-কেলো, ওরে ও হতভাগা, মরেছিস নাকি? তোর নতুন ম্যাস্টার এয়েছে যে!
–চুপ করো পিসিমা, এখন আমি পেয়ারা খাচ্ছি।
–ওরে মুখপোড়া, আর পেয়ারা খায় না। ম্যাস্টার বসে আছে, পড়বি আয়।
–পড়ব না হাতি! হীরের টুকরো ছেলের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম : আচ্ছা পিসিমা মাস্টারগুলোকে সব যমে নেয় না কেন? তা হলে নিশ্চিন্তে পেয়ারা খেতে পারি।
ছিঃ বাবা, বলতে নেই ওসব। লেখাপড়া করে যে গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে
ইস। গাড়ি-ঘোড়া চড়ে না কাঁচকলা! বাবাও তো লেখাপড়া শিখেছে, কই বাবার গাড়ি-ঘোড়া? সে তো পায়ে ঠ্যাঙাতে ঠ্যাঙাতে অফিসে যায়।
পিসিমা বললেন, ওরে হতভাগা, বাপকে বলতে হয় না ওসব কথা। এখন যা, মাস্টার বসে আছে।
–মা শীতলা কেন যে মাস্টারগুলোকে চোখে দেখতে পায় না–একটা দীর্ঘশ্বাস শুনতে পেলাম। আর পরক্ষণেই ঘরের মধ্যে প্রায় লাফ দিয়ে পড়ল সেই ভাজা-মাছ-উল্টে-খেতে-না-জানা শ্রীমান্ কালাচাঁদ ঘোষ–ক্যাবলা যাকে হীরের টুকরো বলে বর্ণনা করেছে আর যার নেপথ্য কথামৃতে এতক্ষণ ধরে রোমাঞ্চিত হচ্ছিলাম আমি।
রোগা কালো একটি ছেলে। শয়তানিতে পিটপিটে চোখ। এক হাতে একটি ডাঁসা পেয়ারা নিয়ে চিবুচ্ছে প্রাণপণে। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল। গলার স্বর কোমল করে বললাম, এসো খোকা, এস–
কিন্তু খোকা সে-কথার কোনও জবাব দিল না। ঘরময় খানিকটা পেয়ারার থুতু ছড়িয়ে দিয়ে ফ্যাকফ্যাক্ করে হেসে ফেলল।
হাসছ যে–
হাসব না? কাঁলাচাঁদ আবার ফ্যাকফ্যাক করে হেসে উঠল; আচ্ছা মাস্টারমশাই, আপনার মুখখানা ঘোড়ার মতো লম্বা কেন?
রাগে পায়ের তলা থেকে মাথার তালু পর্যন্ত জ্বলে উঠল আমার। সামলে গেলাম। একটা ঢোক গিলে বললাম, আমার মুখ নিয়ে তোমার দুশ্চিন্তা করতে করতে হবে না। বসো এখন। কী পড়ো তুমি?
বই।
বই তো বটে, কিন্তু কী বই!
–অনেক বই : বাংলা, অঙ্ক, ইংরেজী, ভূগোল—
–বেশ, আনো তোমার ইংরেজী বই। দেখি কেমন পড়েছ।
কালাচাঁদ খাটের উপর থেকে একখানা বই তুলে নিয়ে এল।
–এ কী, এর যে আদ্ধেক পাতাই নেই!
–তা নেই! কালাচাঁদ ডাঁসা পেয়ারাটায় মস্ত আর-একটা কামড় দিয়ে বললে, কোত্থেকে থাকবে? ঘুড়ি জুড়তে হল যে।
-ঘুড়ি! পড়ার বই দিয়ে। আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠল।
কী করব, বাবা যে পয়সা দেয় না।
হুঁ–?আমি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম ছাত্রের মুখের দিকে : অঙ্ক কদুর করেছ?
–যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ
–বেশ, শ্লেট নাও; করো এই অঙ্কটা
কিন্তু কাকে বলছি চক্ষের পলকে একটা লাফ মরল কালাচাঁদ। তারপরেই ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে প্রাণপণে ছুটতে লাগল রাস্তা দিয়ে। আমি হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম।
কিন্তু কোথাও বোধ করি আড়ি পেতে দাঁড়িয়ে ছিলেন পিসিমা। কানের কাছে ফাটা কাঁসরের মতো তাঁর গলা ক্যানক্যান করে উঠল : হাঁ করে দেখছ কী মাস্টার। ধরো, ধরে আনো কেলোকে। নইলে পড়াবে কী করে?
সুতরাং আমিও ছুটলাম।
এ এক বিচিত্র প্রতিযোগিতা। খানা-খন্দ, মাঠ-ঘাট, নালা-ডোবা ডিঙিয়ে কালাচাঁদ ছুটছে, আমিও সমানে ছুটছি পেছন-পেছন। শেষ পর্যন্ত ধরে ফেললাম।
কিন্তু ধরেই কি সামলানো যায় সেই সোনার টুকরো ছেলেকে। আঁচড়ে কামড়ে আমাকে রক্তারক্তি করে দিলে। প্রাণপণে পাঁজাকোলা করে আমি তাকে ফিরিয়ে নিয়ে এলাম। ততক্ষণে আমার জামার আধখানা ছিঁড়ে ফেলেছে, নাক-মুখ আঁচড়ে দিয়েছে বেড়ালছানার মতো।
আর গালাগালি। আমার চৌদ্দপুরুষের স্বর্গলাভ ঘটিয়ে দিলে।
মনে-মনে যা হচ্ছিল, ভাষায় তা কহতব্য নয়। ইচ্ছে করছিল, এক আছাড়ে দিই ছোকরাকে সাবাড় করে, নিপাত করি এই মহীরাবণকে। কিন্তু আশা তখনও ছাড়তে পারিনি। মাসান্তে দশটি টাকা। দশ টাকায় কতটা পাঁঠার ঘুগনি, কতগুলো লেডিকেনি আর কয় হাঁড়ি কুলপিবরফ হবে একবার আন্দাজ করো দিকি।
পাঁজাকোলা করে ফিরিয়ে আনলাম কালাচাঁদকে।
হাঁপাতে-হাঁপাতে চেয়ারটায় বসে পড়লাম। বললাম, শোনো খোকা, লেখাপড়া একটু-আধটু না করলে মানুষ হবে কেমন করে! সকল ধনের সার বিদ্যা মহাধন
কালাচাঁদ কোনও উত্তর দিলে না। দাঁত বের করে বানরের মতো ভেংচে দিলে আমাকে।
-তোমার বাংলা বই আনো
আনব না।
আমি স্বর আরও কোমল করে বললাম, ছি খোকা, অমন করতে নেই। লেখাপড়া না শিখলে ভবিষ্যৎ যে ঘোর অন্ধকার
-ঘোড়ার ডিম।
রাগে সর্বাঙ্গ জ্বলছে আমার। ছেঁড়া জামার শোকে আর আঁচড়ের জ্বালায় শরীর মন দুই-ই চিড়চিড় করছে। বললাম, তর্ক কোরো না, বই আনো।
বই?–কালাচাঁদের চোখ পিটপিট করে উঠল। যেন নতুন কোনও মতলব ঠাউরেছে সে।
সন্দিগ্ধ গলায় আমি বললাম, হাঁ, বই।
হঠাৎ উবু হয়ে পড়ে খাটের তলা থেকে একটা মেটে হাঁড়ি বের করে আনল কালাচাঁদ। তারপর সেটাকে উপুড় করে দিলে আমার কোলের উপর।
এবার বাপরে বলে একটা প্রলয়ঙ্কর লাফ মারলাম আমি। ধপাৎ করে এসে পড়লাম রাস্তায়। হাঁড়ির মধ্যে সাপ! আমার গায়ের উপর থেকে সাপটা ড্রেনে গিয়ে নামল।
কালাচাঁদ দাঁত বের করে বললে, আমার আরও হাঁড়ি আছে মাস্টারমশাই–আরও হেলে সাপ–
অ্যাঁ—
আর দাঁড়ালাম না আমি! আর নয়। মাসান্তে দশ টাকার আশায় আর পাঁচ মিনিট এখানে থাকলে পৈতৃক প্রাণটি রেখে যেতে হবে।
রাস্তা দিয়ে চোঁ চোঁ করে ছুটলাম। সেবার ছিলাম আমি কালাচাঁদের পেছনে, এবার কালাচাঁদ আমার পেছনে। আর সেই সঙ্গে টালিগঞ্জের যত কুত্তার দল। কালাচাঁদ ছুটতে-ছুটতে তাদের উৎসাহ দিচ্ছে : আরে ছোঃ—ছোঃ—ছোঃ–! ছোঃ, বিউটি—
ছেলেধরার ইতিহাস
–ঝন্টু—ঝন্টু–
