর মাটি। কোথায় যেন মস্ত একটা ভাঙন নামল কাছাকাছিই।

দুজনেই কান পেতে কিছুক্ষণ ধরে শুনল শব্দটা। আবার পাড়ি ভাঙল। হয়তো কারও ঘর গেল, কারও জমি গেল, কারও সর্বস্ব হারিয়ে গেল ওর সঙ্গে।

কিছুক্ষণ পরে আবার নিশ্বাস ফেলল কালাচাঁদ।

তুমি আমার দেশের মানুষ ঠাকুরমশাই, মরণের আগে তোমার চরণে নিবেদন আছে একটা।

মথুরার কষ্ট হল।

মরবে কেন হে? অনেকক্ষণ তো কাটালে। আর ঘণ্টা তিনেকের বেশি রাত্তির নেই। এর মধ্যে যদি কোনো জাহাজ এসে পড়ে তো ভালোই, নইলে দিনের বেলা যে করে হোক উপায় একটা হবেই। ভগবান আছেন।

আমার জন্যে নেই। কালাচাঁদ হাসতে চেষ্টা করল, তা ছাড়া তিন ঘণ্টা আর পারছিনে ঠাকুরমশাই, আমার হয়ে এসেছে। আমার ন-দশ বছরের একটা ছেলে আছে সংসারে, সে পড়ে আছে রতনগঞ্জে তার এক পিসির বাড়িতে। তুমি সেই পিসিকে এই গেজেটা দিয়ে, খান কয়েক মোহর আছে এতে। এ নিয়ে যেন আমার ছেলের নামে জমি কিনে রাখে। বড়ো হলে যেন আমার ছেলে চাষি হয়ে নিজের রোজগারের ফসল খেতে পারে। তা ছাড়া আরও বোলো, উত্তরের পোঁতায় দু-ঘটি…

হাত নামিয়ে গেজেটা তুলে নিলে মথুরা।

উত্তরের পোঁতায় দু-ঘটি…

কিন্তু আর বলতে পারল না কালাচাঁদ। এক হাতে গেজেটা বাড়িয়ে দিতে গিয়ে দুর্বল বাঁ হাতখানা কালাচাঁদের পিছলে গেল নারকেল গাছের গা থেকে। তারপরেই ছলাৎ করে শব্দ হল—যেন বড় একটা রুই মাছ উলাস দিয়ে উঠল জলের ওপর।

তাকিয়ে রইল মথুরা ঘোষাল। দেখল পদ্মার সেই দুরন্ত ঘূর্ণির টানে কালাচাঁদের ঝাঁকড়া মাথাটা ডুবতে ডুবতে ভেসে উঠল এক বার।

যমুনা ঠিকই বলেছিল ঠাকুরমশাই। মাথাটা ডুবে আবার ভেসে উঠল। মা নয়, রাক্ষুসি; রক্ত খায়।

সেই শেষ কথা। জলে বুদবুদ মিলিয়ে গেল। আর যাওয়ার আগে সমস্ত বিশ্বাস এমন একজনের হাতে দিয়ে গেল—একটু আগে চোখ বুজে যাকে সে খুন করতে পারত।

সকালের আলো জাগল। জেগে উঠল পদ্মা, যে মা, যে খিদের ফসল দেয়, পিপাসার জল দেয়। যে-পদ্মায় রঙিলা নাও ভাসিয়ে ভিনদেশিয়া বন্ধু দেশে ফিরে আসে। যে-পদ্মার জলে কালাচাঁদের ছেলে ডিঙি বেয়ে ধান বেচতে যাবে লক্ষীপুরার বাজারে।

একটা চলতি স্টিমার এসে নারকেল গাছের মাথা থেকে যখন অজ্ঞান অচৈতন্য মথুরা ঘোষালকে উদ্ধার করল, তখন তার হাতের মুঠোয় গেজেটা বজ্রশক্তিতে ধরা।

ঘোড়া-টোড়ার ব্যাপার

বলটুদা বললে, এই যে ঘোড়াটা দেখছিস, এর পূর্বপুরুষ কে– জানিস?

অন্য একটা ঘোড়া নিশ্চয়–আমি জবাব দিলাম।

বলটুদা বললে, তোর মুণ্ডু!

তবে কি ওর পূর্বপুরুষ হাতি? নাকি গণ্ডার? না বাঘ?

কিন্তু বাঘ বলে আমার নিজেরই খটকা লাগল : উঁহু, বাঘ জেব্রার পূর্বপুরুষ– জেব্রার গায়েই তো বাঘের মতো ডোরা আঁকা আছে।

আমি জানতে চাই প্যালা, তুই তোর গবেষণা বন্ধ কবি কিনা?

বলটুদা চটে উঠল : যা মনে আসছে তাই যে বলে যাচ্ছিস। আমি তোকে ঘোড়ার কথা জিজ্ঞেস করছিলুম–জেব্রা নিয়ে কে তোকে মাথা ঘামাতে বলেছে?

আমি কান-টান চুলকে বললাম, কী জানো বলটুদা, ঘোড়া-টোড়ার কথা ভাবলেই আমার সব কেমন গোলমাল হয়ে যায়। ঘোড়া থেকে মনে পড়ে ঘোড়ার ডিমকে ঘোড়ার ডিম থেকে মনে পড়ে ডিমের ডালনাকে, তা থেকে মনে পড়ে ফুলকো লুচিকে।

উঃ, এ যে বকবক করে কানের পোকা বের করে দিলে। তোদের মতো পেটুকের সঙ্গে কথা কওয়াই ঝকমারি বলটুদা হাল ছেড়ে দিলে।

আর সঙ্গে সঙ্গেই বলটুদার ঘোড়াটা চিহিহি করে ডেকে উঠল। ঠিক মনে হল, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ঠাট্টার ভঙ্গিতে হি হি করে হাসছে। আচ্ছা বেয়াদব ঘোড়া তো।

বলটুদা বললে, দেখলি তো প্যালা– কেমন সমঝদার ঘোড়া? তোর ক্যাবলামি দেখে কেমন তোকে ভেংচে দিলে। তাই তো বলছিলুম- এর পূর্বপুরুষ হল চৈতক।

চৈতন?–আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, চৈতন তো হল বড়মামার বুড়ো চাকর। সে তো ধানবাদে থাকে, আর সন্ধে হলেই মামা হো–মামা হো, বলে গান গায়।

শুনে বলটুদা কটাং করে আমার মাথায় একটা গাঁট্টা মারলে। বললে, তুই একটা ছাগল। মামা হো নয় রে বেকুব, ওটা রামা হো। আর চৈতন নয়-চৈতক। তোর বড়মামার চাকর নয়–রানা প্রতাপ সিংহের ঘোড়া।

প্রতাপ সিঙ্গী,–ওহো, বুঝতে পেরেছি। আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, ছোটকাকার বন্ধু। রেলে চাকরি করে। আমাকে একবার কেলনারের হোটেলে কাটলেট খাইয়েছিল।

কটাং করে আর একটা গাট্টা পড়ল